টপিকঃ কাজলদীঘি, শ্মশান ও পীরসাহেবের থান

পাঁচ বছর পর আমার নিজের বাসভূমিতে পা রাখলাম। এতদিন নিজভূমে পরবাসে ছিলাম। দেখতে দেখতে পাঁচ পাঁচটা বছর কোথা দিয়ে কেটে গেছে জানি না। বাস থেকে চকে নামলাম। চকের নাম বড়চাড়া। গ্রাম্য ভাষায় বাস স্ট্যান্ডকে চক বলে। লাল ধূলো উড়িয়ে মোরাম রাস্তা দিয়ে বাসটা গর্জন করতে করতে চলে গেলো। গায়ে মাথায় লালাধূলোর পরশ। বাস থেকে নামতে সবাই কেমন উত্সুক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। অজ গাঁয়ের বাসস্টেন্ডে খুব একটা বেশি লোক নামে না। সারাদিনে তিনটে বাস। জনা তিনেক নামলে অনেক বেশি। আমার সঙ্গে আরও দুজন নামল। নেমেই তারা হন হন করে হাঁটতে আরম্ভ করলো মাঠের মোরাম রাস্তা ধরে। এখান থেকে আমায় দশ কিলোমিটার হেঁটে যেতে হবে। এই রাস্তাটুকু হাঁটতে আড়াই থেকে তিন ঘন্টা সময় লাগবে। একটা সময় সাইকেল নিয়ে এসব রাস্তায় কত ঘোরা ঘুরি করেছি। আজ কেমন যেন মনে হচ্ছে।
সূর্য এখন মধ্য গগনে। পাঁচবছর আগে এই চকে যে কয়টা দোকান দেখেছিলাম এখন তার থেকে কয়েকটা বেরেছে। পরিচিত যারা ছিলেন তাদের কাউকেই চোখে পরছে না। হয়ত চিনতে পারছি না। আমরা যে চায়ের দোকানে এসে প্রায় আড্ডা মারতাম সেই দোকানে ঢুকলাম।
একটা বছর কুড়ি বয়সের ছেলে বসে আছে। আর দু’চারজন বসে আছেন। আমি চায়ের কথা বলতে ছেলেটি একটু ভ্রু-কুঁচকে অবাক হয়ে আমার দিকে তাকাল। এটা পরিতোষদার চায়ের দোকান। আমরা সবাই পরিদা বলে ডাকতাম। পরিতোষদার কথা বলতেই ছেলেটি কেমন ভাবে যেন আমার দিকে তাকাল। বুঝল আমি একেবারে অপরিচিত নয়। তারপর আস্তে করে বললো, বাবা বাড়িতে আছেন। চা দিতে একটু দেরি হবে।
আমি ওর দিকে তাকিয়ে বললাম ঠিক আছে, তুমি করে দাও। আমি একটু বসছি। আমি জানি এই দুপুর রোদে এখানে কেউ চা খায় না। তাই চায়ের সরঞ্জাম সব ধোয়া হয়ে গেছে। আমার জন্য আবার নতুন করে বানাতে হবে। তাই দেরি হবে।
দুটো দানাদার চেয়ে নিলাম। আমাদের কলকাতার চিনির ডেলা থেকে যথেষ্ট ভালো। ভাল লাগল। বললাম রসোগোল্লা আছে ? ছেলেটি হ্যাঁ বললো। আমি বললাম দুটো দাও। না মিষ্টির স্বাদ সেরকমই আছে। জলের স্বাদও একই রকম। যাক এত পরিবর্তনের মধ্যেও এই দুটোর স্বাদ এখনো ঠিক আছে। চা খেলাম। কথা বলতে বলতে জানলাম। এখন আর হেঁটে যাবার দরকার নেই। চাইলে ট্রলি পাওয়া যায়। লোক যদি বেশি হয় তাহলে পয়সা কম লাগে। না হলে পয়সা একটু বেশি লাগে। চা খেতে খেতে আমাদের হাউসের কাগজটায় একটু চোখ বোলালাম। আমার একটা লেখা বেরিয়েছে। এ লেখাটা অনেক দিন আগের লেখা। অমিতাভদা সরিয়ে রেখেছিলেন। মনে মনে হাসলাম।
বাবু আপনি যাবিন নাকি ?
কাগজ থেকে চেখ তুলে তাকালাম। একটা কালো কুচকুচে চেলে আমার দিকে জুল জুল করে তাকিয়ে আছে। সারা শরীর রুক্ষ। পরনে মাইছাতি পরা সেন্ডো গেঞ্জি। একটা লুঙ্গি। কাঁধে একটা গামছা।
হ্যাঁ।
কোথায় যাবেন ?
কাজলদীঘি।
গ্রামের নাম বলতেই আশেপাশের অনেক লোক আমার দিকে তাকালেন।
কার ঘরে গো ?
দোকানে বসা একজন বয়স্ক লোক আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন।
মনামাস্টার।
এবার সকলে মুখ চাওয়া চাওয়ি করছেন।
আপনি কে হন ?
আমি ওনার ছাত্র।
তা বাবু আপনি কোথা থেকে আসছেন।
কলকাতা থেকে।
উনার এক আত্মীয় কলকাতায় থাকে। খপররে কাগজে কাজ করে। রেপোর্টার।
হাসলাম।
তুমি থাকো কোথায় ?
মনামাস্টারের পাশের গ্রাম।
ও।
চলো তাহলে।
ওর ট্রলিতে চেপে বসলাম।
ছেলেটি মোরাম রাস্তায় ট্রলি নিয়ে উঠলো। কেঁচর কেঁচর শব্দে হেলেদুলে ট্রলি চলেছে। দুপাশে সবুজ ধানের খেত। আর কিছুদিন পরেই ধান কাটার মরশুম চলে আসবে।
কতোক্ষণ যেতে লাগবে।
আধঘন্টা খানেক।
তুমি কি বীরকটায় থাকো না লাড়োতে।
লাড়ো। আপনি চেনেন নাকি ?
না।
তাইলে বলছেন কি করে।
এসেছিলাম আগে। তখন তোমাদের এই রাস্তাটা তৈরি হয় নি।
হ্যাঁ বাবু। এতো বৎসর খানিক হল। তায় আবার বর্ষার সময় মোরাম ধুয়ে যায়।
রাস্তাটা মোরাম হয়েছে বলে তোমাদেরও কিছু রোজগার হচ্ছে বলো।
হ্যাঁ বাবু।
সামনের দিকে তাকালাম। আদাশিমলার সেই বিশাল মাঠ। এই দুপুরে চারিদিক জনমানবশূন্য। মাঝে মাঝে কয়েকজন মাঠে বাছার কাজ করছে। মাঠের মাঝে মাঝে ছোট ছোট খরের চালার টংগুলো শেলো টিউবওয়েল পোঁতা রয়েছে। দু’একটা চলছে মনেহয়। মৃদু আওয়াজ দূর থেকে কানে ভেসে আসছে। এখানে আমার কতো স্মৃতি লুকিয়ে আছে। ঐ দূরে দেখা যায় উনামাস্টারের বাড়ি। সামনের দিকটা আগে খরের ছিল একন দেখছি এ্যাজবেস্টর লাগানো হয়েছে। ওই বাঁধের ওপাশ দিয়ে গেলেই সৌমি পূর্নিমাদের বাড়ি। দূরে দেখা যাচ্ছে শ্মশানটা। না যেমন দেখে গেছিলাম, ঠিক তেমনি আছে। মাঠে এখন চাষ চলছে। সবুজ গালিচার মতো। যেদিকে তাকাও খালি সবুজ সবুজ। স্কুল জীবনের কথা মনে পরে যচ্ছে। এখানে আমার শৈশব কৈশোর কেটেছে। আমার বন্ধু-বান্ধব সব এখানে। মনটা খারাপ হয়ে গেলো। একটু আনমনা হয়ে পরেছিলাম।
কে যায়, অনি না।
ট্রলিটা বেশ কিছুটা এগিয়ে গেছে। আমি ট্রলিওয়ালাকে থামাতে বললাম। ও ট্রলি থামালো। ছুটে কাছে এলাম। উনামাস্টার। জুতো খুলে নীচু হয়ে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলাম।
থাক থাক। আমার থুতনি ধরে চুমু খেলেন।
তুই তো অনেক বড় হয়ে গেছিস।
না স্যার। আপনার কাছে এখনো আমি অনিই আছি।
তোর লেখা গুলো পরি। আজও তোর লেখাটা পরেছি। তোর লেখার হাতটা বড়ো ভালো।
মাথা নীচু করলাম।
তোর লেখা গুলো এখনকার ছেলে গুলোকে পরাই বুঝলি। ওদের বলি। আনিও তোদের মতো আমার কাছে পরেছে। কিন্তু তোদের মতো এতো বখাটে ছিলো না। ও আমাদের গ্রামের গর্ব।
স্যারের মুখ থেকে এত প্রশংসা আমি আগে কখনো শুনি নি। বরং বেতের বাড়ি পিঠে পরেছে অসংখ্যবার। লজ্জায় আমার মাথা আর উঠছে না। খালি মাঝে মাঝে মুখ দিয়ে স্যার স্যার বেরিয়ে আসছে।
সত্যি গ্রামের মানুষ গুলো এতো সাধাসিধে হয় যে তাদের কোন তুলনা হয় না।
কলকাতা থেকে আসা হচ্ছে ।
হ্যাঁ।
কয়দিন থাকবি তো।
হ্যাঁ।
মনার আবার শরীরটা খারাপ হয়েছে। বয়স হচ্ছে তো।
উনামাস্টারের মুখের দিকে তাকালাম।
যা। পারলে একবার দুয়ারে আসিস।
ঠিক আছে।
মনটা খারাপ হয়ে গেলো। মনাকাকার শরীর খারাপ। কি হয়েছে! ধীরে ধীরে ট্রলিতে উঠে বসলাম। আর একটু খানি। তারপর নদী পেরিয়ে আমার স্বপ্নের বাড়ি।
বাবু আপনি চকে দাঁড়িয়ে মিথ্যে কথা বলছেন।
আমি ! কই নাতো।
ওই যে আপনার পরিচয় গোপন করেছেন। আমি কিন্তু আপনাকে চিন্তি পেরেছি।
তুমি আমাকে চেনো।
হ্যাঁ বাবু। আমি বিজয়।
কুইল্যা ঘরের বিজয়।
হ্যাঁ।
হাঁড়িপারায় থাকো।
হ্যাঁ বাবু। আমি তো আপনার ক্ষেতটা ভাগে চাষ করতিছি। মনামাস্টার দেছেন।
আমি অবাক হয়ে বিজয়ের দিকে তাকালাম।
নদী ঘাটের কাছে এসে বিজয় ট্রলি থামালো। আমি নামলাম। নড়বরে বাঁশের সাঁকোটা এখনো সেই জায়গাতেই আছে। কোন পরিবর্তন নেই।
বিজয়ের দিকে তাকিয়ে বললাম, কতোদেবো।
না বাবু আপনের কাছ থিকা পয়সা নিতি পারবনি।
কেনো। তুমি এতটা পথ এলে।
সে বৈকালে যখন আপনের ঘর যাব তখন দিবেন।
না না তুমি এখন নাও।
না।
বিজয় ট্রলি ঘুরিয়ে চলে গেলো।
আমি আমার বাসভূমে পা রাখলাম। এতদিন নিজভূমে পরবাসে ছিলাম। বাঁশের সাঁকো পেরিয়ে নদী বাঁধে উঠলাম। চারিদিক শূনসান। বাঁধের ওপর উঠলে আমার বাড়ির টং দেখা যায়। আমিও দেখতে পেলাম। মাত্র কয়েক মিনিটের পথ। বাঁশবাগানের মধ্যে দিয়ে বাড়ির পেছন পাশের পুকুর ধারে এলাম। পানাভর্তি পুকুর। বুঝলাম বহুদিন সংস্কার হয়নি। বাঁশঝাড়ের তলা শুকনো পাতায় ভর্তি। শুকনো পাতার ওপর দিয়ে হাঁটতে গেলেই একটা চড় চড় আওয়াজ হয়। তাই হলো। আমি আমার বাড়ির সামনে এলাম।
পাঁচবছর আগে যা দেখেছিলাম, পাঁচবছর পর তার বয়স প্লাস পাঁচ। এখানেও সংস্কারের অভাব চোখে পরল। বারান্দায় উঁকি মারলাম। কয়েকটা কাপর শুকোতে দেওয়া আছে। দেয়ালের মাটি খসে পরেছে। পাশাপাশি দুটো দোতলা মাটির বাড়ি। একটি আমার পৈত্রিক বাড়ি। আর একটি মনামাস্টারের। এই দুপুর বেলায় দূরে কোথায় কুব পাখি কুব কুব করে ডাকছে।
আমার জন্ম ভিটেয় কিছুক্ষণ দাঁড়ালাম। বাইরের গেটে তালা বন্ধ। বুকের ভেতরটা কেমন যেন দম বন্ধ হয়ে আসছে। একটা অব্যক্ত যন্ত্রণা। চোখের কোল দুটো কেমন জ্বালা জ্বালা করছে। ভেতর থেকে কেউ যেন বললো অনি এসেছিস। আয় ভেতরে আয়। বাবা কতদিন পরে এলি। মা-বাবাকে একটুও মনে পরে না। চারিদিকে চোখ মেলে তাকালাম। না কেউ নেই।
পায়ে পায়ে আমার বাড়ি পেছনে রেখে মনাকাকার বাড়ি এলাম। কতটা দূরত্ব ? হাত পঁচিশেক হবে। ভেতরে এলাম। বাইরের দাওয়ায় বেঞ্চটা যেমন ছিলো ঠিক তেমনি আছে। একটা বছর আঠারোর মেয়ে ভেতর বাইরে বসে, মাটিতে ঘসে ঘসে চুনো মাছ বাছছে। পরনে স্কার্ট ব্লাউজ। ব্লাউজটা ঘটি হাতা। টিপিক্যাল গ্রাম্য পোষাক। অনেকদিন পর এই পোষাক চোখে পরলো। হাঁটু পর্যন্ত স্কার্টটা তোলা। স্কার্টের ফাঁক দিয়ে ইজের দেখা যাচ্ছে। বেশ দেখতে মেয়েটাকে। টানা টানা চোখ। শ্যামলা গায়ের রং। গোলগাল চেহারা। মেয়েটা প্রথমে আমাকে দেখেত পায় নি। কাঁধ থেকে হাতের ল্যাপটপটা বেঞ্চের ওপর রাখতেই, সামান্য আওয়াজে, পলকে আমার দিকে ফিরে তাকালো। তারপর হতচকিত হয়ে একটা গঁ গঁ শব্দ করে দৌরে ভেতরে অদৃশ্য হয়ে গেলো।
আমি হতবাকের মতো দাঁড়িয়ে আছি। ভেতরে চাঁচামেচির শব্দ। ধুপ ধাপ আওয়াজ। মনাকাকার গলা পেলাম। কিছুক্ষণ পর কাকীমা বেরিয়ে এলেন। কাকীমার পাশে আর একজন ভদ্রমহিলা। তার পেছনে সেই মেয়েটি। উঁকি মেরে আমাকে দেখছে। পরিষ্কার দেখতে পেলাম এখনো তার বুকটা কামরশালার হাপরের মতো ওঠা নামা করছে। কাকীমা বেশ কিছুক্ষণ আমার দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে। আমি নীচু হয়ে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলাম। ঝড় ঝড় কর কেঁদে আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। এতদিন পর কাকা-কাকীমাকে মনে পরলো।
ভেতর থেকে কাকা তখনও চেঁচিয়ে চলেছেন, কে এসেছে গো কে, তোমরা সবাই কথা বলছো না কেনো।
কাকীমা কাপরের খুঁট দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে ধরা গলায় বললেন, অনি এসেছে।
অনি এসেছে! কোথায়! কোথায়! ওকে ভেতরে নিয়ে এসো আগে।
মেয়েটার দিকে তাকালাম বিদ্যুতের মতন সামান্য হাসির ঝিলিক মুখের ওপর দেখা দিয়েই আবার মিলিয়ে গেলো।
যাচ্ছি কাকা। তোমাকে ব্যস্ত হতে হবে না। আমি ভেতরে যাচ্ছি।
ও সুরমা, সুরমা। ওঃ এরা ডাক দিলে সারা দেয়না কেনো। কোথায় যায় যে এরা।
কাকীমা ধরা গলায় বললেন এই তো এখানে।
বুঝলাম সুরমা এই ভদ্রমহিলার নাম। গ্রামের রীতি একজনকে প্রনাম করলে সকলকে প্রণাম করতে হয়। আমিও সেই ভদ্রমহিলাকে প্রণাম করলাম। উনি পাটা সামান্য সরিয়ে নিয়ে বললেন থাক থাক বাবা। ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করুন। যাও ভেতরে যাও। তোমার জন্যই ওই লোকটা এখনো বেঁচে আছে।
কাকীমাকে জরিয়ে ধরে ভেতরে এলাম। এ পৃথিবীতে আমার আপনার বলতে কেউ নেই। কিন্তু আমি একা নই। বুকটা আবার কেমন ভারী হয়ে এলো। ভেতরে এলাম। কাকা বিছানায় বসে আছেন। আমি পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতেই কাকা খাট থেকে নেমে এসে আমায় বুকে জরিয়ে ধরলেন। কাঁপা কাঁপা হাতে আমার চোখে মুখে হাত বোলাচ্ছেন। যেন কিছু খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা । তারপর ঝর ঝর করে কেঁদে ফেললেন।
তুই কি আমাদের একবারে ভুলে গেলি।
আমার গলাটাও ধরে এসেছে। খুব কান্না পাচ্ছে কিন্তু নিজেকে শক্ত করে নিলাম।
কোথায় ভুলে গেলাম। তোমার চিঠি পর্শুদিন পেয়েছি। আজই চলে এলাম।
বেশ কিছুক্ষণ এই ভাবে থাকার পর কাকা কাপড়ের খুঁট দিয়ে চোখ মুছে বললেন, যাও যাও ওর খাবার ব্যবস্থা করো। ও এখন একটু বিশ্রাম নিক। ও নিপা। উঃ মেয়েটা যায় কোথা বলোতো।
এই তো আমি এখানে।
যা যা অনিদার ঘরটা একটু গুছিয়ে দে।
গোছানো আছে। তোমাকে হুড়াহুড়ি করতে হবে না।
এবার কাকীমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, এঁদের তো চিনতে পারলাম না।
চিনবি কি করে। সেই কবে ছোট সময়ে দেখেছিলি। আমার বোন সুরমা। আর ওটা ওর মেয়ে নিপা। এবার বারো ক্লাস দিয়েছে। তুই যখন সুরকে দেখেছিস তখন ওর বিয়েই হয় নি।
আমি নিপার দিকে তাকালাম। নিপা মাথা নীচু করে মুচকি মুচকি হাসছে। আমাকে ঠক করে একটা পেন্নাম করলো।
বাইরে বেরিয়ে এলাম। বাঁশবাগানটা যেমন দেখেছিলাম তেমন আছে। চারিদিকে জঙ্গল একটু বেশি হয়ে গেছে। সামনের একটু জায়গায় পালং শাক, সুশনি শাকের বীজ ফেলা হয়েছে। সামনের ছোট্ট খেতটায় কয়েকটা কফির চাড়াও পোঁতা হয়েছে। ধান সেদ্ধ করার দোপাখা উনুনটার কাছে একরাশ পাঁউশ (ছাই) ডাঁই করে রাখা রয়েছে। গোয়ালঘরটা ফাঁকা। মনে হয়ে গরুগুলোকে মাঠে বেঁধে আসা হয়েছে। মনাকাকার ঘরের পুকুরটা ঠিক আছে। জল টলটল করছে। দু’একটা মাছ মাঝে মাঝে ভুঁট মারছে।
স্নান করবে না।
তাকালাম। সেই মেয়েটি। চোখ দিয়ে কথা বলছে। আমার দিকে তাকিয়ে। হাসি হাসি মুখ। কাকীমা তখন ওর কি যেন নাম বললো। নীপা।
জামা কাপরটা ছেরে নিই চলো।
ভেতরে এলাম।
কাকীমা দাঁড়িয়ে আছে।
দেখা হলো।
হাসলাম।
এই ছোট্ট শাক বাড়ি কি তুমি করেছো।
না। সুরো করেছে। ও আর নীপা জল ঢালে।
খেতের কফি বাড়ি।
ওটা বিজয় দেখাশুনা করে।
পান্তা আছে।
কাকীমা আমার দিকে অবাক হয়ে তাকালো।
আছে কিনা বলো।
আছে।
নীপা তো চুনো মাছ বাছছে।
ওটাও তোর চোখে পরেছে।
হ্যাঁ। ওই তো বাইরের বারান্দায় বসে। ওখান থেকে কিছুটা নিয়ে ভজে দাও। লঙ্কা পেঁয়াজ তো আছেই।
কাকীমা হাসলেন, তোর কি এখোনো এই সব খাওয়ার অভ্যাস আছে।
জন্ম আমার এই ভিটেতে। বড় হয়েছি এখানে। মাটিটাকে ভুলি কি করে বলো।
কাকা আমার জন্য ব্যস্ত হয়ে পরলেন। ও নীপা আজ হাটবার না। তুই এক কাজ কর অনিলকে একবার ডাক। ওকে হাটে পাঠাই।
থাক না, আমি যাব খেয়ে দেয়ে। কাকা চুপ করলেন।

