টপিকঃ প্রস্টেট ক্যান্সারের প্রাথমিক লক্ষণগুলো কী কী?

https://qph.fs.quoracdn.net/main-qimg-72df0cf35e0761ee80179793e5d55d3e-lq

বংশরক্ষার সহায়ক পুরুষের বীর্য বা সিমেন প্রস্তুতিতে প্রস্টেট গ্ল্যান্ড মুখ্য ভূমিকা নিলেও উপকারীতার জন্য নয়, একজন পুরুষের জীবনে মুখ্যত উত্পাত সৃষ্টি করার জন্যই প্রস্টেটের পরিচিতি দিন দিন বাড়ছে। ‘প্রস্টেট’ তাই এখন খুব চেনা শব্দ। প্রস্টেট থেকে নানা ধরনের সমস্যা হয়। গ্ল্যান্ডটি আকারে বড় হয়ে যেমন বদনামের ভাগীদার হতে পারে, তেমনি সংক্রমণ ঘটিয়েও অনেকের বিরাগভাজন হয়। সবচেয়ে বড় কথা, এই গ্ল্যান্ড থেকে ক্যান্সারের সৃষ্টি হয়। আর সেটা মোটেই হেলাফেলা করার মতো কোনও ব্যাপার নয়। কারণ, গোটা বিশ্বেই প্রস্টেট ক্যান্সারের সংখ্যা হু হু করে বাড়ছে।

তথ্য যেমন জানাচ্ছে

সংখ্যাতত্ত্বের হিসেবে পুরুষদের ক্ষেত্রে স্কিন ক্যান্সারের পরে প্রস্টেট ক্যান্সার এখন সংখ্যায় দ্বিতীয়। খোদ আমেরিকায় ২০০৩ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত যে প্রস্টেট ক্যান্সারের ৫ বছর সারভাইভিং শতাংশ ছিল ৯৯.২, সেটা কিন্তু এখন অনেকটা কমে গেছে। অর্থাৎ আগের থেকে বেশি মানুষ এই রোগে মারা যাচ্ছেন। এটা ঠিক যে আমেরিকা ও ইউরোপের মতো পাশ্চাত্য দেশগুলিতে প্রস্টেট ক্যান্সারে বেশি লোক আক্রান্ত হচ্ছেন। সংখ্যাটা দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ায় তুলনামূলকভাবে কম। ভারতে নির্দিষ্ট ভাবে প্রস্টেট ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা অজানা হলেও সংখ্যাটা যে ক্রমবর্ধমান এবং সমীহ করার মতো সেটা সত্যি। এ দেশে প্রস্টেট ক্যান্সার অপারেশন এবং চিকিত্সা এখন প্রচুর পরিমানে হচ্ছে। ২০০১ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত ১০ বছর সময়কালে ভারতীয় নাগরিকদের গড় আয়ু যেখানে ৬১.৯৭ থেকে বেড়ে ৬৫.৪৮ হয়েছে, সেখানে প্রস্টেট ক্যান্সারে আক্রান্তদের সংখ্যাটা বছরে ১% হারে বাড়ছে। এটা চিন্তা করার মতো।

এক নজরে

· গোটা বিশ্বে প্রতি ২.৫ মিনিট পরপর একটা করে নতুন প্রস্টেট ক্যান্সার ধরা পড়ছে। আর এই রোগ থেকে প্রতি ১৭ মিনিট অন্তর একটি করে মৃত্যু হচ্ছে অধূমপায়ী হওয়া সত্ত্বেও প্রস্টেট ক্যান্সার হতে পারে। ধূমপান করেন না এমন একজন পুরুষের প্রস্টেট ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা লাং, ব্রঙ্কাস, কোলন, রেক্টাল, ব্লাডার, লিম্ফোমা, মেলানোমা, ওরাল ও কিডনি ক্যান্সারের মিলিত সম্ভাবনার চেয়েও বেশি

· প্রস্টেট ক্যান্সারের অগ্রগতি যেহেতু ধীরে ধীরে হয় তাই যে কোনও স্টেজে ধরা পড়া প্রস্টেট ক্যান্সারের ৫, ১০ ও ১৫ বছরের সার্ভাইভ্যাল রেট যথাক্রমে ৯৮%, ৮৪% এবং ৫৬%

