টপিকঃ ঝটিকা সফরে নারায়ণগঞ্জ - কদম রসুল দরগাহ

https://i.imgur.com/UwniHXAh.jpg

গত বছর ২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাসের ২৪ তারিখে গিয়েছিলাম নারায়ণগঞ্জ সফরে। সদস্য আমরা এক পরিবারের চারজন। উদ্দেশ্য ছিল নারায়ণগঞ্জের কিছু প্রাচীন ও দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখা। সেই উদ্দেশ্যে আমরা সকাল সকাল বেরিয়ে যাই বাড়ি থেকে। বাড্ডা থেকে আসমানী পরিবহনের বাসে ১ ঘণ্টায় চলে আসি মদনপুর চৌরাস্তায়। রাস্তা পার হয়ে সকালের নাস্তা করে নিয়ে একটা সিএনজি অটোরিকশা রিজার্ভ করি ৩০০ টাকায় গোটা আটেক স্থানে যাবো বলে।

https://i.imgur.com/NDm70Lch.jpg


প্রথম লক্ষ্য ছিল বন্দর মসজিদ (মিলের মসজিদ) বলে একটি পুরনো ৩ গম্বুজ মসজিদ দেখার। কিন্তু সেটি খুঁজে বের করতে না পেরে চলে যাই কাছাকাছি থাকা ১নং ঢাকেশ্বরী দেব মন্দিরে। মন্দিরটি দেখে আমরা চলে আসি নারায়ণগঞ্জের নবীগঞ্জে অবস্থিত T Hossain House এর সামনে। শত বছররে পুরনো কিন্তু এখনো ঝকঝকে চমৎকার বাড়িটি দেখে আমরা চলে আসি “কদম রসুল দরগা”।

https://i.imgur.com/FYDidndh.jpg



নারায়ণগঞ্জের একটি চমৎকার যায়গা হচ্ছে কদম রসুল দরগা। নারায়ণগঞ্জ শহরের বিপরীত দিকে শীতলক্ষ্যা নদীর পূর্ব পাড়ে নবীগঞ্জে অবস্থিত কদম রসুল দরগাহ। চমৎকার এই দরগাহটিতে রয়েছে আশ্চর্য একটি জিনিস। কথিত আছে এখানে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর কদম মোবারকের ছাপ সংবলিত একটি পাথর রয়েছে। এর জন্যই দরগাহ এর নামকরণ হয়েছে কদম রসুল দরগাহ। একটি সুউচ্চ স্থানে কদম রসুল দরগাহ অবস্থিত।



https://i.imgur.com/NK312tAh.jpg



https://i.imgur.com/DOknyi8h.jpg



https://i.imgur.com/bTmJLYAh.jpg



https://i.imgur.com/3fJAtJih.jpg

এখানে দেখতে পাবেন বিশাল উঁচু একটি প্রবেশ তোড়ন। চমৎকার কারুকাজ করা সুন্দর সুউচ্চ এই স্থাপনা দেখে মনে হবে একটি সুন্দর মসজিদ বা দরগা। আসলে এটি একটি প্রবেশ তোড়ন। অনেকগুলি সিঁড়ি ডিঙ্গিয়ে আপনাকে উঠতে হবে উপরে। এই তোড়নটি মোটামুটি পাঁচতালা দালানের উচ্চতার সমান। সিঁড়ি দিয়ে উঠার আগে জুতা খুলে হাতে নিয়ে নিতে ভুলবেন না।

https://i.imgur.com/KxVcVBQh.jpg



https://i.imgur.com/hUx501Lh.jpg



https://i.imgur.com/9y51Hihh.jpg



https://i.imgur.com/fwnQtUnh.jpg

তোড়ন পার হয়ে ভিতরে ঢুকে দেখবেন উত্তর দিকে রয়েছে একটি মসজিদ আর দক্ষিণ দিকে আছে একটি কবরস্থান যেখানে রয়েছে ১৭টি পাকা কবর। এই দুইয়ের মাঝে আছে ছোট্ট একটি সাদা শ্বেতপাথরের এক গম্বুজ বিশিষ্ট মাজার। এখানেই রয়েছে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর কদম মোবারকের ছাপ সংবলিত পাথরটি। বড়সড় একটি খড়ম আকৃতির কালো পাথর এটি।  আগে সব সময়ই দেখতে চাইলে দেখাতো কিন্তু এখন নির্দিষ্ট কিছু দিনেই শুধু কাচের বাক্স থেকে বের করে দেখায়। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী এটি মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর কদম মোবারকের ছাপ। অবশ্য সত্যিই এটি মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর কদম মোবারকের ছাপ কিনা সেটা নিয়ে অনেক মতভেদ রয়েছে। আমাদের আলোচ্য বিষয় সেটি নয়। বিশ্বাস করা না করা আপনার ব্যাপার। এখানে এই পাথরটি গোলাপজল মিশ্রিত পানির মধ্যে চুবিয়ে রাখা হয়, আর দর্শনার্থীদের একটি গ্লাসে করে সেই পানিয় পান করতে দেয়া হয়।