জীবনে জীবন যোগ না করলে ব্যার্থ হয় গানের পসরা

Re: কাজলদীঘি, শ্মশান ও পীরসাহেবের থান

ভরা পুকুরে অনেকক্ষণ স্নান করলাম। শরীরটা জুড়িয়ে গেলো। এর আগের বার যখন এসেছিলাম। ঘন্টা খানেক ছিলাম। তারপর চলে গেছিলাম। তার আগে বারো ক্লাস পরীক্ষা দিয়ে। দেখতে দেখতে দশটা বছর কোতা দিয়ে ফুরুত করে চলে গেলো। শেষবার এসেছিলাম এমএ পরীক্ষার ফিজ নিতে। সেই শেষ আসা। মনে হয়ে শেষ চিঠি লিখেছিলাম। কাগজে চাকরিটা পাওয়ার পর। তারপর কাকা চিঠি দিলেও আমি তার কোন উত্তর দিই নি।
খেতে খেতে একে একে সবার খবর নিলাম। কাকীমা কখনো কাঁদেন কখনো গম্ভীর হয়ে যান। সুরমাসি  নীপা বসে বসে সব শুনছে।
কাকার চোখে ছানি পরেছে। তাই চোখে কম দেখেন। বলতে গেলে দেখতেই পান না। এখানে এক ডাক্তার আছে। সে নাকি বলেছে অনেক টাকা লাগবে। তাই কাকা ছানি কাটাতে চান নি। নীপারা আপাতত এখন এখানেই থাকবে। নীপা এখান থেকেই কলেজে পরবে। আমার বন্ধু অনাদি নাকি গ্রাম পঞ্চায়েত হয়েছে। আমাদের বাড়িতে লাইট এসেছে। কিন্তু ভোল্টেজ কম। কেরোসিনের খরচ কিছুটা বেঁচেছে। আরো সব খবরা খবর নিলাম। সবচেয়ে আনন্দ পেলাম এখানে নাকি মোবাইল টাওয়ার বসেছে অনেকের কাছে মোবাইলও আছে।
এই অজ গ্রামে মোবাইল টাওয়ার। ব্যাপারটা আমাকে খুব আনন্দ দিয়েছে। এই কিছুক্ষণের মধ্যে নীপার সঙ্গে খুব ভাব জমিয়ে ফেললাম। নিজের তাগিদে। এখানে দিন কয়েক যদি থাকতেই হয়, তাহলে আমাকে বোবা হয়ে থাকতে হবে। এই বুড়ো-বুড়িদের সঙ্গে কত কথা বলবো। বন্ধু-বান্ধব তাদের খুঁজে বার করতেই সময় চলে যাবে। তারপর তারা কে কিরকম অবস্থায় আছে কি জানি। কারুর সঙ্গেই তো পাঁচ বছর কোনো যোগাযোগ নেই। আমি খোঁজ খবর রাখলে তবে তারা খোঁজ খবর রাখবে। আমি রেখেছি কি ?
খাওয়া শেষ হতে আমি আমার বাড়িতে এলাম। নিচটা না ব্যবহারে নোংরা হয়ে আছে। চারিদিক অগোছালো। নিচের ঘর গুলো তালা দেওয়া। আমি সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় নিজের ঘরে এলাম। পরিপাটি করে ঘরটা সাজানো। যেমনটি দেখে গেছিলাম। ঠিক তেমনি। আমার বাবা নাকি এই ঘরটা করেছিলেন তার ছেলের জন্য। নিজেরা বুড়ো-বুড়ি হয়ে নিচে থাকবেন। আর আমি বউ নিয়ে দোতোলার এই ঘরে থাকব। নিজের মনেই নিজে হাসলাম। মনাকাকা সব কিছুই যত্নের সঙ্গে রেখেছেন। আমার কন্ট্রিবিউসন বলতে মাসে মাসে হাজার টাকা। অমিতাভদা প্রত্যেক মাসে আমার মাইনে থেকে হাজার টাকা করে কেটে নিয়ে মানিঅর্ডার করে এখানে পাঠিয়ে দিতেন। বাকিটা বড়মার হাতে। আমি আমার প্রয়োজন মতো বড়মার কাছে নিয়ে নিতাম। এখনো এই অবস্থা বর্তমান।
মোবাইলটা অন করতেই অনেক গুলো মিশ কলের ম্যাসেজ এলো। প্রত্যেকটা নম্বর দেখলাম। এর মধ্যে মিত্রার ফোন আছে। বড়মার আছে। আর ফোন নম্বর গুলো বুঝতে পারলাম না। বড়মাকে ফোন করে শেষ পরিস্থিতি জানালাম। বড়মার গলায় অভিমানের সুর। বাড়ি গিয়ে আমাদের ভুলে গেছিস। বড়মাকে সব বোঝালাম। আমাদের এখানের ব্যাপারটা। উনি জানেন আমি গ্রামে থাকি। কিন্তু সেই গ্রামটা যে এত অজ গ্রাম তা তিনি এখন সবিশেষ জানলেন। শেষ কথা, সাবধানে থাকিস।
একটা সিগারেট খাওয়ার ইচ্ছে হলো। আসার সময় এক প্যাকেট দামি সিগারেট কিনে এনেছি। তাও জীবনের প্রথম। সিগারেটের প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বার করে ধরালাম। বেশ ভাল লাগছে খেতে। দুটো টান দিয়ে পুকুর ধারের জানলাটা খুললাম। বাঁশ ঝাড়ের ফাঁক দিয়ে পুকুরটা পুরো পুরি দেখা যাচ্ছে। নীপাকে দেখলাম। পুকুর ঘাটে। হাতে মুখে সাবান দিচ্ছে। মেয়েটাকে দেখতে খুব একটা ভাল নয়। একবার দেখলে চোখে পরে যাবে এমন নয়। কিন্তু অনেকক্ষণ তাকিয়ে দেখলে ওকে বেশ ভাল লাগে। ওর মুখে একটা গ্রাম্য সরলতা। গোলগাল শরীরের মধ্যে বার বার বুকটার দিকে তাকাতে ইচ্ছে করে। আমি জানলার ধার থেকে সরে এলাম। খাটে উপুর হয়ে শুয়ে পূবদিকের জানলায় মুখ রাখলাম। দূরে পালের বাড়ির টংটা দেখা যাচ্ছে। তারপাশের মেঠোরাস্তাটা ধানগাছের আড়ালে ঢাকা পরে গেছে। আমি  যেন কোথায় হারিয়ে গালাম।


সকালে ঘুম থেকে উঠতে বেশ দেরি হয়ে গেল। আজ অফিসে একটা জরুরি কাজ আছে। অমিতাভদা বলেছিলেন একটু তাড়াতাড়ি আসিস, তোকে একটা জায়গায় পাঠাব। দূর চেষ্টা করেও উঠতে পারলাম না। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আমার মুখ শুকিয়ে গেল। আজ নির্ঘাত অমিতাভদার কাছে ঝাড় আছে। মোবাইলটা বার করে বড়মাকে একবার ফোন করলাম। বড়মা ফোন ধরে বলল।
কিরে এত বেলায় ! ঘুমচ্ছিলি নাকি ?
হ্যাঁ রাতে শুতে একটু দেরি হয়ে গেল।
হায় হায়।
কি হয়েছে ?
তোর দাদাতো সেই সাত সকালে চলে গেছে।
কপালে আজ দুঃখ আছে।
তোর নাকি কোথায় যাওয়ার কথা।
হ্যাঁ।
তোকে ফোন করে নি।
করেছিল হয়তো। আমি তো ফোন বন্ধ করে রাখি।
ভাল করেছিস। তুই যা, আমি ফোন করে দিচ্ছি।
এই জন্যই তো তোমাকে ফোন করা।
সেকি আমি জানিনা।
যা তাড়াতাড়ি মুখ ধুয়ে কিছু খেয়ে নিস। আমি দুপুরের খাবার পাঠিয়ে দেবো।
ঠিক আছে।
যত তাড়াতারি সম্ভব ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে এলাম। ঘড়ির দিকে তাকালাম ১১ টা বেজে গেছে। আমার সাড়েনটার মধ্যে অফিসে পৌঁছনর কথা। কি আর করা যাবে। অফিসে ঢুকতেই রিসেপসনিস্ট ভদ্রমহিলা আমার দিকে তাকিয়ে একবার মুচকি হাসলেন, আমিও হাসলাম। লিফটের সামনে দাঁড়াতেই আমাদের ফটোগ্রাফার অশোকদা বললেন, এই অনি তোকে অমিতাভদা খুঁজছিলেন। আমি হুঁ বলে লিফটের মধ্যে সেঁদিয়ে গেলাম। হু হু করে লিফ্ট ওপরে উঠে এলো।
নিউজরুমে ঢুকতেই মল্লিকদা বললেন, কি হে বৎস আজ মনে হয় একটু বেশি ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। যান আপনার জন্য সমন অপেক্ষা করে আছে। আগে গিয়ে একটু মুখটা দেখিয়ে আসুন। তারপর না হয় মুখে চোখে জল দেবেন।
মল্লিকদা আজ একটু বাঁচিয়ে দাও।
হ তা ঠিক। ফাঁনদে পরলে মল্লিকদা। আর কচিগুলানরে নিয়ে যখন ঘোরা ঘুরি কর। তখন মল্লিকদার কথা মনে পরে না।
আচ্ছা আচ্ছা এরপর তোমায় ভাগ দেবো। তবে ছোটমার পারমিশন নিয়ে।
এই তো আবার ঘুটি বসালি ।
ঠিক আছে ছোটমাকে বলবনা তুমি একটা ফোন করে দাও। আমি এসে গেছি।
মল্লিকদা ফোন থেকে মুখ তুলে বললেন যে কাজে তোমার যাওয়ার কথা ছিল তা হয়ে গেছে। তুমি এখন যেতে পার। আর একটি গুরু দায়িত্ব তোমার প্রতি অর্পন করা হবে। তুমি এখন এডিটর রুমে যেতে পার।
আবার কি গো।
গেলেই জানতে পারবে।
ঠিক আছে।
অমিতাভদা থাকেন ট্রাঙ্গুলার পার্কে আর আমি থাকি গড়িয়াহাটার কাছে অফিসের ফ্ল্যাটে। মল্লিকদা থাকেন যাদবপুরে। আমার প্রত্যেক দিন ডিউটি অফিস থেকে ফেরার পর কিংবা আগে একবার বড়মার সঙ্গে দেখা করে আসতে হবে। নাহলে বিপদ আছে। আমি বিগত ১০ বছর ধরে এই অভ্যাস পালন করে আসছি।
মল্লিকদা মল্লিকদার স্ত্রী প্রায় সময়েই অমিতাভদার বাড়িতেই থাকেন। অমিতাভদার স্ত্রী য়েমন আমার বড়মা ঠিক তেমনি মল্লিকদার স্ত্রী আমার ছোটমা।
ইউনিভার্সিটিতে পড়া চলাকীলীন, এই অফিসের সঙ্গে আমার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তারপর একদিন অমিতাভদার আনুকূল্যে তার বাড়িতে স্থান পাই। তারপর আবার একা। তবে বড়মার কড়া হুকুম। এখনো তাই মনে চলি।
হরিদা অমিতভদার খাস বেয়ারা। গেটের সামনে বসে ঝিমুচ্ছিলেন আমি একটা ঠেলামারতেই চোখ খুলে বললেন কি হল আবার ?
সাহেব ভেতরে।
হ্যাঁ। তুমি কোথায় ছিলে এতোক্ষন ?
কেন!
তোমার আজ পিট্টি হবে।
এই হাউসে আমি হচ্ছি বখাটে সাংবাদিক। কেউ কেউ আবার বলেন এডিটরের কোলের ছেলে। আমার থেকেও অনেক সিনিয়ার সাংবাদিক থাকা সত্বেও অমিতাভদা আমাকে একটু বেসি ট্রাস্ট করেন। সেই কারণে স্বভাবতই আমার খুঁটির জোর একটু বেশি তাই আমাকে কেউ ডিস্টার্ব করে না। সবাই জানে অমিতাভদা মল্লিকদার আমি পেয়ারের লোক। তাদের বাড়িতেই থাকা খাওয়া। তবে আমি আমার দায়িত্ব থেকে ভীষণ ভাবে সচেতন। সেখানে কেউ দাঁত ফোটাতে পারে না। আমার কাছে অফিস মানে আর একটা ঘর।
আমি মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে আছি।
তোর খুব মজা তাই না ?
হাসি।
যা ভেতরে যা।
দরজা খুলে ভেতরে এলাম। একরাস ঠান্ডা হাওয়া আমায় গ্রাস করে বসলো। দেখলাম একটা চেয়ার দখল করে বসে আছেন আমাদের এ্যাডচিফ চম্পকদা। আর একটিতে চিফরিপোর্টার সুনিতদা। আমাকে ভেতরে আসতে দেখেই বলে উঠলেন, এইতো ছোটসাহেব চলে এসেছেন। কি বাবা ঘুমিয়ে পরেছিলে। এমন ভাবে কথা বললেন আমার মাথা নত হয়ে গেল।
কথাগুল কানে খুব লাগলো। আমার জন্য অমিতাভদাকে এরা এই ভাবে টিজ করে কথা বলে। তবে দাদা কোনোদিন গায়ে মাখেন না। এই হাউসের উনি সবচেয়ে সিনিয়ার ব্যক্তি। সেই কারণে সকলে সম্মান সমীহ দুই করে। যার যা সমস্যা উনি ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে কথা বলে মিটিয়ে দেন। সুনিতদা আবার একটু বেশি ফট ফট করে। শোনা কতা উনি নাকি খাস ম্যানেজমেন্টের লোক। পলিটিকস এই হাউসে আছে। চূড়ান্ত। তবে কেউ বুঝতে পারে না। এক এক মালিকের এক একটা লবি। আমি সব জানি কিন্তু বোবা। মনে মনে জানি আমার ভগবান দাদা। দাদার চাকরি নট আমারও নট। তবে কলমের জোরে একটা চাকরি কলকাতা শহরে জোগাড় করে নিতে পারবো।
অমিতাভদা এবার ওর একটা বিয়ে দেবার ব্যবস্থা করুন। অনেক নামডাক হয়েছে। টাকা পয়সাও তো খুব একটা কম পায় না হাউস থেকে। দেখবেন বিয়ের পিঁড়িতে চরলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।
অমিতাভদা মুচকি হসে বললেন, হ্যাঁ ওর মাকে কয়েকদিন আগে বলছিলাম সেই কথা। তা বাবু বলে এসেছেন বিয়ের নাম ধরলেই ওই বাড়িতে আর পদার্পন করবেন না। উনি সন্ন্যাস নেবেন।
সকলে হো হো করে হেসে উঠল।
আয় বোস।
আমি একটা চেয়ারে বসলাম।
তোর মা ফোন করেছিল ঘুম থেকে উঠেই চলে এসেছিস, কিছু খাওয়া দাওয়া করেছিস।
না।
সঙ্গে সঙ্গে বেলের দিকে হাত চলে গেলো।
এখন একটু চা আর টোস্ট খেয়ে নে। তারপর কয়েকটা কপি লিখে দিয়ে বাড়ি চলে যা। তোর মাকে বলা আছে। আজ তোকে ভাইজ্যাক যেতে হবে ইলেকসন কভারেজ। দিন পনেরো থাকতে হবে। সেরকম ভাবে গোছগাছ করে নিস। ওখানে তোর সমস্ত ব্যবস্থা করা থাকবে। সাড়ে সাতটায় ট্রেন।
মাথায় রাখিস। ঘুমিয়ে পরিসনা। চম্পকদা বললেন।
সকলে হেসে উঠল।
ঘুমটা একটু কমা। অতো রাত জেগে পড়াশুনো করতে তোকে কে বলে। যতদিন আমার বাড়িতে ছিলি ঠিক ছিলি। যে দিন থেকে ওই ফ্ল্যাটে গেছিস বিশৃঙ্খল হয়ে গেছিস।
চা টোস্ট খেয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। দাদার ঘড়ের দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম বারোটা বেজে গেছে। মোবাইলটা বেজে উঠল।
তনুর ফোন। কানে ধোরতেই খিল খিল করে হেসে উঠল কি সাহেব, টিকিট হাতে ধরিয়ে দিয়েছে।
কিসের টিকিট।
ভাইজ্যাকের।
না। ধরাবে।
তুমি কি এখন অফিসে না বাড়ির দিকে রওনা দিচ্ছ।
এই মাত্র অমিতাভদার ঘর থেকে বেরোলাম।
আমি এখন কালীঘাটে আছি। ফ্ল্যাটে গিয়ে একটা মিস কল মেরো তুমিতো আর ফোন করবেনা।
আমার যাবার ব্যাপার তুমি জানলে কি করে।
আরে বাবা তুমি হচ্ছ সুপার বসের পোষ্যপুত্র তোমার প্রতি কতজনের বাঁকা নজর আছে তা জান। হাঁদারাম।
ঠিক আছে।
তনু আমার জীবনের একটা মাইলস্টোন। এই অফিসে আমার প্রথম ঘনিষ্ট বন্ধু। অফিসায়াল এটিকেট ওর কাছ থেকে অনেক শিখেছি। অফিসে কারুর সঙ্গে আমার সবিশেষ সেরকম একটা সম্পর্ক নেই। যে দুচারজনের সঙ্গে আছে, তার মধ্যে তনু একজন।
বড়মাকে ফোন করলাম।
হ্যাঁ বল। সব শুনেছি। তোকে একেবারে খাটিয়ে খাটিয়ে মারলে। দাঁড়া আজ আসুক। দেখাচ্ছি মজা। তোদের অফিসে তুই ছাড়া কি আর কেউ নেই।
তুমি বলো।
তুই কখন আসছিস।
আমি পাঁচটার সময় যাবো অফিসে কিছু কাজ আছে। একটু ফ্ল্যাটে যাব তারপর তোমার কাছে যেতে যেতে ৫টা হবে।
কি খাবি।
তোমাকে চিন্তা করতে হবে না। আমি গিয়ে তোমার কাছে ভাত খাব।
ঠিক আছে।
নিউজ রুমে আসতেই মল্লিকদা বলল, হল সব কথা ?
হ্যাঁ।
মুখটা ওরকম বাংলার পাঁচ কেন।
ভাল লাগে বলো। এই দু’দিন আগে ফিরলাম। আজই বলে তোকে যেতে হবে।
হক কথার এক কথা। আমি একটা কথা বলি।
আমি মল্লিকদার মুখের দিকে তাকালাম। নিশ্চই কোন বদ বুদ্ধি আছে।
দুই একটা আর্টিকেল খারাপ কইরা লেইখা দে। বেশ কেল্লা ফতে।
তোমার সব তোলা থাকছে ঠিক জায়গায় নালিশ হবে মনে রেখো।
এই দেখো গরম খাইলি।
কি আছে দাও তাড়াতারি লিখে দিয়ে কেটে পরি।
ঐ মায়াটার লগে.....।
আবার....।
ঠিক আছে। ঠিক আছে। তুমি এখন আইতে পার।
আমিতাভদা বলল কি কাজ আছে।
ছিল ডিস্ট্রিবিউট হয়ে গেছে।
বাঃ বেশ বেশ।
কবে আসা হচ্ছে।
দিন পনেরোর জন্য যেতে হবে।
ও।
আসি।
যাও বিকেলে দেখা হবে।
ঠিক আছে।
নিউজরুম থেকে বেরোতেই হরিদার সঙ্গে দেখা।
কোথায় যাচ্ছ ?
কেন!
বাবু একবার ডাকছেন।
আবার কি হল ?
আমি কেমন করে জানবো।
এডিটর রুমে ঢুকতেই দেখলাম অমিতাভদা একা একা বসে আমাদের হাউসের আজকের কাগজটা পড়ছেন। আমাকে দেখেই মুখটা তুললেন। একটু আগে যারা ছিল তারা সবাই বেরিয়ে গেছে। আমাকে বললেন তুই বোস তোর সঙ্গে একটু দরকার আছে।
আমি একটু অবাক হলাম। আমার সঙ্গে আবার কিসের গোপন বৈঠক! সরাসরি মুখের দিকে তাকালাম। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন একটু চা খাবি ?
মুডটা খুব একটা ভাল বুঝলাম না। দাদাকে এরকম দেখলে মনটা খারাপ হয়ে যায়। মাঝে মাঝে মনে হয় ক্ষমতা যদি কোনোদিন পাই যাদের জন্য দাদার আজ এই চাপ তাদের একবার বুঝিয়ে দেবো। তারপর ভাবলাম আমার ধারনা হয়তো ভুলও হতে পারে।
মাথা দুলিয়ে সম্মতি দিলাম।
হরিদা দু’কাপ চা দিয়ে গেলো।  তোর কোন তাড়াহুরো নেই তো।
তার মানে দাদা অনেকক্ষণ ধরে কথা বলতে চান। তাহলেকি তানিয়ার ব্যাপার নিয়ে। মনে মনে ভাবলাম আজ কপালে আমার দুঃখ আছে। দাদা নিশ্চই তানিয়ার ব্যাপারটা নিয়ে ভুল ভেবেছে, অথবা দাদাকে কেউ রং ইনফর্মেসন দিয়েছে। কে জানাল ব্যাপারটা ? তানিয়া নিশ্চই নয়। তাহলে! আবার ভাবলাম, গতকাল যে লেখাটা জমা দিলাম সেই লেখার ব্যাপারে কিছু।
চায়ের কাপে দীর্ঘ চুমুক দিয়ে আমাকে বললেন, তুই সংঘমিত্রা ব্যানার্জ্জীকে চিনিস ?
কেউ যেন আমার গালে সজোরে একটা থাপ্পর কষালো। এই নামটা দাদা জানল কি করে। মিত্রার কথা ছোটমা ছাড়া কারুর জানার কথা নয়। এইসব ব্যাপারে ছোটমা আমার বন্ধু। দাদা বড়মা মল্লিকদার সাথে কোনোদিন এই ব্যাপার নিয়ে আলোচনা হয় নি। ছোটমাকি তাহলে দাদাকে কোন কথা বলেছে।
আমি অমিতাভদার চোখে চোখ রেখে কিছু বোঝার চেষ্টা করলাম।
চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললাম চিনি। কেনো ?
সেদিন ফোন করে তোর কথা জিজ্ঞাসা করছিল। তখন তুই শিলিগুড়িতে ছিলি। আমাকে তোর ফোন নম্বর জিজ্ঞাসা করলো। আমি বলতে পারলাম না। সত্যি তোর ফোন নম্বর আমার কাছে ছিল না। তোর বড়মার কাছ থেকে নিয়ে দিতে পারতাম। দিই নি।
আর কি বললো ?
না আর কিছু নয়। অমিতাভদা কথাটা বলে আমার চোখে চোখ রেখে একটু থেমে গেলেন।
তোর বড়মা জানে ?
না।
ওর সঙ্গে যে তোর পরিচয় আছে আগে তো কখনো বলিস নি।
ও কে! ওর কথা তোমাদের বলতে হবে ?
আরি বাবা বলিস কিরে, ওর জন্যই তো আমরা দুটো খেয়ে পরে বেঁচে আছি ?
তার মানে!
আরে পাগল ও আমাদের এই কাগজ কোম্পানীর অনেকটা শেয়ার হোল্ড করে আছে। আমার মালিক। তোরও মালিক।
মাথাটা বারুদের মতো গরম হয়ে গেলো। চোখ মুখ লাল হয়ে গেছে। আমি সরাসরি অমিতাভদার চোখে চোখ রাখলাম।
আর কি বলেছে ?

