টপিকঃ আলেকজান্ডারের ভারত আক্রমণের সময় বাংলাদেশ

আলেকজান্ডারের ভারত আক্রমণের সময় বাংলাদেশ
আলেকজান্ডারের ভারত অভিযান ভারতবর্ষের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা। এর পূর্ববতী ভারত ইতিহাসের অধ্যায়গুলি খুবই অস্পষ্ট এবং তমসাচ্ছন্ন। আলেকজান্ডারের ভারত অভিযানের পর থেকেই গ্ৰীক ইতিহাসকারগণের বিবরণীতে ভারত তথা বাংলাদেশের রাজবৃত্তের কাহিনী সম্পষ্ট।
খ্রিস্টপূর্ব ৩২৭ অব্দে আলেকজান্ডার যখন ভারতবর্ষ আক্রমণ করেন, তখন বাংলাদেশ একটি পরাক্রান্ত রাজ্য ছিল, সমসাময়িক গ্ৰীক লেখকগণের বর্ণনা থেকে তা স্পষ্টই বোঝা যায়। গ্ৰীক লেখকগণ গঙ্গারিডই (Gangaridi) অথবা গন্ডারিডাই (Giandaridi) নামে এক পরাক্রান্ত জাতির উল্লেখ করেছেন। এ জাতি যে বাংলাদেশের অধিবাসী সে সম্বন্ধে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু এ রাজ্যের যথার্থ অবস্থিতি ও বিস্তৃতি সম্পর্কে সমসাময়িক গ্ৰীক গ্রন্থকারগণ বিভিন্ন বর্ণনা দিয়েছেন। কেউ কেউ গঙ্গানদীকে এ রাজ্যের পূর্ব সীমা ও কেউ কেউ এর পশ্চিম সীমা বলে বর্ণনা করেছেন।
প্লিনি (Pliny) বলেন, গঙ্গা নদীর শেষ ভাগ এই রাজ্যের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।
গঙ্গারিডই জাতি সম্পর্কে ডিওডোরাস (Diodorus) এরূপ বর্ণনা দিয়েছেন, “ভারতবর্ষে বহু জাতির বাস। তন্মধ্যে গঙ্গারিডই জাতিই সর্বশ্রেষ্ঠ । এদের চার সহস্ৰ বৃহদাকায় সুসজ্জিত রণহন্তী আছে। এ জন্যই অপর কোন রাজা এ দেশ জয় করতে পারেননি। স্বয়ং আলেকজান্ডারও এই সমুদয় হস্তীর বিবরণ শুনে এ জাতিকে পরাস্ত করার দুরাশা ত্যাগ করেন।”
গ্ৰীক গ্রন্থকারগণ গঙ্গারিডই ছাড়াও প্রাসিঅয় (Prasioi) নামে অপর এক জাতির উল্লেখ করেছেন। প্রাসি অয়দের রাজধানীর নাম ছিল পালিবোথরা (পাটলি পুত্র) । গঙ্গারিডই ও প্রাসিঅয় এই দুই রাজ্যের মধ্যে যথার্থ সীমারেখা জানা যায়নি। টলেমির (Ptolemy) বৰ্ণনানুসারে প্রাসিঅয় রাজ্য গঙ্গানদী পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল এবং তাম্রলিপ্তি এর অন্তর্ভুক্ত ছিল । সম্ভবত প্রাসিআয়গণ গঙ্গারিডই দেশের পশ্চিমে বসবাস করত। আলেকজান্ডারের ভারত আক্রমণের সময় এই দুই জাতির পরস্পর সম্পর্ক সঠিক জানা যায় না। কাটিয়াস (Curtius) এ দুটিকে পৃথক জাতি বলে বর্ণনা করেছেন। ডিওডোরাস (Diodorus) গঙ্গারিডই ও প্রাসি অয়গণকে একটি অভিন্ন জাতি বলে উল্লেখ করেছেন। পুটার্ক (Pluntarch) এক স্থানে এই দুই জাতিকে গঙ্গারিডই রাজার অধীন এবং অন্যস্থানে এদের দুই পৃথক রাজার উল্লেখ করেছেন। পুটার্ক লিখেছেন, গঙ্গারিডই ও প্রাসি অয় রাজাগণ এক বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে আলেকজান্ডারের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। যাহোক, গ্ৰীক লেখকদের বর্ণনার উপর নির্ভর করে এরূপ অনুমান করা যেতে পারে, গঙ্গারিডই ও প্রাসিঅয় এই দুই জাতি একই রাজবংশের নেতৃত্বে যুগভাবে আলেকজান্ডারের বিরুদ্ধে অস্ত্ৰধারণ করেছিলেন। গ্ৰীক লেখকদের বর্ণনার উপর নির্ভর করে এও অনুমান করা যেতে পারে, আলেকজান্ডারের আক্রমণের সময় বাংলার রাজা মগধাদি দেশ জয় করে পাঞ্জাব পর্যন্ত স্বীয় রাজ্য বিস্তার করেছিলেন এবং তিনি ছিলেন পাটলি পুত্রের নন্দবংশীয় কোন রাজা ।
আলেকজান্ডার বিপাশা নদীর তীরে এসে উপস্থিত হলে সংবাদ পান, গঙ্গারিডই ও প্রাসি অয় রাজ্যের রাজা অথবা রাজাগণ এক বিরাট সৈনাবাহিনী নিয়ে তাকে বাধা প্ৰদান করতে প্ৰস্তুত হয়ে আছেন। এ সংবাদে গ্ৰীক সৈন্যগণ ভীত হয়ে আর অগ্রসর হতে চাইল না । অগত্যা দ্বিগ্বিজয়ী বীর আলেকজান্ডারকে বিপাশা নদীর তীর থেকে স্বদেশাভিমুখে প্রত্যাবর্তন করতে হয়। এটি সত্য, আলেকজান্ডারের আক্রমণের সময় পাটলিপুত্রে নন্দবংশীয় রাজা রাজত্ব করছিলেন। জৈন পরিশিষ্ট পার্বণে নন্দবংশীয় রাজাকে নাপিত কুমার’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। নন্দরাজা বাঙালি ছিলেন কিনা সে সম্বন্ধে সঠিক কিছু জানা যায়নি। কিন্তু এ সময় যে বাংলার রাজাই সমধিক শক্তিশালী ছিলেন প্রাচীন গ্ৰীক লেখকগণের উক্তি থেকে তা নিঃসন্দেহে প্ৰমাণিত হয় ।
00আলেকজান্ডারের ভারত আক্রমণের অব্যবহিত পরে বাংলাদেশ
আলেকজান্ডারের প্রত্যাবর্তনের পর চন্দ্ৰগুপ্ত-মৌর্য উত্তর-ভারতের এক বিস্তীর্ণ অঞ্চলের উপর মৌর্য বংশের প্রভুত্ব স্থাপন করেন। গ্ৰীক ও বৌদ্ধ গ্রন্থকারদের বর্ণনানুসারে গাঙ্গেয় উপত্যকা ও উত্তরবঙ্গে মৌর্য শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কয়েকটি সূত্রের উপর নির্ভর করে বলা যায়, বাংলা মৌর্য সাম্রাজ্যভুক্ত হয়েছিল।
কাটিয়াস-এর মতে, গঙ্গারিডই রাজ্যটি মগধের রাজা এ্যাগ্রামেস বা ধনানন্দের সাম্রাজ্যের অন্তভুক্ত ছিল। সুতরাং এটি অনুমান করা যেতে পারে, চন্দ্ৰগুপ্ত-মৌর্য মগধের নন্দ বংশের সিংহাসন দখল করলে বাংলাদেশ স্বাভাবিকভাবেই মৌর্য সাম্রাজ্যভুক্ত হয়।
দ্বিতীয়ত, হিউয়েন সাং বাংলাদেশকে অশোকের সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত একটি প্রদেশ উল্লেখ করেছেন। তিনি তাম্রলিপ্তি, কর্ণসুবর্ণ ও সমতট অশোকের বহু স্তম্ভের ধ্বংসাবশেষ লক্ষ্য করেছিলেন।
তৃতীয়ত, উত্তর বঙ্গের বগুড়া জেলার মহাস্থান গড়ে প্রাপ্ত ব্ৰাক্ষী ভাষায় উৎকীর্ণ শিলালিপি থেকে বাংলাদেশের উপর মৌর্য শাসনের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এই লিপিতে পুণ্ডবর্ধন নগরীর সাম্রাজ্যের সমৃদ্ধির কথাও উল্লেখিত হয়েছে এবং এর শাসন ব্যবস্থাও ছিল উন্নত।
