টপিকঃ কম্পিউটার গেম-একাকিত্ব ও মানবিক অনুভুতির

মাঠে গিয়ে ধুলো কাদা মেখে, ঘেমে, নেয়ে রোজ বিকেলে খেলা শেষে বাড়ি ফেরা- এ আজকাল প্রায় উঠেই গেছে। পাড়ায় পাড়ায় খেলার জায়গার অভাব, পড়ার চাপ, যেমন তেমন ছেলে পিলেদের সঙ্গে মিশে ‘খারাপ’ হওয়ার ভয়- কত না অজুহাত অভিভাবকদের। তার পরিবর্তে আমাদের অভিভাবকরা যা সব তুলে দিচ্ছে ছেলে-মেয়েদের হাতে তা যে তাদের কত ক্ষতি করছে তা আমাদের আন্দাজ করাই কঠিন। আজকালকার ছেলেমেয়েরা খেলাধূলা করার চেয়ে ভালোবাসে কম্পিউটার গেম। পিতা-মাতারা অনেক সময়েই বোঝেন না যে এই গেম খেলার ফলে শিশু বা কিশোর মনে কী ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে। বরং অনেক সময়েই ভাবেন যে ছেলেমেয়েরা কম্পিউটারের সামনে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থেকে নিশ্চয় অনেক কিছু শিখছে। যা ভবিষ্যতে যে ধরনের পড়াশুনো বা চাকরিই করুক না কেন এই বিদ্যা তাদের কাজে লাগবে। এই হচ্ছে কম্পিউটার গেম খেলা সম্বন্ধে আজকালকার পিতা-মাতার ধারণা।
সম্প্র্রতি আমেরিকার ম্যাসাচুসেটস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হেনরি জেনকিনস তার এক গবেষণায় বলেছেন কম্পিউটার বা ভিডিও গেমস সম্পর্কে জনমানসে যে ধারণা তৈরী হয়েছে সেটা অনেকাংশে ভ্রান্ত্ম। বর্তমান প্রবন্ধে আমরা অবশ্য জেনকিনসের মতো পরিসংখ্যান ভিত্তিক পদ্ধতির মাধ্যমে শিশুমনের উপর কম্পিউটার বা ভিডিও গেমস এর প্রভাব বিচার করব না। বরং Content analysis – এর পদ্ধতি অনুসরণ করে কয়েকটি বাছাই করা কম্পিউটার গেমস এর গুনগত বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনা করব।

https://i.postimg.cc/sX4cz4PF/game.jpg

সবচেয়ে জনপ্রিয় যে গেমস গুলি আছে তা মোটামুটি চার ধরনের। প্রথম ধরনের গেমে কতগুলি খেলা খেলতে হয়। যেমন ক্রিকেট, ফুটবল ইত্যাদি। নানারকম দল তৈরী করে এইসব খেলা খেলতে হয়। খেলার হারজিত হয়। একবার একটা ম্যাচে হারলে আর একটা ম্যাচ খেলতে ইচ্ছা করে। জিতলেও আরো ভালো ভাবে জিততে ইচ্ছা করে। এর কোনও শেষ নেই। প্রায়ই দেখা যায় ছেলেমেয়েদের কম্পিউটারের সামনে থেকে টেনে ওঠানো যায় না। এতে চট করে একঘেয়েমি আসে না। পড়াশুনা শিকেয় তুলে ছেলেমেয়েরা একটার পর একটা ফুটবল বা ক্রিকেট ম্যাচ খেলে যায়।

আর এক ধরনের গেম আছে তাতে প্রচন্ড গতি সম্পন্ন মোটরবাইক বা চার চাকার গাড়ি নিয়ে আপনাকে রাস্ত্মা, মাঠ, ঘাট পেরিয়ে ছুটে চলতে হবে। আর সবথেকে বিপজ্জনক ব্যাপার হল, এই ছুটে চলার পথে আপনি পথচারিকে ধাক্কা দেবেন, আইন ভঙ্গ করে ফুটপাতে উঠে পড়বেন।, নানা ধরনের জিনিস ভাঙবেন, যেমন ল্যাম্প পোষ্ট ইত্যাদি।

ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করাটাই এইসব গেমের প্রধান আকর্ষণ, পুলিশকেও আপনি ধাক্কা দিতে পারেন। মূল কথাটা হল জয়স্ত্মম্ভের দিকে এগিয়ে যাওয়া। পথে দুর্ঘটনায় আপনার গাড়িতে আগুন লেগে যেতে পারে। গাড়ি সম্পূর্ন ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। কুছ পরোয়া নেহি। তিনবার সুযোগ পাবেন।

