সর্বশেষ সম্পাদনা করেছেন তৌফিক ইমাম (০৯-১১-২০১৭ ০০:০৪)

টপিকঃ The Harder They Come (1972) চলচিত্র এবং কিছু এলোমেলো উপলব্ধি

"Well, they tell me of a pie up in the sky
Waiting for me when I die
But between the day you're born and when you die
They never seem to hear even your cry"

গানের কথাগুলো দিয়ে যেন স্রষ্টাকেই কটাক্ষ করছেন শিল্পী! আরো ভালোভাবে বললে কথাগুলি আসলে জ্যামাইকার খ্রিস্টান মিশনারিজগুলোকে কটাক্ষ করে গাওয়া।
গানটি জ্যামাইকার ইতিহাসে এখন পর্যন্ত সেরা মুভি The Harder They Come এর। খুবই দ্রুত গল্পের নাতিদীর্ঘ এই ছবিতে দেখা যায় গ্রামের সাধারন এক যুবকের গায়ক হবার এক বুক স্বপ্ন নিয়ে শহরে আসা। আমেরিকান ড্রিমের মত পুঁজিবাদের এই যুগে এই স্বপ্ন দুনিয়ার প্রতিটি প্রান্তের সমস্ত সাধারন যুবকেরই স্বপ্ন। অর্থ,খ্যাতি আর নিজের ভাগ্যের পরিবর্তনের স্বপ্ন। এরপর বাস্তবতায় ধাক্কা খেয়ে বিভিন্ন অড জব করে শেষে সে জড়িয়ে পড়ে জ্যামাইকার মাদক ব্যাবসার চক্রে। এরপর কয়েক মুহূর্তের জন্য স্বপ্ন হাতে পাওয়া আর সেইসাথে তার সমাপ্তিও স্বপ্নের মাধ্যমেই। আধুনিক শোষণের মডেলে সে অতি সাধারন একজন উপলক্ষ মাত্র। মুভির কাহিনী না হয় দর্শকের নিজের ওপরই ছেড়ে দিলাম, তবে মুভিতে ছোট্ট এই ক্যারিবিয়ান দেশটির মানুষের আর্থ-সামাজিক চিত্র এতটা স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, যে এই মুভির ওপর ভিত্তি করে পরে উপন্যাস লেখা হয়েছে। সাধারনত যেটার উল্টোটা হয়। তবে এক কথায় পুরো ছবির ক্যামেরার কাজ যেমন অসাধারন, তেমনি anti hero হিসেবে জিমি ক্লিফের অভিনয়ও অতুলনীয়। সেইসাথে অসাধারন মিউজিক কম্বিনেশন।


সাম্রাজ্যবাদ একটি দেশের ভাষা,সংস্কৃতি,ধর্ম, ইতিহাস কিভাবে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিতে পারে, তার একেবারে বাস্তব আদর্শ উদাহরন হল জ্যামাইকা। প্রথমে স্প্যানিশ এবং পরে ব্রিটিশ উপনিবেশ এবং দাস প্রথার শিকার জ্যামাইকা প্রথম স্বাধীনতা পায় ১৯৬২ সালে। অবশ্য এখনো এটি কমনওয়েলথ এর অন্তর্গত দেশ। ১৯৭২ সালে বানানো এই ছবিতে স্বাধীনতার ঠিক এক দশক পরের অবস্থা নিয়ে। এতকালের দাসত্বের পর সে দেশের অধিবাসীদের নিজস্ব ভাষা বলে আর কিছু নেই। জ্যামাইকার সাধারন মানুষের ভাষাকে বলা হয় 'Jamaican Patois'। এটি ইংরেজি থেকে উদ্ভূত একটি creole ভাষা। শুনতে অনেকটা ইংরেজির মত লাগলেও ঠিকঠাকমতো না জানলে একেবারেই উল্টো অর্থ হয়ে যাবে। যেমন মোস্তফা সরোয়ার ফারুকী তার ব্যাচেলর ছবিতে জ্যামাইকান শিল্পী বব মার্লির গান "No woman no Cry" এর বাংলা করেছিলেন "সব সমস্যার মূল হল নারী।" তবে জ্যামাইকান ভাষায় এর অর্থ "প্রিয়তমা, আর কেঁদোনা।"  মোটা দাগে উচ্চবিত্ত আর নিম্নবিত্তে ভাগ হওয়া জ্যামাইকান সমাজের উচ্চবিত্তের লোকেরা অবশ্য পরিষ্কার ইংরেজিতে কথা বলে। পুরো ছবিতে সময় এগোবার সাথে সাথে নায়কের ভাষার পরিবর্তনও দেখা যায়। অর্থাৎ স্বাধীনতার এক দশক পরেও শুদ্ধভাবে সাবেক মনিবের ভাষা আয়ত্ত করতে পারা ক্লাস আর স্ট্যাটাসের পরিচয়। আমাদের দেশেও এতকাল পর সাহেবদের চেয়েও সাহেব হবার এই প্রবণতা এতটুকুও কমেনি। মাত্র কয়েকদিন আগে বিজনেস ইনসাইডার এর বিখ্যাত সাংবাদিক Kim Iskyan বাংলাদেশে এসে তথাকথিত এরিস্টোক্রেসির প্রতীক ঢাকা ক্লাবকে নিয়ে কটাক্ষ করে লিখেছেন। সেইসাথে পুরো ছবিতে বিভিন্ন সময় রং ফর্সা করা থেকে শুরু করে অন্যান্য ইউরোপীয় এবং আমেরিকান প্রসাধনীর বিজ্ঞাপন গুলো কৌশলে দেখিয়ে ডিরেক্টর নাগরিকদের মানুষিক অবস্থারও উদাহরন দিয়েছেন। বৈধ- অবৈধ যেটাই হোক, জ্যামাইকার অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি গাঁজা চাষ। আর এই গাঁজাও কিন্তু জ্যামাইকাতে গেছে উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে আমাদের ভারতবর্ষ থেকে। সে সময় ব্রিটিশটা বিভিন্ন দেশ থেকে আনা দাসদের একসাথে কাজ করানোয় এমন সংস্কৃতির মিশ্রণ ঘটেছে।