https://i.imgur.com/txP2grch.jpg



https://i.imgur.com/Wmr5cXih.jpg



https://i.imgur.com/ZQrkhs7h.jpg



https://i.imgur.com/Qcn7WZkh.jpg



https://i.imgur.com/wRt4bMxh.jpg



https://i.imgur.com/S1oQNcvh.jpg

আগেই বলেছি মাজারের পাশে রয়েছে কবরস্থান। কবরস্থানের ভিতরে রয়েছে বিশাল বড় কেটি কাঠ গোলাপের গাছ। সেই কাঠগোলাপের গাছের একটি ডালে মহিলারা আজমির শরীফের লাল-হলুদ সুতা বাধেন কোন মানত করে। অনেক সুতা বাঁধা আছে, আরোও বাঁধা চলছে। কোন একটা মনোবাসনা পূরণের নিয়ত করে এই সুতো বাঁধা হয়। তাদের বিশ্বাস এতে করে তাদের সেই মনোবাসনা পূরণ হয়ে যাবে। কত বিচিত্র মানুষের মন।

https://i.imgur.com/GqTsGKYh.jpg



https://i.imgur.com/nVDkOueh.jpg



https://i.imgur.com/FI3YeIjh.jpg



https://i.imgur.com/W6TXv4yh.jpg

মনে রাখবেন, আরবি সনের ১২ই রবিউল আউয়াল তারিখ থেকে ১৫দিন ব্যাপী বিশাল এক মেলা বসে এখানে। এই কদম রসুল দরগার কাছেই আরেকটি মাজার রয়েছে, যেটি হানিফ চিস্তির মাজার নামে পরিচিত।

https://i.imgur.com/nYgoX8Zh.jpg

কথিত আছে, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) মেরাজের রাত্রে বোরাকে উঠবার সময় বেশকিছু পাথরে তার পায়ের ছাপ পরে। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত পাথরটি আছে জেরুজালেমে। তাছাড়া আর কিছু পাথর রয়েছে ইস্তাম্বুল, কায়রো এবং দামেস্কতেও। আমাদের বাংলাদেশেও এমন দুটি পাথর রয়েছে, যার একটি আছে চট্টগ্রামে আর অপরটি রয়েছে নবীগঞ্জ কদম রসুল দরগায়।

https://i.imgur.com/Pn7Fp65h.jpg

মির্জা নাথান ১৭শ শতকে রচিত তার বিখ্যাত "বাহির-স্থানই গায়েবী" বইটিতে সর্বপ্রথম নবীগঞ্জের এই পাথরটির কথা উল্লেখ করেন। সম্রাট আকবরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণাকারী আফগান সেনাপ্রধান মাসুম খান কাবুলি, পদচিহ্ন সংবলিত এ পাথরটি একজন আরব বণিকের কাছ থেকে কিনেছিলেন। তার অনেক পরে ঢাকার জমিদার গোলাম নবী ১৭৭৭-১৭৭৮ সালে নবীগঞ্জের একটি উঁচু স্থানে একটি এক গম্বুজ বিশিষ্ট দরগা নির্মাণ করে সেখানে পবিত্র সেই পাথরটি স্থাপন করেন।  পরে কদম রসুল দরগার প্রধান ফটকটি গোলাম নবীর ছেলে গোলাম মুহাম্মদ ১৮০৫-১৮০৬ সালে নির্মাণ করেন।

