৪১

Re: কাজলদীঘি, শ্মশান ও পীরসাহেবের থান

আগামী সপ্তাহে কমপ্লিট করে ফেলবো ভাবছি।
শেষকর আমি তোর সঙ্গে বসবো। কতগুলো স্ট্রাটিজি নিয়ে।
ঠিক আছে। তুই কবে যাচ্ছিস।
তোর এখান থেকে বেরিয়ে বড়মার সঙ্গে একবার দেখা করবো। তারপর চলে যাব।
ফিরবি কবে।
দেখি। তুই অফিসের সম্বন্ধে সব জানিস তো।
হ্যাঁ। মিত্রা কিছু কিছু বলেছে। তুই ঠিক ডিসিসন নিচ্ছিস।
মিত্রা একা পরে গেছে।
বুঝতে পেরেছি। তুই ওদিকটা সামলা আমি এদিকটা সামলে দেবো।
এখন যারা আছে সব বিষ মাল।
জানি। খালি ধান্দা বাজি। তবে ঘুঘুর বাসা পরিষ্কার করতে তোকে হিমসিম খেতে হবে।
জানি। তবে ওটা সামলাতে আমার বেশিক্ষণ সময় লাগবে না।
তোর সময় নষ্ট করব না। তুই যা। কলকাতায় ফিরলে আমায় একবার নক করিস।
ঠিক আছে।
হিমাংশুর ওখান থেকে বেরিয়ে এসে, বড়মার কাছে এলাম। মিত্রা আসতে চাইছিল না। আমিই ওকে জোর করে নিয়ে এলাম। বড়মা প্রথমে মিত্রাকে দেখে একটু অবাক হয়েছিলো। ছোটমা ক্যাজুয়েল। সবাই একসঙ্গে খেতে বসলাম। তারপর আমরা চারজনে মিলে ঠিক করলাম পরবর্তী স্ট্রাটেজি। অমিতাভদার পাকা মাথা কয়েকটা ভাল ডিসিসন নিলো। আমি মেনে নিলাম।
বুঝলাম মেন অপারেটর হবে সনাতন ঘরুই। দাদা সেরকমই ছক করলো। মিত্রা আমি মেনে নিলাম। আমি একটা প্রস্তাব রাখলাম। আমি যেমন আছি তেমনই থাকবো। আমার জায়গার পরিবর্তন হবে না। মিত্রা প্রথমে মানতে চাইছিল না। ওকে ব্যাপারটা বোঝালাম। ও বুঝতে পারল। ফাইন্যাল ডিসিসন হল। আগামী সপ্তাহে শুক্রবার মিটিং কল হবে। সেখানে মিঃ সনাতনের হাত দিয়েই সকলকে যার যার দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়া হবে।
সাইনিং অথরিটি এই মুহূর্তে মিত্রার হাতেই থাকবে। মিত্রাই সোল পাওয়ারের অধিকারী। মিত্রা মেনে নিলো। এই কদিন মিত্রা দাদার সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলবে। প্রয়োজন পরলে আমায় ডাকবে। আমি চলে আসবো। আমার দেখা মিলবে সেই শুক্রবার।
মল্লিকদা ছোটমা বড়মা এতোক্ষণ নিরব দর্শক ছিল। কথা শেষ হতে ছোটমা বললেন, হ্যাঁরে অনি, তোর মা-বাবার কোন ছবি তোর কাছে নেই।
ছোটমা এ ভাবে কোনদিন কথা বলেন নি আমি স্থির দৃষ্টি নিয়ে ছোটমার দিকে তাকালাম।
আছে।
তোর মনে পরে ওনাদের।
না। আবঝা আবঝা।
আমাকে ছবিটা দিবি।
কেনো।
আমি বাঁধিয়ে ঠাকুর ঘরে রাখবো।
হাসলাম।
তোর মতো ছেলের যিনি জন্ম দেন তিনি মহাপ্রাণ।
খাওয়ার টেবিলে সবাই নিস্তব্ধ হয়ে গেলো।
ঠিক আছে তোমায় দেবো।
তুই ওই ফ্ল্যাটটা ছেড়ে দে।
কেনো।
এখানে চলে আয়। এতো বড় বাড়ি এতোগুলো ঘর।
আবার তাকালাম ছোটমার দিকে।
তোকে নিয়ে এই কদিন আমি আর দিদি খালি ভেবেছি।
আমিও কি মহাপ্রাণ।
এমন ভাবে কথাটা বললাম, সবাই হেসে ফললো। মল্লিকদা চেঁচিয়ে উঠলেন, বলছিলাম না, অনির বিকল্প অনি নিজেই। ওর মাথার মধ্যে আরও দশটা মাথা আছে।
আবার শুরু করলে। বলবো ছোটমাকে।
আচ্ছা তোর সঙ্গে কি আমার কোন প্রাইভেট টক থাকতে পারে না।
তাহলে এখন শুধু চিংড়িমাছের কালিয়া খেয়ে যেতে হবে।
মল্লিকদা হো হো করে হেসে বলে উঠলেন ঠিক ঠিক, কিহে দাও।
ছোটমা মৃদু হেসে বললেন, তোমার ভাগেরটা শেষ হয়ে গেছে, খালি আনি আর মিত্রার ভাগেরটা আছে।
বড়মা ছোটমার দিকে তাকিয়ে বললেন, যা না ওবলার জন্য রাখতে হবে না।
ছোটমা রান্নাঘরের দিকে গেলেন, বড়মা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, কবে আসবি।
বৃহস্পতিবার রাতে।
এতদিন কি করবি।
অনেক কাজ আছে। একেবারে শেষ করে আসবো।
বড়মা চুপ করে রইলেন। আমি উঠে গেলাম বড়মার কাছে, বড়মা মিত্রা পাশাপাশি বসে আছে। আমি বড়মার গলা জড়িয়ে ধরে কানের কাছে ফিস ফিস করে বললাম, কেনো মিত্রাকেতো রেখে যাচ্ছি। মিত্রা আমার কথা শুনতে পেয়েছে। আর কেউ শুনতে পায় নি। বড়মা আমার দিকে তাকালেন। চোখ দুটো জলে ভরে উঠেছে।
ছোটমার আনা চিংড়িমাছ সকলে ভাগ করে খেলাম। খাওয়া শেষ হতে বড়মার ঘরে গিয়ে বললাম। টাকা দাও। বড়মা আমার দিকে তাকালেন। এই প্রথম বড়মার কাছে টাকা চাইলাম। এতদিন বড়মা আমাকে দিয়েছেন। কখনো নিয়েছি কখনো নিইনি। বলেছি আমার কাছে আছে। লাগবে না।
বড়মা আমাকে বুকে টেনে নিলেন। আমার শান্তির নীড়। জীবনে প্রথম বড়মার কাছে মুখ ফুটে টাকার কথা বললাম। বড়মা আলমারি খুলে টাকা দিলেন। সেদিন নিয়ে গেছিলাম। তুই রাগ করবি বলে তোকে দিতে সাহস পাই নি। তাই নিয়ে তোর দাদা বাড়িতে এসে আমার ওপর কি হম্বিতম্বি। ছোটও নিয়ে গেছিলো। আমি হাসলাম। কখন যে ছোটমা পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল জানি না। আমার দিকে তাকিয়ে হাসলেন।
কি বাবুসাহেব মচকেছেন না ভেঙেছেন।
ছোটমার কাছে এগিয়ে এলাম, দুটো কাঁধে হাত রাখলাম, কোনটা হলে তোমার ভালো লাগবে।
দুটোই।
ঠিক আছে। এবার থেকে তাই হবে।
ছোটমার চোখ দুটো টল টল করছে।
তোমরা সবাই এরকম করলে আমার পক্ষে লড়াই করা মুস্কিল হয়ে পরবে।
অনি আমরা সবাই এতোদিন মাঝ সমুদ্রে ভাসছিলাম। এখন একটা নৌকায় উঠতে পেরেছি। সেটাও যদি ফুটো হয়ে যায়। সেই ভয়ে আমরা সব....।
নীচু হয়ে ছোটমার বুকে মাথা রাখলাম, অনি সেই অন্যায় কোনদিন করবে না।
জানি বলেই হারাবার ভয়টা বেশি।
কিচ্ছু হারাবে না।
ওই মেয়েটার চোখ দুটো দেখেছিস।
দেখেছি।
সব তোমায় বলবো সময় আসুক।
তুই কি বলবি আমি জানি।
ছোটমার চোখে চোখ রাখলাম।
সবাই আশ্রয় চাইবে। তুই আশ্রয় দিতে পারবি না। থাকর জায়গা দিবি এইতো।
হয়তোবা তোমার কথা ঠিক, হয়তোবা নয়। ঠিক আছে, আমায় এখন যেতে হবে। নাহলে অনেক রাত হবে পৌঁছতে।
ছোটমা বড়মাকে প্রণাম করে বাইরে এলাম, মল্লিকদা অমিতাভদা মিত্রা বসে কথা বলছে।
আমি প্রণাম করলাম। মিত্রাকে বললাম, আমাকে একটু স্টেশন পর্যন্ত এগিয়ে দে।
ও উঠে দাঁড়ালো।
বড়মা এগিয়ে গেল মিত্রার দিকে, চিবুকে হাত দিয়ে বলল একদিন তুমি একবার করে এসো না। ভাল লাগবে।
মিত্রা আমার দিকে তাকালো। আমার চোখের ইশারা ও বুঝতে পেরেছে। ও নীচু হয়ে বড়মা ছোটমাকে প্রণাম করলো। অমিতাভদা মল্লিকদাকে প্রণাম করলো। ওরা আজ কোন বাধা দিলো না।
অমিতাভদার বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলাম। ইসমাইল গাড়ি চালাচ্ছে।
তোর কটায় ট্রেন।
আড়াইটের পর এক ঘন্টা অন্তর।
আমায় ঘন্টাখানেক সময় দে।
মিত্রার দিকে তাকালাম, ওর চোখ কিছু বলতে চায়।
আচ্ছা।
ইসমাইল, গড়িয়াহাটমে উস দুকানসে চলিয়ে।
জি ম্যাডাম।
কিছুক্ষণের মধ্যে গড়িয়াহাটের একটা জামাকাপড়ের দোকানের সামনে এসে দাঁড়ালাম। মিত্রা আমাকে নিয়ে নামলো। আমি ওর পেছন পেছন দোকানের মধ্যে ঢুকলাম। ও নীপার জন্য একটা লং-স্কার্ট আর খুব সুন্দর একটা গেঞ্জি কিনলো।
আমার দিকে তাকিয়ে বললো, কিরে নীপা পরবেতো ?
তুই যখন দিচ্ছিস নিশ্চই পরবে।
মিত্রা ওর জন্য একটা সাদা হাতের কাজ করা সালোয়ার কিনলো। সেদিন ও যেরকম একটা পরেছিলো। কাকার জন্য ধুতি পাঞ্জাবি। আর কাকীমা আর সুরমাসির জন্য কাপড় কিনলো। আমি কোন বাধা দিলাম না।
আমায় বললো তোর জন্য একটা জিনস আর গেঞ্জি কিনবো তোর কোন আপত্তি আছে ?
কেন ?
ঠিক আছে থাক।
অমনি মুখটা ভারি হয়ে গেলো।
আমি নিয়ে যাব না, ফিরে এসে তোর বাড়িতে উঠবো। শুক্রবার ওই পেন্ট গেঞ্জি পরব।
ও আমার দিকে গভীর ভাবে তাকালো, মিটি মিটি হাসলো।
হাসছিস যে।
ঠিক আছে।
মিত্রা আমার দিকে তাকিয়ে বললো, তোর কোন পছন্দ আছে।
না। তুই যা কিনে দিবি তাই পরবো।
ও নিজের মনের মতো করে একটা জিনসের পেন্ট গেঞ্জি কিনলো। দেখলাম বিল প্রায় বিশ হাজার টাকা হয়ে গেছে। আমি কিছু বললাম না। আমাকে বাড়ির জন্য কেনা জামা কাপড়গুলো ধরিয়ে দিলো।
এইগুলো নিয়ে যা। আমি বললাম নিয়ে আমি যাচ্ছি, তবে তুই একটা কাজ কর, কাকার নাম করে একটা চিঠি লিখে দে। ও কাউন্টার থেকে একটা প্যাডের কাগজ নিয়ে খস খস করে কাকার নাম করে একটা চিঠি লিখে দিলো। দেখতে দেখতে তিনটে বেজে গেলো। দুজনে  মিলে কফি সপে বসে এককাপ করে কফি খেলাম।
এখন আমি কি করি বলতো।
কেনো! ক্লাবে যা।
দিন সাতেক হলো ক্লাবের দরজা মারাই নি।
কেনো!
ভালো লাগেনা।
বাড়ি যা। পরাশুনো কর।
কি পরবো।
বই পর।
এখন আর ভাল লাগে না।
সব কিছুতেই ভাল লাগে না ভাল লাগে না বললে চলে, ভাল লাগাতে হবে।
তুই মাস্টারি করিস না।
আমি মিত্রার দিকে তাকালাম।
তোকে ছাড়া আমি একমুহূর্ত চলতে পারছি না।
ঠিক আছে, আমায় দিন কয়েক সময় দে। ওই দিকটাওতো দেখতে হবে।
বুঝি। কিন্তু মন মানে না।
মিত্রা আমার হাতটা চেপে ধরলো। জানিস বুবুন, তুই আমাকে এই কয়দিনে একটা নতুন জীবন দিয়েছিস। আমি আর অতীতে ফিরে যেতে চাই না। গতো সাত বছর জীবনটা যন্ত্রের মতো চালিয়েছি। তুই এই কদিনে আমার জীবনটাকে একেবারে ওলোট পালট করে দিয়েছিস।
সেতো বুঝলাম। কিন্তু তোর ওপর অনেক দায়িত্ব। সেটা বুঝতে পারছিস তো।
পারছি। তুই অফিসে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিস।
সেটাতো তোর স্বার্থে।
জানি।
ঠিক আছে। তুই যদি মনে করিস অফিসে যা। মনে রাখবি তোর ওপর একটা প্রেসার তৈরি করা হবে। তুই ওটা রিকভার করতে পারবি তো।
পারবো।
ঠিক আছে। কাল থেকে তুই অফিসে যা।
কিছু হলে আমাকে একবার জানাবি।
তুই মন থেকে বলছিস।
মন থেকে বলছি।
কবে আসবি।
তিনটে দিন অন্ততঃ আমায় সময় দে।
তারমানে তুই মঙ্গলবার আসবি।
হ্যাঁ।
স্টেশনে এসে মিত্রাকে ছেড়ে দিলাম। মিত্রার চোখ দুটো ছল ছল করে উঠলো। আমি একবার তাকিয়ে আর ওর দিকে ঘুরে তাকালাম না। টিকিট কাউন্টারে এসে টিকিট কাটলাম। ট্রেন মিনিট পনেরো পর। তিন প্যাকেট সিগারেট নিলাম। অনাদিকে একটা ফোন করে বলে দিলাম, আমি ট্রেনে উঠলাম। তোরা স্টেশনে কাউকে পাঠা। অনাদি ওপ্রান্ত থেকে বললো, ঠিক আছে।
ট্রেনে যেতে যেতে মিত্রা তিনবার, নীপা একবার, অনাদি দুবার, চিকনা বাসু একবার করে ফোন করেছে। লোকাল ট্রেনে খুব একটা যাওয়া অভ্যাস নেই। যাইও না তবু নিজেকে মানিয়ে নিলাম। দেখতে দেখতে দুটো ঘন্টা কেটে গেলো। স্টেশনে নামতেই দেখলাম, চিকনা আর সঞ্জীব দাঁড়িয়ে আছে। সূর্য পশ্চিম দিকে হেলে পরেছে, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই সন্ধ্যা হয়ে যাবে।
স্টেশনে নামতেই চিকনা আমার কাছ থেকে ব্যাগটা নিয়ে নিলো। সঞ্জীবকে জিজ্ঞাসা করলাম, কিরে সব ঠিক আছে।
চিকনা খেঁকিয়ে উঠলো, ও শালা কি জানে, সকাল থেকে ওর দেখা পাওয়া গেছে। অনাদি ফোন করতে বাবু এলেন।
সঞ্জীব কিছু বলতে যাচ্ছিলো, আমি বললাম, ঠিক আছে ঠিক আছে আর কেউ আসে নি।
বাসু এসেছে।
কোথায়।
বাইরে আছে।
স্টেশনের বাইরে বেরিয়ে এলাম। আসার সময় চিকনা টিটিকে বললো, কি বলেছিলাম না এই হচ্ছে অনি। ভদ্রলোক বুকের কাছে হাত তুলে নমস্কার করলেন। আমিও প্রীতি নমস্কার করলাম। চা খেতে খেতে বড়মাকে একবার ফোন করলাম। জানালাম আমি পৌঁছে গেছি। মিত্রাকে ফোন করলাম, বললো বাড়িতে আছে, গলাটা ভীষণ ভারী ভারী।
কি করছিস।
একটা সিনেমা দেখছি।
কি সিনেমা।
শুনবি।
মিত্রা মোবাইলটা টিভির কাছে ধরলো, এক দুজেকে লিয়ে। আমি মিত্রা দুজনে জীবনে প্রথম রূপবাণী সিনেমা হলে কলেজ কাট মেরে সিনেমাটা দেখেছিলাম, মিত্রাই দেখিয়েছিলো।
হাসলাম।
কিরে শুনলি।
হ্যাঁ।
তোর কিছু মনে পরে।
প্রথম কলেজ কাট মারার কথা মনে পরছে।
বাড়িতে এসে ভেবেছিলাম ক্লাবে যাব, টিভিটা খুলতেই দেখলাম সিনেমাটা শুরু হয়েছে বসে গেলাম।
ভাল করেছিস।
যে টাস্কগুলো দিয়ে এসেছি মন দিয়ে করিস। ফিরে গিয়ে ধরবো।
মিত্রা হো হো করে হেসে ফললো।
মেঘ কাটলো।
আমি বাসুর পেছনে বসলাম, ঘন্টা খানেক লাগলো বাড়িতে পৌঁছতে। আস্তে আস্তে সবার মুখেই মিত্রার প্রশংসা ঝরে পরছে। অতো পয়সা যার তার কোন দেমাক নেই। ওরা জানতো না এই নার্সিংহোমটা মিত্রার হ্যাজবেন্ডের। দূর ছাই আমিও কি জানতাম। জানলাম সেই দিন। 
চিকনাতো বলেই ফেললো, গুরু আমার জন্য তোমার ওখানে একটা কাজ দেখো না। যদি টেবিল মোছার চাকরিও থাকে তাতেও কোন আপত্তি নেই।
আমি খালি বললাম, আফটার অল তুই আমার বন্ধু, আজ নয় কাল কেউ না কেউ জানতে পারবে। তখন।
ও প্রায় আমার হাতে পায়ে ধরে, আমি বললাম একটু সবুর কর, সব ঠিক হয়ে যাবে।
চিকনা ধাতস্থ হলো।
বাড়ি পৌঁছলাম সন্ধ্যা মাথায় নিয়ে। রাস্তায় কোথাও দাঁড়াই নি। খামারে গাড়ি রেখে আমরা চারজন ঢুকলাম। বাইরের বারান্দায় টিভি চলছে। অনেক লোক বসে দেখছে। কাকাও আছে। আমি আসাতে কাকা চেয়ার ছেড়ে উঠে এলেন। আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, তুই যা বলেছিস সব অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছি। নীপা গেটের কাছে দাঁড়িয়ে ছিল। চেঁচিয়ে উঠলো, বলবো অনিদাকে সকালের কথা। না না বলিস না। ওইটুকুতো খালি অন্যায় করেছি।
নীপার দিকে এতোক্ষণ খেয়াল করিনি। কয়েকদিন আগে দেখা নীপার সঙ্গে আজকের দেখা নীপার অনেক পার্থক্য। বিশেষতঃ নিজেকে সাজিয়ে তোলার ক্ষেত্রে। শহুরে মেয়েরা বিকেল বেলা যেমন পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে, পরিষ্কার জামা কাপর পরে নিজেকে সাজিয়ে তোলে সেইরকম। আমার চোখের চাহুনি নীপা ধরে ফেলেছে। নীপা মুখ টিপে হাসলো।
কি করেছো।
একটু জল নিয়ে মাথায় দিয়েছি।
খুব অন্যায় করেছো। ডাক্তার তোমায় বারন করেছে। চোখে যায়নিতো।
না।
ওষুধ গুলো ঠিক ঠিক দিয়েছো।
ওইতো নীপাকে জিজ্ঞাসা কর। ওঃ যেন ডাক্তারনী।
কাকা এমন ভাবে কথা বললো সবাই হেসে ফেললো। চিকনার দিকে তাকিয়ে বললাম, ওটা নীপার হাতে দে। চিকনা নীপার হাতে ব্যাগটা দিল।
এটা আবার কি।
ভেতরে গিয়ে খুলে দেখো। কাকীমা সুরমাসির সঙ্গে কথা বলে আমি কাকাকে বললাম ও বাড়িতে যাচ্ছি। কাকা বললো আচ্ছা। নীপাকে বললাম, একটু বেশি করে চা করে নিয়ে এসো। নীপা মুখ বেঁকিয়ে ভেতরে চলে গেলো।
অনাদি কই। আমি বললাম।
পচা বললো, একটু বাজারের দিকে গেছে। এখুনি এসে পরবে। ওদের দিকে তাকিয়ে বললাম, আয়।
ওরা আমার পেছন পেছন আমার দোতলার ঘরে এলো। ঘরটা বেশ চকচকে। আগের দিনের থেকে মনে হয় কিছু একটা পরিবর্তন হয়েছে। খাটটা ঠিকই আছে। খালি আলমাড়িটা জায়গা বদল করেছে। তাতে ঘরের জায়গাটা অনেক বেরেগেছে। একটা বসার সোফা ঢুকেছে দেখছি। মনেমনে হাসলাম।
পচা পাঁচু ভানু আর যারা ছিল তাদের সবারই এক কথা, মিত্রার মতো মেয়ে হয় না। আমি ওদের কথায় মুচকি হাসলাম, ভানু একধাপ এগিয়ে বললো, হ্যাঁরে অনি ও কি তোর বউ।
বউ হলে ভালো হতো না। পাঁচু বললো।
ভানু হেসে ফেললো।
চিকনা চেঁচিয়ে উঠলো, শালা তুমি কি কালীচরণের ঝি পেয়েছো।
আবার কালীচরণের ঝির কথা আসছে কেনো। আমি বললাম।
আরে এখনও সময় পেলে এককাট লাগিয়ে চলে আসে।
আমি ভানুর দিকে তাকালাম। ভানু হাসছে।
নারে অনি, ওরা মিছে কথা বলছে।
চিকনা আরো গলা চরিয়ে বললো, ওর বাচ্চা গুলো তোর না ওর বরের বোঝা মুস্কিল।
থাম। আমি চিকনাকে বললাম।
সত্যি তোদের কোন জ্ঞান বুদ্ধি নেই। ছেলেটা অতোদূর থেকে এলো একটু বসতে দিবি। একটু থিতু হতে দিবি। না কালীচরণের ঝি....। সঞ্জয় বললো।
কেরে সতী। চিকনা বললো।
দেখলি অনি দেখলি, তুই এর বিচার কর।
আমি ওদের কীর্তি কলাপ দেখে হাসছি। বাসু স্পিকটি নট।
অনাদি এলো। কি তোরা শুরু করেছিস বলতো। নীচ থেকে শোনা যাচ্ছে। এটা কি তেঁতুলতলা।
তেঁতুলতলা আমাদের আড্ডার ঠেক। সবাই যখন এক সঙ্গে ওখানে বসতাম, আশপাশ দিয়ে বড়রা কেউ যেতো না।
অনাদি এসে আমার পাশে বসলো। কখন এলি।
এইতো আধঘন্টা হবে। কালকের এ্যারেঞ্জমেন্ট কিছু করেছিস।
হ্যাঁ গোরাকে বলে রেখেছি। একটু বেলায় বেরোবো।
কটার সময় ?
এই আটটা নাগাদ।
কটা গাড়ি বলেছিস।
একটা বলেছি, ফালতু লোকজন বেশি গিয়ে লাভ নেই। ঘন্টা খানেকের ব্যাপার।
হ্যাঁ।

জীবনে জীবন যোগ না করলে ব্যার্থ হয় গানের পসরা

৪২

Re: কাজলদীঘি, শ্মশান ও পীরসাহেবের থান

তারপর তোর যা ফর্মা, বেশিক্ষণ বসতেও হবে না।
হাসলাম।
সত্যি অনি তুই কিছু খেল দেখাচ্ছিস।
কি বলেছিলাম, এবার বিশ্বাস হচ্ছে। চিকনা বললো।
নীপা মুখটা বারিয়ে বললো, সঞ্জুদা একটু ধরোতো।
সঞ্জু পরি কি মরি করে ছুটে গেলো।
নীপার পেছনে একটা মেয়েকে দেখলাম।
অনাদি বললো, কে এসেছে তোর সঙ্গে ? 
শেলিদি।
আমি অনাদির মুখের দিকে চাইলাম।
চিনতে পারলি না। অনাদি আমার দিকে তাকিয়ে বললো।
শেলি ভেতরে এসো।
মেয়েটি ভেতরে এলো। চোখমুখ বেশ টানা টানা। চকচকে। ফর্সা মুখটা লজ্জায় বুকের কাছে নেমে এসেছে।
তুমি অনিকে আগে দেখেছো।
শেলি মাথা দুলিয়ে বললো হ্যাঁ।
কোথায় দেখলে।
সেদিন বাজারে। নীপা পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল।
আমি খুব লজ্জা পেয়ে গেলাম। চিকনা চেঁচিয়ে উঠলো দেখেরাখ পরে সমস্ত ডিটিলসে তোকে বলবো। মেয়েটি ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো।
তোমরা সত্যি না এক এক পিস। নীপা বললো।
দিদিমনি এই ভাবে বলবি না।
তুমি আগে এটা খেয়ে নাও।
কি।
নুন চিনির জল।
কেনো।
জানিনা, মাকে গিয়ে বলো।
যা বলছে করনা বাবা। অনাদি বললো।
আমি নিঃশব্দে জলটা খেয়ে নিলাম। বেশ ভাল লাগলো।
মুরি বেশি খাবে না।
তুই বললে, ওকে এক মুঠাও দেবো না। চিকনা বললো।
গেলোনা প্রাণ ভরে কে বারন করেছে।
চিকনাটা বর বাড়াবাড়ি করছে নারে নীপা।
হ্যাঁরে সে....।
বলোনা বলো, অনিদার মুখ থেকে ওই রকম ভাষা শুনেছো কোনদিন।
তোর পায়ে পরছি, এই কান মুলছি, আর হবে না।
নীপা হো হো করে হেসে ফেললো। এই নিয়ে কবার হলো।
নিরানব্বই বার, একশো হলেই তুই গলাটা ঘেঁচ করে দিস। চা ঢাল।
তুমি ঢেলে নাও।
নীপা ওকে ঢালতে দিওনা, তাহলে আমরা কেউ পাবোনা। বাসু বললো।
নীপা একবার কট কট করে চিকনার দিকে তাকালো।
ঠিক আছে ঠিক আছে বাসু যা বললো তাই হবে।
নীপা চা ঢাললো, চিকনা সকলকে এগিয়ে দিলো।
অনিদাকে আমাদের ব্যাপারটা বলেছো ?
অনাদি নীপার দিকে তাকিয়ে বললো না। কালকের দিনটা যাক বলবো।
কাজের মানুষ বলে কথা। আবার কালকেই বলে বসবে বুঝলি তোরা একটু সামলা আমার কাজ পরে গেছে। নীপা বললো।
আমি মুচকি হাসলাম।
তুই সব কথায় গেরো দিস কেনো।
নীপা এলো চুল দুলিয়ে চলে গেলো।
আমরা চা খেলাম। কালকে কারা কারা যাব ঠিক হলো। চিকনা আমি বাসু অনাদি যাবো। কোন বাইক নিয়ে যাব না। আর সবাইকে অনাদি বললো তোরা ওই দিকটা সামলে নে। তারপর আমরা ফিরে আসছি। ওরা বললো ঠিক আছে।
আমি অনাদিকে বললাম, তোদের কি আছে ?
আরে রাস আছে।
রথ শহরের মাঠে!
হ্যাঁ।
যাক প্রাণভরে জিলিপি খাওয়া যাবে।
আচ্ছা কলকাতায় গিয়ে কি তোর কোন উন্নতি হয়নি!
কেনো।
তুই কি সেই অনি, যে মেলায় ঘুরে ঘুরে জিলিপি ছোলাসেদ্ধ খাবি।
হ্যাঁ। আমি সেই অনি, ঠিকআছে তোদের জন্য একটা সারপ্রাইজ তোলা রইলো।
কি বলনা।
সেদিন বলবো।
ঠিক আছে।
সবাই চলে গেলো। আমি পুকুর ঘাটে গিয়ে হাত মুখ ধুয়ে কাপর জামা ছাড়লাম। আমার পেটেন্ট ড্রেস পরে খেতে বসলাম। কাকাকে জিজ্ঞাসা করলাম চোখের কোন অসুবিধা হচ্ছে কিনা। কাকা বললেন আগের থেকে অনেক ভালো দেখতে পাচ্ছেন। মিত্রার চিঠিটা উনি নিজে পরেছেন। ওনার মুখ থেকেও মিত্রার স্তুতি শুনলাম। কাকীমা সুরমাসিও মিত্রার সম্বন্ধে একেবারে গদ গদ। সত্যি মেয়েটার কি ভাগ্য। সব থেকেও কিছু নেই।
আমি বেশি কথা বারালাম না। তাড়াতারি খেয়ে নিলাম। কালকের যাওয়ার ব্যপারটা কাকাকে বললাম। কখন যাব, তাও বললাম। কাকা আমার প্রত্যেকটা কথায় খালি মাথা নেড়ে গেলেন। কিছু বললেন না।
আমি মুখ ধুয়ে ঘরে চলে গেলাম।
অন্ধকার দেখতে আমার ভীষণ ভালো লাগে। জানলার পাল্লাটা খুলে ঘরটা অন্ধকার করে দিলাম। বাইরের রং আরো পরিষ্কার হলো। সত্যি দু’দিন পর পূর্ণিমা। চাঁদের রূপ তাই বলছে। গাছের পাতা গলানো রূপোর অলংকারে সজ্জিত। সেই ঝিঁ ঝিঁ পোকার ঝিঁ ঝিঁ। জোনাকীর আলো। যত দেখছি তত যেন আমার কাছে নতুন। কিছুতেই পুরনো হতে চায় না। প্রত্যেকটা রাতের একটা আলাদা আলাদা রূপ আছে। আমি যেন সেই রূপ তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করছি। একটা সিগারেট ধরালাম দূরে কেউ যেন হেঁটে যাচ্ছে। বাঁশঝারের ভেতর দিয়ে। হাতের টর্চলাইটটা একবার জলছে। একবার নিভছে। মাঝে মাঝে গাছের পাতা গুলো নড়ে চড়ে উঠছে। বুঝতে পারছি। রাত পাখিরা শিকারের লোভে হানা দিচ্ছে এডালে ওডালে। এই আলো আঁধারিতে তাদের দেখা যায় না। চেনা যায় না। বোঝা যায় না। শুধু অনুভব করা যায়। ভাবতে ভাবতে নিজে কোথায় হারিয়ে গেলাম। নীপা কখন এসেছে জানি না। পাশ ফিরতে গিয়ে ওর শরীর স্পর্শ করলাম। সংকোচে উঠে বসলাম। নীপা আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
কখন এসেছি জানো।
না।
আমার সব কাজ শেষ।
তাই।
হ্যাঁ।
তাহলে আধঘন্টার ওপর হয়ে গেছে।
তুমি কি ভাবছিলে বললে নাতো।
কিচ্ছু না।
ভাবছো এই আপদগুলো আমার সব কিছু নষ্ট করে দিতে বসেছে।
ওকথা বলতেনেই।
তাহলে বলো।
কি বলবো।
কি ভাবছিলে।
সত্যি বলবো।
হুঁ।
আমি অন্ধকার দেখতে খুব ভালবাসি। কতরাত আমি একা একা রাতের অন্ধকারে এদিক সেদিক ঘুরে বেরিয়েছি।
তোমার ভূতের ভয় করে না।
না। তবে মানুষকে ভয় পাই। আর সাপ।
মিত্রাদি সত্যি খুব বড়মনের মানুষ।
নীপার দিকে তাকালাম। নীপা মাথা নীচু করে রয়েছে।
আমি নতুন করে কি বলবো। তুমিতো সব শুনেছো। কালকে থেকে খালি মিত্রাদিকে নিয়েই আধবেলা কেটে গেছে।
তোমার ব্যক্তিগত ভাবে কি মনেহলো বললে না।
বললে তুমি বিশ্বাস করবে।
হুঁ।
মিত্রাদি তোমায় ভীষণ ভালবাসে। তুমি মিত্রাদির প্রথম প্রেমিক। তাই তুমি আমার কোন খতি করতে চাও নি।
কে বললো তোমায়।
মিত্রাদি নিজে।
মিত্রাদির কথায় তোমার কিছু মনে হয়নি।
প্রথমে ভীষণ মন খারাপ হয়েগেছিলো। তারপর ভাবলাম, ওই জায়গায় আমি থাকলেও ওই একি অবস্থা হতো।
তোমার হিংসে হয় না।
কিবলছো অনিদা! মিত্রাদিকে আমি হিংসে করবো।
কেনো নয়।
আমি যদি মসাই-এর কাছে না আসতাম তাহলে কোনদিন চেষ্টা করলেও তোমার আর মিত্রাদির কাছে পৌঁছতে পারতাম! এইযে তোমার পাশে বসে আছি এই গ্রামের কতো মেয়ে স্বপ্নে দেখে তা তুমি জানো!
হাসলাম।
জানো অনিদা তোমরা দুজন আমার কাছে আদর্শ। আর শরীরের কথা বলছো, আমি তোমার কাছে ধরা দিয়েছিলাম। তোমার আদর খাব বলে। তোমার অনেক কথা শুনেছিলাম। তোমার বন্ধুদের কাছ থেকে। সব যেনো আমার কাছে মিথ মনে হতো। যখন তোমায় দেখলাম, মনেহলো আমার সেই স্বপ্নের রাজপুত্রকে দেখছি। আমি লোভ সামলাতে পারিনি। বিশ্বাস করো। এই গ্রামের অনেকে আমাকে চেয়েছে। কেউ সহসা হাত বারাতে পারে নি। কিন্তু সেখানেও তোমাকে দেখলাম। তুমি মনের দিক থেকে কতো পবিত্র। তুমি মিত্রাদিকে ভালবাস। তোমার ভালবাসা নিখাদ সোনা। কত ভাগ্য করে জন্মালে একটা মেয়ে এইরকম মনের সংস্পর্শে আসে তা তুমি জানোনা। আমি জানি সেখানে তুমি কাউকে প্রবেশ করতে দেবে না।
যদি আমি না আসতাম।
আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিলো তুমি আসবে। তোমাকে আসতে হবেই।
তুমি এতটা মনের জোড় পেলে কোথা থেকে।
মসাই-এর কাছ থেকে। তোমার কথা শুনে শুনে।
আমি নীপার দিকে তাকিয়ে আছি।
মিত্রাদি আজ যে কাপড় জামা পাঠিয়েছে তা দেখে মসাই কেঁদে ফেলেছিলেন। আমি বললাম তুমি একি করছো। তারপর আমি অকপটে মিত্রাদির সমস্ত কথা মসাইকে বলেছি।
কাকা শুনে কি বললো।
মসাই বললো ও দাতাকর্ণ।
হাসলাম।
তোমার বাবাকে মনে পরে না ।
না। আবঝা আবঝা।
মসাই-এর কাছে থেকে ওনার অনেক কথা শুনেছি।
ভাল না খারাপ।
ভাল না হলে তোমার মতো সন্তান পৃথিবীতে ভূমিষ্ঠ হয় কি করে। আমায় একটা কথা দেবে।
বলো।
জানি আমি তোমাকে কোনদিন পাব না। তবে আমায় একটা সন্তান উপহার দেবে। আমি তাকে নিয়ে দূরে কোথাও চলে যাবো। তাকে নিয়ে আমি আমার স্বপ্নের তরী রচনা করবো।
কি পাগলামো করছো।
নাগো সত্যি বলছি। তোমাকে পাবো না ঠিক। কিন্তু তোমার সন্তান আমার কাছে গচ্ছিত থাকবে।
আমার সন্তানের প্রতি আমার কোন দায়িত্ব থাকবে না।
তোমার দ্বারা তা হবে না, তুমি যাযাবর।
হাসলাম। লোকে আমাকে চরিত্রহীন বলবে।
তুমি চরিত্রহীন নও। মেয়েরা তোমার চরিত্র হনন করবে। তুমি নিজে থেকে তো চাওনা।
অন্ধকারেও নীপার মুখটা পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি।