জীবনে জীবন যোগ না করলে ব্যার্থ হয় গানের পসরা

Re: কাজলদীঘি, শ্মশান ও পীরসাহেবের থান

না আর কিছু নয়। বললো তুই এখানে কার সোর্সে এসেছিস। তোকে কে রিক্রুট করেছে। কতদিন আছিস। এই সব।
তুমি কি বললে ?
আমি বললাম তুই শুভঙ্করের থ্রু দিয়ে এসেছিস। শুভঙ্কর আমার বন্ধু। তা দেখলাম ও শুভঙ্করকেও চেনে ।
আর কি বললো ?
বাবাঃ তুই আমাকে এ ভাবে জেরা করছিস কেনো ? আমি তো তোকে খালি জিজ্ঞাসা করলাম মাত্র।
ব্যাপারটা যখন আমাকে নিয়ে তখন আমাকে ভাল করে জানতে হবে, তাই।
অমিতাভদা আমার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। জানে আমি ভীষণ হুইমজিক্যাল আমাকে এই পৃথিবীতে একমাত্র কন্ট্রোল করতে পারে বড়মা। বড়মা ছারা আমি কাউকে এই পৃথিবীতে পাত্তা দিই না। এরকম একবার হয়েছিল। একটা লেখা নিয়ে আমার সঙ্গে অমিতাভদার মনো মালিন্য হয়েছিল। আমি অমিতাভদার বাড়ি ছেড়ে চলে এসেছিলাম। এমনকি রিজাইন দেবারও মনস্থির করেছিলাম। সে  যাত্রায় বড়মা শিখন্ডী হয়ে সব সামাল দিয়েছিলেন। অমিতাভদা ঐ ব্যাপারটা জানেন।
আমি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম। সংঘমিত্রা আমার ক্লাশমেট। কলেজের বন্ধু। আমরা একসঙ্গে পড়াশুনো করেছি। শুভঙ্করবাবুর কাছেও এক সঙ্গে পরেছি। এরবেশি কিছু জানতে চাইবে না।
ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। পেছন ফিরে তাকাই নি। সোজা লিফ্টের কাছে চলে এলাম। দেখলাম লিফ্ট এখন গ্রাউন্ড ফ্লোরে রয়েছে সিঁড়ি দিয়ে তরতর করে নীচে নেমে এলাম।
মনটা ভীষণ খারাপ লাগল। মিত্রা শেষ পর্যন্ত এখানে ফোন করল কেন। ও এই হাউসের মালিক এইটা বোঝাতেই কি অমিতাভদাকে ফোন করে আমার কথা জিজ্ঞাসা করলো। না অন্য কোন অনুসন্ধিতসা।
পায়ে পায়ে বাসস্ট্যান্ডে এলাম ভীষণ খিদে পেয়েছে। পেটে ছুঁচো ডন-বৈঠকি মারছে। ফ্যাটমামির চাউমিন কারখানাতে ঢুকলাম। অফিসের পাশে বলে প্রায়ই এখানে আসা হয়। আমাদের অফিসের অনেকে এখানে আসে না।
আমরা কলেজ লাইফে বন্ধুরা সবাই মিলে এখানে আসতাম। ফ্যাটমামি চাউমিনটা দারুন বানায়। ঘন ঘন ঘন আসা হয় বলে সবাই চেনে জানে। ঘড়ির দিকে তাকালাম। ১টা বাজে। তনু বলেছিলো একবার ফোন করতে। বয়টা কাছে এসে দাঁড়াল। বললাম একপ্লেট চাউমিন আনতে। ফোনটা বেজে উঠল। পকেট থেকে বার করে দেখলাম বড়মার নম্বর। তারমানে আমার বেগতিক অবস্থার খবর এরি মধ্যে পৌঁছে গেছে। একবার ভাবলাম ধরবনা। তারপর ভাবলাম না থাক।
হ্যাঁ বলো কি হয়েছে। তোমায় তো বললাম ৫ টার সময় যাবো।
তুই এখন কোথায় ?
চাউমিন খাচ্ছি।
ঠিক আছে। পারলে একটু তাড়াতারি আসিস কথা আছে।
কি কথা ?
কেন তুই জানিস না।
আচ্ছা।
ফ্ল্যাটে এসে জামাকাপড় খুললাম। পাখাটা হাল্কা করে খুলে নেংটো হয়ে পাখার তলায় দাঁড়ালাম। আঃ কি আরাম। মনটা একটু খারাপ হয়ে গেলো। শেষ মুহূর্তে অমিতাভদার সঙ্গে ঐরকম ব্যবহার করার উচিত হয়নি। যত রাগ গিয়ে পরছে মিত্রার ওপর। কেউ আমার দুর্বল জায়গায় আঘাত করলে আমি যে স্থির থাকতে পারি না। কি আর করা যাবে। মিত্রার সঙ্গে দেখো হলে ওকে জিজ্ঞাসা করতে হবে কেনো ও  অমিতাভদাকে এই ভাবে ক্রস করেছে। ও কি মালকিন গিরি দেখাতে চেয়েছে।
কলকাতায় এখন শীত পরেনি। বেশিক্ষণ পাখার হাওয়া ভাল লাগে না। একটুতেই শীত শীত করে। বেলটা বেজে উঠল। তাড়াতারি বিছানা থেকে টাওয়েলটা টেনে নিয়ে কোমরে জড়িয়ে নিলাম।
দরজা খুলতেই একটা মিষ্টি গন্ধ আমার ঘ্রাণ শক্তিকে আক্রমন করল। সমনে তনু দাঁড়িয়ে। আজকে ও খুব একটা বেশি সাজেনি। হাল্কা মেকআপ। কপালে ছোট্ট একটা বিন্দির টিপ। চোখের কোলে হাল্কা কাজলের রেখা। চেখ দুটো শ্বেত করবীর ওপর যেন কালো বোলতা বসে আছে। আমি একদৃষ্টে ওর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলাম। ও মিটি মিটি হাসছে।
কি হলো, ভেতরে যেতে বলবে না, এখানে দাঁড়িয়ে কি....।
সরি।
ও ভেতরে এলো। ওর পরনে আজ টাইট জিনস। কোমরবন্ধনীর একটু ওপরে বেল্ট দিয়ে বাঁধা। ওপরে একটা শর্ট গেঞ্জি পরেছে। তনুকে আজ দারুন দেখতে লাগছে। কাগজের অফিসের মেয়েরা এরকমই সাজগোজ করে।
এই তনুই একদিন মল্লিকদাকে নালিশ করেছিল। অনির সঙ্গে আমাকে কভারেজে পাঠাবেন না। ওকে কেউ সাংবাদিক হিসাবে পাত্তাই দেয় না। এক কোনে গিয়ে চুপচাপ বসে থাকে। কারুর সঙ্গে আলাপ করতে চায় না। বলে কি হবে। ওর জন্য আমার প্রেস্টিজ চলে যায়।
মল্লিকদা হাসতে হাসতে বলেছিল। যাই করুক ওর লেখাটা দেখেছিস, ওই লেকাটার সঙ্গে তোর ছবি। মাইলেজটা কোথায় বুঝতে পারছিস।
তনু পরে ব্যাপারটা রিয়েলাইজ করেছিলো। যখন অনেকেই আমার লেখার এ্যাসাইনমেন্ট পাওয়ার জন্য মল্লিকদার কাছে হত্যে দিয়ে পরে থাকতো।
তারপর ও আমার বন্ধু হয়ে গেলো।
কি ভাবছো ? সেন্টার টেবিলে ব্যাগটা ছুঁড়ে ফেলে দিলো।
আমি চুপচাপ।
কিছু খেয়েছো ?
মাথা দুলিয়ে বললাম, হ্যাঁ চাউমিন।
ও পায়ে পায়ে ভেতরের ঘরে চলে এলো। এই ফ্ল্যাটে ওর অবারিত দ্বার। ও ছাড়া এই ফ্ল্যাটে আমার অফিসের দ্বিতীয় ব্যক্তির কোন প্রবেশাধিকার হয় নি। বিছানা অগোছালো।
সত্যি তোমার দ্বারা আর কিছু হবে না।
কেনো।
একটু বিছানাটা পরিষ্কার করতে পারো না।
সময় কোথায়।
ঘুম থেকে উঠে করবে।
আমার দ্বারা হয় না। একটা মাসি ছিল। তা আমারই থাকার ঠিক নেই। মাসিকে রেখে কি করব। বারন করে দিয়েছি।
বড়মা কখনো এবাড়িতে এসেছেন ?
না।
সেইজন্য।
এ বাড়িতে কেউ আসে নি তুমি ছাড়া।
সত্যি!
আমি খুব লাকি বলো।
বলতে পারো।
তুমি অফিসের কাউকে নিয়ে আসো নি!
না। তোমার এ্যাসাইনমেন্ট হয়ে গেছে।
হ্যাঁ। কয়েকটা ছবি তুলতে দিয়েছিল। তুলে দিলাম।
জমা দিয়ে দিয়েছো।
দিলেই তো আবার পাঠাবে।
তারমানে তুমি কাজে ফাঁকি দিয়ে আমার কাছে।
ভাললাগছে না। তোমার সঙ্গে গল্প করতে ইচ্ছে করছে।
আমি জানি তনু কেন আমার কাছে বারে বারে আসে। কিন্তু আমি ওর ডাকে সারা দিইনা। আমাদের হাউসে লুটেপুটে খাওয়ার লোক প্রচুর আছে। সব হাউসেই আছে। খালি একটু চোখ মেলে তাকালেই হলো। তনু আমার হাতের একবারে কাছে। চাইলেই ও আমার ডাকে সারা দেবে। আমি পারি না। কোথায় যেন বাধো বাধো ঠেকে। এটা আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। অনেকঘাটে জল খেয়েছি। তার চেয়ে বেশ আছি।
একটা জিনিষ বারবার লক্ষ করেছি। আমি কোন মেয়ের সঙ্গে একটু ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করেছি। সে আমাকে সেক্স পার্টনারের অফার দিয়েছে। বেশ সন্তর্পনে সরে এসেছি। জানিনা ঈশ্বর আমার শরীরটায় কি মধু মাখিয়ে রেখেছে।
কি ভাবছো।
কিছু না।
তুমি আমার সেই কথার উত্তর এখনো দিলে না।
কোন কথা।
দুজনে প্রথম যখন এ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে বাইরে গেলাম। সেই সময় একটা কথা বলেছিলাম।
সত্যি বলবো তনু।
বলো।
একটা ভুল করেছিলাম। ক্ষণিকের জন্য। এরজন্য তোমার থেকেও আমি নিজেকে অনেকটা বেশি দায়ী করি।
না। আমি তোমাকে একটু বেশি চেয়েছিলাম সেদিন।
তুমি চেয়েছিলে আমি সায় দিয়েছিলাম।
হ্যাঁ।
তারপর আমার ভুলের জন্য তোমার কাছে ক্ষমা চেয়েছি।
হ্যাঁ।
যার বাপ-মার ঠিকানা নেই তাকে তুমি ভালবেসে করবে কি ?
তনু মাথা নীচু করে রইল। বুঝতে পারছি। ওর চোখ দুটো খুব ভারি ভারি।
তনু।
উঁ।
আচ্ছা আমি তোমার খুব ভাল বন্ধু হতে পারি না।
তনু আমার দিকে তাকালো।
তুমি অন্য কারুর এটা বলছোনা কেনো।
বিশ্বাস করো। আমি কারুর নই। আমি একা। কারুর সঙ্গে আমি নিজেকে জড়াতে চাই না। আমাকে অফিসে দেখেছো তো। আমার কোনো ভাল বন্ধু নেই। একমাত্র সন্দীপ ছাড়া।
সন্দীপদার কাছে তোমার সম্বন্ধে অনেক কিছু জেনেছি।
জানিনা সন্দীপ তোমায় কি বলেছে। যে টুকু বলেছে, আশা রাখি আমার সম্বন্ধে তোমার জানার চাহিদা মিটে গেছে।
তুমি এত ভালছেলে আমাদের হাউসে পরে আছ কেনো।
এখনো ভাল সুযোগ পাইনি বলে। তাছাড়া দাদা মল্লিকদাকে ছেড়ে আমি কোথাও যাব না।
তোমায় আমি খুব বিরক্ত করি।
একবারে না। তুমি এলে বরং ভাল লাগে। আমার কথা বলার কেউ নেই জান।
তনু আমার মুখের দিকে তাকাল। আমার কাছে এগিয়ে এল। আমার হাত দুটো ধরে বলল। আমি খুব হ্যাংলা তাই না।
মটেই না।
তনু ঘন্টা খানেক আমার কাছে থাকলো। তারপর চলে গেলো। যাওয়ার সময় ওর চোখের আর্তি আমাকে ভীষণ ভাবে নাড়া দিয়ে গেলো। একবার ভাবলাম মিত্রা আমার জীবন থেকে হারিয়ে গেছে। সেই জায়গায় তনুকে স্থান দিলে ক্ষতি কি। কিন্তু আমি যে মিত্রার কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলাম। ওকে ছাড়া আমি পৃথিবীতে কাউকে আমার জীবনে স্থান দেব না।