বি পি এইচ

প্রস্টেট গ্ল্যান্ড আদতে কোনও যৌনাঙ্গ নয়। তবে পুরুষের যৌনজীবনে এই গ্ল্যান্ডের বিশেষ ভূমিকা আছে তা স্বীকার করতেই হয়। সাধারণত পুরুষদের ১০-১৪ বছর বয়সের মধ্যেই গ্ল্যান্ডটি পরিপূর্ণ আকারের হয়ে যায়। স্বাভাবিক নিয়মে পঞ্চাশোর্ধ পুরুষের শরীরে থাকা প্রস্টেট গ্ল্যান্ড ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। এই বৃদ্ধিকে বিনাইন প্রস্টেটিক হাইপারপ্লাসিয়া বা বি পি এইচ বলে। এই বৃদ্ধি খুব স্বাভাবিক এবং খুব ধীরে ধীরে এটি বাড়তে থাকে। অনুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে পরীক্ষা করে আগেই এই বৃদ্ধি বোঝা গেলেও ক্লিনিক্যালি ধরা পড়ে পঞ্চাশের বেশি বয়সে। যাই হোক, স্বাভাবিক নিয়মে বাড়তে থাকা প্রস্টেট থেকেও কিন্তু সমস্যা তৈরি হতে পারে। হতে পারে বলা হল এই কারণে যে, বাড়তে বাড়তে যদি এটি কোনও কারণে মূত্রনালি বা ইউরেথ্রার ওপরে চাপ দিতে শুরু করে তখন স্বাভাবিক ভাবে প্রস্রাব করা যায় না, কারণ প্রস্রাবের প্রবাহে বাধার সৃষ্টি হয়। আর তা থেকেই সমস্যার সূত্রপাত। এই কারণেই পুরুষ মাত্রেরই প্রস্টেট গ্ল্যান্ড বৃদ্ধিতে সমস্যা হয় না।

স্ফীত প্রস্টেট গ্ল্যান্ড

এখানে অন্য আর একটি প্রশ্ন এসে যাচ্ছে, সেটি হল স্বাভাবিক নিয়মে বাড়া ছাড়াও প্রস্টেট গ্ল্যান্ড কি অন্য কোনও কারণে বেড়ে যেতে পারে এবং এই বৃদ্ধিজনিত কারণে কি কি সমস্যা হতে পারে? দেখা গেছে বিনাইন প্রস্টেটিক হাইপারপ্লাসিয়া বা বি পি এইচ অর্থাৎ, স্বাভাবিক নিয়মে প্রস্টেটের বৃদ্ধি ছাড়াও প্রস্টেটের ক্যান্সারের কারণেও এই গ্ল্যান্ড আয়তনে বেড়ে যেতে পারে।

প্রস্টেট স্ফীতির সমস্যা

প্রস্টেট গ্ল্যান্ড বৃদ্ধি পেয়েছে এমন পুরষকে বার বার টয়লেটে যেতে হয়, কারণ কোনও বারই ব্লাডার পুরোপুরি খালি হয় না। ব্লাডার খালি হয় না বলে সম্পূর্ণ প্রস্রাব হওয়ার অনুভুতি অধরা থাকে। প্রস্টেট স্ফীতি থেকে ঠিক যে ধরনের সমস্যা হতে পারে তা নিচে জানানো হল।

· বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পরে সরুধারায় মূত্র বেরয়, ক্রমশ মূত্র বেরনোর বেগ দুর্বল হয়ে পড়ে, মূত্র প্রবাহে সামঞ্জস্য থাকে না। বন্ধ হয়, আবার শুরু হয়। ঘন ঘন ও জরুরি ভিত্তিতে টয়লেটে যেতে হয়।

· অবস্থা খুব খারাপ হলে প্রস্রাব শুরু করতে দেরী হয়

· একেবারে শেষে ফোটায় ফোটায় প্রস্রাব হয়, মনে হয় ব্লাডারে মূত্র রয়ে গেছে ঘন ঘন ও জরুরি ভিত্তিতে টয়লেটে যেতে হয় রাত্রে বারে বারে টয়লেটে যেতে হয়

· স্ফীত প্রস্টেট খুব বেশি মাত্রায় বাধা দান করে ইউরেথ্রার পথটিকে রুদ্ধ করে দিলে অ্যাকিউট রিটেনশন অফ ইউরিন অর্থাৎ, প্রস্রাব বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এটি অত্যন্ত বিব্রতকর ও যন্ত্রণাদায়ক পরিস্থিতি। প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে গিয়ে দেখা যায় একবিন্দু মূত্রও বেরচ্ছে না। এরকম ক্ষেত্রে রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। সেখানে ক্যাথেটার পরিয়ে মুশকিল আসান করা হয়। তবে একটা কথা ক্যাথেটার কিন্তু একটি সাময়িক সমাধান। তা থেকে ব্লাডার বা কিডনির স্টোন হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সেপ্টিসিমিয়াও হতে পারে। স্থায়ী সমধান পেতে অস্ত্রোপচার বাধ্যতামূলক।

· সংক্রমণ জনিত প্রদাহের কারণে সমস্যা হলে প্রস্রাব করার সময় জ্বালা, যন্ত্রণা, জ্বর হতে পারে।

প্রস্টেট ক্যান্সার নয় তো!

