টপিকঃ বাংলার মুসলমানদের অবনতির কারণ

বাংলার মুসলমানদের অবনতির কারণ

00হাণ্টারের মতে বাংলার মুসলমানদের অবনতির কারণ ছিল নিম্নরূপ :
ক. রাজ্য হারিয়ে মুসলমানরা সকল প্রকার রাষ্ট্ৰীয় সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছে; এর পিছনে ব্রিটিশ সরকারের নীতি কাজ করেছে।
খ, শাসকশ্রেণী হিসাবে নিম্ফল অহংকার, যার ফলে পরিবর্তিত অবস্থার সঙ্গে খাপখাওয়াতে পারেনি।
গ. রাজভাষা ইংরাজি শিক্ষা না করায় তারা সরকারি সওদাগরি চাকরির সুযোগ হারিয়েছে। ঘ, ধনীদের কাছে থেকে উৎকোচ, ভেট, অত্যধিক কর নিয়ে ইংরাজরা মূলধন আত্মসাৎ করেছেন। ফলে তারা দরিদ্র-দশায় পতিত হয়েছে।
ঙ.প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হয়ে বাঙালি হিন্দুদের কাছে পরাজিত হয়েছে।
চ. জনশিক্ষা ব্যবস্থায় ধর্মশিক্ষার স্থান না থাকায় তারা আধুনিক শিক্ষা গ্ৰহণ করতে অনিচ্ছুক হয়েছে। The Indian Mussalinans, See chapter 4.
00সৈয়দ আমীর আলী “স্মারকপত্রে (১৮৮২) বলেছেন, ইংরাজ কোম্পানির দেওয়ানি রাজস্বনীতি ও লর্ড বেণ্টিঙ্কের শাসননীতির ফলে ভূসম্পত্তি, রাজস্ববিভাগ ও বিচার বিভাগের চাকুরি থেকে বঞ্চিত হয়ে মুসলমান সম্প্রদায় চরম দারিদ্র্যের মধ্যে পতিত হয়। একাধারে দারিদ্র্য ও অন্যধারে সরকারের শিক্ষানীতির ফলে মুসলমানরা আধুনিক শিক্ষা গ্রহণে ব্যর্থ হয়। ফারসি রহিত করা হয় বটে, কিন্তু ইংরাজি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়নি। ১৮৬৪ সাল পর্যন্ত মুন্সেফগিরি ও উকিলগিরি পরীক্ষা উর্দু অথবা ইংরাজিতে দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল। ফলে ইংরাজি শিক্ষার তাগিদ কমই ছিল। ইংরাজি ভাষা ও আধুনিক শিক্ষার অভাবে চাকুরির ক্ষেত্রে অন্য সম্প্রদায়ের সহিত প্রতিযোগিতায় টিকতে পারেনি তারা ; কোন কোন ক্ষেত্রে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও আমলাদের ষড়যন্ত্রের ফলে চাকুরি লাভে বঞ্চিত হয়। Mentorial of the National Mahoneclan Association, Calcutta, 1882.
00 খোন্দকার ফজলে রাবিব “দি অরিজিন অব মহামেডানস অব বেঙ্গল’ (১৮৯৫) গ্রন্থে মুসলমানদের পশ্চাদপদতার কারণ ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলেছেন যে, ইংরাজি ভাষার প্রবর্তন ও সেই ভাষার বিরুদ্ধে অন্ধভাবে পোষিত মুসলমানদের কুসংস্কার এবং সরকারি চাকুরির নতুন বিবিধব্যবস্থায় পূর্বের পদমর্যাদা থেকে অপসারণের ফলে তারা দারিদ্র্য ও বিস্মৃতির গহবরে নিমজ্জিত হয়েছে।
The Origin of Mahoneclans of Bengal. Calcutta. 1895