জামা কাপর পরে ব্যাগটা নিয়ে বেরিয়ে এলাম। এই টুকু রাস্তা ইচ্ছে করলনা বাসে যেতে। হাঁটতে হাঁটতে অমিতাভদার বাড়িতে পৌঁছলাম। সাড়ে পাঁচটা বেজে গেছে। গেটের মুখ থেকেই দেখলাম সকলে বাইরের লবিতে পায়চারি করছে। বড়মাকে দেখলাম না। ছোটমা আমাকে দেখেই চেঁচিয়ে উঠল, ওই যে শ্রীমান এলেন এতোক্ষণে। অমিতাভদা পায়ে পায়ে এগিয়ে এসে বললেন, কিরে শরীর খারাপ নাকি ? আমি মাথা দুলিয়ে বললাম, না। মল্লিকদা বললেন, কি বাবা আবার ঘুম।
আমি মল্লিকদার দিকে তাকিয়ে বললাম, ছোটমাকে বলব নাকি সকালের ব্যাপারটা।
এই তো আমাদের দুই কলিগের কথা। সে তো অফিসেই হয়ে গেছে। আবার বাড়িতে কেন ?
কিরে অনি কি হয়েছে। ছোটমা চেঁচিয়ে উঠলেন।
আমি হেসে ফেললাম। অফিসে এই ভদ্রলোকদ্বয়ের দাপট দেখলে অবাক হয়ে যেতে হয়। আর বাড়িতে ছোটমা কিংবা বড়মার কাছে অমিতাভদা মল্লিকদা যেন কেঁদ বাঘ।
বড়মা ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন। কিরে তোর কি হয়েছে। এত দেরি কেন ?
কোথায় দেরি হয়েছে। তোমাকে বললাম পাঁচটা নাগাদ আসব, এসেছি সাড়ে পাঁচটা।
চল ভেতরে চল। সব গোছ গাছ করে নিয়েছিস। ছোট একবার ওর ব্যাগ খুলে দেখে নে। সব ঠিক ঠাক নিয়েছে কিনা।
আমি ভেতরে এসে খাবার টেবিলে বসলাম। দেখলাম তিনজনের জায়গা হয়েছে।
বড়মার দিকে তাকিয়ে বললাম, এখানে তিনজনের জায়গা দেখছি। আর দুজনের ?
খেয়ে নিয়েছে। এখন আমি তুই আর তোর ছোট খাব।
তুমি কি আমার জন্য না খেয়ে বসে আছ ?
বড়মার চোখ ছল ছল করে উঠল। তুই খেতে চাইলি তোকে না খাইয়ে খাই কি করে বল।
ছোটমা ?
তোর জন্য না খেয়ে বসে আছে।
শিগগির ডাক আমার ব্যাগ দেখতে হবে না। আমি ঠিক ঠিক গুছিয়ে নিয়েছি।
বড়মা চেঁচিয়ে উঠল ছোট আয় চলে আয়। আগে খেয়ে নিই তারপর না হয় ওর ব্যাগ গুছিয়ে দিস ।
একসঙ্গে তিনজন খেতে বসলাম। বড়মা আজ দারুন দারুন সব পদ রান্না করেছে। চিংড়ি মাছের মালাইকারি। ট্যাংরা মাছের ঝোল। ভাপা ইলিশ। নিঃশব্দে তিনজন খাচ্ছিলাম। আমি একটা ট্যাংরা মাছ বড়মার পাতে তুলে দিলাম। বড়মা হেই হেই করে উঠল। আর একটা ইলিশ মাছ ছোটমার পাতে তুলে দিলাম। ছোটমা কপট গম্ভীর হয়ে বলল, অনি এটা কি হল। সারাটা দুপুর ধরে আমরা দু’বনে তোরজন্য রান্না করলাম আর তুই যদি...।
আমার যতটা খাওয়ার আমি ঠিক নিয়ে নিয়েছি। বারতিটা তোমাদের দিলাম।
বড়মা খেতে খেতেই বলল, হ্যাঁরে অনি দুপুরে কি হয়েছিল। তুই নাকি তোর বসের সঙ্গে রাগারাগি করেছিস।
তোমায় এ কথা আবার কে বলল ?
মল্লিক বলল।
আমি ছোটমার মুখের দিকে একবার তাকালাম। ছোটমার সঙ্গে আমার সম্পর্ক অনেকটা বন্ধুর মতো দুজনকেই আমি ভীষণ ভালবাসি। কিন্তু বড়মাকে আমি শ্রদ্ধাকরি। তাই বড়মার কোন কথায় আমি চট করে না করতে পারি না। অনেক ভেবে চিন্তে আমায় উত্তর দিতে হয়।
তুমি বড়মাকে বলেছ নাকি ?
কি!
তোমাকে একদিন গল্পের ছলে বলেছিলাম।
মিত্রার ব্যাপারটা।
হ্যাঁ।
তোর গুণের কথা দিদিকে বলব না।
আজ ঐ ব্যাপারটা নিয়েই একটা সমস্যা তৈরি হয়েছে।
খেতে খেতে মাথা নীচু করেই কথা বলছিলাম। কিছুক্ষণ সবাই নিঃশব্দ। খালি খাবার থালায় হাপুস হুপুস শব্দ।
তুই জানিস না ও তোদের মালকিন।
জানতাম না। আজ জানলাম। কয়েক মাস আগে ওর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল বেঙ্গল ক্লাবে। বড় সাহেব পাঠিয়েছিল।
কি জন্য।
একটা এ্যাসাইনমেন্ট দিয়ে ওখানে গিয়ে ওর সঙ্গে দেখা হল। ওর হাসবেন্ডের সঙ্গে আমায় আলাপ করিয়ে দিল। তারপর জোর করে ওর বাড়িতে টেনে নিয়ে গেল। অনেক রাত পর্যন্ত ওর বাড়িতে ছিলাম। সেদিন তোমার এখানে আসার কথা ছিল। আসা হয় নি। কেন ছোটমাকে আমি তো সব বলেছিলাম।
হ্যাঁ ছোট বলেছিল। বয়স হয়েছে এখন আর খেয়াল থাকে না।
কিরে হোল সাড়ে সাতটায় ট্রেন। এতটা পথ যেতে হবে। অমিতাভদার গলায় অভিযোগের সুর।
নিজেরা তো চব্বচষ্য গিলেছ আমাদের কি একটু শান্তিতে খেতেও দেবেনা। কি হিংসুটে ব্যাটাছেলেরে বাবা।
তিনজনেই হো হো করে হেসে উঠলাম। মল্লিকদা আমার দিকে তাকিয়ে একবার চোখ মারল।
নে নে তোর কাগজপত্র সব বুঝে নে। আমায় আবার অফিসে যেতে হবে। আমি আমার ট্রেনের টিকিট। হোটেলের বুকিংয়ের কাগজপত্র। অফিসিয়াল কিছু কাগজপত্র। সব বুঝে নিলাম। সবাইকে একে একে প্রণাম করলাম বড়মার চোখ ছলছল। আমার হাতে একটা খাম দিয়ে বলল, সঙ্গে  রাখ। জানি তোর কাছে আছে। লাগলে খরচ করিস। না লাগলে এসে ফেরত দিস।
আমি হাসলাম। আজ পর্যন্ত বড়মা আমার কাছে থেকে কিছু ফেরত নেন নি। খালি দিয়ে গেছেন। আমি মুখের দিকে তাকালাম।
বেরিয়ে এলাম। অফিসের গাড়ি রেডি আছে। অমিতাভদা বলল, শোন আমাদের এক কোরেসপন্ডেন্স আছে ওখানে বালচন্দ্রন নাম ও কাল তোর সঙ্গে যোগাযোগ করে নেবে। তবে আজ তোর জন্য স্টেশনে আমাদের অফিসের গাড়ি থাকবে। অফিসিয়াল ফাইলের ওপরে যে চিঠিটা আছে দেখবি ওতে গাড়ির নম্বর লেখা আছে। তাছাড়া আমি ওখানকার অফিসে বলে দিয়েছি। তোর কোচ নং টিকিটের নম্বর ওদের দিয়ে দিয়েছি।
তারমানে মোদ্দা কথা হোল আমার যাতে কোন অসুবিধা না হয় তার জন্য সমস্ত বন্দ বস্তই পাকাপাকি ভাবে তৈরি করা হয়ে গেছে।
স্টেশনে পৌঁছে দেখি ট্রেন ছাড়তে আর দশ মিনিট বাকি। আমার টিকিট এসি টু টায়ার। টিকিটের সঙ্গে কোচ মিলিয়ে নিয়ে ট্রেনে উঠলাম। দেখলাম আমার জন্য একটি কুপ বুক করা হয়েছে। মাত্র দুটি সিট। সেখানে আর একজন যাত্রীকে দেখতে পেলাম না। যাই হোক আমার একটা মাত্র ব্যাগ। সিটের তলায় ঢুকিয়ে দিয়ে একটু বাইরে বেরিয়ে এলাম। বহু মানুষের দৌড়াদৌড়ি। চেঁচামেচি। গাড়ির ড্রাইভার কাছে এগিয়ে এসে বলল অনিদা আমি এবার যাই। আমি বললাম, হ্যাঁ যা। গিয়ে একবার বলে দিস আমি ঠিক ঠিক ট্রেনে উঠেছি।  ছেলেটি হেসে ফেলল। আমি ভেতরে চলে এলাম। ট্রেনটা একটু দুলে উঠেই চলতে শুরু করল।
আমি আমার জায়গায় এসে বসলাম। কুপের দরজাটা খোলাই রেখেছি। একটু পরেই টিটি আসবে। রাত্রি বেলা। অতএব ঠেসে ঘুম। খাওয়া দাওয়া বেশ ভালই হয়েছে। তবে এককাপ গরম কফি পেলে বেশ ভাল হতো। কপাল ভাল থাকলে হয়তো এরা দেবে। না হলে নয়।

জীবনে জীবন যোগ না করলে ব্যার্থ হয় গানের পসরা

সর্বশেষ সম্পাদনা করেছেন mamonjafran (৩১-১২-২০০৮ ১৬:৫৫)

Re: কাজলদীঘি, শ্মশান ও পীরসাহেবের থান

আমার এই লেখার পাঠক পাঠিকারা যারা এই লেখার শেষ অংশ খুব তাড়াতাড়ি পরতে চান তাঁরা www.bengalilibrary.org এই সাইটের creative corner-এ ঘাই মারতে পারেন। পরবর্তী পোস্ট আগামী ১৫ জানুয়ারী।

জীবনে জীবন যোগ না করলে ব্যার্থ হয় গানের পসরা

Re: কাজলদীঘি, শ্মশান ও পীরসাহেবের থান

মামুনজাফরান , আপনি যে অবশেষে প্রজন্মে এসেছেন, সে জন্য আপনাকে জানাই আন্তরিক অভিনন্দন।
স্বাগতম, আশা করি নিয়মিত হবেন।

রক্তের গ্রুপ AB+

microqatar'এর ওয়েবসাইট

লেখাটি GPL v3 এর অধীনে প্রকাশিত

সর্বশেষ সম্পাদনা করেছেন mamonjafran (৩১-১২-২০০৮ ২০:৪৪)

Re: কাজলদীঘি, শ্মশান ও পীরসাহেবের থান

microqatar লিখেছেন:

মামুনজাফরান , আপনি যে অবশেষে প্রজন্মে এসেছেন, সে জন্য আপনাকে জানাই আন্তরিক অভিনন্দন।
স্বাগতম, আশা করি নিয়মিত হবেন।

মাইক্রকাতারভাই আপনার দেখানো পথেই প্রজন্মে আসা এখানে আপনার কথা মতোই আপলোড করলাম। চলবে। অনেক ডিটেলসে এখানে লেখার ইচ্ছে রয়েছে। আপনার মতো গুণীজন একানে রয়েছে। আমার ভাবনা কি।

জীবনে জীবন যোগ না করলে ব্যার্থ হয় গানের পসরা

Re: কাজলদীঘি, শ্মশান ও পীরসাহেবের থান

পড়ে ফেললাম পুরোটা big_smile

"I know not with what weapons World War III will be fought, but World War IV
will be fought with sticks and stones."
    -Albert Einstein

Re: কাজলদীঘি, শ্মশান ও পীরসাহেবের থান

মাহ্‌দী লিখেছেন:

পড়ে ফেললাম পুরোটা big_smile

মাহদীভাই ছোট্ট এইটুকু উক্তিতে লেখকের মন ভরে না। হাত খুলে সমালোচনা করতে হবে। যাতে লেখক তার লেখার খারপ দিকগুলি সংশোধন করতে পারে। আশারাখি এইটুকু আমার পাঠাক পাঠিকার কাছ থেকে আশাকরতে পারি। কি তাই না ?

জীবনে জীবন যোগ না করলে ব্যার্থ হয় গানের পসরা

Re: কাজলদীঘি, শ্মশান ও পীরসাহেবের থান

mamonjafran লিখেছেন:

আমার এই লেখার পাঠক পাঠিকারা যারা এই লেখার শেষ অংশ খুব তাড়াতাড়ি পরতে চান তাঁরা http://www.bengalilibrary.org/index.php … ;Itemid=10 এই সাইটের creative corner-এ ঘাই মারতে পারেন। পরবর্তী পোস্ট আগামী ১৫ জানুয়ারী।

জীবনে জীবন যোগ না করলে ব্যার্থ হয় গানের পসরা

১০

Re: কাজলদীঘি, শ্মশান ও পীরসাহেবের থান

এতো বড় লেখা দেখে ভয় পাইছি..:mad::-O;D

পরে পড়বো। আপনাকে প্রজন্মে স্বাগতম ।

সবকিছুর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি, এমনকি মৃত্যুর জন্যও...
রয়েল টেকনোলজি | সমকাল দর্পণ | আমার ফেসবুক প্র্রোফাইল | আমার ফেসবুক পেজ | আমার গুগল+

১১

Re: কাজলদীঘি, শ্মশান ও পীরসাহেবের থান

মেহেদী আকরাম লিখেছেন:

এতো বড় লেখা দেখে ভয় পাইছি..:mad::-O;D

পরে পড়বো। আপনাকে প্রজন্মে স্বাগতম ।

জনাব মেহেদী আকরাম। আপনাকে ধন্যবাদ। আমি খুব নগণ্য মানুষ ভুল করে একটা বড়ো লেখা লিখে ফেলেছি। তাও লেখাটা এখনো শেষ করতে পারিনি। চলছে। তা ধরুণ বেশি নয়। ৪৫০ পাতা হয়ে গেছে। কি করি বলুনতো। আপনাকে অনুরোধ আপনি একটুখানি কষ্ট করে পরেফেলুন

জীবনে জীবন যোগ না করলে ব্যার্থ হয় গানের পসরা

১২

Re: কাজলদীঘি, শ্মশান ও পীরসাহেবের থান

খুব মজার টপিক এবং সুন্দর আত্বকাহিনী নিজের জীবনের। ভালো সব সময়ই ভালো না কি গো ভাই!!!

১৩ সর্বশেষ সম্পাদনা করেছেন জুয়েল (০১-০১-২০০৯ ১৮:২৫)

Re: কাজলদীঘি, শ্মশান ও পীরসাহেবের থান

মামুন জাফরান ভাই আপনাকে বরন করে নেয়ার সুযোগই তো দিলেন না। tongue_smile

নিজের জীবনের আত্মকাহিনী কি আর কয়েক পাতায় শেষ হয়, আপনি মনে হয় পুরো বই ছাপানোর ব্যাবস্থা করতে পারেন, অথবা অনলাইনে ই-বুক;)। সবাই তো দেখছি পছন্দ করছে আপনার লেখা। cool

জাফরান ভাই, ফোরামে লেখাগুলো দেয়ার জন্য ধন্যবাদ, তবে একসাথে এতো বড় লেখা পড়তে একটু কষ্টই হবে। আপনি বরং পর্ব করে দিন, অথবা একেকদিন এখানেই পোষ্ট আকারে দিতে পারেন। আপনাকে প্রজন্ম ফোরামে স্বাগতম। smile

[img]http://fixpc.co.za/iplocator/flag.php[/img] Let's Go BIG!! [img]http://g.imagehost.org/0746/biggrin.gif[/img]