স্ফীত প্রস্টেটের উপসর্গ বি পি এইচ অথবা প্রস্টেটের স্বাভাবিক বৃদ্ধির কারণে যেমন হতে পারে, তেমনি ক্যান্সারের কারণেও কিন্তু হতে পারে। ঠিক কি হয়েছে তা বোঝার জন্য সামান্য একটা রক্তপরীক্ষা করলেই চলবে। প্রস্টেট ক্যান্সার নির্ধারণের মস্ত বড় হাতিয়ার, এই সামান্য রক্তপরীক্ষার নাম পি এস এ বা প্রস্টেট স্পেসিফিক অ্যান্টিজেন টেস্ট।

প্রস্টেট ক্যান্সার

স্বাভাবিক অবস্থায় প্রস্টেট গ্রন্থি থেকে বেরিয়ে আসা পি এস এ মাত্রা ১ থেকে ৪ ন্যানো গ্রাম/মিলিলিটারের মধ্যে থাকে। তবে এখানে একটা কথা বলে রাখা ভাল যে, প্রস্টেট গ্ল্যান্ড যত বড় হবে তা থেকে বেরিয়ে আসা পি এস এ-এর পরিমানও কিন্তু তত বেশি হবে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রস্টেট গ্ল্যান্ডও বড় হতে থাকে বলে কম বয়সীদের তুলনায় বয়স্কদের রক্তে বেশি পি এস এ পাওয়া যায়। যেমন, স্বাভাবিক অবস্থায় একজন ৫৫ বছরের মানুষের তুলনায় একজন ৭৫ বছর বয়স্ক মানুষের রক্তে বেশি পি এস এ পাওয়া যাবে। সুতরাং, কারও পি এস এ বেশি হওয়ার অর্থ এই নয় যে তাঁর ক্যান্সার হয়েছে। অর্থাৎ পি এস এ অর্গান স্পেসিফিক, ডিজিজ স্পেসিফিক নয়।

বয়স ও পি এস এ-র স্বীকৃত মাত্রা

· ৪০-৪৯ বছর - ২.৫ ন্যানো গ্রাম/মিলিলিটার

· ৫০-৫৯ বছর – ৩.৫ ন্যানো গ্রাম/মিলিলিটার

· ৬০-৬৯ বছর – ৪.৫ ন্যানো গ্রাম/মিলিলিটার

· ৭০ বছরের বেশি - ৬.৫ ন্যানো গ্রাম/মিলিলিটার

ঝুঁকি

প্রস্টেট ক্যান্সার হওয়ার পিছনে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ শর্তের সন্ধান মিলেছে। এরা হল– বয়স, জাতি এবং পারিবারিক ইতিহাস। এছাড়া এন্ড্রোজেন হরমোন এবং খাদ্যেরও কিছু ঝুঁকি আছে বলে মনে করা হয়।

বয়স– ৪০ বছরের কম যাঁদের বয়স, তাঁদের মধ্যে খুব বিরল ক্ষেত্রে এই রোগ হয়। পরবর্তীকালের আনুপাতিক হার এইরকম :

বয়সের সঙ্গে আক্রান্তের আনুপাতিক হার

৪০–৪৯ বছর > ৩০৪ জন পিছু ১ জন

৫০–৫৯ বছর > ৪৪ জন পিছু ১ জন

৬০–৬৯ বছর > ১৬ জন পিছু ১ জন

৭০–৭৯ বছর > ৯ জন পিছু ১ জন

জাতি– প্রস্টেট ক্যান্সারের বিস্তার এবং রোগজনিত মৃত্যু নাটকীয় ভাবে কালো চামড়ার লোকেদের মধ্যে বেশি। আর লক্ষ্যণীয় হল জাপানীদের মধ্যে সংখ্যাটা সবচেয়ে কম।

পারিবারিক ইতিহাস– স্তন ও কোলন ক্যান্সারের মতো এই ক্যান্সারেরও বংশগত ঝুঁকি আছে। মনে করা হচ্ছে, মোট প্রস্টেট ক্যান্সারের ৫-১০% পূর্বপুরুষের কাছে অর্জিত জেনেটিক শর্তের কারণে হয়। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ হেলথ বা এন আই এইচ পরিসংখ্যানগত যে প্রতিবেদন পেশ করেছে তাতে স্পষ্ট যে, কোনও পুরুষের প্রস্টেট ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি তাঁর রোগাক্রান্ত বাবার তুলনায় রোগাক্রান্ত ভাইয়ের ক্ষেত্রে বেশি।

এন্ডোজেনাস হরমোন– পুরুষদের অ্যান্ড্রোজেন হরমোন প্রস্টেট ক্যান্সারে প্রভাব ফেলে বলে মনে করা হয়। এটা লক্ষ্য করা গেছে যে, যাঁরা নপুংসক বা ইউনাক, অর্থাৎ, জন্মগত ভাবে যাঁদের টেস্টিস বা শুক্রাশয় নেই, কিংবা বয়ঃসন্ধির আগে পুরুষত্বহানি হওয়ার কারণে যাঁদের টেস্টোস্টেরন নিঃসরণ হয় না, তাঁদের প্রস্টেট ক্যান্সারের ভয় নেই।

খাদ্যসংক্রান্ত ঝুঁকি– চর্বিজাতীয় খাবার ও মাংস প্রস্টেট ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। অন্যদিকে সয়াবিন এই ঝুঁকি কমায়।

#সংগৃহীত

"We want Justice for Adnan Tasin"