২১

Re: কাজলদীঘি, শ্মশান ও পীরসাহেবের থান

আমি বললাম একটু পরে যাচ্ছি।
বড়মা আমার গলারস্বরে বুঝতে পারলো, কিছু একটা হয়েছে।
তোর কি হয়েছে ?
না কিছু হয় নি, তুমি এখন রাখো। আমি ঘন্টা খানেকের মধ্যেই চলে যাচ্ছি। মিত্রা আমার দিকে তাকালো।
কার ফোন।
বড়মা। অমিতাভদার স্ত্রী।
মিত্রার মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গেলো। কি ভাবলো, দুজনেই চুপচাপ বসে আছি। ওর হাত আমার ডান হাতটা ধরে আছে। আমাকে একটা কথা দে।
কি।
আজ রাতে আমার বাড়ি আসবি। তোকে আজ থাকতে হবে। থাকবি ?
বলতে পারছি না।
না তোকে কথা দিতেই হবে।
আমি মিত্রার দিকে তাকালাম। ওর চোখে নানা বিস্ময়। বললাম ঠিক আছে।
তুই আমার গাড়ি নিয়ে যা।
না তা হয় না।
কেনো।
এরা কি ভাববে।
ব্যাবসাটা আমার।
এরা কেউ জানেনা তুই আমার পূর্ব পরিচিত।
জানি। সেই জন্য আমি অনেক ভুল করে ফেলেছি। আমায় তার প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে। তুই আমায় সাহায্য কর। তোর প্রমিসের কথা মাথায় আছে।
আমি মিত্রার দিকে তাকালাম।
খুব বড় একটা ভুল করে ফেলেছিলাম।
কি।
না জেনে তোর ফাইলটাও প্রায় সই করে ফেলেছিলাম।
ভালোইতো।
মিত্রা আমার মাথার চুলটা ধরে ঘেঁটে দিল। অনেক দিন পর আমার অনির সেই রূপটা দেখতে পেলাম।
ওর দিকে তাকালাম।
তাকাসনি। চোখ গেলে দেবো।
আমি এখন যাবো।
রাতের কথা মনে রাখিস।
আমি আফিস থেকে বেরিয়ে এলাম। নিউজরুমে আর গেলাম না। নীচে এসে আমার ব্যাগটা নিয়ে বড় রাস্তায় এলাম। একটা ট্যাক্সি ধরে সোজা অমিতাভদার বাড়ি চলে এলাম।


বাইরের বেলটা বেজে উঠতেই, মল্লিকদা বললো দাঁড়া আমি যাচ্ছি।
ছোটমা বললো, তুমি কথাবল আমি গিয়ে খুলে দিচ্ছি।
কিছুক্ষণ পর ছোটমা ফিরে এলেন হাতে একটা চিঠি। মুখটা কেমন শুকনো শুকনো।
আমি হেসে বললাম কি হলো আবার।
আমার হাতে চিঠি দিয়ে বললো, তোর চিঠি।
খামটা হাতে নিলাম। সকলে আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। কেমন যেন ভয় ভয়।
আমি চিঠিটা খুললাম। মিত্রার চিঠি। গাড়ি পাঠালাম, চলে আয়। অমিতাভদা মল্লিকদা বড়মা ছোটমাকে আমার প্রণাম দিস। দেরি করিসনা। মিত্রা।
চিঠিটা পরে সকলের মুখের দিকে তাকালাম। সবাই উৎসুক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। বড়মার হাতে চিঠিটা দিলাম। বড়মার পরে ছোটমাকে দিল, ছোটমা অমিতাভদার হাতে, অমিতাভদা চিঠিটা পরার পর একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললো। মল্লিকদা পরে আমার দিকে তাকিয়ে হাসলো, চোখে মুখে দুষ্টুমির হাসি। ছোটমার দিকে তাকিয়ে বলল, কেশটা বেশ জটিল।
বড়মা খেঁকিয়ে উঠলো আর বকিস না। কাগজের এডিটর হয়েছে। দুই মক্কেল বসে বসে বিরাট কাজ করেছেন। সবাই মিলে তোদের তাড়িয়ে দিলে আর তোরা বসে বসে খাবি খাচ্ছিস।
না না তুমি শোন। অমিতাভদা বলে উঠলেন।
আর শুনে কাজ নেই অনেক হয়েছে। বড়মা বললেন।
বুঝলাম এখন যুদ্ধ চলবে। আমি উঠে পরে বাথরুমে গেলাম। বেরিয়ে এসে বড়মাকে বললাম, আমাকে একটা পাজামা পাঞ্জাবী বার করে দাও।
পাজামা পাঞ্জাবী পরতে হবে না, প্যান্ট গেঞ্জি পরে যা।
এই যথেষ্ট।
ছোটমা বুঝলো একে বলে কিছু হবে না, বাধ্য হয়ে ঘর থেকে একটা পাজামা পাঞ্জাবী বার করে আনল। আজ আমায় কেউ বাধা দিল না। কেউ কোন প্রশ্ন করল না। আজ সবাই জানলো মিত্রা শুধু আমার পরিচিতই নয় খুব ঘনিষ্ঠ।
ওরা সবাই সোফায় বসে গল্প করছিল। আমি বড়মাকে প্রণাম করলাম। তারপর ছোটমাকে। তারপর অমিতাভদাকে। অমিতাভদা আমার মাথায় হাত রেখে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। চোখদুটো ছলছল করছে, মুখে করুণ আর্তি। তোর ওপর আজ সব কিছু নির্ভর করছে।
আমি মাথা নীচু করলাম। তুমি একথা বলছো কেন, সব ঠিক হয়ে যাবে। তুমি আমার সঙ্গে যাবে।
না।
তুইযা তুই যা ডিসিসন নিবি তাই হবে।
মল্লিকদাকে প্রণাম করতে যেতেই বললেন, থাক থাক আমার চেয়ারের একটা বন্দবস্ত কর। না হলে বেকার হয়ে যাব। এই বুড় বয়সে আর ভাল লাগে না।
কিছু বলতে যাচ্ছিলাম, মল্লিকদা আমার মুখটা চেপে ধরলেন। আজ নয় সুখবর এনে বলিস।
মিত্রার বাড়িতে যখন পৌঁছলাম তখন রাত আটটা বেজে গেছে। গাড়ি একেবারে পোর্টিকোর ভেতরে এসে দাঁরালো। আমি গাড়ি থেকে নামতেই একজন ভদ্রমহিলা এগিয়ে এলেন। চেনাচেনা মনে হলো। মিত্রার ওই বাড়িতে দেখেছি মনে হচ্ছে। বুড়ীমাসি ? আমাকে বললেন, মেমসাহেব ওপরের ঘরে আছেন, আপনাকে চলে যেতে বলেছেন। আমি আটমাস আগে এখানে এসেছিলাম। আর আটমাস পরে এলাম। অনেক পরিবর্তন হয়েছে। সব কিছু লক্ষ্য করলাম। উপরে উঠে এলাম। মিত্রা সিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়ে ছিল। আমি সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে ওকে দেখে থমকে দাঁড়ালাম। মিত্রা একটা বাসন্তী কালারের সালোয়ার কামিজ পরেছে। দারুন লাগছে, কলেজ লাইফের মিত্রা আর আমার বস মিত্রার মধ্যে অনেক পার্থক্য। তবু কোথায় যেন এক থেকে গেছে মিত্রা।
আয়।
আমি ওপরে উঠে এলাম। ওর পেছন পেছন গেলাম। একটা ঘরে আমাকে নিয়ে এলো। তিনজন ওখানে বসে আছেন। এদের মধ্যে মাত্র একজনকেই চিনতে পারলাম। আমাদের অফিসের এ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অফিসার মিঃ সনাতন ঘরুইকে। উনি আমাকে দেখে একটু অবাক হলেন। মুখে কিছু বললেন না। মিত্রা সকলের সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিল। মিঃ ঘরুই খালি বললেন আমি ওনাকে চিনি তবে বেশি কথা হয়নি কোন দিন। তবে উনি যে আপনার এতোটা ক্লোজ জানতাম না।
মিত্রা বেশ গম্ভীর গলায় বললো, এর বেশি আর জানার চেষ্টা করবেন না।
মিত্রা বললো, বুবুন (আমার ডাক নাম, এই পৃথিবীতে এই নামে একমাত্র মিত্রাই ডাকে সেই কলেজ লাইফ থেকে) মিঃ অরিন্দম চ্যাটার্জী এবং কিংশুক ব্যানার্জীকে আমি আজ এ্যাপয়েন্টমেন্ট দিলাম। তোকে সব বলছি তুই সব শুনে নে, তারপর ডিসিসন দে। তোর ডিসিসন আমার অনেক কাজে লাগবে।
সবাই আমার আর মিত্রার দিকে তাকাল।
মিত্রা একে একে অফিসের সমস্ত কথা আমাকে বলল। আমি এতটা জানতাম না। কিছু কিছু জানতাম।
সব শোনার পর বুঝলাম, ও অনেক কেই তারাবার বন্দোবস্ত করেছে। এমনকি তাদের চিঠিও সই সাবুদ হয়ে গেছে। বিশেষ করে যাদের সঙ্গে আজ দুপুর বেলায় আমার কথা কাটাকাটি হয়েছে তাদেরকেও। অমিতাভদা মল্লিকদা যে জায়গায় ছিল সেই জায়গাতেই আছেন। মনে হচ্ছে আমার সঙ্গে কথা বলার পর তুরন্ত ডিসিসন চেঞ্জ করেছে।
আমি সব শুনে বললাম, এটা তুই ডিসিসন নিয়েছিস না অন্য কারুর মতামত নিয়ে করেছিস।
মিত্রা বললো অন্যের মতামত নিয়ে করেছিলাম, এখন আমি আমার ডিসিসনে চলছি।
আমি কথা না বাড়িয়ে বললাম, তুই যা আগে করে ফেলেছিলি, এখন সেইরকম রাখ। চেঞ্জ করিস না।
কেন বলছিস বল।
অনেক সমস্যা তৈরি হবে।
মিত্রা আমার মুখের দিকে তাকাল।
বরং দুটো নতুন পদ ক্রিয়েট কর।
তারপর।
অমিতাভদার জায়গায় তুই সম্পাদক হয়ে যা।
আমি!
বড় বড় চোখ করে। তোর কি মাথা খারাপ হলো।
খাতা কলমে।
অমিতাভদাকে প্রধান সম্পাদক কর, মল্লিকদাকে মুখ্য সম্পাদক বানিয়ে দে। আর বাকি সবাইকে যুগ্ম সম্পাদক বানিয়ে দে। তোর নামটা চেঞ্জ করে নে সম্পাদকের জায়গায় ।
যাঃ তা হয় না।
না হবার কি আছে তুই মালিক।
এই কাগজের একটা ঐতিহ্য আছে।
ওই কথাটা মাথায় রেখেই তোকে বলছি।
এটা যদি করতে পারিস তাহলে আর কারুর কিছু বলার থাকবে না। তবে তোর খরচ বারবে, দুটো নতুন ঘর তোকে বানাতে হবে।
সেটা কিছু নয়।
ঘরুইবাবুকে বলেদে কাল থেকে কাজ শুরু করে দিক।
ঘর কার কার জন্য।
সুনিতদা এখন যে ঘরে আছে সেই ঘরেই থাকুক। একটা অমিতাভদার জন্য আর একটা মল্লিকদার জন্য। তবে ঘর দুটো তোকে নিউজ রুমের  মধ্যে করতে হবে। আলাদা জায়গায় করলে হবে না।
কেনো।
নিউজের ছেলে গুলোর সঙ্গে ঘন ঘন কথা না বললে ওদের ভাত হজম হবে না। ওরা নিউজ খায়, নিউজ দিয়ে স্নান করে, সব কিছুই ওদের নিউজ ময়।
সবাই আমার কথায় হেসে ফেললো। ঘরুইবাবু আমার কথা শুনে মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন, অনি ঠিক কথাই বলেছে ম্যাডাম।
তাহলে আপনি এতদিন কি করছিলেন।
ওদের যে চাপ, তারপর সবাই আপনাকে ঘিরে থাকে সব সময়।
আমি ঘরুইবাবুর দিকে তাকালাম, ঘরুই বহুত ঘোরেল মাল।
আর দিল্লীব্যুরোকে জানিয়ে দে তোর নামটা কাল পরশুর মধ্যে চেঞ্জ করে পাঠিয়ে দিতে, কি ঘরুইবাবু  হবে না।
নিশ্চই হবে।
আর এই কয়েকদিন যেমন চলছে তেমন চলুক। আর ঘরুইবাবু সমস্ত ব্যবস্থা করে ফেলুক। আর তুই কয়েকদিন অফিসে যাস না। তবে মাথায় রাখিস ঝড়টা সহজে থামবে না।
ঠিক আছে।
আর নিউজরুমের বুড়ো গুলোকে সামলাবার দায়িত্ব আমি নেবো তোকে কিছু ভাবতে হবে না।
সবাই হেসে ফেললো।
আপনি ভালো কথা বলেছেন। যত সমস্যা ওই এডিটর পদটাকে নিয়ে। অরিন্দমবাবু বললেন।
মিত্রা আমার দিকে তাকিয়ে মাথা দোলালো।
আমি ঘরুইবাবুর দিকে তাকিয়ে বললাম, ঘরুইবাবু অফিসে আপনার সঙ্গে আমার বিশেষ একটা কথা হয় না। কিন্তু আপনি আমার সম্বন্ধে অনেক খোঁজ খবর রাখেন।
ঘরুইবাবু আমার মুখের দিকে তাকালেন।
আপনার স্বভাব চরিত্র সম্বন্ধে মিত্রা যতটা না জানে, তার থেকে আমি অনেক বেশি জানি। খালি এইটুকু ব্যাপার আপনাকে স্মরণ করিয়ে দিলাম।
ঘরুইবাবুর মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গেলো। উনি ভাবতে পারেন নি এই ঘরে মিত্রার সামনে ওনাকে আমি এই ধরনের কথা বলতে পারি।
এ আপনি কি বলছেন অনিবাবু!
আপনি নিশ্চই জানেন আমি কতোদূর দৌড়তে পারি।
হ্যাঁ হ্যাঁ তা কি বলতে।
দুপুরে একঘর ভর্তি লোকের সামনে আমি মিত্রাকে কি বলেছিলাম সেটা বুঝতে পেরেছিলেন।
ঘরুইবাবু আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছেন।
ওনাদের আমি চিনি না, (সামনে বসা দুজন নতুন ব্যক্তিকে দেখিয়ে) তাই এই মুহূর্তে কিছু বলছি না। (হাতজোড় করে ) তবে আপনাদেরও জানাই মিত্রা আমার কলজের বন্ধু, শুধু বন্ধু নয় বিয়ের আগে ওদের বাড়িতে আমার যাতায়াত ছিল। ওর বাবা-মা সকলেই আমার বিশেষ পরিচিত। এর বেশি কিছু বলতে চাই না। মিত্রার কোন ক্ষতি হবে এটা আমি মেনে নেব না। ও আপনাদের যে দায়িত্ব দিচ্ছে। তা ঠিক ঠিক ভাবে পালন করবেন। আর এই মুহূর্তে যা বললাম তা যেন পাঁচকান না হয়।
মিত্রা চুপচাপ বসেছিল। ওরা আমার কথা শোনার পর কেউ আর কোন কথা বলল না।
মিত্রা যখন আপনাদের এখানে ডেকে এনেছেন, সঙ্গে আমাকে, তখন আমি বুঝে নেবো আপনারা ব্যবসায়িক দিক থেকে মিত্রার খুব কাছের লোকই হবেন।
সকলেই আমার মুখের দিকে তাকালো।
মিত্রার দিকে তাকিয়ে বললাম, ওনাদের পারপাশটা আমাকে একটু বলবি।
চম্পকবাবুকে আমি রাখবনা ভেবেছিলাম।
কেনো ?
ওনার চলচলন আমার ভাল লাগছে না। ওনার জায়গায় অরিন্দমবাবুকে নিয়ে এলাম।
এ ভুলটা করিস না। চম্পকদা থাকুক। চম্পকদার ওপরে ওনাকে বসা।
অরিনদমবাবু আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, আমার একটু অসুবিধে হবে কাজে।
কি কারনে বলছেন।
সাবোতেজ হতে পারে।
আপনি যখন এতটাই জানেন তখন এই টুকু নিশ্চই বুঝতে পারছেন। কেন বলছি।
অরিন্দমবাবু চুপচাপ।
অরিন্দমবাবু আপনি আগে কোথায় ছিলেন।
একটা সর্বভারতীয় ইংরাজী দৈনিকের কথা বললেন।
মিত্রার সঙ্গে আপনার পরিচয়।
মিত্রা বললো, আমার ক্লাবের মিঃ রায় ওনার সঙ্গে পরিচয় করিয় দিয়ছেন।
আপনাদের ওখানে মৈনাক আছে না।
অরিন্দমবাবুর মুখটা কেমন ফ্যাকাসে হয়ে গেলো।
মিত্রা বললো, কে মৈনাক।
আমাদের সঙ্গে ইংরাজী ডিপার্টমেন্টে পরতো।
ফর্সামতো ছেলেটা।
হ্যাঁ।
তোর সঙ্গে এখনো যোগাযোগ আছে।
ভাইজ্যাক যাওয়ার দুচারদিন আগে ওর সঙ্গে দেখা হয়েছিল।
অরিন্দমবাবুর দিকে তাকিয়ে বললাম, চম্পকদাকে এখন সরানো যাবে না। আপনি ব্যাপারটা নিয়ে ভাবুন।
অরিন্দমবাবু চুপচাপ বসে রইলেন।
মিত্রার দিকে তকিয়ে বললাম, কিংশুকবাবু।
ওনাকে আমি ম্যানেজমেন্ট দেখার জন্য অনুরোধ করেছি।
ভালো।
তবে তুই একটা কাজ কর, দায়িত্বটা সকলকে ভাগা ভাগি করে দে।
তোর মতামতটা বল।
আজ হবে না। দাদাকি এখানে আছেন ? সবাই আমার মুখের দিকে তাকালো।
না। মুম্বাই গেছে।
কবে আসবেন।
দু’একদিন দেরি হবে।
দাদাকে আসতে দে।
ঠিক আছে।
মিত্রা ওদের দিকে তাকিয়ে বললো যে ভাবে বুবুন বললো, ওই ভাবে কাল থেকে কাজ এগিয়ে নিয়ে যান। কিংশুকবাবু আর অরিন্দমবাবুর দিকে তাকিয়ে বলল, আপনাদের ঘরটা রেডি হোক তারপর অফিসে আসবেন। আপনারা কাজ শুরু করে দিন। ঘরুইবাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন, যা যা ডিসিসন হলো সেই মতো কাজ শুরু করুন। আগামী সপ্তাহের মধ্যে কাজ শেষ করে ফেলার চেষ্টা করুন।
ঘরুইবাবু একটু আমতা আমতা করে বললেন, আর কয়েকটা দিন আমাকে সময় দিন।
ঠিক আছে তাই হোক।
সুনিতবাবু কিছু বললে পাত্তা দেবার দরকার নেই। বাকিটা কি করে কি করতে হয়, আপনাক নিশ্চই বুঝিয়ে বলার দরকার নেই।
ঘরুইবাবু মাথানীচু করে বললেন, না ম্যাডাম আমি ঠিক ম্যানেজ করে নেবো।
সবাই বিদায় নিল।
মিত্রা ওদের নিচে ছেড়ে দিয়ে এসে বলল, কি খাবি।
বেলা করে বড়মা অনেক খাইয়েছে আর খেতে ভাললাগছে না।
তাহলে আমিও খাব না।
সেকিরে। ঠিক আছে খাব অল্প করে।
মিত্রা আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।
দুজনে নিচে গেলাম। টেবিলে সব সাজান। মিত্রা আমি দুজনে বসলাম। কলেজ লাইফের ছেঁড়া ছেঁড়া কিছু কথা ছাড়া শুধু জিজ্ঞাসা করলাম মাসিমা-মেসোমশাই কেমন আছেন।
মিত্রা একটু গম্ভীর হয়ে গেল, আস্তে করে বলল, দুজনেই গত। তারপর থেকে সব হরিরলুটের মত চলছে। তুইতো কোন খোঁজ খবর রাখিস না।
আমি মাথা নীচু করে বসে আছি। কোন কথা বললাম না। খাওয়া শেষ করে ওপরে উঠে এলাম।

জীবনে জীবন যোগ না করলে ব্যার্থ হয় গানের পসরা

২২

Re: কাজলদীঘি, শ্মশান ও পীরসাহেবের থান

মিত্রাদের বাড়িটা বিরাট জায়গা নিয়ে। সামনে বিশাল বাগান। গেটের ঠিক মুখে এই বাড়ির কাজের লোকেদের থাকার জায়গা। তিনটে গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। বাগানের রাস্তাটায়। আমি বারান্দার রেলিংয়ে কনুইয়ের ওপর ভর দিয়ে একটু ঝুঁকে দাঁড়ালাম। কলকাতা শহরের মতো জায়গায় এই রাতেও ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক শুনতে পাচ্ছি। ভারি ভালোলাগল। চারিদিক নিস্তব্ধ। বাগান পেরিয়ে বড় রাস্তা। নিওন আলোয় চকচক করছে রাস্তাটা। কিছুক্ষণ আগে একজন আয়া এসে আমার ঘরটা দেখিয়ে দিয়ে গেছে। বিছানাপত্র সব ঠিক ঠাক করে দিয়ে গেছে। ঘুম আসছে না। সকাল থেকে ভীষণ ধকল গেল। মিত্রা অমিতাভদাকে ফোন করে সব জানিয়েছে। অমিতাভদা রাজি হয়েছে। বড়মার সঙ্গে ফোনে সামান্য কথা হয়েছে। বলেছি কাল গিয়ে সব বলবো।
হঠাত নরম হাতের স্পর্শে চমকে পেছন ফিরে তাকালাম, মিত্রা কখন এসে পাশে দাঁড়িয়েছে জানি না। ওকে এই মুহূর্তে রাত পরির মতো লাগছে। পরনে ফিন ফিনে একটা সাদা নাইট গাউন। ভেতর থেকে ব্রা-পেন্টি পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। আমি ওর দিকে তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিলাম।
কিরে আমার দিকে তাকাতে লজ্জা করছে।
কিছু বললাম না। আমি সামনের আধা-অন্ধকার বাগানের দিকে তাকিয়ে রইলাম। সামনের গাছটা মনে হয় জুঁই ফুলের গাছ। সাদা থোকা থোকা ফুল ফুটে আছে। চারিদিক তার গন্ধে ম ম করছে। মিত্রা পেছন থেকে আমাকে জাপ্টে ধরলো। ওর সুডৌল বুকের ছোঁয়া আমার পিঠে, মুখটা আমার পিঠে ঘোষতে ঘোষতে বললো, কথা বলবি না।
আমি সোজা হয়ে দাঁড়ালাম। ওর হাত দুটো ছাড়িয়ে দিয়ে মুখো মুখি হলাম। একটা সুন্দর পারফিউমের গন্ধ নাকে এসে লাগলো। গন্ধটায় নেশা হয়। এই আলো আঁধারি ছায়া ঘেরা বারান্দায় ওর চোখে চোখ রাখলাম। মিত্রা সাজে নি। না সাজলে ওকে সত্যি খুব সুন্দর লাগে। প্লাক করা ভ্রু।  টানা টানা চোখ। পান পাতার মতো ওর মুখ মন্ডল। অনেক দিন পর মিত্রাকে এত কাছ থেকে দেখছি। আমি ওর কাঁধে হাত রাখলাম। ও আমার কোমরে হাত রাখলো। অনেকক্ষণ ওর দিকে তাকিয়ে থাকলাম। চোখের পলক পরছে না। মিত্রাও আমার দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে। পারফিউমের গন্ধের আড়ালে ওর শরীরের পরিচিত গন্ধটা আমাকে মাতাল করে তুলছে।
যা ঘরে যা কেউ দেখে ফেললে কি ভাববে।
কে দেখবে! ধারে কাছে কেউ নেই। আমি এখানে একা।
আমি ওর মুখের দিকে তাকালাম।
চল ঘরে যাই।
মিত্রা আমার বাম হাতটা চেপে ধরলো। পায়ে পায়ে ওর ঘরে এলাম। হাল্কা আলোয় ওর ঘরটা স্বপ্নপুরীর মতো লাগছে। বোস, ড্রিংক করিস।
না।
তুই ভাল ছেলে। আমি খারাপ মেয়ে।
আমি ওকে লক্ষ্য করছিলাম, ও ওয়ার্ডোবের সামনে গিয়ে ওয়ার্ডোবটা খুললো। ওর তানপুরার মতো নিটোল পাছাটা নেশা জাগায়।
তুই তো কোন দিন এসব খেতিস না।
খেতাম না। এখন খাই।
কেনো।
স্ট্যাটাস সিম্বল।
না খেলে কি স্ট্যাটাস মেন্টেন করা যায় না।
তুই এখনো সেই এঁদো গলিতেই রয়ে গেলি।
ঠিক।
আজ আমার সঙ্গে একটু শেয়ার কর।
না।
কেনো ?
তুই প্রত্যেক দিন খাস।
যার স্বামী মাসের পর মাস বাড়ির বাইরে থাকে। তাকেতো কিছু একটা নিয়ে বাঁচতে হবে।
সেতো কাজের জন্য। অতো বড় একজন ডাক্তার......।
মিত্রা আমার দিকে ফিরে তাকাল। ওর চোখ দুটো গনগনে আগুনের কয়লার টুকরোর মতো।
পুরুষরা ভীষণ স্বার্থপর।
আমিও।
মিত্রা আমার দিকে তাকাল। মাথাটা নীচু করলো। ওয়ার্ডোব থেকে একটা স্কচের বোতল বার করলো। দুটো গ্লাস একটা সোডার বোতল নিয়ে এলো। আর একটা কাজুর প্যাকেট। সেন্টার টেবিলে রেখে আমার পাশে এসে বসলো।
সত্যি তুই খাবি!
না খেলে ঠিক থাকি না।
কি বলছিস!
হ্যাঁরে, ঠিক বলছি।
দাদ জানে।
ওর কাছ থেকেইতো এসবের দীক্ষা নিয়েছি।
আমি ওর দিকে অবাক হয়ে তাকালাম। গাটা ঘিন ঘিন করে উঠল।
তোকে সব বলবো। সব। তুই আমার জীবনে প্রথম পুরুষ। প্রথম ভালোবেসেছিলাম তোকে। তোকে আমি আমার শরীররে স্পর্শ প্রথম দিয়েছিলাম। মনে আছে তোর সেই দিনটার কথা।
মিত্রাকি আমার সঙ্গে অভিনয় করছে ? তাহলে পুরনো কাসুন্দি ঘাঁটতে যাচ্ছে কেন ? আমাকে দিয়ে কোন কাজ বাগাবার ধান্দা, তারপর ছুঁড়ে ফেলে দেবে। তাই যদি হয়, আজ দুপুরে আমার সঙ্গে দেখা হওয়ার পর সব ডিসিসন চেঞ্জ করল কেন ? আমার কাছে পাস্ট ইজ পাস্ট আমি ফিরে তাকাইনা পেছন দিকে। তবে মাঝে মাঝে নিজেকে দেখার চেষ্টা করি।
তোর সেই ব্যামোটা এখনো যায় নি দেখছি।
কি।
কিছু বললেই খালি ভাবিস।
হ্যাঁ।
কি হ্যাঁ।
তুই যা বললি।
কোথায় বলতো।
বীনা সিনেমা হলে।
তুই এখনো মনে রেখেছিস।
হ্যাঁ।
আমাকে তোর ঘেন্না হয় না।
কেনো।
একটা মেয়ে তোকে না জানিয়ে......।
তুই চুপ করবি। একটু জোরে বলে ফেলেছিলাম।
মিত্রা আমার কাঁধে মাথা রাখলো। আমি ওর মাথায় আস্তে আস্তে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলাম। আমি হাল্কা করে সোফায় শরীরটা ছেড়ে দিলাম। মিত্রার মাথাটা আমার বুকে এসে পরলো। একটা হাতে আমাকে লতা পাতার মতো জরিয়ে ধরেছে। কলেজ লাইফে কতদিন ফাঁকা ঘরে ও আমার কোলে মাথা দিয়ে শুয়েছে। আমিও ওর কোলে মাথা দিয়ে শুয়েছি। ঘন্টার পর ঘন্টা তার কোন ইয়ত্তা নেই।
প্রথম ওর শরীরে হাত দিই বীনা সিনেমায়। সেদিন কলেজ কাট মেরে দুজনে সিনেমা দেখতে গেছিলাম। একেবারে পেছনের সিটের দেয়ালের ধারে বসে ছিলাম। ও আমার বাঁ দিকে বসেছিল। সিনেমা শুরু হতে আমি বাম হাতটা সিটের ওপর রেখেছিলাম। ও একটু ডান দিকে আমার দিকে হেলে বসেছিলো। আমাকে ছুঁয়ে। কখন যে আমার বামহাতটা ও টেনে নিয়ে বুকের ওপর রেখেছিল জানি না। আমি তখন রবীন্দ্রধর্মরাজের চক্রের মধ্যে ঢুকে গেছি। নাসিরুদ্দিন স্মিতা পাতিলের ডুয়েট চলছে। একটু নরম নরম স্পর্শের অনুভূতি পেয়ে নড়ে চড়ে বসলাম। পাশাপাশি তাকালাম, কেউ আমাদের দেখছে কিনা। একটা ভয় ভয় মনের মধ্যে কাজ করছে। হঠাত কানে দাঁতের স্পর্শ। খিল খিল হাসি। ভীতুরাম। বেশ এই টুকু।
বুকটা ভিঁজে ভিঁজে লাগলো। দুহাতে মিত্রার মুখটা তুলে ধরলাম। ও কাঁদছে। ওকে আরো কাছে টেনে এনে বুকে জরিয়ে ধরলাম। ওর তুলতুলে নরম শরীরে সেই আগের মতো স্পর্শানুভূতি পেলাম। বুড়ো আঙুল দিয়ে চোখের কোল মুছিয়ে দিলাম। এটা কি করছিস।
আমি আর পারছিনা বুবুন।
কেনো বলবি তো।
আমার সব আছে। কিছুই নেই।
কি পাগলের মতো বকছিস।
তুই বিশ্বাস কর।
মিত্রা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল। আমি ওর মাথাটা আমার বুকের সঙ্গে চেপে ধরে আছি। মিত্রার চোখের জলে আমার বুক ভেসে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পর মুখটা তুলে আমার গালে হাত দিয়ে বললো, তুই তো আমার কাছে কিছু চাইলি না।
আমি ওর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলাম। মনে মনে বললাম, না চাইতেই তো তোর কাছে অনেক পেয়েছি। আর কি দরকার আমার। মিত্রা আমার দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে। দুজনেরি চোখের পলক পরছে না। যেনো চোখে চোখে কথা বলো মুখে কিছু বোলো না। আমাকে ও দুহাতের বেষ্টনীতে আষ্টে পৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখেছে। আমার মাথাটা ধীরে ধীরে ওর ঠোঁটের কাছে নিয়ে এসে ঠোঁট রাখলো। আমি কোন বাধা দিলাম না। প্রথমে খুব ধীরে তারপর আস্তে আস্তে ওর মধ্যে একটা পশু জেগে উঠল আমি স্থবীরের মতো ওর হাতের খেলার পুতুল হয়ে রইলাম। ও আমাকে আঁচড়ে কামরে একাকার করে দিল।
মিত্রা আমি রক্তে মাংসের একটা মানুষ। এ তুই কি করছিস।
আমিও একটা মানুষ। আমারও শরীর বলে একটা বস্তু আছে। কিন্তু না পাওয়ার বেদনা আমাকে পাগল করে দিয়েছে।
কি বলছিস।
ঠিক বলছি।
বিয়ের পর থেকে কদিন এক বিছানায় শুয়েছি মনে করতে পারি না।
আমি ওর দিকে তাকালাম। ওর চোখ দুটো ছল ছল করে উঠলো।
তুই আমাকে ফিরিয়ে দিস না।
আমি ওর দিকে স্থানুর মতো তাকিয়ে আছি।
ও আমার ঠোঁটে আঙুল রাখল। চোখ দুটো আনমনা কি যেন খুঁজছে। আমি আজ তোকে আমার মতো করে চাই। তুই বাধা দিবি না।
আমি ওর দিকে তাকিয়ে আছি। কোন কথা বলার অবস্থায় আমি নেই।
প্লীজ তুই আজ বাধা দিস না।
আমি মিত্রার হাতের খেলার পুতুল হয়ে গেলাম কয়েক ঘন্টার জন্য।


পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠতে দেরি হলো। প্রথমে ঠাহর করতে পারি নি আমি কোথায় আছি। তারপর বুঝলাম আমি মিত্রার বাড়িতে আছি। চোখ মেলে বিছানার মধ্যেই আড়মোড়া ভাঙছিলাম। মিত্রার গলার আওয়াজে তড়াক করে উঠে বসলাম।
বাবাঃ ঘুমতেও পারিস কিছু।
মিত্রার কথায় লজ্জা পেলাম। নিজের জামা কাপড় ঠিক আছে কিনা আগে দেখে নিলাম। না সব ঠিক আছে। মিত্রার দিকে তাকালাম। অবাক হলাম। লাল পেরে মটকার শাড়ি পরেছে। মাথায় টেনে সিঁদুর দিয়েছে। হাতে ফুলের সাজি। কি অপূর্ব লাগছে ওকে। আমার মুখ থেক কোন কথা সড়ছে না। কালকের মায়াবিনী মিত্রার সঙ্গে এই মিত্রাকে মেলাতে পারছি না। আমি কি ভুল দেখছি। না। মিত্রাই তো! মাঝে মাঝে একা থাকলেই আমি ভাবি, এক নারীর মধ্যে কত রূপ। কখনো সে কামিনী, কখনো সে যোগিনী। কখনো সন্তানকে স্তনদায়িনী মা।
মুখ হাত ধুয়ে নে। ব্রেক ফাস্ট রেডি। মিত্রা ঘর থেকে চলে গেল।
আমি বাথরুমে গিয়ে ফ্রেস হলাম। একটু সময় লাগল। বেরিয়ে এসে দেখলাম মিত্রা সোফায় হেলান দিয়ে বসে আছে।
বাবাঃ তুই তো মেয়েছেলের বেহদ্দ।
মেয়ে আবার ছেলে হলো কবে থেকে ?
ওই হলো।
কি হলো ? পোষাক বদল ?
ওটা ঠাকুর ঘরের জন্য।
দারুন লাগছিল তোকে।
ন্যাকামো করিস না।
হাসলাম
খাবারটা এখানে নিয়ে আসবো না টেবিলে যাবি।
এখানে নিয়ে আয়।
মিত্রা সোফা থেকে উঠে চলে গেলো। একটা ঝুম ঝুম আওয়াজ কানে এলো কেউ যেন মল পরে হাঁটছে। এই মলের আওয়াজটা আমার ভীষণ ভালো লাগে। ফাঁকা ঘরে কিংবা বাড়িতে এই ধরনের আওয়াজ একটা স্বপ্নের পরিবেশ রচনা করে।
মিত্রা ফিরে এলো পেছনে দুজন আয়া। এ বাড়িতে ঠাকুর চাকরের মনে হয় অভাব নেই।
সেন্টার টেবিলে সমস্ত কিছু নামিয়ে রেখে তারা বিদায় নিল। মিত্রা আমার পাশে এসে বসলো। একটা কালো রংয়ের ঘাঘরা, আর টপ পরেছ। ওকে অনেকটা কাশ্মীরি মেয়েদের মতো লাগছে। একটা জুইঁ ফুলের গন্ধ নাকে এসে স্পর্শ করলো। আমি মিত্রার দিকে একটু হেলে ওর কাঁধের কাছে মুখ নামিয়ে ঘ্রান নিলাম।
কি শুঁকছিস।
তোর গায়ের গন্ধটা। দারুন মিষ্টি।
যাঃ।
একটা কথা বলবো।
বিনয়ের অবতার।
তোর ঘাঘরাটা একটু তুলবি।
কেউ এসে পরবে।
তোকে কি পুরো তুলতে বলেছি।
তাহলে।
হাঁটুর কাছ পর্যন্ত তোলনা।
মিত্রা তুললো আমি ওর পায়ের কাছে বসে মল গুলো দেখলাম। এককটা ভরি খানেক হবে।
কি দেখছিস।
তোর মল গুলো। দারুন মিষ্টি আওয়াজ।
তুই একটা পাগল।
ঠিক বলেছিস। আর এই পাগলকে একমাত্র তুইই চিনেছিস।
যাঃ।
এই মিত্রা একটু হাঁট না।
কেনো।
আমি তোর মলের আওয়াজটা চোখবন্ধ করে আর একবার শুনবো।
মিত্রা আমার অনুরোধ রাখলো।
কাল রাতে তোর পায়ে মল ছিল না।
না সকালটা পরি, তারপর খুলে রাখি।
ও।
মিত্রা গরম গরম লুচি আর বাটি চচ্চড়ি করেছে। ওঃ ঘ্রানেন অর্ধভোজনায়।
তুই এসব কি করেছিস।
কেনো। তুই খাবি না।
ওর দিকে তাকালাম। মুখটা কেমন যেন হয়ে গেছে। বললাম, তুই জানলি কি করে আমি এই খাবার খেতে ভালবাসি।
ওর মুখের রং বদলে গেলো।
তুই যখন আমাদের বাড়িতে যেতিস, মা তোকে এই খাবার করে প্রয়ই খাওয়াত, আমি জানি।
সেতো কলেজ লাইফের কথা।
কলেজ লাইফের কথা আমারও কিছু কিছু মনে আছে।
হাসলাম। তোকে একটা কথা বলবো।
বল।
মনে কিছু করবি না।
ও বিস্ময় ভরা চোখে আমার দিকে তাকালো। কালকের ব্যাপারটার জন্য তোর কাছে আমি ক্ষমা চাইছি।
ও আমার দিকে তাকাল। চোখের তারা স্থির রেখে আমার চোখে চোখ রাখলো। আমরা কোন অন্যায় কাজ করিনি। এটা আমার দৃঢ় বিশ্বাস।
আমি মাথা নীচু করলাম।
যদি আবার কখনো ইচ্ছে হয় আমি করবো, তুই যদি বাধা দিস আলাদা কথা। মানুষের পেট যেমন আছে শরীরও তেমন আছে। আমার বরটা ধোয়া তুলসী পাতা নয়। সেখানে আমি আমার জীবনের প্রথম ভালবাসার সঙ্গে শরীর বিনিময় করেছি। কোন অন্যায় কাজ করিনি।
আমি ওর চোখে আগুন দেখলাম। কথা ঘুরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলাম।
তোর দেবাকে মনে আছে।
কোন দেবা।
আরে পলসাইনসের সেই ফর্সা মতো ছেলেটা। তোর পেছনে প্রথমে লাইন মেরেছিল। তুই বলতিস বাবার বখাটে ছেলে।
মিত্রা হো হো করে হেসে উঠলো, হ্যাঁ হ্যাঁ এইবার মনে পরছে। কেনো বলতো।
ও এখন রিলায়েন্সের ইস্টার্ন জোনের চিফ একজিকিউটিভ।
বাবাঃ আমাদের ব্যাচটাতো দারুন।
সত্যি তাই।
খাওয়া শেষ করে আমি উঠলাম । মিত্রাকে বললাম আমি অফিসে যাচ্ছি। তুই ফোন করিস।
ফোন নম্বরটা দে।
ওকে নম্বরটা দিলাম।
আর শোন ঘরুইবাবুকে ইন্টিমেশন দিয়ে রাখ।
ওই কাজটা তুই কর।
না আমি এখন এসব কিছু করব না। তাতে ব্যাপারটা খারাপ দেখাবে।
ঠিক আছে তুই যা বলবি। তাহলে আমি অফিসে এখন যাচ্ছি না।
না।
ও আমাকে গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিল। গাড়ির কথা বললো। আমি বললাম না। আমি বাসে চলে যাব।


ভেবেছিলাম অফিসে যাব গেলাম না। কালকে অনেক রাত পর্যন্ত জেগেছি। অফিসে যেতে ভাল লাগছিল না। সোজা ফ্ল্যাটে চলে এলাম। বড়মাকে একবার ফোন করে বললাম, আমি ফ্ল্যাটে যাচ্ছি। বিকেলে তোমার ওখানে যাব।
অফিসে যাবি না।
না। মোবাইল বন্ধ থাকবে। অতএব ফোন করে লাভ নেই।
দরকার পরলে।
দরকার পরবে না।
ফ্ল্যাটে ঢুকেই ফেনটা জোড়ে ছেড়ে দিয়ে বাথরুমে  গেলাম।
এসে জামা কাপড় খুলে পুরো উদম অবস্থায় বিছানা নিলাম। প্রায়ই আমি এই অবস্থায় আমার ফ্ল্যাটে থাকি।
কখন ঘুমিয়ে পরেছি জানি না। কড়া নাড়ার খটা খট আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেলো। ঘড়ির দিকে তাকালাম। পাঁচটা বাজে। মানে আমি প্রায় ছয় ঘন্টা ঘুমিয়েছি। বিছানা থেকে ধরফর করে উঠে পরলাম। কোন প্রকারে টাওয়েলটা কোমরে জড়িয়ে দরজা খুললাম। একটা দমকা হাওয়া আমার চোখে মুখে এসে লাগলো। বাইরে অঝোড়ে বৃষ্টি পরছে। তানিয়া দাঁড়িয়ে। ওর পেছনে আমাদের এই হাউসিং-এর কেয়ারটেকার।
আরে বাবু বহুত খুন হো গায়া ম্যাডাম....।
তনু কট কট করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। ভিজে চান।
এসো এসো। ঠিক আছে। যাও।
তনু ভিতরে এলো।
আমি দরজা বন্ধ করলাম।
তনুর পরনে একটা টাইট  জিনস  আর গেঞ্জি। সেটাও ভিজে নেতা হয়েগেছে।
সত্যি এইরকম নির্ভেজাল মানুষ আমি চোখে দেখি নি। তনু বললো।
আমি মাথা নীচু করে বললাম, জামা পেন্টটা খুলে নাও। গায়ে জল বসবে।
আমি কি নেংটো হয়ে থাকবো। দরদি।
হেসে ফেললাম।
তা কেন। পাজামা পাঞ্জাবী দিচ্ছি।
আর ঢঙ করতে হবে না। আধঘন্টা বাইরে দাঁড়িয়ে ভিঁজছি।
সরি।
সরি বললে সাতখুন মাপ।
তা না।
একটা টাওয়েল ওকে দিয়ে বললাম, চুল গুলো মুছে নাও। আজ তোমায় চা করে খাওয়াচ্ছি।
সূজ্জিমামা কোন দিকে উঠেছে।
পূব দিকে।
হুঃ।
আমি রান্না ঘরে চলে গেলাম।
জল বসালাম। তনুকে ওখান থেকেই বলাম, চা না কফি।
ও বললো কফি হলে ভালো হয়।
দুধ নেই।
ঠিক আছে, ব্ল্যাক কফি হলেই চলবে।
ক্রমশঃ

জীবনে জীবন যোগ না করলে ব্যার্থ হয় গানের পসরা

২৩

Re: কাজলদীঘি, শ্মশান ও পীরসাহেবের থান

দাদা বাবু চাউমিন কি?

২৪

Re: কাজলদীঘি, শ্মশান ও পীরসাহেবের থান

মিলন লিখেছেন:

দাদা বাবু চাউমিন কি?

চাউমিন হচ্ছে নুডুলস। চীনাদের প্রিয় খাবার কলকাতায় এইখাবার চাউমিন নামে প্রসিদ্ধ।

জীবনে জীবন যোগ না করলে ব্যার্থ হয় গানের পসরা

২৫

Re: কাজলদীঘি, শ্মশান ও পীরসাহেবের থান

আমি চাউমিন খাবো--(--(--(--(--(--(--(--(--(--(--(--(

রক্তের গ্রুপ AB+

microqatar'এর ওয়েবসাইট

লেখাটি GPL v3 এর অধীনে প্রকাশিত

২৬

Re: কাজলদীঘি, শ্মশান ও পীরসাহেবের থান

পাজামা-পাঞ্জাবী কোথায়।
সরি বার করে দিচ্ছি।
আলনা থেকে একটা পাজামা-পাঞ্জাবী ওকে দিলাম। ও বাথরুমে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর বেরিয়ে এল। আমি পাখাটা পাঁচে করে দিলাম। ও ওর অর্ন্তবাস গেঞ্জি পেন্ট শুকোতে দিল।
আমি ছুটে রান্নাঘরে গেলাম।
খাটের ওপর ট্রেটা নামিয়ে রেখে ওর দিকে তাকালাম। দু’হাত ওপরে তুলে শরীরটাকে বেঁকিয়ে বুঁকিয়ে ও চুল আঁচড়াচ্ছিল। ভেতরে কিছু পরে নি। আমি একবার তাকিয়ে ফিক করে হেসে ফেললাম।
দাঁড়াও দেখাচ্ছি।
আমার ব্যাগটা একটু নিয়ে এসো।
কোথায় ?
ঐ ঘরের টেবিলে আছে।
আমি পাশের ঘর থেকে ওর ব্যাগটা নিয়ে এলাম।
ও ব্যাগ থেকে একটা প্যাকেট বার করলো। ঠান্ডা হয়ে নেতা হয়ে গেছে।
কি।
মটন কাটলেট।
ওঃ এই বর্ষায়......তবে তোমার কাটলেটটা গরম আছে তো। আগে ঠান্ডা খাই তারপর না হয় গরম খাওয়া যাবে।
তনু কটমট করে আমার দিকে তাকাল।
আমি হাসলাম। দাঁড়াও প্লেট নিয়ে আসি।
আবার রান্না ঘর থকে দুটো প্লেট নিয়ে এলাম।
তনু কাটলেট শস পেঁয়াজের কুচি পাশে রাখলো।
দুজনে কফি আর কাটলেট খেতে আরম্ভ করলাম।
অনি ।
উঁ।
আমি কলকাতা ছেড়ে চলে যাচ্ছি।
কোথায়।
লন্ডন।
ওর দিকে ঘুরে তাকালাম। লন্ডন! কেনো ?
বিবিসিতে চান্স পেয়েছি।
ওর মুখের দিকে তাকালাম। আমার মুখটা গম্ভীর। আমি মাথা নীচু করলাম। তারমানে তানিয়ার সঙ্গে আমার আর দেখা হবে না। মনটা খারাপ হয়ে গেলো।
কি হলো ? গম্ভীর হয়ে গেলে। তুমি চাও না আমি যাই।
ভেতর থেকে না বলছি। কিন্তু মুখে বললাম, কনগ্রাটস।
ও আমার মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকালো। তোমার সঙ্গে আমার আর দেখা হবে না।
কবে যাচ্ছ।
কাল সকালে দিল্লী যাব। বাড়িতে কয়েকঘন্টা কাটিয়ে দুপুরের ফ্লাইট।
ও। অফিসে জানে।
না। তুমি কিছু জানো না।
কোন ব্যাপারে ?
অফিসের ব্যাপারে।
না।
কালকে অফিসে যা করে এসেছো।
আমি আবার কি করলাম!
তুমিতো তোমার কোন খোঁজ খবর রাখো না।
প্রয়োজন বোধ করি না।
তুমি কাল ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে যা করে এসেছো তাই নিয়ে অফিসে সারা দিন তোলপাড় হয়েছে। আজতো অফিসে যাও নি ?
না।
গেলে জানতে পারতে।
যা হবার তা হবে।
আমাকে মুম্বাই ট্রান্সফার করেছিলো।
কে ?
কে আবার ওই শালা সুনীত।
ওর মুখের দিকে তাকালাম। ফিক করে হেসে ফেললাম। তনু এই প্রথম আমার সামনে শালা বললো।
রিজাইন দিলাম। তারপর এই চান্সটা পেয়ে গেলাম।
কার থ্রু দিয়ে।
আমার দিল্লীতে এক বন্ধু আছে। ওর থ্রু দিয়ে।
ও।
কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইলাম। আমি যেখানে থাকার সেখানেই পরে আছি। সত্যি আমার দ্বারা কিছু হবে না। কত স্বপ্ন দেখেছিলাম। ধুস।
কি চিন্তা করছো।
না। কিছু নয়। ওর দিকে তাকালাম।
হাঁ করো।
ও নিজের কাটলেটে একটা কামর বসিয়ে আমার মুখের কাছে এগিয়ে দিয়েছে। আজ কোন বাধা দিলাম না। আমি ওর কাটলেটে একটা কামর দিলাম। ও আবার নিজেরটায় আর একটা কামর দিল।
খাওয়া শেষ হয়ে গেছে। আমি ট্রেটা বিছানার ওপর থেকে তুলে নিয়ে কিচেনে রেখে এলাম। তনু হেলান দিয়ে খাটের একটা সাইডে পা ছড়িয়ে আধশোয়া অবস্থায়। পাঞ্জাবীর বোতাম গুলো আটকায় নি। সেই ফাঁকে আমার চোখ চলে গেলো। তনু বুঝতে পারলো।
উঃ একটু ফ্রি হয়ে বসার জো নেই। যেনো চোখ দিয়ে ধর্ষণ করছে।
চোখের আর দোষ কি। সে তো সব সময় সুন্দরের পূজারী।
রাখো তোমার কাব্যিক......।
কি পাগলের মতো হাসছো।
কই না।
দেখলাম।
ওর দিকে তাকালাম।
খাটে উঠে ওর ডান দিকে একটা বালিস টেনে নিয়ে শুলাম। মাথার ওপর পাখাটা বন বন করে ঘুরছে। বাইরে এখনো অঝোরে বৃষ্টি পরছে। হঠাত একটা জোরে বাজ পরলো। মেঘটা কড়কড় করে ডেকে উঠলো। তনু আমাকে জরিয়ে ধরলো। ওর বুক আমার বুকে মুখটা আমার কাঁধের মধ্যে গুঁজে দিয়েছে। কার্ল করা চুলের কিছুটা আমার মুখের ওপর এসে পরেছে। একটা মায়াবী গন্ধে আমি আচ্ছন্ন। ওর একটা পা আমার ওপর তুলে দিয়েছে। ওর নরম বুকের ছোঁয়ায় আমি মোমের মতো গলে যাচ্চি। ওর গায়ে একটা বুনো বুনো গন্ধ। নেশা জাগায়। আমার উদম শরীরে ওর শরীর। ওর নরম পেট আমার পেটের সঙ্গে মিশে আছে। সামান্য উষ্ণতা।


বেশ কয়েকদিন কেটে গেল। মিত্রার সঙ্গে রেগুলার ফোনে যোগাযোগ রেখেছি ওই আমাকে বেশির ভাগ সময় ফোন করেছে। আমার সোর্সগুলোকে কাজে লাগিয়ে অনেক সংবাদ সংগ্রহ করেছি যা শুনে আমারই মাথা খারাপ। সকাল বেলা বড়মার ডাকে ঘুম ভাঙলো। প্রথমে একটু অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। তারপর সম্বিত ফিরে পেলাম। কাল অনেক রাতে বড়মার কাছে এসেছি। কলকাতার রাস্তা কালও ভেসেছে। কাল রাতে কারুর সঙ্গেই বিশেষ কথা হয় নি। খেয়েছি আর নিজের ঘরে চলে এসে শুয়ে পরেছি।
আমি আসার আগেই ছোটমা মল্লিকদা চলে গেছেন। বড়মা বললেন, ওরা কাল সকালে চলে আসবে।
কটাবাজে বড়মা।
নটা বেজেগেছে। সকাল থেকে তোর ফোন খালি বেজেই যাচ্ছে। কয়েকটা তোর দাদ ধরেছিল। বাকি গুলো বিরক্ত হয়ে আর ধরে নি।
ও।
ছোটমা এসেছে।
হ্যাঁ তোমার খেঁটনের জোগাড় করছেন।
তুমি কি ঠাকুর নিয়ে ব্যস্ত।
হ্যাঁ। অফিস যাবি না।
না।
কাল তোর একটা চিঠি এসছে।
কোথা থেকে।
তোর বাড়ি থেকে।
আমার বাড়ি!
হ্যাঁ। মনামাস্টার দিয়েছে।
ও।
কি লিখেছেন।
জানিনা। তোর দাদা খুলে পরেছে। তোর দাদাকেও একটা দিয়েছে।
কাম সারসে।
হ্যাঁরে মিত্রার সঙ্গে কি হল বললিনা।
কেন সবইতো বললাম।
না তুই কিছু গোপন করেছিস।
এ কথাটা আবার কে বললো।
সে তোকে বলবো কেন।
ছোট বলেছে।
না।
সে ছাড়া তোমায় লাগাবার লোক এ ভূ-ভারতে কে আছে বলো।
মিত্রা কাল তোর জন্য একটা বড় বাক্স পাঠিয়েছে।
আমার জন্য!
হ্যাঁ।
বড়সাহেব জানে।
ওইতো রিসিভ করলো।
বাবাঃ কদিনেই এতো সব। তার মানে ব্যাপারটা জটিল।
তুই আর ফাজলামো করিস না।
দিদি।
ওই ছোটম্যাডাম এলেন। একজনে হচ্ছিল এতক্ষণ। এবার দোসর এসে হাজির।
কি বলছেগো আমর নামে।
না না কিছু না। বাথরুমে যেতে হবে। খাবার রেডি কিনা।
কথা ঘোরাস না।

জীবনে জীবন যোগ না করলে ব্যার্থ হয় গানের পসরা

২৭

Re: কাজলদীঘি, শ্মশান ও পীরসাহেবের থান

এই দেখো জিলিপির প্যাঁচ আরম্ভ হলো।
উরিবাবা এ কি সাংঘাতিক গো দিদি। আমরা কথা বললেই জিলিপির প্যাঁচ।
না না ও....।
তুমি থামোতো শাক দিয়ে আর মাছ ঢেকো না। তোমার জন্যই ও.....।
আচ্ছা বাবা আচ্ছা আমার ঘাট হয়েছে।
এই জায়গায় থাকা এই মুহূর্তে সুবিধাজনক নয়। আমি আস্তে আস্তে বাথরুমের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। ছোটমা আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো। বাথরুম থেকে ফ্রেস হয়ে সোজা নিচে চলে এলাম। সবাই আমার জন্য অপেক্ষা করছে। আমি সোফার একটা দিক দখল করে বসলাম। খাবার এলো। এই বাড়ির এই একটা মজা। সবাই একসঙ্গে খাবে আর গল্প গুজব হাঁসি ঠাট্টা চলবে। এর মধ্যে মল্লিকদা অগ্রণীর ভূমিকা নেয়।
কি বুবুনবাবু, নতুন কি খবর সংগ্রহ করলেন বলুন।
সবে মাত্র একটা ফুলকোলুচি একটা গোটা আলুর সঙ্গে মুখে তুলেছি, মল্লিকদার কথায় একটু অবাক হোলাম। এই নামটা এরা জানল কি করে।
একটু অবাক হলেন। খবর কি আপনি একাই সংগ্রহ করতে পারেন। আমরাও পারি।
মাথা নীচু করে খেয়ে যাচ্ছি। এখানে কথা বলা মানেই বিপদের হাতছানি।
কালকে মিত্রা তোর জন্য একটা ল্যাপটপ পাঠিয়েছে। অমিতাভদা বললেন।
ওই বাক্সটায় ল্যাপটপ আছে। বড়মা বললেন।
তুমি কি ভাবলে সন্দেশ আছে।
মরন।
আমি মাথা নীচু করে মুচকি হাসলাম।
ল্যাপটপ কাকে দেয় অফিসের মালকিন। যখন সে বস হয়। মল্লিকদা বললেন।
আমি বড়মার পাশে বসেছিলাম। আলুরদমটা ছোটমা হেবি বানিয়েছে। বড়মার পাত থেকে দুটো লুচি আর আলুর দম তুলে নিলাম।
ছোটমা হাঁই হাঁই করে উঠলো তুই নিবি না। আমি তোর জন্য এনে দিচ্ছি।
ততক্ষণে একটা লুচি আমার মুখে পোরা হয়ে গেছে। বড়মা বললেন থাক থাক ছোট। আমি আর কত খাব বল।
সাতখুন মাপ। মল্লিকদা বললেন।
যাই বলিস মল্লিক অনি দারুন ম্যানেজ করতে জানে। অমিতাভদা বললেন।
আমি বুঝলাম আজ আমার কপালে দুঃখ আছে। সাতদিন আগে যে স্যেঁত স্যেঁতে ভাবটা এই বড়িতে ছিল। আজ তা সম্পূর্ণ উধাও। এবার প্রেম বিয়ের প্রসঙ্গ আসবে। সেটা তুলবে মল্লিকদা। তাকে সপোর্ট করবে ছোটমা বড়মা। আর আমি অমিতাভদা নির্বাক শ্রোতা।
কিহলো গেঁট হয়ে বসে রইলে যে লুচি নিয়ে এসো।
ছোটমা লাফাতে লাফাত রান্না ঘরে চলে গেলো। কিছুক্ষণ পরে লুচির পাত্র আর আলুর দমের পাত্র নিয়ে এসে টেবিলে বসিয়ে দিল।
এই যে তুই এই টোনাটা দিলি, এই জন্য এগুলো এলো। না হলে এগুলো বিকেলের জন্য তোলা থাকতো। মল্লিকদা বললেন।
কি বললে।
মল্লিকদা কাঁচুমাচু হয়ে বললেন, না কিছু না। লুচি আলুর দম, সৌজন্য বুবুন।
ঠিক বলেছিস। বড়মা বলে উঠলেন, হ্যাঁরে অনি তোর নাম যে বুবুন তুই আগে তো কখনো বলিস নি।
বুঝলাম ব্যাপারটা ডজ করে বেরিয়ে গিয়েছিলাম কিন্তু হল না। এবার বড়মা চেপে ধরলেন।
তোমরা জানলে কি করে।
ছোট বললো।
ছোট জানলো কি করে।
হ্যাঁরে বদমাশ। শুনবি। মিত্রার কাছ থেকে। ছোট বললো।
তাই বলো।
এই বার ছোটমা ব্যাপারটা বললেন, মিত্রা কাল ফোন করেছিলো। প্রথমে ও বুবুনকে চেয়েছিল। ছোটমা ফোন ধরে বলেছেন বুবুন নামে এ বাড়িতে কেউ থাকে না। তারপর অমিতাভদাকে ফোন করেছিল, তারপর সব জানা জানি হয়।
হ্যাঁরে তোর এই মিষ্টিনামটা কে দিয়েছিলো। বড়মা বললেন।
একটু চুপ থেকে বললাম মা এ নামে ডাকতো।
হঠাত পরিবেশটা কেমন ভারি হয়ে গেলো। আমি নিজেই হাল্কা করে দেবার চেষ্টা করলাম, ছোটমার উদ্দেশ্যে বললাম, বেশতো নাচতে নাচতে গিয়ে লুচির হাঁড়ি নিয়ে এলে আমার আর বড়মার থালা যে খালি। ছোটমা তাড়াতারি উঠে আমাদের লুচি দিলেন।
মল্লিকদা বললেন আমি আর বাদ যাই কেনো। ছোটমা ধমক দিয়ে বললেন, এ মাসের কোলেস্টরেলটা চেক করা হয়েছিলো।
মল্লিকদা হাসতে হাসতে বললেন, দুটো লুচি বেশি খেলে কোলেস্টরেল বেড়ে যাবে না। কি বল অনি।
অমিতাভদা গম্ভীর হয়ে বললেন, তোর মনাকাকা তোর বিয়ের জন্য আমাকে মেয়ে দেখতে বলেছেন।
অমিতাভদা কথাটা এমন ভাবে বললেন, সবাই হো হো করে হেসে উঠলো। বড়মা নাক সিঁটকে বললেন, এই পুঁচকে ছেলেকে কে বিয়ে করবে বলোতো।
ঠিক বলেছ বড়।
না না দাদা আপনি দায়িত্বটা আমাকে দিন। মল্লিকদা বললেন।
আমি মল্লিকদার দিকে কট কট করে তাকালাম। ছোটমা মাথা নিচু করে হাসি চাপার চষ্ট করছেন। আমার বিষম খাবর জোগাড়।
ফোনটা বেজে উঠলো।
ওই নাও শ্যামের বাঁশী বেজেছে। ছোটমা বললেন।
তুমি লিঙ্গে বড় ভুল করো, শ্যাম নয় শ্যাম নয় রাধার বাঁশী। মল্লিকদা বললেন।
রাধা বাঁশী বাজাতে জানতেন নাকি।
ওই হল আর কি।
হ্যাঁ বল।
কি করছিস।
ফ্যামিলি পিকনিক চলছে।
চলে আসবো।
চলে আয়।
না থাক। পরে যাব। তোর দাদা তোর সঙ্গে একবার কথা বলতে চায়।
কবে এলেন।
কালকে।
দে।
হ্যালো।
হ্যাঁ দাদা বলুন।
আজ বিকেল একটু ক্লাবে এসোনা।
আবার ক্লাব কেনো, আমার গরিব খানায় যদি বসা যায় কেমন হয় ?
আমার কোন আপত্তি নেই, তোমার বন্ধুকে রজি করাও।
দিন ওকে।
বল।
দাদাকে নিয়ে তুই চলে আয়।
না। আমার কেমন যেন.......।
দূর পাগলি তুই চলে আয়, কেউ কিছু মনে করবে না।
দাদা কিছু যদি ভাবেন।
কিচ্ছু ভাববেন না।
কখন যাব বল।
লাঞ্চ থেকে ডিনার।
যাঃ।
আমি অফিস যাচ্ছি না। তুই একটা ভাল জিনিষ পাঠিয়েছিস। ওটা নিয়ে সারা দিন পরে থাকব। এনি নিউজ।
না। সব ঠিক ঠাক চলছে। বাকিটা গিয়ে বলবো।
ঠিক আছে চলে আয়।
এতক্ষণ সবাই আমার মুখের দিকে তাকিয়েছিলো। ওরা বেশ বুঝতে পারছিলো আমি কার সঙ্গে কথা বলছি। বড়মা সাথেও নেই পাঁচেও নেই তাই ফোনটা রাখতে, বড়মা বললেন, তুই কাকে আসতে বললি।
কেনো তুমি বুঝতে পারো নি।
না।
মিত্রাকে।
মল্লিকদা টেবিলের ওপর চাপর মেরে চেঁচিয়ে উঠলেন, কি বলিনি।
ছোটমা চোখ টিপে টিপে হাসছেন।
আমি লুচি খেয়ে চলেছি।
অমিতাভদা আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন। যতই হোক একজন মালিক বলে কথা, তারওপর যে সে হাউস নয়। কলকাতার একট বিগ হাউস।
ও ছোট, ও তো নেমন্তন্ন করে খালাস, কি খাওয়াবি।
ছোটমা বড়মার দিকে তাকাল।
আমি খেতে খেতেই বললাম এতো চাপ নিয়ো না শরীর খারাপ করবে।
তুই থাম ।
আমি একটা কথা বলবো।
বড়মা আমার দিকে উত্সুখ হয়ে তাকালেন।
আজকের মেনুটা আমি যদি বানাই তোমার আপত্তি আছে।
থাম তুই কোনদিন বাজারে গেছিস। ছোটমা বললেন।
যা বাবা। বাজারে না গেলে কি মেনু বানানো যায় না।
আচ্ছা বল। অমিতাভদা বললেন।
শরু চালের ভাত, ঘন ঘন করে মুগের ডাল, শুক্তো, পাতলা পাতলা আলু ভাজা, পাবদা মাছের ঝোল কিন্তু গোটা গোটা থাকবে, সরষেবাটা হিংয়ের বড়ি আর আমচুর দিয়ে টক, দই, মিষ্টি।
মল্লিকদা ছোটমা আমার দিকে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে আছে।
বড়মা আমার কানটা মূলে বললেন, ছাগল।
সবাই হেঁসে উঠলো।
অমিতাভদ গম্ভীর গলায় বললেন, অনির মেনু ফাইন্যাল।
বড়মা ছেঁচকিয়ে উঠে বললেন, অতো আর সাউকিরি করতে হবে না।
মল্লিকদা বললেন, আমি তবে বাজারটা করে নিয়ে আসি।
যাও। অমিতাভদা বললেন।
আসর ভাঙলো।
ক্রমশঃ

জীবনে জীবন যোগ না করলে ব্যার্থ হয় গানের পসরা

২৮

Re: কাজলদীঘি, শ্মশান ও পীরসাহেবের থান

আমি আমার ঘরে এসে ল্যাপটপটা নিয়ে বসলাম। আমার জীবনের একটা নতুন দিকের উন্মোচন হলো। মানুষের জীবনে কত কিছু জানার আছে। এক জন্মে তা শেষ করা যায় না। আমারও তাই অবস্থা। হঠাৎ অমিতাভদার গলার শব্দে সচকিত হয়ে পেছন ফিরে তাকালাম।
তোর সঙ্গে কিছু কথা ছিলো।
ভেতরে আসুন। আমার এই ঘরে একটা কাপরের ইজি চেয়ার আছে। অমিতাভদা তাতে এসে বসলেন। বললেন, মনা তোকে যে চিঠিটা দিয়েছে তুইতো পরলি না।
আপনি পরেছেন ?
পরেছি।
তাহলে।
ও তোকে একবার যেতে বলেছে।
কেনো ?
তোর সম্পত্তি বুঝে নেবার জন্য।
সে নিয়ে আমি কি করবো।
তা ঠিক। তবে তোর মনার প্রতি কিছু কর্তব্য আছে। ছোট থেকে সেইই তোকে মানুষ করেছে।
বলতে যাচ্ছিলাম, সেতো আপনি মাসে মাসে টাকা পাঠাচ্ছেন। চুপ করে থাকলাম। এতদিন এই ব্যাপারটা নিয়ে খুব একটা ভাবি নি। হঠাত ভাবনাটা মাথা চারা দিয়ে উঠলো। সত্যিতো।
তার এখন বয়েস হয়েছে। আজ বাদে কাল......। সে তোকে তোর সব কিছু বুঝিয়ে দিতে চায়।
আমি মাথা নীচু করে বসে আছি।
একবার ওখানে যা। তাকে ঋণ মুক্ত কর।
ঠিক আছে যাব।
কবে যাবি।
আপনি বলুন।
কালই চলে যা। এ কদিন তো অফিস ডামা ডোলে চলবে।
কেনো।
আমি সব খোঁজ খবর রাখছি। ওটার দ্বারা কিছু হবে না। কাগজটা দেখিস।
না।
কি করিস তাহলে সারাদিন।
চুপচাপ থাকলাম।
মিত্রা কেনো আসছে।
জানিনা। তবে ওকে বলেছিলাম, আমরা যা আলোচনা করলাম, জামাইবাবুকে একবার জানানো উচিত, আফটারঅল উনি তোর গার্জেন।
মিত্রা কি মিঃ ব্যানার্জীকে....।
না সেভাবে পাত্তা দেয়না।
মল্লিকদা এলেন। খাটের ওপর বসলেন। বুঝলেন বেশ গুরু গম্ভীর আলোচনা চলছে।
তুই কি বলিস।
আমার কিছু বলার নেই, মিত্রা যা ডিসিসন নেবে ওটাই ঠিক ও ৭৫ ভাগ শেয়ার হোল্ড করছে।
না।
আপনার কাছে খবরটা ভুল আছে।
অমিতাভদা আমার দিকে তাকালেন। মল্লিকদা অবাক হয়ে আমার কথা শুনছেন। ছোটমা চায়ের পট কাপ নিয়ে এসে হাজির, ঘরের আবহাওয়ায় বুঝলেন পরিবেশ তার অনুকূল নয়। চা দিয়ে চলে গেল।
চা খেতে খেতে অমিতাভদা বললেন, তুই যে ডিসিসন গুলো ওকে দিয়েছিস তা কি ঠিক ?
বেঠিক কোথায় বলুন।
ও কি সামলাতে পারবে।
ওর রক্তে বিজনেস। ওদের সাতপুরুষের ব্যবসা, ব্লাড কোনদিন বিট্রে করে না।
আমার কথাটা শুনে অমিতাভদা কেমন যেন থমকে গেলেন। মল্লিকদা অবাক বিস্ময়ে আমার দিকে তাকিয় আছেন। কোনমতেই এতোদিনকার দেখা অনির সঙ্গে এই মুহূর্তের অনিকে মেলাতে পারছেন না।
ওই যে নতুন ছেলে গুলো এসেছে।
ওই ব্যাপার নিয়ে আপনি ভাববেন না। আপনি এতদিন সব ব্যাপার নিয়ে ভেবেছেন। তাতে অনেকের আপনি শত্রু হয়েছেন। আপনি এবার আপনার জায়গাটা নিয়ে ভাবুন। আর কে কি করছে তাতে আপনার কি যায় আসে।
কথাটা তুই ঠিক বলেছিস। মল্লিকদা বললেন।
অমিতাভদা মল্লিকদার দিকে তাকালেন। তুই তো কোনদিন এ ভাবে আমাকে বলিসনি।
বলার সময় পেয়ছি কোথায়। তুমি যা বলেছো, তা অন্ধের মতো পালন করার চেষ্টা করেছি।
সেটা ঠিক আছে। তবে যুগ বদলেছে, সময় বদলেছে, তোমাকে এগুলো মেনে নিতে হবে। আমি বললাম।
তুই কি ভাবছিস অন্যারা এগুলো মেনে নেবে।
যারা মানবে না, তাদের সরে যেতে হবে।
কি বলছিস।
ঠিক বলছি।
দামানি মল আলুওয়ালিয়ারা ছেরে দেবে।
প্রথমজন শেয়ার বেচে দিয়েছে মিত্রার কাছ। আপনি যে লবির হয়ে এতদিন কাজ করছিলেন। আপনি জানেন ?
না।
বাকি দুজন শেয়ার বেচে চলে যাবে।
কে কিনবে।
মিত্রা কিনে নেবে।
কি বলছিস তুই। আলুওয়ালিয়া মিত্রাকে শেয়ার বেচবেনা।
বাধ্য করবো।
আমিতাভদা ঘার নাড়ছেন।
আমি ঠিক বলছি। ও যদি মনে করে একাই সমস্ত শেয়ার কিনে নিতে পারে। আমি ভেতর ভেতর সেই ব্যবস্থা করছি।
অমিতাভদা আমার দিকে তাকালেন। মল্লিকদা অবাক। বড়মা ঢুকলেন।
আচ্ছা তোমরা কি ছেলেটাকে একটু শান্তিতে থাকতে দেবে না।
দাঁড়াওতো। খালি বক বক বক। অমিতাভ খেঁকিয়ে উঠলেন।
আমি এগিয়ে গিয়ে বড়মাকে ব্যাপারটা বোঝালাম। বড়মা শিশুসুলভ ভাবে বললেন, অনি আমি একটু শুনবো। আমি বড়মাকে চেয়ারটা দিয়ে বললাম, ঠিক আছে তুমি বসো কিন্তু কোন কথা বলতে পারবে না। বড়মা বললেন ঠিক আছে, অমিতাভদা কর্কশ নেত্রে আমার দিকে তাকালেন। মুখে কিছু বললেন না।
ওরা খুব একটা সহজে ছেড়ে দেবে না।
কেউকি দেয়। দিতে বাধ্য হয়।
এখন কতটা শেয়ার বাইরে পরে আছে।
আলুওয়ালিয়া কুড়ি মল পাঁচ।
আপনি এতদিন দামানির লবির হয়ে কাজ করেছেন, মিত্রার বাবার সঙ্গে আপনার সম্পর্ক খুব একটা ভাল ছিল না।
অমিতাভদা ঘাড় নাড়ছেন।
কেনো ? ভদ্রলোক খারাপ ছিলেন না। অমি যতটুকু জানি।
অমিতাভদা মাথানীচু করে বসে আছেন।
আমার ভুল হলে আপনি আমাকে বলতে পারেন।
তুই এখবর জোগাড় করলি কোথা থেকে।
আমার সোর্সের ব্যাপারে আমি কিছু বলবো না। যা বলছি ঠিক কিনা।
হ্যাঁ।
কাজের জায়গায় ব্যক্তিগত আক্রোশ আসবে কেনো।
আমিতাভদা আমার দিকে তাকালেন, চোখে বিস্ময়।
দামানি আজ থেকে মাস আষ্টেক আগে শেয়ার বেচে দিয়েছে, মিত্রার কাছে। আপনি তা জানতেন।
অমিতাভদা আমার দিকে তাকালেন।
আমি জানতাম, আপনাকে বলিনি।
কেনো।
আজ পরিস্থিতি এমন পজিসনে যে আপনি আমার কথা শুনছেন, ছ’মাস আগে বললে আপনি আমার কথা শুনতেন।
বড়মা মাথা নাড়ছেন। মনে মনে বেশ আনন্দ পাচ্ছেন। যাক এমন একজন তাহলে তৈরি হয়েছে, যে ওর মুখের ওপর সপাটে উত্তর দিতে পারছে।
অমিতাভদা চুপ।
আমি যদি আপনার পরিচিত না হতাম এবং মিত্রা যদি আমার পূর্ব পরিচিতা না হতো তাহলে আপনাকে আমাকে সবাইকে সরে যেতে হতো।
অমিতাভদা মাথা নীচু করে বসে আছেন।
আপনি হয়তো জানেন না আপনার লবির ৪০ ভাগ লোককে তারিয়ে দেওয়া হয়েছে। ৬০ ভাগ লোক আপনাকে ছেড়ে সুনিতদার ন্যাওটা হয়েছে। বাকি খবর এখনো আমার কাছে এসে পৌঁছয় নি।
অমিতাভদার চোখ দুটো ছল ছলে। বড়মার চোখে আগুনের হল্কা। কখন যে ছোটমা এসে দাঁড়িয়েছেন জানি না।
আপনার ঘরে আপাতত সুনিতদাকে বসাচ্ছি। মানে ওকে আমি বলির পাঁঠা করবো। আপনি আপাতত আমার কোন কাজে বাধা দেবেন না।
কি বলছিস অনি। মল্লিকদা বিস্ময়ে আমার দিকে তাকিয়ে কথা বললেন।
অমিতাভদা আমার দিকে তাকালেন, চোখ দুটো স্থির।
এই কদিনের মধ্যে কুড়ি পার্সেন্ট শেয়ার আমার চাই। মিত্রাকে বলেছি টাকা জোগাড় করতে।
অমিতাভদা হতাশ দৃষ্টিতে বললেন, ওরা দেবে।
দেবে না। ছেড়ে দেবে। ওটা হিমাংশু ব্যবস্থা করছে।
হিমাংশু কে।
আমর বন্ধু, চাটার্ড এ্যাকাউন্টেন্ট। আর বেশি কিছু জানতে চাইবেন না।
অমিতাভদার গালে কেউ যেন সপাটে একটা থাপ্পর কষাল, এমন ভাবে আমার দিকে তাকালেন। স্থবিরের মতো ধীর পায়ে আমার দিকে এগিয়ে এলেন। আমার হাত দুটো ধরে আমাকে বুক জরিয়ে ধরে ছোট্ট শিশুর মতো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন।
বড়মা কাপড়ের খোঁট দিয়ে চোখ মুছছেন। ছোটমা মাথা নীচু করে পায়ের বুড়ো আঙুল দিয়ে মাটি ঘষছে। কাপরের খোঁটটা ধরে আঙুলে জড়াচ্ছে। মল্লিকদা খাটের এক কোনে স্থানুর মতো বসে আছেন। কাঁদতে কাঁদতে অমিতাভদা বললেন, মিনু তুমি আমার কাছে সন্তান চেয়েছিলে, তোমাকে দিতে পারি নি, এই নাও তোমার ছেলেকে, বড়মা এগিয়ে এলেন, আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন, মা-বাবা কি জিনিষ জানতাম না, আজ জানলাম, ছোটমা কাছে এসে আমার কপালে চুমু খেয়ে বললেন, বুবুন মাকে পেয়ে ছোটমাকে ভুলে যাবি নাতে।