পরদিন ঠিক সময়ে আমরা বেরিয়ে গেলাম। আজ নীপা মিত্রার দেওয়া লংস্কার্ট আর গেঞ্জিটা পরেছে। সামনে একটা ওর্না জড়িয়ে নিয়েছে। নীপাকে আজ একেবারে অন্যরকম লাগছে। চিকনা চেঁচিয়ে উঠলো, হ্যাঁরে দিদিমনি, তুই করেছিস কি। আলো ঝড়ে পরেছে। আজ তুই অবশ্যই আওয়াজ খাবি।
নীপা চিকনার দিকে কট কট করে তাকিয়ে বললো, তুমি বউনি করলে। কালকে এটাই তুমি বয়ে এনেছিলে।
সরি ম্যাডাম, অন্যায় হয়েছে। আর একখানা বাকি আছে। কাল রাসপূর্ণিমার মেলা আপনার মনস্কামনা পূর্ণ হবে।
সকলে হো হো করে হেসে ফেললো। সত্যি চিকনা তুইও পারিস। আমি বললাম। 
এই অজ গাঁয়ে কি নিয়ে থাকি বলতো অনি এই ভাবেই কেটে যাচ্ছে।
নার্সিংহোমে পৌঁছলাম সাড়েনটা নাগাদ। রিসেপসন কাউন্টারের ভদ্রমহিলা আমাকে চিনতে পেরেছেন। আমাকে দেখেই বললেন, বসুন স্যার। আমরা সবাই বসলাম। উনি ইন্টারকমে কার সঙ্গে কথা বললেন। একজন ভদ্রলোক ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন। পরিচয় দিলেন ডঃ দেবাশীষ বসু। এও জানালেন মিঃ শ্রীধরণ থাকতে না পারার জন্য উনি ক্ষমাপ্রার্থী। তবে মিঃ শ্রীধরণ ওনাকে সমস্ত দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে গেছেন। আমার কি কি করণীয় ওনাকে জিজ্ঞাসা করলাম। উনি বললেন সব ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। কিছুক্ষণের মধ্যেই ওরা কাকাকে ভেতরে নিয়ে গেলো। আমি নীপাকে সঙ্গে যেতে বললাম। নীপা প্রথমে যেতে চাইছিলোনা। আমি অনাদি আর বাসুকে পাঠালাম। নীপার সঙ্গে মিনিট পনেরো পর ওরা বেরিয়ে এলো। কাকার চোখে একটা চশমা দেখলাম। চোখটা একটু লাল লাল।
কি হলো।
ঠিক হয়ে গেছে। কাকা বললেন।
তুমি দেখতে পাচ্ছ।
হ্যাঁরে তোকে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি। কাল আর একটা চশমা দেবে বলেছে।
ঠিক আছে তুমি বোসো।
ওরা সবাই বসলো।
অনাদি বাসুর সঙ্গে কথা বললাম। ওরা বললো একটা চোখের রেটিনাটা একটু কমজোরি হয়ে পরেছে। বছর তিনেক পরে অকেজো হতেপারে। তবে কাকা চোখে বেশি স্টেইন দিতে পারবে না।
আচ্ছা।
আমি রিসেপসনে গেলাম। ভদ্রমহিলাকে বললাম, ডঃ বাসুর সঙ্গে একটু কথা বলবো। উনি কাউন্টার থেকে বেরিয়ে এসে, আমাকে সঙ্গে নিয়ে গেলেন। ডঃ বাসু আমাকে বসতে বললেন, তারপর কাকার বিষয়ে সব জানালেন। অনাদি যা বললো, তাইই। চশমাটা কালকে একটা সময় এসে নিয়ে যেতে হবে। আমি বললাম, দুপুরের দিকে যদি আসি আপত্তি আছে কিনা। উনি বললেন না। আমি রেডি করে রেখে দেবো। কাকাকে সঙ্গে আনতে হবে কিনা। উনি বললেন না আনতে হবে না। যাকে হোক একজনকে পাঠিয়ে দিন দিয়ে দেবো। আমি এবার পয়সার কথায় এলাম। টোটাল ব্যালেন্স কতো বাকি আছে। আমায় কতো দিতে হবে।
উনি আমার দিকে অবাক হয়ে তাকালেন, কেনো মিঃ শ্রীধরণ আপনাকে কিছু বলেননি।
না।
আপনার কোন ডিউ নেই, বরং আপনি যে টাকাটা জমা দিয়েছেন, সেটা রিফান্ড হবে।
কেনো ?
সেতো জানি না স্যার, ওটা মিঃ ব্যানার্জী জানেন।
উনি টেবিলে রাখা বেলটা বাজালেন। একজন বেয়ারা এলো। তাকে উনি আমার ব্যাপরটা বলতেই উনি বেরিয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ পর একজন ভদ্রলোক এসে একটা খাম দিয়ে গেলেন। উনি খামটা আমার হাতে তুলে দিয়ে বললেন, মনে কিছু করবেন না, এটা আমার ডিউটি। ওনাকে বললাম, কাল আমি আসবো। আপনি থাকবেন ? উনি বললেন অবশ্যই।
ওখানে কিছু মিষ্টি চা খেয়ে আমরা সকলে ফিরে এলাম। ফিরতে ফিরতে বেলা গড়িয়ে গেলো।
বাসুকে বললাম, তুই দোকানে থাকছিস ?
হ্যাঁ।
তুই থাকবি কি করে ? অনাদি বললো। ওদিককার কাজ কে সামলাবে ?
ঠিক বলেছিস। মনেই ছিলো না।
তুই ওখানে চলে আয়।
না। একেবারে কাল যাব।
তুই তাহলে একটু রাতের দিকে আয়। এই সাতটা।
ঠিক আছে তোকে যেতে হবে না, আমরাই আসবো। অনাদি বললো।
ঘরে ফিরে এলাম। নীপা ওবাড়িতে গেছে। কিছুক্ষণ পর এসে বললো, ভাত খাবে না।
না। এখন খেতে ভাল লাগছে না। তুমি আমাকে একটু চা দাও।
আমি কিন্তু এখন তোমাকে সময় দিতে পারবোনা বাপু। আমার নাচের রিহার্শাল আছে।
তাই।
হ্যাঁ।
কি নাচ করবে।
চিত্রাঙ্গদা।
ওরে বাপরে। সেতো বিরাট ব্যাপার। চাত্রাঙ্গদা কে হয়েছে ?
আমি মশাই আমি। তারপর আমার কাছে ছুটে এসে জাপ্টে ধরে বললো, তুমি কাল যাবেতো ?
নিশ্চই যাবো।
আবার জরুরি কাজ পরে যাবেনা।
হাসলাম।
কখন শুরু তোমাদের অনুষ্ঠান ?
এখন তাড়াতাড়ি রাত হয়ে যায়। এই ছটা ধরো।
তার মানে কাল তোমার নাগাল পাওয়া যাবে না।
ঠিক তা নয়, একটার পর থেকে মাঠে চলে যাবো। একটু স্টেজ রিহার্শাল করতে হবেনা।
ঠিক ঠিক।
নীপা এক দৌড়ে চলে গেলো।
চা খেয়ে এই বাড়িতে কাকার কাছে এলাম। বললাম আমি একটু আসছি।
কাকা অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, সন্ধ্যে হয়ে আসছে। এই সময় কোথায় যাবি।
দেখি।
টর্চটা নিয়ে যা।
দাও।
কাকা কাকীমাকে ডাকলেন। কাকীমা টর্চটা দিয়ে গেলেন। বললেন তাড়াতাড়ি চলে আসিস।
আচ্ছা। নীপাকে আশেপাশে কোথাও দেখতে পেলাম না।
আমি বেরিয়ে এলাম। আমাদের পুকুর পারের পেছনের রাস্তা ধরে বাঁশ বাগানের ভেতর দিয়ে একবারে খাল পারে চলে এলাম। নিঃঝুম রাস্তাটা পাগল অনির সঙ্গে কথা বলার জন্য যেনো ওঁত পেতে বসে আছে। চারিদিকে শুকনো গাছের পাতায় ঢাকা পঢ়ে গেছে। মাঝখানদিয়ে শরু দড়ির মত রাস্তাটা এঁকে বেঁকে সামনের দিকে এগিয়ে গেছে। আমি একটু নদীর পারে বসলাম। বর্ষাকালে গ্রামের মানুষ একে নদী বলে। তখন নদীর দু’কুল ছাপিয়ে জল গ্রামের মধ্যে ঢোকে। বাঁধ বাঁচাবার জন্য তখন গ্রামের সবাই হামলে পরে বাঁধের ওপর। বর্ষা চলে গেলেই গ্রামের লোকেরা বলে খাল। তখন তার রূপ শীর্ণকায়। এই খালে কতো নৌকা চালিয়েছি আমি আর ভানু। সামন্তদের নৌকা। বিমল সামন্ত। গ্রামের লোকেরা অপভ্রংশ করে বলতো বিমল সাঁতের লৌকো। সেইদিন গুলোর কথা মনে পরে গেলো। অনাদিরা তখনো এতো ক্লোজ হয় নি। টেনে পরার সময় আমরা সবাই দলবদ্ধ হলাম। ভানু ভানুর জায়গায় রইলো। ও আমাদের থেকে বয়সে বরো। কিন্তু ওই যে সিং ভেঙে বাছুরের দলে ঢুকলো আর বেরোতে পারলো না।
গোধুলি শেষে। ঘন কুয়াশার মতো সন্ধ্যা নেমে আসছে একটু একটু করে। আকাশের দিকে তাকাতে তারা গুলো মিট মিট করে জলছে। আমার দিকে তাকিয়ে চোখ মেরে বললো, কি অনিবাবু অনেকদিন পর এই রাস্তায়। কেমন আছ। নিজে নিজেই হেসেফেললাম।
পায়ে পায়ে হারু জানার কালায় এসে পরলাম। এই কালাটা এই গ্রামের বিখ্যাত জায়গা। কালা বলতে একটা ছোট পুকুর তার চারধারে ঘন জঙ্গল। দিনের বেলা এখানে সাধারণ গৃহস্থ কেউ আসে না। রাতের বেলা একবারেই না। নিষিদ্ধ জায়গা। ছোটো থেকেই নিষিদ্ধ জায়গার প্রতি আমার টান বেশি। ক্লাস টেন থেকে আমি উড়চন্ডী। ছোট সময় জানতাম। হারু জানার কালায় ভূত আছে। ওকানে গেলে কেউ জীবন্ত ফিরে আসে না।
একদিন পায়ে পায়ে রাতের অন্ধকারে চলে এসেছিলাম। লুকিয়ে দেখলাম। সেখানে যেন মোচ্ছব বসেছে। কতমেয়ে পুরুষ গায়া গা লাগিয়ে বসে আছে। ঠিক যেন ভানু-কালুচরণের ঝি। সবাই যে এই গ্রামের তা নয় আশেপাশের গ্রামেরও বেশ কয়েকজনকে দেখলাম। গ্রামের ঘরে বলে ভাকু। একচুয়েলি দেশি মদের কারখানা। খোলা আকাশের নিচে গরম গরম ভাকু খেয়ে ফুর্তির জায়গা। হাঁড়িপাড়া ডোমপাড় তাঁতীপাড় কামারপাড়ার অনেক মেয়ে পুরুষকে দেখলাম। সে কি ঢলানি। অনেকক্ষণ লুকিয়ে লুকিয়ে দেখলাম। কলকাতা এসে আবিষ্কার করলাম আমাদের গ্রামের হারু জানার কালা একটা বার।
ক্রমশঃ

জীবনে জীবন যোগ না করলে ব্যার্থ হয় গানের পসরা

৪৩

Re: কাজলদীঘি, শ্মশান ও পীরসাহেবের থান

পায়ে পায়ে শ্মশানে চলে এলাম। শ্মশানের পুকুর পারটায় বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়ালাম। নিঝুম কেউ কোথাও নেই। জোনাকি গুলো আলো ছড়িয়ে উড়ে উড়ে মাথার ওপর দিয়ে চলেযাচ্ছে। দু’একটাকে ধরার চেষ্টা করলাম পারলাম না। দু’একটা আমার গায়ে উড়ে উড়ে এসে বসছে। বেশ দেখতে লাগছে। পোকাগুলোর পেছন দিকটা জলছে নিবছে। মাথার ওপর বড় বড় শাল কদম মহানিম শিরিষ বাবলা জাম। গাছে বসে থাকা ক্লান্ত পাখিরা কিচির মিচির শব্দে জায়গাটাকে মাতিয়ে তুলেছে। একটু এদিক ওদিক তাকালাম। দূরে কোথাও শেয়াল হুক্কাহুয়া হুয়া-কা-কা-কা-হুয়া করে ডেকে উঠলো। মিত্রাকে সকাল থেকে ফোন করা হয় নি। অফিসার কি হালচাল কিছুই জানা হয় নি। সন্দীপকে বলেছিলাম, গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য পেলেই জানাবি। মোবাইলটা পকেট থেকে বার করলাম। একটা সিগারেট ধরালাম। এখানে দেখছি টাওয়ারটা ফুল। মিত্রাকে ডায়াল করলাম।
হ্যালো।
তুই কোথায়।
তোর ঘরে। ছোটমার সঙ্গে বসে গল্প করছি। আর তোর আদরে ভাগ বসাচ্ছি।
হাসলাম।
হাসছিস। তোর হিংসে করছে না।
এককেবারে না।
জানিস এসে চিংড়িমাছের কালিয়া শুক্তো দিয়ে ভাত খেলাম।
বাঃ বাঃ।
তোর লোভ হচ্ছে না।
চিংড়িমাছটা শুনে একটু লোভ হচ্ছে। তবে ঠিক আছে বড়মা আমার জন্য নিশ্চই তুলে রাখবেন।
না মশাই যেটুকু আনা হয়েছিল সব শেষ করে দিয়েছি।
অফিসে গেছিলি।
না।
এখানে কখন এসেছিস।
সেই সকালে।
দাদা বাড়িতে আছেন।
না।
মল্লিকদা।
দুজনেই একসঙ্গে বেরিয়েছে।
ও।
বড়মা কোথায়।
নিচে কারা এসেছেন কথা বলছেন।
তুইতো এখানে আসতে চাইছিলি কাল আসবি।
হ্যাঁ। মিত্রার কথায় উচ্ছলতা। আমি ওর চোখমুখ দেখতে পাচ্ছি।
কি করে আসবি।
তুই এসে নিয়ে যাবি।
হবে না। তোকে একলা আসতে হবে।
যাব।
এখানে আসার কত গুলো শর্ত আছে।
বল।
এখানে কাপড় ছাড়া কিছু পরা যাবে না।
তাই পোরবো।
খোলা আকাশের নীচে বাথরুম করতে হবে। তোর টাইলস বসান এক্সিকিউটিভ বাথরুম পাবিনা।
সেকিরে!
হ্যাঁ।
ঠিক আছে তাই করবো। কিন্তু কেউ যদি দেখেফেলে ?
দেখলে দেখবে।
তারমানে!
হ্যাঁ।
তুই এই ব্যাপারটা একটু দেখ।
হবে না।
অগত্যা।
টেবিল চেয়ার পাবি না। মাটিতে বাবু হয়ে বসে খেতে হবে।
এটা পারব।
গাড়ি নিয়ে কোথাও যাওয়া যাবে না। মাঠে মাঠে হেঁটে হেঁটে ঘুরতে হবে।
হ্যাঁ হ্যাঁ পারব।
বড়মা-ছোটমার সঙ্গে কথা বল। ছোটমাকে দে।
ছোটমা তোর সব কথা শুনেছে।
এইতো বুদ্ধি খুলে গেছে। রেকর্ডিং করেছিস নাকি ?
না না।
ছোটমা হো হো করে হাসছে, সত্যি অনি তুইনা একটা....।
কি বলো....।
না। ফিরে আয় বলবো।
কে এসেছে নিচে।
দাদার দূর সম্পর্কের এক আত্মীয়র মেয়ে।
বয়েস কতো।
সে জেনে তোর লাভ।
একটু....।
বুবুন খারাপ হয়ে যাবে বলছি। মিত্রার গলা, ছোটমা হাসছেন।
সত্যিতো। বেল পাকলে কাকের কি।
দাঁড়া তোর হচ্ছে। মিত্রার গলা।
তুই এখন কোথায় পাখির কিচির মিচির শব্দ শুনছি।
সেই জায়গায়। মিত্রার গলা।
না।
তাহলে।
শ্মশানে বসে আছি।
ছোটমা চেঁচিয়ে উঠলেন, তুই এই ভর সন্ধ্যেবেলা শ্মশানে বসেআছিস, তোর কি একটুও ভয়ডর নেই।
জায়গাটা দারুন।
তুই আগে ওখান থেকে চলে আসবি, আমি দিদিকে বলে দিচ্ছি।
উঃ তোমাদের নিয়ে আর পারা যাবে না। ঠিক আছে চলে যাচ্ছি। মিত্রাকে বলো কিছুক্ষণ পর ফোন করতে।
তুই চলেযা ওখান থেকে। মিত্রা বললো।
যাচ্ছিরে যাচ্ছি।
চারিদিকে ঘন অন্ধকার। পাখির কিচির মিচির শব্দটা কিছুটা ম্লান হয়ে এসেছে। মাঝে মাঝে পাখির ডানার ঝটপট শব্দ। দাঁড়কাকের কা কা ডাক। আকাশের তারাগুলোকে এখন বেশ পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। চাঁদ উঠেছে। তার স্নিগ্ধ আলোর পরশে অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। আমাদের হাই স্কুলের টালির চালটা আবছা দেখা যায়। দূরে ওই অশ্বত্থ গাছের তলাটা পীর সাহেবের থান। আমি প্রত্যেক দিন স্কুলে যাওয়া আসার পথে ওখানে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করতাম। ওর ঠিক পাশেই প্রচুর কুলের গাছ। কুল পাকার আগেই গাছ পরিষ্কার হয়ে যেতো। কুল খাওয়ার যোম ছিল পুনি আর সৌমি। ওরা এখন কোথায় হারিয়ে গেছে জানি না। অনাদিকে একবার জিজ্ঞাসা করতে হবে। ফোনটা বেজে উঠলো। মিত্রার ফোন।
হ্যালো।
অনুমতি পেয়ে গেছি। তুই বড়মার সঙ্গে কথা বল। বলো, বলোনা ও ঠিক শুনতে পাবে।
বুঝলাম মিত্রা ভয়েস মুডে দিয়ে রেখেছে।
হ্যাঁরে তুই নাকি শ্মশানে বসে আছিস।
হ্যাঁ।
এখনো!
হ্যাঁ। ওখান থেকেই তোমার সঙ্গে কথা বলছি।
তোরকি কোন ভয় ডর নেই।
গ্রামের ছেলের ভয় থাকতে নেই।
পাকামো করতে হবে না। এখুনি বাড়ি যা।
যাবো। মিত্রার সঙ্গে কথা হয়েছে।
ও একটা মেয়ে কি করে যাবে।
আফটার অল ও একটা কোম্পানীর মালিক এটা ভুলেযাচ্ছ কেনো। সব সময় লেংবোট নিয়ে ঘুরলে চলবে।
ঠিক আছে ঠিক আছে। আমি যেতে পারবো। তুই নার্সিংহোমের কাছে চলে আসবি আমি ওই রাস্তাটা পর্যন্ত চিনে চলে যেতে পারবো।
আচ্ছা।
কখন যাব বল।
একটা ফোন এসেছে। পরে বলছি।
মিত্রাকে ছারতেই সন্দীপের গলা ভেসে এলো।
কি হয়েছে।
কখন থেকে তোকে ট্রাই করছি কিছুতেই পাচ্ছিনা।
কেনো।
এখানে সব গজব হয়ে গেছে।
তোদের মালকিন কোথায়।
সে নাকি তোর সঙ্গে ভেগেছে।
আমার সঙ্গে।
হ্যাঁ। সেরকমি শুনছি।
এই খবর কোথা থেকে পেলি।
কাল সব পাকা খবর পাবো। তোকে বিকেলের দিকে ফোন করব। আমারতো সব কেমন যেন গুলিয়ে যাচ্ছে।
কেনো।
সুনিত যা বারাবারি আরম্ভ করেছে না, কি বলবো। সব নয়া নয়া মাল এ্যাপয়েন্টমেন্ট দিচ্ছে।
খাতা কলমে না মৌখিক।
মৌখিক। ম্যাডাম নাকি ওকে সমস্ত পাওয়ার দিয়ে তোর সঙ্গে লন্ডন ভেগে গেছে।
তোর কি মনে হয়।
সেতো আমি বুঝতে পারছি। মন মানে না।
বাড়িতে গিয়ে মাথায় সিঁদুর আর হাতে চুরি পরে বসে থাক।
দূর তোকে মন খুলে দুটো কথাও বলতে পারবো না।
বলবিনা।
অন্য কি খবর আছে বল।
সুনিত অফিসের মধ্যে হল্লা লাগিয়ে দিয়েছে। পদে পদে ঘরুই-এর সঙ্গে ঝামেলা করছে। চম্পকদা ওর সঙ্গে আছে। অন্যান্য ডিপার্টমেন্টের কিছু কিছু মাথা রয়েছে।
আমার সঙ্গে মালকিন ভেগেছে এই খবরটা কে দিল।
জানিনা। তবে অনেকেই জানে দেখছি।
কাল লেটেস্ট নিউজ চাই।
আচ্ছা।
সন্দীপের ফোনে মনটা খারাপ হয়ে গেলো। সুনিতের নতুন চাল। নাঃ একটা কিছু করতে হবে। কাল সন্দীপের কাছ থেকে নিউজটা নিই আগে। তারপর। কে রটালো। মিত্রাকে না বলে দিই আসার জন্য। তারপর ভাবলাম ওর মনটা খারাপ হয়ে যাবে। তার থেকে যেমন আছে থাক। দেখা যাবে।
পায়ে পায়ে শ্মশানের একেবারে ভেতরে চলে এলাম। কয়েকদিন আগে কাউকে হয়তো দাহ করা হয়েছে। ছড়িয়ে ছিটিয়ে পোড়া কাঠের টুকরো। ছেঁড়া কাপর। মাটির হাঁড়ি। শহুরে শ্মশানের মতো নয়। চারিদিকে শ্মশানের সেই ঘন জঙ্গল আর নেই। অনেক পরিষ্কার হয়েছে। কাকার মুখ থেকে এই শ্মশান সম্বন্ধে অনেক গল্প শুনেছি। অনেক মিথ এই শ্মশানকে নিয়ে তৈরি হয়ে আছে। সেই মিথের খোঁজেই আমি প্রথমে শ্মশানে আসি। তখন আমি টেনে পরি। আমার মা-বাবাকে এই শ্মশানে একই সঙ্গে দাহ করা হয়েছিল পাশাপাশি চিতায়। সেই জায়গাটা খোঁজার অনেক চেষ্টা করেছি। কাকা কখনো বলতেন পূবপারে যে অশ্বত্থ তলা আছে। তার কোলে পোরানো হয়েছিল। আমি সেই অশ্বত্থ গাছ খুঁজে পেয়েছি। কিন্তু তার কোল খুঁজে পাই নি। এখনো সেই গাছটা মাথা উঁচু করে দাঁরিয়ে আছে। আমি পায়ে পায়ে সেখানে গেলাম। মা বেঁচে থাকলে তার ছেলের কীর্তি হয়তো দেখে যেতে পারতেন। মনটা ভারি হয়ে গেলো। পারদপক্ষে এই সব চিন্তা করতে ভাল লাগে না। তবু মনে এসে যায়। পরিবেশ পরিস্থিতি মেনে।
একটা সিগারেট ধরালাম। মিত্রাকে ফোন করতে ইচ্ছে করছে। পকেট থেকে ফোনটা বার করে, ডায়াল করলাম।
হ্যাঁ বল।
কোথায় ?
ফিরছি।
তুই এখনো ফিরিস নি!
কি করে বুঝলি।
ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক শুনতে পাচ্ছি।
হাসলাম।
কেন এরকম করছিস বুবুন ফিরে যানা। রাতবিরেতে কোথায় কি হবে।
নারে আমার কিছু হবেনা দেখবি। বড়মা কি বললো।
বললো সাবধানে যাস। ও একটা পাগল তুই ওর পাল্লায় পরে পাগল হোস না।
কালকে তুই বড় গাড়িটা নিয়ে আসিস না।
কেনো।
এখানে রাখার জায়গা হবে না।
তাহলে।
ছোট গাড়িটা নিয়ে আসিস। তোর সঙ্গে কে আসবে।
আমি একা ড্রাইভ করে যাব।
না। বাইরুটে একলা আসিস না। ইসমাইলকে নিয়ে আসিস।
আচ্ছা।
দাদার সঙ্গে দেখা হলো।
হ্যাঁ। আমি যখন বেরোচ্ছি তখন দেখা হলো। দাদা ঢুকছেন।
বলেছিস।
না। বড়মা বলেছেন।
ঠিক আছে।
আসার সময় তুই একটা কাজ করবি।
বল।
কিছু বাজি কিনে আনবি।
কোথায় পাবো ?
ক্যানিং স্ট্রীটে।
এখনতো অনেক রাত হলো। দোকান সব বন্ধ হয়ে যাবে।
কটা বাজে।
আটটা। ঠিক আছে দেখছি।
কাল এখানে একটার মধ্যে পৌঁছনোর চেষ্টা করিস।
ঠিক আছে।
ফোন কাটতে না কাটতেই অনাদির ফোন।
তুই কোথায়।
হাসলাম। কেনো।
আমরা কখন থেকে এসে বসে আছি।
আমি শ্মশানে।
একা।
দোকা পাবো কোথায় ?
সত্যি তোর মাথায় কি ছারপোকা আছে।
তা আছে বইকি।
ঠিক আছে তুই বোস।
মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই দেখি বাইকের আওয়াজ। হেডলাইটটা প্রথমে ক্ষীণ তারপর উজ্জ্বল হলো। আমি অশ্বত্থ তলায় বসে আছি। বাইকে দুজন আরোহী। চাঁদের আলোয় যেটুকু দেখতে পাচ্ছি চিকনা আর সঞ্জীব বলে মনে হচ্ছে। ওরা আমায় দেখতে পাচ্ছে না। তারপর অনি অনি বলে চিতকার করলো। আমি সাড়া দিলাম।
তাড়াতাড়ি আয় ভাই। জীবনে এখনো অনেক কিছু পাওয়ার আছে। মরতে চাই না।
ওদের গলার স্বরে যে কাকুতি মিনতি ছিল তা শুনে আমি হেসে ফেললাম।
আমি ধীর পায়ে ওদের কাছে এলাম। আমি খালি বসার অপেক্ষা। চিকনা বাইক ছোটালো রুদ্ধশ্বাসে আমি মাঝখানে সঞ্জীব আমার পেছনে। গুম হয়ে আছে।
মিনিট তিনেকের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম। দেখলাম খামারে একটা জটলা। আমি গাড়ি থেকে নামতে চিকনা চেঁচিয়ে উঠলো। খিস্তি বাদে যা যা বিশ্লেষণে আমাকে আবাহন করার দরকার তাই করল। সঞ্জীবও বাদ গেল না। নীপা আরও গলা চড়িয়ে যা নয় তাই বলল। আমি মাথা নীচু করে শুনে গেলাম। কোন উত্তর দিলাম না। অনাদি খালি কাছে এসে আমার কাঁধে হাত দিয়ে বলল, চল ঘরে চল।
আমি ঘরে এলাম। আমার পেছন পেছন ওরা সবাই এলো।
সবাই কেমন গুম হয়ে আছে। চিকনা ঘরের সোফায় মাথা নীচু করে বসে আছে। আমি নিস্তব্ধতা ভেঙে চিকনার কাছে একটা সিগারেট চাইলাম। চিকনা উঠে এসে আমার পা ধরে ফেললো। একি করছিস তুই। অনি সত্যি বলছি আমি ভুল করে ফেলেছি।
আমি ওর হাত ধরে দাঁড় করালাম। তুই ভুল করিস নি। ঠিক করেছিস।
আমি তোকে অনেক বাজে বাজে কথা বলেছি।
তুই একটুও বাজে কথা বলিস নি। তোর জায়গায় আমি থাকলেও তোর মতো ব্যবহার করতাম।
চিকনা চোখ মুছছে।
তোরা আমাকে ভীষণ ভালবাসিস তাই তো। তোদের আমাকে হারাবার ভয়। তাইতো।
চিকনা মাথা দোলাচ্ছে। সঞ্জীব অপরাধীর মতো আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।
ওরে শ্মশানটা পবিত্র জায়গা। ওখানে ভয়ের কিছু নেই। ভয় করলেই ভয়।
শালা অনাদিটার জন্য। তখন বাসুর দোকানে যাওয়ার ব্যাপারটা ফাইন্যাল করলেই সব লেটা চুকে যেতো। তুই ওখানে কি ছিঁরলি এতোক্ষণ, বল। কয়েকটা পার্টির লোকের সঙ্গে কপচালি। লোকের পেছন মেরে চা খেলি....।
আমি হেসে ফেললাম।
অনাদি মুখ নীচু করে হাসছে। দোষ করলি তুই, ঝাড় খাচ্ছি আমি, দেখছিসতো।
চিকনা কাঁচা কাঁচা খিস্তি করলো, পার্টি করছে। তোর জন্য অনিকে আমি...।
নীপা চায়ের মগ নিয়ে ঘরে ঢুকলো। গম্ভীর কোন কথা না বলে ট্রেটা রেখে চলে গেলো। বুঝলাম, চিকনার মতো ওরও চোখ ছল ছল করছে।
অনাদি সবাইকে চা ঢেলে দিলো। চা খাওয়া হলো। আমি মেলার খবর নিলাম। শুনে মনে হচ্ছে বেশ বড়ো ফাংশন হবে। অনাদি মেলা কমিটির সেক্রেটারি। সঞ্জয় অনাদির অধস্তন। বাসু প্রসিডেন্ট। আমি অনাদিকে বললাম, হ্যাঁরে প্রসিডেন্টেরতো কোন কাজ কর্ম নেই তোদের প্রোগ্রামে।
আছে। তবে হাল্কা।
ওই জন্যই বাসু ওই পোস্টটা নিয়েছে। চিকনা বললো।
বাসু হাসছে। আমিও হাসছি।
তোকে কি পোস্ট দিয়েছে।
ফাংশন।
আরি বাবা এতো গুরু দায়িত্ব।
আমি সঞ্জয়কে দিয়ে দিয়েছি। বলেছি এই দায়িত্ব তুই নে আমি মাঠের দায়িত্বে থাকবো।
মাঠের আবার কি দায়িত্ব।
দেখবি কাল, ডাবুর বোর্ড বসবে।
সেতো জুয়া।
হ্যাঁ।
তোরা এলাও করবি।
অনাদিকে বল।
আনাদির দিকে তাকালাম।
হ্যাঁরে অনি। ওরাইতো মেলার সিংহভাগ খরচ দেয়।
আরো আছে শুনবি। চিকনা বললো।
আমি চিকনার দিকে তাকালাম।
ভাকুর ঠেক বসবে আরো কতো কি হবে। হাতের সুখ করতে হবে কাল।
যে রকম আমায় করে ফেলছিলি আর একটু হলে।
চিকনা অপরাধীর মতো চোখ করে বললো, তুই আর ওই কথা মনে করাস না।
হ্যাঁরে দিবাকর কোথায় ?
ও শালা কলকাতায় গেছে। কি ইন্টারভিউ দিতে। চিকনা বললো।
ও থাকবে না কালকে।
হ্যাঁ। একটু হামবরাক্কি ভাব করতে হবে না। দেখবি কাল খালি স্টেজের পাশে। মেয়েদের পেছন পেছন ঘুর ঘুর করছে।
ও এখনো বিয়ে করে নি।
সকালে যে মেয়েটা এসেছিল ওটাকে পটিয়েছে। ভানুকে জিজ্ঞাসা করবি ডিটেলস পাবি। তোকেতো ও দু’চোখে দেখতে পারে না। সেদিন তুইতো বাজার থেকে চলে এলি। আমায় বলল, অনিকে দেখে অতো আদিখ্যাতার কি আছে। দিলাম শালা বাপ তুলে। শুর শুর করে কেটে পরলো। ও তোকে একদম সহ্য করতে পারে না।