১৪

Re: কাজলদীঘি, শ্মশান ও পীরসাহেবের থান

বাপের জন্মে কোনোদিন কুপে যাই নি। পেছনে খুঁটি থাকলে কত কিছু হয়। বুঝতে পারছি এবার। কুপের এ্যারেঞ্জমেন্টটা খুব ভাল। দুদিকে দুটি সীট মাঝখানে একটা সেন্টার টেবিলের মতো। জানলার ধারে মাথার শিয়রে একটা টেবিল ল্যাম্পের মত। জেলে দেখলাম বেশ ভাল। যাক ঘুম না আসা পর্যন্ত একটা বই পড়া যাবে। কালকূট সমগ্রের একটা খন্ড নিয়ে এসেছি। ছটা উপন্যাস আছে। ট্রেনটা কত জোরে যাচ্ছে কিভাবে যাচ্ছে কিছুই বোঝা যাচ্ছেনা। এই কামড়ারই কয়েকজনের চেঁচামিচির শব্দ কানে আসছে। তারা এখনো গুছিয়ে উঠতে পারে নি।
ফোনটা বেজে উঠল। দেখলাম বড়মার নম্বর। সমস্ত ব্যাপার পঙ্খানুপুঙ্খ রূপে জানিয়ে দিলাম। শেষে বড়মা বলল সাবধানে থাকিস।
নীচু হয়ে সিটের তলা থেকে ব্যাগটা টেনে বার করলাম। পাম্পার বালিশটা বার করে ফুলিয়ে নিলাম। উপন্যাস সমগ্রটা বার করে কুপের দরজাটা টেনে দিলাম। টান টান হয়ে শুয়ে পরলাম। আঃ কি আরাম।
আবার ফোনটা বেজে উঠল। দেখলাম তনুর নম্বর। হা হা করে হাসি। কি হল বাবজীবন। ট্রেন ছেড়েছে।
হ্যাঁ।
এখন কোথায় ?
জানিনা ট্রেন চলছে এটুকু বলতে পারি।
কেন!
আমার টিকিট টু টায়ার এসি কোচের একটা কুপে। সেখানে দুটো সিট আছে কিন্তু আমি একা।
ইস ব্যাডলাক। আমি যাব নাকি।
চলে এসো।
ইস সখ দেখ।
তুমি এখন কোথায়।
বাড়ি ফিরছি। বড় সাহেবের আজ মাথাটা বেশ গরম।
কেন আবার কি হল।
অফিসে একটা ঝামেলা হয়েছে।
কাকে নিয়ে।
আবার কাকে নিয়ে ঐ চিফরিপোর্টার।
তোমার এ্যাসাইনমেন্ট জমা দিয়েছ।
হুঁ। অনি ভাল লাগছে না। তোমার কথা বার বার মনে পরছে।
মনটাকে বশে আনার চেষ্টা কর।
তনু চুপচাপ
তনু।
কি।
মন খারাপ লাগছে।
একটু লাগছে।
সবসময় কাজের মধ্যে থাকার চেষ্টা কর। আমি তোমাকে পুরোপুরি ফিরিয়ে দিই নি।
তনু চুপচাপ।
কি হল কথা বলছনা যে।
তনু কাঁদছে।
আবার মন খারাপ করে। আরে আমি মাত্র পনেরো দিনের জন্য এসেছি। আবার ফিরে যচ্ছি।
হয়তো তোমার সঙ্গে নাও দেখা হতে পারে।
কেনো ?
ফিরে এসো বলব।
আচ্ছা।
ফোনটা তনু কেটে দিল।
কুপের দরজাটা কেউ নক করল। শুয়ে শুয়েই বললাম খোলা আছে ভেতরে আসুন।
দেখলাম টিটি সাহেব এসেছেন। উঠে বসলাম। ওনাকে ভেতরে এসে বসতে বললাম। উনি ভেতরে এলেন। আমি ব্যাগ থেকে টিকিটটা বের করে ওনাকে দিলাম। উনি দেখে বললেন, স্যার আপনার কোন অসুবিধা হলে আমাকে বলবেন।
আমি একটু অবাক হলাম। স্যার বলে সম্বোধন করাতে। একটু কফি পাওয়া যাবে ?
অবশ্যই। আমি গিয়ে পাঠিয়ে দিচ্ছি। এনি প্রবলেম আমাকে একটু জানাবেন। আমি পাশেই আছি।
ঠিক আছে।
উনি চলে গেলেন। একটু পরেই দেখলাম একজন এসে একটা ট্রে টেবিলের ওপরে রাখল। কফির পট কাপ ডিস দেখে আমার একটু সন্দেহ হল। আমি নিশ্চই কোন সাধারণ ব্যক্তি নই। এদের এ্যারেঞ্জমেন্ট সেই কথাই বলছে। একজন সাধারণ সাংবাদিকের জন্য এরকম ব্যবস্থা। কেমন যেন সন্দেহ হল। মুখে কিছু বললামনা। পকেট থেকে মানিপার্সটা বার করে পয়সা দিতে গেলাম। বলল না স্যার আপনার যখনি যা চাই বলবেন আমরা চলে আসব।
এই ছোটো ঘরটায় আমাকে বোবা হয়েই থাকতে হবে। কারুর সঙ্গে কথা বলার জো নেই।  কফি খাওয়ার পর বইটা পড়তে পড়তে কখন যে ঘুমিয়ে পরেছি খেয়াল নেই। হঠাৎ দরজায় টোকা মারার শব্দে ঘুমটা ভেঙ্গে গেল। দেখলাম টিটি ভদ্রলোক মুখটা আমসি করে দাঁড়িয়ে আছে।
সরি স্যার একটু বিরক্ত করলাম। যদি পারমিসন দেন তাহলে একটা কথা বলবো।
আমি একটু অবাক হলাম। বিনয়ের অবতার। বলুন।
স্যার আপনার এই কুপে একটা সিট খালি আছে একজন ভদ্রমহিলাকে যদি একটু লিফট দেন ?
আমি লিফ্ট দেবার কে। ফাঁকা আছে। আপনি এ্যালট করবেন।
না স্যার এই কুপটা আজ শুধু আপনার জন্য। জিএম সাহেবের হুকুম।
জিএম সাহেব।
হ্যাঁ স্যার। আপনার যাতে কোন অসুবিধা না হয়। তার জন্যও আমাদের বলে দেওয়া হয়েছে।
তাই নাকি। জিএম মানে সোমনাথ মুখার্জী।
হ্যাঁ স্যার।
এতোক্ষণে বুঝতে পারলাম। ঠিক আছে আপনি যান। ওনাকে নিয়ে আসুন।
চোখের নিমেষে ভদ্রলোক অদৃশ্য হয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ পরে বছর কুড়ির একজন তরুনীকে নিয়ে এসে হাজির।
দেখেই আমার চোক্ষু চড়কগাছ।
গায়ের রং পাকা গমের মতো। পানপাতার মতো লম্বাটে মুখ। ঠোঁটের ঠিক ওপরে একটা বাদামী রং-এর তিল। পিঠময় মেঘের মতো ঘন কালো চুল। মাঝে মাঝে হাইলাইট করা। চোখে রিমলেস চশমা। উদ্ধত বুক। পরনে থ্রিকোর্টার জিনসের প্যান্ট। টাইট একটা হাতাকাটা গেঞ্জি।
টিটি ভদ্রলোক আমার পরিচয় ওকে দিতেই আমি হাত তুললাম।
আমার নাম ঝিমলি।
আমি হাতজোড় করে মাপছি। বয়সের ধর্ম।
আমি ঝিমলিকে আপনার সব কথা বলেছি। তাছাড়া সোমনাথবাবুও ওকে সব বলেছে। ঝিমলির বাবা আমাদের ডিভিসনের এজিএম। উনিও আপনাকে খুব ভলকরে চেনেন। আপনার লেখার খুব ভক্ত।
মোবাইলটা বেজে উঠল। পকেট থেকে বার করতেই দেখলাম, বড়সাহেবের ফোন। তুই কোথায় ?
কি করে বলবো। একটা কুপের মধ্যে টিকিট কেটেছ। আমি এতটা ভিআইপি আগে জানতাম না।
সারা রাতের জার্নি তোর বড়মা বলল.....।
ধরো। আমরা এখন কোথায় আছি ? টিটি ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম।
খড়গপুর ছেড়ে এলাম।
আমরা এখন খড়গপুর ছেড়ে এলাম।
সোমনাথ ফোন করেছিল। ওদের এক কলিগের মেয়ে কি পরীক্ষা আছে। তোর স্টেশনেই নামবে। আমাকে রিকোয়েস্ট করেছিল। তোর কুপে পারলে একটু ব্যবস্থা করে দিস। আর তোর বড়মাকে বলার দরকার নেই।
হাসলাম। ওরা আমার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে।
আচ্ছা আচ্ছা। দুএকটা ভাল লেখা কাল পরশুর মধ্যে পাঠাস।
ঠিক আছে।
আমার কথাবার্তা শুনে ওরা বুঝে গেছে আমি কার সঙ্গে এতোক্ষণ কথা বলছিলাম। টিটি ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে বললাম। কটা বাজে।
দশটা পনেরো।
একটু কিছু খাওয়াতে পারেন। আমার গেস্ট এলেন।
ওকে স্যার গেস্ট বলবেন না। ঠিক আছে আমি পাঠিয়ে দিচ্ছি।
আর একটু কফি।
আচ্ছা স্যার।
কিছুক্ষণের মধ্যেই ঝিমলির সঙ্গে ভাল আলাপ জমিয়ে ফেললাম। জানলাম ও আমার ওপর ভাল হোমওয়ার্ক করেই এখানে এসেছে। ও উঠেছে হাওড়া থেকেই কিন্তু জায়গা না পাবার জন্য প্যানটিকারেই ছিল। তারপর খোঁজ খবর নিয়ে যোগাযোগ করে। অমিতাভদার পারমিসন নিয়ে এখানে স্থানান্তরিত হয়েছে। সোর্স থাকলে কি না হয়। বাঘের দুধ পর্যন্ত পাওয়া যায়। আমার প্রতি কৃতজ্ঞতায় ঝিমলির দুচোখ ভরে গেছে।
আমি আসাতে আপনার কোন অসুবিধা হবেনা।
হলে আপনাকে আসতে দিতাম না।
ঝিমলি ভাইজ্যাকে একটা মেডিক্যাল এক্সাম দিতে যাচ্ছে। পর্শুদিন ওর এক্সাম। কথায় কথায় এও জানলাম ওখানে ওর থাকার কোন বন্দবস্ত নেই। ওর বাবা ভাইজ্যাকের স্টেশন মাস্টারকে বলে দিয়েছেন। ওরাই ওর ব্যবস্থা করে দেবে।
খাবার চলে এল। আমরা দুজনে একসঙ্গে খেলাম। খেতে খেতে ওর সঙ্গে অনেক গল্পহল। ওর পড়াশুনর বিষয় আমার লেখার বিষয়ে। আরও কত গল্প। আমার কিন্তু বার বার ওর বুকের দিকে নজর চলে যাচ্ছিল। ও সেটা ভাল রকম বুঝতে পারছিল কিন্তু তার কোন প্রকাশ ওর মুখে চোখে দেখতে পেলাম না। বরং আমার চোখের এই লোভাতুর দৃষ্টি ও বেশ তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করছিল।
খাওয়া শেষ হতেই একজন এসে সব পরিষ্কার করে নিয়ে চলে গেল। আমি ব্যাগ থেকে একটা পাজামা পাঞ্জাবী বার করে বাথরুমে চলে গেলাম। একেবারে ফ্রেস হয়ে চলে এলাম। আমি চলে আসার পর ঝিমলি গেল।
ঝিমলি একটা ঢলঢলে গেঞ্জি আর একটা ঢলঢলে বারমুডা পরে এল। মোবাইল থেকে দুটো ম্যাসেজ করলাম। একটা বড়মাকে আর একটা তানিয়াকে। মোবাইলের শুইচ অফ করলাম। বার্থে একটা চাদর পাতলাম। একটা কম্বল চেয়ে নিলাম।
ঝিমলি বলল কি হল শুয়ে পরবেন নাকি ?
হ্যাঁ।
আমি একা একা জেগে বসে থাকব নাকি।
ঘুমিয়ে পড়ো।
তারমানে।
তাহলে কি করবে ?
কেন গল্প করব।
সব গল্পতো শেষ হয়ে গেল।
বারে। কই! আমার আরো জানার বাকি আছে। আপনাকে পেয়েছি গোগ্রাসে কিছুটা গিলি।
বাবা আমি এত বড় এখন হয়ে উঠিনি।
ঝিমলা হাসছে।
আমি টান টান হয়ে শুয়ে পরলাম। ঝিমলি আমার মুখের দিকে কপট রাগ করে তাকাল।
দেখ ঝিমলি তুমি না থাকলেও আমি ঘুমতাম। রাত জাগা আমার অভ্যাসে নেই।
আপনি না সাংবাদিক।
তাতে কি হয়েছে। সারা রাত জেগে কি আমরা সংবাদ লিখি নাকি। কারা লেখে জানিনা। তবে আমি লিখি না।
ঝিমলির মুখের দিকে তাকালাম। চোখের থেকে চশমাটা খুলে সামনের টেবিলের ওপরে রাখল। তানপুরার মতো ভরাট পাছা। তনুর থেকে যথেষ্ট সেক্সী। দেখলেই বোঝা যায়। অন্য কেউ হলে এরি মধ্যে ঝিমলিকে পটিয়ে নিয়ে একটু সেক্স করে নিত। কিন্তু আমার দ্বারা এসব হয় না।
আমি চুপ চাপ ঘুমের ভান করে মরার মতো পরে রইলাম। ঝিমলি একবার দরজা খুলে বাইরে গেল। টিটি ভদ্রলোক সামনই বসেছিলেন তাকে কি যেন বলল। তারপর ভেতরে এসে দরজায় লক করে দিল। নিজের ব্যাগ খুলে একটা চেপ্টা মতন কি যেন বার করল। বুঝলাম ল্যাপটপ। তারপর আমার দিকে পা করে দরজার দিকে মাথা করে ওর বার্থে শুয়ে ল্যাপটপটা খুলল। আমি মিটিমিটি চোখে ঝিমলির শুয়ে থাকার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। ওঃ কি ভরাট পাছা। যদি একবার সেক্স করতে পারতাম জীবন ধন্য হয়ে যেত। তারপর নিজেকে বোঝালাম সব জিনিষ তোমার জন্য নয়।
বেশ কিছুক্ষণ একটা গেম খেলার পর ঝিমলি উঠে বসল। আমার মুখের কাছে মুখটা নামিয়ে নিয়ে এল। আমি ওর গরম নিঃশ্বাসের স্পর্শ পেলাম। ভীষণ ইচ্ছে করছিল ওর মাথাটা ধরে ঠোঁটে ঠোঁট ঠেকাই। পারলাম না। নিজেকে পুরুষ বলে পরিচয় দিতে সেই মুহূর্তে আমার ভীষণ খারাপ লাগছিল। ঝিমলি সোজাহয়ে দাঁরিয়ে লাইটটা অফ করে দিল। কুপের ভেতর হাল্কা সবুজ কালারের ছোট লাইটটা জলছে।
ঝমলি নিজের গেঞ্জিটা খুলে ফেলল। আমি অবাক হয়ে ওর বুকের আপেল বাগানের দিকে তাকিয়ে রইলাম। ঝিমলিতো ব্রা পরে নি। তাহলে! আমার ভুল ভাঙল। না ঝিমলি ব্রাটাই খুলছে। ও ট্রান্সপারেন্ট ব্রা পরেছে। ব্রাটা নীচু হয়ে ওর ব্যাগে ঢোকাল। ওর শরৎকালের মতোফর্সা পিঠে কালচুলের রাশি ছড়িয়ে পরেছে। আমার দিকে ফিরে তাকাল। ওর নিরাভরণ দেহ আমার চোখ পরল। ওর সুগভীর নাভি মূল কি মসৃন। গোল নাভীটা আমায় যেন ডাকছে।
অনি ওঠো আর দেরি করোনা সময় নষ্ট করো না। মানুষের জীবনে সুযোগ বার বার আসে না। এই অপসরা তোমার জন্যই আজ সব কিছু সাজিয়ে নিয়ে বসে আছে। আর তুমি ঘুমোচ্ছ ভূরু কাপুরুষ। ঝিমলি গেঞ্জিটা মাথা গলিয়ে পরল। ওর বগলে এক ফোঁটা চুল নেই কামানো বগলে শঙ্খের মতো দুচারটে ভাঁজ পরেছে। সত্যিই ঝিমলিকে অপসরার মতো লাগছে।
ঝিমলি ওর বার্থে বাবু হয়ে বসল। আমার দিকে এরবার তাকাল আমি জেগে আছি কিনা। আর একবার উঠে এসে আমার মুখের কাছে মুখটা নামিয়ে নিয়ে এল। ওর নিঃশ্বাস এখন আরো ঘন হয়ে পরছে। আমি ইচ্ছে করেই জিভটা বার করে আমার ঠোঁটটা চাটলাম। ঝিমলি ত্রস্তে মুখটা সরিয়ে নিল। আমি একটু নরেচরে একটা বড় নিঃশ্বাস ফেললাম।
ঝিমলি ওর সিটে গিয়ে বসলো। আমার দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে ও বসে রইল। তারপর আস্তে আস্তে আমার দিকে একপাশ হয়ে শুল। ল্যাপটপটা কাছে টেনে নিল। একবার আমার দিকে তাকাচ্ছে আরএকবার ল্যাপটপের দিকে। বেশ কিছুক্ষণ এইরকম করার পর ও একটা ফাইলে গিয়ে রাইট ক্লিক করে ওপেন উইথ করে একটা ফ্লিম চালাল।
ল্যাপটপটা ওর দিকে একটু ঘুরিয়ে নিল। আমি ল্যাপটপের স্ক্রিনটা পুরোটা দেখতে পাচ্ছিনা। তবে কিছুটা দেখতে পাচ্ছি। মনে হল ও যেন একটা ব্লু-ফ্লিম দেখছে। আমি আবঝা আবঝা দেখতে পাচ্ছি। ঝিমলি এবার সিটের ওপর উঠে বসল। আবার ল্যাপটপটা ঘুরিয়ে নিল। হ্যাঁ আমি যা ভেবেছিলাম ঠিক তাই। একটা টিন এজের বিদেশি ব্লু-ফ্লিম। আমি এবার পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি।
আজকালকার এই ইয়ং জেনারেশনের মেয়েগুলো কেমন যেন। এরা কেরিয়ারিস্ট আবার সেক্সটা এদের কাছে জলভাত। ঝিমলি নিশ্চই ধরে নিয়েছে আমি ঘুমিয়ে পরেছি। নাহলে ও নীল ছবি দেখতো না। খুব ইচ্ছে করছিল। ছবি দেখে ওর রিঅ্যাকসন কি হয় দেখার জন্য। নিজেকে খুব ছোটো মনে হল। কিছুক্ষণ আগেই ওকে নিয়ে যাতা ভাবছিলাম। মনের আর দোষ কোথায়। ঝিমলিকে দেখেই মনে হচ্ছে ওর বাবা-মা ওকে অভাবে রাখে নি। দু’হাত ভরে দিয়েছেন। আর আমি ক্লাসটেনে ব্যাং কাটার জন্য একটা বায়লজি বক্স কাকার কাছে চেয়ে পাই নি। হয়তো না পাওয়ার জন্য আমার খিদে আরো বেরে গিয়েছিল।
এখনো ল্যাপটপে হাত দিই নি। অফিসের কমপিউটারে মাঝে মাঝে বসি। আমি পাশ ফিরে শুলাম। মাথার মধ্যে যতসব উল্টপাল্টা চিন্তা ভিড় করে আসছে। বড়মার মুখটা মনে পরে গেল। বড়মার স্নেহের ছায়ায় আমি আজ এখানে। খুব ভাল করে লক্ষ করে দেখেছি। আমার জীবনের টার্নিং পয়েন্টগুলোতে সব মেয়ে। কেউ আমার প্রেমিক। কেউ আমার মাসী। আবার কেউ আমার মা। ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে পরেছিলাম জানি না।
একটা নরম হাতের স্পর্শে ঘুম ভাঙলো। মুখের কাছে সুন্দর একটা মুখ। মিত্রা এখানে কোথা থেকে এলো!
সম্বিত ফিরে পেলাম। না এ মিত্রা নয়। ঝিমলি। উঠে বসলাম।
বাবাঃ কিছু ঘুমতে পারেন।
হেসেফেললাম। কেন তুমি সারারাত জেগেছ নাকি।
তা নয়তো কি।
সত্যিতো একটা সমত্ত পুরুষের সঙ্গে এক কুপে একটা রাত কাটান সত্যি খুব টাফ।
টিজ করছেন।
একবারে না। তবু বুড়ো হাবড়া হলে কথা ছিল। তা নয় একটা সাতাস-আঠাশ বয়সের তরতাজা তরুন বলে কথা।
ঝিমলি মাথা নীচু করে আছে।
স্টেশনে এসে গেছি।
না।
আসছে, টিটি সাহেব বললেন।
তাহলে রেডি হতে হয়। তুমি রেডি।
আমি ঝিমলির দিকে তাকালাম। ঝিমলি রেডি হয়ে গেছে। কালরাতে যে পোষাকে দেখেছিলাম সেই পোষাক। মাথার মধ্যে আবার কেলাটা চাগিয়ে উঠলো।
আমি উঠে বসলাম। ঝিমলি আমার দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে। বোঝার চেষ্টা করছে। কাল রাতে কতটা আমি ওকে জেনেছি। না একেবারেই জানতে পারি নি।
আমার সঙ্গে এক হোটেলে থাকতে অসুবিধে আছে নাকি।
ঝিমলির চোখ দুটে চকচক করে উঠল না।
তাহলে একবার কথা বলে নিতে পারো বাড়ির লোকজনের সঙ্গে।
ঝিমলি ওর বাড়িতে ফোন করে ওর বাবার পারমিশন নিয়ে নিল। ট্রেন থামতে টিটি ভদ্রলোক এলেন আমাদের কুপে। আমরা তখন রেডি হয়েগেছি নামার জন্য। একজন ভদ্রলোক ওনার পেছনে এসে দাঁড়াল। জিজ্ঞাসা করল আমি অনি কিনা। আমি একটু অবাক হলাম। উনি বললেন আমি রামাকান্ত। অফিস থেকে আসছি।
আমি ওকে জিজ্ঞাসা করে জানলাম। ও আমাদের এখানকার অফিসের কর্মচারী। যাক একটা ঝামেলা চুকলো। ওকে সব ব্যাপারটা বলতে ও বলল ও সব জানে। আজ থেকে আমার সঙ্গেই ওর ডিউটি। যতোক্ষণনা আমি এখান থেকে যাচ্ছি। ঝিমলি আমার দিকে তাকিয়ে একটু মুচকি হাসল। রামাকান্ত বলল, স্যার আপনার লাগেজটা দিন। আমি গাড়িতে নিয়ে গিয়ে রাখছি। আমি আমার লাগেজ ওকে দিতেই, ও ঝিমলির লাগেজটাও তুলে নিল। ঝিমলি হাই হাই করে উঠল। আমি ওকে চোখের ঈশারায় বারন করলাম।