মৌর্য সামাজ্যের পতনের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস তমসাচ্ছন্ন। মহাস্থান গড়ে শূঙ্গ যুগের কয়েকটি পোড়ামাটির মূর্তি ও নোয়াখালীতে প্রাপ্ত কয়েকটি শিলালিপি থেকে জানা যায়, মৌর্য বংশের পতনের পর শৃঙ্গ বংশের রাজত্বকালে বাংলার রাজনৈতিক জীবন স্থিতিশীল ছিল। এই যুগেও পুণ্ডবর্ধন নগরের সমৃদ্ধি অব্যাহত ছিল।
বাংলাদেশের কোন অংশ কুষাণ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল কিনা সে সম্পর্কে নিশ্চিত ভাবে কিছু জানা যায় না। বাংলা ও উড়িষ্যায় কুষাণ রাজাদের মুদ্রা পাওয়া গেছে। এতে কেউ কেউ ধারণা করেন, বাংলাদেশ কুষাণ সাম্রাজ্যের অন্তর্গত ছিল।
  কিন্তু ডঃ মজুমদার একে নিশ্চিত প্ৰমাণ বলে গ্ৰহণ করেননি। তাঁর মতে, কোন রাজা বা রাজবংশের মুদ্রগুলি অনায়াসেই নানা কারণে ভিন্ন রাজ্যে নীত হয়ে থাকে। সুতরাং কেবল মাত্র মুদ্রার উপর ভিত্তি করে এ ধরনের সিদ্ধান্ত করা সম্ভব নয়। মুদ্রা বাণিজ্যের মাধ্যমে স্বরাজ্য সীমা পার হয়ে অন্যস্থানে যেতে পারে।
টলেমির (Ptolemy) রচনা ও পেরিপ্লাস (Periplus) নামক গ্রন্থে খ্রিস্টীয় প্রথম ও দ্বিতীয় শতকে বাংলাদেশের নিম্নাঞ্চল নিয়ে এক শক্তিশালী রাজ্য গঠিত ছিল বলে উল্লেখ আছে। এই রাজ্যের রাজধানী শহর গঙ্গে (Gange) একটি প্রসিদ্ধ বন্দর ছিল। বাংলায় যে সূক্ষ্ম মসলিন তৈরি হত তা এই বন্দর থেকেই সুদূর পশ্চিম দেশে রপ্তানি করা হত। এই নগরের কাছেই সোনার খনি ছিল।
  ডঃ নীহার রঞ্জন রায়ের মতে, বাংলার সুবৰ্ণ বীথি ও সুবৰ্ণ গ্রামের উল্লেখ থেকে মনে করা হয়, বাংলায় সোনার খনি ছিল। পেরিপ্লাস গ্রন্থে নিম্ন গাঙ্গেয় ভূমিতে ‘ক্যালটিস’ নামক এক প্রকার স্বর্ণ মুদ্রা প্রচলনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
ফরিদপুর জেলার কোটালি পাড়া অঞ্চলে প্রাপ্ত ষষ্ঠ শতকের একটি সুবৰ্ণ বীথির উল্লেখ, ঢাকা জেলার সুবর্ণ গ্রাম, সোনারঙ্গ এবং সোনাকান্দি প্রভৃতি সকল নামই সুবর্ণ স্মৃতি বহন করে। তাই বলা চলে টলেমির উল্লেখিত সোনার খনি নেহ্যায়েত কাল্পনিক না-ও হতে পারে।
কুষাণ যুগের পর থেকে গুপ্ত যুগের সূচনা পর্যন্ত বাংলার ইতিহাস এখনও অন্ধকারে আছে। তবে প্রাপ্ত উপাদান সমূহে বাংলাদেশের সমৃদ্ধ ও বিস্তৃত ব্যবসা-বাণিজ্য ও তার ফলস্বরূপ বাংলার সমৃদ্ধির সুস্পষ্ট আভাস রয়েছে। ভবিষ্যতে আরও তথ্য উদঘাটন হলে এই অন্ধকার অংশ আরও আলোকিত হতে পারে।

০০বাংলাদেশের ইতিহাস পরিক্রমা—কে এম রাইছ উদ্দিন

গোলাম মাওলা , ভাবুক, সাপাহার, নওগাঁ

Re: আলেকজান্ডারের ভারত আক্রমণের সময় বাংলাদেশ

শেয়ার করার জন্য ধন্যবাদ।

সব কিছু ত্যাগ করে একদিকে অগ্রসর হচ্ছি

লেখাটি CC by-nd 3.0 এর অধীনে প্রকাশিত