জীবনে জীবন যোগ না করলে ব্যার্থ হয় গানের পসরা

৪৪

Re: কাজলদীঘি, শ্মশান ও পীরসাহেবের থান

ওর একটা জেলাস কাজ করে সব সময়। বাসু বললো।
সব সময় খিস্তি দিস না। বয়স হয়েছে তো।
দেখ অনি খিস্তির কি মহিমা কাল বুঝতে পারবি।
হাসলাম। অনাদির দিকে তাকিয়ে বললাম, কাল বাসুকে আমার সঙ্গে একটু ছারবি।
তুই ওকে নিয়ে স্যারের চশমা আনতে যাবি ?
হ্যাঁ।
ও থাকা যা না থাকাও তা। সঞ্জয় বললো।
তাড়াতাড়ি চলে আসিস। আজকে যে খেল দেখালি তুই।
হাসলাম।
হাসিস না। জানিস গত সপ্তাহে হাঁড়ি পারার একটা মেয়ে ঘাস কাটতে গেছিলো ওখানে। ওকে ভূতে ধরেছিলো। গুনিনকাকার কাল ঘাম ছুটে গেছে ভূত তাড়াতে।
দূর। যত সব আজগুবি। কই আমাকেতো ভূতে ধরলো না।
জানিনা। তোর সঙ্গে তর্ক করে পারব না।
নারে অনি আমিও শুনেছি ব্যাপারটা। বিশ্বাস হয়না তবু বিশ্বাস করি। বাসু বললো।
আমি মিটসেফের কাছে উঠে গেলাম। মানিপার্টস থেকে কুড়ি হাজার টাকা বার করলাম। সঞ্জয় আর বাসুকে ভাগ করে দিয়ে বললাম, ব্যালেন্সটা আমায় বলিস কাল দিয়ে দেবো।
ওরা না গুনেই টাকাটা পকেটে ঢুকিয়ে নিলো।
আমি বললাম, গুনেনে।
সঞ্জয় আমার দিকে তাকিয়ে হাসলো, তুই কি কম দিবি।
না। তবু টাকা পয়সার ব্যাপার গুনেনে।
না থাক, বাড়িতে গিয়ে গুনব।
ওরা চলে গেলো।

আমার শ্মশানে যাওয়াটা যে খুব অন্যায় হয়েছে। রাতে খেতে বসে তা বুঝলাম। কাকীমা স্নেহের বকাবকি করলো। সুরমাসি মুখে কিছু না বললেও, ভূতের গুনাগুণ বিচার করলো। নীপা বার কয়েক সুরমাসির দিকে বিরক্তি পূর্ণ ভাবে চাইলো। কাকাও অনেক কথা বললো। বোঝালো। আমি বোবার শত্রু নেই এই ভাবে গোগ্রাসে গিলে চলে এলাম। বসা মানে কথা বাড়বে। সোজা নিজের ঘরে এসে খাটের পাশে গোছানো আমার কাপর গেঞ্জি পরে টান টান হয়ে শুয়ে পরলাম।
আমি ঘুমোই নি। ঘুমোনোর ভান করে পরেছিলাম। নীপা ঘরে এলো। তার কাজ সারছে। আর খালি ফুঁপিয়ে যাচ্ছে। আমি কোন কথা বললাম না। তারপর নীপা দরজাটা ভেজিয়ে বাইরে চলেগেলো। আমি বুঝলাম আজ বহুত গজব হয়ে গেছে। এ ভুলের সংশোধন আমাকেই করতে হবে। শ্মশান নিয়ে এতো কুসংস্কার এই গ্রামের মানুষের মধ্যে আছে তা কল্পনার অতীত। বেশ মনে পরে একবার কাকার কাছে বেধড়ক মারও খেয়েছিলাম। কি করবো ?
বিছানা ছেড়ে উঠলাম। দরজার ফাঁক দিয়ে দেখলাম নীপা ওর বিছানায় উপুর হয়ে শুয়ে ফুলে ফুলে কাঁদছে। আমার ভীষণ হাসিও পাচ্ছে। আবার করুণাও হচ্ছে। একটা ছোট্ট ব্যাপার নিয়ে এতোবড় একটা ঘটনা ঘটতে পারে আমার জানা ছিল না। অনাদি যদি ফোনটা না করতো তাহলে কিছুই হতোনা।
আমি দরজাটা আস্তে করে খুলে নীপার পাশে গিয়ে বসলাম। ওর পিঠে হাত রাখলাম। ফোঁপানিটা আরো বেরেগেলো। আমি জোরকরে ওকে বুকে টেনে নিলাম। ও আমার বুকে মুখ ঢাকলো। আমি ওকে বুকের সঙ্গে জাপ্টে ধরে উঠে বসলাম, তারপর পাঁজা কোলা করে তুলে ঘরে খাটের ওপর শোয়ালাম।
কি ভারিরে বাবা। এইটুকু একটা মেয়ে এতো ভারি হতে পারে আমার জানা ছিল না। যাক ফাঁকতালে কোলে চরা হয়ে গেলো।
আমি কথাটা এমন ভাবে বললাম, নীপা ফিক করে হেসে ফেললো। তরাক করে উঠে বসে আমার বুকে দু’চারটে ঘুসি মারলো।
আমি ওর হাত দুটো ধরে হাসতে হাসতে বললাম, বুকটা ভেঙেগেলে নীপার জন্য যে জায়গাটুকু আছে সেটুকুও চলে যাবে।
যাও আমার দরকার নেই।
জিভ দিয়ে চু চু চু করে বললাম ও কথা বলতে নেই। দেখো অতো সুন্দর মুখটা কেমন ভাতের হাঁড়ির পেছনের মতো লাগছে।
নীপা আমার বুকে ঝাঁপিয়ে পরলো। দাঁত বসালো। আমি উঃ করে উঠলাম। নীপা আমার গেঞ্জিটা তুলে দাঁত বসানো জায়গাটায় হাত বোলাচ্ছে।
জুতে মেরে গরু দান।
নীপা আমার দিকে তাকালো। তুমি ভীষণ স্বার্থপর। নিজেরটা ছাড়া কারুর কথা ভাবো না।
আরি বাবা আমি ভগবান নই। আমিও অন্যায় করতে পারি.....।
তুমি কেনো ওখানে গেছিলে।
ভালোলাগে বলে।
তোমার ভালো লাগার আর কোন জায়গা নেই।
না।
দিনের বেলা মানুষ যেতে ওখানে ভয় পায় আর তুমি রাতে.....।
আচ্ছা বাবা আর হবে না। এবার গেলে তোমরা জানতেও পারবে না।
আমার গা ছুঁয়ে কথা দাও তুমি আর যাবে না। গেলে আমি মিত্রাদিকে বলে দেবো।
শুঁড়ির সাক্ষী মাতাল।
কি বললে।
না কিছুনা।
নীপা আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
আমি তোমার গা ছুঁয়ে প্রতিজ্ঞা করার পর যদি যাই তাহলে কি হবে।
আমি মরে যাবো।
আর আমি ঢোল বাজিয়ে লোককে বলে বেরাবো নীপা মরিয়া গিয়া প্রমান করিলো সে মরে নাই।
উঃ তোমাকে নিয়ে পারা যাবে না।
মেঘ কাটলো। নীপাকে বললাম জলের জগটা নিয়ে এসো আকন্ঠ জল খাই।
আমি ওর দিকে তাকালাম। নীপা কোমর দুলিয়ে চলেগেলো মিটসেফের কাছে, জলের জগটা নিয়ে এলো, জল খেলাম, নীপা জলের জগটা নিচে নামিয়ে রেখে আমার পাশে বসলো।
জানো নীপা খুব ছোটবেলার একটা কথা মনে পরে যাচ্ছে।
কি।
তোমার মেঘনাদ পন্ডিতকে মনে পরে।
হ্যাঁ।
আমরা শেষের একবছর পন্ডিতমশাই-এর কাছে পরেছিলাম।
আমাদের খুব মারতো। একদিন সন্ধ্যে বেলা কাকার সঙ্গে দেখা করতে এলো, আমি তখন ঐ বাড়ির বারান্দায় বসে পরছিলাম, খুব জোড় পেচ্ছাপ পেয়েছে, কিন্তু নিচে নামা যাবে না, কাকাতো আছেই তারওপর পন্ডিত মশাই, কি করা যায়, পা টিপি টিপে, বারান্দার কোনায় গেলাম, দেখলাম মেঘনাদ পন্ডিত ঠিক চালের তলায় দাঁড়িয়ে, দিলাম মুতে, চাল থেকে জল গড়িয়ে মেঘনাদ পন্ডিতের গায়ে, মেঘনাদ পন্ডিত হঁ হঁ কের উঠলো দেখলে আমার সর্বাঙ্গ ভিজিয়ে দিলে, কাকা অবাক হয়ে বললেন, কে। কে আবার এত গুলো বেড়াল পোষো কেনো বলতো, ওদের খাওয়ার খরচতো আছে।
নীপা হেসে কুটি কুটি খাচ্ছে, একবার আমার গায়ে ঢলে পরে একবার বিছানায় শুয়ে পরে।
তুমি এতো দুষ্টু ছিলে।
দুষ্টু বললে ভুল হবে, সেই মুহূর্তে আমার কিছু করার ছিল না।
অনিদা তুমি তখন খুব রাগ করেছিলে তাই না।
একদম নয়।
আমি তোমার সমস্ত কথা বাইরে দাঁড়িয়ে শুনেছি। তোমার জায়গায় অন্য কেউ হলে তো......।
আমি নীপার দিকে তাকালাম, যাও এবার শুয়ে পরো।
না আর একটু গল্প করি।
কাল তোমার প্রোগ্রাম আছে, রাত জেগে বেশি গল্প করলে, কালকে চোখের তলায় কালো দাগ পরে যাবে।
ঠিক আছে। গুড নাইট।
গুড নাইট।

পরদিন সকালে নীপা এসে যখন ডাকলো, তখন সাড়ে নটা বেজে গেছে, আমি হুড় মুড় করে উঠে বসলাম, নীপা মিত্রার দেওয়া সেই লং-স্কার্ট আর গেঞ্জিটা পরেছে, গোল গলার গেঞ্জিটা নীপাকে দারুন
কি দেখছো।
তোমাকে । দারুন মানিয়েছে।
মিত্রাদির চয়েস আছে, কি মোলায়েম।
আমি খাটে বসে আছি, নীপার স্নান হয়ে গেছে, মাথায় শেম্পু করেছে, চুলটা কালো মেঘের মতো ফুলে আছে।
মিত্রাদি ফোন করেছিলো।
তোমায়।
হ্যাঁ।
কি বললো।
তোমার কথা জিজ্ঞাসা করলো, আর বললো ওকে গুঁতিয়ে তোল, না হলে ওর ঘুম ভাঙবে না।
হাসলাম।
হাসলে যে।
শেষের কথাটা বারিয়ে বললে।
ঠিক আছে, তুমি ফোন করে জেনে নাও।
ঠিক আছে।
ওঠো বিছানাটা গুছিয়ে দিই, তুমি দাঁত মেজে নাও।
ঘুটের ছাই আছে।
কেনো।
অনেক দিন ঘুটের ছাইএ দাঁত মাজিনি।
তুমি সত্যিই গাঁইয়া।
আমি শাঁইয়া কে বলেছে।
কি বললে।
শাঁইয়া। গ্রামের লোকেরা যদি গাঁইয়া হয়, শহরের লোকেরা শাঁইয়া।
সত্যি তোমার মাথা বটে।
হাসলাম।
তুমি কেবলার মতো হেসোনাত।
আমি কেবলা।
তা নয়তো কি।
তোমার সারপ্রাইজের কথা বললে নাতো।
কিকরে জানলে।
কাল রাতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে তোমাদের সমস্ত কথা শুনেছি।
আমি মাথা নীচু করলাম।
দিবাকরদা তোমায় একেবারে সহ্য করতে পারে না।
এটা ওর স্বভাব। সেই ছোট থেকে।
কেনো।
ও স্কুলে ফাস্ট হতো আর আমি সেকেন্ড, কিন্তু ফাইন্যালে গিয়ে ওকে বিট করলাম।
মসাই বলেছে, তুমি স্টার পেয়েছিলে। সাতটা বিষয় লেটার। আচ্ছা অনিদা তুমি বাংলায় লেটার পেলে কিকরে।
কিকরে জানবো, হয়তো ভালো লিখেছিলাম।
তোমার পর এই গ্রামে কেউ এখনো পর্যন্ত বাংলায় লেটার পায় নি। উনামাস্টার পদে পদে সবাইকে শোনায়।
স্যার আমাকে খুব ভালবাসতেন।
তোমার মাথাটা আমার ফাঁক করে দেখতে ইচ্ছে করে।
ঠিক আছে একদিন দেখাবো।
আমি বিছানা থেকে উঠে, নীপার কোমরে একটা খোঁচা মারলাম।
আ।
কিহলো।
আমার হাত ধরে ঘর থেকে বের করে দিয়ে বললো যাও মুখ ধুয়ে এসো।
আমি বেরিয়ে এলাম।
পুকুর ধারে একটা কচি বাঁশের ডগা নিয়ে দাঁতন বানালাম। বেশ কিছুক্ষণ ভাল করে রগড়ে পুকুরে মুখ ধুয়ে চলে এলাম।
নীপা চা বিস্কুট নিয়ে হাজির।
চা খেতে খেতে নীপাকে বললাম তুমি কখন বেরোবে।
একটা নাগাদ।
তাহলে তোমার সঙ্গে আমার সেই বিকেলে দেখা হবে।
আজকে না গিয়ে যদি কালকে যাও।
কেনো।
তাহলে তুমি আমার সঙ্গে যেতে।
তাহলে কি হতো।
আমার বুকটা ফুলে যেতো।
তোমার বুকটাতো এমনি ফোলা ফোলা দেখছি। আর ফুলিয়ো না খারাপ দেখাবে।
নীপা ছুটে এসে আমার মাথাটা ধরে বললে, একেবারে মাথাটা ভেঙে দেবো। খালি মাথায় কু-বুদ্ধি। দাঁড়াও মিত্রাদিকে ফোন করছি।
সকাল বেলা চিকনাদা এসে একবার তোমার খোঁজ করে গেছে। আমাকে বললো এককাপ চা দে, চা খেয়ে চলে গেলো। তুমি আজ না গেলে নয়।
আরে বাবা যেতে আস্তে যতটুকু টাইম লাগে।
ঠিক আছে, যাও।
নীপা মিটসেফের কাছে চলে গেলো, কি যেনো খোঁজা খুঁছি করছে মিটসেফের ওপরে।
আমি ডাকলাম, নীপা।
নীপা ফিরে তাকালো।
আমার মানিপার্সটা নিয়ে এসো।
নীপা আমার মানিপার্সটা হাতে করে নিয়ে এলো। আমি ওখান থেকে তিনটে একশো টাকার নোট বার করে ওর দিকে এগিয়ে দিলাম। রাখো।
কিহবে।
রাখোনা।
না।
আমি একদিন মেলায় গিয়ে কষ্ট পেয়েছি এটার জন্য, আমি চাই না তুমি কষ্ট পাও।
নীপার চোখ দুটো ছল ছল করে উঠলো।
নাও।
নীপা টাকাটা হাতে নিয়ে আমার গলা জড়িয়ে ধরলো। তুমি এতো ভাব।
ভাবিনা ফিল করি।
কাঁদেনা। কান্না দুর্বলের প্রতীক। দাঁতে দাঁত চেপে লড়বে সব সময়, কাউকে এক তিলার্ধ জমি বিনাযুদ্ধে ছেড়ে দেবে না।
নীপা আমার দিকে তাকালো, আমার চোখের আগুনে ও পরিশুদ্ধ হলো।
আমি পারবো অনিদা!
নিশ্চই পারবে, আমিতো আছি।
নীচ থেকে কাকার গলা পেলাম, আমার নাম ধরে ডাকছে, আমি জানলা দিয়ে মুখ বারকরে বললাম, কি হয়েছে।
তোর কাকীমা জিজ্ঞাসা করলো কখন বেরোবি।
এইতো স্নান করেই বেরিয়ে যাব।
খাবি না।
না। এসে খাবো।
সেকি হয় নাকি।
ঠিক আছে তুমি যাও আমি যাচ্ছি।
নীপা আমার দিকে তাকালো। কাছে এসে আমায় প্রণাম করলো।
এটা কিসের জন্য।
তোমার সম্মানটা যেন আজ রাখতে পারি।
নিশ্চই পারবে। যাও।


আমি উঠে পড়ে স্নান করে রেডি হলাম, কাকীমা খাওয়ার কথা বললো, আমি বললাম, তাড়াতাড়ি ফিরে আসবো, তুমি চিন্তা করো না, পারলে একটু মুড়ি আর চা দাও।
সুরমাসি মুড়ি আর চা নিয়ে এলো, আমি সুরমাসিকে জিজ্ঞাসা করলাম, হ্যাঁগো চিংড়িমাছের টক আছে।
সুরমাসি হাসলো। কেনো।
এসে চিংড়িমাছের টক দিয়ে পান্তা খাবো।
আছে।
বাসু ঠিক সময় এলো। মোবাইলের ঘড়ির দিকে তাকালাম। সাড়ে এগারোটা বাজে। বাসুকে বললাম, চা খাবি।
বানাতে হবে নাকি।
তাতো বলতে পারবো না। ঠিক আছে সুরমাসিকে জিজ্ঞাসা করি দাঁড়া। সুরমাসিকে ডাকলাম।
সুরমাসি বললো, আছে। নিয়ে আসছি।
বাসু আমার দিকে তাকিয়ে মিটি মিটি হেসে বললো, অতো বেলা পর্যন্ত ঘুমোচ্ছিলি কেনো।
তোকে আবার কে বললো ?
চিকনা।
নীপা বলছিলো, চিকনা আমায় খোঁজ করতে এসেছিলো। কেনো বলতো।
একটা চিঠি লিখে দিতে হবে।
কিসের জন্য।
কোথায় একটা ইন্টারভিউ দিতে যাবে।
তার মানে বায়োডাটা।
হ্যাঁ হ্যাঁ মনে পরেছে।
ওর কি চাকরির খুব দরকার।
মাঠে খেটে আর কত দিন চালাবে বলতো। অত গুলো পেট। কতই বা ধান হয়।
ঠিক আছে। তোর কাছে গেছিলো নাকি ?
হ্যাঁ। আমি বললাম অনাদির কাছ থেকে লিখে নে। দিল গালাগালি, তোকে আমাকে দুজনকে। তোকে একটু কম আমাকে বেশি।
হাসলাম।
বাসু বললো, চল এবার বেরোন যাক।
আমি বললাম হ্যাঁ চল।
নীপাকে দেখছি না।
বাবাঃ সেতো আজ পৃথিবীর ব্যস্ততম মানুষ।
বাসু হাসলো। আমি ভেতরের ঘরে গিয়ে কাকাকে বলে বেরিয়ে এলাম।
মোরাম রাস্তায় উঠতেই পচার সঙ্গে দেখা। মাঠে কাজ করছে। দেখা হতে, মাঠ থেকে উঠে এলো, বললো, আর ঘন্টাখানেক কাজ করে চলে যাবে। আমায় জিজ্ঞাসা করলো, নার্সিংহোমে যাচ্ছি কিনা। আমি বললাম, হ্যাঁ।
বেরিয়ে এলাম, আসার সময় বাসুকে সমস্ত ব্যাপারটা বললাম।
সর্বনাশ। তুই ম্যাডামকে কোথায় রাখবি।
আমার ঘরে।
ওরে থাকবেতো, না পালিয়ে যাবে।
আমি দশ বছর ধরে ওর সঙ্গে মিশছি। মনে হয়না ওর কোন অসুবিধে হবে। তোকে একটা কাজ করতে হবে।
কি ?
গাড়িটা রাখার একটা ব্যবস্থা করতে হবে।
সেতো বাজারেই রাখা যাবে আমার দোকানের সামনে।
বাজার পর্যন্ত রাস্তা হয়ে গেছে।
হ্যাঁ।
তাহলেতো কোনো চিন্তা নেই। তুই কি যেখানে থাকতিস সেখানেই আছিস।
হ্যাঁ। তবে বাজারের শেষ প্রান্তে একটা ঘর করেছি। বাড়িতে সমস্যা। তাই বউ ছেলে নিয়ে এখানে চলে এসেছি।
বাবা-মা।
বাড়িতেই আছেন। প্রত্যেক দিন সকাল বিকেল যাই।
বাড়িতে বাবা-মা ছাড়া কে আছেন।
মেজভাই ছোটভাই আর ওদের বউ। মেজভাই-এর বউটা শুবিধার নয়।
কি করে।
জমি জমা সব ভাগ হয়ে গেছে। চাষ করছে খাচ্ছে।
তোর কি খালি দোকান।
হ্যাঁ। শ্বশুরের কাছ থেকে কিছু টাকা নিয়েছিলাম। আর জমি বেচেছি। তাই দিয়ে দোকান। কিছুটা জমি চিকনা চাষ করে।
ব্যবসা কেমন চলছে।
চলে যায় আর কি। এখানকার পরিস্থিতিতো জানিষ। সব ধারে বিজনেস। মাসে মাসে টাকা।
আমার ব্যালেন্সটা তোর বলার কথা ছিলো।
তোর কাছ থেকে আর কিছু পাবো না।