মিত্রারা এলো প্রায় দেড়টা নাগাদ। আমি তখন আমার ঘরে ল্যাপটপ নিয়ে বসে আছি। অফিসে কম্পিউটর ঘাঁটা ঘাঁটি করি তাই সেই ভাবে খুব একটা অসুবিধা হলো না। বেশ তাড়াতাড়ি সরোগরো হয় গেলাম। ছোটমা এসে বললেন, চলুন আপনার গেস্টরা চলে এসেছেন।
আমি ছোটমার মুখের দিকে তাকালাম, ছোটমা হাসছে। এ হাসি পরিতৃপ্তির হাসি। এ হাসি মন ভাল হয়ে যাবার হাসি। এ হাসির মধ্যে লুকিয়ে আছে হারিয়ে গিয়ে আবার ফিরে পাওয়া।
কি হলো ওই ভাবে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয় কি দেখছিস।
তোমাকে।
তবেরে দুষ্টু, বলে আমার কান ধরলো।
উঃ ছোটমা লাগছে। ছাড় ছাড়।
ছোটমার চোখ চোখ রেখে বললাম, কেমন দেখলে ?
দারুন।
কি দারুন।
মিত্রাকে দেখতে।
পছন্দ।
ছোটমা একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়লেন, পছন্দ হয়ে আর হবে কি।
ঠিক। কপালে নেইকো ঘি ঠক ঠকালে পাবে কি।
আর বুড়োমি করতে হবে না। এবার চলো।
বড়মা কি বলছেন।
খুব শুনতে ইচ্ছে করছে না।
মাথা নারলাম।
বিয়ে না হলে বউ করতেন।
ওতো আমার বউ।
যাঃ।
হ্যাঁগো।
চল চল ওরা বসে আছে।
চলো।
ছোটমার পেছন পেছন নিচে চলে এলাম, এরি মধ্যে মিঃ ব্যানার্জী, মিত্রা, অমিতাভদা, মল্লিকদা বেশ জমিয়ে গল্প শুরু করে দিয়েছেন। আমাকে দেখেই মিত্রার চোখ দুটো চক চক করে উঠলো। সবার চোখ এড়ালেও ছোটমার চোখ এড়ালো না। মিঃ ব্যানার্জী বললেন, এসো অনি তোমার জন্য.....।
মল্লিকদা মিঃ ব্যানার্জীকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, না স্যার, অনি নয়, অনিবাবু। সবাই হো হো  করে হসে উঠলো।
আমি মিত্রার পাশে সোফার খালি জায়গায় বসে পরলাম। মিত্রার দিকে তাকিয়ে বললাম, সবার সঙ্গে দাদার আলাপ করিয়ে দিয়েছিস।
ও বোকা বোকা চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বললো, আমার আগে মল্লিকদা সবার সঙ্গে আলাপ করেছেন এবং আলাপ করিয়ে দিয়েছেন।
বড়মার সঙ্গে আলাপ হয়েছে।
হ্যাঁ।
তুই বড়লোক মানুষ, বড়মা বিশ্বাসই করতে পারে নি তুই এখানে আসতে পারিস।
গালে একটি থাপ্পর।
হ্যাঁরে সত্যি। দাদার সঙ্গে কথা বলার পর তোর সঙ্গে যখন কথা বলছিলাম, এরা আমাকে পাগল ভাবছিল।
এতটা ঠিক নয়। মিঃ ব্যানার্জী বললেন।
ছোটমা চোখ পাকিয়ে গোল গোল চোখ করলেন, মিত্রা আমার দিকে তাকিয়ে হাসলো।
বড়মা রান্না ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বললেন, ও কোনদিন পরিষ্কার করে কোন কথা বলে না। সব সময় একটা হেঁয়ালি।
ঠিক বলেছেন, এটা ওর চিরকালের অভ্যাস। মিত্রা বললো।
তোমরা আমার থেকে বেশি জানবে মা। আমি আর কতটুকু দেখলাম।
কলেজেও ও এরকম ছিল। সব সময় দেখছি দেখবো খাচ্ছি খাবো ভাব। খালি ডঃ রায় যখন কোন কথা বলতেন তখন বুবুনকে পায় কে। ও তখন সিরিয়াস।
ডঃ রায় কে ?
আমাদের হেডডিপ ছিলেন ।
সমকালীন পত্রিকায় একসময় খুব ভালো ভালো প্রবন্ধ লিখতেন। এখনও লেখেন, আমাদের কাগজেও লিখেছেন, তবে খুব কম, এখন উনি সমালোচক হিসাবে বেশ নাম করেছেন অমিতাভদা বললেন।
ও আরো ভালো বলতে পারবে। ও স্যারের পোষ্যপুত্র ছিলো। মিত্রা বললো।
আমি মিত্রার দিকে তাকালাম।
ঠিক বলেছো। এখানেও তাই। খালি বড় সাহেব কিছু বললে ও শুনবে আর কাউকে কোন পাত্তাই দেয়না। অমিতাভদার দিকে তাকিয়ে বড়মা বললেন।
খিদে পেয়েছে। তোর পায় নি। মিত্রার দিকে তাকালাম।
কি রাক্ষসরে তুই। এইতো কয়েকঘন্টা আগে অতগুলো লুচি গিললি এরি মধ্যে.....ছোটমা বললেন।
সকলে আমার দিকে তাকিয়ে হাসলেন।
তাহলে চলো আমার ঘরে গিয়ে বসি।
আমার কথাটা মিঃ ব্যানার্জী লুফে নিলেন। হ্যাঁ হ্যাঁ সেই ভালো কাজের কথা আগে, তারপর খাওয়া দাওয়া।
আমরা সবাই আমার ঘরে এলাম। ছোটমা বাধা দিয়ে বলেছিলেন, বড়দার ঘরে বোস না।
কেনো ? ছাটমা চোখ পকালেন।
আমি মাথা নীচু করে হাসতে হাসতে বললাম, তুমি মিত্রাদের আদি বাড়িতে যাওনি। গেলে এ কথা বলতে না।
মিত্রা মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে, মিঃ ব্যানার্জী আমার দিকে একবার তাকালেন।
আয়, আসুন আমি ওদের আমার ঘরে এনে বসালাম। এই বাড়িটার এই ঘরটা সবচেয়ে সুন্দর। অন্ততঃ আমার কাছে। পিওর ব্যাচেলার্স কোয়ার্টার বলতে যা বোঝায় ঠিক তাই। তবু এটা কিছুটা মন্দের ভালো। সৌজন্যে ছোটমা বড়মা। আমার জানলার ধারেই বিশাল একটা আমগাছ। তার পাশেই বড় একটা নিমগাছ। এছাড়া আরো কত গাছ আছে। অমিতাভদা ওঁর যৌবন বয়সে এই বাগান বাড়িটা কিনেছিলেন। সামনের দিকে কিছুটা অংশ বাগান। বাকিটা পেছনে। প্রায় ২৫ কাঠা জমির ওপর বাড়িটা। কেনার সময় গাছ কিছু ছিল বাকি অমিতাভদা পুঁতেছেন। এখন পরিচর্যার অভাবে জঙ্গল। একে একে সবাই বসলেন। আমি আমার ভাঙ্গা চেয়ারে বসলাম।
কাল কখন ফিরলেন।
বিকেলের ফ্লাইটে।
আপনাকে কাছে পাওয়া খুব মুস্কিল।
কি করবো বলো। ডাক্তারদের কোন জীবন নেই।
না না এমন ভাবে বলবেন না। আপনি শুধু ডাক্তার হলে আলাদা কথা ছিলো। আপনি এশিয়াতে একটা ফিগার।
লোকে বলে।
মিত্রা মুচকি মুচকি হাসছে।
দেখছোতো অনি, তোমার বান্ধবীর অবস্থা। আমাকে ডাক্তার বলে মনে করে না। বলে কিনা আমি ভেটারনারি ডাক্তার।
সবাই হেসে উঠলাম।
একচ্যুয়েলি ও তো আপনার পাশে আছে। সব সময় দেখে, তাই। আমরা আপনাকে সেই ভাবে পাই না তাই বলি।
ওকে বোঝাও। ওর পাগলামির চোটে আমি পাগল হয়ে যাবো।
এই দেখো ভাল হচ্ছে না কিন্তু। মিত্রা বললো।
থাক। বাড়িতে গিয়ে কুস্তি করিস। আমরা কেউ দেখতে যাবো না।

জীবনে জীবন যোগ না করলে ব্যার্থ হয় গানের পসরা

২৯

Re: কাজলদীঘি, শ্মশান ও পীরসাহেবের থান

আবার হাসি।
দাদাকে সব বলেছিস। মিত্রার দিকে তাকিয়ে বললাম।
হ্যাঁ।
দাদা শুনে কি বললেন।
তুই জিজ্ঞাসা কর।
আমি তো দাদাকে প্রশ্ন করিনি, তোকে করেছি।
আমি কিছু জানিনা যা।
বাঃ তুমি মালকিন, সম্পাদক বলে কথা।
না আমি মালকিন নই।
তাহলে কে।
জানিনা।
মিঃ ব্যানার্জী হাসলেন। তুমি কি দাদাদের সব বলেছো।
হ্যাঁ।
দাদা আপনাদের মতামত বলুন।
আমরা কি মতামত দেবো বলুন। আমরা আজ আছি কাল নেই। কাগজটা চালাবে ওরা।
ফোনটা বেজে উঠলো। সন্দীপের ফোন। সরি বলে ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দয় এলাম।
কি হয়েছে বল।
অফিসে এলিনা কেনো।
আমি এখন কয়েকদিন যাবো না। তোকে যে দায়িত্ব দিয়ছিলাম করেছিস।
হ্যাঁ।
ওরা কিছু বলছিল।
না। ওরা তোকে বেশ ধসে।
তুই কি করে বুঝলি।
সে কি খাতির যত্ন।
থাক। আমার ফোন নম্বরটা দিয়েছিস।
সে আর বলতে।
অফিসের হালচাল।
সুনিতদা ছড়ি ঘোরাচ্ছে। ম্যাডাম অসুস্থ। তাই কয়েকদিন আসতে পারছেন না। এলে আরো কিছু ছাঁটাই হবে।
ম্যাডাম অসুস্থ তোকে কে বললে।
আরে আমাদের ঐ এ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অফিসার আছে না, কি সাম ঘরুই।
হ্যাঁ।
উনিই বললেন।
তাই।
এখনতো উনিই মালিক।
তাই নাকি।
হ্যাঁরে।
আজ আমার মর্নিং ছিলো। এই ফিরছি। আর শোন শোন অফিসে রিমডুলেশন চলছে।
বাঃ বাঃ।
হ্যাঁরে।
কাগজ ঠিক ঠিক বেরোচ্ছে তো।
বেরোচ্ছে তবে ওই রকম। তুই আমার চাকরিটা একটু দেখিস।
ঠিক আছে।
যে দায়িত্বগুলো তোকে দিয়েছি করে যা।
ঠিক আছে।
ঘরে এলাম।
মিঃ ব্যানার্জী, অমিতাভদা কথা বলছেন। অফিস কি ভাবে সাজানো হবে। পরবর্তী কি কি কাজ করলে ভাল হয়। সেই নিয়ে। আমি আমার জায়গায় বসলাম। ছোটমা চায়ের সরঞ্জাম নিয়ে হাজির। পেছনে বড়মা। দেখলাম মেনুটা খারাপ নয়, চিংড়িমাছের চপ আর চা। আমি জুল জুল করে চেয়ে রইলাম। ছোটমা হেসে বললো, তোর জন্য নয় ওনাদের জন্য।
চা খেতে খেতে আবার আলোচনা শুরু হলো।
মিত্রা বললো, হিমাংশুর সাথে কথা হয়েছে। ও এই সপ্তাহের মধ্যে রেডি করে দেবে।
ভালোতো।
একটা সমস্যা হয়েছে।
সেটা আবার কি রকম।
ওরা আমার নামে ট্রান্সফার করবে না।
তোর নামে করবে না, দাদার নামে করুক।
আমাদের দুজনের নামে হবে না।
মিঃ ব্যানার্জী আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, একটা কথা বলবো অনি।
বলুন।
শেয়ারটা তোমার নামে ট্রান্সফার করিয়ে নাও।
আমার নামে! খেপেছেন নাকি।
তোর নামে করলে আপত্তি কোথায়। মিত্রা বললো।
আমি মিত্রার দিকে তাকালাম। আমার চাহুনি মিত্রা চেনে।
ঠিক আছে ঠিক আছে। তুই ওর সাথে কথা বল। মিঃ ব্যানার্জীর দিকে দেখিয়ে দিলেন।
আমি ফোনটা তুলে ডায়াল করলাম। ইচ্ছে করে স্পীকারে রাখলাম।
হ্যাঁ বল। তোর কাজ করে দিয়েছি। হিমাংশু বললো।
মাঝে কি ঝামেলা হয়েছে শুনলাম।
হ্যাঁ হয়েছে। সেতো আমি মিত্রাকে বলেছি।
ঝামেলাটা কে সামলাবে তুই না মিত্রা।
এটুকু সাহায্য তুই যদি না করিস তাহলে কি করে হয়।
ঠিক আছে দুটো ডিড কর, একটা আমার নামে ট্রান্সফার হচ্ছে, আর একটা কর আমি মিত্রার নামে ট্রান্সফার করছি।
আমিতো বলেছিলাম সেই কথা, মিত্রা রাজি হয় নি।
সবাই আমার দিকে তাকিয়ে আছে। মিত্রা আমার দিকে কটমট করে তাকিয়ে। মুখ লাল হয়েগেছে। ও ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছে।
ঠিক আছে আমি তোকে আধঘন্টা বাদে ফোন করছি।
ফোন নামিয়ে রাখলাম। মিত্রার দিকে তাকালাম। সম্পত্তি নিয়ে পাগলামো করিস না। আজ আমি ভাল আছি। কাল শত্রু হয়ে যাব না কে বলতে পারে। হিমাংশু আমার ইনস্ট্রাকসন ছাড়া একটুও দুলবে না। ওকে যে ভাবে কাজ করতে বলেছি সে ভাবে করতে দে। তোর ভালর জন্য বলছি। আমাকে তোর যদি কিছু দিতে হয়....সেতো অনেক সময় রয়েছে। এতো তাড়াহুড় করার কি আছে। মিত্রা মাথা নীচু করে বসে আছে। চোখ দুটো ছল ছলে। আমি জ্ঞানতঃ কোন অন্যায় কাজ করব না।
চোখ মোছ। মুখ তোল। মিত্রা মাথা নীচু করে রয়েছে। আমি তোকে অপমান করতে চাই নি। তোকে বোঝাতে চাইলাম। সেদিনও তোকে বুঝিয়েছি। এই টাইমটা খুব ভাইট্যাল। তোকে আটঘাট বেঁধে পা ফেলতে হবে। এখানে ইমোশনের কোন দাম নেই। এ্যাডমিনিস্ট্রেসন আর ইমোশন এক নয়। এটা তোকে আগে বুঝতে হবে।
মাথায় রাখবি আমি কিন্তু ভীষ্মর সঙ্গে যুদ্ধ করছি। যে ইচ্ছামৃত্যুর বর নিয়ে বসে আছে। তুই আমার শিখন্ডি। তোর সাহায্য ছাড়া কাউকে কিছু করতে পারব না। তবে আমিও ভগবান নই আমারও ভুল হতে পারে। তখন তুই কৃষ্ণের মতো আমাকে তোর বিশ্বরূপ দেখাস।
সবাই হো হো করে হসে উঠলো।
মিত্রা আপাতঃ গম্ভীর কন্ঠে বললো তুই থামবি। বহুত লেকচার মেরেছিস।
সবাই হাসলাম। আসর ভেঙে গেলো। খাবার টেবিলে মজা করে সবাই খেলাম। মিঃ ব্যানার্জী সবচেয়ে আনন্দ পেলেন আজকের মেনুতে । একথাও বললেন, এরকম খাবার কতদিন পরে খেলাম তা বলতে পারবনা।
মল্লিকদা টিপ্পনি কেটে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন রাইট চয়েস বেবি।
খাবার শেষ হতে মিঃ ব্যানার্জী বললেন, অনি তোমার সঙ্গে আমার কিছু কথা ছিল। চলো তোমার ঘরে যাই। আমর বুকটা ধরাস ধরাস করে উঠলো। তাহলে কি সেদিন রাতের ব্যাপারে....। কিন্তু মিত্রার হাব ভাবে সেরকম কিছু বুঝতে পারলাম না। তাহলে।
আমি বললাম চলুন, মিত্রা আমার দিকে একবার তাকাল। ওর চোরা চোখের চাহুনি কিছু বলতে চায়। আমি চোখ সরিয়ে নিলাম। পায়ে পায়ে ওপরের ঘরে উঠে এলাম। মিঃ ব্যানার্জী আমার পেছন পেছন এলেন।
অনি তোমার এখানে এ্যাসট্রে আছে।
না।
তুমি সিগারেট খাও না।
খাই। তবে ইচ্ছে হলে।
খুব ভাল হেবিট।
আজ কি আমার সঙ্গে একটা খাবে।
দিন।
আমি আমার টেবিলের তলা থেকে একটা ভাঁড় বার করলাম। মিঃ ব্যানার্জী ইজি চেয়ারে বসলেন। আমি আমার চেয়ারে। উনি একাট সিগারেট আমাকে দিলেন। আর একটা নিজে ধরালেন। দু’চারবার সুখ টান দেবার পর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, অনি আমাকে একটু সাহায্য করতে হবে।
আপনাকে! আমি।
হ্যাঁ।
আমার সাধ্যের মধ্যে হলে অবশ্যই করবো।
আমি তোমাকে অসাধ্য সাধন করতে বলবো না। তবে আমি বিশ্বাস করি তুমি পারবে।
বলুন।
মিত্রা তোমার খুব ভাল বন্ধু।
হ্যাঁ।
মিত্রাকে তুমি একটু সঙ্গ দাও।
সেতো দিচ্ছি। ওর যখনই অসুবিধা হবে আমি ওর পাশে থাকব কথা দিয়েছি।
না অফিসায়ালি নয়। আন অফিসায়ালি।
আমি মিঃ ব্যানার্জীর চোখে চোখ রাখলাম। মনে মনে বললাম ডাক্তার তুমি বড় খেলোয়াড় হতে পার। আমি ছোট খেলোয়াড় এটা ভাবছ কেনো। আমি এঁদো গলি থেকে রাজপথ দেখেছি। তুমি এঁদো গলি দেখ নি।
আমি আপনার কথাটা ঠিক ধরতে পারছি না।
তুমি সেদিন আমাদের বাড়িতে গেছিলে। মিত্রা আমায় বলেছে। তাছাড়া সেদিন থেকে মিত্রা একটা জিনিষ ছেড়ে দিয়েছে। যা আমি বিগত দেড় বছরে চেষ্টা করেও ছাড়াতে পারিনি।
কি ?
মিত্রা সেদিন থেকে আর ড্রিংক করে না।
এটা খুব ভাল খবর।
শুধু ভালখবর নয়, ও তোমার সান্নিধ্যে এসে অনেক বদলে গেছে। ওর চাল চলন কথাবার্তা।
এটা আপনি বারিয়ে বলছেন। মিত্রা বরাবরি খুব ভাল মেয়ে।
আমি অস্বীকার করতে পারি না। তবে কি জানো অনি তুমি আমার থেকে অনেক ছোট। আজ তোমার কাছে আমি অকপটে স্বীকার করছি। আমি ওকে আমার স্ত্রীর মর্যাদা দিতে পারি নি। সে অনেক কথা। সময় সুযোগ হলে তোমায় বলবো। আজ মনে হচ্ছে তোমাদের এখানে এসে আমি একটা দিশা খুঁজে পাচ্ছি।
আমি মিঃ ব্যানার্জীর দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি। একটা সিগারেট শেষে দ্বিতীয়টা ধরেছেন।
অর্থ বাদ দিলে স্ত্রীর প্রতি স্বামীর কিছু কর্তব্য থাকে। আমি তার কোনটাই পালন করতে পারি নি। তুমি হয়তো প্রশ্ন করবে কেনো ? ওইযে বললাম সে অনেক কথা। তোমার সঙ্গে দেখা হওয়ার আগে তোমার কথা ওর মুখ থেকে বহুবার শুনেছি। কাকতালীয় ভাবে তুমি যে আমাদের হাউসেই কাজ কর তা জানতাম না। ক্লাবে তোমার সঙ্গে প্রথম পরিচয়। সেদিনই তোমায় আমি মার্ক করেছি। তবে তুমি এর মধ্যে কোন যোগাযোগ রাখ নি মিত্রার সঙ্গে। তুমি ভাইজ্যাক গেছো সেও আমি জানতাম। তুমি এ বাড়িতে থাকো না। তাও আমি জানি। তবে মিত্রা কিছু আমাকে বলে নি। আমি নিজের ইন্টারেস্টে তোমার খোঁজ খবর নিয়েছি।
আমি মিঃ ব্যানার্জীর দিকে তাকিয়ে আছি। উনি ভাবলেশহীন ভাবে ওনার কথা বলে চলেছেন।
তুমিতো আমার বয়েসটা দেখছো, মিত্রার পাশে আমায় মানায় না।
আমার কানের লতি গরম হয়ে যাচ্ছে।
কোন একটা কারনে মিত্রাকে আমি বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছি। সেটাও তোমাকে আমি একদিন বলবো।
আমি মিঃ ব্যানার্জীর কথায় অবাক হলাম। উনি কি নিজের কথা বলছেন! না বানিয়ে বানিয়ে আমার সঙ্গে গল্প করছেন!
আমি তোমাকে একটা রিকোয়েস্ট করবো। মিঃ ব্যানার্জী ইজি চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে আমার হাত দুটো ধরলেন। আমি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম। ওর সঙ্গে কলেজ লাইফে তুমি যে ভাবে মিশতে ঠিক তেমনি ভাবে মেশো। আমার কোন আপত্তি নেই।
আমি মিঃ ব্যানার্জীর চোখে চোখ রাখলাম। চোখ দুটো কেমন ভাবলেশ হীন। কিন্তু ভেতরে অন্য কথা বলছে বলে মনেহয়। এতো বড় একজন ডাক্তার আমার সামনে কেমন যেন হয়ে পরেছেন।
সত্যি বলছি অনি তুমি যদি ওর বেড পার্টনারও হও, তাতেও আমার কোন আপত্তি থাকবে না। আমি ওকে ভীষণ হাসি খুশি দেখতে চাই। ওর মধ্যে যে প্রাণটা হারিয়ে গেছিল, তুমি কয়েকদিনের মধ্যে তা ফিরিয়ে দিয়েছ।
সবচেয়ে অবাক কথা কি জানো অনি। আমার কথায় অভিমানে ওর চোখে কোন দিন জল দেখিনি। আজ প্রথম ওর চোখে জল দেখলাম। আমি জানি ও তোমাকে ভীষণ ভালবাসে। আমি সেই মুহূর্তে ডিসিসন নিয়েছিলাম। তোমাকে আমি সব বলব। আশা রাখি তুমি আমার এই অনুরোধটুকু রাখবে।
মনে মনে ভাবছি ব্যাপারটা কি ? এতটা আত্মসমর্পন কেউ করে নাকি ? মুখে বললাম, এ আপনি কি বলছেন!
আমি ঠিক বলছি। আমি স্ব-জ্ঞানে তোমাকে বলছি। এটা আমার কোন অভিনয় নয়। এটা আমার পরাজয়। তবু এই পরাজয়ের মধ্যে আনন্দ আছে। সে তুমি বুঝবে না। তোমাকে আমি বলব, সব বলব।
বলো তুমি এই উপকারটুকু করবে।
আমি কথা দিতে পারব না। তবে চেষ্টা করব।
কিহলো এবার যেতে হবে। ঘড়ির দিকে একবার তাকিয়েছ ? কটা বাজে।
দেখলাম ছোটমা বড়মা মিত্রা আমার ঘরের গেটের মুখে দাঁড়িয়ে। মিত্রা আমার দিকে বিস্ময় চোখে তাকাল। মিঃ ব্যানার্জী চশমাটা চোখ থেকে খুলে রুমাল দিয়ে মুখ মুছলেন।

অনি। এই অনি।
সুরমাসির গলা না। সম্বিত ফিরে পেলাম।
আমি বারান্দায় বেরিয়ে এলাম।
জামাইবাবু বললো বিজয়কে বাজারে পাঠাচ্ছে। তোমাকে যেতে হবে না।
কেনো ? আমিতো যাবো বললাম, কাকার আর তর সইছে না।
সুরমাসি নীচ থেকেই চলে গেলো।
বেলা পরে এসেছে। গ্রামের ঘরে বেলা পরতে আরম্ভ করলেই ঝিঁ ঝিঁ পোকা আর জোনাকীর দেখা মেলে। কতদিন জোনাকী দেখি নি। ছোট বেলায় এই রাতের বেলা কত জোনাকী ধরেছি। একটা পাতলা কাপড়ের মধ্যে ওদের রেখে অন্ধকারে ওদের আলো দেখেছি। কি ভালো লাগতো। আমার খাটটা পরিপাটী করে গোছানো। আবার একটু শুয়ে পরলাম। নীপা আমার ব্যাগ গুলো ঘরের একটা কোনে রেখেছে। ল্যাপটপটা আসার সময় সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি। সময় সুযোগ পেলে একটু লেখালিখি করবো। তানিয়া যাবার সময় একটা পেন ড্রাইভ দিয়ে গেছে। বলেছিলো আমি না থাকলে এখানে কয়েকটা নীল ছবি দিয়ে গেলাম দেখো। একটু পুরুষ হওয়ার চেষ্টা করো। তানিয়ার দিকে তাকিয়ে বোকা বোকা হাসি হেসেছিলাম। শুয়ে শুয়ে আড়মোড়া ভাঙছিলাম। চোখ দুটো ঘুমে জড়িয়ে আসছে। ঘরটা আধা অন্ধকার।
অনিদা ও অনিদা। বাবাঃ ভুতের মতো কি করছো।
আলো জলে উঠলো।
সামনে নীপা দাঁড়িয়ে। ওর পরনে শর্ট শালোয়াড়। বুকগুলো অসম্ভব উদ্ধত লাগছে। ঠোঁটে হালকা প্রলেপ। কপালে ছোট্ট বিন্দীর টিপ। আমি ওর দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেলাম।
কি দেখছো কি বলোতো তখন থেকে। আমাকে কি নতুন দেখছো।
মাথা দোলালাম।
মনিমা ঠিক বলেছে, যা দেখ ও আবার যায় কিনা।
কেনো।
তুমি ভীষণ গেঁতো।
তাই বুঝি। আমার বায়োডাটা এরি মধ্যে জোগাড় হয়ে গেছে।
নীপা মুচকি হাসলো।
আমার প্রতি ওর দুর্বলতা ওর চোখে মুখে ধরা পড়ে যাচ্ছে।
চলো চলো আর দেরি করলে হাটে লোকজন থাকবে না।
সেতো আরো ভালো।
তাই হয় নাকি। চলো চলো আমি আবার একটা জিনিষ কিনবো।
কি কিনবে।
সে তোমায় বলা যাবে না।
আমি উঠে পরলাম।
এই অবস্থায় যাবে নাকি।
হ্যাঁ।
এই একটা আধ ময়লা পাজামা পাঞ্জাবী পরে।
আধ ময়লা কোথায় এর রংটাই এরকম।
না। ওই জিনসের পেন্ট আর গেঞ্জিটা পরো। দারুন স্মার্ট লাগে তোমাকে।
হাসলাম। নীপা জানে না কাকার হাত ধরে একসময় একটা ইজের পেন্ট আর সেন্ডো গেঞ্জি পরে আমি হাটে গেছি। একটু বড় হয়ে পাজামা আর হাফ শার্ট। ড্রয়ার কেনা হয় নি কোনো দিন। কাকা বলতেন লেংট পর। পরেওছি। কলকাতা যাওয়ার সময় দু’সেট ফুল জামাকাপড় পেয়েছিলাম। আজ নীপা আমায় জিনসের পেন্ট আর গেঞ্জি পরতে বলছে। একটু ইতস্ততঃ করলাম।
ঠিক আছে ঠিক আছে আমি নীচে অপেক্ষা করছি, তুমি তাড়াতাড়ি চেঞ্জ করে চলে এসো।
আমি পাজামা পাঞ্জাবী খুলে পেন্ট গেঞ্জি চরালাম। নীচে এসে দেখি বাইরের বারান্দায় বেশ কয়েকজন বসে আছে। কাকা মধ্যমনি হয়ে মাঝখানে। তাকে ঘিরে বাকি সকলে। আমাকে দেখেই ওরা অবাক হয়ে আমার দিকে তাকালো। আমি কাছে গিয়ে কাকাকে বললাম, আমি একটু নীপার সঙ্গে হাটে যাচ্ছি।
তুই এখনো যাস নি।

