টপিকঃ নিরাপদ সড়ক অলীক স্বপ্ন

https://www.sahas24.com/wp-content/uploads/2020/10/images-1-300x158.jpeg


সড়ক দুর্ঘটনা নামের আড়ালে সড়ক হত্যা  বন্ধ করতে হবে আর নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে, জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস-২০২০ উপলক্ষে সড়কে সন্তান- স্বজনহারা পরিবার ফোরাম কর্তৃক আয়োজিত ‘নিরাপদ সড়ক কি অলীক স্বপ্ন? ’ শীর্ষক ভার্চুয়াল আলোচনা সভায় বক্তারা এইআহবান জানান।

অনলাইন পোর্টাল সম্পাদক, সমাজসেবক সালমান সাদি বলেন, প্রধানত বিচারহিনতা’র কারনে সড়কে প্রতিনিয়ত হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে, তার সাথে লাইসেন্স বিহীন, ভুয়া লাইসেন্স ও মাদকসেবি চালক, পুরনো ও ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন,প্রতিযোগিতামূলকভাবে গাড়ি চালানো, তীব্রগতি  এবং ওভারটেকিং,  সড়ক পরিবহনের সাথে সম্পৃক্ত এক ধরণের কর্মচারীদের দুর্নীতিও সড়কে হতাহত বৃদ্ধির জন্য দায়ী

সড়কে সন্তান- স্বজনহারা পরিবার ফোরামের আহ্বায়ক,সড়কে শহীদ মেধাবী  শিক্ষার্থী আদনান তাসিনের পিতা আহসান উল্লাহ টুটুল বলেন, “সড়ক হত্যাকাণ্ডকে কখনো সড়কদুর্ঘটনা বলবেন না, এতে ঘাতকরা আনুপ্রানিত হয় – আইন না থাকা ও আইনের প্রয়োগ না হওয়ার কারনে সড়ক হত্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে – পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, সড়কে হত্যা বৃদ্ধির হার ৮.০৭% এর  অধিকহারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, সড়কে প্রতিদিন হত্যাকাণ্ডের শিকার ৬৪ জন, আদৌ কি কোন হত্যাকারী ধরা হচ্ছে? হাজার হাজার সড়কহত্যা, মাত্র একটি উধারন কি দিতে পারবেন, কারো-সাজা বা বিচার হয়েছে? আন্দোলন, প্রভাব বা ক্ষমতা’র জোরে ১-২% মামলা হলেও-  মামলা দায়ের থেকে শুরু করে নিষ্পত্তি পর্যন্ত দীর্ঘসূত্রিতা এবং সাক্ষ্য গ্রহণে জটিলতার কারনে আইনের সুফল থেকে মানুষ বঞ্চিত, আর সাধারণ মানুষ মামালার বিশাল ব্যবহুল খরচের কারনে মামলা করতেই পারেনা।  প্রতিদিনের সড়ক দুর্ঘটনার নামে সড়ক হত্যার সংবাদ গুলো দোয়া করে একটু পড়ে দেখুন, প্রতিটি সংবাদের শেষ লাইনেই প্রতিদিনই লিখা থাকে, “ঘাতক চালক ও হেল্পারকে ধরা সম্ভব হয়নি”, অলিখিত ভাবে তাদেরকে ধরা নিষিদ্ধ কিনা?

অনেকেই বলেন, ‘দুর্ঘটনা হলে ড্রাইভারকে মারতে মারতে মেরে ফেলা হয়..যার ফলে  ড্রাইভার নাকি মারের ভয়ে প্রাণের ভয়ে মানুষের ওপর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে দেয়। এমন একটি নজির কি বাংলাদেশে আছে যে, কোন ঘাতক মানুষ হত্যা করার পর – মানুষ সেই ঘাতককে পিটিয়ে মেরে ফেলেছে? জানা থাকলে একটি নজির দিন

সকলেই জানেন, ২৯ জুলাই ২০১৮, রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে রমিজুদ্দিনের শিক্ষার্থী রাজীব-দিয়ার হত্যাকাণ্ডের পর,  রাজীব-দিয়ার হত্যার বিচার সহ ৯ দফা দাবিতে আন্দোলন হয়, আন্দোলনে দাবিকৃত সড়ক নিরাপত্তা আইন করার কথা থাকলেও তা হয়নি, হয়েছে ‘সড়ক পরিবহণ আইন”  যেখানে বেপরোয়াভাবে চালিয়ে হত্যা করলে সর্বোচ্চ ৫ বছর কারাদণ্ড সহ ১৪ টি বিধান রাখা হয়, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮ এ সংসদে আইনটি পাশ হয় ও ১লা নভেম্বর ২০১৯ থেকে কার্যকর করার কথা ঘোষণা করেন। আদৌ কি সেই আইন বাস্তবায়িত হবে?