তৃতীয় যে গেমগুলির কথা বলব সেগুলিতে আছে শুধুই প্রচন্ড রকমের হিংসাত্মক ঘটনা। হিংসার উদ্দাম আনন্দে আপনি পে-ন নিয়ে শত্রু খুঁজে বেড়াচ্ছেন দুর্গম গিরিগর্ত, নদীনালা, জঙ্গল বা সমুদ্রের উপর দিয়ে। প্রতি মুহুর্তে টেনশন। এই আপনার পে-নে বিপক্ষের গুলি লাগল বা আপনি পাহাড়ে ধাক্ক্‌ লাগিয়ে ফেললেন। দ্রুম্নত চলতে হবে, আরো বেশি গুলি চালাতে হবে, তাহলেই পয়েন্ট বাড়বে।

আর এক ধরনের হিংসাত্মক গেমে আপনি একজন কমান্ডো। হাতে একটি শক্তিশালী বন্দুক বা অটোমেটিক মেশিনগান নিয়ে কাঁটাতারের বেড়া, দুর্গম পাঁচিল এইসব পেরিয়ে শত্রু শিবিরের একবারে ভেতরে ঢুকে পড়েছেন। আপনি অবিশ্বাস্য রকমের শারীরিক ফিটনেস নিয়ে তীব্র গতিতে ছুটছেন, লাফিয়ে পাঁচিলে ডিঙাচ্ছেন আর একের পর এক শত্রু হত্যা করে চলেছেন। রক্তে মেঝে ভেসে যাচ্ছে। প্রহরীদের দেহ আপনার পায়ের সামনে লুটিয়ে পড়ছে।

পরবর্তী যে গেম গুলি নিয়ে আলোচনা করব সেগুলিকে ‘বিভৎস’ ছাড়া আর কিছু বলা যায় কিনা সন্দেহ।

ডুম – এই গেমটিতে খেলোয়াড়কে লক্ষ্যবস্তুর ওপর গুলি চালাতে হবে। যতগুলি চালাবে ততই নাম্বর পাবে। গুলি চালনোর সময় কোনও কিছু চিন্ত্মা করে না। খেলোয়াড়দের একগুচ্ছ অনৈতিক কাজকর্ম করতে দেওয়া হয়। খেলাটিতে রাস্ত্মায় পড়ে থাকা মৃত মানুষদের পকেট এবং ব্যাগ থেকে মূল্যবান জিনিসপত্র লুটপাট করতে পারলে নম্বর পাওয়া যাবে। এমনকি এই খেলায় রাস্ত্মায় ড্রাগ বিক্রেতার কাছ থেকে ড্রাগ কেনা যেতে পারে।

বিটডাউন – এই গেমে একটাই। সে যখন তখন খেপে ওঠে এবং এলোপাথারি গুলি চালিয়ে অযথা মানুষ মারে। মানুষ মানুষ মারাতেই তার আনন্দ। আমাদের শিশু বা কিশোররা খেলায় মেতে ওই চরিত্র হয়ে যায় খুব সহজেই। কয়েকটি মাত্র বোতাম টিপে।চালিয়ে আপনি যখন একের পর এক মানুষ খুন করে চলেছেন সেই সময় আপনি গ্রেনেড ছুঁড়ে একটি গুন্ডার পা জখম করে দিতে পারেন। লোকটি খোঁড়াতে খোঁড়াতে পালাবে। আপনি আবার গ্রেনেড ছুঁড়বেন। লোকটির হাতপা ওর শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। শেষ পর্যন্ত্ম শুধু তার মাথা ও বুক থাকবে। রক্তে মাখামাখি হয়ে আপনার শত্রুর দেহ সামনে পড়ে থাকবে। এটি নাকি শিশু ও কিশোরদের জন্য তৈরি আধুনিকতম খেলা! বারো শক্তিশালী অস্ত্র ব্যবহার করে শত্রুহত্যায় উৎসাহ দেওয়া হয়। খেলাটাতে আপনি মাইক্রোওয়েভ বন্দুক দিয়ে শত্রুকে মারলে তার দেহ

পোস্টাল – এই খেলায় চরিত্র একটাই। সে যখন তখন খেপে ওঠে এবং এলোপাথারি গুলি চালিয়ে অযথা মানুষ মারে। মানুষ মানুষ মারাতেই তার আনন্দ। আমাদের শিশু বা কিশোররা খেলায় মেতে ওই চরিত্র হয়ে যায় খুব সহজেই। কয়েকটি মাত্র বোতাম টিপে।