জীবনে জীবন যোগ না করলে ব্যার্থ হয় গানের পসরা

৩০

Re: কাজলদীঘি, শ্মশান ও পীরসাহেবের থান

না।
ওঃ।
কেনো।
নীপাতো অনেকক্ষণ আগে বেরিয়ে গেছে।
ওইতো দাঁড়িয়ে আছে।
দেখো দেখি কান্ড।
আমাকে এক ঘন্টা আগে বললো হাটে যাবে।
আমি হাসলাম।
যা যা তাড়াতাড়ি ঘুরে আয়। সাড়ে পাঁচটা বেজে গেছে এখুনি সন্ধ্যা হয়ে যাবে। সবাই চলে যাবে। তবে বেশ কয়েকটা নতুন দোকান হয়েছে। দেখে আয়। ভালো লাগবে।
আমি সবার মুখের দিকে একবার তাকালাম।
এরা তোর জন্য বসে আছে। তোর সঙ্গে দুটো কথা বলবে বলে।
আমার সঙ্গে ? কেনো!
সে অনেক কথা, আগে তুই ঘুরে আয়, তারপর বলছি। কৈ হে চন্দ্রেরপো, এই হচ্ছে অনি। দেখে চিন্তে পারছ। আমার তো চোখ গেছে, ওকে ঠিক মতো দেখতেও পাই নি।
হ্যাঁগো বাবাঠাকুর এককেবারে বাপের মতোন গো।
মনটা খারাপ হয়ে গেলো। সবাই কোমন হই হই করে উঠলো।
আমি বললাম ঠিক আছে, আমি যাই।
এসো। আর শোন একটা টর্চ নিয়ে নে, আস্তে আস্তে অন্ধকার হয়েযাবে। কোথায় হোঁচোট-ফোঁচট খাবি।
আমি হাসলাম, না না লাগবে না।
ও অনিদা কি হলো।
যা যা ওই পাগলী ডাকছে।
আমি বেরিয়ে এলাম। ক্ষেত্রমণির টবার ধার দিয়ে নদী বাঁধে উঠলাম। নীপা কখনো আমার পাশে কখনো আমার থেকে একহাত আগে। বাঁধের ওপর দিয়ে প্রায় আধঘন্টা হাঁটলে তবে হাটে গিয়ে পৌঁছবো।
যেতে যেতে নীপার সঙ্গে অনেক কথা হলো। নীপা এখন এই গ্রামের খুব পরিচিত একটা মেয়ে। একটা সময় আমাকেও এই গাঁয়ের অনেকে চিনতো। অনেকে যেতে যেতে আমাকে যেমন তির্যক দৃষ্টিতে দেখছে, তেমনি নীপার সঙ্গে যেচে যেচে কথা বলছে। নীপা এই গ্রামের মেয়েদের নিয়ে একটা নাচের দল করেছে। এখানে ওখানে নাচতে যায়। সপ্তাহে তিনদিন করে নাচের মহরা হয়। এখানে এসে প্রথম প্রথম আমার নাম শুনতো, তারপর কাকার কাছ থেকে আমার সব কিছু জেনেছে। আমার বন্ধু-বান্ধবের কাছে আমার বায়োডাটা নিয়েছে। এখন এই গ্রামে আমাকে নিয়ে খুব আলোচনা হয়। প্রত্যেক দিন আমাদের বাইরের দালানে আড্ডা বসে চলে রাত নটা পর্যন্ত তারপর সকলে ফিরে যায়। আমার লেখা নিয়ে আলোচনা হয়। বাক-বিতন্ডা চলে। আরো কত কি।
নীপা কল কল করে কথা বলে চলেছে। আমি খালি হুঁ-হাঁ করে যাচ্ছি। এক সময় নীপা বলে উঠলো, মনিমা ঠিক কথা বলেছে, দেখিস ও সাত চড়ে রা করে না।
আমি বললাম কে মনিমা।
কেনো তোমার কাকীমা।
বুঝলাম ঊষাকাকীমাকে নীপা মনিমা বলে ডাকে।
আমাকে নিয়ে তোমরা অনেক আলোচনা করো তাই না।
হ্যাঁ। তুমি আমাদের গ্রামের গর্ব। তাছাড়া তুমি আমাদের বাড়ির ছেলে। সেই ফ্লেভার টুকু তো আমরা পাইই।
সেই জন্য কলকাতায় খেত বসে আমি এত বিষম খাই।
তাই বুঝি। ......এঁ কি বললে। ......বিষম খাও, .....আমাদের জন্য, নীপা আমার হাতে একটা রাম চিমটি দিলো।
আমি উঃ করে উঠলাম। নীপার চোখদুটো কেমন হয়ে গেলো। ও বললো সরি অনিদা।
আমি হাসলাম। ওর আয়ত চোখদুটি ঝিরি ঝিরি বাতাসে কেঁপে কেঁপে উঠলো। সূজ্জিমামা পশ্চিমদিকে একেবারে হেলে পরেছে। এখন তার রং কমলা। দূরে একটা মিহি মিহি আওয়াজ কানে এলো, অনেক লোকে একসঙ্গে কথা বললে মিলে মিশে যেমন একটা শব্দ বের হয় ঠিক তেমনি। বুঝলাম আমরা হাটের খুব কাছাকাছি এসে গেছি।
অনিদা।
উঁ।
আমার ওপর রাগ করলে।
কেনো।
না থাক।
নীপা।
উঁ।
তুমি হাটে রেগুলার আসো ?
হ্যাঁ। কেনো ?
একটা সময় ছিলো, তোমার বয়সি কোন মেয়ে হাটে আসতে পারত না।
তাই।
হ্যাঁ।
সে অনেক দিন আগের কথা। এখন সব বদলে গেছে।
ওর দিকে তকালাম, নীপা খুব স্মার্ট।
দেখছোনা চারিদিকে।
হাসলাম।
একটা বাইক পাশ দিয়ে হুশ করে বেরিয়ে গিয়ে কেঁচ করে থেমে দাঁড়ালো।
অনি না।
আমি পেচন ফিরে তাকালাম।
ভদ্রলোকের দিকে তাকালাম।
পায়ে পায়ে ভদ্রলোকের দিকে এগিয়ে গেলাম।
মুখটা চিনি চিনি কিন্তু ঠিক ঠাহর করতে পারছি না।
কি নীপা, আমি ঠিক কথা বলছি।
হ্যাঁ।
শালা, ঢেমনা চিন্তে পারছো না।
বলে আমার হাতটা ধরে এমন জোরে করমর্দন করলো আমি কঁকিয়ে উঠলাম।
নীপা বললো, চিন্তে পারছো না! যার কথা আজ দুপুরে খেতে খেতে বলছিলে, এইই সেই বিশেষ ব্যক্তি।
অনাদি!
হ্যাঁরে ঢেমনা, অনাদি।
অনাদি বাইক থেকে নামলো।
পথচলতি অনেকে অনাদির পাশে দাঁড়িয়ে পরেছে। নেতা হলে যা হয়। ফেউরা ভিড় করে থাকে। আমি অনাদিকে বুকে জড়িয়ে ধরলাম। দশবছর আগে দেখা অনাদির সঙ্গে এখনকার অনাদির অনেক পার্থক্য। অনেক সার্প। কেমন আছিস।
ভাল। কদিন থাকবিতো এখন।
হ্যাঁ। তবে পর্শুদিন চলে যাবার কথা।
সেকিরে.....আচ্ছা আচ্ছা তুই এখন হাটে যাচ্ছিস তো।
হ্যাঁ।
নীপা তোরা বাসুর দোকানে থাকিস, আমি এখুনি একটা কাজ সেরে ঘুরে আসছি। চলে যাসনা যেন।
আমরা আবার হাঁটতে আরম্ভ করলাম। নীপা আমার পাশে পাশে চলেছে। কখনো মাথাটা মাটির দিকে করে আবার কখনো মাথাটা সামনের দিকে।
তোমাকে দেখে আমার হিংসে হয় জানো অনিদা।
হাসলাম। কেনো ?
তোমার পপুলারিটি।
তাহলে বলো আমি এই গ্রামের একজন সেলিব্রিটি।
সেলিব্রিটি বললে ভুল হবে তার থেকেও যদি বেশি কিছু থাকে, তুমি তাই।
বাড়িয়ে বলছো।
নাগো, সত্যি বলছি। বারান্দায় যাদের দেখলে, তারা প্রত্যেক দিন এসে মশাই-এর কাছে তোমার খোঁজ খবর নেবে। তুমিতো কোনদিন ফোনও করো না, আর চিঠিপত্রও দাও না। মশাই ওদের প্রত্যেকদিন বানিয়ে বানিয়ে তোমার কথা বলে, তারপর কাগজ বার করে তোমার লেখা পরা হয়, তুমি নাকি রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ।
আমি নীপার দিকে তাকালাম। সত্যিতো, গত পাঁচ বছরে আমি একটা চিঠিও লিখি নি। মনাকাকা অফিসের ঠিকানায় কয়েকটা চিঠি লিখেছে। অমিতাভদা আমায় বলেছেন এই মাত্র। তবে নিয়ম করে টাকাটা আসতো, আর আমার খবরা খবর অমিতাভদাই দিতেন। নীপার দিকে অপরাধীর মতো তাকালাম।
সত্যি নীপা একদম সময় পাই না।
একটা ফোন করার সময় পর্যন্ত পাও না।
ফোন যে এখানে আছে তাই জানি না।
তুমি জানোনা!
না। সত্যি বলছি। আর মাবাইলটার কথা বলছো, এই গত মাসে ভাইজ্যাক গেছিলাম ইলেকসন কভার করতে, তখন অমিতাভদা এটা কিনে দিয়েছেন।
ও আমার দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকালো।
আমি সত্যি বলছি। তবে এবার দেখো, এ ভুল আর হবে না।
নীপা হাসলো। ওর হাসিটাই বলে দিচ্ছে ও জিতে গেছে।
আমরা হাটে পৌঁছেগেলাম। নীপা বললো চলো একবার বিউটি স্টেশনার্সে যাব।
সেটা আবার কি।
ওঃ তোমায় বলেছি না তোমার দশ বছর আগের দেখা হাট আর এখনকার হাটের মধ্যে অনেক পার্থক্য।
ওখানে কি পাওয়া যায়।
ওখানে সাজগোজের জিনিষ পাওয়া যায়।
সেতো মনিহারীর দোকানে পাওয়া যায়।
কনসেপ্ট বদলে গেছে।
হাসলাম। সত্যি লোকজন অনেক কমে এসেছে, তবে আগে সন্ধ্যা হয়ে এলে লম্ফ ছাড়া কোন আলো হাটে দেখা যেতো না। এখন দেখছি বেশ কিছু দোকানে নিওন আলো জলে উঠেছে। আগের থেকে অনেক ঝকঝকে। এখন আর হাট বলে মনে হয় না। বাজার বলাই ঠিক হবে।
এসো ভেতরে এসো।
আমি নীপার পেছন পেছন দোকানের ভেতরে গেলাম। একটা বছর কুড়ির ছেলে জিনিষ দেখাচ্ছে। মেয়েদের ভিড়ই বেশি। এই অজ পাড়াগাঁয়ে, এই ভর সন্ধ্যে বেলা মেয়েদের এত ভিড় দেখে অবাক হয়ে গেলাম। দুচারজন মেয়ে নীপাকে দেখে এগিয়ে এলো। চোরা চোখে আমাকে দেখে নীচু স্বরে নীপাকে আমার সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করলো। নীপা কিছু কথা বলতেই ওদের চোখের চাহুনি বদলে গেলো। নীপা যেন ডগমগ করছে ওর পা যেন মাটিতে পরতে চাইছে না।
ঋজুদা জিনিষ গুলো এনেছো ?
সব পায় নি।
তা হলে।
এই দিয়ে কাজ চালিয়ে দাও।
এই শুক্রবারের পরের শুক্রবার ফাংসন।
এখনো দশদিন বাকি দেখি যদি কলকাতা যাই আমি এনে দেবো।
উঃ তোমায় নিয়ে আর পরা যাবেনা।
পিঠে দরাম করে একটা ঘুসি পরলো। শালা সন্ধ্যের সময় হাটে এসেছো। যাতে কেউ দেখতে না পায়। তাই না।
বড্ড লেগেছে, তবু বুঝলাম এ পরিচিত কেউ হবে। পেছন ফিরে তাকালাম, ভানু, দিবাকর, চিকনা, পাঁচু, পচা, পলা, সঞ্জু আরো অনেকে। আমার সব স্কুল লাইফের বন্ধু। হেসে ফেললাম, ভনু আমার হাত ধরেতো প্রায় মুচড়ে ভেঙেই ফেলবে এমন অবস্থা।
হাত ছাড়তেই ভানুকে জড়িয়ে ধরলাম। কেমন যেন দেখতে হয়ে গেছে। কম বয়সে বুরোটে মারকা চেহারা। সেই ভানুর তাগড়াই শরীর কোথায়!
কিরে চেহারার এ কি অবস্থা।
আর বলিস কেনো, মাঠে খাটতে খাটতে.....।
আরে দোকানের মধ্যে নয় বইরে চল, যতই হোক ব্যবসার স্থান।
ওকে তুই চিনিস।
না। চিনবো কি করে।
উনামাস্টারের ছেলে। যাকে তুই হামা দিতে দেখেছিস।
ছেলেটি এবার কাউন্টার থেকে বেরিয়ে এসে আমার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলো। বাবর কাছে আজ সকালে আপনার কথা শুনেছি।
স্যারের সাথে আসার সময় সকালে দেখা হয়েছিলো।
নীপার দিকে তাকালাম। নীপা আমার দিকে বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে। ওর চোখে অহংকারের প্রলেপ। আমি ছেলেটিকে বললাম, এই ভাই নীপা যা যা জিনিষ নেয় দিয়ে দাও। পয়সা নিও না। আমি দেবো।
ঠিক আছে।
এই নীপা শোন আমরা বাসুর দোকানে আছি, তোর সব কেনা কাটা হয়ে গেলে, ওখানে আসবি। অনি ওখানে থাকবে। পাঁচু বললো।
নীপা কোন উত্তর দেবার আগেই আমি ওদের হাতে চালান হয়ে গেলাম।
বাসুর দোকানে এলাম। বাসু আমাদের সঙ্গে ক্লাস টেন পর্যন্ত পরেছিলো। তারপর ওর বাবা বললো আর পরতে হবে না বাপ। মাঠে কাজ করো খাওয়া পরার অভাব হবে  না। শুনেছি বাসু পরে বসন্তপুর কলেজ থেকে গ্র্যাজুয়েসন কমপ্লিট করেছিলো। সেই বাসু এখন বেশ জমপেশ করে রেডিমেড জামা কাপড়ের দোকান করেছে।
আমরা এক দঙ্গল ঢুকতে বাসু এগিয়ে এলো। বুঝলাম আজ ওর বেচা কেনা লাটে। ভানু স্বভাব সিদ্ধ মতো লিডারের পার্ট নিলো। আমি ওদের হাতের পুতুল। বাসু বললো অনি তুই আজ অতিথি কি খাবি বল।
তোর দোকানতো লাটে উঠে যাবে।
দূর সারাদিন অনেক ব্যবসা করেছি। এবার একটু আড্ডা। কতদিন পরে তোর সঙ্গে দেখা। বললি নাতো কি খাবি।
খাওয়াবি।
অফকোর্স।
পচা বলে উঠলো শালা ইংরেজি ঝারছে রে।
ভানু পচাটাকে সামলাতো। বাসু বললো।
আমি বললাম, একশো গ্রাম ছোলার পাটালি নিয়ে আয়।
বাসু অবাক হয়ে আমার দিকে তাকালো, ওর চোখে কে যেন হাজার পাওয়ারের বাল্ব জালিয়ে দিল।
হ্যাঁরে তোর কি আর কিছু চাওয়ার নেই। সেই ছোলার পাটালি।
দশবছর খাই নি।
আজ গ্রামে ঢুকেই চুনোমাছের ভাজা দিয়ে কাকীর কাছে পান্তা খেয়েছি। তোর কাছে ছোলার পাটালি চাইলাম।
ভানু চেঁচিয়ে উঠলো পচা, দেখতো জানা ঘরের বুড়ীর কাছে ছোলার পাটালি আছে কিনা। ওখানে যদি না পাস কামরঘরের অশ্বিনীর কাছে থাকবে।
পচা আর একটা জিনিষ নিয়ে আসিস, একটু ছোলা সেদ্ধ আর কাঁচা লঙ্কা, আলুভাজা গুলো দেখে নিস। আমি বললাম।
সবাই আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে। ওরা বিশ্বাস করতে পারে না আমি এই ধরনের কিছু ওদের কাছে চাইতে পারি। আমি যেনো একটা কেউ কেটা হয়ে গেছি। পুরোদস্তুর শহুরে একজন লোক। অবাক হয়ে ওদের দিকে তাকালাম। একটু পরিবর্তন সকলের মধ্যে হয়েছে। সেটা বয়সের ধর্মে কিন্তু মনের দিক থেকে এখনো আমরা সেই স্কুলের বন্ধু। আমি যেনো আবার আমার স্কুল লাইফে ফিরে গেলাম। এরিমধ্যে বাসুকে কানে কানে বললাম, নীপার জন্য তোর দোকানে বেস্ট যে শালোয়ার কামিজটা আছে প্যাক করে রাখ।
অনাদি এলো, আবার একচোট হই হুল্লা হলো, পাটালি আর ছোলা সেদ্ধ এলো সকলে ভাগ করে খেলাম, শেষে চা।
আমি অনাদি ভানু আর বাসু আলাদা করে কাকার বিষয় নিয়ে আলোচনা করলাম। ওরা আমাকে বললো এখানে খুব ভালো একটা নার্সিংহোম হয়েছে। তুই যদি বলিস তাহলে ব্যবস্থা করি। আমি বললাম আমি থাকাকালীন এটা করে যেতে চাই। ওরা আমায় কথা দিলো কাল দুপুরের মধ্যে সব ব্যবস্থা করে দেবে। আমি ওদের বললাম, টাকার ব্যাপার নিয়ে ভাববি না। আমি কাকার চোখের আলোটা আবার ফিরিয়ে আনতে চাই। ওরা বললো ঠিক আছে। আর একটা কথা, আমার জমিজমা নিয়ে একটু কথা আছে, কাল তোরা আয় দুপুরের দিকে জমিয়ে আড্ডা মারা যাবে। অনাদি একটা সিগারেট এগিয়ে দিলো। আমি হেসেফেললাম, অনাদির হাতটা চেপে ধরে বললাম, এখনো এটা অভ্যাস করি নি। কালেভদ্রে একটা দুটো খাই। বাসুর চোখ কপালে উঠলো। অনাদি বললো কালেভদ্রে খাস যখন এখন একটা খা। চারিদিক চেয়ে দেখলাম, অনাদিকে বললাম, বড়রা যদি কেউ থাকে। সতীপনা করিস না, আশেপাসে এখন সিনিয়াররা কেউ নেই। সবাই এখন তোর বাড়িতে। ওখানে আড্ডা মারছে।
আমি অনাদির দিকে তাকালাম। ভানু কোথায় গেলোরে।
আর বলিস না। কাল সব বলবো।
অবাক হোলাম।
উনামাস্টারের ছেলের দোকানে কিছু টাকা পাবে, নীপা কিছু জিনিষপত্র কিনেছে।
কাল দিবি।
না না। তুই পচাকে বল একটু দিয়ে আসতে।
অনাদি পচা পচা বলে চেঁচাতেই, পচা এসে হাজির। মানিপার্টস থেকে একটা হাজার টাকার নোট বার করে বাসুর দিকে এগিয়ে দিলাম। তোর দামটা নিয়ে বাকিটা পচাকে দে।
দূর শালা। সকাল থেকে পাঁচশো টাকা বিক্রি হয় নি তুই হাজার টাকার নোট দেখাচ্ছিস।
আচ্ছা, তোর দামটা নিয়ে দিবি তো।
না থাক।
তাহলে নেবো না।
বাসু আমার দিকে কটমট করে তাকালো। অনিচ্ছা সত্বে উঠে গেলো। একটা পাঁচশো টাকার নোট পচার হাতে দিয়ে বললো যা দিয়ে আয়।
আমি পচাকে বললাম, নীপাকে একবার বলে আসিস, এবার উঠবো।
সকলে হো হো করে হেসে উঠলো।
হাসলি যে।
ওই দেখ নীপা দাঁড়িয়ে আছে।
বাইরে দিকে তাকিয়ে দেখলাম নীপা ওর সমবয়সী বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলছে।

জীবনে জীবন যোগ না করলে ব্যার্থ হয় গানের পসরা

৩১

Re: কাজলদীঘি, শ্মশান ও পীরসাহেবের থান

বেশ কিছুক্ষণ হই হই করে কাটলো। আমি বললাম এবার উঠবোরে।
ওরা বললো আর কিছুক্ষণ থাক না।
কাকা তাড়তারি যেতে বলেছে, কারা যেন এসেছে।
অনাদি বললো, আজকে ২৫ ভাগ এসেছে, কাল ঠেলা বুঝবি।
হাসলাম।
নীপা মিথ্যে কথা বলে নি। আমি সত্যি সেলিব্রিটি।
তুই এক কাজ কর আমার বাইকে বসে যা। অনাদি বললো।
আমি নয় তোর বাইকে বসলাম, নীপা যাবে কি করে।
সে ব্যাবস্থা আমি করে দিচ্ছি।
অনাদি বেরিয়ে এলো। বাসুকে বললাম কাল তাহলে আসিস। ও বললো ঠিক আছে। নীপা বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল, আমি আসতেই বললো, অনিদা এসো আমার বন্ধুদের সঙ্গে তোমায় আলাপ করিয়ে দিই।
নীপা একে একে সবার নাম বলে চলেছে, কেউ আমার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে, কেউ আবার হাত জোড় করে। কারুরই মুখ এই আধো অন্ধকারে পরিষ্কার দেখতে পেলাম না। সবাইকে বললাম একদিন এসো, জমিয়ে গল্প করা যাবে। ওরা কল কল করে উঠলো।
আমি অনাদির পেছন পেছন এলাম, নীপা আমার পাশে। অনাদি বাইকে স্টার্ট দিলো, বললো তুই আমার পেছনে বোস, নীপা তুই অনির পেছনে বোস।
আমার চক্ষু চড়কগাছ। এই অন্ধকারে তিনজন!
বোসতো,  নীপা আছে বলে , না হলে তোকে....।
নীপা খিল খিল করে হেসে উঠল।
ঠিক আছে ঠিক আছে, হাত পা যদি ভাঙে....।
নীপা হো হো করে হেসে উঠলো এবার একটু জোরে, আমরা অনাদিদার বাইকে চারজনে বসি।
আমি অবাক হলাম।
আমি অনাদির পেছনে বসলাম। নীপা আমার পেছনে। অনাদি বাইক চালাতে আরম্ভ করলো। বাজার ছেড়ে বেরিয়ে এলাম। আলো থেকে অন্ধকারে। কিন্তু না, জ্যোতস্নার আলোয় মাঠ ভরে গেছে। অনেকদূর পর্যন্ত দেখা যায়। আজ বোধ হয় ত্রয়োদশী,  চাঁদটা বেশ বড়, নীপা আমার শরীরের সঙ্গে সেঁটে আছে। ওর হাত আমার থাইতে। ওর নরম ভারি বুক আমার পিঠে হুল ফোটাচ্ছে। বাইকের আওয়াজ চারিদিকের নিস্তব্ধতা ভেঙে এগিয়ে চলেছে। মাঝে মাঝে দু’একটা পোকা মাকড় ঠকাস ঠকাস করে চোখে মুখে লাগছে। নীপা ওর ঠোঁট দুটো আমার পিঠে ছোঁয়ালো। মাথা রাখলো। আমার পিঠটা যেনো ওর বালিশ। আমরা তিনজনেই চুপচাপ।
মিনিট দশেকের মধ্যে আমরা সবাই পৌঁছে গেলাম। মনাকাকা বারান্দায় দাঁড়িয়ে চেঁচামিচি করছে। তোমরা ছেলেটাকে পাঠিয়ে দিলে, এখনো এলো না। .....কে এলিরে।
স্যার আমি অনাদি ।
অনাদি। দেখতো ছেলেটা হাটের দিকে গেছে, এখনো এলো না।
কে।
কে আবার, অনি।
এই তো আমি ওকে নিয়ে এসেছি।
নিয়ে এসেছিস। আয় আয়। ভাতরে আয়।
অনাদি দাওয়ায় উঠে কাকাকে প্রণাম করলো।
আমি এই সোনাঝরা জ্যোতস্নায় নীপার দিকে তাকালাম। ওর চোখে এখন অন্য কথা। আমি প্যাকেটটা ওর হাতে দিলাম।
কি এটা ?
ভেতরে গিয়ে খুলে দেখো।
নীপা ভেতরে চলে গেলো।

আসর ভাঙতে অনেক রাত হলো। খেতে খেত আরো দেরি হলো। প্রায় এগারোটা। আমি কাকাকে চোখের ব্যাপারে বললাম। কাকা হাঁই হাঁই করে উঠলো। আমি খালি একটা কথাই বললাম, তাহলে কাল সকালে উঠেই আমি এখান থেকে চলে যাব। এজীবনে আমার সঙ্গে আর দেখা হবে না। কাকা কেঁদে ফেললেন। ঠিক আছে তুই যা বলবি তাই হবে। কিন্তু অনেক খরচ।
সে নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না। আমার কন্ঠের দৃঢ়তা কাকাকে সব কিছু মেনে নিতে বাধ্য করালো। সম্পত্তির ব্যাপার নিয়ে কাকাকে বললাম, আমি একটা চিন্তা ভাবনা করে রেখেছি কাল তোমায় জানাবো।
সুরমাসি বললেন, হ্যাঁরে অনি তুই একলা ওবাড়িতে শুতে পারবি।
আমি বললাম, কেনো পারবো না।
নীপা বলছিলো তোর ওখানে শোবে।
আমি নীপার দিকে তাকালাম, ও মাথা নীচু করে আছে।
এমনি সময় এই বাড়িতে কে থাকে রাতে।
ভাট পাড়ার দুটো ছেলে আছে, ওরা এসে  রাতে শোয়।
ওবাড়িতে।
আমি আর নীপা শুই। সুরমাসি বললো।
তুমি কোথায় শোবে।
আমি এই বাড়িতে থাকবো।
ঠিক আছে।
খাওয়া শেষ। আমি উঠে মুখ ধুয়ে ওবাড়িতে চলে গেলাম। বাইরের বারান্দায় দুটো ছেলেকে বসে থাকতে দেখলাম। আমাকে দেখে ওরা উঠে দাঁড়ালো।
তোমরা কার ঘরের ?
দাদ আমরা ভাটের ঘরে।
তোমাদের বাবর নাম কি।
একজন বললো বিধান রায়, অপরজন বললো বানু রায়।
আমি অবাক হয়ে ওদের দিকে তাকালাম। এই ছোট ছোট দেখেছি। এখন সব সমত্ত বয়স।
নিজের ঘরে এলাম।
ছোট একটা ডিম লাইট জ্বলছে। তার আলোয় যতটা দেখা যায়। আমি পেন্ট গেঞ্জি খুলে পাজামা পাঞ্জাবী পরলাম। কতদিন এই ঘরে একা একা শুয়ে কাটিয়েছি। তখন কেউ আমার সঙ্গে শুতে আসতো না। ভানু থাকতো, হাঁড়ি পারার বিজন এসে থাকতো। একা থাকাটা আমার যেন জন্মগতো অধিকার। সেই জন্য আমার কোন ভয়ডর নেই। রাতের অন্ধকার আমার কাছে ভীষণ প্রিয়।
উঃ তোমাকে নিয়ে আর পারা যাবে না।
পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখি নীপা এসে হাজির। এরি মধ্যে পোষাক বদল হয়ে গেছে। একটা হাতকাটা ম্যাক্সি পরেছে। ঘরের লাইটটা জাললো। লো ভল্টেজ টিম টিম করে জলছে। আমি ওর দিকে তাকালাম।
সত্যি অনিদা তুমি একটি লেডিস ফিঙ্গার।
হাসলাম।
হাসছো। তোমার খাটের পাশটা দেখেছো।
না।
দেখো ওখানে তোমার রাতের পোষাক ভাঁজ করে রাখা আছে।
থাক। কাল পোরবো।
দাঁড়াও আমি একটু আসছি। বলে নীপা চলে গেলো। কিছুক্ষণ পর একটা বড় টর্চলাইট আর একটা জলের মগ নিয়ে এলো। আবার বেরিয়ে গেলো। একটা টেবিল ল্যাম্প নিয়ে এলো।
এটা আবার কি হবে।
দেখতেই পাবে। এতো আর তোমাদের শহর নয়। একটু পরেই লাইট ফুস হয়ে যাবে।
তাই নাকি।
হ্যাঁ। আমরা সারারাত লাইট জালালে তোমরা শহরের লোকেরা কারেন্ট পাবে কি করে।
নীপা বেশ টরটরি আছে। কটকট করে কথা বলে। এরি মধ্যে ও যেন আমার কতো আপন। আমাকে শাসন করছে। সোহাগ করছে। নীপা খাটটা ঝেরে দিয়ে নিচে রাখা বাক্স থেকে একটা চাদর বার করে বিছানায় পেতে দিল। চাদরটা চেনা চেনা মনে হলো। আমি ওর দিকে তাকিয়ে আছি।
কার বলোতো চাদরটা ?
কার ?
মনে করার চেষ্টা কর।
মনে পরছে না।
মনিমা বলেছিল, তুমি যখন স্কুল ফাইন্যালে স্টার পেয়েছিলে, সেই সময় মশাই তোমাকে এটা প্রেজেন্ট করেছিলো।
চেয়ে চেয়ে দেখলাম, নীপা সত্যি কথা বলেছে। আমি মাদুর পেতে শুতাম। অবস্থা খুব একটা ভাল ছিল না। কাকা চাদরটা কিনে দিয়েছিলো। কিন্তু আমি এতে শুতাম না। সেটা যে এতো যত্ন সহকারে তোলা আছে জানতাম না। চাদরের গায়ে নেপথলিনের গন্ধ ম ম করছে।
যাও শুয়ে পর। নীপা বললো।
তুমি কোথায় শোবে।
ভেতর বারান্দায়।
কেনো ?
সে তুমি বুঝবে না।
নীপা নিজে থেকেই একটা আড়াল তোলার চেষ্টা করছে। কিছু বললাম না।
দরকার পরলে ডাকবে।
আমি বিছানায় টানটান হয়ে শুলাম। আঃ কি আরাম কলকাতায় আমার গদি ওয়ালা বিছানার থেকে এ বিছানার মাধুর্যই আলাদা। মাথাটা ভীষণ যন্ত্রনা করছে। নিজে নিজেই মাথায় হাত বোলাতে লাগলাম। নীপা বাইরের বারান্দায় বিছানা করছে, ঝুপ ঝাপ শব্দ হচ্ছে। কিছুক্ষণ পর ও আবার ভেতরে এলো।
দরজা বন্ধ করবে না ?....কি হলো!.....মাথা যন্ত্রণা করছে!
আমি ওর দিকে তাকালাম। ওর চোখ দুটো কেমন যেন হয়ে গেলো, আমার মাথার শিয়রে এসে বসলো।
আজ সারাদিন তোমার অনেক ধকল গেলো।
হ্যাঁ।
দাঁড়াও তোমার মাথায় একটু বাম লাগিয়ে দিই।
না থাক।
থাক কেনো।
আমি ওসব লাগাই না।
ওঃ তুমি না......নীপা মাথা থেকে আমার হাতটা সরিয়ে দিয়ে নিজের হাত রাখলো। নরম হাতের ছোঁয়ায় আমার চোখ বন্ধ হয়ে এলো। নীপা আমার চুলর মধ্যে হাত ঢুকিয়ে বিলি কাটছে। একটা পিন পরলেও এ ঘরে শব্দ হবে। এখনো কারেন্ট আছে। ডিম লাইটটা মিট মিট করে জলছে। আমার মাথার শিয়রের জানলাটা খোলা। একফালি চাঁদের আলো জানলার ফাঁক দিয়ে বিছানায় এসে পরেছে। আমার চোখ বন্ধ।
অনিদা।
উঁ।
তুমি আমার জন্য এত দাম দিয়ে ওটা কিনলে কেনো।
তোমার পছন্দ হয়েছে।
হ্যাঁ। যেদিন বাসুদা ওটা নিয়ে এসেছিল, আমি দেখেছিলাম, কিন্তু......।
কিন্তু কি।
তুমিতো জানো আমাদের অবস্থা।
একটা কাজ করবে।
কি।
আমার বন্ধু গুলো.....উঃ, তাড়াহুড়োয় আমার একটা ভুল হয়ে গেছে। কালকে তুমি এক ফাঁকে একবার বাসুর দোকানে যেতে পারবে।
তুমি বললে নিশ্চই যাব।
তুমি বাসুর দোকানে গিয়ে তোমার পছন্দ মতো সুরমাসীর জন্য, কাকীমার জন্য আর কাকার জন্য বেশ কয়েকটা করে কাপড়, শায়া ব্লাউজ আর তোমরা যা যা পরো নিয়ে আসতে পারবে।
নীপা মুচকি হাসল।
হাসছো কেন।
তোমার কথায়। ওই যে বললে......।
আরে ধ্যুত, আমিতো কোনো দিন কারোর জন্য কিছু কিনিনি।
জানি।
কি করে জানলে।
তোমার কথায়। তুমিও যাবে আমার সঙ্গে।
না। কাল আমার অনেক কাজ।
জানি।
কি করে জানলে।
মশাই বলছিলো। তুমি যা ডিসিসন দেবে তাই ফাইন্যাল। মশাই তোমাকে ছাড়া কাউকে পাত্তা দেয় না। কাল দেখবে সবাই তোমার কাছে আসবে কত কাজ নিয়ে। সত্যি অনিদা তোমায় এতো দিন দেখিনি। তোমার কথা শুনেছি। আর কল্পনায় তোমাকে দেখার চেষ্টা করেছি।
তোমার কল্পনার সঙ্গে অনিদার মিল খুঁজে পাচ্ছ।
না।
কেনো।
তুমি অত্তো বড় লোক।
এখন।
তুমি আমাদের থেকেও সাধারণ।
তাই।
আজ যত দেখছি তত অবাক হয়ে যাচ্ছি।
নীপা।
উঁ।
তোমার কোলে একটু মাথা রাখবো।
রাখো।
মনে কিছু করবে না।
ধ্যাত। আমার সৌভাগ্য।
কেনো।
আমার বন্ধু গুলোকে দেখেছিলে তখন।
হ্যাঁ।
ওদের দেখে তুমি কিছু বোঝো নি।
না।
সত্যি অনিদা তুমি যে কি।
আমি মানুষ।
আমি তাই বলেছি নাকি।
তুমি চাইলে এখুনি সকলকে পেতে পারো।
কি ভাবে।
যে ভাবে চাইবে।
হ্যাঁ।
তোমাকে যদি চাই।
ধ্যাত।
আমি কি সিনেমা আর্টিসট।
তা নয় তবে আমাদের কাছে তুমি তাদের থেকেও অনেক কিছু।
আমি নিপার কোলে মাথা রাখলাম। ওর নরম কোলের স্পর্শে আমার মাথা ব্যাথা অনেকটাই সেরে গেছে। নীপার শরু শরু আঙুল আমার চুলে বিলি কাটছে। অনুভব করলাম নিপা ভেতরে কিছু পরে নি। হাত দুটো দিয়ে নীপাকে একটু কাছে টেনে নিলাম। না ওর কোনো সংকোচ নেই। ও কোন আনইজি ফিল করছে না। ওর বুকটা আমার ঠোঁটের খুব কাছে। আমি চোখ বন্ধ করে আছি। নীপা গর গর করে ওদের কথা বলছে। কবে ওরা এখানে এসেছে, কেনো এসেছে, এই সব। আমি চোখ বন্ধ করে শুনে যাচ্ছি। সবেতেই আমি জড়িয়ে আছি। এটুকু বুঝলাম, নীপা ক্লাস এইটে যখন পরে তখন ওর মা ওকে নিয়ে চলে আসে। তারপর থেকে ওরা এখানেই আছে। নীপার বাবা ভাল নয়, সে কোন এক মহিলার সঙ্গে চলে গেছেন। এখন কাকা কাকীমার দেখভালের দায়িত্ব ওদের। কাকা কাকীমাও ওদের ওপর ভীষণ ভাবে নির্ভরশীল।
নীপা।
উঁ।
যাও এবার শুয়ে পরো।
আর একটু তোমার সঙ্গে গল্প করি।
আমি কিছু বললাম না। ভীষণ ঘুম পাচ্ছে। নীপার হাতের স্পর্শে ওর শরীরের ওমে আমার চোখ জুরিয়ে আসছে।
নীপা।
উঁ।
আমি যখন এলাম, তখন আমাকে দেখে ওরকম দৌড়ে চলে গেলে কেনো।
ভয় পেয়ে গেছিলাম।
আমি বাঘ না ভাল্লুক।
না। তবে একজন অপরিচিত......।
এখন।
তুমি আমার। সম্পূর্ণ আমার।
হাসলাম। বুঝতে পারছি নীপা আমার দিকে হাপুস নয়নে চেয়ে আছে। আমার চোখ বন্ধ। তবু আমি ওর মুখটা দেখতে পাচ্ছি। টিনএজে আমারও অনেক স্বপ্ন ছিল। মনে পোষণ করে রেখেছিলাম। আজ সেই সব স্বপ্ন স্বার্থক করে তোলার চেষ্টা করছি। নীপার অনেক প্রশ্ন, হয়তো তার কিছুটা আমি উত্তর দিতে পারব। বাকিটা পারব না। সাতপাঁচ নানা কথা ভাবতে ভাবতে কখন ঘুমিয়ে পরেছি জানি না। হঠাত একটা অদ্ভূত স্বপ্ন দেখে ঘুমটা ভেঙে গেলো। কেউ যেন আমার গলা চেপে ধরেছে আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে। হাত পা কেমন যেন অসাড় হয়ে আসছে। চোখ মেলে তাকালাম, ঘরটা ঘুট ঘুটে অন্ধকার। কেরোসিনের ডিম লাইটটাও নিভে গেছে। আমি নড়তে চড়তে পারছি না। কেউ যেন আমাকে আষ্টে পৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে আছে। আমি নড়াচড়া না করেই বুঝতে চেষ্টা করলাম।
একটা কোমল শরীরের স্পর্শ অনুভব করলাম। কাল রাতে নীপার কোলে মাথা রেখে আমি ঘুমিয়ে পরেছিলাম। নীপা কোথায় ? চোখ মেলে তাকালাম। নীপা আমাকে পাশ বালিশের মতো আষ্টেপৃষ্ঠে জাপ্টে ধরে শুয়ে আছে। ওর মুখ আমার কাঁধের কাছে। ওর উষ্ণ নিঃশ্বাস আমার কানের লতিকে আরো উষ্ণ করে তুলছে। হাতটা আমার বুকের ওপর, ডানপাটা আমার পায়ের ওপর, ওর ভারী বুক আমার শরীর স্পর্শ করে আছে। নরম বুকের ছোঁয়ায় আমি স্নাত। মাথার ওপর জানলাটা খোলা। ঝিরঝিরে বাতাস ঘরে এসে আছড়ে পরছে। চাঁদ মধ্য গগনে। অন্ধকারেও আলোর রেখা দেখতে পেলাম। আস্তে আস্তে ঘরের সমস্ত অংশ পরিষ্কার হয়ে এলো। আমি নীপাকে খুব সন্তর্পনে আমার শরীর থেকে আলাদা করলাম। বালিশটা ওর মাথার তলায় গুঁজে দিলাম। খাট থেকে নেমে জলের জগ থেকে একটু জল খেলাম। মিটসেফের ওপরে রাখা সিগারেটের প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বার করলাম। আস্তে আস্তে পা টিপে টিপে বাইরের বারন্দায় এলাম।
সিগারেট ধরালাম। চারিদিক নিস্তব্ধ, চাঁদের আলো গাছের পাতার ওপর রুপোর মতো গলে গলে পরছে। ঝিঁ ঝিঁ পোকার একটানা তারস্বর চিত্কার। পরিবেশটাকে স্বপ্নিল করে তুলেছে। আমি নিজের মধ্যে নিজে হারিয়ে গেলাম।
কেউ যেন আমাকে জাপ্টে ধরলো, তার নরম বুক আমার পিঠে স্পর্শ করেছে, ঠোঁট দুটো ছবি আঁকছে আমার ঘারের কাছে। আমি হাতদুটো আলগা করে, তার সামনা সামনি হলাম, নীপা। এ নীপাকে আমি চিনি না জানি না, ওর চোখের রং বদলে গেছে।
নীপার ঠোঁটদুটো আমার ঠোঁটের খুব কাছে। ওর সুডৌল বুক আমার বুকে আছড়ে পরেছে। থিরি থিরি কাঁপছে ঠোঁট দুটি। আমি নীপাকে আস্তে আস্তে আমার শরীর থেকে আলগা করলাম। ওর মুখটা তুলে ধরে আস্তে করে বললাম না নীপা না। নীপা আমার হাতদুটো ছিটকে সরিয়ে দিয়ে জাপ্টে ধরলো। আমার ভেতর একটা অস্বস্তি খেলা করে যাচ্ছে। প্রাণপনে নীপাকে ছাড়াবার চেষ্টা করছি। হঠাৎ নীপা ডুকরে কেঁদে উঠলো। চারিদকে জ্যোতস্না স্নাত রাত, কোথাও একটা মোরোগ ডেকে উঠলো কঁ কঁকর কঁ।
ক্রমশঃ