জীবনে জীবন যোগ না করলে ব্যার্থ হয় গানের পসরা

১৫

Re: কাজলদীঘি, শ্মশান ও পীরসাহেবের থান

ট্রেন থেকে নেমে টিট সাহেবকে বিদায় জানালাম। স্টেশনের বাইরে এসে দেখলাম। গাড়ি রেডি। আমি ঝিমলি পেছনের সিটে উঠে বসলাম। হোটেলে পৌঁছতে মিনিট দশেক লাগল। হোটেলে চেক ইন করে নিজের রুমে গেলাম। রমাকান্ত আমাদের সঙ্গেই আমাদের রুম পর্যন্ত এল। ঘরেরে মধ্যে লাগেজ রেখে আমাকে বলল স্যার, আমি এখন অফিসে যাচ্ছি। অফিসে খবর দিচ্ছি আপনি চলে এসেছেন। আমি আবার কখন আসবো ? আমি বললাম তুমি এখন যাও। বালচন্দ্রনকে বলবে আমাকে একবার ফোন করতে। আমি আমার ভিজিটিং কার্ডটা ওকে দিলাম। ও সেলাম ঠুকে চলে গেলো। এতোক্ষণ যা কথা হল সব ইংরাজিতে। ঝিমলি আমাকে দেখছিল। রমাকান্ত চলে যেতে আমাকে বললো, আপনি ভালো ইংরাজী বলেনতো। সাউন্ড এবং প্রোনাউনসেসন খুব সুন্দর।
কেনো তুমি পারো না।
পারি কিন্তু ইংরাজী বলার কিছু স্টাইল আছে সেটা মেন্টেইন করা বেশ টাফ।
প্রেকটিস বুঝলে ঝিমলি। তুমিও পারবে। মানুষের অসাধ্য কিছু নেই, যদি তুমি ভালবেসে সেই কাজটা কর।
হোটেলের ঘর দেখে আমার চক্ষু চড়কগাছ। এ তো হোটেল রুম নয়। একটা স্যুইট। বিগ-বসরা এলে ম্যানেজমেন্ট এই ধরনের বন্দোবস্ত করে থাকেন। আমার খুব জানতে ইচ্ছা করছিল। আমি কি তাহলে বিগ বস হয়ে গেছি ? কিন্তু কার কাছ থেকে জানবো। বড়মাকে একটা ফোন করলাম। জানিয়ে দিলাম। হোটেলে পৌঁছেছি। বিগ-বসকে যেন জানিয়ে দেয়। বড়মা জানাল বিগ-বস এরি মধ্যে জেনে গেছেন আমি হোটেলে পৌঁছে গেছি।  একটা ম্যাসেজ ঢুকলো দেখলাম। তানিয়ার কাল রাতে ফোন বন্ধ করে রাখার জন্য অভিমান।
ঝিমলি সোফায় গা এলিয়ে বসেছিল। ওর দিকে তাকাতেই দেখলাম চোখ নামিয়ে নিল। ওকে বেশ ক্লান্ত দেখাচ্ছে।
কি ভাবছ ? এ কোথায় এসে পড়লাম।
না।
তাহলে।
ভাবছি এতোটা সৌভাগ্য আমার কপালে লেখাছিল।
কিসের সৌভাগ্য।
এখানে এক্সাম দিতে এসে এরকম হোটেলে থাকব।
ধূস, যত সব আজে বাজে কথা।
নাগো অনিদা সত্যি বলছি। তোমার সঙ্গে দেখা না হলে আমার হয়তো অনেক কিছুই অজানা থেকে যেত।
আমারও ঠিক তাই। কি খাবে।
ফ্রেস হয়ে খাব।
ফ্রেস হবার আগে কিছু গরম গরম খেয়ে নাও। তারপর দেখবে ফ্রেস হতে দারুন মজা।
জানি এ অভিজ্ঞতা তোমার আছে। আমার কাল পরীক্ষা। একবার সিটটা কোথায় জানতে যেতে হবে।
তোমায় চিন্তা করতে হবে না। একটু পরেই বালচন্দ্রন আসবে। ও আমাদের এখানকার ব্যুর চিফ। ওকে বললেই সব ব্যবস্থা করে দেবে।
ঘরের বেলটা বেজে উঠল। লক ঘুরিয়ে খুলতেই একজন ওয়েটার এসে বলল। স্যার কফি আর কিছু স্ন্যাক্স নিয়ে আসি।
আমি ছেলেটির দিকে তাকালাম। তোমায় কে বলল আমাদের এই সময় এ গুলে লাগবে।
অফিস থেকে হুকুম আছে স্যার। আমার ওপর এই কামরার দেখভালের দায়িত্ব পরেছে।
ঝিমলি এককাত হয়ে সোফায় গা এলিয়ে দিয়েছে। ওর দিকে ছেলেটি একবার তাকাল। তাকানোই উচিত। আমি ওর জায়গায় থাকলে আমিও তাকাতাম।
ঠিক আছে যাও নিয়ে এস।
মনেহচ্ছে কোন অবস্থাপন্ন গেরস্থের ড্রইং রুমে বসে আছি। ঝিমলির দিকে তাকালাম।  ও এবার পাদুটে ওপরে তুলে টান টান হয়ে শুয়ে পরেছে। শরীরের চরাই উতরাই দেখলে সত্যি নেশা লেগে যায়। কালকের রাতের কথাটা মনে পরে গেল। সত্যি আমি খুব ভাগ্যবান। না হলে এরকম একটা মেয়ে আমার কপালেই বা জুটবে কেন।
নিজের ব্যাগ থেকে টাওয়েল আর একটা পাজামা পাঞ্জাবী বার করে নিলাম। আর সাবান শ্যাম্পু। ঝমলি চোখ বন্ধ করে পরে আছে। কাছে গিয়ে দেখলাম ঘুমিয়ে পরেছে। ওকে আর বিরক্ত করলাম না। ঘরটা ভাল করে ঘুরে ঘুরে দেখলাম। আবিষ্কার করলাম এই ঘরের ভতরেও আর একটা ঘর আছে। খুলে দেখলাম। ওইটা আরো সুন্দর। দেখে মনে হচ্ছে শোবার ঘর। পলঙ্ক দেখে এখুনি শুয়ে পরতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু না। ঝমলিকে সারপ্রাইজ দিতে হবে। সত্যি ভাগ্য করে জন্মেছিলাম। জানলার পর্দাটা একটু সরাতেই দেখলাম কাছেই একটা ছোট পাহারের মতো দেখাচ্ছে। কি দারুন দৃশ্য। সত্যি আমি ভাগ্যবান।
হ্যাঁ আজ বলছি আমি ভাগ্য করেই জন্মেছি। কিন্তু যেদিন গ্রাম থেকে শহরে পা রাখলাম। একটা অনাথ ছেলে। শুধু স্যারের একটা চিঠি সঙ্গে করে। আর পকেটে স্যারের দেওয়া কিছু টাকা। আসার সময় স্যার খালি বলেছিলেন। কলকাতায় যাচ্ছিস যা। জোয়ারের জলে ভেসে যাস না। নিজের কেরিয়ারটা তৈরি করিস।
স্কুলের ছাত্ররা বলতাম মনামাস্টার। নিঃসন্তান মনামাস্টার আমার কারিগর। স্যারের কাছেই শুনেছি। আমার বাবা তাঁর ঘনিষ্ট বন্ধু ছিলেন। তাই দুজনে পাশাপাশি বাড়ি করেছিলেন। জমিজমাও পাশাপাশি কিনতেন। একবছর বন্যায় আমাদের গ্রামে খুব কলেরা হয়েছিল। আমার বাবা-মা সেই সময় একসঙ্গে মারা যান। সেই থেকেই আমি গ্রামের ছেলে। তবে মনামাস্টারের বাড়িতেই বড় হয়েছি। আরো কতো কি যে হয়েছে। তা বলে শেষ করা যাবে না।
আগে বছরে একবার গ্রামে যেতাম। অন্নপূর্ণা পূজের সময়। আমাদের গ্রামে ঘটা করে এই পূজোটা হয়। তবে গত পাঁচ বছর আমি গ্রাম মুখো হই নি। আমার যা কিছু জমি-জিরেত সবি মনামাস্টারের হেপাজতে। ভিটেটা এখনো মনামাস্টার সারিয়ে শুরিয়ে রেখেছে। মাটির দেওয়াল এখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। বন্ধুরা এই অন্নপূর্ণা পূজোর সময় সবাই আসত। দেখা সাক্ষাৎ হত। ঐ দু’চারদিন বেশ ভাল লাগে। মা-বাবা কাউকেই মনে পরে না। আমি যখন কলকাতায় আসছি, মনা মাস্টার আমাকে একটা এ্যালবাম দিয়েছিলেন। জানিনা তোর সঙ্গে আমার আর দেখা হবে কিনা। এটা রাখ। এতে তুই তোর পরিবারকে জানতে পারবি।
সত্যি কথা বলতে কি গ্রামে থাকা কালীন, মা-বাবা কি জিনিষ জানতে পারি নি। অমিতাভদার বাড়িতে এসে বুঝতে পারলাম মা কি জিনিষ।
কোমল হাতের স্পর্শে চমকে উঠলাম। ঝিমলি পাশে দাঁড়িয়ে আছে। আমার মুখের দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে। হাসলাম। ঝিমলি বুঝতে পারল। আমার হাসির মধ্যে কোন প্রাণ নেই।
কি ভাবছিলে এত।
না।
লুকিয়ে যাচ্ছ।
আমার জন্য তোমার কোন অসুবিধে।
দূর পাগলি।
আমার কথায় ঝিমলি হো হো করে হেসে ফেলল।
আবার বলো।
কি।
ঐ যে বললে।
বার বার বললেও প্রথম বারের মতো মিষ্টি লাগবে না।
ঝিমলি আমার নাকটা ধরে ঝাঁকিয়ে দিল।
এই প্রথম ঝিমলি আমার শরীর স্পর্শ করলো।
বেলটা বেজে উঠল। ঝিমলি গিয়ে দরজা খুললো। ওয়েটার এসেছে। ট্রেতে অনেক কিছু সাজিয়ে নিয়ে।
স্যার ব্রেকফাস্ট কখন করবেন।
ঘন্টা খানেক বাদে একবার এসো।
স্যার রুম সার্ভিসের বেলটা একবার কাইন্ডলি বাজিয়ে দেবেন।
ঠিক আছে।
ওয়েটার চলে যেতেই, ঝিমলি ট্রেটা নিয়ে বসল। স্ন্যাক্স আর কফি। ঝিমলি নিজেই সব নিজে হাতে করলো। আমায় একটা কাপ এগিয়ে দিয়ে বললো, স্ন্যাক্স গুলো নিজে হাতে হাতে নাও। বেশ খিদেও পেয়েগেছিল। দুজনে গোগ্রাসে খেলাম।
কথাপ্রসঙ্গে জানতে পারলাম ঝিমলিরা দুই বোন। ছোট বোন এই বারে মাধ্যমিক দিয়েছে। ওরা থাকে গোলপার্কে। ওরা বেশ অবস্থাপন্ন পরিবার। ওর মা পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তথ্য-সংস্কৃতি দপ্তরের একজন বড় অফিসার। ঝিমলির কথামতো উনি আমাকে ভাল মতো চেনেন। তাছাড়া কাগজে আমার লেখাও পরেছেন।
ঝিমলি এখানে মেডিক্যাল পরার জন্য এক্সাম দিতে এসেছে। ওকে কালকের কথা বলতেই ওর মুখ চোখ রাঙা হয়ে উঠল। বললাম আমি হয়তো ভুল করেছি। ঝিমলি কিছুতেই সেই কথা স্বীকার করলো না। ব্যাপারটা এই রকম, এ রকম ঘটনা ঘটতেই পারে।
আমি ওর কথা শুনে একটু অবাক হলাম। ওকে বলার চেষ্টা করলাম। আমিই হয়তো অন্যায় কাজ করেছি। তোমাকে ওইভাবে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখেছি। ঝিমলি বললো, না অন্যায় নয় অনিদা। তুমি যদি মেয়ে হতে আমি যদি ছেলে হতাম, তাহলে আমিও এই ঘটনা ঘটাতাম। তবে তোমাকে আমার খুব ভাললাগছে। তুমি সড়াসরি আমাকে বলেফেললে। তাছাড়া আমরা এখন ফ্রি-সেক্স নিয়ে অনেক কথা বলি। কিন্তু কাজের বেলা দেখা যায় শূন্য। আমি আর কথা বারালাম না। ওকে বললাম। তুমি বাথরুমে  আগে যাবে না আমি যাব। ও বললো তুমি আগে সেরে নাও। তারপর আমি যাব।
আমি ওর সামনেই জামাটা খুলে ফেললাম। তারপর লজ্জাপেয়ে আবার পরতে গেলাম। ও হেসে ফেললো। এতগুলো ঘন্টা পার হবার পর এখনো লজ্জা যায় নি। আমি হেসে ফেললাম।
টাওয়েলটা কাঁধে নিয়ে বাথরুমে চলে গেলাম।।
মিনিট পনেরো পরে হাত দিয়ে চুলটা ঝারতে ঝারতে বেরিয়ে এলাম।
ঝিমলি একটা ছোট সর্টস পরেছে আর একটা সেন্ডো গেঞ্জি। আমি একঝলক ওর দিকে তাকিয়েই মাথা নীচু করলাম। এই পোষাকে ওর দিকে তাকান খুব মুস্কিল। চোখ সরিয়ে নিলাম।
তোমার একটা ফোন এসেছিল।
কে করেছিল।
নাম বলেনি। বললো অফিস থেকে বলছি।
ও।
আবার করবে বলেছে। আধঘন্টা পরে।
ঠিক আছে। আসতে না আসতেই কাজের তারা।
আমি আমার ব্যাগটা টেনে নিয়ে চেনটা খুললাম। পাজামা পাঞ্জাবী আর পরা যাবে না। ব্যাটারা হয়তো এখুনি এসে পড়বে। আমি একটা জিনসের প্যান্ট আর গেঞ্জি বার করলাম।
ঝিমলি বাথরুমে। দরজায় নক করার আওয়াজ। খুললাম। ব্রেকফাস্ট নিয়ে চলে এসেছে। আমি বললাম, সেন্টার টেবিলে রাখো। ছেলেটি সেন্টার টেবিলে রেখে চলে গেলো। আমি জামা পেন্ট পরে রেডি হয়ে গেলাম।
ঝিমলি বেরিয়ে এলো। টেবিলের ওপর খাবার দেখে বললো কি গো অনিদা এটা আবার কখন এলো।
এই তো।
ঝিমলি আমি একটু বেরিয়ে যাবো। তুমি একটু রেস্ট নাও তারপর বেরিয়ো। আমি অফিস থেকে গাড়ি পাঠিয়ে দেবো।
ঠিক আছে।
তোমার কোনো অসুবিধে হবে নাতো।
না না।
দুজনে একসঙ্গে খেলাম। আলুপরটা মাখন পনির স্যালড বেশ ভালো লাগলো। অফিসের গাড়ি চলে এলো ঠিক সময়ে। আমি বেরিয়ে গেলাম। রাতে আর ফিরতে পারলাম না। ঝিমলিকে জানিয়ে দিলাম। পরেরদিন ওকে নিয়ে ওর কলেজে পৌঁছে দিয়ে আমার কাজ সারলাম। বিকেলের ট্রেনে ঝিমলি ফিরলো।
ঝিমলি চলে গেল। এর পর কাজ আর কাজ। কাগজের অফিসে কাজ করা তো নয়। ঘন ঘন ফোন। নানা রকমের ফাই ফরমাস। আর কতো কি। যাক এই কদিনে চুটিয়ে কাজ করলাম। যাওয়ার দিন ঝিমলি ট্রেনে বসে একটা কথা বলেছিল। অনিদা আমি জীবনে এমন পুরুষ প্রথম পেলাম। যে হাতের কাছে সাজিয়ে দেওয়া খাবার দেখেও খেতে ইচ্ছে করলনা। তোমার প্রতি শ্রদ্ধায় আমার মাথা নত হয়ে আসছে। এই দুদিনে তোমার কাছ থেকে অনেক কিছু শিখলাম। একটা প্রণাম করব তোমায়।
আমি ওর হাতটা ধরে ফেললাম। না জীবনে বড় হতে গেলে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। আমি সেই ত্যাগ স্বীকারের ব্রত পালন করছি। তোমার মতো একজন আমার পরিচিতা আছেন। তবে আমি তাকে জীবনে পাব না। ওই আর কি। গলাটা কেমন ধরে এল।
ঝিমলি আমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল। আমি ওর মাথায় হাত দিলাম কেঁদো না। পারলে যোগাযোগ রেখো। তোমার মা-বাবার সঙ্গে আলাপ করার ইচ্ছে রইল। ঝিমলি আমাকে ওর মোবাইল নম্বরটা দিল।
সত্যি আমার দ্বারা যে এরকম কিছু হবার নয় তা আমি জানি। শৈশব কৈশোর কেটেছে গ্রামের পাঠশালা আর স্কুলে। এরপর কলকাতায় চলে আসি। কলেজ লাইফ আর ইউনিভার্সিটি লাইফ কেটেছে কলকাতায়। তারপর চাকরি জীবন। অনেকটা ভাসামানিকের মতো। আমি এখনো ভাসছি। ভেসে বেড়াচ্ছি।
গ্রামে উনামাস্টারের কাছে টিউসন পরতে যেতাম। আমাদের গ্রামের থেকে সেটা প্রায় ২ মাইল দূরে। প্রত্যেক দিন হেঁটে যাওয়া আসা করতে হতো। আমাদের গ্রাম থেকে আমরা দুজন যেতাম আমি আর ভানু। ভানু চারবার ফেল করে এখন আমার সঙ্গে একসঙ্গে মাধ্যমিক দেবে। স্বভাবতই ও আমার বস। আমার থেকে অনেক কিছু ও বেশি জানে। তাছাড়া বিড়ি খায়। বাবার বিড়ির বান্ডিল থেকে প্রত্যেক দিন ও দু-তিনটে করে বিড়ি গেঁড়াবেই গেঁড়াবে। আর আমাদের বন্ধুদের সামনে এমন করে খাবে যে আমরাও ওর কথাবার্তায় মহিত হয়ে যেতাম। ও আমাদের দলের পালের গোদা।
আমি মাঝে মাঝে ওর ফাই ফরমাস খাটতাম। মনামাস্টার আমার গার্জেন। মাঝে মাঝে আমাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে গিয়ে বলতো, ভানুর সঙ্গে বেশি মিসিস না। ছেলেটা ভালো নয়। আমি মাথা নীচু করে থাকতাম।
সেদিন উনামাস্টারের কাছে পরতে যাওয়ার কথা। সকাল ৬ টার সময়। আমি রেডি হয়ে ভানুর বাড়িতে গেছি। ভানুর মা বলল, ভানু চলে গেছে। অগত্যা আমি একা একাই গেলাম উনামাস্টারের কাছে। গিয়ে দেখি সকলেই এসেছে। কিন্তু ভানু নেই। কেমন যেন লাগলো। সৌমিলি আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে পূর্ণিমাকে বললো, পুনি দেখ বাবু আজ একা একা জোরিদার নেই। আমি এমনিতে খুব কম কথা বলি। মেয়েদের সঙ্গে তো কথাই বলতাম না। ওদের দিকে তাকালাম। ওরা এমন ভাবে আমাকে চোখ মারলো যে আমার বুকটা কেঁপে উঠলো। উনামাস্টার আমার দিকে তাকাল। আর একটা হনুমান গেল কোথায় অনি। আমি মাথা নীচু করে বললাম জানিনা।
মিথ্যা কথা বলছিস।
না। সত্যি বলছি। ভানুর মা বললো ও আমার আগে চলে এসেছে।
ও। দেখ গিয়ে কার বাড়ির আঁখ খেতে ধ্বংস করছে।
গুডবয় বলে আমার একটা সুনাম ছিল। তাই মাঝে মাঝে পাল্লায় পরে দোষ করলেও সাতখুন মাপ। অনি এটা করতেই পারে না।
পড়তে পড়তে অনেক দেরি হয়ে গেলো। বইখাতা গুছিয়ে বেরোতেই দেখি বাঁশঝারের কাছে পুকুর পারে সৌমি আর পুনি দাঁড়িয়ে আছে। কাছে আসতেই সৌমি বললো, কোন দিক দিয়ে যাবি অনি।
দীঘাআড়ি দিয়ে যাব।
দীঘাআড়ি!
আমাদের দুটো গ্রামের মাঝে একটা বিরাট ঝিল। মাঝে মাঝে আমি একা একা ওখানে গিয়ে বসি। কতো পাখি আসে ওই ঝিলে। আমি বসে বসে দেখি। চারিদিকে গাছ গাছ আর গাছ। জঙ্গলে ভর্তি। উনামাস্টারের বাড়ি থেকে বেরিয়ে প্রথমে পরবে বীরকটার শিবমাড়ো। একটু এগোলেই পুরীকুন্ডী শ্মশান। শ্মশানকে বাঁহাতে রেখে এগিয়ে গেলে কামার ঘর। তারপর বড়বিল রামপুরার বাঁধে উঠে বাঁধ বরাবর দীঘাআড়ি। লোকে ভয়ে ওই পাশে যায় না। বলে ওখানে নাকি ভূতেরা খেলা করে। আমি বহু দিন একা একা ওই খানে গিয়ে বসেছি। কিন্তু ভূত দেখতে পাই নি। তাই আমাকে অনেকে সাহসী বলেও ডাকে। বাড়ির সকলে জানে কোথাও না পেলেও অনিকে দীঘাআড়িতে পাওয়া যাবেই। আমাদের গ্রামে যারা মারা যান। তাদের ওই শ্মশানে পোড়ান হয়। আমার মা-বাবাকেও ওখানে পোড়ান হয়েছিল।
বোঁচকুল খাবি। পুনি বললো।
না।
আমাদের সঙ্গে আজ বাঁধে বাঁধে চল না।
অনেক ঘোরা হয়ে যাবে।
তাতে কি হয়েছে ? একসঙ্গে গল্প করতে করতে যাবো।
ওরা থাকে আমাদের গ্রামের পশ্চিম পাশে মানিকড়া বলে একটা গ্রামে। ওই গ্রামের সকলেই বেশ পয়সা ওয়ালা লোক। সৌমি আগে আমি মাঝখানে পুনি পেছনে। হাঁটতে হাঁটতে ওরা আমাকে নিয়ে হাসি ঠাট্টা করছিল। তুই একটা গবেট বুঝলি আনি।
কেনো।
তুই মেয়েদের সঙ্গে কথা বলতে জানিস না।
আমি চুপ করে থাকলাম।
ভানুকে দেখেছিস, আজকে একটা মেয়েকে পটাচ্ছে। আবার কালকে আর একটা মেয়েকে পটাচ্ছে। আর তুই ওর সঙ্গে থেকে কি শিখলি।
ভানু ভালছেলে।
এঃ । ভানুর কলাটা দেখেছিস।
ভানু কি কলাগাছ যে ওর কলা থাকবে।
হি হি হি তুই সত্যি একটা গাধা।
যা তোদের সঙ্গে আমি যাবনা। আমি ফিরে দাঁড়ালাম।
পুনি, সৌমি দুজনে আমার দুহাত ধরলো।
আচ্ছা আচ্ছা তোকে গাধা বলবো না। কিন্তু গাধী বললে রাগ করবি না।
আমি সৌমির দিকে তাকালাম। ওর চোখের ভাষা সেইদিন সেই বয়সে বুঝতে পারি নি। কিন্তু ছবির মতো আমার চোখে আজও চিপকে আছে। এখন এই ভরা যৌবনে আমি চোখ বন্ধ করে একমনে চিন্তা করলেই সেই চোখ দেখতে পাই। ভাষাও বুঝতে পারি।
তিনজনে হাঁটতে হাঁটতে একেবারে গ্রামের শেষ প্রান্তে এলাম। সামনের বড়ো মাঠটাকে কাশিঘরের ডাঙা বলে। এখন ওটা সবুজ। সবে মাত্র রোয়া শেষ হয়ে গাছগুলো সামান্য বেড়ে উঠেছে। ওটা পেরলেই সৌমিদের বাড়ি। আর আমাকে ডানদিক দিয়ে আবার ছিনার বাঁধে বাঁধে কিছুটা হেঁটে নদী পেরিয়ে আসতে হবে।
সামনে বিশাল বাঁশ বন। এই দিনের বেলাতেও সেখানে শেয়ালের আনাগোনা।
এই পুনি তুই বলনা অনিকে।
আমি ! না না তুই বল।
কেন আমি কি শুধু একা ভাগ নেবো ? তুই নিবি না।