জীবনে জীবন যোগ না করলে ব্যার্থ হয় গানের পসরা

৪৫

Re: কাজলদীঘি, শ্মশান ও পীরসাহেবের থান

সে কি করে হয়। কাকার পাওনা, আমার পাওনা। সব মিলিয়ে......।
আর দু’একশো টাকা হয়তো পাবো।
সেটাওতো টাকা, নাকি টাকা নয়।
তুই এতো হিসেব করিস না।
ঠিক আছে।
ফোনটা বেজে উঠলো।
বাসু বাইক থামালো। পকেট থেকে বার করে দেখলাম মিত্রার ফোন।
কোথায় এখন।
আমি পৌঁছেগেছি।
এতো তাড়াতাড়ি।
তুই আয় বলবো। তুই কোথায়।
আমার যেতে আরো মিনিট পনেরো লাগবে।
ঠিক আছে।
কি ম্যাডাম পৌঁছে গেছেন। বাসু বললো।
আর বলিস না, আমার অনেক জ্বালা, সংসারনেই তবু ভরাসংসার।
সত্যি তুই ছিলি, না হলে স্যারের যে কি হতো।
দুর ওই সব নিয়ে ভাবি না।
নারে অনি, ললিতাকে তোর কথা বলতেই, ও বিস্ময়ে আমার দিকে তাকায়।
তোর বউকে এর মধ্যে একদিন দেখতে যাব।
কবে যাবি।
কথা দেবোনা। হুট করে চলে যাবো।
তুই বাইক চালাতে জানিস না।
না।
সাইকেল চালাতে পারিসতো।
পারতাম। এখন পারবনা। অভ্যাস নেই।
দাঁড়া তোকে বাইকটা শিখিয়ে দেবো।
না। তার দরকার পরবে না।
কেনো।
কলকাতায় অফিসের গাড়ি চড়ি, কোথাও গেলে প্লেন কিংবা ট্রেন। বাইক চালাব কখন।
তাও ঠিক।
কথা বলতে বলতে পৌঁছে গেলাম। নার্সিংহোমের দোরগোড়ায় মিত্রার গাড়িটা রাখা আছে। বাসু বাইকটা একটা সাইড করে রাখল। আমরা দুজনে ভেতরে এলাম, সেই রিসেপসনিস্ট ভদ্রমহিলা ছিলেন, আমাদের দেখে বললেন, দাঁড়ান ম্যাডামকে খবর দিই।
আমার চশমা।
ওটা রেডি আছে। ম্যাডাম বলেছেন, আপনি এলেই খবর দিতে।
মেয়েটি ভেতরে চলে গেলো।
কিছুক্ষণ পর বেরিয়ে এসে বললো, আপনাকে একবার ভেতরে ডাকছেন।
আমি ভেতরে গেলাম, বাসুও আমার সঙ্গে এলো। বুঝলাম এটা মালিকের বসার ঘর। আরও দুতিনজন বসে আছেন, আমি কাউকে চিন্তে পারলাম না, তবে ডঃ বাসুকে চিন্তে পারলাম। আমাকে দেখে মুচকি হেসে মিত্রা বললো, বোস।
আমরা বাইরে আছি। মনে হচ্ছে মিটিং চলছে।
তোকে নিয়ে আর পারা যাবে না। মিটিং নয় একটু কথা বলছি।
ঠিক আছে তুই বল না, আমি থাকলে এনাদেরও কিছু সমস্যা থাকতে পারে।
তোর সঙ্গে আলাপ করাবার জন্য ওনাদের ডেকেছি।
বাধ্য হয়ে বসলাম।
মিত্রা একে একে সবার সঙ্গে আমার আলাপ করিয়ে দিলো। বুঝলাম এরা সবাই ডাক্তার। এও জানাতে ভুললো না আমি কোম্পানীর ওয়ান অফ দেম মালিক। বাসু আমার দিকে একবার তাকাল। বিস্ময় ওর চোখে ঝোরে পরছে। সত্যিতো আমি এই কথাটা ওদের গোপন করেছি। বাসুই প্রথম জানলো। বাসুর চোখে যেমন বিস্ময়, ঠিক তেমনি যারা এখানে বসে আছেন তাদের চোখেও বিস্ময়। ওরা যেনো ভুত দেখছে। এরা নিশ্চই ভেবেছিলো, আমি মিত্রার খুব পরিচিত তাই সব ফ্রি করে দিয়েছে। ডাক্তাররা সবাই এবার আমাকে চেপে ধরলেন। আমি খালি একটা কথাই বললাম, মিত্রা আমার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু তাই এই কথা বলছে। মিত্রা আমার দিকে তাকিয়ে একবার হাসলো, বুবুন তুই এতবড় মিথ্যে কথাটা বলতে পারলি। আমি ওকে ফোন করবো।
না এই উপকার তোকে করতে হবে না। ফেরার দিন সময় নিয়ে আসবো, জমিয়ে গল্প করা যাবে।
একটু কফি খা।
এখানে এসে এই ঘরে বসে কফি খেতে ভালো লাগবে না। তার থেকে বরং বাইরে কোথাও বাঁশের বেঞ্চিতে বসে চা খাবো।
আসর ভাঙলো। আমি সবার আগে বেরোলাম, কাউন্টারে এসে চশমাটা চাইতেই মেয়েটি দিয়ে দিলো। আমি ডঃ বাসুর চেম্বারে একবার গেলাম, উনি বসেছিলেন। আমি দরজাটা ফাঁক করে বললাম, আসতে পারি। দেখলাম ডঃ বাসু চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন, একি বলছেন স্যার। ভাবটা এরকম পারলে আমার চেয়ারে আপনি বসুন। আমি চশমার ব্যাপারে ওনাকে জিজ্ঞাসা করলাম, উনি সব বলে দিলেন, বললেন কোন অসুবিধে হবে না। দিন সাতেক রেসট্রিকসন-এ থাকতে বলুন, আর ওষুধ গুলো পনেরোদিন কনটিনিউ চলবে। পনেরো দিন পর একবার দেখাতে হবে।
ঠিক আছে।
উনি একবার দেঁতো হাসি হাসলেন। বাইরে বেরিয়ে এসে দেখি, মিত্রা কাউন্টারের কাছে দাঁরিয়ে। আমি বললাম চল।
দাঁড়া রবিন একটু বাইরে গেছে।
ইসমাইল আসে নি।
ওর বাচ্চাটার একটু শরীর খারাপ। রবিন এই এলাকার ছেলে, বললো সব চিনি।
কিছুক্ষণ পর রবিন এলো, ধোপদুরস্ত পোষাক, অফিসের ড্রেস কোড, মাথায় টুপি কোমরে বেল্ট আমায় দেখে হেসে ফেললো, স্যার।
ও তুমি।
হ্যাঁ স্যার।
তুই চিনিস।
চিনবোনা মানে, ওকে সারাজীবন মনে রাখবো।
কেনো।
তোর বাড়িতে প্রথম দিন ওই ঢুকতে দেয়নি।
রবীন মাথা চুলকোচ্ছে।
না স্যার মানে তখন......।
চিনতে না। এখন চিনে ফেলেছো।
হ্যাঁ স্যার।
বাসু আমার কীর্তিকলাপ দেখে হাসছে, মিত্রা হাসতে গিয়েও গম্ভীর হতে চাইছে, ওর মুখটা অদ্ভূত লাগছে।
চল তাহলে।
তুই ওকে বলে দে।
গাড়িতে উঠি আগে।
আমরা বেরিয়ে এলাম, দুচারজন ডাক্তার পেছন পেছন এসেছিলো গাড়ির কাছ পর্যন্ত, আফটার অল মালকিন বলে কথা।
মিত্রাকে বললাম, তুইতো গাড়ি চালাতে পারিস, এই টুকু রাস্তা তুই চালিয়ে নিয়ে চল।
মিত্রা আমার দিকে একবার কট কট করে তাকালো।
পেছন দিকে বসার জায়গা রেখেছিস।
মিত্রা অপ্রস্তুত হয়ে পরলো।
রবীন বাসুর বাইকে বসুক। আমি সামনের সিটে বসি। তুই ড্রাইভ কর।
মিত্রার চোখে দুষ্টুমির হাসি খেলে গেলো। বাসু আমার দিকে একবার চাইল।
আর একটা কথা বাসু, আনাড়ি ড্রাইভার, সামনে তুই থাকবি একটু আস্তে চালাস।
বাসু হাসলো।
মিত্রা গাড়ি স্টার্ট দিলো। বাসু সামনে সামনে যাচ্ছে। আমরা পেছনে।
মিত্রা আজ একটা ঢাকাই জামদানী পরেছে, লাইট তুঁতে কালারের। তারসঙ্গে ম্যাচিং করে তুঁতে কালারের ব্লাউজ ওকে দারুন লাগছে। অনেক দিন পর ওকে শাড়ি পরা অবস্থায় দেখলাম, মিত্রার চোখ সামনের দিকে। সব জানলার কাঁচ বন্ধ, ভেতরটা বেশ ঠান্ডা ঠান্ডা।
এসিটা চালাবো।
চালা।
মিত্রা সুইচ অন করলো।
টেঙ্কি ভরে এনেছিস।
কেনো।
এখানে ২৫ কিমির আগে কোন পেট্রল পাম্প পাবি না।
সেকিরে।
সেকিরে না। গ্রাম দেখার সখ এবার মিটে যাবে। আর আসতে চাইবি না।
তোকে বলেছে। রবীন আছে, ঠিক ব্যবস্থা করবে।
পেছনে এত কি নিয়ে এসেছিস।
একটা আমার জামা কাপড়ের ব্যাগ, আর একটায় ক্যামেরা, আর তোর বাজি।
এতো কি বাজি নিয়ে এসেছিস। বাজার শুদ্ধু তুলে এনেছিস নাকি।
আমি জানি না যা, ইসমাইলকে বললাম, ওর কোন পরিচিত দোকান থেকে নিয়ে এসেছে।
কত টাকার নিয়ে এসেছিস।
পয়সাই দিই নি।
তার মানে।
ইসমাইল বললো, ম্যাডাম ফিরে এসে দেবেন। ওরা এখন দোকান বন্ধ করছে।
আমি সামনের দিকে তাকিয়ে আছি। গাড়িটা যে চলছে বুঝতেই পারছিনা। কোন জার্কিং নেই, খুব স্মুথ চলছে, মিত্রার হাতটাও ভালো। বেশ ঠান্ডা ঠান্ডা লাগছে। বাইরে রোদ ঝলমল করছে। কটা বাজে ? রোদ দেখে মনে হচ্ছে দুটো কিংবা আড়াইটের মাঝা মাঝি।
কিরে বললিনাতো আমায় কেমন লাগছে ?
মিত্রার দিকে তাকালাম, ফিচলেমি করার খুব ইচ্ছে হচ্ছে, কিন্তু ও গাড়ি চালাচ্ছে, ওর তলপেটের অনেকটা অংশ নিরাভরণ আমার চোখ ওদিকে চলে গেলো। সুপার্ব, কামরে খেতে ইচ্ছে করছে।
ধ্যাত।
মিত্রা ব্রেক কষলো। যেখানে ব্রেক কষলো গাড়ি সেখানেই থামলো। আমার কপাল সামনের বোনেটে ধাক্কা খেলো। চেখে জল এসে গেলো। মাথায় হাত দিয়ে মুখ তুললাম। মিত্রা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে। আমার হাতটা চেপে ধরেছে। দেখলাম বাসু বাইক থামিয়ে নেমে আসছে। রবীন ওর পেছন পেছন। মিত্রা আমার দিকে কাঁচুমাচু মুখ করে তাকিয়ে। কানে এলো।
কিহলো।
ওই ছাগলের বাচ্চাটা।
ম্যাডাম খুব সাবধানে, এখানে মানুষ চাপা দিলে কেশ খাবেন না। তবে ছাগল চাপা দিলে আপনার জরিমানা হবে। তোর আবার কিহলো।
আর বলিশ না প্রাণ হাতে নিয়ে এই সিটে বসেছি।
আমি এমন ভাবে বললাম, সবাই হেসে ফেললো, চল। পরেছি যবনের হাতে খানা খেতে হবে সাথে।
কি বললি।
না কিছু নয়।
খুব খারাপ হয়ে যাচ্ছে কিন্তু।
ওরা বাইক স্টার্ট দিলো। মিত্রা গাড়ি চালাচ্ছে।
খুব লেগেছে।
একটুও না। বোনেটটা আমার কপালে চুমু দিলো।
ঠিক আছে চল গিয়ে বরফ লাগিয়ে দেবো।
বরফ ! কোথায় পাবি।
কেনো  ফ্রিজ নেই।
ফ্রিজ। এমন ভাবে বললাম মিত্রা হেসে ফললো।
সত্যি বলনা।
এখানে ফ্রিজ বলতে পানাপুকুরের পচা পাঁক।
তুই সত্যি.....।
নিজের চোখে দেখবি চল না। অনি সত্যি না মিথ্যে।
কি করবো বল ছাগল বাচ্চাটা লাফাতে লাফাতে.....।
দেখ এখনো আমি বিয়ে করি নি, বাপ হই নি.....।
বিয়ে করার অত শখ কিসের, পরের বউকে নিয়ে রয়েছো তাতেও শখ মিটছে না।
যতই হোক পরের বউতো।
মিত্রার গলাটা গম্ভীর হয়ে গেলো, নিজের বউ করেনে।
চুপ চাপ থাকলাম, মিত্রার চোখ সামনের দিকে। চোখে জল টলটল করছে। আমি ওর সিটে হাত রাখলাম। এরকম করলে এনজয়টাই নষ্ট হয়ে যাবে।
মিত্রার হাত স্টিয়ারিংয়ে একবার ডান দিক একবার বাঁদিক করছে।
তুই ওরকম বললি কেনো।
আচ্ছা বাবা আর বলবো না।
চকে এসে বাসু দাঁড়ালো, আমরাও দাঁড়ালাম। চা খাওয়া হলো, মিত্রা তাকিয়ে তাকিয়ে চারিদিক দেখছে, বিস্ময়ে ওর চোখের পাতা পরে না। বাঁশের তৈরি বেঞ্চে বসে চা খেলাম। মিত্রা এক চুমুক দিয়ে আমার দিকে তাকালো। সত্যি অনি তোর কথা অক্ষরে অক্ষরে মিলে যাচ্ছে। আমি ওর দিকে চেয়ে হাসলাম। রবীন একটু দূরে দূরে।
বাসু বললো, ম্যাডাম এবার রবিন চালাক, আর মিনিট পনেরোর পথ।
মিত্রা বললো, কেনো আমি পারবো না।
পারবেন। তবে রবিন চালাক।
তাই হোক। মিত্রা আমার দিকে তাকিয়ে বললো, তুই কোথায় বসবি।
আমি বাসুর পেছনে বসছি।
ওর মনপসন্দ হলো না। মুখ দেখেই বুঝতে পারছি। কিন্তু মুখে কিছু বললো না। রবিন স্টিয়ারিংয়ে বসলো। আমরা আধাঘন্টার মধ্যে পৌঁছে গেলাম। বাসু মনে হয় ফোন করে সব ঠিক করে রেখেছিলো। গাড়ি থামতেই সবাই ঘিরে ধরলো। আমি বললাম বাসু ব্যাগগুলো পৌঁছবার ব্যবস্থা করতে হবে।
তোকে ভাবতে হবে না। বরং চল তোদের পৌঁছে দিয়ে আসি।
তোর বাইকে তিনজন। মিত্রার দিকে তাকালাম। মিত্রা ঘার নাড়ছে। যাবেনা। রবীন বললো ম্যাডাম আমাকে যদি ছুটি দেন কালকেই চলে আসবো।
মিত্রা বললো, ছুটি মানে! তুমি কোথায় যাবে ?
রবীন বললো, পাশের গ্রামেই আমার আত্মীয়ের বাড়ি। তাছাড়া এখান থেকে গাড়ি আর কোথাও নিয়ে যাওয়া যাবে না। আপনাকে পায়ে হেঁটেই....।
আমি হাসলাম, ঠিক আছে যাও। কালকে সকালে চলে আসবে কিন্তু। মিত্রা আমার দিকে তাকালো।
এখান থেকে মিনিট কুড়ি হাঁটতে হবে।
তাই চল।
রাসপূর্নিমার মেলা বলে আজ এই জায়গাটা ফাঁকা ফাঁকা। নাহলে এতোক্ষণ ভির হয়ে যেতো।
আমরা হাঁটতে আরম্ভ করলাম, সত্যি মিনিট কুড়ি লাগলো। বাসু তার আগেই বাড়িতে সব পৌঁছে দিয়েছে, কাকা ওকে জিজ্ঞাসা করেছে, এত ব্যাগ বাগিচা কার। বাসু কোন জবাব দেয় নি, চলে এসেছে। রাস্তায় আমার সাথে দেখা হতে খালি বললো, সারা পারা মনে হয় রাষ্ট্র হয়ে গেছে। তোর সারপ্রাইজ রসাতালে যাবে।
তুই তাড়াতাড়ি খেয়েদেয়ে আয়।
ঠিক আছে।
দুজনে মিলে খামারে এসে দাঁড়াতেই কাকা কাকীমা সুরমাসি ছুটে এলেন। সবাই অবাক মিত্রাকে দেখে,  মিত্রা সবাইকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলো। কাকা চেঁচামিচি আরম্ভ করে দিয়েছে।
আমি বললাম, তুমি থামো, ওরজন্য তোমায় ব্যস্ত হতে হবে না।
কাকীমা ছুটে গিয়ে সরবত নিয়ে এলেন। এক হুলুস্থূলুস ব্যাপার। মিত্রা আরাম করে বেঞ্চিতে বসেছে। পায়ে ধুলো জড়িয়ে আছে। আমি বললাম, দেরি করিস না। বেলা গড়িয়ে গেছে। হাত-মুখ ধুয়ে কিছু খেয়ে নিই। মেলায় যেতে হবে। মিত্রা চোখের ইশারায় বাথরুমের খোঁজ করছে, বাধ্য হয়ে বললাম, চল আমার ঘরে।
আমি ওর ক্যামেরার ব্যাগ আর জামাকাপরের ব্যাগ হাতে নিয়ে ওবাড়িতে গেলাম। মিত্রা আমার পেছন পেছন। আমি ওপরের ঘরে এলাম। লাইট জালালাম। মিত্রা ঘরে ঢুকেই বললো আগে বাথরুম কোথায় বল।
বাথরুম!
ন্যাকা আমার তলপেট ফেটে যাচ্ছে।
এই গ্রামের গোটাটাই বাথরুম। তুই যেখানে খুশি বসে ব্যবহার করতে পারিস।
সত্যি বুবুন বলনা।
সত্যি বলছি।
আমি কষ্ট পাচ্ছি। তুই মজা করছিস।
আচ্ছা আয় আমার সঙ্গে। নিচে নেমে এসে পেছনের খিড়কি দিয়ে পুকুর ধারে এলাম। এখানে কর।
ধ্যাত।
তোকে কালকে বলেছিলাম।
তুই মিথ্যে বলেছিলি। ওদিক দিয়ে যদি কেউ দেখে ফেলে।
ওদিকটা জনমানব শূন্য, পুকুরের ধারেই খাল, যার পাশ দিয়ে বাঁধে বাঁধে এতোক্ষণ এলি।
আচ্ছা তুই ভেতরে যা।
কেনো।
যা না।
মিত্রা আমাকে ঠেলে ভেতরে ঢুকিয়ে দিলো। খিড়কি দরজা ভেজিয়ে দিল। আমি ওপরে চলে এলাম। ব্যাগ গুলো ঠিক ঠাক ভাবে গুছিয়ে রাখলাম।
বুবুন। মিত্রা তারস্বরে চিৎকার করে ডাকলো।
কিহলো।
কোথায় তুই।
এইতো ওপরে।
তুই শিগগির নীচে আয়।
দৌড়ে নীচে এলাম। মিত্রা খিড়কি দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে আছে। ভয়ে কাঠ।
কি হয়েছে।
ওই দেখ। আঙুল দিয়ে নিচটা দেখাল। দেখলাম একটা গিরগিটি ওর দিকে জুল জুল করে তাকিয়ে আছে। আমি হেট করতেই গিরগিটিটা দৌড় লাগালো, মিত্রা পরি কি মরি করে আমার বুকে এসে ঝাঁপিয়ে পরলো। থর থর কাঁপছে। আমি হাসছি।
তুই হাসছিস!
কি করবো কাঁদবো।
ধ্যাত।
সিনেমায় গ্রাম দেখো, এবার অরিজিন্যাল গ্রাম দেখো।
অনি ও অনি। কাকীমার গলা।
চল কাকীমা ডাকছেন। হ্যাঁ যাই কাকীমা।
সাবানটা নিয়েনে, হাত মুখ ধুয়ে কিছু খেয়ে নিই।
কি খাওয়াবি।
পান্তা আর চিংড়িমাছের টক। খাবিতো।
হ্যাঁ। কোন দিন খাই নি।
খাসনি। খাবি।
কেমন খেতে।
খলেই জানতে পারবি।
ওপরে এলাম, ও ব্যাগ খুলে ওর লিকুইড সোপ বার করলো। কাপর খুলবো না।
এখন নয় খাওয়া দাওয়ার পর।
পেন্টিটা ভিজে গেছে।
উঃ তোকে নিয়ে আর পারা যাবে না।
তুই আসতে বললি কেনো।
আমি বললাম কোথায়, তুইতো নাচলি।
খুলে ফেলি।
খোল।
তুই ওদিকে তাকা।
কেনো দেখে ফেলবো।
উঃ তাকা না।
আমি পেছন ফিরলাম, মিত্রা কাপর তুলে পেন্টি খুললো, রাখবো কোথায় ?
ওইতো আলনাটায়।
কেউ দেখেফেলে যদি।
দেখলে কিহবে।
তুইনা কিছু বুঝিস না।
বোঝার দরকার নেই। চল।
মিত্রা কাপরটা একবার ঠিক ঠাক করে নিলো। ওকে নিয়ে এবাড়িতে এলাম। কারা যেনো এসেছে, আমাদের দেখলো, কাকা চেয়ারে বসে আছেন। আমরা ভেতরবাইর (বাড়ির ভেতরের উঠান) দিয়ে পুকুর ঘাটে এলাম। সুরমাসি কাকীমা পেছন পেছন এলেন।
পুকুরে নামবি না বালতি করে জল এনে দেবো ?
পুকুরে নামব।
ক্রমশঃ

জীবনে জীবন যোগ না করলে ব্যার্থ হয় গানের পসরা

৪৬

Re: কাজলদীঘি, শ্মশান ও পীরসাহেবের থান

সুরমাসি বললেন, ওকে বালতিকরে জল এনে দে অনি, হরকা আছে কোথায় পরেযাবে। লাগবে এখন।
লাগুক।
তুই রাগ করছিস কেনো। মিত্রা বললো।
আমি ওর দিকে তাকালাম।
সুরমাসি হাসছেন।
সখ হয়েছে যখন নামুক। কিরে নামবি ?
হ্যাঁ। তুই হাতটা ধর।
ওই নিচের ধাপিটায় উবু হয়ে বসতে পারবিতো।
পারবো।
দেখ ওইটুকু জায়গা। খুব স্লিপারি।
আমি সাঁতার জানি।
আমি মিত্রার হাত ধোরলাম, মিত্রা আস্তে আস্তে নামছে।
জুতোটা খুলিস নি।
কেনো।
ওটা কি জলে ভেঁজাবি।
খুলে আসি তাহলে।
যা।
তুই আয়।
আমি কি তোর সঙ্গে ওপর-নিচ করবো।
আয় না।
চল।
আমি কাছে আসার আগেই ওপরে উঠতে গিয়ে মিত্রা পা হরকালো, কাকীমা ওপর থেকে ধর ধর ধর করে চেঁচিয়ে উঠলেন, আমি কোন প্রকারে ওকে জাপ্টে ধরে টাল খেয়ে পুকুরে পরলাম। আমার হাঁটু পর্যন্ত জলে ভিজলো। ও চোখে হাত ঢেকে আছে। ভেতর থেকে সুরমাসি ছুটে এলো।
নীপা ওপর থেকে তার স্বরে চেঁচাচ্ছে, বুদ্ধি দেখো, নিজে পুকুরে ঠিক মতো নামতে পারে না, মিত্রাদিকে সঙ্গে করে নেমেছে।
সম্বিত ফিরতে পুকুর পারে তাকিয়ে দেখলাম, অনাদি বাসু চিকনা পচা পাঁচু সঞ্জয়। নিপা ঘাটে নেমে এসেছে। ওপরে দাঁড়িয়ে ওরা সবাই হো হো করে হাসছে। নীপা প্রথমে একচোট আমায় নিলো। তারপর মিত্রাকে আমার কাছ থেক ছিনিয়ে নিয়ে বললো, সত্যি অনিদা তোমার কোন বুদ্ধি নেই। মিত্রাদিকে নিয়ে কখনো এই পিছল ঘাটে নামে। আমি চুপচাপ। মিত্রার দিকে তাকালাম, ও চোখ মেরে হাসছে। মাথা নীচু করে, মুখ-হাত-পা ধুয়ে ঘাট থেকে উঠে এলাম।
অনাদির দিকে তাকিয়ে বললাম, কখন এলি।
অনাদি হাসছে।
চিকনা বললো, তোর সারপ্রাইজটা জব্বর দিয়েছিস। বলে চোখ মারল।
ঘাটের দিকে তাকালাম। নীপা মিত্রাকে নিয়ে শেষ ধাপিতে দাঁড়িয়ে। আমি বাড়ির ভেতরে এলাম। আমার পেছন পেছন ওরাও চলে এলো।
বাইরের বারান্দায় এসে সবাই বসলাম। অনাদি বললো, তোর পেটেপেটে এতো কিছু ছিলো আগে জানাস নি কেনো।
জানালে মজাটাই নষ্ট হয়ে যেতো।
তা যা বলেছিস। তুই ম্যাডামকে পুকুরে নামাতে গেলি কেনো।
আমি নামাতে গেছি, কাকীমা বারন কোরলো, আমি বারন কোরলাম, বোললাম বালতি করে জল তুলে দিচ্ছি, না আমি নামবো, নাম। মাঝখান থেকে.......।
চিকনা চোখ মেরে হো হো করে হেসে ফেলল।
তোরা সবাই চলেএলি ওখানটা সামলাচ্ছে কে ?
লোক আছে।
তোরা খবর পেলি কি করে বলতো ?
চিকনা প্রথমে খবর পেয়েছে।
চিকনা!
হ্যাঁ।
বাসুর দোকানের ছেলেটা ফোন করেছিলো চিকনাকে।
বুঝেছি। তোরা।
চিকনা নীপাকে নিয়ে রুদ্ধশ্বাসে মেলাথেকে বাইক নিয়ে বেরোল। বাসুকে ফোন করলাম কি হয়েছেরে। ও সব বললো। সবাই চলে এলাম।
ডি এইচ এ এম এন এ বাসুর দিকে তাকিয়ে বললাম। বাসু হাসছে।
অনাদি বললো, কি বললি।
আমি বানান করে বললাম তুই উচ্চারণ কর।
চিকনা ঢক করে আমার পায়ে হাত দিলো। গুরু একি শেখালে।
হাসলাম।
চিকনা আমার পা ধরেই বললো, গুরু আর একবার বলো।
কি।
ওইযে যেটা বললে।
কি বলবিতো।
ওই যে বাসুকে বললে না।
ধ্যাত।
আর একটা এখনো বলি নি। বাসু বললো।
বাসুর দিকে কট কট করে তাকালাম। বাসু হাসছে।
অনাদি বললো, কিরে বাসু।
ওটা এখন বলা যাবে না।
বলতেই হবে।
না।
চিকনা বাসুকে দুহাতে জাপ্টে ধরলো। পাঁচু পচা ওর পেন্টের বোতাম খুলতে আরম্ভ করেছে। সঞ্জয় বাসুকে কাতাকুতু দিচ্ছে। বাসু মাটিতে পরে গিয়ে ছটফট করছে। ওর প্রাণ যায় যায়। বুঝলাম বাসু আটকে রাখতে পারবে না। সে এক হুলুস্থূলুস কান্ড। বাধ্য হয়ে বাসু অনাদিকে কানে কানে বলে দিলো। অনি ওই কোম্পানীর একজন মালিক। অনাদি ছুটে এসে আমাকে কোলে তুলে নাচতে শুরু করেছে। ওদের পাগল প্রায় অবস্থা দেখে কাকা ওদিক থেকে চেঁচিয়ে উঠলেন, ওরে তোরা করছিসটা কি বলতো। তোদের বয়স দিনে দিনে বারছে না কমছে।
অনাদি আমাকে মাটিতে নামিয়ে রেখে, কাকার কাছে ছুটে গেলো। কানে কানে কাকাকে বলতেই, কাকা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন, আবার বসে পরলেন। নীপা ভেতর থেকে ছুটে এসেছে। কি হয়েছে গো চিকনাদা ? মিত্রাও নীপার পেছন পেছন এসেছে। তার পেছনে কাকীমা সুরমাসি। চিকনা নীপার কানে কানে বললো খবরটা। নীপা ছুটে এসে আমাকে জরিয়ে ধরলো। কানে কানে বললো তোলা থাকলো। আমি হাসলাম, তারপর ছুটে গিয়ে মিত্রাকে জড়িয়ে ধরে ওর গালে চুমু খেতে আরম্ভ করলো। কাকা উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ওরে ও হচ্ছে নীলকন্ঠ।
আমি কাকার কাছে গিয়ে প্রণাম করলাম, তোমার অপারেশনের দিন হয়েছে।
আমি জানিরে জানি। নাহলে তুই ওই সময় আমাকে ছেরে যেতিস না।
মিত্রা এবার ব্যাপারটা ধরতে পেরেছে, ওর চোখে খুশির হাওয়া। ও আমার পাশে এসে দাঁড়ালো, কাকাকে প্রণাম করলো। কাকা আমাদের দুজনকে বুকে জরিয়ে ধরলেন।
কাকীমা সুরমাসি ব্যাপারটা ধরতে পারেন নি। তবে কিছু একটা ঘটেছে, সেটা জানতে পারলেন।
অনাদি মিত্রার কাছে গিয়ে বললো, এর জন্য আমরা কালকে একটা পার্টি দেবো।
মিত্রা মুচকি মুচকি হাসছে।
পান্তা খাওয়া নিয়ে নীপার সঙ্গে বেশ কিছুক্ষণ বাক বিতন্ডার পর মিত্রা হাসতে হাসতে বললো, নীপা আমি বুবুনকে বলেছিলাম, খাবো। নীপা মিত্রার কথা শুনে ব্যাপরটায় ইতি টানলো, তবু বলতে ছারলনা, তুমি আমাদের বাড়িতে প্রথম এলে, তোমায় গরমভাত না খাইয়ে পান্তা খাওয়াবো। মিত্রা হাসলো, আমি কি পালিয়ে যাচ্ছি নাকি। এখনতো থাকবো কয়েক দিন।
তাই।
হ্যাঁ। এসেছি ওর ইচ্ছেয়, যাবো আমার ইচ্ছেয়।
পান্তা খেতে বসলাম। মিত্রা বেশ তাড়িয়ে তাড়িয়ে খেলো, তারপর সুরমাসির দিকে তাকিয়ে বললো, আর নেই। সুরমাসি লজ্জা পেয়ে গেলো। অভ্যাস নেই মা, বেশি খেলে শরীর খারপ করবে। মিত্রা হেসে ফেললো।

খাওয়া শেষে আমি উঠে বাইরের বারান্দায় চলে এলাম, অনাদিরা বসে চা খাচ্ছে, কোন ফাঁকে নীপা এদের চা করে দিয়ে গেছে, বারান্দার ঘরিতে দেখলাম চারটে দশ। আনাদির পাশে বসে বললাম, মিত্রা এক পেটি বাজি নিয়ে এসেছে।
তুই সব ষঢ়যন্ত্র করেই ব্যাপারটা ঘটিয়েছিস।
বিশ্বাস কর, কাল শ্মশানে বসে মিত্রার সঙ্গে কথা হলো। ও আসতে চাইলো। বললাম আমিতো চশমা আনতে যাবই, তুই চলে আয়। বাজির ব্যাপারটা আমি আনতে বলেছি।
কেনো ?
ছোট বেলায় এই মেলাতেই বাজি ফাটানোর জন্য কত কথা শুনেছি, তাই মিত্রাকে আনতে বলেছিলাম। এখানকার জন্য কিছু রেখেদে, বাকিটা মেলায় নিয়ে গিয়ে বাচ্চাদের দিয়ে ফাটা।
সকলে চুপ করে গেলো।
অনাদি চুপ করে আছে। না জেনে তোকে হার্ট করে ফেলেছি।
দূর পাগল। আমি এত সহজে হার্ট হই না। হলে বাঁচতে পারতাম না।
ঠিক আছে ঠিক আছে, তুই যা বলবি তাই হবে। চিকনা।
চিকনা কাছে এলো। অনাদি ওকে সব বুঝিয়ে দিলো।
হ্যাঁরে যেতে হবেতো।
মিত্রা নীপা গেলো কোথায়।
ওবাড়িতে। পচা বললো।
কোনদিক দিয়ে গেলো।
পেছন দিক দিয়ে।
নীপা নাচছে না কি করছে যেন।
চিকনা বললো হ্যাঁ।
কটায় আরম্ভ।
বাঙালীর কথা ছটা বলেছে, সাতটায় শুরু হবে।
শেষ হবে কখন।
রাত একটা ধরে রাখ।
শোব কখন।
শুতেই হবে তোকে।
আমি চিকনার কথা শুনে হেসে ফেললাম। নীপা বারান্দা থেকে আমার নাম ধরে তারস্বরে চেঁচাচ্ছে। আমি পচার দিকে তাকিয়ে বললাম, দেখতো কেনো চেঁচাচ্ছে। পচা গুম হয়ে ফিরে এলো। আমি ওর দিকে তাকিয়ে বললাম, কি হলো।
তোর জন্য ঝার খেলুম।
আচ্ছা তোরা কিছু বলতে পারিস না।
আমরা।
কেনো।
চিকনা হাসছে।
হাসছিস কেনো।
এখানে যে কটাকে দেখছিস, সেগুলো ছাড়া, সবাই কম বেশি ওর কাছে ঝাড় খায়, দিবাকরকে একদিন ত্থাপরই কষিয়েছিলো।
কেনো।
সে অনেক ব্যাপর।
অনাদি গ্রামসভা ডেকে মিটমাট করে। নাহলে তো দিবাকরকে ও গ্রামছাড়া করে দিতো।
আনাদি চিকনার দিকে তাকিয়ে বললো, এখনি এই সব কথা আলোচনা করতে হবে। থাক না।
আচ্ছা দাঁড়া আমি ঘুরে আসছি।

আমি ওপরে গেলাম। নীপা মিত্রা দুজনে শাড়ি পরেছে। দুজনকে এত সুন্দর লাগছে চোখ ফেরাতে পারছি না। আমাকে দেখেই নীপা বললো, এই পেন্ট-জামাটা পরে ফেলো। আমি একটু আসছি। নীপা বেরিয়ে গেলো। আমি আজ কোন কথা বললাম না। মিত্রার দিকে তাকালাম, দারুন মাঞ্জা দিয়েছিস আজ রাতে তোকে  চটকাবো।
এখন চটকাস না, প্লিজ সাজগোজ নষ্ট হয়ে যাবে।
দে কোনটা পরতে হবে।
খাটের ওপর আছে।
হঠাত হৈ হৈ শব্দ।
কি হলো বলতো।
ও তুই বুঝবি না।
আমি কোন কথা না বলে পেন্টটা খুললাম, মিত্রা এগিয়ে এলো।
একদম না। নীপা এখুনি চলে আসবে।
আসুক আমার জিনিসে আমি হাত দেবো।
খাটে বসে জিনসের পেন্টটা পরলাম, সেদিন মিত্রা গড়িয়াহাট থেকে যেটা কিনেছিলো, গেঞ্জিটাও লাগালাম।  খারাপ লাগছে না, আসতে পারি। নীপার গলা।
আসুন।
ঢুকেই ফস করে আমার গায়ে কি ছিটিয়ে দিলো।
ইস এটাও সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিস। কে দেখবে বলতো।
দেখার অনেক লোক আছে। চলোনা মেলায়। নীপা বললো।
তাড়াতাড়ি করো। ওরা বেচারা আমাদের জন্য বসে আছে। মেলায় ওদের অনেক কাজ।
তুইযা পাঁচ মিনিটের মধ্যে যাচ্ছি।
মিত্রা ভুরুতে শেষ টান দিচ্ছে।
আমি নিচে চলে এলাম। চারিদিকে সেন্টের গন্ধ ম ম করছে। ওই জন্য তোরা তখন চেঁচাচ্ছিলি।
তুই জানিস অনি, মেয়েটা আজ আমাদের মারবে। একটু ভালো করে কান পাত, শুনতে পাবি, নাম ধরে ধরে কেমন ডাকছে।
কে আছে ওখানে।
তুই চিনতে পারবি না, শান্তনু বলে একটা ছেলে আছে। পলাকে দায়িত্ব দিয়ে এসেছি।
রথ কখন বেরোবে।
এই সাতটা নাগাদ।
অনেক দিন রথের দড়িতে হাত দিই নি, চিকনা ঠাকুরকে একটু মিষ্টি কিনে দিস।
কেনো তুই যাবি না।
আমি হেসে ফেললাম।
মিত্রা নীপা নীচে নেমে এলো। ওদের চোখের পাতা আর নড়ছে না। সবাই অবাক হয়ে ওদের দেখছে। চিকনা আমার হাত ধরে দাঁতে দাঁত চিপে বললো, অনি আমি ম্যাডামের বডি গার্ড হবো।
আমি ওর দিকে তাকিয়ে বললাম, আমি কোথায় থাকবো।
নীপা দেখে ফেলেছে।
চিকনাদা কি বলছেগো অনিদা।
তোমরা দারুন মাঞ্জা  দিয়েছো তাই।
নীপা একবার কট কট করে চিকনার দিকে তাকালো। চিকনা ইশারা করে দেখালো, মেলায় গিয়ে গলাটা কাট। নীপা হেসে ফললো।
মিত্রা আমার পাসে এসে দাঁড়াল, বল ঠিক আছেতো।
আমি হাসলাম।
চল। আমরা রেডি। আমার ব্যাগ দুটো নিয়ে যেতে হবে।
কিসের ব্যাগ!
ক্যামেরা আর, সাজগোজের।
কেনো ?
আমি সিডি বানাবো।
ব্যাটারি শেষ হয়ে গেলে ?
কেনো কারেন্ট নেই!
মেলায় হ্যাচাক পাবি। কারেন্ট পাবি না।
ও অনি থাক না। অনাদি বললো।
দেখেছো অনাদি ও আমাকে কেমন করে।
ঠিক আছে চলুন ম্যাডাম আপনার কোন অসুবিধে হবে না, সব ব্যবস্থা করে দেবো।
চিকনা, মিত্রা আর নীপাকে নিয়ে তুই যা।
আমি! চিকনা বললো।
হ্যাঁ।
না।
তুই যা। আমি বরং ব্যাগ বই।
ওরা আবার গেলো কোথায়।
ভেতরে গেলো।
সত্যি অনি তোর ধৈর্য আছে। বাসু বললো।
আরও নিদর্শন পাবি, চল একবার মেলায়, দেখতে পাবি।
অনিদা কি বলছে গো আনাদিদা। নীপা বললো।
কিচ্ছু না।
আমি মিত্রাকে বললাম, তুই অনাদির বাইকের পেছনে নীপাকে সঙ্গে করে চলে যা।
মিত্রা কিছুতেই বাইকে উঠবে না।
অগত্যা অনাদিকে বললাম, তোরা এগিয়ে যা।
হ্যাঁরে ট্রলি পাঠাবো।
যাবে।
আমার বাড়ির সামনে থেকে যাবে।
না থাক। তোরা যা। আমি হেঁটে যাচ্ছি।
অগত্যা ওরা বেরিয়ে গেলো।
আমি বাসু আর মিত্রা হাঁটতে আরম্ভ করলাম।
বাসুর বাইক পাঁচু চালিয়ে নিয়ে গেছে।
সন্ধ্যে হয় নি। তবে বেশি দেরি নেই। ঘরির দিকে তাকালাম। পাঁচটা পাঁচ। প্রায় আধ ঘন্টার পথ। তারমানে মেলায় পৌঁছতে পৌঁছতে সন্ধ্যে হয়ে যাবে। মিত্রাকে দেখাতে দেখাতে নিয়ে যাচ্ছি। এইটা বড়মতলা, ওইযে সেই পেয়ারা গাছ। ওটা তাঁতীপারা ওটা চন্দ্রেপারা ওই দিকটা হাঁড়িপারা। ওই যে দূরে বোনটা দেখছিস, ওইটা দীঘাআড়ি। মিত্রা আমার হাতটা শক্ত করে ধরলো।
কাল আমায় নিয়ে আসবি।
আসবো।
তোর মুখ থেকে গল্প শুনেছি এতদিন, এবার চাক্ষুষ দেখবো।  হ্যাঁরে কতোক্ষণ লাগবে যেতে।
বাসুর দিকে তাকালাম, হ্যাঁরে বাসু, এভাবে হাঁটলে কতোক্ষণ লাগবে।
আধঘন্টা।
আমি বললে বিশ্বাস করতিস না।
তুই সব সময় হেঁয়ালি করিস তাই বিশ্বাস করতাম না।
বাসু হাসলো।
হ্যাঁগো বাসু জানোনা তোমার বন্ধুটিকে। আমি দশ বছর ওর সঙ্গে মিশছি আমি জানি।
দীঘা আড়ির কাছে আসতে একটা হৈ হল্লা শুনতে পেলাম, মিত্রাকে বললাম, ওই দূরে আলোর রোশনাই দেখতে পাচ্ছিস।
হ্যাঁ।
ওইটা মেলা।
এতোটা যেতে হবে এখনো।
হ্যাঁ।
মেলায় গিয়ে একটা ঠান্ডা খাওয়াস।
ঠান্ডা!
বল সেটাও পাওয়া যাবে না। কঁত কঁত করে খালি জল গিলতে হবে।
ঠিক আছে আপনি চলুন ব্যবস্থা করে দেবো। বাসু বললো।
দেখ তোর মতো ঢেপস নয়।
বাসু হাসলো।
আমি ওর হাতটা একটু চিপে দিলাম।
মিত্রা আমার দিকে তাকিয়ে চোখ মারলো।
মেলার কাছাকাছি এসে সন্ধ্যে হয়ে গেলো। আমি টর্চ জাললাম, মিত্রা আমার হাত শক্ত করে ধরলো।
উঃ।
কি হলো।
পায়ে কি জড়িয়ে গেছে।
মিত্রা তারস্বরে চেঁচাচ্ছে আমাকে জরিয়ে ধরে। আমি ওর পায়ে টর্চের আলো ফেললাম, দেখি একটা খরের টুকরো। নীচু হয়ে জুতোর ফাঁক দিয়ে খড়ের টুকরো বার করলাম। বাসু হাসছে।
তোকে নিয়ে আমর বড় জ্বালা।
কি করবো। আমি ইচ্ছে করে জড়িয়েছি। খর না হয়ে যদি সাপ হতো।
আমি ওর দিকে কট কট করে তাকালাম।
ঠিক আছে চল। মিত্রা আমার বাম হাতটা চেপে ধরে আছে। ওর সুডৌল বুকের স্পর্শ পাচ্ছি। আস্তে করে বললাম, সামনে বাসু আছে।
থাক।
কি ভাবছে।
ভাবুক। এরকম অন্ধকার রাস্তায় এলি কেনো।