জীবনে জীবন যোগ না করলে ব্যার্থ হয় গানের পসরা

৩২

Re: কাজলদীঘি, শ্মশান ও পীরসাহেবের থান

কিছু জায়গা রিপোষ্ট হয়ে গিয়েছে । আজ যতটুকু দিয়েছেন, পুরোটাই ।

"I know not with what weapons World War III will be fought, but World War IV
will be fought with sticks and stones."
    -Albert Einstein

৩৩

Re: কাজলদীঘি, শ্মশান ও পীরসাহেবের থান

পূব দিকের আকাশটা সবে ফর্সা হয়ে এসেছে। মাঝে মাঝে কালো কালো ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘ ভেসে যাচ্ছে। আমি পাজামা পাঞ্জাবী পরে সিগারেটের প্যাকেট মোবাইলটা পকেটে ঢোকালাম। নীপা আমার দিকে তাকালো। ওর আয়ত চোখ দুটি ভিজে কাদা হয়েগেছে। আমি কিছু বললাম না, বেরিয়ে এলাম। নীচে নেমে দরজাটা ভেতর থেকে টেনে বন্ধ করলাম। খামারে এসে দাঁড়ালাম, পেছন ফিরে তাকালাম, নীপা জানলা থেকে মুখ সরিয়ে নিল, আমি মাঠের পথ ধরলাম।
প্রথমে পড়বে চন্দ্রপাড়া, তারপর তাঁতীপাড়া, তারপর কামারপাড়া, একেবারে শেষে হাঁড়িপাড়া, হাঁড়িপাড়া পেরিয়ে আমার গন্তব্য স্থল দীঘাআড়ি। আমার এক সময়ের সবচেয়ে প্রিয় জায়গা। আমি ওখানে গেলে কেমন যেন নিজের মধ্যে নিজে হারিয়ে যাই। সোনাঝড়া রোদ কচি ধান গাছের গায়ে আবির লেপে দিয়েছে। এরি মধ্যে কেউ কেউ মাঠে নেমে পরেছে। এখন বাছার (আগাছা পরিষ্কার করা) সময়। কয়েকদিন পর ধানের বুকে শীষ আসবে দুধ জমবে। এই সময় একটু যত্ন আত্তি করতে হয়। আমি একা পথের পথিক। কেউ আমার দিকে তাকালো। কেউ তাকালো না। সাঁওতাল মেয়ে গুলো নীচু হয়ে অলচিকি ভাষায় মিহি সুরে গান করছে। ওদের শরীর গুলো সত্যি দেখার মতো। কালো কষ্টি পাথরে কোন শিল্পী যেন কুঁদে কুঁদে ওদের সৃষ্টি করেছে। খালি গায়ে বুকের ওপর কাপরটাকে পেঁচিয়ে পরেছে। নীচু হয়ে কাজ করায় ওদের অনাবৃত বুকের কিছুটা দেখা যাচ্ছে। আমি আড় চোখে মাঝে মাঝে ওদের দেখতে দেখতে এগিয়ে চলেছি।
হাঁড়িপাড়া পেরিয়ে চলে এলাম দীঘাআড়ি। আঃ যেমন দেখেছিলাম আজ থেকে দশ বছর আগে ঠিক তেমনি আছে। প্রকৃতির কোনো পরিবর্তন নেই, বরং দিনে দিনে সে লাস্যময়ী হয়ে উঠেছে। বর্ষার সময় দুকুল ছাপিয়ে জলের ঢল নামে। এখন জল অনেকটা মরে গেছে, তবু যে টুকু আছে তা নয়নাভিরাম। মাঝখানে পানকৌড়ি আর সরাল পখির হুটোপুটি। আকাশ থেকে ডানা মেলে ঝুপ করে জলে আছড়ে পরছে বক। কোকিলের কুহু কুহু স্বর চারিদিক ম ম করছে। এত প্রচন্ড নিস্তব্ধতা যে নিজের নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের শব্দ নিজে শুনতে পাচ্ছি।
কালীচরণের ঝিকে নিয়ে ভানুর সেই কীর্তি কলাপের জায়গায়টায় একটু থমকে দাঁড়ালাম। চোখ বন্ধ করলে এখনো সেই দৃশ্য আমি দেখতে পাই। পায়ে পায়ে আমার সেই চেনা ঝোপের ধারে এসে বসলাম। এখন অনেকটা নোংরা হয়ে গেছে। কেউ হয়তো আসে না। আমার মতো পাগল কজন আছে। আমি একটু পরিষ্কার করে বসলাম। পেছনটা ভিজে গেল। বুঝলাম, সারারাতের শিশির স্নাত ঘস গুলি আমাকে স্নান করিয়ে তার কোলে জায়গা দিল। দীঘির জল কাঁচের মত ঝকঝকে, স্থির। মাঝে মাঝে একটা দুটো মাছ লেজ নেরে দীঘির জলে কাঁপন তুলছে। কাঁপা কাঁপা ঢেউ গুলি কিছু দূরে গিয়ে আবার মিলিয়েও যাচ্ছে। সূর্যের আলো এসে পরেছে দীঘির জলে। তার আলো ছায়ার স্পর্শ গাছের ডালে, তার পাতায়।
ঝন ঝন করে ফোনটা বেজে উঠলো, মনেই ছিলো না, পকেট থেকে ফোনটা বের করলাম। মিত্রার ফোন।
কখন ঘুম থেকে উঠলি।
চারটে।
যাঃ।
হ্যাঁরে।
এখন কোথায়।
আমার স্বপ্নের সেই জায়গায়।
কোথায় বসে আছিস বলতো পাখির আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি।
সে অনেক কথা। ফোনটা অফ করিস না কথা না বলে শুধু শুনে যা। আমি ভয়েজ অন করলাম। মিত্রা মনে হয় গাড়ি করে কোথাও যাচ্ছে, গাড়ির হর্নের আওয়াজ পাচ্ছি।
কিরে কোথায় হারিয়ে গেলি।
হারিয়ে যাই নি, হারায়ে খুঁজি।
বাবাঃ কবি কবি ভাব, ছন্দের অভাব।
শুনলি।
হ্যাঁ। লাইভ।
সত্যি তাই। আমি সেই ঝিলের ধারে একা।
একা একা কেন, দোকা করে নে।
কে আসবে বল।
চাইলেই পাবি।
সব চাওয়া পাওয়া হয়ে ওঠে না।
ঠিক বলেছিস বুবুন।
জানিস মিত্রা এখানে এই সকালটা এতো ভালো লাগে তোকে বোঝাতে পারব না। পৃথিবীতে অনেক কিছু আছে যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। তাকে অনুভব করতে হয়।
কবে আসছিস।
ঠিক নেই।
তারমানে।
মিত্রাকে এখানকার সমস্ত ব্যাপারটা পঙ্খানুপুঙ্খ রূপে বললাম।
বুঝেছি তুই অনেক সমস্যায় পরে গেছিস। দাদাকে বলেছিস।
এখন বলি নি।
হ্যাঁরে তুই বড়মাক ফোন করিস নি।
কেনো।
গতকাল বড়মা আমায় প্রায় পনেরবার ফোন করেছে তোর খবর নেওয়ার জন্য। ভেবেছে আর কাউকে তুই ফোন করিস আর না করিস আমাকে অবশ্যই করবি।
বড়মার ধারনাটা অন্যায় না। সবাইকে ফাঁকি দিতে পারি, বড়মা ছোটমাকে ফাঁকি দিতে পারব না।
কাকার ব্যাপারে কি ডিসিসন নিলি।
আজ বারোটার পর জানতে পারবো।
আমাকে জানাস।
জানবো।
ভুলে যাবি।
নারে বিশ্বাস কর এখানে মাঝে মাঝে টাওয়ার থাকে আবার চলে যায়। তোরা বরং ফোন করিস না। আমিই তোদের ফোন করব। ওদিককার খবর কি।
হিমাংশু সমস্ত এ্যারেঞ্জ করে দিয়েছে। তুই এলে ফাইন্যাল হবে।
তুই এখন কোথায়।
সকালে কি মনে হলো একটু গঙ্গার ধারে গেছিলাম। স্নান করলাম, অনেক পাপ করেছি। এখন ফিরছি।
একা না কেউ সঙ্গে আছে।
আমি তোরই মতো। তুই ঝিলের ধারে একা, আমি গঙ্গার থেকে একা ড্রাইভ করে ফিরছি।
অফিসে গেছিলি।
না। তুই বারন করেছিস। অমান্য করতে পারি না।
আমি কে।
শুনতে ইচ্ছে করছে। বাঁদর।
হাসলাম।
হাসছিস। তোর লজ্জা করে না।
না।
হ্যাঁরে টাকা পয়সা সঙ্গে আছে।
খুব বেশি নেই।
তোর ঠিকানা বল।
তুই বাড়ি ফিরে যা। প্রয়োজন হলে বলবো।
উঃ তুই মচকাবি তবু ভাঙবি না।
এই টুকু নিয়েই বেঁচে আছি। এই পৃথিবীতে আমার বলে কে আছে বল।
চোখ মেলে তাকা, বুঝতে পারবি।
হাসলাম।
আবার বোকার মতো হাসছিস।
আসবি এখানে।
তুই বললেই ছুটে চলে যাব।
থাক।
থাক কেন।
উঃ তুই বরো জালাতন করিস।
মিত্রা কোন কথা বলছে না। খালি গাড়ির হর্নের আওয়াজ, ক্যাঁচ করে ব্রেক চাপার শব্দ, বুকটা ধরাস করে উঠলো।
কিরে কথা বলছিস না কেনো, মিত্রা মিত্রা।
এখন রাখি। গলাটা ধরা ধরা।
কি হয়েছে বলবি তো।
তোর এই সময়......।
কি পাগলামো করছিস।
আমি কি তোর পাশে থাকতে পারি না।
কাঁদছিস কেনো।
কই কাঁদলাম।
আমি দেখতে পাচ্ছি।
ধ্যুস।
ঠিক আছে এখানে ডেটটা ফাইন্যাল করে তোকে জানাবো।
জানাবি ঠিক।
বললামতো জানাবো।
বিকেলে একবার ফোন করিস। বড়ো একারে।
আচ্ছা।
মিত্রা ফোনটা রেখে দিল। কয়েকজন লোক দীঘির পারে এসেছে। ওরা মনে হয় মাছ ধরবে। ওদের কাঁধে জাল দেখছি। কলকাতার ভেঁড়িতে মাছ ধরা দেখেছি। আর এখানকার দীঘিতে মাছ ধরা দেখেছি দুয়ের মধ্যে কত তফাত। না আর বসে থাকা যাবে না। সূর্যের রং বলছে অনেক বেলা হয়েছে। মোবাইলটা পকেট থেকে বার করে সময় দেখলাম নটা বাজতে যায়।
ফেরার পথে অনেকের সঙ্গে দেখা হল। কাউকে চিনতে পারলাম কাউকে পারলাম না। স্মৃতি থেকে মুছে গেছে। চন্দ্র পাড়ায় অনাদির বাড়ির কাছে এলাম। দুটো বাচ্চা ওদের খামারে খেলা করছে। ধুলোয় ঢাকা শরীর। হাসলাম, আমিও একসময় এরকম ছিলাম, গ্রামের ছেলেরা ধুলো ঘাঁটতে খুব ভালবাসে। মেয়েটা মনে হচ্ছে বড়। কত বয়স হবে চার কি পাঁচ, ছেলেটা দুই কিংবা তিন। একজন আর একজনের মাথায় ধুলো দিচ্ছে। আমি খানিকক্ষণ দাঁড়িয় দাঁড়িয়ে ওদের খালা দেখলাম। ওরা মাঝে মাঝে আমার দিকে জুল জুল করে তাকাচ্ছে।
অনাদি বাড়ি আছিস।
একজন বছর চব্বিশের অটপৌরে ভদ্রমহিলা উঁকি দিয়েই আবার ভেতরে চলে গেলো। গরুগুলো খামারের একপাশে বাঁধা। খড় চিবোচ্ছে। চোখ বন্ধ করে মুখ দিয়ে লালা গড়িয়ে গড়িয়ে পরছে। একটা বোকনা বাছুর গুতিয়ে গুতিয়ে তার মায়ের বাঁট থেকে দুধ খাচ্ছে। লেজ দুলছে তার খেয়ালে। অনাদিরা এই গাঁয়ের সম্ভ্রান্ত কৃষক। ভালো পয়সা আছে। তাছাড়া এখন গ্রামপঞ্চায়েত হয়েছে। নিশ্চই কিছু পয়সাগড়ি করেছে। একজন বয়স্ক ভদ্রলোক বেরিয়ে এলেন। প্রথমে ঠাহর করতে পারি নি। পরে বুঝলাম কাকাবাবু, অনাদির বাবা।
আমি এগিয়ে গেলাম, পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলাম। কাকাবাবু থাক থাক করলেন।
কে বাবা।
আমি অনি।
আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। একি করলি অনি এই সাত সকালে।
কি করলাম।
তুই আমাকে প্রণাম করলি।
কেনো!
তোরা ব্রাহ্মণ, আমরা নমশুদ্র। কায়েতের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতে নেই।
তোমরা আমার গুরুজন।
কাকু আমার গায়ে মাথায় হাত বোলালেন। চেঁচিয়ে উঠলেন সৌদামিনি ও সৌদামিনি দেখবে এসো কে এসেছে। জানিস বাবা কাল তোর ঘরে গেছিলাম। তোকে একবার দুচোখ ভরে দেখতে।
কেনো।
তুই কত বড় হেয়েছিস। চারিদিকে তোর কত নামডাক।
এইতো আমি তোমার সামনে দাঁড়িয়ে আছি। কোথায় বড় হয়েছি।
কাকীমা ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন। কে এসেছে গো, কে এসেছে।
আমাদের অনি এসেছে গো দেখো দেখো।
তাকিয়ে দেখলাম, বারান্দা থেকে সেই ভদ্রমহিলা উঁকি দিয়ে আমাকে দেখছেন। বাচ্চা গুলো পায়ে পায়ে আমার কাছে এসে হাজির। কাকীমা কাছে এলেন। আমি নীচু হয়ে প্রণাম করতে গেলাম। কাকীমা হাত ধরে ফেলেছেন, না বাবা তুই প্রণাম করিস না, তোর বাপ-মাকে আমরা প্রণাম করতাম। আজ বেঁচে থাকলে তারা দেখতো তাদের অনি কত বর হয়েছে।
মাথা নীচু করলাম, ও কাঞ্চন আয় এদিকে আয় দেখা যা অনিকে।
কেনো আমি কি কোনো দ্রষ্টব্য বস্তু।
নারে তোর কথা প্রায় আলোচনা হয়। ওরা তোকে দেখে নি। ভাবে লোকটা কে।
মেয়েটি কাছে এলো, বেশ দেখতে। অযত্নে মরচে পরে গেছে। ঘোমট দেওয়া। আমায় প্রণাম করতে চাইলো। আমি বললাম থাক থাক, প্রণাম করতে হবে না।
কাকীমা বললেন, অনাদির বউ।
তাই নাকি।
ওই দেখ দুটিতে কেমন খেলা করছে, একটা ছেলে একটা মেয়ে।
মাথা নীচু করে হাসলাম।
একটু চা করি বসুন। কাঞ্চন বললো।
থাক আর একদিন এসে খাবো। অনেক সকালে বেরিয়েছিলাম। কেউ জানে না।
কোথায় গেছিলি। কাকা জিজ্ঞাসা করলেন।
দীঘাআড়ি।
কাঞ্চন আমার দিকে অবাক হয়ে তাকালো। ওর আয়তো চোখে কত বিস্ময়। এই লোকটা ওই বনে কি করতে গেছিলো ? ঘোমটা সরে গেছে, মাথার সিঁদুর ফিকে। এলোমেলো চুল মুখের ওপর এসে পরেছে।
কাকা। অনাদি কোথায় ?
ও আর দিবাকর রাত থাকতে বেরিয়েছে, বললো একটু টাউনে যাবে কি কাজ আছে।
ঠিক আছে আমি আসি।
অনাদির বাড়ি থেকে বেরিয়ে বিসই পাড়ার গা দিয়ে কলাবাগানের ভেতর দিয়ে বড়মতলায় এসে পরলাম। বড়মতলার পুকুর ঘাটে সেই পেয়ারাগাছটা এখনো অটুট। কয়েকটা বাচ্চা গাছটার ডাল ধরে দাপা দাপি করছে। পেয়ারা ছিঁড়ে খাচ্ছে। গ্রামের ভাষায় এজমালি গাছ। সবার অধিকার।
এক সময় এর ডালে কত নাচানাচি করেছি, গ্রীষ্মের দুপুরে ওর ডাল থেকে, পুকুরে ঝাঁপ দিয়েছি। মনটা কেমন আনচান করে উঠলো। আরে দাঁত মাজা হয় নি। আমি পেয়ারা গাছের কাছে যেতেই বাচ্চা গুলো ছুটে একটু দূরে চলে গেলো। আমি একটা শরু পেয়ারা ডাল ভেঙে নিয়ে দাঁতনের মতো করে নিলাম। কিছুক্ষণ গাছটার তলায় দাঁড়ালাম, মগডালে কয়েকটা পেয়ারা হয়েছে। কিছুতেই লোভ সামলাতে পারলাম না, বাচ্চা গুলোকে ইশারায় কাছে ডেকে নিলাম।
ওরা প্রথমে কিছুতেই আসতে চায় না, তারপর আমার ওপর বিশ্বাস জন্মালো। কাছে এগিয়ে এলো। আমি গাছে উঠলাম, মগডাল থেকে পেয়ারা ছিঁড়ে ছিঁড়ে ওদের দিকে ছুঁড়ে ফেললাম। ওদের সে কি আনন্দ কি চেঁচামিচি, আমি দুটো পেয়ারা ওদের কাছ থেকে পারিশ্রমিক হিসাবে চেয়ে নিলাম। কে আমাকে পেয়ারা দেবে তার কমপিটিসন লেগে গেলো।  আমি এদের কাউকে চিনি না জানি না। সবাই কাকু আমারটা নাও, কাকু আমারটা নাও, আমি দুজনের কাছ থেকে দুটো পেয়ারা নিলাম। বড়মতলার পুকুর ঘাটে মুখ ধুলাম। বাড়ির পথ ধরলাম।
খামারে উঠতেই নীপার গলা শুনতে পেলাম, ওই উনি আসছেন। মূর্তিমান বিভীষিকা। যাও ভাইপোর কাছে হিসাব চাও। তিনি কখন কোথায় গেছিলেন।
কাকা আমতা আমতা করছে নীপার কথায়।
আমি দাওয়ায় পা রাখলাম।
দীঘাআড়ি ছাড়া তোমার আর কি যাবার জায়গা নেই। নীপা বললো।
মুখ নীচু করে হাসলাম। চারিদিকে চোখ বোলালাম, আরো অনেকে বসে আছেন, কাউকে চিনি না।
কাকীমা বললেন, ওঃ গিন্নী হয়ে গেছেন ধমক্কাচ্ছে দেখ ছেলেটাকে কেমন। আমার কাচে এসে বললেন, হ্যাঁরে বাবা চাটা কিছু না খেয়ে কোথায় গেছিলি।
বললাম।
সে তো আমি এখুনি শুনলাম, কালিচরণের ঝির কাছ থেকে।
একটু চমকে গেলাম। কালিচরণের ঝি।
হ্যাঁ। ওতো বাইশটিকীর কাছে মাঠে কাজ করছিল তোকে দেখেছে।
ও।
কি খাবি।
কিচ্ছু না।
তার মানে।
কলকাতায় এত সকালে খাওয়া জোটে না।
তুইতো তোর সাহেবের বাড়িতে থাকিস।
থাকতাম। এখন থাকি না।
কাকীমা একটু অবাক হলেন। নীপা তোর জন্য আলুভেজে রেখেছে মুড়ি দিয়ে মেখে দেবে বলে।
নীপার দিকে তাকালাম। ভেঙচি কেটে মুখটা ঘুরিয়ে নিল। দাও একটুখানি, বেশি না।
নীপা ছুটে চলে গেলো।
তুই চিন্তে পারিস এদের। কাকা বললেন।
না।
এরা রামপুরা থেকে এসেছে।
আমি কাকাপ পায়ের কাচে বসে থাকা সারিবদ্ধ মুখ গুলির দিকে তাকিয়ে হাঁ করে থাকলাম। নমস্কার করতে আর পারছিনা। কালকে থেকে নমস্কার করতে করতে কোমড় ব্যাথা হয়েগেছে। কেবলা কেবলা চোখে সবার দিকে তাকিয়ে একটু হাসলাম।
তোমার কথা অনেক শুনিগো ছোটবাবু।
বুঝলাম কাকা বড়বাবু, আমি ছোটবাবু।
তা বউমাকে সঙ্গে আনলে না কেনো।
কাকা ধমকে উঠলেন, ছুঁচ্চা কাই করার ও এখনো বিয়েই করে নি, বউমা।
তা কি করে জানব বলতো বড়বাবু।
নীপা মুড়ির বাটি দিতে এসে ফিস ফিস করে বললো, ওপরের ঘরে এসো কথা আছে।
আমি ওর দিকে তাকালাম।
মুড়ি খেলাম। চা খেলাম। অনাদি আর বাসু বাইক নিয়ে খামারে এলো। খামার থেকেই আমাকে দেখতে পেয়েছে। পায়ে পায়ে দাওয়ায় এলো।
কে এলো।
অনাদি বললো স্যার আমি অনাদি। দিবাকর কাকার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলো।
কে।
স্যার আমি দিবাকর।
বাবাঃ অনি এসেছে, তাই তোদের দেখা পাই।
দিবাকর মাথা চুলকাচ্ছে। নীপা ছুটে চলেগেলো। ব্যাপরটা বুঝলাম না। অনাদি বললো, চল একটু কথা আছে।
আমি কাকাকে বললাম, কাকা আমি যাই ওরা এসেছে, ওদের সঙ্গে কথা বলি।
যাও।
ওবাড়িতে গেলাম, ঘরে ঢুকতেই নীপা কট কট করে আমার দিকে তাকালো। ঘর গোছাচ্ছিলো। আমার পেছন পেছন অনাদি, দিবাকর ঢুকলো।
এই নীপা একটু কড়া করে চা বানা।
সে আর বলতে, সব চা খোর এক সঙ্গে জড়ো হয়েছো।
ঠিক বলেছিস।
মুড়ি খাবে।
সকাল থেকে পেটে কিছু পরে নি।
কি রাজকাজে গেছিলে।
সে অনেক কাজ তুই বরং আগে একটু চা নিয়ে আয় পরে মুরি আনবি।
নীপা চলে গেলো।
অনাদি প্যাকেট থেকে সিগারেট বার করলো, আমি বললাম রাখ, আমি এক প্যাকেট সখ করে কিনে এনেছি, কটা আর খাব তোরা খা। প্যাকেটটা বার করলাম।
আরি বাব, এত দামি সিগারেট খাবো না।
এটা কি দামি সিগারেট।

জীবনে জীবন যোগ না করলে ব্যার্থ হয় গানের পসরা

৩৪

Re: কাজলদীঘি, শ্মশান ও পীরসাহেবের থান

হ্যাঁ।
জীবনে প্রথম নিজের হাতে কেনা। বলতে পারবো না।
কলকাতায় তোকে সাংবাদিক বলে কেউ চেনে।
আমি চুপ থাকলাম।
অনাদি একটা সিগারেট বার করল। দিবাকরকে একটা দিল। আমিও একটা সিগারেট ধরালাম।
তুই শালা বললি সিগারেট খাস না। যেভাবে খাচ্ছিস এতো পাক্কা সিগারেট খোরের মতো টান।
আমার বসের নকল করা।
ওরা হাসলো।
শোন অনি সব ব্যাবস্থা করেছি। মাইক্রোসারজারি হবে। খরচ একটু বেশি। তবে কয়েকঘন্টার ব্যাপার কাকাকে নার্সিংহোমে ঘন্টা পাঁচেক থাকতে হবে। তারপর ছেড়ে দেবে।
খুব ভালো।
কিন্তু ভাই রগঢ়াটা অনেক বেশি।
কতো ?
পঁয়ত্রিশ চাইছে।
এখানে এটা ঠিক আছে, কলকাতা হলে হাজার পঁচিশের মধ্যে হয়ে যেতো।
তুই এর রেট জানিস।
হ্যাঁ।
অমিতাভদার করিয়েছি।
এই নার্সিংহোমটা এখানে খুব নাম করেছে। ইকুইপমেন্টও বেশ ভালো।
কোথায় ? স্টেশনের পাশে বম্বেরোডের ধারে।
তাহলে তো একটা গাড়ির ব্যবস্থা করতে হবে।
সে হয়ে যাবে।
নীপা মুড়ির বাটি নিয়ে ঢুকলো, তুমিতো এক পেট গিললে আবার হবে নাকি।
না। তবে একটু চা হলে ভালো হয়।
হবে। অনাদিদা চা কি এখুনি আনব না পরে।
তোর আনতে আনতে মুড়ি টেনে দেবো, চাষার ছেলে।
আমি হাসলাম।
তোকে খুব শাসন করছে না।
সে আর বলতে, আমি তো খুব ভয় পেতে শুরু করেছি।
তুই জানিস না, এ তল্লাটের দিদিমনি বলে কথা।
অনাদিদা ভাল হচ্ছেনা বলে দিচ্ছি।
তুই খালি সাপ্লাই লাইনটা ভাল রাখ। তাহলে তোর কোন গুনের কথা অনিকে বলব না।
নীপা বেরিয়ে গেলো, দিবাকর বললো দাঁড়া একটু আসি। বলে বেরিয়ে গেলো। অনাদি হাসলো।
মুড়ি খেতে খেতে অনাদি বললো, তুই রাজি হলে আজই বুক করতে হবে।
কত লাগবে।
পাঁচ লাগবে।
পাঁচ কি হাজার না পাঁচশো।
হাজার হাজার।
চল তাহলে দিয়ে আসি।
অনি আছিস নাকি।
বাসুর গলা মনে হলো। অনাদির দিকে তাকিয়ে বললাম কে বলতো।
আবার কে বাসু হারামজাদা।
ওকেতো দুপুরে আসতে বললাম।
শালার এই কদিন ব্যবসা লাটে। অনাদি বললো।
অনাদি বাইরের বারান্দায় বেরিয়ে গেলো। এসো সেগোরা এসো, একটু মেরে দিয়ে যাও।
বুঝলাম বাসু একলা না। আরো অনেকে এসেছে। সিঁড়িতে হুড়ুম দুড়ুম আওয়াজ আমার ঘর ভরে গেলো। কালকে যারা দলে ছিলো না, তারাও এসে হাজির। সকলেই আমাকে দেখে খিস্তির বন্য বইয়ে দিলো। সঞ্জীব চিকনা পলা।
অনাদি বললো সঞ্জীব এখন বর বেওসায়ী।
সঞ্জীব অনাদিকে তেরে খিস্তি দিলো, হারামী বাঁধে মাটি ফেলা নিয়ে কত কামিয়েছিস বল। বুঝলি অনি খালি বন্যা হলেই হয়, অনাদির কামাই শুরু।
আমি বললাম থাম থাম।
কেনো থামবো বল অনি, যখনি দেখা হবে তখনি আমাকে এই ভাবে ঠেস দিয়ে কথা বলবে।
আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে। তোর এখনো মাথাটা...।
নীপা ঢুকলো। সবাইকে দেখে ও চোখ দুটো এমন করলো.....আমি আর চা করতে পারব না।
চিকনা উঠে দাঁড়িয়ে বললো, এই কথা চল দেখিয়ে দে চায়ের জায়গাটা, তারপর বাকিটা আমি সামলে নিচ্ছি।
হ্যাঁ চলো না, মনিমা আছে দেখতে পাবে।
ওরে বাবা, তাহলে আমি নেই, ভানু তুই যা।
স্যার বসে আছেন।
আমি নীপার দিকে তাকালাম, নীপা যাও একটু কষ্ট কর আমার জন্য......।
তোমার জন্য করতে আমার একটুও অসুবিধা নেই। এদের জন্য পারব না।
দেবী দেবী কেন তুমি ক্রোধান্বিত আমাদের ওপর, আমরা তো তোমায় আবাহন করিতেছি....।
সবাই হো হো করে হেসে উঠলাম পলার কথায়।
নীপা কট কট করে পলার দিকে তাকালো। আমাদের ড্রেস মেটেরিয়াল রেডি।
রেডি মেডাম যখন যাবেন পেয়ে যাবেন।
নীপা চলে গেল। অনাদি বলল দাঁড়া অনির একটা ব্যাপার নিয়ে আমি আর দিবাকর সকালে ব্লুপ্রিন্ট নার্সিংহোমে গেছিলাম, এই আসছি। সবাই চুপ করে গেলো। অনাদি সমস্ত ব্যাপারটা বললো।
স্যারের এরকম অবস্থা আমরা কেউ জানি না। বাসু বললো।
তোরা খোঁজ খবর রাখিস নি।
আমাদের হাটের কানা সামন্তকে দেখিয়েছিলো না। চিকনা বললো।
ছাড় ওসব কথা।
কাজের কথায় আসি। পর্শু যদি অপারেশনের ব্যবস্থা করি তোদের পাবো তো।
এটা আবার জিজ্ঞাসা করতে হয়, নেতা হয়েছিস না ঘর মোছার নেতা। চিকনা বলল।
ঠিক আছে, ঠিক আছে। ভানু গাড়ির ব্যাপারটা।
চল যাচ্ছিতো, গোড়ার সঙ্গে কথা বলে চলে আসবো।
কখন বেরোবি। চিকনা বললো।
তাহলে ঘন্টা খানেকের মধ্যে বেরিয়ে যাই চল।
ঠিক হলো আমরা ছজন যাব, বাসুর একটা বাইক অনাদির একটা বাইক আর চিকনার একটা বাইক। সঞ্জীব ভানু আর আমি। দিবাকর বললো আমি যাবো না বিকেলে কাজ আছে।
ঘন্টা আছে। চিকনা বললো।
এই আবার শুরু করলি।
কেনো একদিন না গেলে কি মহাভারত অশুদ্ধি হয়ে যাবে।
তোকে ভাবতে হবে না।
তুই ওটাকে নিয়ে গেছিলি কেনো, বাসুকে নিয়ে যেতে পারিস নি।
বাসুর একটা কাজ ছিল।
আমাকে ডাকতে পারিস নি।
ঠিক আছে ঠিক আছে। ওর কাজ থেকতে পারে না।
চিকনা চুপ করে গেলো।
হাতের কাজ শেষ করে নে, পর্শুদিন ওখানে সবাইকে যেতে হবে। সারাদিন লেগে যাবে।
সবাই মেনে নিল অনাদির কথা। নীপা চা নিয়ে এলো, হাসি ঠাট্টা ইয়ার্কি ফাজলামো কত কি হলো। সবার মধ্যমনি নীপা। আমাদের আড্ডায় কিছুক্ষণ অংশগ্রহণ করলো। চিকনা ধমকে বললো বড়দের আড্ডয় ছোটদের থাকতে নেই।
আমি এখন এ্যাডাল্ট।
নীপা এমন ভাবে কথা বললো সবাই হেসে উঠলো।
সঞ্জীবের দিকে তাকিয়ে বললাম, হ্যাঁরে তোর দোকানে টিভি আছে।
আনাদি বললো আছে মানে কি চাই বল।
দেখলি ব্যবসার কথা হলেই কেমন টোকে।
উঃ সব কথা গায়ে মাখিস কেনো। আমি বললাম।
এই হল কাল। বাসু বললো।
তোর কথা ভাঙিয়ে কত কাজ বাগায় জানিস ও। অনাদি বললো।
সেতো ভালো। তুই করিস না।
হ্যাঁরে ছুঁচ্চা আমি করি, তুই করিস না।
সঞ্জীব হেসে বললো করি তবে কম। একটা কথা কি জানিস অনি তোকে সবাই বেশ ধ্বসে।
কি রকম।
সেদিন ভানুর একটা ব্যাপারে বিডিওর কাছে গেছিলাম, শালা কিছুতেই করবে না, যেই বললাম ঠিক আছে আমার বন্ধুরে তাহলে একবার ফোন করতে হবে।
শালা তোর নাম শুনেই বলে কিনা আপনি একটু ঘুরে আসুন আপনার কাজ হয়ে যাবে। সত্যি বলছি অনি কাজটা হয়ে গেলো। তুই শালা এখন মিনিস্টার বনে গেছিস।
সবাই হো হো করে হাসলো। সিগারেটের প্যাকেটে মাত্র দুটো সিগারেট পরে আছে। চিকনা একটা আমাকে দিয়ে বললো, এটা কাউন্টার হবে। ভানু বললো আমি ফার্স্ট, চিকনা বললো, ইঁট পাতো। আমি হেসে ফেললাম।
বাসুকে আলাদা করে বললাম, নীপা তোর দোকানে আজ যাবে কিছু জামা কাপড় কিনতে তুইতো থাকবি না, তাহলে কি হবে ?
বাসু খিস্তি করে বললো তোকে চিন্তা করতে হবে না।
সঞ্জীবকে বললাম, তোর দোকানের সবচেয়ে ভাল টিভি যদি থাকে আজ একটু লাগিয়ে দেবার ব্যবস্থা কর। সঞ্জীব আমার দিকে তাকলো, চুয়াড়।
আমি মুচকি হাসলাম।
সবাই চলে গেলো। ঠিক হলো এখান থেকে বারোটার সময় বেরোব ওরা বাইক নিয়ে যে যার চলে আসবে। আমি ওবাড়িতে গিয়ে কাকার সঙ্গে সব আলোচনা করলাম। নীপা কাকীমা সুরমাসিও ছিল। ওরা আমার দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে আছে। আমি কাকাকে বললাম তুমি অনুমতি দাও আমি এখানে থাকতে থাকতে সব কাজ সেরে যেতে চাই।
কাকা কেঁদে ফেললেন। চশমা লাগিয়েও আমি আবঝা দেখি বুঝলি অনি। যার চোখ নেই পৃথিবী তার কাছে অন্ধকার। তোর লেখা আমি পরতে পারি না। নীপা পরে পরে শোনায় ঘরে একটা টিভি আনতে পারলাম না। মেয়াটা সারাদিন কি করে বলতো, সন্ধ্যায় চিকনাদের বাড়িতে যায় একটু টিভি দেখার জন্য।
আমি গুম হয়ে কিছুক্ষণ বসে রইলাম। কাকীমার দিকে তাকিয়ে বললাম, পান্তা খেয়ে বেরোব।
সেকিরে মেয়েটা তোর জন্য সেই সাত সকাল থেকে রান্না করলো।
নীপার দিকে তাকালাম, ওর মুখটা কেমন থমথমে।
ঠিক আছে, আমি স্নান সেরে আসি ওরা এসে পরবে এখুনি।
আমি ওবাড়ি হয়ে পুকুর ঘাটে চলে গেলাম। স্নান সেরে ঘরে এসে দেখি নীপা দাঁড়িয়ে আছে খাটের কাছে। কি যেন করছে। আমাকে দেখেই মুখটা গম্ভীর করে নিল। আমি বললাম কি হলো আবার।
কি হয় নি তাই বলো।
আমি ওর দিকে তাকালাম।
তুমি যে এরি মধ্যে এতো সব প্ল্যান ভেঁজেছো আমাকে জানিয়েছো।
সময় পেলাম কোথায়।
কেনো কাল থেকে সময় পাও নি।
হাসলাম।
আমি কি তোমার কেউ নই।
কে বলেছে তুমি কেউ নও।
তাহলে।
আচ্ছা আচ্ছা ঘাট হয়েছে।
আমায় একটা জিনসের পেন্ট আর গেঞ্জি এগিয়ে দিল।
আমি বললাম এটা নয় পাজামা পাঞ্জাবী দাও। এগুলো কলকাতার জন্য।
না।
কেনো।
এটা পরলে তোমাকে দারুন স্মার্ট লাগে।
হাসলাম। দাও।
জাঙ্গিয়াটা পরতে গিয়ে ওর দিকে তাকালাম। ও হাসছে।
তুমি যাও।
ভেবেছিলাম তোমার সঙ্গে কথাই বলব না।
সে কি!
নীপা বেরিয়ে গেলো। আমি জামা পেন্ট গলিয়ে নিলাম।
আসবো।
এসো।
নীপা ভেতরে এলো। ওর চোখ মুখ বলছে কিছু বলবে আমায়। উসখুস করছে অনেকক্ষণ থেকে।
অনিদা তোমায় একটা কথা বলবো।
বলো।
কালকে আমি খুব বড় একটা অন্যায় করে ফেলেছি।
না। তুমি কোনো অন্যায় করো নি।
একথা বলছো কেনো।
তুমি করো নি। তোমার বয়সটা করেছে।
তুমি আমাকে খুব খারাপ মেয়ে ভাবলে।
একবারেই না।
কিজানি তখন কিযে হলো।
দেখো নীপা ওটা বয়সের ধর্ম। আমার জায়গায় অন্য কেউ হলে তোমায় গ্রহণ করতো।
নীপা আমার কাছে এসে মুখ নীচু করে দাঁড়ালো। আমাকে ক্ষমা করে দাও অনিদা।
আমি ওর কাঁধে হাত রাখলাম। নীপা মাথ নীচু করে আছে। আমি ওর চিবুকটাধরে মুখটা তুললাম। চোখের পাতা দুটো চিক চিক করছে। আমি ওর চোখের পাতায় আঙুল দিয়ে মুছিয়ে দিলাম।
জানোনা অনিদা মেসো মনিমা গ্রামের সকলের কাছে তোমার কথা শুনে শুনে খালি ভাবতাম তুমি আমার আর কারুর নয়। আমায় যদি তোমার জন্য আবাহমান কাল বসে থাকতে হয় বসে থাকবো। কিন্তু তুমি আমার।
আমি তো তোমার। একথা ভুল নয়। এই তো তোমার সামনে দাঁড়িয়ে আছি।
নীপা আমার দিকে চোখ মেলে তাকালো। ওর ডাগর চোখে অনেক জিজ্ঞাসা।
একদিন তোমার ভুল ভাঙবে নীপা। তখন দেখবে আমি যা করেছি ঠিক করেছি।
নীপা আমাকে জড়িয়ে ধরলো।
তুমি কখনো আমাদের ছেড়ে যাবে না।
কেনো যাবো!
নীপা আমাকে জড়িয়ে ধরে বেশ কিছুক্ষণ কাঁদলো। আমার ওর গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে অনেক করে বোজালাম। নীপা আমাকে ছারলো।
আমি মিটসেফের কাছে গিয়ে আয়না চিরুনিটা নিয়ে চুলটা কোনোপ্রকারে আঁচড়ালাম। নীপা আমায় তাড়িয়ে তাড়িয়ে দেখছে।
কি দেখছো।
তোমাকে যত দেখছি হিংসে হচ্ছে।
কেনো।
আজ যারা এই বাড়িতে এসেছিল জানো তারা কেউ এই কয় বছরে আসে নি। একমাত্র চিকনাদা ছাড়া।
জানি। ওরা তা স্বীকার করেছে।
তাও ওদের সঙ্গে তুমি রিলেসন রাখবে।
পৃথিবীতে একটা পিঁপরের কিছু না কিছু অবদান আছে।
রাখো তোমার তত্ব কথা।
এবার দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে।
নীপা আমাকে আবার জড়িয়ে ধরে ঝড় ঝড় করে কেঁদে উঠলো। তুমি কিছুদিন আগে আসনি কেন অনিদা। তাহলে আমাদের এই অবস্থা হতো না।
ঠিক আছে ঠিক আছে। আমিতো এসে গেছি। এবার দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে।
নীপার কান্না থামে না।
আমি ভীষণ অপ্রস্তুতে পরে গেলাম। নীপা কাঁদুক, কিছুক্ষণ কাঁদলে ও বরং হাল্কা হবে। নীপার চোখের জলে আমার বুক ভিঁজেছে। আমি ওর চোখ মুছিয়ে দিলাম। এবার চলো।