কিংপিন – এই গেমটিতে গুলি সোলজার অব ফরচুন – খেলাটি একেবারে আক্ষরিক অর্থে শোঁ শোঁ শব্দে ভাজা ভাজা হয়ে যাবে। আবার আপনি যদি স্-াগ-গান থেকে শত্রুর ওপর নজরদার গুলি ছোঁড়েন তাহলে সে তীব্র আর্তনাদ করে খাবি খেতে শুরু করবে। আপনি যদি একজন সৈন্যের ঘাড়ে গুলি লাগাতে পারেন তাহলে আপনি পরিষ্কার শুনতে পাবেন যে সে নিজের রক্ত মুখে নিয়ে গার্গেল করতে করতে মৃত্যের মুখে লুটিয়ে পড়েছে। আশ্চর্য এসব গেমের বর্ণনা পড়লে গা গুলিয়ে ওঠে অথচ সারা পৃথিবীর শিশু কিশোরদের মধ্যে এইসব গেম লুকিয়ে বা প্রকাশ্যে বিক্রি করা হচ্ছে।

এবার যে কম্পিউটার গেম গুলির কথা বলব সেগুলি এ পর্যন্ত্ম বর্ণনা করা গেমগুলির থেকেও বীভৎস।

আনরিয়েল টুর্নামেন্ট- এই খেলায় খুন করতে পারলে নম্বর পাওয়া যায়। আর এই খুনগুলি করার জন্য আপনি দশ রকমের অস্ত্র ব্যবহার করতে পারেন। একটা অস্ত্র হল মস্ত্ম বড় হাতুড়ি। এই হাতুড়ি দিয়ে আপনি বিপক্ষের খেলোয়াড়দের দেহের মাংশপেশি থেঁতলে কিমার মতো করে দিতে পারবেন। খেলোয়াড়ের মাথার খুলি বেমালুম ফুটো করে ঘিলু বের করে দিতে পারে। এর পর খুলি ফুটো মানুষটি হাঁটু মুড়ে যন্ত্রনায় কাতরাতে কাতরাতে বসে পড়বে এবং আপনার কচি ছেলেটি তার আরও ভয়ংকর মারণাস্ত্র প্রয়োগ করে সারা দেহটিকেই টুকরো টুকরো করে ফেলবে। আপনার শিশু বা কিশোর ছেলেটির মুখের অভিব্যক্তি তখন কেমন হবে একবার কল্পনা করুন।

কুইক-থ্রি এরেনা – ‘ছোট গুলি কর, মর আর টুকরো টুকরো হয়ে যাও’ এই হল এ খেলার মূলমন্ত্র।

কোনও সুস্থ, স্বাভাবিক, শিক্ষিত পিতা-মাতা কি চাইবেন যে তাদের শিশু ও কিশোর ছেলেমেয়েরা এইসব বীভৎস, বিকৃত ও ভয়ঙ্কর খেলাগুলি ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে খেলে যাক? টিভি সিরিয়াল বা সিনেমার চেয়ে বহুগুণ শক্তিশালী হল এইসব কম্পিউটার গেম। এদের প্রভাব শিশুমনের উপর টিভি সিরিয়াল বা ফিল্মের চেয়ে অনেকগুন বেশি। মনোবিজ্ঞানীদের গবেষণালদ্ধ ফলাফল এরকমই বলছে। এইসব গেম ক্রমাগত খেললে শিশু ও কিশোরদের পক্ষে কোনও সিরিয়াস বই পড়া বা দীর্ঘসময় মনঃসংযোগ করে কোনও কিছু করা আদৌ সম্ভব নয়। এইসব খেলা একটা নেশার মতো। একবার ধরলে ছাড়া ভীষণ কঠিন। পিতা-মাতারা আবার ভেবে দেখুন বিগস্ক্রিন টিভি তে কম্পিউটার গেম শিশুদের খেলতে দেবেন কি না। সামাজে ক্রমাগত বাড়তে থাকা ক্রাইম, নিঃসঙ্গতা, মানসিক অবসাদ ইত্যাদির মতো মনোবিকার, হিংসাত্মক মনোবৃত্তি, বিভিন্ন অসামাজিক ঘটনার সঙ্গে এই সব খেলা গুলির একটা পরোÿ যোগাযোগ থাকাই স্বাভাবিক নয় কি ? মানুষের চিন্ত্মাশক্তি, তার সৃজনশীলতা, তার মেলামেশা, তার স্বভাব ও আচরণএ সমস্ত্ম কিছুকে বিকারগ্রস্ত্ম করে তোলার এ কোন ব্যবসা? লাভের কড়ি গোনাই কি এর একমাত্র উদ্দেশ্য, নাকি এর পিছনে আছে অন্য কোনও দুরভিসন্ধিও?