তবে জ্যামাইকানরা এই মনিবদের ভাষা দিয়েই তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ গড়েছে, গুরু বব মার্লি কিংবা এই ছবির নায়ক বিখ্যাত গায়ক জিমি ক্লিফের মত শিল্পীরা তাদের নিজস্ব এই Creole ভাষায় যে গানের ধারা সৃষ্টি করেছেন, তা সারা দুনিয়ায় পরিচিতি পেয়েছে reggae ধারার গান হিসেবে। এই গানগুলোতে কথায় কথায় দুঃশাসন, সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে করা প্রতিবাদের গানগুলো জনপ্রিয় হয়েছে সমস্ত দুনিয়াজুড়ে। আগের গানটিরই কয়েকটি লাইন,

"Well, the oppressors are trying to keep me down
Trying to drive me underground
And they think that they have got the battle won
I say forgive them Lord, they know not what they've done."


সাম্রাজ্যবাদীদের অন্যতম একটি যুক্তি হল কলোনীর অধিবাসীরা নিজেরা নিজেদের শাসন করতে পারেনা। জ্যামাইকার ইতিহাস কিন্তু তাদের এই কথাই কিছুটা সমর্থন করে। যেমন স্বাধীনতার পরপরই অপরাধের হার বিবেচনায় জ্যামাইকা ছিলো পৃথিবীর অন্যতম কম অপরাধপ্রবন দেশ। কিন্তু বর্তমানে এটি অন্যতম অপরাধপ্রবন দেশ! আফ্রিকা-ক্যারিবিয়ার অনেক দেশেই এমন অনেক উদাহরন পাওয়া যায়। তবে এর পেছনের কারন এই সাবেক মনিবেরাই কি না তা কে জানে।


সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঠিক কিভাবে করা উচিত, সেটা নিয়ে অনেকেই বেশ দ্বিধান্বিত। অনেকেই মত দেন সাম্রাজ্যবাদের আগের সময়ের সংস্কৃতি পুনরুজ্জীবনের কিংবা শুধু নিজের দেশের অংশটুকুই ধারণ করতে, বিশ্বায়নের ছোঁয়া না লাগাতে। আমাদের দেশের পণ্ডিতদের মধ্যে এই প্রবণতা আরো বেশি। দেশ, জীবনযাপনের ধারা, প্রযুক্তি সবকিছু বদলালে সেই সংস্কৃতিও না বদলালে যে তা মানুষের রুচির চাহিদা মেটাতে পারবেনা, সেটা তারা মানতে নারাজ। অন্যদিকে অন্যান্য ধনী রাষ্ট্রও বিশ্বায়নকে স্বীকার করে নিজেদের সংস্কৃতিও সেটির মত করেই বদলে নিয়েছে। সেজন্যই আমেরিকার নাগরিকেরা ইংরেজি রক বা পপ গান শোনে, আবার কোরিয়া-জাপান-চীন-ফ্রান্সের নাগরিকেরাও ইংরেজি রক বা পপ গান শোনে তবে সেই সাথে তাদের নিজেদের ভাষার রক বা পপ গান সৃষ্টি করে সেগুলোও শোনে। আর আমাদের মত দেশে সেটা রোধ করে জোর করে সাবেকী সংস্কৃতির ধারা গেলানোতেই পরম তৃপ্তি লাভ করেন। বিশ্বায়নের যুগে এই প্রাচীন অস্ত্র নিয়েই  অন্যদের যৌবনের তেজের সাথে যুদ্ধ করতে হচ্ছে।  অন্তত নিজের দেশের দিকে তাকালে তার ফলাফলটা কিন্তু দেখি ভয়াবহ। দিন শেষে মানুষের যেটা ভালো লাগে, সেটাই গ্রহন করে, গেলানো বস্তু না। আর মধ্য থেকে আমরা অপেক্ষাকৃত নিম্নমানের , অনুকরণপ্রিয় স্থুল রুচির কালচারের জন্ম দিচ্ছি।

আরেকটি উল্লেখযোগ্য জিনিস ডিরেক্টর এই ছবিতে আরেকবার উপলব্ধি করিয়েছেন যে , যৌনতার বিকল্প কোনকিছুই নয়। পরিবার, ভালোবাসা, ভয়, ধর্ম কোনকিছুই মানুষের যৌনতা আর প্রেমকে ঠেকিয়ে রাখতে পারেনা। তবে মানুষের ক্ষুধা আবার নিমেষেই এই ভালোবাসা আর যৌনতাকে পরাজিত করে ফেলে।

ডিরেক্টর Perry Henzell তার এই ছবিটি নিয়ে ভেনিস চলচিত্র উৎসবে যান, তখন এই নতুন ডিরেক্টর আর তার বিদেশী ছবিকে কেও তেমন পাত্তা দেয়নি। তবে সেখানে ছোট্ট একটি ঘর ভাড়া করে ছবিটি প্রদর্শন শুরুর পর থেকেই ঘটনা বদলে যায় আর এটি লাভ করে অন্যতম ক্লাসিক ক্যারিবিয়ান চলচিত্রের মর্যাদা।

লেখাটি GPL v3 এর অধীনে প্রকাশিত