ওরা ঠিক সময়ে চলে এসেছে। আমি ওদের সঙ্গে বেরিয়ে পরলাম। আমি বাসুর বাইকে বসেছি। যেতে যেতে টুকরো টুকরো অনেক কথা হলো। এও জানলাম বাসুর দোকানে কাকার প্রায় হাজার পাঁচেক টাকা ধার আছে। বাসুকে বললাম এখানে এসবিআই-এর এটিএম আছেরে। ও বললো আছে। আমি বললাম তুই প্রথমে ওখানে আমাকে একবার দাঁড় করাবি। তারপর নার্সিংহোমে যাব। ও বললো ঠিক আছে।
এটিএম থেকে একবারে টাকা তুলতে দিল না। পাঁচবারে পঞ্চাশ হাজার টাকা তুললাম। নিয়ে এসেছিলাম দশ হাজার টাকা। বেশ কিছু টাকা খরচ হয়েছে। কি আর করা যাবে। নার্সিংহোমে পৌঁছলাম প্রায় দেড়টা নাগাদ। ওখানে সব কাজ মিটতে মিটতে প্রায় সাড়ে তিনটে বাজলো।
অনাদির সঙ্গে বেশ চেনা পরিচয় আছে দেখলাম। আমার কোন পরিচয় এখানে দিলাম না। ওদেরও বারন করে দিয়েছিলাম। নার্সিংহোমে পঁচিশ হাজার টাকা জমা দিলাম। এরপর ভানু গাড়ির ব্যবস্থা করলো। দুখানা টাটা সুমো, ওখানে টাকা মেটালাম। মোবাইলের টাওয়ারটা দেখলাম বেশ ভালো। অমিতাভদাকে ফোন করে সব জানালাম। অমিতাভদা বড়মাকে দিলেন। আমি বড়মার সঙ্গে কথা বললাম।
বড়মার এক কথা আমি যাব, তুই না করিস না। বহুবার বারন করলাম, শুনল না, বাধ্য হয়ে ঠিকানা পত্র সব দিলাম। এরপর মিত্রাকে ফোন করলাম, মিত্রাকে সব জানালাম, ওকেও বললাম, এসে কি করবি, শুধু শুধু এতদূরে আসবি, আবার ফিরতে হবে তো।
কিছুতেই আমার কথা শুনল না, বাধ্য হয়ে বললাম, বড়মারা আসবে, তুই বড়মার সঙ্গে চলে আয়। আর যখন আসবি আমার একটা উপকার কর।
বল কি করবো, তুই আমার জন্য একটা মোবাইল কিনে আনিস, এই মোবাইলটা কাকার কাছে রেখে যাবো। আমি এখান থেকে একটা সিম কার্ড নিয়ে নিচ্ছি। আসার সময় মোবাইলটা ফুল চার্জ দিয়ে নিয়ে আসবি।
এতোক্ষণ খেয়াল করিনি বাসু আমার পাশে দাঁড়িয়ে, ও অবাক হয়ে আমার কথা শুনছিল। ওর চোখে বিস্ময়।
হ্যাঁরে অনি, বড়মা কে !
ওকে সব বললাম, শুনে তো ওর মাথা খারাপ।
জিজ্ঞাসা করলো, মিত্রা ?
বললাম সব কথা। হাসতে হাসতে বললো, তুই শালা তোর মালকিনকে তুই তুই করে বলছিস।
কি করব বল, ভাগ্যচক্রে ওর সঙ্গে আমি এক সাথে পড়াশুনো করেছি।
উরি শালা তুই তো বড়গাছে মই বেঁধেছিস।
আমি বললাম নারে, ও বিবাহিত ওর স্বামী এশিয়ার রিনাউন্ড একজন ডাক্তার।
শুনে ওরা থ। কথাটা ভানু অনাদি সঞ্জীবের কাছে পৌঁছতে বেশিক্ষণ সময় লাগল না। ওরা তো এই মারে সেই মারে।
অনাদি বললো তুই শালা কিরে, নীলকন্ঠ।
আমি হাসলাম।
সঞ্জীবকে বললাম, তুই তো ইলেকট্রনিকসের ব্যবসা করছিস আমায় একটা সিম জোগাড় করে দে না।
কেনো।
দরকার আছে।
তোরতো আছে।
কাকাকে দিয়ে যাব।
সেট।
ওইতো আনতে বলে দিলাম। কাল এসে যাবে।
তোরটা কি ?
এন নাইনটি ফাইভ ।
আরি বাবা এই তল্লাটে কারুর নেই। চল আমার বস মগার দোকানে।
সেটা আবার কে ?
আমার মহাজন। আমি কলকাতা যাই না, ওর কাছ থেকেই মালপত্র নিয়ে যাই।
কলকাতা থকে মাল নিয়ে এসে ব্যবসা করতে পারিস। আমি ঠেক গুলো সব চিনিয়ে দেবো। দেখবি দুটো পয়সার মুখ দেখতে পারবি।
বুঝলি অনি ক্যাপিটেল চাই।
সেতো মহাজন দেবে।
কি বলছিস তুই।
হ্যাঁ। তোকে মাল পাঠাবে তুই যদি ঠিক ঠিক বিক্রি করে পয়সা দিস, আর কোন অসুবিধা নেই। ধান্দা ভালো।
ঠিক আছে তোর কাজ মিটুক বসে কথা বলা যাবে।
ওর বস মগার দোকানে এলাম। সঞ্জীব প্রথমেই ট্রাম্প কার্ড খেললো।
মগাদা এই সেই বিখ্যাত অনি।
উনি চেয়ার ছেড় উঠে দাঁড়ালেন। জোড় হাত করে নমস্কার করলেন।
বসুন বসুন আপনার লেখাতো কাগজে পরি, তাছাড়া সঞ্জীবের মুখ থেকে আপনার অনেক কথা শুনেছি। ভদ্রলোক একেবারে গদ গদ।
সঞ্জীব বললো একটা সিম চাই অনির, আমাদের এখানে যার টাওয়ার সবচেয়ে ভালো সেটা দাও।
কার নামে হবে।
ক্রমশঃ

জীবনে জীবন যোগ না করলে ব্যার্থ হয় গানের পসরা

৩৫

Re: কাজলদীঘি, শ্মশান ও পীরসাহেবের থান

চালিয়ে যান,(y)  আর পরবর্তী আপডেট গুলোও একটু করে ছাড়েন।:x অপেক্ষা সহ্য হয় না। ghusi

রক্তের গ্রুপ AB+

microqatar'এর ওয়েবসাইট

লেখাটি GPL v3 এর অধীনে প্রকাশিত

৩৬

Re: কাজলদীঘি, শ্মশান ও পীরসাহেবের থান

microqatar লিখেছেন:

চালিয়ে যান,(y)  আর পরবর্তী আপডেট গুলোও একটু করে ছাড়েন।:x অপেক্ষা সহ্য হয় না। ghusi

কাজলদীঘি, শ্মশান ও পীরসাহেবের থান পুরোটা ওনার সাইট এ আছে । আমি আর সহ্য করতে না পেরে, গতকাল ডাউনলোড ( পি ডি এফ) করে নিয়ে প্রায় পুরোটা পড়ে ফেলেছি । অনেক অনেক বড় । রাত ৩ টা পর্যন্ত পড়ে ঘুমিয়েছি । শেষ হয়নি । ২ টা পার্ট বাকি আছে । এখানে পড়তে থাকলে শেষ করতে অনেকদিন লাগবে ।


mamonjafran লিখেছেন:

আমার এই লেখার পাঠক পাঠিকারা যারা এই লেখার শেষ অংশ খুব তাড়াতাড়ি পরতে চান তাঁরা http://www.bengalilibrary.org/index.php … ;Itemid=10 এই সাইটের creative corner-এ ঘাই মারতে পারেন।

"I know not with what weapons World War III will be fought, but World War IV
will be fought with sticks and stones."
    -Albert Einstein

৩৭

Re: কাজলদীঘি, শ্মশান ও পীরসাহেবের থান

স্যারের নামে।
ওর যে কিছু কাগজপত্র চাই।
কি লাগবে।
ভোটার আইডি, এ্যাড্রেস প্রুফ।
সে তোমাকে অনাদি দিয়ে দেবে।
ঠিক আছে।
সেট।
কলকাতা থেকে আসছে।
কেনো। আমার কাছে তো আছে, কলকাতার দামেই.....।
যে সেট ওর দরকার তা তোমার কাছে নেই।
কি।
ব্ল্যাক বেরি।
আমার কাছে নেই।
এ্যাকটিভেসন কি আজ হয়ে যাবে। আমি বললাম।
হ্যাঁ রাতের দিকে আপনি একটা ম্যাসেজ পাবেন।
ঠিক আছে।
কাজ শেষ হতে হতে প্রায় পাঁচটা বেজে গেলো, চকে এসে পৌঁছলাম পৌনে ছটা নাগাদ। পরিদার দোকানে আড্ডা। পরিদার সঙ্গে দেখা হলো। সেই ছেলেটি আজ আমায় দেখে চিনে ফললো। আরো অনেকে এলো। যারা আমার লেখার ফ্যান। বেশ উপভোগ করছিলাম ব্যাপারটা। ওখানে বসে কাল সকালের সমস্ত ব্যাপার চক আউট করে নিলাম। দুটো গাড়ি তিনটে বাইক। আমি অনাদির হাতে টাকা দিলাম। তেল কেনার জন্য। সঞ্জীব তেরে খিস্তি করলো, টাকা ফেরত নিয়ে নিলাম। সঞ্জীব আমার কানের কাছে এসে বললো, খবর এলো, তোর বাড়িত টিভি লাগানো হয়ে গেছে। আমার পোলাটা এখনো ঘন্টা খানেক তোর ওখানে থাকবে। ট্রেনিং পর্বো চলছে।
আমি সঞ্জীবের দিকে তাকালাম। তুই এতো প্রম্পট জানতাম না।
ও হাসলো।
তোর টাকাটা।
তোর কাজ শেষ হোক, তারপর দিস।
ঠিক আছে।
সবাই এক সঙ্গে বেরোলাম। আমি অনাদির বাইকে উঠলাম।
চারিদিক অন্ধকার, জ্যোতস্না রাত বিশেষ কিছু অসুবিধা হচ্ছে না। অনাদি আমাকে টেস্ট রিলিফের বাঁধের কাছে নামালো।
আমি অনাদির গাড়ি থেকে নামলাম।
সারাদিন তোর সঙ্গে থাকলাম, তুই একটা কথা আমাকে বললি না।
কি।
সকালে তুই আমার বাড়ি গেছিলি।
হ্যাঁ। লজ্জা পেয়ে গেলাম।
তুই কাঞ্চনকে চিনতে পারিস নি।
কাঞ্চন!
শালা, সামন্ত ঘরের কাঞ্চন। উনামাস্টারের কাছে পোরতো।
হ্যাঁ হ্যাঁ মনে পোরেছে, আমাদের থেকে কয়েক ক্লাস জুনিয়র ছিল।
হ্যাঁ। তুই এককাপ চাও খাস নি।
অনাদিকে জড়িয়ে ধরলাম, আমি কাকাকে কথা দিয়েছি, একদিন গিয়ে চা খেয়ে আসবো।
হ্যাঁ বাবা বলেছেন। বাবা তোর আগেকার কথা বলতে বলতে কেঁদে ফেলেছিলেন।
আমি মাথা নীচু করলাম।
তোকে এই গ্রামের সকলে ভালবাসে।
দেখছি তাই। আমি কি সেই ভালবাসার মর্যাদা রাখতে পারবো।
কেন পারবি না। তুই আমাদের গর্ব। সঞ্জীব তখন মিথ্যে কথা বলে নি।
আমি অনাদির চোখে চোখ রাখলাম।
কাঞ্চনকে একটু যত্ন নে। মরচে পরে গেছে।
তুই বলিশ গিয়ে।
হাসলাম।
হ্যাঁরে তুই বললে কাজ হবে।
আচ্ছা কাকার ব্যাপারটা মিটুক। যাব।
অনাদি চলে গেলো।
সন্ধ্যে হয়ে গেছে। দূরের ঘর গুলোয় এখনও লম্ফ জলে। কারুর কারুর ঘরে লাইট জলছে। তাও মিট মিট করে। জ্যোতস্না রাতটা দারুন সুন্দর লাগছে। আগামী সপ্তাহে পূর্ণিমা। কাকা যদি পূর্ণিমার চাঁদ দেখতে পায় তাহলে আমার এই পরিশ্রম সার্থক। আরো কত কথা মনে পরছে, সত্যি কলকাতা আমায় এই ভাবে কখনো আপন করে নেয় নি। নেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু কলকাতাই আজ আমাকে এই আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছে, আর অমিতাভদার কথা মনে পরছে, উনি না থাকলে আজ কোথায় ভেসে যেতাম।
বড়মা আমার মায়ের থেকেও বড়। কাকে বাদ দিয়ে কাকে ছাড়ব। কখন যে বাড়ির গেটের কাছে পৌঁছে গেছি জানি না। দরজাটা হালকা করে ভেজানো। একটু টানলে খুলে যায়। আমি খুব সন্তর্পনে দরজাটা খুলে ভেতরে এলাম। মনে হচ্ছে ওপরে কেউ আছে। ঘরের লাইটটা জ্বলছে। আমি আস্তে আস্তে সিঁড়ি দিয়ে উঠলাম। ঘরের ভেতরে উঁকি মারতেই অবাক হলাম। নীপা আমার জিনসের পেন্ট গেঞ্জি পরে বড় আলমারির সামনে যে আয়নাটা আছে, তার সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নাচ প্রেকটিশ করছে। নীপাকে দেখতে দারুন সুন্দর লাগছে, আমার গেঞ্জিটা ওর বুকে বেশ টাইট। আমি কোন শব্দ করলাম না, নীপা গুণ গুণ করে গান গাইছে। কোন একটা পপুলার হিন্দী গানের সুর। মনে হচ্ছে ছুটে গিয়ে ওকে জাপ্টে ধরে একটু চটকা চটকি করি। সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে সামলে নিলাম, অনি কেনো তুমি এসব কথা চিন্তা করছো। এটা ঠিক নয়, লোভ সংবরণ কর, নিজেকে সেই উচ্চতায় নিয়ে যাও।
আমি ঠায় দাঁড়িয়ে আছি, মাঝে মাঝে নীপা হাতদুটো ওপরে তুলে শরীরে হিল্লোল তুলছে। গেঞ্জিটা কোমর থেকে সামান্য উঠে যাচ্ছে। অনাবৃত অংশে ভাঁজ পরছে। ঘরের মধ্যে এলাম। আমাকে দেখে নীপা ভীষণ লজ্জা পেয়ে গেলো। ও বুঝতে পারে নি আমি এই সময় হঠাত চলে আসতে পারি। হাত দিয়ে মুখ ঢাকছে। ও আলমারীর পাশে গিয়ে লুকোনোর চেষ্টা করলো।
নীপা এই নীপা, নীচে এক মহিলার কন্ঠস্বর পেলাম।
কি হয়েছে মা।
অনিকে দেখেছিস।
অনিদাতো সেই দুপুরে বেরিয়েছে।
সেতো আমি জানি।
ফিরে এসেছে ?
হ্যাঁ। দিবাকর এসেছে। কি দরকার।
তাহলে দেখো আবার কোন বোন বাদারে গিয়ে বসে আছে।
তুই কি করছিস ওপরে।
নাচ প্র্যাকটিস করছি।
অনি এলে ওকে একবার ওবাড়িতে পাঠাস।
আচ্ছা।
নীপা খাট থেকে নেমে কোমরে হাত দিয়ে আমার দিকে কট কট করে তাকালো।
আমি খিল খিল করে হাসছি।
এখুনি একটা বিপদ ডেকে আনছিলে।
আমি ওর দিকে তাকালাম।
শোন সামনের দরজা দিয়ে নয় পেছনের দরজা দিয়ে বেরোও। তারপর বাকিটা তুমি ম্যানেজ করবে। বারান্দায় অনেক লোকের ভিড়। সবাই তোমার কীর্তি কলাপ দেখছে।
আমার কীর্তি কলাপ।
হ্যাঁ। কাকা বলেছে, আর টিভি চলে এলো।
হাসলাম।
আমি নীচে নেমে এসে খিড়কি দরজা দিয়ে বেরোলাম। চারিদিক ঘুটঘুটে অন্ধকার। স্টেশনের ওখান থেকে দু’প্যাকেট সিগারেট কিনে এনেছি। চাঁদের আলো বাঁশ ঝাড়ের ফাঁক ফোঁকর দিয়ে নীচে এসে পরেছে। জানাকি গুলোর আলো নিভছে জ্বলছে। একটা স্বপ্নিল পরিবেশ। পানা পুকুরের ধারে একটা বাঁশঝাড়ের তলায় শুকনো পাতার ওপর বসলাম। একটা সিগারেট ধরালাম। ঝিঁ ঝিঁ পোকার তারস্বর ডাক। আকাশটা পুকুরর জলে হুমড়ি খেয়ে পরেছে। পুকুরের স্থির জলের দিকে তাকিয়ে আমি তারা গুনলাম। কলকাতার আকাশে এত তারা দেখা যায় না। হঠাত একটা স্বর স্বর আওয়াজে চমকে তাকালাম। একটা সাপ বাঁশ গাছ থেকে নেমে পাশ দিয়ে চলে গেলো। একটু ভয় পেয়ে গেলাম। যতই আমি গ্রামের ছেলে হই আজ দশ বছর কলকাতায় আছি। না থাকাটা ঠিক নয়। পায়ে পায়ে পেছনের পথ ধরে বারান্দায় এলাম। ওখানে তখন তারস্বরে টিভি চলছে। একটি ছেলে টিভির সামনে বসে আছে। বাকি সবাই টিভির দিকে মুখ করে।
ওখানে তখন হুলুস্থূলুস কান্ড একদিকে টিভি, আর একদিকে দিবাকরকে সবাই গাল মন্দ করছে। এমন কি নীপাও ছেরে কথা বলছে না। দিবাকার বার বার বোঝাবার চেষ্টা করছে। ও অনাদির সঙ্গে এসেছে। তবু কে বোঝে কার কথা। অনাদিরও শ্রাদ্ধ শান্তির ব্যবস্থা চলছে। আমাকে দেখে সকলে চুপ। নীপা গলা চড়িয়ে বললো কোথায় যাওয়া হয় শুনি। বাড়িতে লোকজন বলেতো কিছু আছে।
আমি আস্তে আস্তে বেঞ্চের ওপর এসে বসলাম।
দেখছিসতো আমার অবস্থা।
কি হয়েছে।
তুই ফিরিস নি।
কাকা কোথায়।
তোকে খুঁজতে খামারে গিয়ে বসে আছে।
আমি উঠে গেলাম, খামারে গিয়ে কাকাকে নিয়ে এলাম।
কোথায় গেছিলি ?
হারুজানার কালাতে।
ওখানে কি করতে গেছিলি।
দেখতে।
এই রাতর বেলা! জায়গাটা ভাল নয়।
ঠিক আছে আর যাবো না।
কাকা বারান্দায় এসে নিজের চেয়ারে বসলেন।
দেখেছো আমার ভাইপোর হাল, কোথায় দীঘাআড়ি কোথায় হারু জানার কালা, এই সব করে বেরাচ্ছে সকাল থেকে।
আমি কাকার কথায় কান দিলাম না।
কাকীমার দিকে তাকিয়ে বললাম, একটু চা খাওয়াবে।
কেন কাকীমা বুঝি চা দেন, এইবার থেকে কাকীমাই দেবেন। নীপা বললো।
আমি চুপচাপ থাকলাম। দিবাকরকে জিজ্ঞাসা করলাম কি হয়েছেরে।
একটু খামারে চল।
আমি ওর সঙ্গে পায়ে পায়ে এলাম।
তোকে একটা কথা বলি, মনে কিছু করিস না।
কি হয়েছে বলবিতো।
কাল আমি যেতে পারবো না।
ঠিক আছে, তাতে কি আছে, ওরাতো আছে।
আচ্ছা।
দিবাকর চলে গেলো।
আজকের আসরটা তাড়াতাড়ি ভেঙে দিলাম। সঞ্জীবের ছেলেটি সব গুছিয়ে তুলে রাখলো। বললাম কাল আসিস একটু সন্ধ্যে বেলায়, লাগিয়ে দিস।
কাকা বললো, না ঘরেরে ভেতর জায়গা করেছে তোর কাকীমা এখুনি লাগিয়ে দিক।
আমি ওকে ইশারায় তাই করতে বললাম, ও সবকিছু ঠিকঠাক করে চলে গেলো।
রাতে খাওয়ার সময় কাকাকে সব বললাম, কাকা বললেন দু’দিন পরে করলে হোতো না। আমি বললাম না। আমি সব ব্যবস্থা করে ফেলেছি।
কাকীমা বললেন হ্যাঁরে অনি তুই সবার জন্য অতো জামাকাপড় কিনেছিস কেনো।
আমি কাকীমার দিকে তাকালাম। পছন্দ হয় নি।
হ্যাঁ।
তাহলে।
অতো দাম দিয়ে কিনতে গেলি কেন।
জীবনে এই প্রথম তোমাদের কিছু দিলাম। দামের কথা জানি না।
নীপা আমার দিকে তাকালো।
কালকে একটা পরে যেও।
কেনো।
আমার ভালো লাগবে।
ঠিক আছে।
নীপা বলেদেবে কোনটা পরে যাবে।
কাকীমা কোন কথা বললো না।
সবাই চুপচাপ।
কাকীমা সকালের সেই চিংড়িমাছের টক একটু পাওয়া যাবে।
কাকীমা আমার দিকে তাকালেন, নীপার জালায় কিছু রাখার জো আছে।
নীপা গম্ভীর হয়ে গেলো।
আমি হাসলাম।
তাড়াতাড়ি খেয়ে উঠে পরলাম। ওঠার আগে বললাম, কালকে অনেক সকালে উঠতে হবে ওখানে সাতটার মধ্যে পোঁছনোর কথা।
কাকা বললেন, বাড়িতে কে থাকবে ?
তোমাকে ও নিয়ে ব্যস্তহতে হবে না। আমি সব ব্যবস্থা করে দিয়েছি।
বেশ। তাই হবে।
আমি মুখ ধুয়ে চলে এলাম। নীপা প্রায় একঘন্টা পরে এলো।
আজ ওর পরনে সালোয়ার কামিজ। যেটা পরে খেতে বসেছিল সেটাই পরা রয়েছে। একটু অবাক হলাম। আমি আজ নীপার কথা মতো খাটের এক কোনে রাখা একটা পাটভাঙা ধুতি আর গেঞ্জি পরেছি। জানিনা এটা কার। তবে কাকার নয় এটা বুঝলাম। আমি পাশ ফিরে শুয়ে পরলাম। নীপা কোন কথা বললো না। বুঝলাম নিশব্দে ও কিছু কাজ করছে। বাইরে বেরিয়া গেলো। নীচের দরজায় ছিটকিনি দেওয়ার শব্দ পেলাম। সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসারও শব্দ পেলাম। বাইরের বারান্দায় বিছনা করারা শব্দ পেলাম। আমি শুয়ে আছি।
কি বাবু ঘুমিয়ে পরলেন নাকি। আমি কোন কথা বললাম না। মাথাটা আজও যন্ত্রনা করছে। না নীপাকে বলা যাবে না। আমিও একটা মানুষ। তনুর সঙ্গে একবার ভুল করে ফেলেছি। আর নয়। কিন্তু কেন বার বার আমার সঙ্গেই এরকম ঘটনা ঘটবে। আমিতো চাই না। জীবনের শুরু সৌমি পূনিকে দিয়ে। তাদেরও আমি চাই নি। দূর যত সব বাজে চিন্তা। অনি তুমি ঘুমিয়ে পরো।
সারাদিন বেশ ধকল গেছে। নীপার কোনো সাড়াশব্দ নেই। লাইটটা নিভে গেলো। ঘরটা আধো অন্ধকার। কারেন্ট চলে গেলো নাকি। বুঝতে পারলাম না। সাত পাঁচ ভবতে ভাবতে পাশ ফিরলাম।
ডিমলাইটটা মিটি মিটি জলছে। নীপা মিটসেফের কাছে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াচ্ছে। একটা নাইটি পরেছে, অপূর্ব মানিয়েছে। মিত্রাকে এই ধরনের একটা নাইটি পরতে দেখেছি। কিন্তু মিত্রা নীপা দুজনে এক নয়। নীপাকে এই মুহূর্তে রাত পরির মতো লাগছে। এই আবঝা অন্ধকারেও বেশ পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি নীপার কপালে চাঁদের মতো বিন্দির টিপ। গাঢ় মেরুণ কালারের। ঠোঁটে লিপস্টিকের প্রলেপ। তাও আবার হাইলাইট করা। চোখের পাতায় রং। চোখগুলো স্বাভাবিকের তুলনায় বেশ বর লাগছে। নীপা সাজেনি তবু যেন সেজেছে। পরনের নাইটিটা ওকে এই মুহূর্তে স্বপ্নিল করে তুলেছে। এলো চুলের রাশি পিঠময় ছড়িয়ে পরেছে। দুটো ফিতের ওপর নাইটিটা ওর কাঁধ থেকে ঝুলে পরেছে। বুকটা প্রায় অনাবৃত। আমার চোখের পলক পরছে না। কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছি না। নীপা এই কানা রাতে সাজতে গেলো কেনো। তাও আমার ঘরে দাঁড়িয়ে। তাহলে কি আজকে ও জোড় করে! মেয়েদের মন বোঝা সত্যি মুস্কিল। লাইটটা হঠাত জলে উঠলো।
বুঝলাম সত্যি কারেন্ট গেছিলো। একটু আগে ডিম লাইটের আধা অন্ধকারে নীপার রূপ দেখেছি, এখন পূর্ণ আলোয়, নীপার রূপ যেন ঠিকরে বেরোচ্ছে।
কি কিছু বলছো না যে।
চুপ করে রইলাম। আমার চোখের ভাষা নীপা বোঝার চেষ্টা করছে।
ভাবছো নীপাটা কি পাগল। এই কানা রাতে....ধ্যুস। তোমরা নাকি লেখক, মানুষের মন নিয়ে কারবার করো।
মনে পরে গেলো আমার এক সিনিয়ার লেখকের কথা, খিস্তি দিয়ে আমাকে বলেছিলেন, কটা মেয়ের সঙ্গে রাত কাটিয়েছিস। কটা মেয়ের সঙ্গে সঙ্গম করেছিস। নিত্য নতুন মেয়ের সঙ্গে সঙ্গ কর। তাদের সঙ্গে মেশ। ওদের মনের গভীরে ডুব দে। পারলে সঙ্গম কর। মেয়েরা যতক্ষোণ তোর উরুর তলায় ততক্ষণ তোর। যেই তোর উরুর থেকে উঠবে তোর নয়। ওরে ওরা মায়াবিনী সমুদ্রের মতো তল খুঁজে পাবি না। তখন দেখবি লেখা আপনা থেকেই তোর হাত থেকে বেরোচ্ছে। তুই লিখছিস না। লেখা নিজে থেকেই লিখছে।
না নীপা আমি লেখক নই, সাংবাদিক।
ওই হলো। লিখতে গেলেও ফিলিংস লাগে।
অস্বীকার করছি না।
এই নাইটিটা আজ তোমার পয়সায় কিনে এনেছি।
ওর দিকে তাকালাম।
অনেক দিনের সখ ছিল। পছন্দ।
আস্তে আস্তে ঘার দোলালাম। হঠাত মিত্রার মাথায় এরকম ভূত চাপল কেনো ? তাহলেকি কালকের ব্যাপারটা ও ঠিক মেনে নিতে পারে নি, আমার সামনে প্রলভনের হাতছানি ?
আমি ওর দিকে তাকিয়ে আছি।
ও আস্তে আস্তে মিটসেফের কাছে গিয়ে ঘুরে দাঁড়ালো।
মিট সেফে হেলান দিয়ে কোমর ভেঙে দাঁড়ালো। আমার দিকে তাকালো। নীপা চোখ দিয়ে হাসছে। অনিদা আজ আমার জন্ম দিন। আজ আমি সাবালক হলাম। এতদিন আমার কেউ জন্মদিন পালন করে নি। বলতে পারো সে সুযোগ বা সামর্থ আমাদের ছিল না। কাল তোমার কথা শোনার পর লোভ সামলাতে পারলাম না। আমি নিজে হাতে এগুলো কিনে এনেছি। মা জানে না। নীপা মাথা নীচুকরল। 
ধরা গলায় বললো, অনিদা তুমি রাগ করনিতো। নীপার চোখ দিয়ে টপ টপ করে জল পরছে।
আমি শুধু বিস্মিত নই, কয়েক সেকেন্ড স্থানুর মতো বসে রইলাম। দাঁড়াও বলে আমি মিটসেফের কাছে এগিয়ে গেলাম।  পেন্টেরপকেট থেকে সিম কার্ডটা বার করলাম। আমার মোবাইলটা খুলে ফেললাম। নতুন সিম কার্ডটা ভরে অন করতেই সুন্দর একটা গান বেজে উঠলো। ম্যাসেজ ঢুকলো তার মানে নীপার কার্ডটা এ্যাকটিভেট হয়ে গেছে। নীপা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমার কীর্তিকলাপ দেখল। আমি ধীর পায়ে ওর দিকে এগিয়ে গেলাম। এই নাও আমার তরফ থেকে তোমার ক্ষুদ্র উপহার। হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ।
নীপা ফুঁপিয়ে ফুঁফিয়ে কাঁদছে। আমি ওর মাথায় হাত রাখলাম। কাঁদে না। আজ আনন্দের দিন। আমি তোমার বার্থডে সেলিব্রেট করছি। নাও ধরো।
যাঃ।
সত্যি।
তোমার মোবাইল আমি নেবো কেনো।
এটা আমার নয়, আজ থেকে তোমার।
সত্যি বলছো।
হ্যাঁ।
ওকে সমস্ত ঘটনাটা বললাম, ওর চোখের পাতা আরো ভারি হয়ে এলো। তুমি আমাদের জন্য এতো ভাবো।
এতদিন ভাবিনি। এখন ভাবছি।
নীপা আমাকে জড়িয়ে ধরলো, জানো অনিদা তুমি আমাদের কাছে দেবদূত।
কেনো।
মশাই ভাবতে পারে নি তিনি চোখে আবার দেখতে পাবেন।
আমি অনেক ভুল করেছি নীপা বিশ্বাস করো। এই ভুলের কোনো ক্ষমা নেই। আমাকে আমার এই ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে।
নীপা আমার বুকে মাথা রেখে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।
অনেকক্ষণ পর কান্না থামিয়ে, কান্নাহাসি মাখা সুরে বললো।
আজ তুমি সকালে কি করেছো।
কখন।
সকাল বেলা।
না কিছু না।
দুপুরে এক দঙ্গল বাচ্চা এসেছিলো তোমায় খুঁজতে। ওরা সব হাঁড়িপাড়া, কামারপাড়া, ভাটপাড়ার ছেলে।
কেনো।
তোমায় আঁখ খাওয়াতে এসেছিলো।
হেসেফেললাম, সকালের কথাটা মনে পরে গেলো।
বুড়ো বয়সে যদি হাত-পা ভাঙতে কে দেখতো।
তুমি।
নীপা আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
আমি হাসলাম।
আবার ম্যাসেজ এলো দেখো। নীপা মোবাইলটা আমার সামনে তুলে ধরলো।
ভালোইতো তুমি এখন মোবাইল মেন।
আমাকে একটু শিখিয়ে দেবে না।
দেবো।
টিভির ব্যাপারটা।
কি!
টিভিটা নেকু।
ওইতো ঠিক আছে। এক ঢিলে সব পাখি মারলাম।
জানো অনিদা, এই সঞ্জীবদাকে মশাই আজ থেকে একবছর আগে টিভির কথা বলেছিলো। মশাই বলেছিলো আস্তে আস্তে পয়সা দিয়ে দেবে। তারপর থেকে সঞ্জীবদা এই বাড়ির চৌকাঠ পর্যন্ত মারায় নি।
জানি।