জীবনে জীবন যোগ না করলে ব্যার্থ হয় গানের পসরা

১৬

Re: কাজলদীঘি, শ্মশান ও পীরসাহেবের থান

আমিতো ওকে রাজি করিয়ে নিয়ে এলাম এপাশ দিয়ে আসার জন্য তুই এবার বল।
আমি ওদের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। কি বলছে ঠিক মাথায় ঢুকছে না। ওরা আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে। আমরা এখন বাঁশ বনের ভেতরে। চারিদিকে বাঁশ গাছ ছাড়াও অনেক গাছ আছে। তাল তমাল শিরিষ সেগুন বট অশ্বত্থ আরো কত কি।
ওই কোনের ঢেকটাতে একটা বড় জামরুল গাছ আছে। আমরা দঙ্গল বেঁধে জামরুল খেতে আসি। হাওয়ার স্পর্শে বাঁশ গাছগুলো একপাশ থেকে আর এক পাশে হেলে যাচ্ছে। ঘসা লেগে কেঁচর কেঁচর করে একটা আওয়াজ। আমি প্রায়ই একা থাকলে এরকম নির্জনে চলে আসি। ঘন্টার পর ঘন্টা একলা বসে থাকি। ভীষণ ভাল লাগে।
এই আওয়াজ শুনতে শুনতে মনে হয় বাঁশ গাছ গুলো যেন একে অপরের সঙ্গে গায়ে গা লাগিয়ে কথা বলছে। আমরা কেউই ওদের শব্দ-স্পর্শ-গন্ধ বুঝি না। কিন্তু ওরা ওদের ভাষা বোঝে। আমি ওপরের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। একফালি সূর্যের আলো ফাঁক ফোকর দিয়ে নিচে আসার জন্য অবিরাম চেষ্টা করছে। কিন্তু আর একটা গাছ তাকে কিছুতেই নিচে আসতে দেবে না। এ যেন আলো ছায়ার খেলা। আমি নিজের মধ্যে নিজে যেন হারিয়ে গেলাম।
অনি।
সৌমিলির গলা শুনে চোখ নামাতেই দেখি দুজনের কেউ নেই। একটু ভয় পেয়ে গেলাম।
অনি।
এদিক ওদিক তাকালাম। না কেউ কোথাও নেই।
অনি।
এবার বুঝতে পারলাম। ঐ বাঁশ ঝারটার পেছন থেকে আওয়াজ আসছে।
কি হলো তোরা ওখানে কি করছিস ? যাবি না। আমার কিন্তু ভীষন দেরি হয়ে যাচ্ছে। মনাকাকা বকবে।
একবার এদিকে আয় একটা জিনিষ দেখাবো।
আমি একটা হেলে পরা বাঁশের তলা দিয়ে মাথাটা নীচু করে ওপাশে গেলাম।
কোথায়!
এইতো এখানে আয়।
আমি কাছে যেতেই অবাক হয়ে গেলাম। একটু ভয়ও পেয়ে গেলাম। পুনি সৌমি দুজনেই উলঙ্গ অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে।
করবি।
আমি ভয় পেয়ে গেলাম। সেই যে ওখান থেকে দৌড় লাগালাম সোজা চলে এলাম দীঘাআড়ি। দীঘির পারে বইখাতা রেখে ঝিলের জলে চোখ মুখ ধুলাম। পেট ভর্তি করে জল খেলাম। তারপর আমার পরিচিত সেই ঝোপটার কাছে গিয়ে বসলাম। সরাল পাখি গুলো একবার দীঘির জলে ডুব মারছে আবার ভেসে উঠছে। সামনেই কোথাও একটা ঘু ঘু পাখি ডাকছে। ঝিঁ ঝিঁ পোকার একটানা ঝিঁ ঝিঁ শব্দ। আমি আবার অন্যমনস্ক হয়ে গেলাম।
মা-বাবা থাকলে হয়তো আমার জীবনটা একটু অন্য ভাবে কাটতো কিন্তু কি করা যাবে। সবার ভাগ্যে সব কিছু জোটেনা আমারও তাই।
হঠাৎ একটা মেয়ের খিল খিল শব্দে চমকে উঠলাম। এদিক ওদিক তাকালাম। না কেউ কোথাও নেই। তারপর ভানুর গলার শব্দ।
আমি পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম । ঝোপের আরালে ভানু আর কালীচরনের ঝি।
কালীচরন আমাদের বাড়ির খামারের ওপারে একটা টং করে রয়েছে। এই সময় ওরা আসে মাঠে কাজ করার জন্য। আবার মাঠের কাজ শেষ হলে চলে যায়।
কালীচরন সাঁওতাল। ওর মেয়ের নাম ময়না। ময়না ভানুর কাছ ঘেঁয়ে বসে আছে। উদম গায়ে একটা বারো হাত কাপর কোন প্রকারে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে পরে আছে। কতো বয়স হবে আমাদেরি মতো। সতেরো আঠারো শরীরটা যেন পাথরে কুঁদে তৈরি করা। যেমন মিশ কালো তেমনি তার গ্লেজ। আমার যে ময়নাকে ভাল লাগত না তা নয়। তবে ভাল লাগলেও বা করব কি। আমি চেষ্টা করেও কখনো ভানুর মতো হতে পারবনা। তাছাড়া আমার মনামাস্টার আছে। আমার গার্জেন। আমি বাপ-মা মরা ছেলে। আমাকে শাসন করার প্রচুর লোক। আমার অনেক প্রতিবন্ধকতা। তাই সব ইচ্ছে গুলো বুকের মধ্যে গলা টিপে মরে ফেলতাম। মনে পরে গেল সৌমি আর পুনির ব্যাপারটা। ওরা ওই ভাবে নেংটো হয়ে আমার সামনে এলো। আর আমি দৌড়ে চলে এলাম।
তুই এতো জোরে চাপিস কেনো।
ভালো লাগে।
আবার ওদের দিকে চোখ পরে গেলো।
ভানুর শরীরে শরীর ঠেকিয়ে ময়না বসে আছে। বুক থেকে কাপরটা খসে পরেছে।
ময়না বলে উঠল, বুদতি পালিছি বুদতি পালিছি.....।
ভানু হাসল, তুই বুঝতে পেরেছিস।
হ।
তাহলে কাপরটা....।
না।
কেন।
কি দিবি।
বিকেলে হাটে তোকে ছোলার পাটালি কিনে দেব। আর মনিহারির দোকান থেকে একটা লাল ফিতে কিনে দেবো।
দিবি তো।
হ্যাঁ।
আগের বার দিলিনি।
এবার তোকে ঠিক দেবো।
আমাকে তাড়াতারি যেতে হবে। ভাত নিয়ে মাঠে আস্তে হবে।
ভানু ময়নার কানের লতিতে জিভ দিল। ময়না নড়ে চড়ে উঠল।
কেউ যদি এসে পরে।
কে আসবে এখন।
তোর ওই বন্ধুটা।
অনি।
হ।
ওতো পড়তে গেছে।
তুই যাস নাই।
না।
কেনো।
তোকে আজ খুব আদর করতে ইচ্ছে করছিল। তাই ওইখানে গিয়ে বসেছিলাম। জানি তুই আসবি।
তোর খালি নষ্টামি। এসব করা ভাল লয়।
কে বলল তোকে।
মা বলছে।
তোকে আমার ভাল লাগে।
ভানু ময়নার গালে একটা চুমু খেলো। তারপর....আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। আমি প্রায় আধঘন্টা ধরে সব দেখলাম। এটাই তবে সেক্স। বন্ধুরা অনেক গল্প করতো। কিন্তু আমি ঠিক আমল দিতাম না। মাঝে মাঝে অন্ধকার ঘরে উলঙ্গ হয়ে ছোট আয়নাটা নিয়ে নিজেই নিজেকে দেখতাম। ভাল লাগত।
আমি বহু দিন ওদের দীঘাআড়ির এই জায়গাটায় দেখেছি। কিন্তু কোন দিন ওরা আমাকে দেখতে পায় নি। তারপর একদিন ভানুকে ব্ল্যাকমেল করলাম। ভানু আমার হাতে-পায়ে ধরে। আমি খালি ওকে বলেছিলাম, আমি যা বলবো তোকে তাই করতে হবে। ও রাজি হয়ে গেল। তারপর থেকে ভানু দাদা। তবে আমি ওর দাদা।


দেখতে দেখতে ১৫টা দিন যে কোথা দিয় কেটে গেল ঠিক বুঝতে পারলাম না। বড়মা এর মধ্যে দু’তিনবার ফোন করেছিলেন। ছোটমাও। অমিতাভদা রেগুলার সকালে একবার বিকেলে একবার ফোন করতেন। মল্লিকদাও। তনু মাঝে কয়েকবার ফোন করেছিল ঠিক, তবে ওর কথাবার্তা শুনে কেমন যেন একটু খটকা লাগলো। বললাম ঠিক আছে কলকাতায় গিয়ে সব শুনবো।
আসার সময় আমাকে প্লেনের টিকিট ধরানো হলো। কলকাতর অফিসে আমার জরুরি দরকার আছে তাই। এয়ারপোর্টে ঢোকার আগে বড়মার ফোন পেলাম। কন্ঠে উতকন্ঠা। আমাকে বললেন, তুই এখন কোথায়।
আমি বললাম এই নামবো মিনিট পনেরর মধ্যে।
ঠিক আছে। প্রথমে একবার এ বাড়িতে আসিস।
একটু ভয় পেয় গেলাম, বললাম কেনো!
আয়না এলে জানতে পারবি।
তুমি আগে বলো, দাদার কিছু হয়েছে!
নারে না।
তাহলে!
তোর জন্য আমি ছোট সকাল থেকে রান্না চাপিয়েছি। তুই এলে একসঙ্গে খাওয়া হবে।
সত্যিকথা বলো, তাহলে যাবো। নাহলে যাবো না। যেমন বিকেল বেলা যাই তেমন যাবো।
না তুই এখুনি আসবি।
ঠিক আছে।
বুঝলাম গুরুতর একটা কিছু হয়েছে। যার জন্য বড়মার তলব। এয়ারপোর্টে নেমে অনেক পরিচিত মুখের দেখা পেলাম। কাজের তাগিদে এখানে প্রায় আসতে হয়। তাছাড়া সাংবাদিক মানুষ তাই একটু আধটু খাতির আছেই। তাছাড় কলকাতা মার্কেটে আমার পরিচিতি খুব একটা খারাপ নয়। সমীরনদা কলকাতারই একটা অন্য কাগজের এয়ারপোর্ট সংবাদদাতা। আমাকে দেখে বললো, কোথায় ছিলে বাপ কদিন দেখা সাক্ষাত হয় নি। বললাম কোথায় গেছিলাম, একটু অবাক হয়ে বললেন করেছিস কি, সম্পূর্ণটা তুই একলা করেছিস!
হ্যাঁ।
চল একটু ক্যান্টিনে যাই কফি খাব। তোর কোন তড়াহুরো নেই তো ?
এই তো সবে কলকাতায় নামলাম।
সমীরনদা হাসল। আমি  তোর সমস্ত নিউজগুলো পরেছি। দারুন লিখেছিস। তোর স্পেকুলেসন সব মিলে গেছে।
হ্যাঁ, আজকে রেজাল্ট। আমি তো সকালের ফ্লাইটে বেরিয়েছিলাম, দিল্লী হয়ে আসছি। সকাল থেকে কাগজটা দেখা হয় নি।
তাই।
সমীরনদা ব্যাগথেকে ওদের হাউসের কাগজ আর আমাদের হাউসের কাগজটা বার করলেন। আমি ওপর ওপর একবার চোখ বোলালাম। কফি আর চিকেন পকোরা এলো। সকাল থেকে কিছু পেটে পরে নি। খিদেও পেয়েছিল। কয়েকটা চিকেন পাকোরা গলধোকরণ করে, কফি মুখে দিলাম। অমৃতের মতো লাগলো। সমীরনদা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছেন।
তারপর কলকাতার হাল হকিকত বলো।
যেমন ছিল তেমনি আছে।
তাপস এলো হাঁপাতে হাঁপাতে।
তুমি এখানে। তাপস আমাদের হাউসের একজন গাড়ির ড্রাইভার।
হ্যাঁ।
তোমাকে খুঁজতে খুঁজতে হয়রান হয়ে গেলাম।
কেনো তুই আসবি আমাকে কেউ বলে নি।
আমার কি আসার ঠিক ছিলো। এইতো ঘন্টা খানেক আগে বললো।
ও।
কেনো কি হয়েছে।
তোমাকে অফিসে ফেলেই আবার রাইটার্সে যেতে হবে।
আমি তো এখন অফিসে যাব না।
যা বাবা! সুনিতদা বললো তোমাকে নিয়ে অফিসে যেতে।
দাদা কোথায়।
দাদাতো কয়েকদিন হল অফিসে আসছেন না।
মল্লিকদা।
মল্লিকদাও আসছেন না।
আমি তাপসের দিকে তাকালাম। সমীরনদা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। কিছু পরার চেষ্টা করছে।
ঠিক আছে, তুমি কফি খাবে।
না।
গাড়ি কোথায় রেখেছো।
পার্কিংয়ে।
ঠিক আছে, তুমি যাও আমি আসছি। বুঝলাম কিছু একটা গড়বর হয়েছে। নাহলে কাগজের দুই স্তম্ভ নেই। কাগজ বেরিয়ে যাচ্ছে। আমার একটু অবাক লাগলো। ঘরের কথা বাইরে প্রকাশ করতে নেই। সমীরনদা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বসে আছে। কিছু একটা বোঝার চেষ্টা করছে। সমীরনদা ওর হাউসে একটা ভাল জায়গায় আছে।
কিরে কি ভাবছিস।
না তেমন কিছু নয়। পনেরো দিন ছিলাম না।
হ্যাঁ তোদের হাউসে বেশ গন্ডগোল চলছে।
তাই। সে তো আমাদের হাউসে লবিবাজি আছেই। ঠিক আছে দাদা, আজ আসি কাল দেখা হবে।
সমীরনদার কাছে বিদায় নিয়ে লাউঞ্জপেরিয়ে গেটের বাইরে এলাম। তাপস আমার জন্য অপেক্ষা করছিল।
কি ঠিক করলে।
আরে অফিস গাড়ি পাঠিয়ছে। আগে অফিসে যাই তারপর দেখা যাবে।
মনে হচ্ছে ঝড়ের একটা পূর্বাভাস দেখতে পাচ্ছি। তাপস আমাকে অফিসে লিফ্ট করেই ওর কাজে চলে গেল। আমি আমার লাগেজটা রিসেপসন কাউন্টারে রেখে সোজা লিফ্টের কাছে চলে এলাম। সবাই কেমন ইতি উতি তাকাচ্ছে। ভারি অবাক লাগল। আমি ওপরে এসে সোজা নিউজরুমে চলে গেলাম। সন্দীপনের সঙ্গে দেখা হল।
কখন এলি।
এইতো এই মাত্র।
শুনেছিস কিছু।
কি বলতো।
অফিসের হাল চাল।
না।
কথা বলতে বলতে নিজের টেবিলে এলাম। মল্লিকদার চেয়ারটা ফাঁকা পরে আছে। অপরজিটের চেয়ারে কয়েকজন নতুন ছেলে মেয়েকে দেখলাম। দু’একটা ভাল চামকিও চোখে পরলো। আমি আমার টেবিলে গিয়ে বসলাম। সন্দীপ আমার পাশে বসলো। টেবিলের ওপর রাশিকৃত চিঠি। নিউজরুম এখন বেশ হাল্কা। অনেকে এসে এখনো পৌঁছয় নি। সন্দীপ আমার দিকে তাকিয়ে বসেছিল। আমি চিঠি গুলো একবার দেখলাম। কয়েকটা চিঠি পরিচিত জনের। বাকি আমার লেখার ওপর। এগুলো চিঠিপত্র বিভাগে পাঠিয়ে দিতে হবে। আমি সন্দীপের দিকে তাকালাম। সন্দীপ বললো চল একটু ক্যান্টিনে যাই।
চল।
আমি আর সন্দীপ ক্যান্টিনে এলাম।
বটাদাকে ডেকে ডিমটোস্ট আর চায়ের কথা বললাম। সন্দীপের দিকে তাকিয়ে বললাম, বল কি বলছিলি।
আমার চাকরিটা মনে হয় গেলো।
কেনো।
তুই কিছুই জানিস না।
না।
দাদা তোকে কিছু বলে নি।
না।
তুই কলকাতায় কবে এসেছিস।
কতবার বলবো। ঘন্টাখানেক হবে। তাপস গেছিল আনতে, বললো সুনিতদা অফিসে আসতে বলেছে।
ও।
কেনোরে ?
যা তাহলে সব জানতে পারবি।
কেন কি হয়েছে বলনা।
ফোনটা বেজে উঠলো। বড়মার ফোন।
হ্যালো বলতেই অমিতাভদার গলা পেলাম। মাথা ঠান্ডা রাখিস।
তুমি! বড়মা কোথায় ?
বড়মা রান্নাঘরে।
তোমার ফোন কোথায়।
ব্যবহার করছি না।
ও।
তা হঠাত মাথা ঠান্ডা রাখব কেন।
সন্দীপ আছে শুনে নে।
অফিসে আসনি কেনো।
সে অনেক কথা।
আমি এখানে এটা কে বললো।
খবর এলো।
বাবাঃ নেট-ওয়ার্ক তো বেশ স্ট্রং, তাহলে এই অবস্থা কেনো।
কপাল।
সাংবাদিকতা করতে করতে চুল পাকিয়ে ফেললে। এখন এই কথা বললে হবে।
সে তুই যা বলিস।
মল্লিকদা কোথায়।
বাড়িতে। তুই কখন আসছিস।
দেখি। কাজ শেষ হলেই চলে যাব।
ফোনটা পকেটে রাখলাম। হ্যাঁ কি বলছিলি।
ক্রমশঃ

জীবনে জীবন যোগ না করলে ব্যার্থ হয় গানের পসরা

১৭ সর্বশেষ সম্পাদনা করেছেন mamonjafran (০১-০১-২০০৯ ২০:৩৪)

Re: কাজলদীঘি, শ্মশান ও পীরসাহেবের থান

জুয়েল লিখেছেন:

মামুন জাফরান ভাই আপনাকে বরন করে নেয়ার সুযোগই তো দিলেন না। tongue_smile

নিজের জীবনের আত্মকাহিনী কি আর কয়েক পাতায় শেষ হয়, আপনি মনে হয় পুরো বই ছাপানোর ব্যাবস্থা করতে পারেন, অথবা অনলাইনে ই-বুক;)। সবাই তো দেখছি পছন্দ করছে আপনার লেখা। cool

জাফরান ভাই, ফোরামে লেখাগুলো দেয়ার জন্য ধন্যবাদ, তবে একসাথে এতো বড় লেখা পড়তে একটু কষ্টই হবে। আপনি বরং পর্ব করে দিন, অথবা একেকদিন এখানেই পোষ্ট আকারে দিতে পারেন। আপনাকে প্রজন্ম ফোরামে স্বাগতম। smile