জীবনে জীবন যোগ না করলে ব্যার্থ হয় গানের পসরা

৪৭

Re: কাজলদীঘি, শ্মশান ও পীরসাহেবের থান

তোর জন্য লাইট পাবো কোথায়।
অনাদিকে বল। ওতো পঞ্চায়েত।
শেষের কথাটা বাসুর কানে গেলো। বাসু ঘুরে একবার হাসলো। ম্যাডাম দেখছেন তো আমরা কিভাবে বেঁচে আছি।
দেখছি।
এই অন্ধকারে অনি কালকে একা শ্মশানে ছিলো।
ওরে বাবা।
কিহলো।
বাসু আবার থমকে দাঁড়ালো।
দেখ পায়ে কি ঢুকেছে।
আমি আবার ওর পায়ের কাছে বোসলাম। টর্চ জ্বালালাম। চোর কাঁটা। শাড়ির পারটা চোর কাঁটায় ভরে গেছে। ওকে  কিছু বললাম না চল এসেগেছি মেলায় গিয়ে ব্যবস্থা করছি।
কি বলবিতো।
উঃ পা ঝারিস না। এগুলো বার করতে সময় লাগবে।
বলনা কি আছে।
চোর কাঁটা।
বাসু ফিক করে হাসলো। এই অন্ধকারেও মিত্রার মুখটা দেখতে পেলাম, পাকা আপেলের মতো রং।
মেলার মুখে ওরা সবাই দাঁড়িয়ে। আমরা যেতেই চিকনা বললো, নীপার হুকুম, ম্যাডামকে গ্রিনরুমে নিয়ে যেতে হবে।
আমি বললাম, তুই নিয়ে যা।
তুইও চল। মিত্রা বললো।
আমি ওই মহিলা মহলে গিয়ে কি করবো। তুই সেলিব্রিটি দেখনা ওখানে গিয়ে মালুম পাবি।
মিত্রা এমন ভাবে আমার দিকে তাকালো বাসু চিকনা পর্যন্ত হেসে ফেললো।
ঠিক আছে চল, হ্যাঁরে চিকনা আর কে কে আছে।
ওই সব মিউজিসিয়ান মেকআপ ম্যান আর পলা আছে।
ও কি করছে ওখানে।
ওইইতো সব।
বাবাঃ।
সাজানো-গোজানো ড্রেস পরানো।
কসটিউম ডিজাইনার। মিত্রা বললো।
ছাগল। দর্জি থেকে কসটিউম ডিজাইনার!
সবাই হেসে ফেললো। পলাকে একটু চাটতে হবে।
তুই পারবি অনি, আমরা বললে আজ সব্বনাশ। চিকনা বললো।
কেনো।
নীপা দিদিমনি।
মিত্রার ক্যামেরার ব্যাগ কোথায়।
ওখানে। নীপার জিম্মায়।
কয়েকটা পাঁপড় আর জিলিপি নিয়ে আয় না।
চল সব ব্যবস্থা আছে।
তুই কি রাক্ষস। মিত্রা বললো।
কেনো।
এইতো একপেট ভাত গিলে এলি।
ভাত নয় পান্তা। এতোটা যে হাঁটালি।
আমি হাঁটালাম কোথায়, তুইতো হাঁটালি।
তুই চিকনার বাইকের পেছনে বসলেই হাঁটতে হতো না। তার ওপর উপরি বোনাস, দুবার পা ধরালি।
বুবুন খুব খারপ হয়ে যাবে বলছি।
আমাদের দুজনের কথা-বার্তায় চিকনা বাসু হাঁসতে হাঁসতে প্রায় মাটিতে গড়িয়ে পরে।
স্টেজের পাশে গ্রিনরুম। চিকনা পর্দা সরিয়ে নীপা বলে চেঁচাতেই নীপা ছুটে এলো। মিত্রাকে হিড়হিড় করে টানতে টানতে ভেতরে নিয়ে গেলো। আরে থাম থাম, শাড়িতে পা জড়িয়ে উল্টে পরে যাবো। কে কার কথা শোনে। নীপা আজ হাতের চাঁদ পেয়েছে। আমি আমের আঁটি, আমে দুধে মিশে গেছে। আঁটি গড়াগড়ি খাচ্ছে। কি আর কোরবো। পকেট থেকে সিগারেট প্যাকেট বার করে চিকনাকে একটা দিলাম। বাসুকে একটা দিলাম। নিজে একটা ধরালাম। একটা ছেলে একটা স্প্রাইটের বোতল নিয়ে এসে হাজির। বাসুর দিকে তাকালাম, এটাকি।
ম্যাডামের জন্য।
তোরকি মাথাখারাপ।
কেনো।
ওকি একা খাবে নাকি।
তাহলে ।
এখুনি হুকুম করবে। আরনেই, ওদের জন্য নিয়ে আয়।
তাহলে।
আগে স্টক দেখ কত আছে। তারপর পাঠাবি।
ম্যাডাম বললো ঠান্ডা খাবে।
এমনি সাদা জল নিয়ে আয়।
তুই শালা একদম.......। বাসু বললো।
চিকনা খিল খিল করে হেসে ফেললো। বেশ জমেছে মাইরি।
বাসু অগত্যা ছেলেটিকে বললো, কটা বোতল আছে।
বড় বোতল গোটা কুড়ি হবে।
ঠান্ডা হবেতো।
বরফ দেওয়া আছে।
ছোটবোতল কি আছেরে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম।
থামস আপ, স্প্রাইট, পেপসি......।
একটা স্প্রাইটের ছোট বোতল নিয়ে আয়। খুলবি না।
ছেলেটি চলে গেলো।
এখান থেকেই বুঝতে পারছি মিত্রার প্রাণ ওষ্ঠাগত। সত্যি কথা বলতে গেলে আজ ও-ই এই মেলার সেলিব্রিটি। অনেক বড় বড় আর্টিস্ট আমাদের কাগজে স্থান পাওয়ার জন্য সম্পাদককে নিমন্ত্রণ করে নিয়ে যায়। আর আজ ও যেচে এই অজ পাড়াগাঁয়ের একটা মেলায় এসেছে। একটা ফোন করলেই কালকের কাগজের  ফ্রন্ট পেজে একটা কলম লেখা হয়ে যাবে। কিন্ত কেউ জানেইনা ও এখন এখানে। আমি তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করছিলাম। ও বেশ সামলাচ্ছে, কেউ হাত মেলাচ্ছে ওর সঙ্গে, কেউ পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করছে। কেউ জড়িয়ে ধরছে। নীপা খুশিতে ডগমগ, ওর মাইলেজ আজ  অনেক বেরেগেছে।
বাসুদা নিয়ে এসেছি। দেখলাম আর একটা ছেলে।
তুই।
ও গিয়ে বললো, অনেক লাগবে তাই জানতে এলাম।
ভাল করেছিস।
যা ওই ভদ্রমহিলাকে গিয়ে দিয়ে আয়। বাসু দেখিয়ে দিল।
ছেলেটি ভির ঠেলে ওর কাছে পৌঁছতেই মিত্রা গেটের দিকে তাকালো। বুঝলাম ও কিছু বলছে ওদের, তারপর এগিয়ে এলো।
বাসু, ঠেলাটা বোঝ এবার।
বাসু আমার দিকে তাকিয়ে হাসলো।
মিত্রা এদিকেই এগিয়ে আসছে, আমি মিটি মিটি হাসছি। কেছে এসেই, ওর প্রথম কথা, তোর মতো বে-আক্কেলে ছেলে আর দেখি নি।
কেনো ? আমি কি দোষ করলাম!
আমি কি একাএকা খাবো।
এখানে তোর জন্য অনেক কষ্টে একটা বোতল জোগাড় করা হয়েছে।
সবার জন্য পারলে আন নাহলে আমার চাই না।
কি বাসুবাবু, পালস বিটটা দেখেছো।
মিত্রা আমার দিকে কটকট করে তাকিয়ে আছে।
ঠিক আছে তুইখা, ওদের জন্য আনছে।
না। সবার জন্য আনুক তারপর খাবো।
তাহলে আমি খাই। বলে ছেলেটির হাত থেক বোতলটা নিলাম, মিত্রা ছোঁ মেরে আমার কাছ থেকে বোতলটা ছিনিয়ে নিল, তুইও খাবি না। এটা চিকনাকে দে।
চিকনা তুইখা। তোর ভাগ্য ভালো। আমার কোমরে চিমটি পরলো, আমি উ করে উঠলাম।
ছেলেটিকে বললাম, কটা বোতল আছেরে।
গোটা পঞ্চাশ হবে।
সব গুলো নিয়ে আয়। ঠান্ডাতো।
বরফের পেটিতে আছে।
যা বাবা, বাঁচা।
চিকনা, বোতলটা শেষ করে আমাদের টিমটাকে একটু খবর দে।
চিকনা হাসছে।
পলাকে দেখতে পাচ্ছিনা।
ভেতরে আছে।
মিত্রাকে মনেহয় দেখে নি।
লাইটিং নিয়ে বিজি।
তারপর ম্যাডাম, বলুন কেমন বুঝছেন।
জানিস বুবুন সত্যি এখানে না এলে খুব মিশ করতাম।
একটা ছোট্ট থ্যাঙ্কস যদি পোরাকপালে জুটত।
একটি থাপ্পর। দেখছো বাসু তোমার বন্ধুকে, খালি টিজ করবে।
এটা টিজ হলো।
তাহলে কি হলো, প্রেমহলো।
চিকনা হাসতে গিয়ে বিষম খেলো। মিত্রা ওর দিকে এগিয়ে গেলো। বাসু হাসছে। চিকনা মিত্রাকে খক খক করে কাশতে কাশতে কাছে আসতে বাধা দিচ্ছে। ইশারায় বলছে কিছু হয় নি। মিত্রা আমার দিকে তাকালো। ব্যাপারটা এরকম, তোর জন্য দেখ কি হচ্ছে।
চিকনার বিষম থামলো। ছেলেটি একটা আইস্ক্রীমের গাড়ি নিয়ে এসে হাজির।
এটা কিরে।
এর মধ্যেই আছে।
ভাল করেছিস। আমি খাবো না, চিকনা আমার জন্য পাঁপড় আর জিলিপির ব্যবস্থা কর।
আমিও খাবো। মিত্রা বললো।
এটাও কি সবার জন্য।
হলে ভালো হয়।
ঠিক আছে আগে জলখা।
ওদের ডাকি।
ডাক।
মিত্রা নীপা বলে ডাকতেই নীপা ছুটে এলো।
মিত্রা বললো, ওদের ডাক কোলড্রিংকস খাবে।
নীপা আমার দিকে তাকালো, সেতো অনেক লোক।
তোরা যারা পার্টিসিপেন্ট তাদের ডাক।
সেওতো তিরিশ জনের ওপর।
তোমায় পাকামো করতে হবে না, মিত্রাদি স্পনসর করছেন, পারলে মেলার সবাইকে খাওয়াতে পারেন।
অনিদা খারাপ হয়ে যাবে বলে দিচ্ছি।
তুই ওর কথায় কান দিস না, ও ওই রকম।
নীপা ছুটে ভেতরে চলে গেলো।
মেয়েগুলোকে ছুটে আসতে দেখে পলা এদিকে তাকালো, আমাদের দেখতে পেয়েই পরি কি মরি করে ছুটে এলো। কি গুরু কতোক্ষণ।
বাসু বললো অনেকক্ষণ। তুই কাজে ব্যস্ত।
আরে বলিসনা মেয়ে গুলো জালিয়ে পুরিয়ে মারলো।
কি বললে পলাদা। নীপা চেঁচালো।
একবারে কথা বলবি না। দেবো মুখে কালো ডিমার মেরে বুঝতে পারবি। তারপর এই ম্যাডাম এসে সব গুবলেট করে দিলো।
বাসু হাসছে। মিত্রা হাসছে। নীপা হাসছে।
হাসছিস কেনো।
চিকনা একটা ঠান্ডার বোতল এনে পলাকে দিল।
তুই খাওয়াচ্ছিস। আমার দিকে তাকিয়ে।
না ম্যাডাম। চিকনা বললো। আয় এদিকে।
পলা গেলো। চিকনা পলার কানে কানে কি কথা বললো।
পলা ছুটে এসে মিত্রার কাছে হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে গেলো। ম্যাডাম আমায় ক্ষমা করেন আমি বুঝতে পারি নি। এখুনি কি ভুল করছিলাম।
মিত্রা হাসছে।
নীপাটা কি ছাগল বলতো। আগে বলবে তো।
তুমি বলার সময় দিয়েছো।
ওরা ঠান্ডা খাচ্ছে আর কথা বলছে।
ফোনটা বেজে উঠলো।
পকেট থেকে বার করতেই দেখি সন্দীপের ফোন। মিত্রার দিকে তাকিয়ে বললাম, আমি আসছি দাঁড়া। ওখান থেকে বেরিয়ে এলাম। বাসুও আমার পেছন পেছন বেরিয়ে এলো। তুই রাখ আমি তোকে রিংব্যাক করছি।
মেলা থেকে একটু দূরে চলে এলাম, একটা কলোরোল কানে ভেসে আসছে, আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ, চারিদিকে আলোর চাদর বিছিয়ে রেখেছে। কে বলে অন্ধকার। খেতের আল ধরে সোজা চলে এলাম টেস্ট রিলিফের ছোটো বাঁধে। বাসু আছে। জায়গাটা মেলা থেকে প্রায় তিনশো মিটার দূরে। এখানে মেলার আওয়াজ ম্রিয়মান। বাসুকে বললাম, দেখতো আমার ফোনে রেকর্ডিংটা কোথায় আছে। বাসু বুঝতে পারলো, কিছু একটা হয়েছে। বললো দে দেখিয়ে দিচ্ছি। আমি ভয়েস মুড আর রেকর্ডিং মুড দেখে নিলাম। সন্দীপকে ফোন করলাম।
হ্যাঁ বল ।
তুই এখন কোথায়।
আমার বাড়িতে।
মেলায় ঘুরে মজমা নিচ্ছ।
তুই জানলি কিকরে।
এখানে ব্রড কাস্টিং হচ্ছে।
তাই নাকি।
তাহলে বলছি কিকরে তোকে। ম্যাডাম তোর সঙ্গে আছে। তুই একটা প্লেবয় ওদের ফ্যামিলির দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছিস।
ওদের ফ্যামিলিতে প্রবলেম আছে এখবর জানাজানি হল কি করে।
সুনিতদা রটাচ্ছে।
বাঃ ইনফর্মারটা বেশ গুছিয়ে খবর পাঠাচ্ছে বল।
হ্যাঁ। করিতকর্মা ছেলে। ওকে নাকি চিফ রিফোর্টার বানাবে সুনিতদা।
তাই।
অফিসের খবর বল।
আজ সনাতন বাবুর ঘরে তুমুল হট্টোগোল হয়েছে।
কারা করেছে।
চম্পকদা লিড করেছে। সুনিতদা আর ওর চেলুয়া গুলো ছিল।
পুরনো কারা কারা আছে।
এখন বোঝা মুস্কিল। সমুদ্রের ঢেউ-এর মতো সকলে সুনিতদার শিবিরে ভিরে গেছে।

জীবনে জীবন যোগ না করলে ব্যার্থ হয় গানের পসরা

৪৮

Re: কাজলদীঘি, শ্মশান ও পীরসাহেবের থান

তাই।
হ্যাঁ। তুই গেলি গেলি ম্যাডামকে সঙ্গে নিলি কেনো।
কি হয়েছে বলবিতো।
ম্যাডামের সঙ্গে তোকে জড়িয়ে হুইসপারিং ক্যাম্প চলছে। তোকে ফোটাবার ধান্দা। তুই হচ্ছিস চম্পকদা আর সুনিতদার পথের কাঁটা।
সেতো সেইদিন থেকে যেদিন মিত্রার ডাকা মিটিংয়ে ওদের ঝেরেছিলাম।
ম্যাডামের সঙ্গে তোর সম্পর্ক কিরে অনি।
জেনে লাভ।
বলনা। জানতে ইচ্ছে করছে।
কিহবে জেনে।
আমার চাকরি যায় যায়, কালকে আমাকে শোকজের নোটিস ধরাবে শুনতে পাচ্ছি।
কেনো ?
এখনো জানি না। তবে পর্শুদিনের এডিটোরিয়াল পেজে একটা ভুল খবর ছাপা হয়েছিল।
ওই পেজের দায়িত্বে এখন কে আছে ?
নিতাই হারামীর বাচ্চা।
তাহলে তোকে কেনো শোকজ করবে ?
নিউজটা আমি করেছিলাম।
ভুল নিউজ করলি কি করে ? কপি কোথায় ?
খুঁজে পাচ্ছি না। নিউজটা ভুল নয়, অনেক পুরনো।
ছাপা হলো কিকরে।
সেটাইতো আমি বুঝতে পারছি না।
ইনফর্মার ছেলেটি কে। নাম জানতে পেরেছিস।
আমাদের পরিচিত কেউ নয়।
থাকে কোথায়।
তোদের গ্রামেই থাকে মনে হচ্ছে।
কিকরে বুঝলি।
তোদের মেলা থেকে ভয়েজ অন করে কথা বলছে।
নাম বল।
তুই আমাদের প্রেসে চিফ মেসিনম্যান অতীশবাবুকে চিনিস।
না। কোনদিন প্রেসে আমাকে যেতে দেখেছিস।
অতীশবাবু ছেলেটির পিসেমশাই।
ও।
কি বলেছে।
সব কি জানতে পারছি। তবে তোরা ওখানে আছিস। হাত ধরাধরি করে ঘোরা ঘুরি করছিস সেই নিয়ে একটা কেচ্ছা।
ম্যাডামের খতি হচ্ছে এতে। আমি বললাম।
ছারতো। ওরা বড়লোক। তোর মতো দুচারটে ছেলেকে ওরা কেপ্ট হিসাবে রাখে। তারপর প্রয়োজন ফোরালে ছুঁড়ে ফেলে দেবে। কোটি কোটি টাকার মালিক ওরা।
ঠিক বলেছিস। আমি এতটা বুঝি নি। ম্যাডাম আস্তে চাইলো তাই নিয়ে এলাম।
শালা।
সত্যি আমি জি এ এন ডি ইউ।
আমরটা আমাকে ঝারলি।
আমার ভীষণ ভয় করছেরে সন্দীপ, চাকরি গেলে খাবো কি।
দূরশালা তুই ম্যাডামকে নিয়ে ঘুরছিস আবার বলছিস চাকরি গেলে খাব কি।
সত্যিরে।
দাঁড়া তুই ধরে রাখ। আমার একটা ফোন এসেছে। কিছু নতুন নিউজ পাবো।
ঠিক আছে।
আমি ধরে রইলাম। বাসু আমার মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। ও কিছুই বুঝতে পারছে না। তবে সামথিংস-রং এটা বুঝে নিতে ওর অসুবিধে হচ্ছে না। যতই হোক ও একজন ব্যবসায়ী। থট রিডিংটা ও জানে।
হ্যাঁ। শোন।
বল।
ছেলেটার নাম দিবাকার মন্ডল। ও অতীশবাবুর শালার ছেলে। পড়াশুনায় বেশ ভালো। রেজাল্টও ভাল। বিদ্যাসাগর ইউনিভার্সিটি থেকে বাংলায় এমএ করেছে।
তোর ইনফর্মার কে।
সুনিতদার ঘরেই কাজ করে।
ঠিক ঠিক দিচ্ছেতো না এডিটোরিয়াল পেজের মতো হবে।
তুই এভাবে বলিস না, তোর কথা আমি অক্ষরে অক্ষরে পালনা করছি।
বল।
সুনিতদা ওর বায়োডাটা নিয়ে আজ সনাতন বাবুর সঙ্গে ঝামেলা করেছে। ওকে আজই এ্যাপয়েন্টমেন্ট দিতে হবে।
সনাতনবাবু কি বলছে।
ম্যাডাম এলে সব হবে, বলে এড়িয়ে গেছেন।
কাগজ বেরোচ্ছে।
গত সাতদিনে এক লাখ সার্কুলেশন পরেছে।
কেনো।
ডিউটাইমে বেরোয় নি। বিটে কাগজ যাচ্ছে না।
সনাতনবাবু কি করছে।
সনাতনবাবুকে মানলেতো।
ও।
আর দুজন নতুন এসেছে কিংশুক আর অরিন্দম বলে। যেহেতু ম্যাডামের এ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার ওদের কাছে আছে, তাই কেউ কিছু বলে ওঠার সাহস পাচ্ছে না। তবে ওরা এক সাইড হয়ে গেছে।
পার্টিগত দিক থেকে কোনো ফর্মেসন।
একটা হয়েছে। তবে এখনো প্রকাশ্যে নয়।
তোকে যেখানে যেতে বলেছিলাম, গেছিলি।
গেছিলাম। কিছু কাজ হয়েছে। সেই জন্য তো এখনো পার্টি ইনভলভ হয় নি। ফর্মেসনও হয় নি। তুই এলে তোর সঙ্গে কথা বলে ব্যাপারটা ঠিক হবে।
তুই আজকের লেটেস্ট নিউজ আমায় দে যত রাতেই হোক। তোর আজ কি ডিউটি।
নাইট।
গুড। তুই এখন কোথায়।
ময়দানে। প্রেসক্লাবের লনে।
প্রেসক্লাবে ব্যাপারটা চাউর হয়েছে নাকি।
আমাদের হাউসের ছাগল গুলো আছে না। কম পয়সায় মাল খেয়ে বাওল করেছে।
ঠিক আছে। ছেলেটার নাম কি বললি, দিবাকর মন্ডল।
হ্যাঁ তুই মালটাকে খুঁজে বার কর। শুয়োরের বাচ্চা এক নম্বরের খান.... ছেলে।
খিস্তি করিস না।
খিস্তি করছি সাধে। একটা ছেলের জন্য হাউসটার আজ সর্ব্বনাশ হতে বসেছে।
ঠিক আছে ঠিক আছে। রাখি। রাত একটার পর তোকে ফোন করবো।
না। আজ কাগজ ছাড়তে ছাড়তে দেরি হবে।
ট্রেন ধরাবি কি করে।
এইকদিন ফার্স্ট ট্রেন ধরছে না।
ঠিক আছে।
রেকর্ডিংটা সেভ করলাম। বাঁধের ওপর ঘাসের ওপর থপকরে বসে পরলাম। মাথাটা ঝিম ঝিম করছে। বাসুর দিকে তাকালাম।
অনাদিকে খবর দেবো।
ওর দিকে হাত দেখিয়ে বললাম না।
ও আমার পাশে বসে আমার কাঁধে হাত রাখলো।
অফিসে কোনো গন্ডগোল।
মাথা নারলাম।
দিবাকরের ব্যাপারে কি বলছিলো।
আমিও ঠিক বুঝতে পারছি না। আমায় একটু একা থাকতে দে। তুই চলে যা। মিত্রা খুঁজলে বলবি আমি একটু ঘুরতে গেছি। আমি এখানেই থাকবো। না হলে অন্ধকারে ওই স্কুল ঘরে।
আচ্ছা।
বাসু হন হন করে চলে গেলো। আমি পকেট থেকে সিগারেট বার করে ধরালাম। অনেকক্ষণ ভাবলাম। একবার উঠে গিয়ে সামনের একটা চায়ের দোকান থেকে চা খেয়ে চলে এলাম। পাশ থেকে দু’চারজন হেঁটে চলে গেলো। এটুকু আমার দৃঢ় বিশ্বাস খাতা কলমে পাওয়ার আমার হাতে। কোম্পানীর সম্বন্ধে আমারও কিছু বলার থাকতে পারে। কিন্তু চাইলেই এখুনি বলতে পারবো না। সময় চাই।
মিত্রাকে জানাবো কি করে ? যেটুকু ও বলেছে তাতেই বুঝতে পেরেছি। ওর লাইফটা শেষ। হিমাংশুকে একটা ফোন করবো ? না থাক। আমারও পছন্দ অপছন্দ বলে কিছু থাকতে পারে। এইকদিনে যা ঘটলো তাহলে কি সব মিথ্যে। মিঃ ব্যানার্জী, অমিতাভদার বাড়িতে আমার ঘরে দাঁড়িয়ে যা যা বলেছেন, তা অভিনয়! হতে পারে। সেদিন মিত্রা মিঃ ব্যানার্জীকে বাস্টার্ড বলেছে। নিশ্চই এমন কিছু আছে যাতে একথা বলতে মিত্রার মতো মেয়ে বাধ্য হয়েছে। কথায় কথায় মিত্রা বলেছিল মিঃ ব্যানার্জীর যা কিছু প্রসার তা মিত্রার জন্য।
মিত্রা আমার শরীরে শরীর মিশিয়ে মিঃ ব্যানার্জীকে বাস্টার্ড বললো। সেটাও অভিনয়। না আমি মনে হচ্ছে মনে মনে দুর্বল হয়ে পরছি। এসব ফালতু চিন্তা করছি। মিত্রা জোর করে আমায় কোম্পানীর শেয়ার কিনিয়েছে। সত্যি যদি তাই হতো তাহলে আমার পেছনে মিত্রা ১৫০ কোটি টাকা খরচ করতো না। তাও আবার সাদা কালো মিশিয়ে।
আমি চেষ্টা করলেও সারা জীবনে এত টাকা ইনকাম করতে পারবো না। একটা গুডনিউজ আমার মালিকানার খবর এখনও ওরা জানতে পারে নি। আমি যদি কোন ড্রস্টিক স্টেপ নিই মিত্রা নিশ্চই বাধা দেবে না। তবু মন মানছে না। সন্দীপ ঠিক কথা বলেছে। ওদের পয়সা আছে। প্রোয়োজন ফোরালে ছুঁড়ে ফেলে দেবে। তবু জীবনে অনেক মানুষ দেখেছি। আমার কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছে না।
কাঁসর ঘন্টা বেজে উঠলো। রথ বের হচ্ছে। খুব ইচ্ছে করছিলো। কিন্তু ভালো লাগল না। বাজি ফাটছে। মিত্রার আনা বাজি পোরানো হচ্ছে। সত্যি ছোট সময়ে এই বাজি ফাটাবার জন্য কতো আগ্রহ ছিলো। উনামাস্টার এই মেলার প্রেসিডেন্ট ছিলো। কাকা সেক্রেটারি। একটা বাজি চেয়েছিলাম বলে একটা থাপ্পর জুটেছিল। তারপর থেকে আর কোনদিন বাজি ফাটাবার নাম মুখে আনিনি। লোকে ফাটিয়েছে। আমি দেখেছি। অনাদিরা বাজি ফাটাবার কথা বললে বলেছি আমার ভয় করে।
দিবাকর মন্ডল আর আমার বন্ধু দিবাকর মন্ডল কি একব্যক্তি। এটা আমাকে প্রথমে জানতে হবে। সন্দীপ যা বায়োডাটা দিচ্ছে তাতে দিবাকরের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। কাকে দিয়ে খবরটা নেবো। তিনটে ছায়া মূর্তি আমার পাশে এসে দাঁড়ালো। চমকে তাকালাম, অনাদি বাসু চিকনা। ওরা আমার পাশে এসে বসলো। ভাবলাম ওদের কিছু বুঝতে দেবো না। ক্যাজুয়েল থাকার চেষ্টা করলাম। ওদের দেখে হাসলাম।
কিরে তোরা এই সময়। ফাংসন আরম্ভ হয়েছে।
কোন কথার উত্তর নেই। চোখ গুলো সব চিতাবাঘের মতো জ্বলছে। আমি এই চাঁদনীরাতেও ওদের পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি।
কিরে কথা বলছিস না কেনো। মিত্রা কোথায় ?
পায়ের তলাটা দেখেছিস। অনাদি বললো।
আমি দেঁতো হাসি হেসে অনাদির দিকে তাকালাম। বিকেলের দেখা অনাদি আর এখনকার অনাদির মধ্যে আকাশ পাতাল পার্থক্য। নিচের দিকটা একবার দেখে নিয়ে অনাদির চোখে চোখ রাখলাম। গনগনে আগুনের কয়লার টুকরো।
কেনো।
এইটুকু সময় কটা সিগারেট খেয়েছিস।
হ্যাঁ শেষ হয়ে গেছে। চিকনা একটা সিগারেট দিবি।
তুইতো এতো সিগারেট খাস না।
খাই না, আজ খেতে ভালো লাগছে।
চিকনা প্যাকেটটা এগিয়ে দিলো। একটা সিগারেট বার করে নিলাম। তারপর আবার প্যাকেটটা ফেরত দিলাম।
চিকনা বললো, তোর কাছে রাখ। আমি পাশে রাখলাম।
ফোনটা বেজে উঠলো। সন্দীপ।
হ্যাঁ আমি তোকে পরে ফোন করছি। আমার কথা বলা শেষ হলো না, অনাদি ফোনটা ছোঁমেরে আমার হাত থেকে নিয়ে নিলো। কানে তুলে বললো, আপনি কে বলছেন। এরি মধ্যে ও ভয়েসমুড অন করে দিয়েছে, রেকর্ডিং বটম টিপে দিয়েছে।
আমি অনির বন্ধু সন্দীপ বলছি।
এখুনি অনির গলা পেলাম, আপনি কে ?
আমি অনাদি, অনির বন্ধু।
অনি নেই।
ধরুন।
অনাদি ইশারায় কথা বলতে বললো।
হ্যাঁ বল।
শোন পাক্কা খবর। দিবাকর মন্ডল তোর বন্ধু। তোর সঙ্গে ও এক সঙ্গে পরেছে। এমনকি তোর ডিটেলস পর্যন্ত এখানে দিয়ে দিয়েছে। আর কি বলবো তোকে, কথাটা বলতে তোকে খুব খারাপ লাগছে। সুনিতদার মন পেতে বলেছে, তোর বাপ-মার ঠিক নেই। এখন এখানে লাইভ রেকর্ডিং চলছে। ছেলেটি মনে হয় ম্যাডামের খুব কাছাকাছি আছে। এমন কি ম্যাডামের গলাও শুনতে পাচ্ছে এরা।
কোথায় চলছে রেকর্ডিং।
সুনিতদার ঘরে।
আর কে আছে।
যারা থাকার তারাই আছে। তুই এর একটা বিহিত কর অনি।
আমি অফিসে ঢুকছি। দেখি লাস্ট আপডেট কি হয়।
ঠিক আছে। তুই ফোন কর। আমার ফোন অন থাকবে।
লাইনটা কেটে গেলো।
অনাদি আমার দিকে তাকিয়ে। চিকনা চেঁচিয়ে উঠলো, অনাদি তুই একবার পারমিশন দে, আমি ওকে কাল সকালের মধ্যে গাইপ করে দেবো।
ঘাউরামি করিস না। আমি বললাম।
বাসু চুপচাপ, শুধু বললো, ওকে হাতে মেরে কিছু হবে না, ভাতে মারতে হবে।
ঠিক বলেছিস।
ও এখন কোথায়রে চিকনা।
উঃ তোরা থাম না। আমি বললাম।
থামার সময় এখন নেই অনি। মালটা আমি বুঝতে পেরেছি।
কিছুই বুঝিস নি।
তুই বোঝা।
কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকলাম। চোখ দুটো কেমন জ্বালা জ্বালা করছে। জীবনে বাবা-মাকে ঠিক মনে পরে না। কিন্তু জ্ঞানতঃ কোনদিন বাবা-মাকে আমি অশ্রদ্ধা করি নি। কিন্তু আজ প্রথম বাবা-মার সম্বন্ধে কোন খারাপ কথা শুনলাম। বুকের ভেতরটা ভীষণ যন্ত্রনা করছে। মনে হচ্ছে দম বন্ধ হয়ে আসবে। তিনজোড়া চোখ আমার দিকে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে আছে। ওদের বুঝতে দেওয়া যাবে না। তাহলে একটা বিচ্ছিরি কান্ড ঘটে যাবে। আমি মাথা নীচু করে বসে আছি।
অনি শরীর খারাপ লাগছে। বাসু আমার পিঠে হাত দিলো।
আমি বাসুর মুখের দিকে তাকালাম। হয়তো চোখটা ছল ছল করে উঠেছিলো।
অনাদি আমার দিকে তাকিয়ে নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। চিকনার দিকে তাকিয়ে বললো, আজ রাতেই কাজ হাসিল কর।
কথা বলতে গিয়ে আমার গলা ধরে এসেছে। আমি অনাদির হাত চেপে ধরে বুকে জড়িয়ে ধরলাম। না এরকম করিস না। প্লিজ।
তোকে যে অপমান করে সে আমাদেরও অপমান করেছে।
ঠিক আছে। তার জন্য....।
তুই জানিস না এই গ্রামটাকে ও জ্বালিয়ে দিচ্ছে। খালি বন্ধু বলে ও পার পেয়ে যাচ্ছে।
দূর বোকা। হিংসার রাজনীতি করতে নেই। ঠান্ডা মাথায় চিন্তা কর। সব ঠিক হয়ে যাবে।
অনাদি একটু ঠান্ডা হলো।
আমি চিকনার দিকে তাকিয়ে বললাম, একটু চা খাওয়াবি।
চিকনা ছুটে চলে গেলো।
অনাদি আমার হাত চেপে ধরলো। অনি তুই বল। তুই একা চাপ নিস না। আমি জানি তোর সমস্যা তুই একলাই সলভ করবি। আমরা যদি তোকে কিছুটা হেল্প করতে পারি। যেহেতু ব্যাপরটা আমাদের এখানকার সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। তুই এখান থেকে ১০ বছর ডিটাচ। এখানের আমূল পরিবর্তন হয়েছে। তুই দিন চারেকে তার  কিছুই জানতে পারবি না। ওপর ওপর সবাই ভালো। ভেতর থেকে ছুঁরি চালাবর লোক প্রচুর। তুই অনেক কষ্ট করে এখানে এসে দাঁড়িয়েছিস। আমরা তোকে হারাতে চাই না।
মিত্রা কোথায়।
ও সামনে বসে ফাংসন দেখছে।
ছবিটবি তুলছে না।
সব ব্যবস্থা করে দিয়েছি। উনি আমাদের গেস্ট, তুই আমাদের ওপর বিশ্বাস রাখ, ওনার কোন অসুবিধে হবে না।
দিবাকর কোথায়।
ওর ব্যবস্থা করছি।
এখন নয়।
ঠিক আছে তুই বল।
চিকনা চা নিয়ে চলে এলো।
আমি ওদের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সমস্ত কথা বললাম। ওদের গায়ের লোম খাঁড়া হয়ে গেলো। অফিসিয়াল ব্যাপারটা এত জটিল ওরা কিছুতেই ধরতে পারছে না। আমি চিকনাকে বললাম, মেলার মজাটা আজ করতেই পারলাম না। তুই এক কাজ করবি।
বল।
এমন কোন বিশ্বস্ত লোক আছে, যে দিবাকরকে ফলো করবে।
এই কাজ, তোকে চিন্তা করতে হবে না। তোকে আধঘন্টার মধ্যে ডিটেলস দিয়ে দিচ্ছি।
না। ওকে মনিটরিং কর। যেন কিছু বুঝতে না পারে। ফাংসন কখন শেষ হবে।
১২টা বাজবে।