গত ২ নভেম্বর ২০১৯ সকালে নারায়ণগঞ্জের  বিআরটিএ’ পরিদর্শনে এসে সড়ক পরিবহন মন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ১ নভেম্বর থেকে আইন কার্যকর করার কথা থাকলেও – এই আইন কার্যকরের জন্য এখন সারাদেশে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো হচ্ছে। আগামী ৯ নভেম্বর ২০১৯ এই প্রচারণা চলবে এবং এসময় কোনও পরিবহনের বিরুদ্ধে নতুন আইনে মামলা দায়ের না করার জন্য নির্দেশ দেন

হটাত করে, আইনের বিভিন্ন ধারা সংশোধনের দাবি জানিয়ে, দেশে ধর্মঘট শুরু করে পরিবহন শ্রমিকরা – তারা সড়কে নেমে, গণপরিবহনের পাশাপাশি ব্যক্তিগত গাড়ি, রিকশা, মোটরসাইকেলসহ সবধরনের যানবাহন চলাচলে আটকে দেয়,  সড়কে অনেক গাড়ির চালক ও যাত্রীদেরকে হেনস্থা ও মারধোর করে এবং মুখে  পোড়া মবিল মাখিয়ে দেয়। তারা হাসপাতালগামী অ্যাম্বুলেন্স আটকে রাখায় শিশুর মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে ,গুটি কয়েক সন্ত্রাসির সড়কে নৈরাজ্য সন্ত্রাসি কর্মকাণ্ড দেখছিলেন সকলেই, আর উৎশৃঙ্খল কর্মীরা নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা ইলিয়াস কাঞ্চনের ছবিকে প্রকাশ্য রাজপথে অবমাননা করে – সড়কে ত্রাসের সৃষ্টি করতে থাকে অবাধে।  ২৪ নভেম্বর ২০১৯ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রির সাথে পরিবহণ নেতা সাজাহান খান সহ নেতাদের বৈঠকে “পরিবহণ আইন””৩০শে জুন ২০২০ পর্যন্ত স্থগিত করেন

অথচ এই আইনটি করায় ক্রোধে আক্রোশে শিক্ষার্থী হত্যায় নামে চালকরা, তাদের আক্রোশের প্রথম শহিদ সেন্ট জসেফের মেধাবি শিক্ষার্থী আদনান তাসিন, একে একে শিক্ষার্থীদের প্রাণ কাড়া শুরু হয়,  শুধু ঢাকা সিটি এলাকায়ই প্রান কেড়ে নেয়  ফাইযা, আদনান তাসিন, আবরার, লাবণ্য, তানজিলা, আরিফ, সাব্বির, আবিরসহ অনেকেরই, আর সিলেটের ওয়াসিম, গাজীপুরে সালাহুদ্দিন, সাভারের শিল্পিকে চলন্ত বাস থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে হত্যা করে-সংবাদে বলা হয়,“গাড়ি টি জব্ধ করা হয়েছে তবে ঘাতক চালক ও হেল্পার পলাতক” –  তার পর আর কে পায় আর এই ঘাতকদের? তার পর আবার নুতুন খবরে ঢাকা পরে পুরাতন খবর- সেই গদ বাঁধা একই কাহিনী

সড়ক দুর্ঘটনা রোধে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ‘এই বিষয়টা লক্ষ্য রাখতে হবে—যারা গাড়ি চালাচ্ছে, তারা মাদক সেবন করে কি-না? তাদের ডোপ টেস্টের মাধ্যমে তা পরীক্ষা করা দরকার। প্রত্যেকটা চালকের এ পরীক্ষাটা একান্তভাবে অপরিহারর্য। এ পরীক্ষাটা করতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আরেকটা প্রবণতা আছে আমাদের গাড়ির ড্রাইভারদের, ওভারটেক করা। একটা গাড়ি চলে গেছে এটাকে ওভারটেক করতে হবে। তখন হুঁশ থাকে না, বেহুঁশ হয়ে ওভারটেক করতে গিয়ে অ্যাকসিডেন্ট করে। এই প্রবণতাটাও বন্ধ করতে হবে।’ যানবাহনের ফিটনেস নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করে সরকারপ্রধান বলেন, ‘গাড়ির ফিটনেস দরকার, সেগুলো বিশেষভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা, ড্রাইভারদের বিশ্রাম নিশ্চিত করতে হবে। প্রাইভেট সেক্টর ও সরকারি সেক্টর সবাইকে এ বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। ড্রাইভার বিশ্রাম নিলো কি-না, খাবার খেলো কি-না, এ বিষয়টা দেখতে হবে।’  সড়ক দুর্ঘটনা রোধে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী’র উপদেশ আমলে নিলে দেশে সড়ক হত্যা কমে আসবে।