জুয়েল সাহেব আপনার নামের তলায় একটা জিনিষ দেখলাম প্রজন্ম গুরু। তারমানে আপনি আমারও গুরু।
গুরুকে প্রণাম।
লেখার সুযোগ পেয়ে লোভ সামলাতে পারলাম না। তাই মনের রং মিশিয়ে কথা দিয়ে ছবি আঁকছি। আপনাদের ভালো লাগলে আবশ্যই আমার ভালো লাগবে। তবে এর জন্য আমি মাইক্রোকাতার ভাই-এর কাছে কৃতজ্ঞ তাঁর কথায় আমি এই ফোরামের খোঁজ পেয়েছিলাম।
আমাকে আপনারা বরণ করে নিয়েছেন এটা আমার সৌভাগ্য। আমি চেষ্টা করবো তার মর্যাদা রাখার।

জীবনে জীবন যোগ না করলে ব্যার্থ হয় গানের পসরা

১৮

Re: কাজলদীঘি, শ্মশান ও পীরসাহেবের থান

আমার এই লেখার পাঠক পাঠিকারা যারা এই লেখার শেষ অংশ খুব তাড়াতাড়ি পরতে চান তাঁরা http://www.bengalilibrary.org/index.php … ;Itemid=10 এই সাইটের creative corner-এ ঘাই মারতে পারেন।

জীবনে জীবন যোগ না করলে ব্যার্থ হয় গানের পসরা

১৯

Re: কাজলদীঘি, শ্মশান ও পীরসাহেবের থান

পুরো লিখাটা পড়ে তারপর নাহয় বড় comment লিখবো smile এতদুর পর্যন্ত তো অনেক ভালই লাগছে । নাইকা দেখি ৩ টা হয়ে গেল thinking তাড়াতাড়ি পরের লিখা দিন। অফিসের ঘটনা জানতে ইচ্ছে করছে big_smile

"I know not with what weapons World War III will be fought, but World War IV
will be fought with sticks and stones."
    -Albert Einstein

২০

Re: কাজলদীঘি, শ্মশান ও পীরসাহেবের থান

আমার চাকরিটা মনে হয় যাবে।
কেনো।
সুনিতদা এখন পাওয়ারে।
তাতে কি হয়েছে।
তুই সত্যি একটা গা.....।
হেসে ফেললাম।
হাসিস না। তোর ওই হাসিটা দেখলে গা জলে যায়।
আচ্ছা আচ্ছা হাসবনা।
তোর চাকরিটা থাকবে।
যাক তাহলে রক্ষে।
অমিতাভদা এবং মল্লিকদাকে এখন ছুটিতে যেতে বলা হয়েছে।
তাই। এককেবারে ছুটি।
ন্যাকামো করিস না। অমিতাভদার ঘরে এখন সুনিতদা বসছেন।
ও তাহলে এডিটর।
ওই রকমি বলতে পারিস। এখনো খাতা কলমে নয়। তবে বকলমে কাজ চালাচ্ছে।
ও।
সব নতুন নতুন ছেলে মেয়ে আমদানি করেছে।
বেশ ভালোতো।
সন্দীপ কট কট করে আমার দিকে তাকালো। একজন উর্দিপরা ভদ্রোলোক এসে বললেন, আপনাকে সুনিতবাবু ডাকছেন।
ভদ্রলোকের মুখের দিকে তাকালাম। উনি চলে গেলেন। সন্দীপের দিকে তাকালাম।
এখন অনেক সিকুরিটি গার্ড এসেছে। এরাই এখন অফিসের দেখভাল করে।
হরিদা নেই এখন।
না।  অমিতাভদা যেদিন থেকে আসা বন্ধ করেছেন, হরিদাকে প্রেসে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।
ওখানে কি করছে।
কাগজ বইছে।
ওই বুড়ো মানুষটা কাগজ বইছে।
হ্যাঁ। না হলে কাজ থেকে ছুটি নিতে বলা হয়েছে। বেচারা।
আমি অবাক হয়ে সন্দীপের কথা শুনছিলাম। বাকিটা নিজে নিজেই আঁচ করে নিচ্ছিলাম। এই অফিসের মালকিন আমার পূর্ব পরিচিত এটা এখানকার কেউ জানে না। একমাত্র অমিতাভদা, মল্লিকদা ছাড়া। তবে মল্লিকদার স্ত্রীই যে আমার ছোটমা আর অমিতাভদার স্ত্রী আমার বড়মা এটা সংঘমিত্রা জানে না। তারমানে অনেক জল এই পনেরো দিনে গড়িয়ে গেছে। এই বয়সে এত লাঞ্ছনা গঞ্জনা সহ্যকরেও ওরা কেউ কোন কথা বলে নি। খালি আমার ফিরে আসার অপেক্ষা করেছে। এই বয়সে এটা ওদের প্রাপ্য ছিল না। আমি নিজে খুব ভালকরে জানি এই কাগজটাকে আজ কলকাতায় শীর্ষে তোলার জন্য ওরা কি না করেছে।
কি ভাবছিস।
না কিছু না। চল ওঠা যাক। নতুন সাহেবের সঙ্গে কোথায় দেখা করবো।
অমিতাভদার ঘরে।
ক্যান্টিন থেকে সোজা নীচে চলে এলাম। এডিটর রুমে ঢোকার মুখে দেখলাম একজন সিকুরিটি গার্ডের মতোন লোক দাঁড়িয়ে আছে। ঢুকতে যেতেই আমাকে বাধা দিলেন। কি প্রয়োজন জিজ্ঞাসা করলেন। তারপর বললেন, ওই খানে গিয়ে স্লিপ করতে। দেখলাম, নিচে যে রিসেপসনিস্ট ভদ্রমহিলা বসতেন তিনি বসে আছেন। কাদের সঙ্গে যেন কথা বলছেন। আমি বাধ্যে ছেলের মতোন সেখানে গেলাম, আমাকে দেখেই ভদ্র মহিলা মুচকি হেসে বলে উঠলেন আরে অনিবাবু যে, কি দরকার।
এডিটর সাহেবের সঙ্গে দেখা করবো।
ওঃ এই সিকুরিটিটাকে নিয়ে পারা যাবে না। সবাইকে আমার কাছে পাঠিয়ে দিচ্ছে দেখুন তো।
কি আর করা যাবে, ও তো আর আমাকে চেনে না।
চিনবে না কেনো। আপনি এই হাউসের স্টাফ।
আজ আমাকে প্রথম দেখছে।
ঠিক আছে চলুন আমি বলে দিচ্ছি।
না না আপনি একটা স্লিপ লিখে পাঠিয়ে দিন।
না না এটা হয় না।
কেনো হয়না, যেটা অফিসের ডেকোরাম সেটা তো মানতে হবেই।
ভদ্রমহিলা আমার মুখের দিকে তাকালেন। কি যেন ভাবলেন। হয়তো শেষের কয়টা কথা বেশ কঠিন হয়েগেছিল। খুব খলবলি ভদ্রমহিলা। আমি খুব একটা পাত্তা দিই না। তবে অফিসের অনেকেই ওকে পাত্তা দেয়। দেখতে শুনতেও খারাপ নয়। ভেতরে গিয়ে ইন্টারকমে একটা ফোন করতেই আমার যাবার ডাক এলো।
দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলাম। দেখলাম সুনীতদা তার দলবল নিয়ে বসে আছেন। আমাকে আসতে দেখেই বললেন , আয় আয়। আমি একটা চেয়ার নিয়ে বসলাম। সুনীতদা বললেন, বল কেমন আছিস।
ভাল।
চা খাবি।
না। ক্যান্টিন থেকেই আসছি।
তোর সঙ্গে একটা জরুরি কথা ছিল।
বলো।
তুই আজ সবে মাত্র ফিরলি।
তাতে কি হয়েছে। এয়ারপোর্টে গাড়ি পাঠালে.....।
না মানে। তোকে আমি চেন্নাই-এর ব্যুরো চিফ করেছি।
কার অনুমতি নিয়ে।
আমিই ঠিক করেছি। তবে ম্যানেজমেন্ট সেটায় সায় দিয়েছে।
আজকাল কি তুমি এসব ঠিক করছ নাকি।
না ম্যানেজমেন্ট গত সপ্তাহে আমাকে দায়িত্ব তুলে দিয়েছে।
আমাকে কেউ এখনো জানায় নি।
এই তো, আমি জানাচ্ছি।
সুনিতদা জানে আমার মতো খারুয়া ছেলে এই হাউসে একটাও নেই। মাঝে মাঝে অমিতাভদা পর্যন্ত ফেল মেরে যেতো। কিন্তু আমি বেঁচে যাই শুধুমাত্র আমার লেখার জন্য।
সুনিতদার দিকে তাকিয়ে বললাম, ম্যানেজমেন্টকে বলো আমার সঙ্গে কথা বলতে।
সেটা কি করে হয়।
কেনো, যাবে কে তুমি না আমি ?
তুই।
তাহলে আমার সঙ্গে একবার আলোচনা করা উচিত ছিল।
সেটা ঠিক, তবে আমি জানি তুই......।
সরি। আমি যেতে পারছি না। তাছাড়া আমি এতো বেশি অভিজ্ঞ নই যে একটা অফিস চালাব। তার চেয়ে বরং তুমি চলে যাও। তা না হলে আমার থেকেও অনেক সিনিয়ার জার্নালিস্ট এ হাউসে আছে। তাদের পাঠাবার ব্যবস্থা করো।
তাহলে তুই যাচ্ছিস না।
না।
সবাই আমার মুখের দিকে হাঁ করে তাকিয়েছিল। ঘরটা নিস্তব্ধ। সুনিতদা আমার মুখের দিকে তাকালেন। কিছু হয়তো বলবেন ঠিক করছিলেন তার আগেই আমি উঠে দাঁড়ালাম। তাহলে এবার আসি।
তুই একবার ভেবে দেখতে পারিস।
সরি।
তাহলে আমার কিছু করার নেই।
হাসলাম। তোমার ম্যানেজমেন্ট আমারও ম্যানেজমেন্ট তাদের সঙ্গে আমি বসবো। তাতে তোমার আপত্তি কোথায় ? তোমার ব্যাক্তিগত আপত্তি থাকলে আলাদা কথা ?
না, তুই হয়তো সব জানিস না।
সেতো হতেই পারে। আমি পনেরো দিন পরে ফিরলাম। আমার সমস্ত ব্যাপার না জানারই কথা।
ঠিক আছে তুই যা।
আমি বেরিয়ে এলাম। এটুকু জানি আমাকে এই হাউস থেকে সরান খুব মুস্কিল। তাহলে অনেক ঝড় উঠবে। সেটা সুনীতদা ভালকরে জানে। চম্পকদা আঁচ করে, তাছাড়া মিত্রা এসব কি করলো। কার কথায় ও উঠছে বসছে! সুনিতদার কথায়! মুখে থেকে একটা খিস্তি বেরিয়ে এলো, কালকা জোগী....বোলতা হ্যায় জটা।
নিউজরুমে চলে এলাম।
নিজের টেবিলে এসে বসলাম।
সন্দীপ এলো। কিরে কি বললো ?
চেন্নাইয়ের ব্যুরো চিফ বানিয়েছে।
আমি জানি ডি এইচ এ এম এন এ নিশ্চই একটা প্ল্যান ভেঁজেছ।
সেটা আবার কিরে।
বউ বলেছে কাউকে গালাগালি দিতে হলে বানান করে দেবে।
আমি মনে মনে উচ্চারণ করে হেসেফেললাম।
শালা অমিতাভদার  সবকটা হ্যান্ডসকে একসপ্তাহের মধ্যে এখানে ওখানে সরিয়ে দিয়েছে। তুই কি বললি।
যাবনা বলে দিয়েছি।
ব্যাস হয়ে গেলো। তোর চাকরি নট।
তো।
এরপর কি করবি।
কোন কাগজের এডিটর হবো।
হ্যাঁ, তোর সেই দম আছে।
হাসলাম।
অনি আমার একটা চাকরির ব্যবস্থা করিস।
কেনো ? তোর চাকরি চলে গেছে।
যায় নি, তবে চলে যাবে।
কি করে বুঝলি।
খবর নিয়েছি কাগজপত্র তৈরি।
পিটিআই, ইউএনআই সামলাবে কে।
লোক এসে গেছে। আমি সাতদিন ধরে আসছি আর চলে যাচ্ছি।
কোন নিউজ করিস নি।
না।
ও।
অনিববু কে আছেন। একজন সিকুরিটি এসে পাশে দাঁড়াল। আমি ভদ্রলোকের দিকে তাকালাম, ভালকরে মাপলাম, ভদ্রলোক নয় একটা বাচ্চা ছেলে।  সন্দীপ আমাকে দেখিয়ে বললো, উনি।
আপনাকে একবার মেমসাহেব ডাকছেন।
কে।
খিঁচিয় উঠলাম। বলাটা একটু জোড়ে হয়েগেছিলো। নিউজরুমের সবাই আমার দিকে তাকাচ্ছে।
মেমসাহেব।
সে আবার কে। বসতে বলো।
আপনাকে এখুনি ডাকছেন।
সন্দীপের মুখের দিকে তাকালাম। সন্দীপ ইশারায় বললো মালকিন।
তোমার মেমসাহেবকে বলো, আমি একটু পরে যাচ্ছি।
জরুরি দরকার আছে।
আরি বাবা এতো ঘোরায় জিন দিয়ে এসেছে। চেঁচিয়ে উঠলাম, নিউজরুমের সবাই আমার দিকে হাঁ করে দেখছে।
আমি উঠে পরলাম। গট গট করে ওর পেছন পেছন গেলাম। এই চেম্বারটা আগে ছিল না নতুন হয়েছে। এই পনেরো দিনে অফিসের হাল-হকিকত একেবারে বদলে গেছে। দোষ আমার। কেননা আমি অফিসে খুব বেশিক্ষণ থাকতাম নয়। বেশির ভাগটাই বাইরে বাইরে কাটাতাম। তাছাড়া মাথার ওপর ভাববার অনেক লোক ছিল। তাই নিজের লেখালিখি নিয়েই থাকতাম।
আসতে পারি বলে দরজাটা খুলতেই অবাক হয়ে গেলাম, যারা কয়েকদিন আগেও অমিতাভদাকে তেল দিত, তারা এখন ম্যানেজমেন্টের কাছের লোক। ঘর ভর্তি। সবাই আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। মিত্রা একটা চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে। আমাকে দেখে ও একটু অবাক হলো। কিন্তু কাউকে বুঝতে দিল না। আমার পায়ের নোখ থেকে মাথার চুল পর্যন্ত ভালকরে মাপলো। দেখলাম সুনিতদা ম্যাডামের পাশেই একটা চেয়ারে বসে আছেন। আমাকে দেখেই মুখে একটা পরিতৃপ্তির হাসি। ব্যাপারটা এরকম কেমন মজা দেখ।
আসুন।
ভেতরে এসে বসলাম।
সুনিতদা আমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন, ম্যাডাম এই হচ্ছে অনি।
আমি মিত্রার চোখে চোখ রেখই বুকের সামনে হাত তুললাম।
চম্পকদা বললেন আরে অনিবাবু, ভাইজ্যাক কেমন কাটালে।
ভাল।
তোমার আর্টিকেল গুলো কিন্তু এবার খুব একটা জমে নি।
আমি চম্পকদার দিকে একবার তাকালাম। সামান্য হেসে বললাম, চম্পকদা আমি জানতাম আপনি এ্যাডের লোক সাংবাদিকতা নিয়ে কবে থেকে মাথা ঘামাতে শুরু করলেন।
আমার কথায় ঘরটা একেবারে নিস্তব্ধ হয়ে গেলো। মিত্রা আমার দিকে তাকিয়ে কিছু বলার চেষ্টা করলো। বললো না। হেলান দিয়ে চুপচাপ বসেছিল। আর একদৃষ্টে আমাকে দেখে যাচ্ছিল।
আমি মিত্রার দিকে তাকিয়, হ্যাঁ ম্যাডাম বলুন আমাকে কেন ডেকেছিলেন।
সুনিতদা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ওই ব্যাপারটা।
আমি বেশ গম্ভীর হয়ে বললাম, আপনাকে ডিসিসন জানিয়ে দিয়েছি। নতুন কিছু থাকলে বলতে পারেন।
সেটা আমরা মানতে পারছি না।
সুনিতদা, আপনি এখন এই হাউসের কোন পজিসনে আছেন আমি জানি না। তবে আমার যিনি রিসেন্ট বস কাম এডিটর ছিলেন তাঁকে আমি এই হাউসে যখন ঢুকি তখন বলেই ঢুকেছিলাম, আমার একটা পা হাউসের বাইরে থাকবে সব সময়। প্রয়োজন পরলে, যে পাটা ভেতরে আছে, সেটাও বাইরে বার করে নেবো।
তুমি কি বলতে চাইছো।
আপনি একজন চিফ রিপোর্টার বাংলা ভাষাটাও ঠিক মতো বুঝতে পারছেন না। আবার বাংলা কাগজে কাজ করছেন।
হেয়ালী রাখ।
আমি উঠে দাঁড়ালাম। বুকের কাছে হাতজোড় করে বললাম, ম্যাডাম আমি আসছি।
মিত্রা আমার দিকে তাকাল। ওর চোখে অনেক না বলা কথা। কিন্তু বুঝতে পারছি এদের সামনে কিছুতেই বলতে পারছে না। আমাকে চেয়ার দেখিয়ে বললেন, বসুন। সুনিতবাবু আপনারা এখন যান। আমি ওনার সঙ্গে কথা বলে নিচ্ছি।
এক ঘর ভর্তি লোক সবাই এই কথায় কেমন যেন অবাক হয়ে গেলো। একে অপরের মুখের দিকে তাকালো। আমি বসলাম। একে একে সবাই ঘরের বাইরে চলে গেলো। মিত্রা বেলবাজাতেই সেই ছেলেটিকে দেখলাম। যে আমায় ডাকতে গিয়েছিল। চোখ দু’টো ভীষন জ্বালা জ্বালা করছে। মাথা নীচু করে বসে ছিলাম।
কেউ যেন আমাকে বিরক্ত না করে। বেল বাজালে একমাত্র তুমি আসবে।
ঠিক আছে ম্যাডাম। ছেলেটি বেরিয়ে গেলো।
আমি মাথা নীচু করে বসেছিলাম। অনেক দিন পর কারুর সঙ্গে এইরকম রাফ ব্যবহার করলাম। নিজেরি খুব খারাপ লাগছিলো। এসির হাওয়াটা ভীষণ ঠান্ডা ঠান্ডা লাগছে।
কিরে আমার সঙ্গে কথা বলবি না।
বলুন।
বাবাঃ, এখনো রাগ পরে নি।
রাগের কি আছে, চাকরি করতে এসেছি তা বলে নিজের সত্বাকে বিক্রি করতে আসি নি।
মিত্রা নিজের চেয়ার ছেরে উঠে এলো। আমার গলা জড়িয়ে ধরে বললো।
তুই রাগ করলে আমি যাবো কোথায়, আমি এখন বড় একা।
আমি ওর দিকে তাকালাম, ওর চোখ দু’টো ছল ছল করছে।
তুই আমার পাসে থাকবি না।
ওর চোখের ভাষা পরার চেষ্টা করলাম। না আমার কলেজ লাইফের মিত্রাই। ওর চোখের মধ্যে কোন দৈত সত্বা নেই। এক দৃষ্টে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
তুই এসব কি করলি।
আমি করিনি। আমাকে দিয়ে করান হয়েছে।
তার মানে! ব্যবসা করতে বসেছিস, মালকিন হয়েছিস।
সে অনেক কথা। আর ভাল লাগছে না। তোর সঙ্গে আটমাস আগে দেখা হয়েছিল। তোকে আমার ওখানে যেতে বলেছিলাম। তুই যাস নি।
চুপ করে থাকলাম।
আমার থুতনিতে হাত দিয়ে মাথাটা ঘুরিয়ে বললো, বল কেন যাস নি।
আমার চোখ দুটো ভারি হয়ে এসেছিল। নিজেকে সামলে নিলাম।
ও আমার পাশে একটা চেয়ার নিয়ে মুখোমুখি বসলো।
কখন ফিরলি।
সকালে।
বাড়ি গেছিলি।
না।
একটু কফি খা।
না।
ফোনটা বেজে উঠলো, বড়মার ফোন। ফোন ধরতেই বড়মার গলায় অভিমানের সুর। কিরে কখন আসবি, আমরা না খেয়ে বসে আছি।

জীবনে জীবন যোগ না করলে ব্যার্থ হয় গানের পসরা