জীবনে জীবন যোগ না করলে ব্যার্থ হয় গানের পসরা

৪৯

Re: কাজলদীঘি, শ্মশান ও পীরসাহেবের থান

মিত্রার আশে পাশে কারা আছে আমাকে একটু জানা। দিবাকরেরও কিছু লোকজন এখানে আছে। ওরা আমাকে খুঁজে বেরাচ্ছে নিশ্চই।
ঠিক আছে তোরা এখানে বোস। আমি যাচ্ছি। চিকনা চলে গেলো।
খুব সাবধান।
তোকে ভাবতে হবে না।
শোন মিত্রা যদি খোঁজ করে বলবি আমার সঙ্গে তোর দেখা হয় নি।
আচ্ছা।
অনাদি ভীষণ খিদে পেয়েছে।
কি খাবি বল।
একটু ছোলা সেদ্ধ আর মুড়ি।
পাটালি। অনাদি হেসে বললো।
এখন ভালো লাগছে না।
বুঁচিকে ফোন করে দিচ্ছি দাঁড়া।
কে বুঁচি।
তুই চিনবি না পার্টি করতে গিয়ে অনেক কিছু রাখতে হয়, শিখতে হয়।
থাম দাঁড়া। তুই একটা কাজ করতে পারবি।
বল ।
তুই নিজে যা। ওদের নাচ কি শুরু হয়েছে।
হ্যাঁ প্রায় একঘন্টা হয়ে গেছে।
তার মানে এবার শেষের পথে।
হ্যাঁ।
মিত্রা নিশ্চই মেলা ঘুরতে চাইবে। তুই নীপা ওদের বন্ধুদের সঙ্গে ওকে ভিরিয়ে দে।
সম্ভব হবে বলে মনে হচ্ছে না। বাসু বললো।
ঠিক আছে। শেষ হলে আমায় ফোন কর। আমি যাবো। আমার আর কিছু ভালো লাগছে না।
বুঁচিকে দিয়ে মুড়ি চা পাঠিয়ে দিচ্ছি। বাসু তুই কিন্তু অনিকে ছেড়ে যাস না।
আচ্ছা।
বাসুর ফোনটা বেজে উঠলো।
চিকনা ফোন করেছে, তুই কথা বলবি।
দে।
হ্যাঁ।
হ্যালো।
বাসু।
না আমি অনি বলছি।
শোন সব ব্যবস্থা পাকা, শুয়োরের বাচ্চা ম্যাডামের সঙ্গে বসে জমিয়ে গল্প করছে।
ঠিক আছে। তুই ডিস্টার্ব করিস না। ওদের গল্প করতে দে। পরলে শোনার চেষ্টা কর। আমার ফোনে রিং কর আমি রেকর্ডিং করবো। মাথায় রাখবি এই কাজ যে করে সে খুব শেয়ানা ছেলে।
আচ্ছা।
বাসু আমার দিকে তাকালো, তোর মাথায় কতো চাপ। তুই চলিস কি করে।
চলতে হয় বাসু। না হলে চালাবো কি করে।
আমার তোর মাথাটা মাঝে মাঝে দেখতে ইচ্ছে করে। আমরা হলে এতোক্ষণে কোন অঘটন ঘটিয়ে দিতাম।
এই যে তুই কিছুক্ষণ আগে বললি হাতে নয় ভাতে মারবো।
বাসু মাথা নীচু করে হাসলো।
অনাদির ছেলেটা মুরি চা দিয়ে গেলো। দুজনে বসে বসে খেলাম। ভেতরে ভেতরে তোলপাড় চলছে। আমাকে মিত্রাকে নিয়ে কেচ্ছা, অন্য হাউস রসালো গল্প করবে। একদিন হয়তো উপন্যাসেও স্থান পাবো। ভাবতেই গাটা শিউরে উঠছে।
চিকনার ফোন।
বাসুকে দিলাম, ও ভয়েস মুডে দিয়ে রেকর্ডিং করছে।
............আপনার সঙ্গে অনির অনেক মিল আছে। মিত্রার গলা।
না না কি বলছেন আপনি। অনি আপনার হাউসের একজন স্টার রিপোর্টার। ওর সঙ্গে আমার তুলনা।
আচ্ছা অনির সঙ্গে আপনার পরিচয় কি ভাবে কাগজে কাজ করতে করতে।
না আমরা কলেজ লাইফ থেকে একে অপরের সঙ্গে পরিচিত।
বাবা তার মানে প্রয় দশ বছর।
হবে।
অনিকি আপনার কাছে থাকে না অন্য কোথাও থেকে।
আমার কাছে থাকবে কেনো, ওর নিজস্ব ফ্ল্যাট আছে।
আমি তো শুনলাম কলকাতয় ওর থাকার জায়গা নেই বলে আপনার বাড়িতে থাকে।
আপনি ভুল শুনেছেন।
সত্যি আপনাদের নিগূঢ় বন্ধুত্ব দেখলে হিংসে হয়।
কি করে দেখলেন।
মেলায় আসার পথে আপনাদের পেছন থেকে দেখলাম।
কলেজ লাইফেও আমাদের অনেকে ঘনিষ্ঠ বন্ধু-বান্ধব আমাদের দেখে হিংসে করতো।
এখানকার সবাই কানা-ঘুসো করে আপনার সঙ্গে ওর একটা এ্যাফেয়ার আছে।
কারা বলে।
অনির বন্ধুরা।
আপনি বলছেন। না আর কেউ বলছে।
কেনো। অনাদি বাসু চিকনা কতজনের নাম বলবো।
হতেই পারে না। ওরা অনির খুব ভাল বন্ধু নার্সিংহোমে দেখলামতো।
আমি সেদিন ওর কাকার অপারেশনের দিন যেতে পারলাম না, খুব খারাপ লাগছে।
সেদিনতো আপনাকে দেখতে পাই নি।
আপনি নার্সিংহোমে এসেছিলেন।
আমি একা নয় অনির বড়মা ছোটমা......।
বাবা ওকানে গিয়ে এসব পাতিয়ে ফেলেছে।
পাতাবে কেনো। একজন আমার কাগজের এডিটরের স্ত্রী আরএকজন আমার কাগজের চিফ এডিটরের স্ত্রী।
অনি আসে নি ?
এসেছে। কোথায় ঘুরে বেরাচ্ছে। ও একটা ভবঘুরে।
পোষ মানাবার চেষ্টা করুন।
করছিতো পারছি কোথায়।
সত্যি ওর কোন রেসপনসিবিলিটি নেই। আপনার মতো একজন সেলিব্রিটিকে নিয়ে এরকম ছেলেখেলা করার।
কোথায় ও ছেলেখেলা করলো। আমিইতো এখানে আসতে চেয়েছি, ও না করেছিলো। তবু এলাম। সত্যি না এলে আমার অনেক কিছু অদেখা থেকে যেতো।
ফোনটা কেটে গেলো।
বাসু আমার দিকে তাকিয়ে হাসলো।
আমার ফোনটা বেজে উঠলো, দেখলাম মিত্রার ফোন।
হ্যালো।
কিরে তুই কোথায়।
আমি শ্মশানে।
শ্মশানে মানে!
শ্মশানে।
আবার ওখানে গেছিস।
হ্যাঁ। জায়গাটা আমায় খুব টানেরে। তুই যেনো কাউকে বলিস না।
কি বলছিস তুই। এখুনি আসবি।
কেনো।
আমাকে একা একা ফেলে যেতে তোর লজ্জা করছে না।
কই তোকে একা ফেলে এলাম, নীপা আছে, ওর বন্ধুরা আছে, অনাদি বাসু চিকনা আর কতজনকে তোর চাই।
তোর গলাটা ভারি ভারি লাগছে কেন ?
ফাঁকে মাঠে বসে আছি কিনা একটু ঠান্ডা লেগেছে বোধ হয়।
তুই এখুনি আয়।
ফাংসন শেষ ?
আর একটু বাকি আছে।
ঠিক আছে আমি অনাদিকে বলে দিচ্ছি। তোকে সঙ্গ দেবে গিয়ে।
তোর এক বন্ধুর সঙ্গে আলাপ হলো।
কার সঙ্গে।
দিবাকর। দিবাকর মন্ডল।
কোথায় আলাপ হলো। এইতো আমার পাশে বসে আছে।
তাই।
দে ওকে।
দিচ্ছি।
হ্যালো।
বল।
তুই এখন কোথায়।
পুরীকুন্ডী শ্মশানে।
মিথ্যে কথা বলছিস।
তুই চলে আয়।
কোথায় ?
আমি যেখানকার কথা বললাম।
আমার এতো শখ নেই।
তাহলে আর সত্য মিথ্যার যাচাই করে লাভ।
আমি তোর মতো পাগল নই।
তুই পাগল নয়। শেয়ানা।
কেনো একথা বলছিস।
তুই সেদিন বললি তোর কাজ আছে তাই নার্সিং হোমে যেতে পারবি না।
সত্যি তুই বিশ্বাস কর অনি, একটা কাজ পরে গেছিল।
ইন্টারভিউ কেমন হলো।
তোকে কে বললো।
সাংবাদিকের কাজ খবর সংগ্রহ করা। আমি নিশ্চই মিথ্যে বলি নি।
না। এটা তুই সত্যি কথা বলেছিস।
কোন কাগজে ইন্টারভিউ দিলি।
এটাও কি জেনে ফেলেছিস।
না। জানতে পারি নি। দেখ সত্যি কথা বললাম।
মেলায় কখন আসছিস। তোর মিত্রাদেবিতো তোকে দেখার জন্য পাগল।
ওটা বড়লোকেদের খেয়াল।
কি বলছিস।
কেন বিশ্বাস হচ্ছে না।
একেবারে না।
তুইতো পাশে বসে আছিস, জিজ্ঞাসা কর।
এতটা ধৃষ্টতা দেখাতে পারবো না।
আমাদের কাগজে কার কাছে ইন্টারভিউ দিয়ে এলি।
কি পাগলের মতো বকছিস।
আরে আমিতো বদ্ধ পাগল।
সেটাই মনে হচ্ছে।
কেনো এটাও কি মিথ্যে বললাম।
পুরোটা।
মিত্রাকে ধর একটা হিল্লে হয়ে যাবে।
বলেছি।
বাঃ এইতো করিতকর্মা ছেলে। মেলায় থাক। আমি আসছি।
কতোক্ষণের মধ্যে আসবি।
এখান থেকে যেতে ঘন্টা খানেক তো লাগবে।
নারে আমি তাড়াতাড়ি ফিরে যাব। কাল সকালে একবার কলকাতা যেতে হবে।
হাসতে হাসতে বললাম, জয়েনিং।
বোকা বোকা কথা বলিস না।
ফোনটা কেটে দিলাম। বাসু আমার দিকে তাকিয়ে আছে। রেকর্ডিংটা সেভ করেই অনাদিকে ফোন করলাম। অনাদি ধরেই বললো কি হয়েছে বল।
তুই কোথায় ?
কাজ গোছাছি।
মানে ?
মেলার চারিদিকে নজরদারি বারালাম।
ঠিক আছে। চিকনা কোথায় ?
ও মেলার বাইরে আছে।
আচ্ছা। শোন তুই একবার মিত্রার কাছে যা, ওখানে দিবাকর আছে।
ওর পেছনে পাশে চার পাঁচজন আছে।
তুই গিয়ে মিত্রার সঙ্গে বোস ওর সঙ্গে খেজুরে গল্প কর। আমার সম্বন্ধে যাতা বল। কালকের শ্মশানের গল্প কর। আমি দিবাকরকে এইমাত্র শ্মশানের গল্প দিয়েছি। ওর মুখটা লক্ষ্য রাখবি তাহলে সব ধরতে পারবি। ও একঘন্টার মধ্যে মেলা থেকে বেরিয়ে যাবে বলছে। ওকে যে ভাবেই হোক তুলে আনবি আমার কাছে। মিত্রা যেন একটুও বুঝতে না পারে।
ঠিক আছে। তুই পাঁপড় ভাজা জিলিপি খাবি।
খাব। মিত্রার জন্য নিয়ে যা। চিকনা কোথায় এখন ?
বললাম তো মেলার বাইরেটা সামলাচ্ছে।
ওর ফোন বন্ধ, মনে হয় ব্যাটারি নেই।
ঠিক আছে দেখছি।
বাসু আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। তোকে কত চিন্তা করতে হয়। এখন মনে হচ্ছে তোর প্রেমকরা উচিত, বিয়ে করা উচিত নয়।
হেসে ফেললাম। কেনো।
বিয়ে করলে বউকে সময় দিবি কখন।
তোর বউ মেলায় এসেছে।
এসেছে।
দেখালি নাতো।
সময় পেলাম কোথায়। যা ঝড় চলছে।
মিত্রার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিতে পারতিস এক ফাঁকে।
গেছিলাম তখন। আলাপ করিয়ে দিয়েছি।
ভাল করেছিস।
ফোনটা বেজে উঠলো। মিত্রার ফোন।
এখন এলি না।
আসছি। এতটা পথ হেঁটে যেতে হবেতো।
অনাদি পাঁপড় আর জিলিপি নিয়ে এসেছে।
খা।
তুই না এলে খাব না।
পাগলামো করিস না, ওরা মন খারাপ করবে।
কালকে তোর শ্মশানে যাবার গল্প শুনছি।
হাসলাম।
আচ্ছা এই মেলা ছেরে তোর শ্মশানে যেতে ভালো লাগলো।
মা-বাবার কথা ভেবে মনটা খুব খারাপ লাগলো। তাই চলে এলাম।
সরি আমি না জেনে তোকে হার্ট করলাম। তুই আয়।
ফোনটা কেটে দিলাম। কিছু ভাললাগছে না। চল স্কুল ঘরের বারান্দায় গিয়ে বসি। আমি বাসু ইস্কুল ঘরের বারান্দায় বসলাম। এখান থেকে মেলেটাকে দেখা যাচ্ছে কিন্তু কি হচ্ছে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। চিকনার ফোন। সরি গুরু। আমি ব্যবস্থা করেছি। তবে মনে হয় কাজ হবে না। নীপাদের নাচ শেষ হলো। ম্যাডাম গ্রীনরুমে যাচ্ছে। দিবাকর হেসে হেসে ম্যাডামের সঙ্গে কথা বলছে, শুয়োরের বাচ্চা আবার হাত মেলাচ্ছে। অনাদি ওর কাঁধে হাত রেখেছে। ঠিক আছে বস আর মিনিট দশেক। রাখি।
বাসু আমার দিকে তাকলো।
কিরে আমি কি বাইরে গিয়ে বসবো।
বোস। আমি এখানে আছি জানাবি না। তুই অনাদি আগে ফেস কর। তারপর ওকে এখানে নিয়ে আয়। আমি মোবাইল অফ করছি।
আচ্ছা।
সিগারেটের প্যাকেটটা দিয়ে যা।
বাসু সিগারেটের প্যাকেটটা দিয়ে বেরিয়ে গেলো। মাথা গরম করলে চলবে না। যা হবার তা হয়ে গেছে এখন কাজ উদ্ধার করতে হবে। হঠাত চেঁচামিচির শব্দ। বাইরে উঁকি দিয়ে দেখলাম। এই জ্যোতস্না রাতেও পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি। দিবাকরের কলার ধরে হির হির করে টেনে আনছে ওরা। হয়তো দু’চারঘা দিয়েও দিয়েছে। দিবাকারের সঙ্গে জোর ধস্তা-ধস্তি চলছে। চিকনার গলা শুনতে পেলাম। বেশি বাড়াবাড়ি করবি না। আমার পরিচয় তোকে নতুন করে দেবার নেই। কেটে টুকরো টুকরো করে মালঞ্চের জলে ভাসিয়ে দেবো। মাছের খাবার হয়ে যাবি।
আমার বুকটা দুরু দুরু করে উঠলো। একি বলছে চিকনা।
অনাদি ঠান্ডা মাথায় খালি বলছে। তোকে যেখানে নিয়ে যাচ্ছি সেখানে চল। সব বুঝতে পারবি।
কাছাকাছি এসে অনাদি বাসুকে জিজ্ঞাসা করলো অনি কোথায়। আমি দেখতে পাচ্ছি বাসু অনাদিকে আড়ালে ডেকে নিয়ে গিয়ে সব বলছে। অনাদি ঘাড় নারছে। অনাদি একবার ইস্কুল বাড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো। তারপর ঘাড় নাড়লো।
ক্রমশঃ

জীবনে জীবন যোগ না করলে ব্যার্থ হয় গানের পসরা

৫০

Re: কাজলদীঘি, শ্মশান ও পীরসাহেবের থান

আপনার লেখাটা অল্প একটু পরেছি খুব ভাল লেগেছে ........।
পরে বাকিটুকু পড়ে নিব আশা করি ভাল লাগবে..................।
আপনা কে এই লেখার জন্য ধন্যবাদ।

জ্ঞানই শক্তি যখন ইহা ব্যাবহার করা হয়......