জীবনে জীবন যোগ না করলে ব্যার্থ হয় গানের পসরা

৩৮

Re: কাজলদীঘি, শ্মশান ও পীরসাহেবের থান

তুমি সব জানো।
হ্যাঁ, জানতে হয়েছে।
আজ টিভি দেখে মশাইয়ের চোখে জল চলে এসেছিল। আমার খুব খারাপ লাগছিল। আবার ভীষণ আনন্দ লাগছিলো।
কেনো ?
এপাড়ায় সকলের মুখে ঝামা ঘষে দিয়েছি।
কি রকম।
আমাদের টিভিটা সবচেয়ে দামী এবং বরো।
আমি ওকে এই টিভিটাই দিতে বলেছিলাম।
কত দাম নিলো।
তুমি জেনে কি করবে।
বলোনা।
না।
মা সকাল বেলা কাপরগুলো দেখে কেঁদে ফলেছিলো। মনিমা বললেন কাঁদছিস কেনো। অন্য কেউ দেয় নি, অনি দিয়েছে। ওতো আমাদের ছেলে পেটে ধরিনি এই যা।
ঠিক বলেছেন কাকীমা।
নীপা আমার দিকে ডাগর চোখে তাকিয়ে।
কাকীমা আমার মার থেকেও বড়। মা জন্মদিয়েছিলেন। মনিকাকা-কাকীমা আমায় জীবন দিয়েছেন। আমিতাভদা-বড়মা আমায় কর্ম দিয়েছেন।
অনিদা তোমায় একটা জিনিষ দেখাবো। দেখবে।
মাথা নাড়লাম।
আমি ওর দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকালাম। নীপার কোন বিকার নেই। ও একটা প্যাকেট থেকে একটা পেন্টি আর ব্রেসিয়ার বার করলো। আমি ওর দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি। ব্রসিয়ারটার দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেলাম। প্লাসটিকের।
এটা কি প্লাসটিকের।
সত্যি অনিদা তুমি কি বলোতো।
হেসেফেললাম।
এগুলোকে ট্রান্সপারেন্ট ব্রা বলে।
আমি অবাক হয়ে ওর দিকে তাকালাম।
জানো অনিদা আমার কোন ভালো ব্রেসিয়ার নেই। এতদিন ইজের পরতাম। কোথাও প্রোগ্রাম থাকলে। শেলির কাছ থেকে পেন্টি চেয়ে পরতাম। আজ তোমার পয়সায় কিনেছি। নীপা সহজভাবে কথা বলে যাচ্ছে।
আমি নীপাকে দেখছি। ওর না পাওয়া বেদনাগুলো একদিন আমারও ছিল, কিন্তু আমি সেই বেদনা আমার বুকের মধ্যে গলা টিপে মেরে ফেলেছি। কাকার কাছে হাত পেতে কোন জিনিষ চাইতে পারি নি। যদিও আমার কোন কিছুর অভাব ছিল না। তবু কোথায় যেন আমি বড় একা ছিলাম। নীপার তবু বলার মতো একটা অনিদা আছে।
তোমায় অনেক বিরক্ত করলাম। নাও শুয়ে পরো কাল সকালে আবার উঠতে হবে। গুডনাইট। নীপা দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে চলেগেল ভেতর বারান্দায়।
আমি একা একা অনেকক্ষণ বোবার মতো শুয়ে থাকলাম। বার বার নীপার মুখটা ভসে আসছে ও সেজেছে। আমাকে ওর মনের না পাওয়া বেদনার কথা বলেছে। এর মধ্যে দিয়ে ও কি বার্তা পৌঁছে দিতে চায় আমাকে। নানা চিন্তা মাথার মধ্যে কিলবিল করছে। কখন ঘুমিয়ে পরেছি জানি না।

সবাই ঠিক ঠাক সময়ে এসেছে। খালি দিবাকর আসেনি। আমরা সকলে বারান্দায় বসে চা খাচ্ছি নীপা চা দিয়ে গেছে,  চিকনা বললো, হ্যাঁরে অনাদি দিবাকর কোথায়।
অনাদি বললো আমি কি জানি, কালকে সকলের সামনেইতো কথা হলো।
হারামী।
আমি চিকনার দিকে তাকলাম। কালকে ও আমাকে বলেগেছে আসতে পারবে না।
সরি, তুই বল অনি, আজকে ওর গাদন দেবার দরকার পরলো।
ওকি তোর কথা বুঝতে পারবে। সঞ্জীব বললো।
তাওতো ঠিক। ভানুর দিকে তাকিয়ে বললো, হ্যাঁরে গোরা এসেছে।
কাল রাত থেকে এখানে এসে বসে আছে।
আরও কয়েকট নতুন ছেলে এসেছে। আমি চিনতে পারলাম না, চিকনাকে বললাম ওরা কারা।
অনাদির কালেকসন।
আমি কথা বারালাম না। অনাদিকে বললাম বাড়িতে কারা থাকবে।
তোকে চিন্তা করতে হবে না।
ঠিক আছে।
গাড়িটা মোরাম রাস্তায় আছে। অনাদি বললো তিনটে বাইকে করে কাকীমা সুরমাসি কাকাকে পাঠিয়ে দিই তারপর আমরা যাবো।
তাই কর।
কয়েকজন হেঁটে চলে গেলো। আমি অনাদি, চিকনা, সঞ্জীব, বাসু বেঞ্চে বসে আছি। ওরা সবাইকে একে একে নিয়ে গেলো। নীপাকে বললাম, মোবাইলটা একটু দাও। নীপা মোবাইলটা দিয়ে গেলো। চিকনা বললো, কিরে তুই রেডি হলি না। নীপা বললো এখুনি হয়ে যাবে। নীপা ভেতরে চলে গেলো, আমি সঞ্জীবের দিকে তাকিয়ে বললাম, সিমটা খুলে এই সিমটা লাগা।
এ্যাকটিভেট হয়ে গেছে।
হ্যাঁ।
দেখছিস এই হচ্ছে সঞ্জীব।
চিকনা খিস্তি দিলো।
বুঝলি অনি এদের কাছ থেকে কোন দিন ভাল কাজ করে ভাল কথা শুনবি না, খালি খিস্তি খিস্তি। সঞ্জীব বললো।
আমি হাসলাম।
হায় হায় কত মিসকল।
কার।
তোর।
দেখি দে।
দেখলাম অনেক মিশ কল তার মধ্যে বড়মা মিত্রারও আছে। বুঝলাম ওরা বেরিয়ে পরেছে।
তোদের বাইক গুলো কে চালাবে।
কেনো।
ভাবছিলাম ওই ছেলে গুলো যদি বাইক গুলো নিয়ে যেতো তাহলে আমরা একটা গাড়িতে সবাই যেতাম।
বাসু আমার মনের কথা বুঝতে পারলো। ও অনাদিকে বললো বাইকে করে ওদের চলে যেতে বল। ভানুকে কাকার গাড়িতে বসতে বল। নীপা কি ওই গাড়িতে যাবে।
না। আমাদের সঙ্গে যাবে। আমি বললাম।
ঠিক আছে। চিকনা তোর বাইকটা।
পোঁদ পাকাটাকে দিস না, বিজনকে দে ।
বাসু বললো ঠিক আছে।
অনাদি বাসুর কথা মতো সব ব্যবস্থা করলো। নীপা আজ নতুন শালোয়ার পরেছে। বেশ সুন্দর দেখতে। চিকনের কাজের ওপর। বাসু যে এত সুন্দর শালোয়ার রাখতে পারে আমার জানা ছিল না। নীপাকে মানিয়েছেও বেশ। বাসন্তী কালারের ওপর বেদনা রংয়ের শুতো দিয়ে কাজ করা।
বহুত মাঞ্জা দিয়েছিস। চিকনা বললো।
নীপা চিকনার দিকে একবার তাকালো।
না দিদিভাই, অন্যায় হয়েছে, আর হবে না।
হ্যাঁরে সঞ্জু চিকনাটা সবার পেছনে লাগে...।
হারামী।
তোর বাপ ঘরামী।
ওঃ তোরা কি এখনো সেই ফাইভের ছেলের মতো।
কি করি বল অনি সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনি আর এই টুকু.....।
নীপার দরজায় তালা দেওয়া শেষ হলো। চিকনার দিকে তাকিয়ে বললো, আমি রেডি। অনাদি বললো চল। আমি অনাদির দিকে তাকিয়ে বললাম, তোর লোক কোথায়।
তোকে বলেছি না, ঠিক সময় চলে আসবে।
আমরা পায়ে পায়ে মোরাম রাস্তার কাছে চলে এলাম। অনাদি একটু আগে আগে হাঁটছে আমার পাশে নীপা বাসু পেছনে চিকনা সঞ্জীব। চিকনা সঞ্জীব খুনসুটি করেই চলেছে। বাসু আমার দিকে তাকিয়ে বললো, হরিহর আত্মা একদিন দেখা না হলে দুজনে পাগল হয়ে যাবে। ওরা আমাদের অক্সিজেন।
হাসলাম।
গাড়ির ওখান থেকে একটু হই হই আওয়াজ পাচ্ছি। বাসু বললো স্যারের গলা। খেপেছে। পা চালিয়ে তাড়াতাড়ি গাড়ির কাছে এলাম।
ওইতো অনি এসেছে। অনাদি বললো।
এসেছে। কাকা আমার আসায় আশ্বস্ত হলেন।
কিহলো।
স্যার তখন থেকে খালি অনি অনি করছে।
আমি কাকাকে বললাম কি হয়েছে।
না কিছু হয় নি। তুই আসলি না এরা কি এসব পারবে।
খুব পারবে। ওরাও তোমার ছাত্র। আমারই মতো।
ফ্যাল ফ্যাল করে কাকা আমার দিকে তাকালো।
ঠিক আছে তোমাকে ব্যস্ত হতে হবে না। আমি নীপাকে নিয়ে পেছনের গাড়িতে বসছি ভানু পাঁচু তোমার গাড়িতে বসছে।
ঠিক আছে।
গাড়ি ছারলো। আমি নীপা পেছনে, মাঝে বাসু সঞ্জীব অনাদি। সামনে চিকনা পচা।
কিরে অনি তোর কি টেনসন হচ্ছে। অনাদি বললো।
কেনো।
চুপচাপ।
না।
নীপা ফিক করে হাসলো।
কিরে নীপা হাসলি কেনো। চিকনা বললো।
বীরপুরুষ।
কে।
কে আবার।
কেন কি হয়েছে।
আমি নীপার দিকে তাকালাম। চোখ পাকাচ্ছে। কাল সারারাত বারান্দায় পায়চারি করেছে। আর সিগারেট খেয়েছে।
হ্যাঁ। টেনসনতো একটু থাকবেই। অনাদি বললো।
ফোনটা বেজে উঠলো। দেখলাম অমিতাভদার ফোন।
হ্যাঁ বলো। কোথায় তোমরা।
আমরা পৌঁছেগেছি।
তার মানে।
গাঢ়ল কোথাকার একটা কান্ডজ্ঞান নেই। কটা বাজে দেখেছিস ঘড়িতে।
ঘড়ি নেই।
সেই জন্য। ধর কথা বল। বড়মার গলা।
কাল সারারাত ঘুমোও নি নাকি।
খুব ভাল ঘুমিয়েছি।
তাহলে এত সকালে পৌঁছলে কি করে।
অনাদি বাসু নীপা আমার দিকে তাকিয়ে।
আমরা কাল রাতে এসেছি।
তার মানে।
হ্যাঁ। তুই আয় সব বলবো।
ঠিক আছে।
আচ্ছা পাগলদের নিয়ে আমি পরেছি।
কিহলো।
দাদারা কাল রাত থেকে এসে আছেন, বোঝ।
অনাদি আমার দিকে তাকালো, কাল রাতে। থাকলো কোথায় ?
ওনার থাকার জায়গার অভাব।
ঠিক বলেছিস।
আমি মানিপার্স থেক অনাদির হাতে চারটে পাঁচশো টাকার নোট দিয়ে বললাম এটা রাখ। প্রয়োজনে চেয়ে নিবি। পৌনে সাতটা নাগাদ পৌঁছলাম। চারিদিকে তাকিয়ে দেখলাম কেউ কোথাও নেই। দাদারা তারমানে আসেন নি। বড়মা কি করে বললো চলে এসেছে। অনাদির চেলুয়া গুলো আমাদের বেশ কিছুক্ষণ আগেই পৌঁছে গেছে। অনাদি নেমে আগে চলে গেলো। রিসেপসনিস্ট কাউন্টারে গিয়ে বলতেই, ভদ্রমহিলা কাউন্টার ছেরে ছুটে ভেতরে চলে গেলেন।
নার্সিংহোমের ক্যামপাসটা বেশ বড়। কালকে তাড়াহুড়োর চোটে কিছু দেখা হয় নি। পেছনের দিকে স্টাফ কোয়ার্টার আছে। এই রকম অজ জায়গায় সাজানো গোছানো একটা আধুনিক নার্সিংহোম থাকতে পারে আগে কখনো ভাবি নি। তবে এই যা হাইরোডের একেবারে গায়ে। কমিউনিকেসন খুব সুন্দর। অনাদি কাল যেতে যেতে বলেছিল, এই নার্সিংহোমটা এখন এই এলাকার হাসপাতাল। নীপা আর চিকনা কাকাকে ধরে ধরে ভেতরে আনলো। সোফায় বসালো। অনাদি বললো ভদ্রমহিলা গেলেন কোথায় বলতো।
কিছুক্ষণ পরে দেখলাম, ভদ্রমহিলা একজন স্যুট টাই পরা ভদ্রলোকের সঙ্গে বেরিয়ে এলেন। ভদ্রলোক এসে আমার নাম ধরে খোঁজ করলেন। আমি এগিয়ে গেলাম। আমার হাত ধরে বেশ কিছুক্ষণ ঝাঁকিয়ে ইংরাজীতে আমাকে জানালেন, উনি এখানকার ম্যানেজার, নাম মিঃ মুরলী শ্রীধরণ।
আমি আমার নাম আবার বললাম, বুঝলাম উনি সাউথ ইন্ডিয়ান। বাংলার বও জানেন না। কিন্তু কালকে এই ভদ্রলোক ছিলেন কোথায় ?
উনি আমাকে জানালেন, উনি আমাকে বিলক্ষণ চেনেন, তবে নামে, আমার লেখার উনি ভীষণ ভক্ত।
কিছু বললাম না, আমি লিখি বাংলায়, ও বেটা পরে কিকরে ? সন্দেহ ঠেকলো, মুখে কোন বহিঃপ্রকাশ করলাম না। হেঁসে হেঁসে আমিও তার প্রতি উত্তর দিলাম ইংরাজীতে।
আমার সঙ্গে কুশল বিনিময়ের পর, কিছুক্ষণ ওনার সঙ্গে কাকার ব্যাপার নিয়ে কথা বললাম। কাকার ব্যাপারটা উনি পঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে আমার কাছে জানলেন। মনে হল ওনাকে ঠিক সেটিসফায়েড করতে পারলাম না। বললাম আপনি কাকার সঙ্গে কথা বলতে পারেন।
উনি মাথা দুলিয়ে বললেন, ওটাই ঠিক, যা কথা হচ্ছে সব ইংরাজীতে, নীপা আর বাসু আমার দুপাশে, তার পাশে অনাদি আর চিকনা। ওরা আমার দিকে বিস্ময়ের দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে।
কাকার সামনে গিয়ে কাকাকে দেখলেন, ইংরাজীতে দুচারটে কথা জিজ্ঞাসা করলেন, আমি দোভাষীর কাজ করলাম। তারপর রিসেপসন কাউন্টারে গিয়ে রিসেপসনিস্ট ভদ্রমহিলাকে কি যেন বললেন, উনি একটা হুইল চেয়ার নিয়ে এলেন। কাকাকে চেয়ারে বসিয়ে ভেতরে নিয়ে যাওয়া হলো। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ওনার কেবিন নম্বর এস-৬।
অনিকে বললাম, এরা টাকার কথা কিছু বললো নাতো। কালকে বলেছিলো, ব্যালেন্স টাকাটা ভর্তি হওয়ার আগে দিয়ে দিতে হবে। ব্যাপারটা ঠিক বোধগম্য হচ্ছে না। অনাদি আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে।
কি হলো।
দাঁড়া হজম করতে বেশ কষ্ট হচ্ছে।
হাসলাম।
তুই শালা পেঁয়াজ।
কি করে বুঝলি।
খালি খোসা ছাড়িয়ে যেতে হবে, আসল মালটা অনেক ভেতরে।
নীপা হাঁ করে তাকিয়ে আছে। আমার একটা হাত চেপে ধরে আছে।
ছার ওসব কথা। কলকে এই ভদ্রলোক ছিলেন কোথায় ?
সেতো আমিও বুঝতে পারছি না।
মনে হচ্ছে এর মধ্যে কোনও একটা খেলা চালু হয়েছে।
বাসু আমার দিকে তাকালো, তুই ভাল বুঝতে পারবি আমাদের থেকে।
চিকনার দিকে তাকিয়ে বললাম, ভ্যাবলার মতো তাকিয়ে আছিস কেনো, ছেলেগুলো এসেছে অদ্দূর থেকে ওদের কিছু খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা কর।
ওই দায়িত্বে পচা আছে, তোকে ভাবতে হবে না। আমি তোর কাছ ছারা হচ্ছি না।
সঞ্জীব কোথায়।
বাইরে আছে।
চল একবার গিয়ে কেবিনটা দেখে আসি।
রিসেপসনিস্ট কাউন্টারের ভদ্রমহিলাকে গিয়ে বললাম, উনি বললেন একটু দাঁড়ান আমরা কিছ পরীক্ষা কর নিই আগে তারপর।
অগত্যা কাকীমা সুরমাসির পাশে এসে সোফায় বসলাম। কাকীমার চোখ দুটো ছল ছল করছে। আমার হত দুটো ধরে বললেন, অনি।
আমি বললাম কাঁদছ কেনো দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। নীপা আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছ। কিছুক্ষণ পর সেই ভদ্রমহিলা এসে বললেন এবার যেতে পারেন।
পায়ে পায়ে ভেতরে গেলাম। করিডোরের সামনের ঘরটাই এস-৬ কেবিন। কালকে কেবিনের পয়সা আমার কাছ থেকে নেয়নি তো! যাক এখন এই নিয়ে ভাবতে চাইলাম না। কাকা বিছানার ওপর হেলান দিয়ে শুয়ে আছে। কোমর থেকে মাথা পর্যন্ত তোলা।
কাকীমা কাকার পাশে গিয়ে বসলেন।
কাকা বললেন, আমার চোখে ওষুধ দিয়ে গেলো, কি সব পরীক্ষা করলো, ইঞ্জেকসন দিয়ে গেলো, বললো ৯.৩০ অপারেশন। কাকীমা আমার হাত দুটো মুঠো করে ধরলেন, ও অনি....কাকীমার চোখে জল।
কাঁদছ কেনো। সব ঠিক হয়ে যাবে। দেখবে কাকা এবার চশমা ছাড়াই দেখতে পাবে। এখানে কাঁদতে নেই, লোকে কি ভাববে।
অনাদি বললো, অনেক দিন আগে এই রুমটায় ঢুকেছিলাম, মানসদাকে দেখতে, এটা ভিআইপিদের রুম। 
আমি ঘরের চারিদিকে একবার চোখ বোলালাম, ঘরের ডেকরেশন তাই বলে। কিন্তু অমিতাভদারা গেলেন কোথায়! বললেন কাল রাত থেকে এসে বসে আছেন। ঘরটা এসি, বেশ ঠান্ডা লাগছে,  কাকা কেমন গুটি-সুটি মেরে গেছেন। রুম সার্ভিস বেলটা বাজালাম, সঙ্গে সঙ্গে একজন নার্স এসে হাজির।
ইংরাজীতেই তাকে বললাম, এসিটা একটু বন্ধ করে দিতে।
মেয়েটি বললো, কমিয়ে দিচ্ছি স্যার, বন্ধ করা যাবে না।
ঠিক আছে। মেয়েটি এসির টেম্পারেচার বারিয়ে দিয়ে চলে গেলো।
পাঁচু ছুটতে ছুটতে ঘরে এলো, অনি অনি চল চল পঙ্খীরাজ গাড়ি করে কারা যেন এসেছে। তোকে খোঁজা খুঁজি করছে। বুঝলাম সাহেবরা এসেছেন, কাল চলে এসেছে! তাহলে এতো দেরি! নীপা আমার হাতটা শক্ত করে ধরেছে। চিকনাকে দেখতে পেলাম না। অনাদি এবং বাসু সঙ্গে আছে।
কাকাকে বললাম, দাঁড়াও আমি আসছি।
কাকা বললেন যাও।
আমি ঘরের বাইরে এলাম, দেখলাম শ্রীধরণ ওদের সঙ্গে করে নিয়ে আসছেন। সামনে মল্লিকদা, সবার পেছনে মিত্রা। মিত্রার দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেলাম। কপালে ডগ ডগ করছে সিঁদুর। ঠোঁটে লাল লিপস্টিক। একটা সাদা চিকনের সালোয়ার পরেছে। মনে হচ্ছে কোন বুটিক থেকে আনানো। সচর আচর এগুলো চোখে পরে না। ওকে আজ সৌম্য শান্ত দেখাচ্ছে। সেজেছে কিন্তু সেই সাজার মধ্যে মনহারিনী ব্যাপার আছে।
আয়া পরসি। মল্লিকদা বললেন।
নীচু হয়ে প্রণাম করলাম। আমার দেখা দেখি, সকলে প্রণাম করলো।
অনি লাইফে প্রেথম প্রেণাম পেলাম তোর কাছ থেকে।
প্রেথম না প্রেথ্থম। বাঙাল ভাষাটাও সঠিক ভাবে বলতে পারো না।
সবাই হেসে উঠলো।
দিলিতো গ্যামাকসিন মেরে।
আমার আশেপাশের সবাই হেসে ফেললো।
আমি সবার সঙ্গে একে একে পরিচয় করিয়ে দিলাম। মিত্রা নীপাকে কাছে টেনে নিল। ছোটমার দিকে তাকিয়ে নীপার গালে হাত দিয়ে বললো কি মিষ্টি দেখতে। বড়মা আমার গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, কিরে এরি মধ্যে মুখটা কেমন যেন শুকিয়ে গেছে। আমি বললাম এই শুরু করলে আবার। এই জন্য আসতে বারন করেছিলাম। ঠিক আছে ঠিক আছে আর বলবো না। ছোটমা চোখে মুখে কথা বলছে। নীপার দিকে তাকিয়ে ইশারা করে বললো এখানে এসেও সখী জুটিয়ে নিয়েছো।
হাসলাম।
ভেতরে গেলাম। কাকা কাকীমা সুরমাসির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলাম। ওরা সকলে সকলের কুশল বিনিময় করলো। মিত্রা সবার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলো। ওরা প্রণাম কেউ নিতে চায় নি। মিত্রাও ছাড়ে নি। শেষে অমিতাভদা বললেন, অনি যেমন আপনাদের ছেলে ও তেমনি আপনাদের একটা মেয়ে। ও যখন প্রণাম করতে চাইছে ওকে করতে দিন।
আমি বললাম এবার চলো। এখানে বেশি ভিড় করে লাভ নেই। নার্সিংহোমের অন্যান্য পেসেন্ট পার্টিরা আজ যেন কেমন অচ্ছুত। সবার কনসেনট্রেসন যেন আমাদের দিকে। করিডোরে বেরিয়ে এলাম। মিঃ শ্রীধরণ আমায় ছুটতে ছুটতে এসে বললেন, স্যার আপনার একটা ফোন আছে।
আমার!
হ্যাঁ স্যার। মিঃ ব্যানার্জী করেছেন।
মিঃ ব্যানার্জী!
শ্রীধরণের সঙ্গে মিত্রার চোখাচুখি হলো। আমি লক্ষ্য করলাম।
ফোনটা এসে ধরলাম।
হ্যালো।
অনি।
হ্যাঁ।
তুমি খুব রাগ করে আছো মনে হচ্ছে।
কেনো।
সরি আজ আমি তোমার পাশে থাকতে পারলাম না।
তাতে কি হয়েছে।
আরে না না....।
আপনাকে কে খবর দিলো ?
মিত্রা কাল আমায় সব বলেছে।
এই ফোন নম্বর পেলেন কোথায় ?
হাসলেন, এটা আমার নার্সিংহোম।
তাই নাকি ! বাবা তাহলেতো....।
হ্যাঁ হ্যাঁ, আমি ওদের সমস্ত ব্যবস্থা করতে বলে দিয়েছি। তোমায় একটুও টেনসন করতে হবে না।
না না আমি টেনসন করছি না।
কলকাতা থেকে মিঃ শ্রীধরণকে পাঠিয়েছি, উনি কাকাবাবুর অপারেশন করবেন। তোমার কাছে আমি অনেক ঋণী। এটুকু ঋণ আমায় শোধ করতে দাও। মিঃ ব্যানার্জীর গলাটা ভারী হয়ে এলো।
এ আপনি কি বলছেন!
সাক্ষাতে সমস্ত কথা বলবো।
ঠিক আছে।
একেবারে রাগ করবে না।
আচ্ছা।
ফোন রাখলাম।
মিত্রা আমার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। ওর মুখের দিকে তাকালাম। চোখদুটো হাসি হাসি। আমি গম্ভীর হয়ে গেলাম।
অনাদিকে বললাম, দাদাদের জন্য একটু খাবার ব্যবস্থা কর।
আনাদি আমার দিকে তাকালো। আমি কেবিনে গেলাম, কাকাকে নিয়ে যাবার তোড়জোড় চলছে। পোষাক পরানো হয়ে গেছে। কাকা আমাকে ডাকলেন, সোফায় সবাই লম্বা হয়ে বসে আছে। আমি কাকার কাছে গেলাম, কাকা আমার হাত দুটো চেপে ধরলেন।
অনি এতোদিন শিক্ষকতা করেছি, তোদেরও পরিয়েছি, রক্তের সম্পর্ক সবচেয়ে বড় সম্পর্ক। আজ অনুভব করছি। তারথেকেও বড় সম্পর্ক আছে। তুই তা প্রমান করলি। কাকা আমাকে বুকে জরিয়ে ধরলেন। কাকাকে সান্তনা দেবার ভাষা আমার নেই। চারিদিকে চোখ ঘোরালাম। থম থমে পরিবেশ। কাকীমা সুরমাসি নীপা কাঁদছে। মিত্রার একটা হাত নীপার কাঁধে।
ট্রলি এসে গেছে, ওরা কাকাকে নিয়ে যাবে।
আমি বললাম, এবার তোমরা সবাই বাইরে গিয়ে বসো। ওরা ঘর থেকে সবাই বেরিয়ে গেলো। নার্সকে কাছে ডেকে আস্তে করে বললাম, কাকা ইংরাজী ভাল বোঝেন, কিন্তু ফ্লুএন্টলি বলতে পারেন না, আপনারা একটু সাহায্য করবেন। নার্স মাথা দোলালো।
ওরা কাকাকে নিয়ে অপারেশন থিয়েটারে চলে গেলো।
আমি কাকীমার দিকে তাকিয়ে বললাম, চলো কিছু খেয়ে নিই।
মিত্রা বললো, চলো ওপোরে একটা রুম ঠিক করা আছে, ওখানে গিয়ে বসি।
তোরা যা আমি একটু খাবার ব্যবস্থা করে আসি।
ও অনি, আমরা খাবার নিয়ে এসেছি। বড়মা বললেন।
বড়মার দিকে তাকালাম।
হ্যাঁরে, কাল রাতে করেছি।
তোমরা কি রাতে ঘুমোও টুমোও নি।