উল্লেখ্য যে, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি প্রফেসর আনোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে ৯ সদস্যের কমিটিতে বুয়েটের শিক্ষক, সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধি, মালিক ও শ্রমিক নেতারা ছিলেন। ২০১২ সালের মাঝামাঝি কমিটির সদস্যরা স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদি মিলিয়ে ৭৮টি সুপারিশ করেন। কিন্তু এর বেশির ভাগ এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। সরকারের সদিচ্ছার অভাবেই এমনটি হয়েছে। লক্ষণীয় দিক হল ৩০২ ধারা বলবৎ থাকাকালে দেশে সড়কে হতাহতের হার কিছুটা হ্রাস পায়। এই ধারায় মামলা বাতিলের পর পরিবহন শ্রমিকরা হয়ে উঠেছেন আরো বেপরোয়া। যে কারণে সড়ক দুর্ঘটনার হার আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে চলেছে। ব্যক্তিত্ব ও বিবেক হীন কেনো কোনো পরিবহন শ্রমিক কর্তৃক ঠাণ্ডা মাথায় নৃশংসভাবে পথচারী, রিকসা ও স্কুটার চালককে গাড়ির চাকায় পিষ্ট করে হত্যা করার ঘটনাও ঘটেছে। তাই এখনই সরকার কঠোর ব্যবস্থা না নিলে এই মৃত্যুর মিছিল বাড়তে থাকবে।

অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, দেশের সড়কগুলোতে প্রায় অর্ধকোটি অদক্ষ, ভুয়া ও লাইসেন্সবিহীন চালকের হাতে জিম্মি যাত্রীরা। বেপরোয়া গাড়ি চালাতে বরং এদের দক্ষতা রয়েছে। এরাই দাপিয়ে বেড়াচ্ছে সারাদেশের সড়ক। সড়কে হতাহতের হার বাড়ার কারণ এরাই অধিকাংশ ক্ষেত্রে। দুঃখজনক যে, এই বিরাট সংখ্যক অদক্ষ চালকের বিষয়ে কোন তদারকি নেই সরকারের। যত যানবাহন রয়েছে তার অর্ধেক চালকই লাইসেন্সধারী নয়। এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ২৪ লাখ অদক্ষ ও লাইসেন্সহীন চালক রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় এক লাখ অদক্ষ চালক বাস, ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানসহ ভারি যানবাহন চালায়। এমনকি অধিকাংশ মোটরসাইকেল চালকের নেই লাইসেন্স। যখন বিআরটিএ’তে নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা প্রায় ৪৬ লাখ ৭৯ হাজার ৬১৩টি – সেই সময়ে যানবাহন চালানোর জন্য লাইসেন্স নিয়েছে ১৮ লাখ ৬৯ হাজার ৮১৬ জন চালক। তাহলে বাকি যানবাহন কারা চালায়?

২০১৪ সালে সরকারের মন্ত্রী পরিবহন শ্রমিক নেতা তালিকা প্রদান করে কয়েক লক্ষ অদক্ষ পরিবহন শ্রমিককে লাইসেন্স প্রদানের জন্য সড়ক ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয় এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করেছিলেন। মন্ত্রীর সে সময়ের বহুল আলোচিত ও সমালোচিতা বক্তব্যটি ছিল, ‘বাস চালকরা রাস্তার গরু-ছাগল চিনলেই হল।’ তবে মন্ত্রীর বক্তব্যে ‘মানুষ’ কথাটি ছিল না।

‘সড়কে সন্তান স্বজনহারা অভিভাবক ফোরাম’ পক্ষ থেকে দাবি

(১) সড়ক হত্যা বন্ধে লাইসেন্স বিহীন, ভুয়া লাইসেন্স ও মাদকসেবি চালক সড়ক থেকে অপসারণ করতে হবে,

(২) হত্যাকারীদের গ্রেফতার ও সাজা নিশ্চিত করতে হবে

(৩) সড়ক নিরাপত্তা আইন যথাযথ কার্যকর করতে হবে

(৪) সড়ক নিরাপত্তা আইনের ১০৫ ধারা সংশোধন করে ৩০২ ধারা পুনঃ স্থাপন করে মৃত্যুদণ্ড / যাবৎজিবন করতে হবে এবং

(৫) সড়ক নিরাপত্তা আইনে পরিবহণ মালিকদেরকেও সাজার বিধান রাখতে হবে ( হত্যাকারীকে পাওয়া না গেলে মালিককেই সাজার আওতায় আনতে হবে)

(৬) সড়কে সন্তান স্বজনহারা পরিবারকে ক্ষতিপুরুন-সহ তাদের পরিবারের দায়িত্ব রাষ্ট্রকে নিতে হবে

(৭) খুনী যানবাহনটি/হত্যায় ব্যবহৃত যানবাহনটি মুল আসামী গ্রেফতার না করা পর্যন্ত থানার জিম্মায় রাখতে হবে।

"We want Justice for Adnan Tasin"