৫১

Re: কাজলদীঘি, শ্মশান ও পীরসাহেবের থান

টেস্ট রিলিফের বাঁধের ওপর ওরা বসেছে। প্রায় আধঘন্টা ধরে কি কথা হলো বুঝতে পারলাম না। কোন চেঁচামেচি নেই। দিবাকর অস্বীকার করছে মনে হয়। বাসু এগিয়ে আসছে স্কুল বাড়ির দিকে। বুঝতে পারলাম আমার সঙ্গে কথা বলবে। বাইরে বেরিয়ে এলাম। বাসু আমায় বললো বল তুই কি করবো।
ও সব অস্বীকার করছে।
হ্যাঁ।
এক কাজ কর। ওর মোবাইলটা রেখে দে। আর আজ ওকে বাড়ি যেতে দিবি না। ওকে এখানে কোথাও নজর বন্দি করে রাখ। কাল ৯ টায় আমার ঘরে নিয়ে আয়। তারপর দেখি কি করা যায়।
আচ্ছা।
আমার কথা মতো কাজ হলো। এক চোট চেঁচা মেচি হলো। তারপর কয়েকজন দিবাকরকে নিয়ে চলে গেলো। আমি তাদের চিনতে পারলাম না। চেহারা দেখে খুব ভাল লোক মনে হচ্ছে না।
অনাদি এলো।
তুই সত্যি মহান।
কেনো।
এই মোবাইলটা নিয়ে কি করবো।
আছে অনেক কাজ আছে। সঞ্জয় কোথায়।
বাসুর ফোন বেজে উঠলো। বাসু আমার দিকে তাকিয়ে বললো নীপা।
কথা বল।
কি হয়েছে নীপা।
চিকনাদাকে ফোন করলাম, ধরে ছেড়ে দিল। ওখানে কিসের চেঁচামিচি হচ্ছে বাসুদা।
চিকনা মোবাইল বার করে দেখে কল হয়ে পরে আছে। এক হাত জিভ বার করে ফোনটা কাটলো।
কই কিছু হয় নি তো।
হয়েছে। তুমি মিথ্যে বলছো।
সত্যি নীপা তুমি বিশ্বাস করো।
অনিদা কোথায়। ওর মোবাইল স্যুইচ অফ কেনো।
তাতো বলতে পারবো না, ওতো তোমাদের কাছে গেলো।
না। অনিদার কিছু হয়েছে। চিকনাদা কাকে মারছিলো।
চিকনা কাউকে মারে নিতো।
না। তুমি সত্যি কথা বলো। আমি প্রচন্ড চেঁচামিচির আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলাম। আমি এখানে তোমাদের কাউকে দেখতে পাচ্ছি না। তোমরা কোথায়।
তুমি বিশ্বাস করো।
দেখো মিত্রাদি মন খারাপ করছে। ও সব শুনেছে। আমার খুব খারাপ লাগছে।
তুমি পাঁচ মিনিট সময় দাও আমরা যাচ্ছি।
আচ্ছা। ঠিক পাঁচ মিনিট।
চিকনার দিকে ফিরে বললো, গা.... মোবাইলটা বন্ধ করতে পারিস না।
সত্যি বলছি তখন উদম কেলাচ্ছিলাম দিবাকে। অনেক দিন হাতের সুখ করি নি, খান.... ছেলের ওপর অনেক রাগ জমে ছিল। বিশ্বাস কর খেয়াল ছিল না, শুয়োরের বাচ্চার কি গরম, আমায় থানা দেখাচ্ছে।
আমি চিকনার কথায় কান দিলাম না সঞ্জুকে বললাম, তুই আমার একটা উপকার কর। ওর মোবাইল যা আছে আমার মোবাইলে কপি কর।
দাঁড়া কপি কর বললেই হবে, মালটা আগে দেখি।
অনাদি আমার দিকে তাকলো, বুঝলো দিবাকরের সেট নিয়ে আমি কি করবো। সেটটা ওর হাতে দিল।
আরে শালা এই সেট পেল কোথা থেকে! এতো ই সিরিজের মাল। ওর এলজির মাল ছিল। আমার দিকে ঘুরে তাকিয়ে বললো। তুই জানলি কি করে ওর সেট থেকে কপি করা যাবে।
কাল সব বলবো।
তুই কপি করে নিয়ে আয়। অনাদি বাসু আমি এগিয়ে যাচ্ছি তোরা পেছনে আয়।
আচ্ছা।
বাসুর দিকে তাকিয়ে বললাম, নীপাকে একবার ফোন কর, ওরা কোথায় আছে।
বাসু ফোন করলো। বললো স্টেজের সামনে আছে।
আমরা তিনজনে এলাম। মিত্রা নীপা ছাড়াও আরো দুচারজন মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমায় দেখে মিত্রা মুখটা ঘুরিয়ে নিলো। নীপা গম্ভীর। কথা বলছে না।
আমি লজ্জাসরমের মাথা খেয়ে কাছে গিয়ে মিত্রার কাঁধে হাত রাখলাম। রাগ করিস না তুইতো......।
একবারে কথা বলবিনা। মাথাটা নীচু করে নিল। তুই তোর মতো এনজয় করলি। আমি আমার মতো এনজয় করলাম। কত স্বপ্ন ছিল.....। গালাটা ধরে গেলো, মাথাটা নীচু করলো। দুজনে একসঙ্গে এনজয় করতে পারলাম না। ওর চোখের পাতা ভারি হয়ে এলো।
আমি ওর থুতনিটা ধরে তুললাম, এইতো আমি চলে এসেছি, চল। মিত্রা মাথা তুললো।
ওর ভাসা ভাসা চোখের ভাষা বদলে গেলো। তোর কি হয়েছে! মুখটা এরকম লাগছে কেনো!
কোথায় ?
না তোর কিছু একটা হয়েছে।
তুই বিশ্বাস কর।
না তোর মুখ বলছে কিছু একটা হয়েছে।
নীপা আমার দিকে তাকালো। তারপর চিকনার দিকে। চিকনাদা।
চিকনা ত ত করছে, বিশ্বাস কর কিছু হয় নি।
অনাদিদা।
অনাদি মুখ ঘুরিয়ে নিল।
ওখানে ভাকু নিয়ে একটা......। চিকনা বললো।
ভাকু মানে! মিত্রা নীপার দিকে তাকালো।
নীপা মিত্রার কানে কানে কি বললো, মিত্রা মুচকি হাসলো।
এখানে এসেও তোর গন্ডগোল করার ইচ্ছে জাগলো।
না মানে.....আমরা তিনজনে মুখ চাওয়া চাওয়ি করছি। চিকনার মালটা খেয়ে গেছে। যাক এই যাত্রায় রক্ষাপেয়ে গেলাম।
সবাই মিলে ঘন্টা খানেক মেলায় মজা করে ঘুরলাম। ছোলার পাটালি পাঁপড় ছোলাসেদ্ধ জিলিপি কখনো নীপা ব্যাগথেকে টাকা বার করে দাম মিটিয়েছে। কখনো মিত্রা দিয়েছে। আমার পারদপক্ষে কোনো খরচ হোলো না।
চিকনা নীপার পেছনে সব সময় টিক টিক করে গেলো। মাঝে মাঝে সঞ্জয় আর চিকনার দ্বৈরথ হলো। মাঝে তো চিকনা খিস্তিই দিয়ে দিল সঞ্জয়কে। মিত্রা ফিক করে হেসে ফেললো। তারপর মিত্রার অনুরোধে, চিকনা আর সঞ্জয় নীপা আর মিত্রাকে ভাকু কি জিনিষ দেখাতে নিয়ে গেলো। ডাবুর বোর্ড দেখিয়ে নিয়ে এলো।
বাড়ি ফিরলাম রাত প্রায় বারোটার সময়। অনাদিকে বললাম, কাল সকাল সাড়েনটায়, আসামিকে হাজির করিস। হ্যাঁরে ওরা আবার ছেলেটাকে মারধোর করবে নাতো ?
আরে না না, ওর বাড়িতেই নিয়ে গেছে। কাল নিয়ে আসবে। তোকে ওসব নিয়ে ভাবতে হবে না। মাঝখান দিয়ে কালকের পার্টিটা নষ্ট হয়ে গেলো।
কিচ্ছু নষ্ট হয় নি। কালকেই হবে। এবার পাওয়ার গেম খলবো। কালকে দেখতে পাবি।
সঞ্জুর দিকে তাকিয়ে বললাম, সব কপি করেছিস ঠিক ঠিক করে।
হ্যাঁ।
গুরু একটা ভুল কপি হয়ে গেছে।
কি বল।
শেলির সঙ্গে দিবাকরের একটা সেক্স সিন লোড হয়ে গেছে। কিছুতেই ডিলিট করতে পারলাম না।
অনাদি হেসে বললো, শালা এতোক্ষণ বলিসনি কেনো।
বলার সময় দিলি কোথায় ?
অনাদি মোবাইলটা তোর কাছে রেখে দে। অবশ্যই খোলা রাখবি। সব ফোন রিসিভ করবি। কোনো কথা বলবি না। এই ফোনের রেকর্ডিং থেকে আরো মশলা পাবো। আর কাল অতি অবশ্যই মোবাইলটা নিয়ে আসবি। অনাদি আমার দিকে তাকিয়ে হাসলো। ওরা চলে গেলো।
নীপা আজ আমাদের ঘর ছেড়ে দিয়েছে। নীপা বলেছে, ওবাড়িতে শোবে। ঘড়টা টিপ টপ করে গোছানো। একটা নতুন চাদর পাতা হয়েছে। নীপা ওবাড়ি থেকে মিত্রাকে এবাড়িতে পৌঁছে দিয়ে গেলো।
অনিদা নিচটা বন্ধ করে দিয়ে যাও।
আমি নিচে গিয়ে খিল দিলাম।
নীপা চলে গেলো।
আমি ওপরে এলাম। মিত্রা চুল আঁচড়াচ্ছে। আমি খাটের ওপরে বসে লক্ষ্য করছি। সেই থেক মিত্রা গরম খেয়ে রয়েছে। মুখে হাসিখুশি থাকার একটা অভিনয় করে যাচ্ছে।
কিরে এবার নাইট গাউন পোরবো ? না কাপর পরেই থাকবো।
আমি কোন কথা বললাম না।
চুপ করে আছিস কেনো ?
কি বলবো বল।
এখানে তুই যা বলবি তাই হবে।
আমি উঠে গেলাম। জানি মান ভাঙাতে আমাকেই হবে। কাছে গিয়ে পেছন থেকে ওর কোমর জড়িয়ে ধরলাম। মিত্রার হাত থমকে গেলো। আমার মুখের দিকে কট কট করে ঘার ঘুরিয়ে তাকালো। আমার গায়ে হাত দিবি না।
ওকে আরো শক্ত করে কাছে টেনে নিলাম। কানের কাছে ঠোঁট রাখলাম।
এতো রাগ করলে চলে। কতো লোক আমাদের দিকে জুল জুল করে চেয়ে আছে দেখেছিস।
বুঝতে আর কার বাকি আছে শুনি।
কেনো। কারা কারা বুঝতে পেরেছে।
সবাই। এমনকি আজ তোর ওই বন্ধুটা কি যেন নাম, দিবাকর না কি সেও কথা প্রসঙ্গে তোর সঙ্গে আমার একটা এ্যাফেয়ার আছে সেটা বলে দিলো।
আমার চোয়াল শক্ত হলো। চোখের ভাসা বদলে গেলো। মিত্রা বুঝতে পেরেছে। হাত দুটো আস্তে আস্তে আলগা হয়ে ওর শরীর থেকে খসে পরলো।
কিরে বুবুন!
না কিছু না।
মিত্রা ঘুরে দাঁড়ালো।
কি হয়েছে বল। তুই ওর নামটা শুনে ওই রকম করলি কেনো।
বললামতো কিছু নয়।
মিত্রা আমার গলা জড়িয়ে ধরলো। তোর কিছু একটা হয়েছে। সেই কোলড্রিংকস খাওয়ার পর থেকেই তোর কোনো পাত্তা নেই। তোর মধ্যে যে একটা দিলখোলা হাসিখপশি মানুষ সব সময় লুকিয়ে থাকে তাকে আমি দেখতে পাচ্ছি না। আমাকে নিয়ে কোন ব্যাপার।
না।
তাহলে।
পরে বলছি।
বিছানায় ফিরে গেলাম। একটা সিগারেট খেতে ইচ্ছে করছিল। মিটসেফের কাছে এলাম। সিগারেটের প্যাকেটে হাত দিতেই, মিত্রা হাতটা চেপে ধরলো। চোখের ভাষায় বুঝিয়ে দিলো এখন খাবি না। প্যাকেটটা রেখে চলে এলাম।  বিছানায় এসে জানলার পাল্লাটা পুরো হাট করে খুলে দিলাম। আজকে চাঁদের আলোর ঝাঁঝ অনেক বেশি। নিওন আলোকেও হার মানায়। গাছের মগ ডালের পাতা গুলোও পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি। চারিদিকে অবিশ্রান্ত ঝিঁ ঝিঁ পোকার তারস্বর ডাক। এক স্বপ্নিল পরিবেশ তৈরি করেছে।
বুবুন।
ফিরে তাকালাম।
মিত্রা ব্রা আর শায়া পরে আমার দিকে পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে আছে।
একটু কাছে আয়।
বিছানা ছেড়ে উঠে ওর কাছে গেলাম।
হুকটা খুলে দে তো।
আমি নীচু হয়ে ওর ব্রার হুকটা খুলে দিলাম। বুক থেকে ব্রাটা খসে পরলো। ও ঘুরে দাঁড়িয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরলো। ওর নরম বুক আমার বুকে। বকের মতো গলা উঁচু করে আমার ঠোঁটের কাছে ঠোঁট নিয়ে এলো। আমি ওর ঠোঁটে ঠোঁট রাখলাম। খোলা চুলে একটা ক্লিপ লাগিয়েছে। হাল্কা একটা পারফিউমের গন্ধ ওর শরীর থেকে ছড়িয়ে পরছে। চোখ আবেশে বন্ধ। আমি ওর মুখের দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছি। আজ ঠিক মন চাইছে না। তবু মিত্রাকে ফিরিয়ে দিতে ইচ্ছে করছে না। ও বলাকার মতো নীল আকাশে ডানা মেলতে চায়। দেখতে গেলে জীবনে ও কিছু পায় নি। আবার সব পেয়েছে। ঠোঁট থেকে ঠোঁট সরিয়ে আমার দিকে তাকালো। ওর শরীরটা ইষদ উষ্ণ। চোখ দুটো সামান্য ঘোলাটে। আমার বুকে ও ঠোঁট ছোঁয়ালো। ইশারায় বললো। চল বিছানায় যাই।
আমি ওর কথা মতো বিছানায় এলাম। ও আমাকে বিছানায় ঠেলে ফেলে দিয়ে বুকের ওপর ঝাঁপিয়ে পরলো।
ফোনটা বেজে উঠলো।
আমি বিছানা ছেড়ে উঠে গেলাম মিটসেফের দিকে। ফোনটা তুলে নিলাম। সন্দীপ।
বল।
সব এই মুহূর্তে ঠিক ঠাক আছে। রাত দশটা পর্যন্ত সনাতনবাবুর ঘরে কেচাল হয়েছে। তারপর ওরা হালে পানি না পেয়ে দান ছেড়ে দিয়েছে। শুনলাম, ম্যাডাম নাকি সনাতনবাবুকে যে পাওয়ার দিয়েছেন সেটা সনাতনবাবু শো করাতেই ওরা চুপ চাপ হয়ে গেছে।
সব ঠিক ঠাক ছেড়েছিস তো।
হ্যাঁ। আজকে মনে হচ্ছে টাইমলি বেরোবে।
কাল এগারোটার পর একবার আসবি। লাস্ট আপডেট নেবো।
ঠিক আছে। গুড নাইট।
গুড নাইট।
ফোনটা রাখলাম। মিত্রা আমার দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে। ও বুঝতে পেরেছে কোনখান থেকে ফোন এসেছে। আফটার অল বিজনেসটা বোঝে। ডান হাতটা মাথায় দিয়ে বিছানায় হেলে পরেছে, উদ্দাম বুকটারদিকে চোখ পরতেই চোখ নামিয়ে নিলাম। আমি কাছে গিয়ে ওর পাশে বসলাম। ও একটু শোরেগেলো, আমি ওর পাসে শুলাম, ও আমার বুকে উঠে এলো।
ফোনটা অফিস থেকে এসেছিলো ?
মিথ্যে কথা বলতে পারতাম। বললাম না। ঘাড় দুলিয়ে বললাম হ্যাঁ।
কে।
আমার একজন ইনফর্মার।
সামথিংস রং মনে হচ্ছে। তুই খুব অফ মুডে আছিস।
ওকে কাছে টেনে নিলাম। কপালে একটা চুমু খেয়ে বললাম, সব বলবো তোকে। এখন একটু তোকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকতে ইচ্ছে করছে।
না। তুই কষ্ট পাবি আরি আমি আনন্দ করবো তা হয় না। সেই আনন্দটা পরিপূর্ণ নয়।
ঠিক আছে সব বলার পরে আমাকে ফিরিয়ে দিবি না।
ও আমাকে চুমু খেয়ে বললো, তোকে কোনো দিন ফিরিয়ে দিয়েছি। সব কষ্টের মধ্যেও তুই যখনি ডেকেছিস আমি চলে এসেছি।
উঠে গিয়ে মোবাইলটা নিয়ে এলাম।
ওকে পঙ্খানু-পুঙ্খরূপে সব বললাম। মোবাইল থেকে রেকর্ডিং গুলো সব শোনালাম। এমনকি দিবাকরের মোবাইল থেকে যে রেকর্ডিং কপি করেছিলাম, তাও শোনালাম।
মিত্রার চোখর রং বদলে যাচ্ছে। ওর শরীরের ভাষা বদলে যাচ্ছে। সব শোনার পর মিত্রা রুদ্রমূর্তি ধরলো। চেঁচামেচি শুরু করে দিলো। এখুনি আমি কলকাতায় যাবো। রবীনকে ফোন কর। এতোবড়ো সাহস স্কাউন্ড্রেল গুলোর। ওরা সাপের পাঁচ পা দেখেছে। এক একটাকে লাথি মেরে দূর করে দেবো। ওরা ভাবে কি মিত্রা বাঁজা মেয়ে।
এই নিশুতি রাতে ওর গলা গাঁ গাঁ করে উঠলো। কাকারা জেগে উঠলে একটা কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে, আমি ওর মুখ চেপে ধরলাম। ওকে থামিয়ে রাখা যাচ্ছে না। তুই ছাড় বুবুন, সব কটাকে দূর করবো।
বাধ্য হয়ে বিছানায় জোড় করে শুইয়ে ওর ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ধরলাম। রাগে ও ফুলে ফুলে উঠছে। তারপর ঝড় ঝড় করে কেঁদে ফেললো। আমার বুকে মুখ লুকিয়ে ফুলে ফুলে কেঁদে উঠছে। ওর ফোঁপানি কিছুতেই থামাতে পারছি না। আমার জন্য তোকে কতো অপমান সইতে হলো। তোর এই ছোট্ট বুকে কতো ব্যাথা তুই গোপন করে আজ সন্ধ্যায় আমাকে আনন্দে ভাসিয়ে দিলি। নিজে এক কোনে পরে থাকলি কাউকে কিচ্ছু বুঝতে দিলি না। কেনো তুই এরকম করলি বল। আমি কি তোর কেউ নয়। আমাকে তুই কেনো জানালি না।
মিত্রা কেঁদে চলেছে চোখ বুঁজিয়ে। আমি ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি। ওর উদ্দাম শরীরটা আজ কোন নেশা জাগাচ্ছে না। পূব আকাশে ভোরের আলোর ক্ষীণ পরশ লেগেছে।
মিত্রা।
উঁ।
চল দীঘাআড়ি থেকে ঘুরে আসি।
ও আমার মুখের দিকে তাকালো। চোখ দুটো জবা ফুলের মতো লাল, চোখের কোল দুটো কেঁদে কেঁদে ফুলিয়ে ফেলেছে।
ওঠ। ঝপ করে কাপর পরে নে। ঘুরে আসি দেখবি মনটা ভালো লাগবে। খোলা আকাশের নীচে বসে অনেক কিছু সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।
মিত্রা উঠে পরলো। কাপর পরে নিলো। দুজনে বাড়ির দরজা ভেজিয়ে বেরিয়ে এলাম।
তোর মোবাইলটা নিয়েছিস।
হ্যাঁ।
চল।
আমরা দুজনে বেরিয়ে এলাম। খামাকে এসে একবার পেছন ফিরে তাকালাম। না কেউ আমাদের দেখছে না। সবাই ঘুমোচ্ছে।
মিত্রা আমাকে জড়িয়ে ধরে হাঁটছে। খামার পেরিয়ে বড়মতলার কাছে এসে দাঁড়ালাম। এখনো আকাশে জ্যোতস্না আছে। কিন্তু সূর্যের আলোও ফুটে উঠছে। আমার কাছে সব চেনা দৃশ্য। মিত্রার কাছে নয়। ও যেন সব গোগ্রাসে গিলে খাচ্ছে। অনাদির বাড়ি ছাড়িয়ে যখন ফাঁকা মাঠটায় এসে পরলাম তখন পূব দিক লাল হয়েছে।
ইস ক্যামেরাটা আনলে ভাল হোতো।   
মোবাইলে তোল।
দাঁড়া।
ও পূব আকাশের দিকে মোবাইলের ক্যামেরাটা ঘুরিয়ে ঠিক করলো। সবুজ ধান খেতে শিশিরের পরশ। কেউ কেউ এরি মধ্যে মাঠে নেমে পরেছে। ও প্রায় পাঁচ সাত মিনিট ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ছবি তুললো।
বুবুন এদিকে আয়।
আমি কাছে গেলাম। তুই এটা ধর। আমি ধরলাম। ও ছুটে ধান ক্ষেতে নেমে পরলো। আমি বললাম বেশি দূর যাস নি। সবে ধানগাছ গুলোর বুকে দুধ এসেছে নষ্ট হয়ে যাবে। ও আমার কথা মতো বেশি দূর গেলো না। মনের খেয়ালে নানা পোজ দিলো। আমি ধরে আছি। কাছে এসে আমার কাছ থেকে মোবাইলটা নিয়ে আমার গালে গাল ঘসে ক্যামেরা তাক করলো। একবার চকাত করে চুমুও খেলো। মোবাইল অফ করলো।
আবার হাঁটা। ধান ক্ষেতের মাঝখান দিয়ে শরু আইল পথে আমরা এসে পৌঁছলাম। মিত্রা দুচারবার হোঁচোট খেলো। আমাকে জাপ্টে ধরলো। কখনো খুনসুটি করলো। আমি আমার সেই চেনা জায়গায় এলাম।
ওআও। মিত্রার মুখ দিয়ে এক অদ্ভূত শব্দ বেরিয়ে এলো।
কিহলো।
এতো সুন্দর জায়গা আমি আগে কখনো দেখি নি। বিশ্বাস কর বুবুন। একবার ছুটে দীঘির পারে চলে গেলো তারপর ছুটে এসে আমার বুকে ঝাঁপিয়ে আদর করে নাচতে আরম্ভ করলো। যেন ময়ূরী আকাশে কালো মেঘ দেখে পেখম তুলে নাচতে শুরু করেছে।
তুই সেদিন এখানে বসে ছিলি!
হ্যাঁ।
তোর টেস্ট আছে।
বলছিস।
তুই পাখির ডাক শুনতে পাচ্ছিস।
দাঁড়া রেকর্ড করি।
আবার মোবাইল চালু। নীপা আস্তে আস্তে দূরে চলে যাচ্ছে। আমি নিমগাছের একটা নরম ডাল ভেঙে দুটো দাঁতন বানালাম। হঠাত বুবুন বুবুন চিৎকারে ফিরে তাকালাম। মিত্রা রুদ্ধশ্বাসে দৌড়চ্ছে। আমি দৌড়ে ওর কাছে গেলাম। ও আমার বুকে ঝাঁপিয়ে পরে জড়িয়ে ধরলো। কামার শালের হাপরের মতো ওর বুক ওঠা নামা করছে। আমার বুকে মুখ লুকিয়েছে। হাত দিয়ে খালি ওই দিকটা দেখাল। দেখলাম কয়েকটা শেয়াল লেজ নাড়তে নাড়তে চলে গেলো। আমি পাঁজা কোলা করে তুলে এনে ওকে ঘাসের বিছানায় শুইয়ে দিলাম। তখনো ওর বুক ওঠানামা করছে। আমি ওর বুকে কান পাতলাম। লাবডুব শব্দের তীব্রতা একটু কমে এসেছে।
আমি দীঘির বুকে ভেসে থাকা পদ্মপাতা ছিঁড়ে তাতে করে জল নিয়ে এলাম। ওর চোখে মুখে ছিটিয়ে দিলাম। জলের স্পর্শে ও চোখ মেলা তাকালো। মুচকি হেসে আমাকে জড়িয়ে ধরে একটা চুমু খেলো। আস্তে আস্তে কানে কানে বললো।
তোকে কেমন ভয় পাইয়ে দিয়েছিলাম বলতো। খুব আদর খেতে ইচ্ছে করছিলো।
হাসলাম। ওগুলো শেয়াল। ও আবার চোখ বন্ধ করলো।
কিরে দাঁত মাজবি না। আমি দাঁতন বানিয়ে রেখেছি।
ও চোখ খুললো, উঠতে ইচ্ছে করছে না। তুই আমাকে জড়িয়ে ধরে থাক।
শিশিরের জলে কাপর ভিঁজে গেলো যে।
যাক। এরকম ভেঁজা কজনের ভাগ্যে ঘটে।
দাঁত মেজে চল একজনের বাড়িতে গিয়ে একটা সারপ্রাইজ দিই। যাবি।
কার বাড়িতে।
সে বলবো না। গেলে দেখতে পাবি।
সেই শয়তানটার বাড়িতে।
উঃ ওই নামটা উচ্চারণ করে এই মুহূর্তটা নষ্ট করিস না।
ঠিক আছে। সরি।
দাঁতন নিয়ে দুজনে দাঁত মাজলাম। দীঘির টল টলে কাঁচের মতো স্বচ্ছ জলে মুখ ধুলাম, মিত্রার আঁচলে মুখ মুছলাম।
কটা বাজে বলতো ? মিত্রা জিজ্ঞাসা করলো।
আমি মোবাইলের ঘরিটা দেখে বললাম, ছটা দশ।
মাত্র!
আমরাতো এখানে অনেকক্ষণ এসেছি।
হুঁ।
কখন বেরিয়েছি বাড়ি থেকে।
চারটে হবে।
আজ দুজনে সারারাত ঘুমোলাম না। কি করবি কিছু ভাবলি।
সব ভেবে রেখেছি। ঘরে চল সব জানতে পারবি।
ঠিক আছে চল।

জীবনে জীবন যোগ না করলে ব্যার্থ হয় গানের পসরা

৫২

Re: কাজলদীঘি, শ্মশান ও পীরসাহেবের থান

বাঁধ থেকে নেমে এসে ধানখেতের মাঝখান দিয়ে শরু আইলপথ ধরলাম। ধানের শিষের বুকে সকালে যে বিন্দু বিন্দু শিশিরের ছোঁয়া দেখেছিলাম, নরম রোদের স্পর্শে এখন উধাও। দুজনে হেঁটে চলেছি। সামনের দিকে। টেস্টে রিলিফের ছোট্ট বাঁধটা পেরিয়ে, মেঠো রাস্তা ধরে অনাদির বাড়ির কাছে এলাম। সেই এক দৃশ্য আনাদির বাচ্চা দুটো খামারে ধুলো মেখে খেলা করছে। আজকেও ও দুটোকে দেখতে ভালো লাগছে। মিত্রা আমার হাত দুটো চেপে ধরে বললো, দেখ বাচ্চা দুটো কি কিউট।
আমি ওর দিকে তাকিয়ে হাসলাম।
আজ অনাদিকে ডাকতে হলো না। কাঞ্চন বেরিয়ে এসে এক মাথা ঘোমটা দিয়ে আমাকে আর মিত্রাকে একটা ঢিপ করে প্রণাম করলো। ভেতরে চলো ওকে ডেকে দিচ্ছি। এইতো ভোরে ঘুমলো কোথায় কি ঝামেলা হয়েছে।
মিত্রা অপ্রস্তুত হয়ে পরলো। ওর চোখের ভাষা বুঝতে পারলাম।
কাঞ্চন, অনাদির স্ত্রী।
আমার হাত ছেড়ে ও কাঞ্চনকে জড়িয়ে ধরলো।
ওই দুটো অনাদির বাচ্চা।
এইবার ওকে ধরে রাখা মুস্কিল হলো ও ছুটে গিয়ে বাচ্চা দুটোকে কোলে তুলে চটকাতে লাগলো। বাচ্চা দুটো প্রথমে একটু ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেছে। তারপর ভ্যাঁ করে কেঁদে উঠলো।
মিত্রা ওদের ছেড়ে দিলো। ভেতর থেকে কাকার গলা পেলাম, কেগো বৌমা।
অনিদা।
কাকা চেঁচামিচি শুরু করে দিলেন। আমি খামর থেকেই চেঁচিয়ে উঠলাম, তোমায় ব্যস্ত হতে হবে না।
ভেতরে আয়।
যাচ্ছি।
কাকা পায়ে পায়ে খামারে বেরিয়ে এলো। এই মেয়েটা কে ? চিনতে পারলাম না।
এ হচ্ছে সেই।
কাকা এগিয়ে এসে মিত্রার গালে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
বেশ মিষ্টিরে অনি।
তোমার পছন্দ ?
খুব ভালো।
মিত্রা এবার ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছে। আমাকে ইশারায় জিজ্ঞাসা করল প্রণাম করবো, আমি বললাম না।
কাঞ্চনের দিকে তাকিয়ে বললাম একটু চা বসাও, আর কত্তাকে ডাকো।
কাঞ্চন ভেতরে চলে গেলো। কিছুক্ষণের মধ্যে অনাদি বেরিয়ে এলো চোখ মুছতে মুছতে।
কিরে। নিশ্চই ম্যাডামকে তোর পাগলামোর সঙ্গী করেছিস।
মিত্রা হাসছে।
মাথা নীচু করে ওদের বাড়ির বারান্দায় এলাম।
মিত্রা দড়ির দোলনা দেখে অবাক। আমাকে বললো, একবার বসিয়েদে একটু দুলি।
আচ্ছা চল। ওকে বসিয়ে দিলাম। ও বাচ্চা মেয়ের মতো দুলছে। না দেখা জিনিষগুলো প্রাণ ভরে লুটে নিতে চাইছে।
বাইকের আওয়াজ পেলাম। বাইরে তাকালাম। চিকনা আর বাসু। আমি পায়ে পায়ে খামারে বেরিয়ে এলাম।
কিরে এতো সকালে!
চিকনা খিস্তি দিতে যাচ্ছিল, কিন্তু মিত্রার দিকে চোখ পরতে থেমে গেলো। সারারাত নিজেও ঘুমোবি না, কাউকে ঘুমোতেও দিবি না।
ওর দিকে তাকালাম। বোঝার চেষ্টা করলাম।
সকাল বেলা শ্মশানের হাওয়াও খাওয়ালি।
মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে আছি। বাসু হাসছে। অনাদি বেরিয়ে এলো। ওদের দুজনকে দেখে একটু অবাক হলো।
কিরে ?
কি আবার। সারা মহল্লা খুঁজে শেষে এখানে এসে পেলাম। তাও মেডামের শাড়িটা দীঘাআড়ি থেকে চোখে পরলো বলে। শালা সকালের শ্মশানটাও দেখা হয়ে গেলো ওর জন্য।
শ্মশানে গেছিলি কেনো ? আবার কে মারা গেলো ?
কেউ মরে নি নিজেই মরে গেছিলাম, সঙ্গে বাসুকেও প্রায় মেরে দিয়েছিলাম।
কেনো।
অনিকে জিজ্ঞাসা কর।
অনাদি আমার মুখের দিকে তাকলো। আমি মাথা নীচু করে আছি।
বাসু অনাদিকে বললো, কাল সারারাত ওরা দুজনে ঘুমোয় নি। মিত্রা ভীষণ চেঁচামিচি করেছে। নীপাও ঘুমোওনি। ওদের সব কথা শুনেছে। ও ভীষণ ভয় পেয়ে গেছে। ওরা বেরিয়ে আসতে, নীপা চিকনাকে ফোন করেছিলো। ভীষণ কান্নাকাটি করেছে। বাধ্য হয়ে চিকনা ওই রাতে আমার কাছে আসে। আমি প্রথমে গাড়িটা লক্ষ্য করি। না গাড়িটা ঠিক আছে। তখনি বুঝলাম ওরা চলে যায় নি। এখানেই কোথাও আছে। প্রথমে দুজনে মিলে হারুর কালায় যাই, ওখান থেকে শ্মশানে, তারপর দীঘাআড়ি। ওখানে এসে মিত্রার শাড়িটা লক্ষ্য করে চিকনা। আমায় দেখায়। আমি বলি হ্যাঁ। ওখান থেকে তোর বাড়িতে এলাম।
মিত্রা দোলায় দুলছে, বাচ্চাদুটোর সঙ্গে মনে হয় ভাব জমিয়ে নিয়েছে। দুটোই দেখছি ওর কোলে।
চল ভেতরে চল।
দাঁড়া নীপাকে একবার ফোন করি। যে মেয়েকে কোনদিন কাঁদতে দেখি নি, তাকে কাল কাঁদতে শুনে মাথা খারাপ হয়ে গেছিলো। চিকনা বললো।
মিত্রাকে কিছু বলিস না। ও খুব আপসেট আছে।
তোকে আর জ্ঞান দিতে হবে না। ওগুলো বুঝতে ঘটে বুদ্ধি লাগে না।
হেসেফেললাম।
হাসিস না।
চিকনা নীপাকে ফোন করে সব জনালো।
আমরা অনাদির বাড়ির দাওয়ায় বসলাম।
চা এলো। সঙ্গে নারকেলকোড়া ঘি দিয়ে মুড়ি মাখা। মিত্রা দোলনা ছেড়ে আমাদের পাশে এসে বসলো। চিকনা একবার তাকালো মিত্রার দিকে।
কাল খুব ভালো ঘুম হয়েছে মনে হচ্ছে, চোখের কোল দুটো ফোলা ফোলা।
মিত্রা মাথা নীচু করলো। আপনাদের খুব কষ্ট দিলাম।
আপনি নয়, তোমাদের খুব কষ্ট দিলাম। চিকনা বললো।
মিত্রা হেসে ফেললো, ফ্যাকাসে হাসি।
হাসলেন বটে কিন্তু কালকে পুকুর ঘাটে যখন পরে যাচ্ছিলেন, তারপর অনির দিকে তাকিয়ে যে হাসিটা ঝেড়েছিলেন সেরকম নয়। চিকনা এমন ভাবে কথা বললো মিত্রা খিল খিল করে হেসে ফেললো।
এইবার মিললো।
আমরা মরে যাই নি ম্যাডাম। অনি যেমন আপনার। আমাদেরও।
জানি। আমি কালকের সব ঘটনা শুনলাম ওর মুখ থেকে।
আমাদের খপ্পরে পরা খুব সহজ, বেরোনো খুব কঠিন। আপনি কিচ্ছু চিন্তা করবেন না। অনাদির দিকে ঘুরে তাকিয়ে, হ্যাঁরে মুড়ি কি বারন্ত।
অনাদি এমন ভাবে তাকালো, চিকনা হেসে ফেললো।
খিদে লেগেছে।
খা না, টিনটা বসিয়ে দেবো।
ম্যাডাম লজ্জা পাবে। গাঁয়ের ছেলে, খাওয়া তো দেখে নি, বিড়াল ডিঙোতে পারবে না।
মিত্রা হাসলো।
ওদিকের খবর।
রাতে সঞ্জয়ের জিম্মায় চলে গেছে। সব ঠিক আছে। ম্যাডাম যখন বলবে হাজির করে দেবো।
সঞ্জয়ের জিম্মায় মানে! অনাদি বললো।
কাল রাতে কিছু একটা হয়েছিল। সঞ্জু আমায় ফোন করলো। আমি বললাম চেলাকাঠ দিয়ে পিঠ গরম করে দে, তারপর তোর ওখানে নিয়ে গিয়ে রাখ।
মিত্রা চিকনার কথায় হেসে ফেললো।
হাসবেন না ম্যাডাম ওই শা...।
চিকনা একহাত জিভ বারকরে ফেললো। সরি।
কালকে মেলার মজাটাই নষ্ট হয়ে গেছে। ওকে এতো সহজে ছেড়ে দেবো না।
এখন কোথায়। অনাদি জিজ্ঞাসা করলো।
সঞ্জয়ের বাড়িতে।
ঠিক আছে।
তোরা কি চিন্তা করলি। অনাদি আমার দিকে তাকিয়ে বললো।
আমি ভেবে রেখেছি। মিত্রাকে বলিনি। বাড়িতে গিয়ে বলবো। মোবাইলটায় ফোন এসেছিলো ?
বহু। এইতো ভোর বেলা পর্যন্ত। কানের কাছে খালি টেঁ টেঁ।
নিয়ে আয়।
ওইটা দেখেছিস। চিকনা বললো।
হারামী। কথাটা বলেই অনাদি জিভ কাটলো। মিত্রা মাথা নীচু করে হাসছে।
হটকেক। চিকনা বললো।
অনাদি ভেতরে চলে গেলো। কিছুক্ষণের মধ্যে ফোনটা নিয়ে এলো। আমার হাতে ফোনটা দিলো। মিত্রা বাসুকে কি যেনো ইশারা করলো। বাসু উঠে পরলো। মিত্রাও উঠে পরলো। ওরা একটু দূরে চলে গেলো। আমি ফোনটা অন করে কল লিস্ট দেখলাম। চম্পকদা সুনীতদা অতীশবাবুর ফোন। এই তিনটে নাম দেখলাম সেভ করা আছে। বাকিগুলো বুঝতে পারলাম না। অনাদিকে বললাম, একটু কাগজ কলম নিয়ে আয়। অনাদি নিয়ে এলো আমি নাম্বার গুলো নোট করলাম টাইমগুলো নোট করলাম। আনাদিকে বললাম, ওকে সাড়েনটায় নিয়ে আয়। আমি দশটায় মিটিং কল করছি অফিসে।
কোন অফিসে ?
কলকাতায়। আমার অফিসে।
যাবি কি করে ?
যাব না এখান থেকেই টেলি-কনফারেন্সে করবো। ইচ্ছে ছিল সকলের সামনে ওর মুখোশ খুলবো। তা হবে না।
সে তোকে চিন্তা করতে হবে না। আমি সব ব্যবস্থা করে রেখেছি। ওকে এবার গ্রাম ছাড়া করবো। অনাদি বললো।
আমি ওকে না বলতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু বললাম না।
মিত্রা ওখানে কি করছে বলতো বাসুর সঙ্গে।
তোর কি। চিকনা বললো।
কি করছে জানিস ?
কি।
নিশ্চই কোনো খেলনার দোকান খুঁজছে এই সাতসকালে। অথবা ক্যাটবেরি কিংবা চকলেট।
মনগড়া কথা বলিস না।
তুই ওদের কথা শুনে এসে আমায় বল।
যদি না হয় কি দিবি।
তোকে অনেক কিছু দেবো। ধরে রাখতে পারলে জীবনে আর কিছু করতে হবে না।
চিকনার চোখ চক চক করে উঠলো, ঠিক।
হ্যাঁ।
চিকনা উঠে গেলো, আমি অনাদিকে কাল রাতের সমস্ত ঘটনা সংক্ষেপে বললাম। অনাদির চোখ কঠিন হয়ে গেলো। তোর ধৈর্য আছে অনি। তোর কাছ থেকে অনেক কিছু শেখার আছে। শালাকে এমন শাস্তি দেবোনা, এবার তুই দেখবি।
না অনাদি। ছোট থেকে আমরা একসঙ্গে বড় হয়ে উঠেছি। আমরা একে অপরের বন্ধু। ওকে শোধরাবার ব্যবস্থা করতে হবে। চেষ্টা করে দেখি না।
তুই মহান হতে চাইছিস।
না। জীবনে কিছু পায় নি। আমার থেকে তুই এটা ভাল জানিস। তোর বাড়িতে এসে পান্তা খেয়ে অনেক দিন দুজনে মিলে এক সঙ্গে স্কুলে গেছি। কেনো ? কাকার পয়সা ছিল না! না আমার বাবার কিছু কম ছিলো! আজ আমার কাছে সবাই ভালো। আরে দিবাকরতো পরের ছেলে। কাকাকে আমিতো কোনদিন পর ভাবি নি। থাক ওসব কথা, চলে আয় ঠিক ওই সময়। আমি দিবাকরের সঙ্গে আগে একটু কথা বলে নেবো। অনাদি মাথা নীচু করে আছে।
আমায় ক্ষমা করিস। আমি না জেনে তোকে.....।
ছার ওসব কথা, একটা সিগারেট দে।
অনাদি উঠতে যাচ্ছিলো, চিকনা এলো। গুরু তুমি অন্তর্যামী।
সিগারেটের প্যাকেটটা আগে বার কর। অনাদি বললো।
দিলিতো মাঝখানে টুকে।
প্যাকেটটা আগে বার কর, অনি চাইছে।
অনি। আগে বললি না কেনো।
চিকনা সিগারেটের প্যাকেটটা বার করলো। একটা সিগারেট নিয়ে ধরালাম, বল।
তোমার কথাই ঠিক। তুমি কি করে জানলে একটু শেখাও।
মানুষকে ভালবাসতে হবে। নিঃস্বার্থ ভাবে।
বিদ্যেটা শিখতে হবে।
বাসু কি বলছে। বেলায় ব্যবস্থা করে দেবে। ম্যাডাম বলছে এখুনি। এই নিয়ে ক্যাচাল।
আমি মিত্রার দিকে তাকালাম, ওকে ডাকলাম, মিত্রা কাছে এলো। বাসু যা বলছে, ঠিক বলছে। চল অনেক কাজ। ও যখন সাড়ে নটার সময় আসবে, তখন নিয়ে আসবে।
ঠিক।
আমিতো বলছি।
বাসু হাসছে।
আমরা ফিরে এলাম। আমাদের দূর থেকে আসতে দেখে নীপা এগিয়ে এলো। খামারে এসে দাঁড়িয়েছে। চোখের কোলে কে যেন একপোঁচ কালি লেপে দিয়েছে। কয়েকঘন্টার ব্যবধানে মেয়েটার বয়স দশ বছর বেরে গেছে। মিত্রার বুকে মুখ গুঁজে ফুলে ফুলে কেঁদে উঠলো। আমি পাশে নীরবে দাঁড়িয়ে আছি। মেবাইলের ঘড়িটা দেখলাম, সকাল ৭.৩০ বাজে। নীপা কিছু একটা ঘটনা ঘটেছে বুঝতে পেরেছে। কি ঘটেছে বুঝে উঠতে পারছে না।
মিত্রা নীপার মুখটা তুলে বললো, আমার একটুতে মাথা গরম হয়ে যায়। তোর অনিদার মাথাটা বরফের মতো ঠান্ডা। তাইতো ওকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছি। তোর কোন চিন্তা নেই। দেখিস আর কয়েকঘন্টার মধ্যে সব ঠিক হয়ে যাবে। মিত্রা নীপার চোখ মুছিয়ে দিলো। এখন আর ওবাড়িতে যাবো না। কাকারা কিছু জানে নাতো।
নীপা মাথা দুলিয়ে বললো না।
তুই একটু চা নিয়ে আয়।
আর কিছু খাবে না।
কি করেছিস।
আলু ভেজেছি। একটু মুড়ির সঙ্গে মেখে দেবো।
যা নিয়ে আয়।
ওপরে এলাম। মিত্রাকে আমার প্ল্যানের সমস্ত ব্যাপারটা বুঝিয়ে বললাম। ওর চোখ ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইছে। তুই কি বলছিস।
আমি যা বলছি তাই কর। মিত্রা ফোন তুলে নিলো, ভয়েস অন করে রেকর্ডিং চালু করে দিলাম।
সনাতনবাবু হ্যালো করে উঠলেন।
অফিসের খবর কি।
ম্যাডাম আর বলবেন না। এই কদিনে আমার দফারফা করে দিচ্ছে এরা।
কারা।
চম্পকবাবু, সুনিতবাবু। আর্ট ডিপার্টমেন্টের কয়েকজন। কাকে বাদ দিয়ে কাকে বলি বলুনতো।
আপনি কি করছেন।
আমি কি করবো। কথা শুনলেতো। এরা কিছুই মানছে না। বিশেষকরে সুনিতবাবু। আমি কিছু বলতে পারছি না। উনি আপনার আত্মীয়।
ঠিক আছে। আমি টেলি কনফারেন্সে আজ এগারোটার সময় মিটিং করবো। সব ডিপার্টমেন্টের ম্যানেজারদের থাকতে বলবেন। সবাইকে সাড়ে দশটার মধ্যে অফিসে হাজির হতে বলুন। আমার ঘরে বসাবেন। আর শুনুন, সব রেকর্ডিং করবেন।
ঠিক আছে ম্যাডাম।
আমি ঠিক এগারোটার সময় ফোন করবো। আপনার মোবাইলে।
আচ্ছা ম্যাডাম।