‘মোসলেম ক্রনিকলে জনৈক প্রবন্ধলেখক মুসলমানদের পতনের কারণ ব্যাখ্যা করেন। এভাবে :
ক. মুসলমানরা রাজ্য হারিয়ে “ভাববাদী হয়ে ওঠে, তারা অতীতের ঐতিহ্যের দিকে তাকিয়ে থাকত এবং গৌরবের কথা ভেবে দুঃখ প্রকাশ করত ; ইংরাজদের প্রভু বলে স্বীকার করতে পারেনি, ফলে যুগের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে দেরি হয়ে যায়।
খ. চাকুরি-বাকরী হারিয়ে যারা কৃষিকাৰ্য গ্রহণ করেছিল, তারা অদক্ষতার কারণে কৃষিতে উন্নতি করতে পারেনি।
গ. অর্থকরী ব্যবসায়ে তারা অমনােযোগী ছিল। সুদের ব্যবসায় 'হারাম" (নিষিদ্ধ) বলে মহাজনী করতে বিরত হয়।
ঘ. বিলাসিতা ও অমিতব্যয়িতার জন্য গরীব হয়ে পড়ে।
ঙ. ইউরোপীয় বিদ্যা ও বিজ্ঞান শিক্ষা সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা ছিল, ফলে আধুনিক শিক্ষা থেকে দূরে থেকে দুভাগ্যকে ডেকে আনে।
চ. সুবিধাপ্রাপ্ত হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছ থেকে সহানুভূতি লাভে ব্যর্থ হয়েছে। The Moslem Chronicle, 23 May 1896 (Supplementary).

দেলওয়ার হোসেন আহমদ ‘ল অব সাকসেশন" শীর্ষক একটি প্রবন্ধে মুসলমানের উত্তরাধিকার আইনে সম্পত্তি বণ্টনের ফলে সমাজ দরিদ্রে পরিণত হয় বলে উল্লেখ করেন। এবং ঐ আইনের সংশোধনের পক্ষে অভিমত ব্যক্ত করেন। একিনুদ্দীন আহমদ ও কতিপয় লেখক ঐ মতের বিরোধিতা করেন এবং সম্পত্তি বাড়াতে না পারা মানুষেরই অক্ষমতা — এই যুক্তিতে শাস্ত্রীয় আইনের অভ্রান্ততা প্রতিপন্ন করেন। The Moslem Chronicle, 23 May 1896 (Supplementary).
“হিন্দু মোসলমান (১৮৮৮) পুস্তকে শেখ আবদোস সোবহান বাংলার মুসলমান জমিদারদের পতনের কারণ হিসেবে তাঁদের বিলাসিত, ভৌগলিপসো, দায়িত্বহীনতা ও শিক্ষার প্রতি অমনোযোগিতার কথা বলেছেন। আমলার উপর জমিদারির দায়িত্ব দিয়ে মাসোহেব-চাটুকার পরিবৃত হয়ে বাইজী-বেশ্যা-খেমটা, গাচ-গানে অথবা মোরগ-লড়াই, কবুতর উড়ান ইত্যাদি কুক্রীড়ায় কালাতিপাত করেন। তাঁরা আধুনিক শিক্ষা ও যুগের দায়িত্ব সম্পর্কে উদাসীন। তাঁদের অযোগ্যতার ও অকৰ্মণ্যতার সুযোগ নিয়ে অসৎ আমলারা জমিদারি উৎসন্নে দেয়। তিনি মুসলমান জমিদারদের উপদেশ দিয়ে বলেছেন, আছে ? ... মোরগ লড়াই কবুতর উড়ান ইত্যাদি কুক্রীড়া সকল ত্যাগ করুন। জ্ঞানচক্ষু উন্মীলিত হইবে, বুঝিতে পরিবেন, আপনি এত ঋণী কেন। ... গাঁজা, আফিম, মদ, বেশ্য যদি কিছু অভ্যাস করিয়া থাকেন, শীঘ শীঘ্ৰ ত্যাগ করিয়া, বিষয় কাৰ্য্যে মন দিউন, অশিক্ষিত মুখ মদ্যপায়ী, বিলাসী, লম্পট, মাসোহেব ইয়ার, পূর্ণ অসভ্য, পূর্ণ চাষা,খানসামা, খেদমতগার লাঠিয়াল ত্যাগ করুন।
সূত্রঃ উনিশ শতকে বাঙালি মুসলমানের চিন্তা ও চেতনার ধারা—ওয়াকিল আহমদ

গোলাম মাওলা , ভাবুক, সাপাহার, নওগাঁ