জীবনে জীবন যোগ না করলে ব্যার্থ হয় গানের পসরা

৩৯

Re: কাজলদীঘি, শ্মশান ও পীরসাহেবের থান

হ্যাঁ।
করলে কখন।
মিত্রা আর ছোট করেছে।
আমি মিত্রার দিকে তাকালাম, মিত্রা নীপার হাত ধরেছে শক্ত করে।
তুই বিশ্বাস কর....।
ঠিক আছে আমি ওদের একটু খাবার ব্যবস্থা করে আসি। তোমরা ওপরে যাও।
আচ্ছা।
দাদা গেলেন কোথায়।
ওইতো রিসেপসনে বসে আছে। মিত্রা বললো।
ওদের ডেকে নিয়ে যাও।
মল্লিকদা দাদা রিসেপসনে বসে আছেন। দাদা কার সঙ্গে ফোনে কথা বলছেন। আমি কাছে যেতে বললো, একটু ধর, হ্যাঁ বল।
কি খাবে।
একটু চা বিস্কুট।
বড়মা খাবার নিয়ে এসেছেন।
হ্যাঁ হ্যাঁ কালকে ওরা কিসব করছিল। তুই খাবি না।
গ্রামের ছেলে গুলো এসেছে, ওদের একটু দেখে আসি। তুমি ওপরে যাও ওরা গেছে।
যা তাহলে।
একটু মিষ্টি পাঠিয়ে দিই।
সুগার ফ্রি।
মনে হয় পাব না। তবু দেখছি।
দাদা আবার ফোনে কথা বলতে শুরু করলেন।
আমারে জিজ্ঞাসা করলি না। মল্লিকদা বললেন।
তোমারটা আমি জানি।
ঠিক আছে।
আমি বাইরে বেরিয়ে এলাম।
অনাদি সমস্ত ব্যবস্থা করেছে। বাইরে বেরিয়ে এসে দেখলাম, তিনটে গাড়ি। তার মধ্যে একটি গাড়ি আবার সরকারী তকমা মারা। মানে এখানে এসে ফোন টোন করা হয়ে গেছে। আমাকে দেখেই চিকনা এগিয়ে এলো। গুরু তোমার পায়ের ধুলো একটু দাও।
অন্যান্য যে ছেলেগুলো এসেছিল, ওরা মুখের দিকে তাকায়। ওরা সব শুনে ফেলেছে, আমি চিকনার দিকে তাকিয়ে বললাম, একটা সিগারেট খাওয়ানা।
চিকনা ছুটে চলে গেলো। অনাদি কাছে এলো। বাসু আমার ছায়া সঙ্গী। পচা সঞ্জয় আমার কাছ ঘেঁসে দাঁরিয়ে মিটি মিটি চোখে আমায় দেখছে।
ভানু কোথায়রে ? আমি বললাম।
অনাদি বললো আশে পাশে আছে কোথাও। চিকনা একটা প্যাকেট নিয়ে এসেছে।
এক প্যাকেট। সঞ্জয় বললো।
এই শুরু করলি। আমি বললাম।
আচ্ছা আচ্ছা পরে হবে।
হ্যাঁ ঠেকে গিয়ে।
ঠিক আছে।
একটা সিগারেট নিয়ে চিকনার হাতে প্যাকেটটা দিলাম। সঞ্জয় বললো, দে একটা।
না।
কেনো।
গুরুর প্রসাদ। এখন নয় ফেরার সময়। এখন বিড়ি খা।
অনাদিকে বললাম, তুই বাইরেটা সামাল দে। আমি ভেতরটা সামাল দিই। আর শোন দাদা আর মল্লিকদার জন্য কিছু সুগার ফ্রি মিষ্টির ব্যবস্থা কর।
অনাদি আমার দিকে তাকিয়ে বললো, সুগার ফ্রি ? পাবো তো।
বাসু বললো, স্টেশনের ধারে মা লক্ষীতে পাবি।
ফান্ড আছেতো। অনাদি মাথা নাড়লো, শেষ হলে চেয়ে নিস।
আচ্ছা।
অনাদি চিকনাকে সঙ্গে নিতে চাইলো। চিকনা বললো আমি গুরুর পাশে আছি। তুই সঞ্জয়কে নিয়ে যা।
ঠিক আছে।
চিকনাকে বললাম, চল একটু চা খাই।
আমি চিকনা পাঁচু পচা বাসু সবাই এসে সামনের দোকানটায় বসলাম। বেশ চকচকে দোকানটা একটা নার্সিংহোমকে কেন্দ্রকরে জায়গাটা বেশ জমজমাট। চিকনা চায়ের কথা বললো, ভদ্রলোক বললেন, একটু অপেক্ষা করুন। বানিয়ে দিচ্ছি।
বাসু বলল, হ্যাঁরে অনি ওই ভদ্রমহিলা কাগজের মালিক!
হ্যাঁ। আর অমিতাভদাকে দেখলি, উনি এডিটর।
সত্যি কথা বলতে কি আমার বিশ্বাস হচ্ছে না।
না হওয়ারি কথা। ওর মধ্যে একটা ব্যাপার আছে, দেখন দারি নেই।
একেবারে খাঁটি কথা বলেছিস। কোটি কোটি টাকার মালিক......।
কোটি টাকা নয়, ঠিক এই মুহূর্তে ওর এ্যাসেটের ভ্যালু হাজার কোটি টাকা।
কি বলছিস।
ঠিক বলছি।
কি সাধারণ।
সবাই আমার কথা শুনছে আর চোখ ঠিকরে বেরিয়ে আসছে।
অনাদি আর সঞ্জয় এলো। পাশে বসলো।
অনাদি বললো। এটা।
দিয়ে আয়।
অনাদি সঞ্জয়ের দিকে তাকালো।
তুই যা গুরু। ওখানে সব......।
অনাদি বেরিয়ে গেলো।
দুটো করে মিষ্টি বলনা। সকলে খাই। আমার মুখ থেকে কথা সরলো না, তার আগেই চিকনা অর্ডার দিলো। কিছুক্ষণ পর দেখলাম, নার্সিংহোমের গেট পেরিয়ে অনাদির সঙ্গে নীপা আর মিত্রা আসছে। আমি উঠে দাঁড়ালাম। বাসুও আমার দেখা দেখি উঠে দাঁড়ালো। অনাদি হাত দেখালো, বুঝলাম বিশেষ কিছু নয়। ওরা ভেতরে এলো।
কিহলো ?
মিত্রাদি বললো তোমার কাছে আসবে। নীপা বললো।
এসো।
আমার পাশ থেকে বাসু উঠে গেলো। মিত্রা আমার পাশে এসে বসলো। আর একপাশে নীপা বসলো। টেবিলের অপরজিটে বাসু অনাদি সঞ্জয়, চিকনা একটা চেয়ার টেনে এনে বসলো।
আর একটা টেবিলে ওরা সবাই বসলো।
খেয়েছো।
নীপ বললো, ছোটমা জোড় করে লুচি আলুরদম খাইয়েছে।
মিত্রাদি।
মিত্রাদিও খেয়েছে।
মিষ্টি খাবি।
নিয়ে আয়। চিকনাকে ইশারা করতে ও বলে দিলো।
সকলের টেবিলে মিষ্টি আসলো। বাসু অনাদি মিত্রাকে একাপেয় অনেক কথা বলার চেষ্টা করলো। মিত্রা কিছু উত্তর দিলো। বাকিটা আমায় দেখিয়ে দিলো। মিত্রা নীপার দিকে তাকিয়ে বললো, নীপা আমার ব্যাগটা দাওতো। নীপা মিত্রার ব্যাগটা দিল, ব্যাগ খুলে মিত্রা মোবাইল বার করলো।
এইনে তোর মোবাইল।
আমি হাতে নিলাম। দেখলাম সঞ্জয়ের চোখ জুল জুল করছে।
এত দাম দিয়ে কিনলি কেন।
তুই মোবাইল আনতে বলেছিস, দামের কথা কিছু বলিস নিতো।
তাবলে.....।
মিত্রা মাথা নীচু করে মিষ্টি ভেঙে খাচ্ছে। পকেটে হাত দিয়ে দেখলাম আমার মোবাইল নেই। আমার চোখ মুখ দেখে চিকনা বললো, মোবাইল তো।
হ্যাঁ।
আমার পকেটে।
তোর পকেটে মানে।
তুই যখন কেবিনে গেলি তখন আমার হাতে দিলি। তারপর অনেকবার ফোন বেজেছে ধরিনি। শেষবারেরটা ধরলাম। হিমাংশু না কে ফোন করেছিল। পরে ফোন করুন বলে কেটে দিয়েছি। তারপর দেখলাম অনবরতো ফোন আসছে। বন্ধ করে পকেটে রেখে দিয়েছি।
সঞ্জয় চেঁচিয়ে উঠলো গা.....বাসু ওর মুখটা চেপে ধরলো। সরি বলে সঞ্জয় হেসে ফেললো। মিত্রা নীপা মাথা নীচু করে ফিক ফিক করে হাসছে।
তোলা থাকলো। চিকনা বললো। এই অপমান আমি সইব না, মনে রাখিস।
হ্যাঁ হ্যাঁ।
আমি তাকালাম। ওরা থেম গেলো।
সঞ্জয়কে বললাম ওই মোবাইল থেকে কার্ডটা এই মোবাইলে ভরে দে। পকেট থেকে আর একটা সিম বার করে বললাম, এই সিমটা এতে ভরে দিয়ে নীপাকে দে। মিত্রার দিকে তাকিয়ে বললাম, চার্জ দিয়ে নিয়ে এসেছিস।
হ্যাঁ।
চা খাবি।
মিত্রা হাসলো।
হাসলাম।
হাসছিস কেনো।
এমনি।
চিকনার দিকে তাকাতে, দুটো এক্সট্রা বলা হয়ে গেলো।
দাদা মল্লিকদা কি করছেন।
দাদা এখানের সকলকে ফোন করে ফেলেছেন। সব চলে এলো বলে।
মানে।
মানে আরকি তুই জিজ্ঞাসা করবি।
আমি।
হ্যাঁ।
তুই সম্পাদক, আর আমি জিজ্ঞাসা করবো।
মিত্রা আস্তে করে আমার থাইতে চিমটি কাটলো। থেমে গেলাম। কানের কাছে মুখটা নামিয়ে এনে বললো, নীপা আছে, তুই একটু বাইরে চল। কথা আছে। আমি ওর দিকে তাকালাম। মিত্রা আমার চোখের ইশারা বুঝতে পারলো।
চা খাওয়া হতে সঞ্জয়ের কাছ থেকে মোবাইলটা নিলাম।
সঞ্জয় গদ গদ হয়ে বললো, গুরু অনেকদিনের সখ ছিল একটু ঘাঁটবো, ঘাঁটা হয়ে গেলো।
কি।
ব্ল্যাক বেরি।
ও।
তুই এক কাজ কর নীপাকে একটু এই মোবাইলের অপারেটিং সিস্টেমটা শিখিয়ে দে। আমি একটু বাইরে যাচ্ছি। নীপাকে ইশারায় বললাম তুমি বোশো।
মিত্রাকে নিয়ে বাইরে এলাম। মিত্রার গাড়ির কাছে গেলাম। ইসমাইল ছিলো গাড়ির দরজা খুলে দিলো। আমি মিত্রা গাড়ির ভেতরে বসলাম। সবাই দেখছে। দেখুক এখন আমার আর কিছু যায় আসে না।
ইসমাইল বললো কোথায় যাবেন স্যার।
কোথাও না। তুমি খেয়েছো।
হ্যাঁ স্যার। ওই বাবু খাইয়েছেন জোর করে।
আচ্ছা। তুমি একটু চা খেয়ে এসো।
আচ্ছা স্যার। ইসমাইল আমার ইশারা বুঝতে পারলো।
ইসমাইল চলে গেলো।
মিত্রার দিকে তাকিয়ে বললাম, তোকে আজ খুব মিষ্টি দেখতে লাগছে।
তাই। যাক তুই সুন্দর বলেছিস, আমার কপালটা সত্যি ভালো।
আমি ওর দিকে জুল জুল করে তাকিয়ে আছি।
তাকাস না, হিমাংশু কাল ডেট ঠিক করেছে।
কি বলছিস!
আমি ওকে অনেক বার বারন করেছিলাম ও শোনে নি।
আমি চুপচাপ।
কিসব প্রবলেম আছে বললো তুই ওর সঙ্গে একবার কথা বলে নে।
তুইতো সব দেখতে পাচ্ছিস।
তোকে এই মুহূর্তে নিয় যেতে মন চাইছে না, কিন্তু আমার কিছু করার নেই।
আমি মিত্রার দিকে তাকালাম, মিত্রা মাথা নীচু করে আছে।
তুই বরং সই সাবুদ করে কাল চলে আয়।
হিমাংশুকে ফোন করলাম, প্রথমেই ও কাকার কথা জিজ্ঞাসা করলো, ওকে সব বললাম।
তুই কালকে কয়েকঘন্টার জন্য চলে আয়।
ঠিক আছে। ফোন রেখে দিলাম।
মিত্রাকে বললাম, দাদাকে সব কথা বলেছিস।
দাদা সব জানে।
মিঃ ব্যানার্জী।
ও বলেছে তুই যা করবি তাই হবে।
তোরা সব আমার ঘারে ঠেলে দিচ্ছিস কেনো, নিজেরা কিছু কর।
তুই বইতে পারিস তাই।
কথা বারালাম না। বললাম, ঠিক আছে। যাবো।
বাসু জানলায় টোকা দিলো, বললো ভেতরে ডাকছে, অপারেশন হয়ে গেছে।
গাড়ি থেকে বেরিয়ে নার্সিংহোমের ভেতরে এলাম।
এখনো কেবিনে দেয় নি। সবাই নিচে চলে এসেছে, মিঃ শ্রীধরণ আমাকে ডাকলেন, বললেন, সব ঠিক আছে, আমি যা করার করে দিয়েছি। তবে কাকাকে চশমা নিতে হবে। দীর্ঘদিন ক্যাটারাক থাকার ফলে, চোখটা একটু কমজোরি হয়ে গেছে। ওনিয়ে চিন্তা করতে হবে না। বাহাত্তর ঘন্টা পরে ওরা পাওয়ার এবং চশমা দেবে।
আমি বললাম, ভয়ের কিছু নেই। উনি বললেন একেবারে নয়, তবে বয়স হয়েছে, এটাতো আপনাকে মানতে হবে, আমি ওনার কথায় সম্মতি দিলাম, আর একটা কথা এই কদিন স্নান করা জল দেওয়া চলবে না, আর দুপুরের দিকে উনি ছেড়ে দেবেন।
কেবিনে এলাম, কাকাকে স্বাভাবিক দেখলাম, ছোটমা কাকাকে বললেন এই যে অনি এসেছে।
আমি কাকার কাছে গেলাম। কাকার চোখ ব্যান্ডেজ করা আছে। কালো চশমা লাগানো। আমার গায়ে মাথায় হাত বোলালেন। হাতদুটো থর থর করে কাঁপছে, ঠোঁটটা নড়ে উঠলো। কোন কথা বলতে পারলেন না। নিজের খুব খারাপ লাগছিলো, কিন্তু শক্ত হলাম। এই সময় ভেঙে পরলে চলবে না। আমার একপাশে নীপা আর একপাশে মিত্রা। কাকার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলাম। বললাম, এরা তোমায় বিকেলে ছেরে দেবে।
মল্লিকদা পাশে এসে দাঁরিয়েছেন, কি হে শক্তিমান, লুজ হয়্যা যাইতেছ মনে হইতাছে।
হাসলাম।
ব্যাশ বুইঝা ফেলাইছি, বড়মা আমার হাতদুটো ধরে বললেন, দেখিস সব ঠিক হয়ে যাবে। আমি বড়মার দিকে তাকালাম। আমার ভাগ্যটা সত্যি খুব ভালো। না হলে এদের মতো এতো বড়ো বড়ো লোকজন আমার পাশে থাকবে কেনো। চোখ দুটো জ্বালা জ্বালা করছে।
ক্রমশঃ

জীবনে জীবন যোগ না করলে ব্যার্থ হয় গানের পসরা

৪০

Re: কাজলদীঘি, শ্মশান ও পীরসাহেবের থান

কেবিনের বাইরে এলাম। মিত্রা এসে পাশে দাঁড়িয়েছে। অনাদিরা সব কেবিনের বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল। আমাকে দেখে এগিয়ে এলো। কেমন আছেন স্যার ? এখন ঠিক আছে। যা ভেতরে গিয়ে দেখে আয়। পায়ে পায়ে করিডোর দিয়ে এগিয়ে নার্সিংহোমের বাইরে এসে দাঁড়ালাম। চিকনাকে বললাম একটা সিগারেট বার কর। চিকনা একটা সিগারেট দিলো। কোন কথা বললো না। অনাদিরা কাকাকে দেখে চলে এলো।
বাসু অনাদি আমার পাশে এসে দাঁড়ালো। মিত্রা আমার পাশেই আছে।
অনাদি।
বল।
আমর একটা উপকার করতে হবে।
কি বল।
আমায় আজ কলকাতা যেতে হবে। একটা জরুরী দরকার আছে।
এই সময়!
হ্যাঁ। মিত্রা খবরটা নিয়ে এসেছে। কিছু করার নেই।
নীপা কখন এসে পাশে দাঁড়িয়েছে জানি না।
অনাদি মিত্রার দিকে তাকিয়ে বললো, ম্যাডাম অনি কয়েকদিন পরে গেলে হোত না।
মিত্রা মাথা নীচু করে দাঁরিয়ে আছে।
অনি আমাদের বল ভরসা। ও থাকলে কোন কঠিন কাজ আমাদের কাছে কঠিন বলে মনে হয় না।
মিত্রা মাথা নীচু করে আছে, ওরা জানে না, মিত্রারও একি অবস্থা।
বাসু বললো, ওতো আজ গিয়ে কাল আবার ফিরে আসছে। আমরা...।
চিকনা আর সঞ্জয় বললো কয়েক ঘন্টার তো ব্যাপার আমরা পালা করে....।
সেটা নিয়ে ভাবছি না। যদি কোন প্রবলেম হয়।
গোরার গাড়িটা রেখে দে। এখানে নিয়ে চলে আসবি। আমি বললাম।
মিত্রা বললো আমার গাড়িটা রেখে যাবো।
অনাদি বলে উঠলো পাগল নাকি, আপনার গাড়ি পাহারা দেওয়ার আবার লোক ঠিক করতে হবে। গাঁইয়া ভূত সব।
ভানু বললো, ওটা নিয়ে তোকে ভাবতে হবে না।
নীপা বললো, অনাদিদা দাদা যখন বলছে যাক না। আমি তো আছি।
হ্যাঁ, তোকেই তো সব করতে হবে। আমরা সব পাহারাদার।
ওরা সবাই চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো। অনাদি বললো।
স্যারকে বলেছিস।
বলিনি। বলবো।
স্যার তোকে ছাড়া এই মুহূর্তে কারুর কথা শুনবে না।
সব বুঝলাম কিন্তু আমি না গেলে হবে না।
নীপা বললো, তুমি যাও অনিদা। আমি বলছি। সব সামলে নেবো তুমি দেখবে। নাহলে তোমার নাম করে ভয় দেখাবো, তাতেই কাজ হয়ে যাবে।
সবাই নীপার কথায় হো হো করে হসে ফেললো।
একটু বেলায় অনেকেই এসেছিলেন, এখানকার জেলাসভাধিপত এসপি ডিএম। অমিতাভদার সঙ্গে দেখা করতে। তারাও কাকাকে দেখে গেলেন। আমার সঙ্গেও পরিচয় হলো। কিন্তু আমি যে এখানকার ছেলে তারা এই প্রথম জানলেন।
ভেবেছিলাম কাকা আমাকে কিছু বলবেন। দেখলাম কাকাই আমাকে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে যেতে বললেন। সুরমাসি কাকীমা একটু কিন্তু কিন্তু করছিলেন। কাকা ধমকে উঠলেন। আমিতো ঠিক আছি। ওর কি কোন কাজ  কর্ম নেই। খালি এখানে বসে থাকবে। কেউ আর কিছু বললো না।
বেড়তে বেড়তে বিকেল হয়ে গেলো। কাকাকে এবার কাউকে ধরতে হোলো না। কাক নিজে নিজেই এলেন। মনের দিক থেকে কাকাকে অনেক বেশি ফিট মনে হলো। ওদের ছেড়ে দিয়ে আমরা বেরোলাম। আমি মিত্রার গাড়িতে উঠলাম। অমিতাভদারা নিজেদের গাড়িতে।
কলকাতায় পৌঁছলাম সাতটা নাগাদ। দাদার বাড়িতে কিছুক্ষণ কাটিয়ে মিত্রার রিকোয়েস্টে ওদের বাড়িতে এলাম। মনটা ভীষণ ভারাক্রান্ত কিছুই ভালো লাগছেনা। বার বার কাকার মুখটা মনে পরে যাচ্ছে। বিগত পাঁচ বছরে শয়নে স্বপনে কাকার মুখটা একবারও মনে পরে নি। তাহলে হঠাত আজ কেন বার বার মনে পরে যাচ্ছে।
তখন আমার পাঁচ বছর বয়স। আজও সেই দিনটার কথা মনে পরে যায়। বর্ষার সময় ঠান্ডা লেগে ধূম জ্বর। গ্রামে দখন অমূল্যদাদু ছিলেন একমাত্র ডাক্তার। কাকা অমূল্যদাদুকে কাকা বলে ডাকতেন। আবঝা আবঝা কাকার কথা মুখটা মনে পরে যায়। কাকা দাদুকে বলেছিলেন। ওর বাপগেছে মা গেছে যে কোন স্বর্তে ওকে তোমায় বাঁচিয়ে তুলতে হবে। আমি ওকে কিছুতেই হারাতে চাই না। অমূল্যদাদু আমাদের বাড়িতে পরপর তিনদিন ছিলেন। আমার মাথায় ধারা দেওয়া হয়েছিল জ্বর নামানর জন্য। গ্রাম শুদ্ধ উপচে পরেছিল। সেইকটা দিন। যে যেমন ভাবে পেরেছিল কাকাকে এসে সাহায্য করেছিল। আমি যেন গ্রামের সম্পদ কাকার একলার নয়।
জ্বর সেরে যাবার পর। কাক আমাকে নিয়ে পীরবাবার থানে নিয়ে গেলেন। আমাকে বললেন প্রণাম কর। তোর বাপ এখানে পীরবাবাকে দেখেছিলেন। তারপর আমাকে নিয়ে গেলেন, বীরকটার শিব মন্দিরে। গ্রামের লোকেরা বলে বুড়োশিবের থান। এর মাটি গায়ে মাখলে নাকি শরীর খারাপ হয় না। কাকা আমাকে মাটি মাখিয়ে মন্দিরের সামনে ঝিলের জলে স্নান করিয়ে পূজা দিলেন। সত্যি বলতে কি তারপর থেকে আমার সেই ভাবে কোন শরীর খারাপ করেনি।
সেই দিন প্রথম কাকার চোখে জ্বল দেখেছিলাম। আমার বাবার নাম ধরে বার বার বলেছিলেন একি গুরুদায়িত্ব তুই আমাকে দিয়ে গেলি। বাবা শিব আমি অনিকে তেমার পায়ে রাখলাম। আজ থেকে ওর বাঁচামরা তোমার ওপর নির্ভর। তুমি যা ভাল বুঝবে করবে। আমার ছোট্ট শরীরটাকে বুকে জরিয়ে ধরে কাকা হাপুস নয়নে কেঁদেছিলেন।
কিরে এখনো বসে আছিস ? বাথরুমে যাবিনা।
সম্বিত ফিরে পেলাম।
বাথরুমে গেলাম। ফ্রেস হয়ে, দুজনে রাতের খাওয়া খেয়ে নিলাম। মিত্রা আসার সময় বিরিয়ানী কিনেছিল। আমি বারন করলাম। বললো এখন গিয়ে আর করতে ভাল লাগবে না। বরং চল কিনে নিয়ে যাই খেয়ে নেবো। তাই করলাম। বিরিয়ানী আর বাটার চিকেন ফ্রাই। খাওয়ার পর দেখলাম শরীর আর বইছে না। মিত্রার ঘরে বসে নিউজ চ্যানেল দেখছিলাম। কটা বাজে বারটা হবে। এরি মধ্যে বার কয়েক নীপাকে ফোন করে খবর নিয়েছি। কাকার সঙ্গেও কথা বলেছি। নীপার একটু অভিমান হয়েছে। কি আর করা যাবে। মিত্রা এলো আরও আধঘন্টা পরে। বুঝলি সারাদিন ছিলাম না, একেবারে সব লন্ডভন্ড করে রেখেছিলো। লোক দিয়ে কাজ করানো যে কি ঝকমারি তোকে কি বলবো।
মিত্রার দিকে তাকালাম। সকালের মিত্রা আর এখনকার মিত্রার মধ্যে আকাশ পাতল পার্থক্য। ফিনফিনে একটা ব্ল্যাক কাপরের নাইট গাউন পরেছে। পরা না পরা দুই সমান। আমি ওর দিকে তাকালাম। ও আমার পাশে এসে বসলো।
কি দেখছিস।
বিবিসি সিএনএন অল্টারনেট করে দেখছি। আমার বিছানা রেডি।
তোর ! কেনো!
কোথায় শোব ?
এখানে, আপত্তি আছে।
ওর দিকে তাকালাম।
ওসব নিয়ে কিছু ভাবিস না।
মিত্রা আমার কাঁধে মাথা রাখলো।
তোর সোফাটা বেশ আরামদায়ক। তুই সোফার ওপাশে একটু হেলান দিয়ে বোসতো।
কেনো ?
বোসনা।
মিত্রা সরে গিয়ে হেলান দিয়ে বসলো। আমি ওর নরম কোলে মাথা দিয়ে শুলাম।
এই জন্য, বদমাশ।
মাথাটা একটু টেপ, ভীষণ যন্ত্রনা করছে।
পারবনা যা, আমি কি তোর বউ।
তোর সমস্ত দায়িত্ব আমাকে অর্পন করা হয়েছে।
মিত্রা একবার আমার দিকে তাকালো, পারবি আমার ভার বইতে।
দিয়েই দেখ না।
দিয়েতো দিয়েছি, তুই নিচ্ছিস কোথায় ?
নেবো নেবো, এত তাড়াহুড়ো করছিস কেনো।
আমারতো বেলা বয়ে যায়।
না না ধরে রাখার চেষ্টা কর।
একি ধরে রাখা যায়।
যাবে যাবে, সময়ে সব হয়। মিত্রা মাথায় বিলি কাটতে আরম্ভ করল, আমার চোখ বুজে আসছে।
একটা কথা বলবো।
বল।
রাগ করবি না।
না।
সারাদিন খুব স্টেইন গেলো, একটু ড্রিংক করবি।
আমি ওর দিকে তাকালাম।
আমি তোকে রিকোয়েস্ট করবো। দেখবি উপকার পাবি।
আমি ওর চোখে চোখ রাখলাম।
আমি জানি তুই এসব পছন্দ করিস না। তবু তোকে বলছি। আর কোনদিন বলব না।
ওর বলার মধ্যে এমন একটা জোর ছিল, আমি না বলতে পারলাম না।
ও হেসে ফললো। মুহূর্তের মধ্যে সব রেডি করে ফেললো।
বেশি দিস না।
মাত্র দু’পেগ।
তুই জানিস, আমি এর বিন্দু বিসর্গ বুঝি না।
ঠিক আছে, অসুবিধে হলে বলবি।
মুহূর্তের মধ্যে ও সব রেডি করে ফেললো, জানিস বুবুন, তুই যে দিন শেষ এসেছিলি, সেইদিন থেকে আমি আর ছুঁইনি।
তাহলে আজ খাচ্ছিস কেনো ?
ইচ্ছে করছে।
ঠিক আছে, আর নয়।
প্রমিস করছি যদি খাই কখনো একমাত্র তোর সঙ্গেই খাবো। একা কোনদিন খাব না।
ও গ্লাসে করে সাজিয়ে দিল, দুজনে গ্লাসে গ্লাস ঠেকিয়ে শিপ করলাম। কেমন যেন একটা লাগল, কোন দিন খইনি। কেমন ওষুধ ওষুধ গন্ধ। কিন্তু বেশ মিষ্টি মিষ্টি স্বাদ। মিত্রা আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে। আমার এক পেগ শেষ হতে না হতেই, ওর দু’পেগ খাওয়া হয়ে গেলো।
কিরে এতো তাড়া তাড়ি। আর খাবি না।
আর একপেগ। প্লিজ।
মিত্রা সোফার অপজিট থেকে এসে আমার কাছ ঘেঁসে বসলো। পাখাটা একটু চালাই।
আস্তে করে।
মিত্রা ফিরে এলো। একটু টাল খেলো যেনো। আমি উঠতে যাচ্ছিলাম। ও হাত দেখিয়ে বসতে বললো। এমন ভাবে বসলো যেন আমার কোলে বসে পরবে। দুহাত দিয়ে আমার গলা জরিয়ে ধরলো।
জানিস বুবুন, আমার হাজবেন্ডটা একটা বাস্টার্ড।
চমকে উঠলাম। আমি ওর চোখে চোখ রাখলাম। মিত্রার চোখ অন্য কথা বলছে। আমার কোন সেনসেসন এখনো হয় নি।
ও আর একটা মেয়েকে নিয়ে থাকে, আমি ওর কেপ্ট।
থামবি।
মিত্রা হাসছে। ভাবছিস আমি মাতাল। না। ও তোর আমার ব্যাপারে সব জানে। কিন্তু কিচ্ছু করার নেই। সেই জন্য তোকে সেদিন অমনি ভাবে সব কথা বলেছে। তোর শেষ হয়ে গেছে। দাঁরা আর একটা পেগ তোকে দিই।
না।
প্লিজ তুই না করিস না। মাত্র একটা। তুই একটা আমি একটা। ব্যাশ।
আমি হার মনলাম। মিত্রার এরিমধ্যে তিনটে পেগ খাওয়া হয়ে গেছে।
ও কি ভাবে, ওর দয়ায় আমি বেঁচে আছি। ওর যা কিছু প্রতিপত্তি দেখছিস সব আমার বাবর জন্য। ওকে বিয়ে করে তোকে ভোলার চেষ্টা করেছিলাম। পারিনি। তবু মানিয়ে চলার চেষ্টা করলাম। ছয় মাসের মধ্যে সব জানতে পারলাম। বাবাকে সব জানালাম। বাবা বললেন বল মা তুই কি করতে চাস, আমি তোর কথায় না বলবো না। সেই সময় তোকে অনেক খুঁজেছি পাই নি। আমার বাবা-মা খালি আমার কথা ভেব ভেবে মারা গেলেন। এক মাত্র মেয়ের একি হাল। তবু বাবার অনেক পয়সা ছিল তাই বেঁচে গেলাম। তারপর পরিবেশ পরিস্থিতি আমাকে তৈরি করে দিয়েছে। বাবা তোকে খুব ভালবাসতেন। মারা যাবার আগে আমায় বলেছিলেন, অনি যদি তোর কাছে কোনদিন ফিরে আসে ওকে ফিরিয়ে দিস না। বাবা তোকে চিনেছিলেন। মা নয়। মিত্রা থামলো। গ্লাসটা মুখে তুলে নিল। এক নিঃশ্বাসে জলের মতো ঢক ঢক করে বেশ কিছুটা খেলো। তারপর গ্লাসটা টেবিলে ওপর ঠক করে নামিয়ে রাখলো।
এল আর ডিসগা....।
মিত্রা আমার কাঁধে মাথা রখলো। কাঁধটা ভিঁজে ভিঁজে ঠেকলো, মিত্রা কাঁদছে। ওর মাথাটা আমার কোলে রাখলাম, মাথায় হাত বুলিয়ে দিলাম।
আমার এখন দু’চার পেগে কিছু হয় না বুঝলি বুবুন। আকন্ঠ খেলে তবে তৃপ্তি পাই।
আমার মাথাটা ঝিম ঝিম করছে। আমি ওকে ধরে ধরে বিছানায় নিয়ে গেলাম। বালিশটা ওর মাথায় দিয়ে শুইয়ে দিলাম। ওর পাশে বসলাম। এই মুহূর্তে মদ খাওয়ার কোন ফিলিংস আমার মধ্যে নেই। আমি মিত্রার পাশে আধ শোওয়া অবস্থায়। মিত্রা আমার আরো কাছে এগিয়ে এলো। বুকের কাছে মুখটা নিয়ে এসে বললো, একটু আদর করবি।
ওর চোখ ভাসা ভাসা, আমি ওর কপালে চুমু খেলাম, ও ঠোঁট দেখিয়ে ইশারা করছে।
থাক না আজ।
বিশ্বাস কর বুবুন আমি মাতাল হই নি। তাকে দেখলেই খালি সেক্স করতে ইচ্ছে করে।
এএ নেশাটা তোকে ত্যাগ করতে হবে। মাথায় রাখবি আমিও একটা মানুষ।
জানি। মন মানে না।
মানাতে হবে। তোকে বিজনেস ম্যাগনেট হতে হবে।
ওর জন্য তুই আছিস।
আমি কতোক্ষণ।
তুই আমাকে ছেরে যাবি না। আমার হাত দুটো চেপে ধরলো।
কেনো এসব কথা চিন্তা করছিস।
অনেকদিন পর আমার ভালবাসাকে কাছে পেয়েছি।
আমিতো তোর কাছেই আছি।
আমি জানি। আমি যেমন তুইও ঠিক তেমনি।
কিরকম।
আমাদের মনের মধ্যে একটা যাযাবর লুকিয়ে আছে।
সেটাতো ভাল।
ঠিক।
তার খারাপ দিকও আছে।
শোধরাতে হবে।
তুই পাশে থাকলে হয়তো হয়ে যাবে।
সেতো আমি জানি।
ও আমার ডান হাতটা ধরে বুকে রাখলো। জানিস বিগত আট বছরে ওর সঙ্গে আট মাস ঘর করিনি। এই বাড়িটা এক সময় আমার মামার বাড়ি ছিল। মামাদের কাছ থেকে কিনে নিয়ে রিপেয়ার করে নিয়েছি। বাবার খুব সখ ছিলো। এই রকম একটা বাড়িতে থাকবে।
ছিলেন।
হ্যাঁ, শেষের কয়েকটা দিন।
আর ওই বাড়ি।
জ্যাঠারা নিয়েছে।
নিয়েছে না দিয়ে দিয়েছিস।
ওই হলো।
মিত্রা আমার মাথাটা টেনে নিয়ে জোর করে ওর ঠোঁটে রাখলো, উষ্ণ ঠোঁটের ছোওয়ায় আমার গাছের পাতায় বাতাস লাগলো।
তোর ঠোঁটটা ভীষণ মিষ্টি মনে হয় সর্বক্ষণ তোর ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে শুয়ে থাকি।
তোর ঠোঁটটাও কম কিসে।
মিত্রা হাসলো। ছেলেদের ঠোঁট এরকম হয় আমার জানা ছিল না।
জেনে নিলি।
এটা অনেকদিন আগে জানা উচিত ছিল, সেই কলেজ লাইফে।
সেই দিন গুলোর কথা মনে পরলে হাসি পায়। একটা গ্রামের ছেলে শহুরে আধুনিকার পাশে। অনেক দিন ও সুযোগ দিয়েছে আমাকে কিন্তু আমি ওর দেহ স্পর্শ পর্যন্ত করিনি। মনের মধ্যে একটা দ্বৈত্বতা খেলা করতো সব সময়। না আমি গ্রাম থেকে এসেছি। আমায় কিছু করতে হবে। সবুজ মনে তখন অনেক সোনালি স্বপ্ন।
তুই পাঞ্জাবীটা খোল আমি নাইট গাউনটা খুলে নিই। মিত্রা উঠে বসলো। এখন ওর মধ্যে কোন সঙ্কোচ নেই যেন আমরা স্বামী-স্ত্রী।
পাখাটা বন্ধ করে দে। ঠান্ডা ঠান্ডা লাগছে।
আমি উঠে গিয়ে পাখাটা বন্ধ করে দিলাম। একটা মিষ্টি গন্ধ চারদিকে ম ম করছে। বিছানায় উঠে এলাম। ওর পাশে শুলাম। মিত্রা আমার বুকে।
মিত্রা চেয়ে আছে আমার দিকে। তোর শরীরটা ভীষণ চার্মিং।
সব মেয়েরাই তাই বলে।
মিত্রা এক ঝটকায় উঠে বসলো। আর কারা কারা বলে। বল।
সে কি মনে আছে, যাদের সান্নিধ্যে আসি তারাই বলে।
নাম কি বল। তাদের ফোন করে আমি বলে দেবো, আমার জিনিষে তারা যেন ভাগ না বসায়।
হাসলাম।
ভাগ বসালে কি হয়েছে। খোয়ে যাবে, না কমে যাবে ?
ওরে শয়তান, গাছেরও খাবে আবার তলারও কুরোবে।
গাছ আর তলা যদি দুই পাওয়া যায় খতি কি।
মিত্রা হঠাত গম্ভীর হয়ে গেলো। ঠিকইতো, আমার কি আছে যা দিয়ে তোকে ধরে রাখবো। যা পাওয়া যায় তাই লাভ।
মিত্রার পুরো শরীরটা আমার শরীরের ওপর। আমার বুকটা ওর বালিশ। আমার ঘাড়ের তলা দিয়ে দুহাতে আমাকে পেঁচিয়ে ধরে আছে।
কিরে ঘুমিয়ে পরলি।
না। তোর বুকের লাব ডুব শব্দ শুনছি।
তোকে এতো দিন খুব মিস করেছি।
মিত্রা মিত্রার মতো কথা বলেযাচ্ছে। আমি ওর কিছু কথার উত্তর দিচ্ছি। বাকিটা দিচ্ছি না। মাঝে মাঝে ও বিরক্ত হচ্ছে। আমি নিশ্চুপ।
কতোক্ষণ দুজনে নিস্তব্ধ হয়ে শুয়েছিলাম জানি না। খালি দুজনে দুজনের নিশ্বাস প্রশ্বাসের শব্দ শুনেছি। একে অপরের বুকের লাবডুব শব্দ শুনছি। মিত্রার নরম হাত আমার চুলে বিলি কাটছে। মাথার ঝিম ঝিমানি ভাবটা এখন সম্পূর্ণ অদৃশ্য।
কিরে এই ভাবে শুয়ে থাকবি।
আর একটু।
উঠবি না।
না।
কাল অনেক কাজ।
এই মুহূর্তটুকু আর চেষ্টা করলেও পাবো না।
তোর ভালো লাগছে।
হ্যাঁ।
ঘেমে গেছিস।
স্বাভাবিক। আমি কষ্ট করলাম। তুই এনজয় করলি।
শয়তান। মিত্রা আমার নাকটা টিপে দিলো। ওঠ।
কেনো।
ওই যে বললি কাল সকালে অনেক কাজ।
আমি উঠে পরলাম।

সকালে মিত্রার ডাকে ঘুম ভাঙলো। সেই এক চিত্র। মিত্রা ঠাকুর ঘর থেকে বেরিয়েছে। সেই লালপাড় মটকার কাপড়। মাথায় একগাদা সিঁদুর। মা মা। ঘরের নিপাট গৃহিণী। আমি উঠে রেডি হলাম। দুজনে সেই লুচি বাটিচচ্চরি খেয়ে বেরিয়ে পরলাম।
হিমাংশুর অফিসে এলাম সাড়ে দশটা নাগাদ। ও বললো একবার ভালকরে সব দেখে না। ডিডটা ভালকরে পরে নিলাম। ওখান থেকে রেজিষ্ট্রি অফিস। অমিতাভদা মল্লিকদা মিত্রা আমার হয়ে সাক্ষী দিলেন। আরো অনেকে ছিল। খালি মিঃ ব্যানার্জী ছিলেন না। মিত্রাকে ওই মুহূর্তে ব্যাপারটা নিয়ে জিজ্ঞাসা করতে ইচ্ছে করে নি। ওখানে একঘন্টার কাজ ছিল। কাজ শেষে হিমাংশুকে আলাদা করে ডেকে নিয়ে গিয়ে বললাম, আমাকে একটা আছোলা বাঁশ দিলি। বেশ চলছিল তুই থামিয়ে দিলি। হিমাংশু হেসে বললো, সব ভালো যার শেষ ভালো। তোকে মিত্রার সঙ্গে জুড়ে দিলাম। নাহলে মিত্রার একার পক্ষে কনট্রোল করা সম্ভব হোত না।
ওর দিকে তাকালাম। ও আমার মিত্রার সম্বন্ধে কোন আঁচ করতে পেরেছে কিনা। ওর চোখ সেই কথা বলছে না।
এরপর আমার করনীয় কি আছে।
খাতাপত্র গুলো সাজিয়ে নিই। আর একজন যে ডিরেক্টর আছে, তাকে জানাতে হবে। এখন আমার অনেক কাজ।
তোর কাজ কবে শেষ হবে।

জীবনে জীবন যোগ না করলে ব্যার্থ হয় গানের পসরা