নীপা আলুভাজা মেখে মুড়ি চা নিয়ে এলো। আমার দিকে কিছুতেই তাকাচ্ছে না। আমি খাটে পা ঝুলিয়ে হাতের ওপর হেলান দিয়ে একটু পেছনে হেলে বসে আছি। মিত্রা আমার পাশে খাটের ওপর। নীপা মুড়ির বাটিটা খাটের ওপর রেখে আমার পায়ের কাছে বসে। আমার কোলে মাথা রেখে হাউ হাউ করে কেঁদে উঠলো। প্রথমটায় ভীষণ অপ্রস্তুত হয়ে পরেছিলাম।
আমায় ক্ষমা করো অনিদা।
আমি ওর মাথায় হাত রাখলাম। কেনো।
আমি তোমাকে না জানিয়ে চিকনাদাকে ফোন করেছিলাম। তুমি বিশ্বাস করো আমার মাথাটা তখন কোনো কাজ করছিল না।
দূর এসব নিয়ে এতো কেউ ভাবে।
নাগো মিত্রাদি ওই রকম রেগে যেতে পারে, আমি ভাবতেই পারিনি।
রাগটাও মানুষের একটা ধর্ম।
কই তুমিতে কোনো দিন রেগে যাও নি।
আমিতো বোকা। বোকারা কখনো রাগতে পারে।
এমন ভাবো কথাটা বলে ফেললাম, এই সিচুয়েসনেও নীপা কাঁদতে কাঁদতে হেসে ফেললো। মিত্রা হো হো করে হেসে বিছানায় গড়িয়ে পরলো।
তুই হাসছিস না কাঁদছিস। মিত্রার দিকে তাকিয়ে বললাম।
কেনো হাসছি।
আমি ভাবলাম তুইও কাঁদছিস।
নীপা উঠে গিয়ে মিত্রার ওপর ঝাঁপিয়ে পরলো।
হ্যাঁরে তোর বাথরুম পায় নি ?
পেয়েছে। তুই মুখ পাত।
উঃ মিত্রাদি তুমি না।
তোর অনিদা যেরকম, সেরকম উত্তর না দিলে বিপদ আছে।
না কালকের পর তোকে....।
বুবুন খারাপ হয়ে যাবে।
নীপা চোখ পিট পিট করছে, তার মানে।
কি, বলবো ?
প্লিজ বুবুন।
ঠিক আছে।
তাহলে ওটা করবি।
হ্যাঁ। না না না...।
ওরা দুজনেই হো হো করে হেসে উঠলো।

ওরা সবাই ঠিক সময়ে এসেছে। দিবাকরও এসেছে। আমার মুখে কোনো বিকার নেই। আমার এই ঘরে এখন লোক দাঁড়াবার জায়গা নেই। আরো দু’চারজন নতুন মুখ দেখতে পেলাম। আমি চিনতে পারলাম না। বুঝলাম অনাদির চাল। অনাদি কারুর সঙ্গেই আলাপ করালোনা। 
দিবাকর এসেই কাঁদুনি গাইতে আরম্ভ করেছে।
আমি ওকে ভাল মুখে সবকথা স্বীকার করে নিতে বললাম, ও কিছুতেই স্বীকার করবে না। বার বার একি কথা অনাদি ওকে প্ল্যান করে ফাঁসিয়েছে।
আমি মিত্রার দিকে তাকালাম, মিত্রা মুচকি মুচকি হাসছে।
কিছু বুঝছিস।
হ্যাঁ।
ও কালকে তোর পাশেবসে তোর সঙ্গে রসিয়ে রসিয়ে সঙ্গে করেছে। কলকাতায় ওটা রেকর্ডিং হয়েছে। তাও বলছে ওকে ফাঁসানো হচ্ছে।
তুই বিশ্বাসকর অনি।
তুই কাল মিত্রার সঙ্গে কি কথা বলেছিস তার রেকর্ডিং শুনবি।
দিবাকর মাথা নীচু করলো।
এরপরও তুই বলবি তোকে ফাঁসানো হয়েছে। তুই কাল আরো অনেক কিছু বলেছিস। আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আঘাতটা আমি তোর কাছথেকে পেয়েছি।
তুই একবার পারমিশন দে অনি, দেখ পাঁচমিনিটের মধ্যে কিমা করে দেবো। চিকনার চোখে মুখের চেহারা বদলে গেছে। সঞ্জু চিকনার পাশে দাঁড়িয়ে রাগে ফুঁসছে।
আমি তোর পায়ে ধরছি তুই আমাকে বাঁচা। দিবাকর আমার পা ধরে ফেললো।
দিবাকরের ফোনটা বেজে উঠলো। আমি চিকনার হাত থেকে মোবাইলটা নিলাম। দেখলাম সুনিতদার নম্বর। ভয়েস অন করে দিবাকরের হাতে দিলাম। তোর হবু বস ফোন করেছে। রেসপন্স কর। নাহলে চিকনার কথাটা মনে রাখিস। একবারে বেগড় বাই করবি না। খুব সাধারণ ভাবে। যেভাবে গত চারদিন কথা বলেছিস সেইভাবে বলবি। চিকনা রেকর্ডিংটা টিপে দে।
চিকনা রেকর্ডিংটা অন করে দিলো।
হ্যালো হ্যালো।
বলুন।
তোমার খবর কি ? কালকে সেই রাত দশটায় লাস্ট নিউজদিলে তারপরে কিহলো বলো।
কোনো খবর নেই তাই দিই নি।
গলাটা এত ভারী কেনো। কেউ জানতে পেরেছে নাকি।
আমি দিবাকরের দিকে তাকালাম, হাতের ইশারা করলাম।
না।
কালকে থেকে কতবার তোমায় ফোন করেছি, চম্পকবাবু করেছে অতীশবাবু করেছে। কি বলবো।
ফোনটা প্রবলেম করছিলো।
লেটেস্ট খবর কি বলো ?
ভালো নয়।
আমি দিবাকরের দিকে কটকট করে তাকালাম।
কেনো!
কাল রাতে এখান থেকে ওরা চলে গেছে।
তারমানে! কোথায় খোঁজ নাও।
কি করে নেবো। আমাকে বলে গেছে নাকি।

জীবনে জীবন যোগ না করলে ব্যার্থ হয় গানের পসরা

৫৩

Re: কাজলদীঘি, শ্মশান ও পীরসাহেবের থান

কোথায় আবার যাবে আমার সঙ্গে কিছুক্ষণ আগে ম্যাডামের কথা হয়েছে। ওরা গাড়ি করে কোথায় যাচ্ছে মনে হয়।
কাছাকাছি দীঘা আছে ওরা হয়তো দীঘা গেছে।
দ্যাটস রাইট এটা ঠিক বলেছো। তুমি পাত্তা লাগাও। টাকার জন্য চিন্তা করোনা। যা লাগে আমি দেবো। যদি বোঝো এখুনি একটা গাড়ি ভাড়া করে চলে যাও।
ঠিক আছে।
রবিনকে পেলে।
না।
ওরা কিন্তু রবিনকে নিয়ে যায় নি। ম্যাডাম গাড়ি চালাচ্ছে।
ও।
রবিনের বাড়ি তোমাদের পাশের গ্রামে। একবার পাত্তা লাগাও। ওকে আমার খুব দরকার। অনিটা খুব ধুরন্ধর ছেলে, মিত্রাকে দিয়ে যদি কিছু সই সাবুদ করিয়ে নেয় সব কেঁচে যাবে।
মিত্রা ফিক করে হেসে ফেললো। আমি ওর মুখ টিপে ধরলাম।
শোনো তুমি কনফার্ম খবরগুলো নিয়ে আজ কোলকাতায় চলে এসো।
না। এখানে একটা কাজ পরে গেছে।
এমা, ম্যাডামের সঙ্গে আমার কথা হল আমি সব বললাম। উনিতো ভয়ে কাবু। আরে কিছু হোক ছাই না হোক সম্মানের একটা ব্যাপার আছেতো। ওই রকম একটা ফালতু ছেলের সঙ্গে ঢলানি। এই ফাঁকে আমি আমার কাজ গুছিয়ে নিলাম। বাধ্য হয়ে উনি সব মেনে নিলেন। আমি অনির জায়গায় তোমায় বসাবো। তুমিযে কি উপকার করলে। আরে হুঁ হাঁ করছো কেনো ?
দিবাকর আমার দিকে তাকালো। আমি ইশারা করলাম। কথা তাড়াতাড়ি শেষ করতে।
আপনার কথা শুনছি। ঠিক আছে কিছুক্ষণ পর আপনাকে ফোন করছি।
এনি নিউজ।
না। রাখছি।
সঞ্জয় ফোনটা ছিনিয়ে নিয়ে কেটে দিয়ে রেকর্ডিংটা সেভ করলো।
আমি বললাম লাস্ট রেকর্ডিংটা আমার মোবাইলে ট্রান্সফার কর।
মিত্রা মুখ নীচু করে বসে আছে।
এবার বল দিবাকর। তোর কিছু বলার আছে, দিবাকর হাঁউ মাউ করে কেঁদে উঠলো।
চিকনা ওকে প্রায় মেরেই দিচ্ছিলো, সঞ্জয় ধরে ফেললো।
বল। তোর যদি কিছু বলার থাকে।
দিবাকর আমার পা জড়িয়ে ধরলো, আমায় বাঁচা অনি।
যে বাসুকে আমি এইকদিনে রাগতে দেখিনি। সব সময় আমার পাশে ছায়ার মতো থেকেছে। হঠাত ও দিবাকরের গালে একটা থাপ্পর মেরে বসলো।
বাসুর এই ব্যাবহারে ঘর ভর্তিলোক অবাক হয়ে গেলো।
চিকনা চেঁচিয়ে উঠলো। তোর ওই স্যাকরার ঠুকঠাকে হবেনা। আজই ওর ব্যাবস্থা করে দিচ্ছি।
এতোক্ষণ তুই মিত্থ্যাকথা বলছিলি কেনো। তুই ম্যাডামকে কতটুকু চিনিস। বাসু বললো।
আমি ওদের দিকে তাকালাম। ঘরের সব হো হো করে হাঁসছে।
অনাদি একে একে সবার সঙ্গে আমার আলাপ করিয়ে দিলো।
ওদের লোকাল কমিটির ভদ্রলোক বললেন, আপনার কথা অনেক শুনেছি আজ চাক্ষুষ দেখলাম।
আমি হাতজোড় করে নমস্কার করলাম।
আমার দেখাদেখি মিত্রাও নমস্কার করলো।
সত্যি আপনার বুদ্ধির প্রশংসা করতে হয়। অনাদির কাছে আপনার সমস্ত ঘটনা শুনে আমি থ।
আমি হাসতে হাসতে বললাম, পাঁচ বছর পর নিজের গ্রামে এসেছি। রথেরমেলা গত দশবছর দেখিনি। ভেবেছিলাম কাল রথ টানবো। হল না।
এই মুহূর্তে আমি খুব ইমোশোন্য়াল হয়ে পরলাম। নানা চিন্তা মাথায় বাসা বাঁধছে। মিত্রার দিকে তাকালাম। ও আমার দিকে ফ্য়াল ফ্য়াল করে তাকিয়ে আছে। দিবাকার আমার মুখের দিকে তাকিয়ে চোখ মুছছে। ওকে দেখে মায়া হচ্ছে আবার রাগও হচ্ছে। না বুজে ও কি করলো। মানুষের লোভ মানুষকে কত নিচে নিয়ে য়েতে পারে দিবাকর তার একটা উজ্জ্বল প্রমাণ। মনে মনে ঠিক করলাম দিবাকরকে একটা সুযোগ দেবো। দেখিনা যদি শুধরে যায়।
স্বগোতোক্তির সুরে ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে আস্তে করে বললাম, শুনেছি আপনি যেখানে দাঁড়িয়ে আছেন ওইখানে আমি ভূমিষ্ঠ হয়েছিলাম।
ভদ্রলোক অপ্রস্তুত হয়ে পরলেন, কোথায় দাঁড়াবেন ঠিক করতে পারছে না।
কটা বাজে।
এগারোটা পাঁচ।
দিবাকরের দিকে তাকালাম, তুই চুপচাপ থাকবি না মুখ-হাত-পা বেঁধে ওখানে ফেলে রাখবো।
দিবাকর কাঁদো কাঁদো মুখ করে বললো, আমি তোর পায়ের কাছে বসবো।
নীপা আমার পাশে এসে বসলো। ও আমার হাতটা চেপেধরে আছে। ও এই অনিদাকে দেখে নি। মুখ চোখ শুকিয়ে কাঠ। ও ঠিক ঠাহর করতে পারছে না, ব্যাপারটা কি ঘটছে।
মিত্রার দিকে তাকালাম, এবার তোর খেলা শুরু কর।
ঘরে পিন পরলে আওয়াজ হবে না। সবাইকে বললাম চুপ চাপ থাকবেন। কোন কথা বলবেন না। মিত্রা যা যা বলেছি খুব ঠান্ডা মাথায়, কখনই উত্তেজিত হবি না। মনে রাখবি এ্যাডমিনিস্ট্রেসনের কাছে মা-বাবা-ভাই-বোন-আত্মীয়স্বজন বলে কিছু নেই। ব্যাপারটা এইরকম, আই এম কোরাপ্ট বাট গুড এ্যাডমিনিস্ট্রেটর।
মিত্রার চোখে মুখের চেহারা বদলে গেলো। এটা সবাই লক্ষ করলো।
দিবাকর কোনো আওয়াজ করবি না, যদি বাঁচতে চাস। তোর মোবাইলটা কোথায় ?
চিকনা এগিয়ে দিলো। দিবাকরের দিকে তাকিয়ে বললাম, ইশারায় কাজ করবি।
তুই যা বলবি তাই করবো।
ঠিক আছে।
মিত্রা ডায়াল করতেই ও প্রান্ত থেকে সনাতনবাবুর গলা ভেসে এলো।
হ্যাঁ ম্যাডাম।
সবাই এসেছেন।
হ্যাঁ। ম্যাডাম।
নাম বলুন কে কে এসেছেন।
সনাতনবাবু ওপ্রান্ত থেকে সবার নাম বললেন।
সবার নাম নোটকরে সই করিয়ে নেবেন।
ঠিকআছে ম্যাডাম।
সুনিতবাবু।
হ্যাঁ ম্যাডাম।
কাগজের খবর কি ?
সব ঠিক আছে।
কিরকম।
আপনি যেভাবে ইনস্ট্রাকসন দিয়ে গেছিলেন সেই ভাবে চলছে।
তাই নাকি ? আমার কাছে যে অন্য খবর আছে।
না ম্যাডাম একটু ঝামেলা হয়েছিলো অমিতাভবাবু আর মল্লিকবাবুর সঙ্গে।
কি নিয়ে ?
আপনি আস্তে বারন করেছিলেন, আমি সেটা বলতেই বললো কাগজ দেখি।
আপনি কি বললেন ?
কাগজ দেখাতে পারি নি, আপনি মৌখিক ভাবে বলেছিলেন আমায়।
সনাতনবাবু কি বললেন ?
উনি বললেন আপনি যা ভাল বুঝবেন করবেন, তারপর ম্যাডাম এলে ডিসিসন হবে।
আমার কাছে সেরকম কোনো খবর নেই। বরং কাগজের বাইরের খবর নিয়ে আপনারা বেশি মাতামাতি করেছেন।
না ম্যাডাম।
সময় মতো কাগজ বেরোচ্ছে ?
হ্যাঁ ম্যাডাম।
গত কাল ছাড়া প্রতিদিন কাগজ সেকেন্ড ট্রেন ধরেছে।
কে বলেছে ম্যাডাম আপনি একবার তার নাম বলুন।
সনাতনবাবু।
হ্যাঁ ম্যাডাম, সুনিতবাবু যা বলছেন তা ঠিক নয় । গতকাল এক মাত্র ঠিক টাইমে কাগজ গেছে। আর যায় নি।
আপনি কি করছিলেন।
এ্যাকচুয়েলি ম্যাডাম...।
আপনাকে কাজের জন্য পয়সা দেওয়া হয়। মিত্রা ঝাঁঝিয়ে উঠলো।
হ্যাঁ ম্যাডাম।
আপনাকে যে পাওয়ার দিয়ে এসেছিলাম তা ইউটিলাইজ করেছেন।
এরা ঠিক....।
সুনিতবাবু।
হ্যাঁ ম্যাডাম।
কজনকে চাকরির লোভ দেখিয়েছেন ?
একজনকেও না।
আমি দিবাকরের ফোন থেকে রিং করলাম। সুনিতদার ফোন বেজে উঠেছে।
ম্যাডাম আমার একটা ফোন এসেছে।
মিত্রা নম্বরটা বললো, এই নাম্বার থেকে ?
চুপচাপ।
কি সুনিতবাবু চুপচাপ কেনো, নম্বরটা ঠিক বললাম না ভুল বললাম। কথা বলছেননা কেনো।
হ্যাঁ ম্যাডাম।
আপনার মামা ব্যাপারগুলো জানেন।
না।
ওকে ফোন করুন, আর বলুন আমাকে এখুনি ফোন করতে। শুনুন আপনি আমার টেলি-কনফারেন্স শেষ হলে অফিস থেকে বেরিয়ে যাবেন। আগামী শুক্রবার আমার ঘরে মিটিং। আপনি উপস্থিত থাকবেন। সেদিন যা বলার বলবো। এদের সামনে আর বললাম না।
ম্যাডাম, আমার কিছু কথা বলার ছিলো।
শুক্রবার বেলা এগারোটা। চম্পকবাবু।
হ্যাঁ ম্যাডাম।
এমাসের টার্গেট কতো ছিলো ?
১৫ কোটি।
কত ফুলফিল হয়েছে।
১ কোটি।
বাকিটা।
হয়ে যাবে।
গাছ থেকে পরবে ?
চুপচাপ।
কি হলো চুপ করে আছেন কেনো।
না ম্যাডাম, বাজারের অবস্থা....।
অন্য হাউস পাচ্ছে কি করে। আমার কাগজের হাল কি এতই খারাপ নাকি।
না ম্যাডাম, নিউজ কোয়ালিটি....।
সুনিতবাবু।
ম্যাডাম।
চম্পকবাবু কি বলছেন।
ম্যাডাম। মানে আমি.....।
চম্পকবাবু।
হ্যাঁ ম্যাডাম।
কত টাকা মাইনে পান।
চুপচাপ।
যদি কাল আপনাকে দুর করে দিই। ওই মাইনে কলকাতার কোনো হাউস আপনাকে দেবে। আপনিও শুক্রবার অফিসে এসে দেখা করবেন। সমস্ত ডকুমেন্টস নিয়ে।
আচ্ছা ম্যাডাম।
কিংশুকবাবু।
হ্যাঁ ম্যাডাম।
আপনাকে যা দায়িত্ব দিয়ে এসেছিলাম তা পালন করেছেন, না সনাতনবাবুর মত অবস্থা।
চুপচাপ।
বুঝেছি।
চম্পকবাবু আপনার দায়িত্ব গুলো কিংশুকবাবুকে বুঝিয়ে দিন।
ঠিক আছে ম্যাডাম।
সনাতানবাবু।
বলুন ম্যাডাম।
সার্কুলেশনের ভদ্রলোক এসেছেন।
হ্যাঁ ম্যাডাম আমি এসেছি।
গত ১০ দিনে কাগজের সার্কুলেসন ১ লাখ পরেগেছে কেনো।
না মানে।
দেরি করে বেরিয়েছে এই কারন দেখাবেন না, সব বিটে কাগজ ঠিক সময় পৌঁছই নি।
না ঠিক তা নয়। প্রেসে একটু প্রবলেম ছিলো।
আমি ১০ দিন অফিসে যাই নি। এতো দেখছি চারিদিকে খালি প্রবলেম আর প্রবলেম।
অতীশবাবু আছেন ওখানে।
হ্যাঁ ম্যাডাম।
কি অতিশবাবু সাপের পাঁচ পা দেখেছেন।
চুপচাপ।
সুনিতবাবু।
বলুন ম্যাডাম।
দিবাকর মন্ডলকে চেনেন।
দিবাকর মন্ডল.....!
অতিশবাবুর দিকে তাকাচ্ছেন তাইতো। চিনতে পারছেন না। একটু আগে আপনাকে ফোন করলো।
না ম্যাডাম ওতো ফোন করে নি।
এইতো এখুনি বললেন ওকে চিনিনা।
না মানে।
আপনার গলার রেকর্ডিং শুনবেন।
না মানে.....।
ত ত করছেন কেনো।
চুপচাপ।
পয়সা দিয়ে আমি গরু পুশবো ছাগল নয় এটা মনে রাখবেন। আমাকে নিয়ে হাউসে অনেক আলোচনা হচ্ছে। এটা আমার কানে এসেছে। একটা কথা মনে রাখবেন, আমার অনেক পয়সা আমার পক্ষে দু’দশটা কেপ্ট পোষা খুব একটা অস্বাভাবিক নয়। এটা বড়লোক মানুষদের খেয়াল। আপনার মামাকে আমাকে ফোন করতে বলুন।
সনাতনবাবু।
বলুন ম্যাডাম।
ওখানে আর যারা আছেন, তাদের শুক্রবার আসতে বলুন। আমার কথা বলতে ভাল লাগছে না। আপনারা এতটা নীচে নেমে গেছেন।
আর শুনুন, আমি ইসমাইলকে বলে দিচ্ছি, গাড়িটা অমিতাভদার বাড়িতে পাঠিয়ে দিন। আজ থেকে কাগজের দায়িত্ব অমিতাভদার হাতে থাকবে। আমি কলকাতা না যাওয়া পর্যন্ত।
ঠিক আছে।
আর আপনারা সবাই শুনে নিন, অনি আপনাদের অনেক ক্ষতি করেছে। তাই না।
ঠিক বলেছেন ম্যাডাম।
আমি ওকে পানিশমেন্ট দিয়েছি।
এটা ভাল কাজ করেছেন ম্যাডাম। আমরাই বা শুধু ভুগবো কেনো। ওর জন্য জুনিয়র ছেলেরাও আমাদের কথা শুনতে চাইছে না।
ঠিক বলেছেন। আপনারা না এক একজন দিকপাল সাংবাদিক। এ্যাডমেনেজার, সিইও, এ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ম্যানেজের, আরো কত কি। সব গালভরা নাম তাই না।
চুপচাপ।
আপনাদের জ্ঞাতার্থে একটা কথা জানিয়ে রাখি অনি বর্তমানে এই কাগজের ২০ পার্সেন্ট শেয়ার হোল্ড করছে। দু’এক দিনের মধ্যেই নোটিস বোর্ডে নোটিশ পরে যাবে। যাকে যা দায়িত্ব দিলাম সেই দায়িত্ব অনুযায়ী কাজ করুন। শুক্রবার ১১টার সময় দেখা হবে।
সবাই চুপচাপ।
আমি লাইনটা কেটে দিয়ে সেভ করলাম। মিত্রা মাথা নীচু করে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো। আমি সবাইকে ইশারায় বাইরে বেরিয়ে যেতে বললাম।
সবাই চলে গেলো। নীপা বসেছিলো। আমি বললাম তুমি একটু গরম দুধ নিয়ে এসো। আর ওদের একটু চা-এর ব্যাবস্থা করো।
নীপা ছুটে বেরিয়ে গেলো।
মিত্রা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।
কাঁদিস না। এতো ইমোশন্যাল হলে ব্যাবসা চালাবি কি করে ?
আমি আর পারছিনা বুবুন।
তোকে পারতেই হবে।
ও আমার ঘাড় থেকে মাথা তুলছে না। এই দেখো। এখনো কত কাজ বাকি আছে, দাদাকে ফোন করতে হবে। কাগজটা বার করতে হবেতো।
তুই কর।
নীপা ঘরে ঢুকলো।
কি বোকা বোকা কথা বলছিস। চোখখোল, ওই দেখ নীপা তোকে দেখে হাসছে।
মিত্রা আমার ঘার থেকে মাথা তুললো। নীপার দিকে তাকালো। নীপা গরম দুধ নিয়ে এসেছে। নে এটা খেয়ে নে, দেখবি ভাল লাগবে।
তুইখা। ওরা সবাই কোথায় গেলো!
আমরা প্রেমকরবো, সবাই দেখবে, এটা হয়।
ধ্যাত। তুই না।
নীপা হাসছে।
মুখপুরী, তুই হাসছিস কেনো।
নীপা মিত্রার কোলে মাথা দিলো।
তোর আবার কি হলো।
আমাকে তোমার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিয়ো না, আমি তোমার বাড়িতে রান্নার কাজ করবো।
কি পাগলের মতো কথা বলছিস।
ওঠ। তোকে তোর অনিদার মতো হতে হবে।
আমি পারবো না মিত্রাদি।
পারতেই হবে।
নে ফোন কর দাদাকে। আমি বললাম।
কি বলবো।
স্পিরিটটা মাঝে মাঝে হারিয়ে ফেলিস না।
দে ।
আমি আমার ফোন থেকে ডায়াল করেই ওর হাতে দিলাম।
হ্যালো।
কিরে তুই কেমন ছেলে একটা ফোন করলি না কালকে। বড়মাকে ভুলে গেছিস।
আমি মিত্রা বড়মা।
তোর গলাটা এরকম কেনো ! কিছু হয়েছে ?
না।
অনি তোকে কিছু বলেছে ?
না।
ওই মর্কটটা কোথায় রে। দেতো কানটা মুলে।
দেবো।
না থাক। ওর অনেক চাপ । বুঝি, কিন্তু মন মানে না।
সত্যি বড়মা, গিয়ে তোমাকে সব বলবো।
কেনোরে, আবার কি হলো।
সে অনেক কথা।
ওর কাকার শরীর ভাল আছেতো।
হ্যাঁ।
ওইনে তোর দাদা চেঁচাচ্ছে, কে ফোন করল ? সত্যি কি মিনষেরে বাবা, একটুও সহ্য হয় না।
মিত্রা হো হো করে হেসে ফেললো।
হাসিস না হাসিস না। তিরিশ বছর ঘর করা হয়ে গেলো, হারে হারে চিনেছি।
দাদাকে দাও।
ধর। ওকি আমার সঙ্গে কথা বলবেনা বলে প্রতিজ্ঞা করেছে।
আমার সামনে বসে আছে।
ওর গলাটা একটু শোনা না।
তোমাকে পরে দিচ্ছি।
আচ্ছা।
হ্যালো।
দাদা আমি মিত্রা।
হ্যাঁ বলো মা। তোমরা কেমন আছ।
ভালনেই।
কেনো।
সে অনেক কথা, আপনাকে যেজন্য ফোন করছি।
আগে বলো ওখানকার সবাই ভালোতো।
হ্যাঁ এখানকার সবাই ভালোআছে, আমরাও ভালোআছি।
বলো কি বলছিলে।
আজ থেকে আপনি অফিসে যান। আমি ইসমাইলকে বলে দিয়েছি। ও আপনাকে মল্লিকদাকে নিয়ে যাবে। আর যাদের যাদের আপনার দরকার তাদের তাদের আপনি ডেকেনিন। শুক্রবার সকালে আমি আর অনি কলকাতা যাবো।
কিছু একটা গন্ডগোল হয়েছে মনে হচ্ছে।
মিথ্যেকথা আপনাকে বলবোনা। হয়েছে।
কি হয়েছে বলো ?
আপনি অফিসে গেলেই সব বুঝতে পারবেন। বাকিটা পরে ফোন করে আপনাকে বলবো।
ঠিক আছে।
ওখানে কিছু হয়েছে ?
না।
সত্যি কথা বলছো।
হ্যাঁ।
নাও ছোটর সঙ্গে কথা বলো।
কিরে কোমন আছিস।
ভালো। তুমি কোমন আছ।
ভলো, ওই ছাগলটা কোথায় ?
আমার দিকে জুল জুল করে চেয়ে আছে।
দেতো ওকে।
ধরো।
মিত্রাকে ইশারা করে বলে দিলাম ইসমাইলকে ফোন কর।
মিত্রা ইসমাইলকে ফোন করছে।
বলো।
কিরে ছোটমা বড়মাকে ভুলে গেলি ?
কি করে ভুলবো।
তাহলে ফোন করিস নি কেনো ?
সব গিয়ে বলবো, ফোনে এতোকথা বলা যাবে না।
খারাপ না ভালো।
খারাপ ভালো মিশিয়ে।
কবে আসছিস।
শুক্রবার রাতে তোমাদের সঙ্গে দেখা হবে।
কেনোরে।
আজ রাতেই মল্লিকদার কাছ থেকে সব শুনতে পাবে।
ধর দিদির সঙ্গে কথা বল।
কিরে।
তুমি রাগ করোনা। তোমার অনি এখন একটা লিডিং কাগজ কোম্পানীর মালিক, এটা বোঝোতো।
সেই জন্য বড়মাকে ভুলেগেছিস।
তাহলে ওই বাড়ি যাওয়া বন্ধ করেদেবো।
ক্রমশঃ

জীবনে জীবন যোগ না করলে ব্যার্থ হয় গানের পসরা

৫৪

Re: কাজলদীঘি, শ্মশান ও পীরসাহেবের থান

mamonjafran ভাই bengalilibrary.com থেকে তো ডাউনলোড করে সব তো পড়ে ফেললাম কিন্তু ওখানেও তো গল্পটা শেষ করেননি%-(%-(নাকি গল্পটা ঐ পর্যন্তই??:-/:-/

৫৫ সর্বশেষ সম্পাদনা করেছেন mamonjafran (১৩-০২-২০০৯ ১১:০০)

Re: কাজলদীঘি, শ্মশান ও পীরসাহেবের থান

abol-tabol লিখেছেন:

mamonjafran ভাই bengalilibrary.com থেকে তো ডাউনলোড করে সব তো পড়ে ফেললাম কিন্তু ওখানেও তো গল্পটা শেষ করেননি%-(%-(নাকি গল্পটা ঐ পর্যন্তই??:-/:-/

আরো আটটা পার্ট লেখা হয়ে গেছে। www.bengalilibrary.org এর ক্রিয়েটিভ কর্নারে প্রথমে আপলোড করবো তারপর এখানে। একটু সময় দিন। আশা রাখছি দিন দশেকের মধ্যে আপলোড করেদিতে পারবো।

জীবনে জীবন যোগ না করলে ব্যার্থ হয় গানের পসরা

৫৬

Re: কাজলদীঘি, শ্মশান ও পীরসাহেবের থান

বাকিটুকি শেষ করেছি। এবং দ্বিতীয় পর্ব শুরু করেছি।
http://forum.banglalibrary.org/viewforum.php?id=30

জীবনে জীবন যোগ না করলে ব্যার্থ হয় গানের পসরা

৫৭

Re: কাজলদীঘি, শ্মশান ও পীরসাহেবের থান

দ্বিতীয় পর্ব।
http://forum.banglalibrary.org/viewforum.php?id=30

জীবনে জীবন যোগ না করলে ব্যার্থ হয় গানের পসরা

৫৮

Re: কাজলদীঘি, শ্মশান ও পীরসাহেবের থান

কাজলদীঘি শ্মশান ও পীরসাহেবের থান এই গল্পটা পুরোটা কোথায় পেতে পারি ?
কোনও সহৃদয় বন্ধু যদি জানান তাহলে উপকৃত হই

Kajal Maji

৫৯

Re: কাজলদীঘি, শ্মশান ও পীরসাহেবের থান

কাজলদীঘি শ্মশান ও পীরসাহেবের থান এই গল্পটা পুরোটা কোথায় পেতে পারি ?
কোনও সহৃদয় বন্ধু যদি জানান তাহলে উপকৃত হই  fahadhabib420@gmail.com

৬০

Re: কাজলদীঘি, শ্মশান ও পীরসাহেবের থান

কাজলদীঘি শ্মশান ও পীরসাহেবের থান এই গল্পটা পুরোটা কোথায় পেতে পারি ?
কোনও সহৃদয় বন্ধু যদি জানান তাহলে উপকৃত হই  mdmashiur.mer@gmail.com