https://i.imgur.com/x3HWI4Ch.jpg



https://i.imgur.com/n6zMdFMh.jpg

সতর্কতাঃ
১। দরগার সামনের রাস্তায় অনেকেই দোকান সাজিয়ে বসেছে আগরবাতি, মোমবাতি, গোলাপজল, আতর, সুতা ইত্যাদি নিয়ে। চাইলে আপনি সেখান থেকে কিনতে পারেন, তবে কিনতেই হবে বা দরগায় এগুলি আপনাকে দিতেই হবে তা কিন্তু নয়।
২। জুতা খুলে মাজারে প্রবেশ করতে হয়।
৩। জুতা খুলে অবশ্যই হাতে করে নিয়ে যাবেন। বাইরে রেখে গেলে ফিরে এসে নাও পেতে পারেন।তবে এখন জুতা রাখার জন্য আলাদা ঘর ও লোক রাখা হয়েছে।
৪। ভেতরে প্রকাশ্য গঞ্জিকা সেবন হয়ে থাকে কখনো সখনো, মেলাতে অবশ্যই। তাই অপরিচিতদের সাথে না মেশাটাই ভালো সেখানে। বর্তমানে গঞ্জিকা সেবন কমেছে।
৫। কোন খাদেম বা অন্য কাউকে পাত্তা দেয়ার দরকার নেই, নিজের মত করে দেখে চলে আসুন। যায়গাটা নিরাপদ, অন্যান্য মাজারের মত টাউট বাটপারের ছড়াছড়ি নেই। তবুও সাবধান থাকতে কোন দোষ নেই।


https://i.imgur.com/xySY2l2h.jpg



https://i.imgur.com/3qSgJ51h.jpg



https://i.imgur.com/WFqJ9Nrh.jpg



https://i.imgur.com/0QAiwBXh.jpg



https://i.imgur.com/nl1QDznh.jpg



জিপিএস কোঅর্ডিনেশন : 23°37'49.3"N 90°31'11.9"E

পথের হদিস : ঢাকা থেকে বাসে মদনপুর, মদনপুর থেকে শেয়ার সিএনজি বা ইজি বাইকে কদম রসুল দরগাহ এর সামনে।
তাছাড়া বাস বা ট্রেনে নারায়ণগঞ্জ গিয়ে নৌকায় নদী পার হয়ে রিকসা নিয়ে চলে আসা যায় কদম রসুল দরগায়।

https://i.imgur.com/h7fQTv5h.jpg

বি.দ্র. : বেড়াতে গিয়ে যেখানে সেখানে ময়লা না ফেলি। চিপস, চকলেট, বিস্কিটের খালি প্যাকেট রাস্তায় ছুড়ে ফেলা থেকে বিরতো থাকি।

এখনো অনেক অজানা ভাষার অচেনা শব্দের মত এই পৃথিবীর অনেক কিছুই অজানা-অচেনা রয়ে গেছে!! পৃথিবীতে কত অপূর্ব রহস্য লুকিয়ে আছে- যারা দেখতে চায় তাদের নিমন্ত্রণ।

Re: ঝটিকা সফরে নারায়ণগঞ্জ - কদম রসুল দরগাহ

দেওয়ালের কারুকাজ  love

Re: ঝটিকা সফরে নারায়ণগঞ্জ - কদম রসুল দরগাহ

Jol Kona লিখেছেন:

দেওয়ালের কারুকাজ  love

শুকরিয়া মন্তব্যের জন্য।

এখনো অনেক অজানা ভাষার অচেনা শব্দের মত এই পৃথিবীর অনেক কিছুই অজানা-অচেনা রয়ে গেছে!! পৃথিবীতে কত অপূর্ব রহস্য লুকিয়ে আছে- যারা দেখতে চায় তাদের নিমন্ত্রণ।

Re: ঝটিকা সফরে নারায়ণগঞ্জ - কদম রসুল দরগাহ

কারুকাজ  গুলা খুব নিক্ষুত হয়েছে । ছবি গুলাও খুব সুন্দর ভাবে উঠানো হয়েছে ।

Re: ঝটিকা সফরে নারায়ণগঞ্জ - কদম রসুল দরগাহ

aburaihan.me লিখেছেন:

কারুকাজ  গুলা খুব নিক্ষুত হয়েছে । ছবি গুলাও খুব সুন্দর ভাবে উঠানো হয়েছে ।

ধন্যবাদ মন্তব্যে প্রসংসার জন্য।

এখনো অনেক অজানা ভাষার অচেনা শব্দের মত এই পৃথিবীর অনেক কিছুই অজানা-অচেনা রয়ে গেছে!! পৃথিবীতে কত অপূর্ব রহস্য লুকিয়ে আছে- যারা দেখতে চায় তাদের নিমন্ত্রণ।