টপিকঃ রোগ- ব্যাধি নিরাময়- ওঝা ও ডাইনি( নেটিভ অ্যামেরিকান সংস্কৃতি)

রোগ- ব্যাধি নিরাময়- ওঝা ও ডাইনি( নেটিভ অ্যামেরিকান সংস্কৃতি)
স্বাস্থ্য এবং নিরাময় :
প্রতিটি সংস্কৃতিতে অসুখ সম্পর্কে নিজস্ব ধারণা তৈরি হয়। নেটিভ সংস্কৃতিতে ব্যাধির ধারণাও অলৌকিক বিষয়ের সঙ্গে জড়িত। সাধারণ গলাব্যাথা বা কানব্যাথা, অম্বল বা পেশি যন্ত্রণা ইত্যাদি ব্যাধিগুলিকে অবশ্য অলৌকিক ভাবা হয় না। যে ব্যাধিগুলি দীর্ঘমেয়াদী এবং পীড়াদায়ক সেইগুলি ওঝা বা গুনিনের সাহায্যে সারানো হয়। মনে করা হয় ওই ওঝা হন বিশেষ ক্ষমতা সম্পন্ন। ওঝা এই বিষয়ে যথেষ্ট তালিমপ্রাপ্ত, অভিজ্ঞ ও চিকিৎসাশাস্ত্ৰে পণ্ডিত ব্যক্তি। ওঝাগণ বিভিন্ন ভাবে তাদের শক্তি প্ৰাপ্ত হন। এরা ধ্যান ও স্বপ্ন প্ৰাপ্তির মাধ্যমে আত্মিক জ্ঞান অর্জন করতে পারেন। কেউ আবার কোনো চিকিৎসকের শিক্ষানবিশ সহকারী হিসাবে কাজ শিখতে পারেন। কেউবা স্বতঃস্ফূর্ত ভাবেই স্বপ্নাদিষ্ট ও স্বপ্নের মাধ্যমে এই বিদ্যা অর্জন করেন।
ইসাক টেনিস নামক এক গিটসকান (ব্রিটিশ কলম্বিয়া) ওঝার বর্ণনায় জানা যায়, অলৌকিকের সঙ্গে অভিজ্ঞতার মাধ্যমে কীভাবে চিকিৎসাবিদ্যা তার আয়ত্তে এসেছিল। তার জন্মের তিরিশ বছর পর, সে একদিন পাহাড়ে কাঠ আনতে গিয়েছিল। সন্ধ্যা হয়ে আসছিল। শেষ কুড়ালটি মারার আগেই অদ্ভুত এক আওয়াজ শোনা গেল। এক বিরাট প্যাঁচা তার কাছে এলো। প্যাচটি তার মুখ ধরে, তাকে উঠিয়ে নিয়ে যেতে চাইছিল। সে জ্ঞান হারাল। যখন চেতনা ফিরল-দেখল একটা বরফাচ্ছন্ন স্থানে পড়ে আছে। তার মাথা বরফে ঢাকা। মুখ দিয়ে রক্ত পড়ছে। সে উঠে দাঁড়িয়ে সরু পথ ধরে এগোতে থাকল দ্রুত। পথের দুধারের গাছগুলি তাঁর পিছনে হামা দিয়ে ছুটছিল। যেন তারা সাপ। সে তার বাবার কাছে পৌঁছে ঘটনাটি বিস্তারিত ভাবে জানালো। সে খুব শীতার্ত হয়ে পড়েছিল এবং উষ্ণতা নিয়ে তবে শয়ন করতে গেল। সেখানে সে ভয়গ্ৰস্থ হল; মনে হল দুজন ওঝা তাকে শুশ্রূষা করছে। কিন্তু বিষয়টি মনে আছে খুবই অস্পষ্ট। যখন সে তন্দ্ৰাচ্ছন্ন ছিল, একজন ওঝা তাকে বলল, ওদের মতো তাকেও একজন ওঝা হতে হবে। কিন্তু সে রাজি হয়নি, তাই সে তাদের পরামর্শও নেয়নি।
আর একদিন সে শিকারে গেল, নদীর অপর পারে। সে একটি ভালুকের গুহার খোজ করতে গিয়ে দেখল সিডার গাছের মগ ডালে একটি প্যাঁচা বসে আছে।  সে তাকে গুলি করল। সেটি মাটিতে পড়ার পর তুলতে গিয়ে দ্যাখে, সেটি ভোজবাজির মতো উবে গেল। একটা পালকও পড়ে নেই। সে যথারীতি বরফ ভেঙে নদীপার হয়ে গ্রামে ফিরে এল। তার বাবার সঙ্গে দেখা হল। একসঙ্গে বাড়ি ফিরল। তার হৃৎপিণ্ড দ্রুত চলতে লাগল। সে কাপতে লাগল। ঠিক আগের অবস্থার মতন। তার চামড়া যেন ফুটতে শুরু করেছে। এই অবস্থাতেই সে গান শুরু করল। এক স্বতঃস্ফূর্ত মন্ত্রগান আপনা। আপনি গেয়ে চলল। অনেক জিনিস আসতে লাগল তার কাছে, বড়োপাখি, জীবজন্তু। তারা তাকে ডাকছিল। এই স্বপ্ন তখনই হয়, যখন একব্যক্তি ওঝায় পরিণত হয়।
সানাপিয়া একজন কোম্যানচে ওঝা। সে তার বিদ্যা অর্জন করেছিল, মা ও মামার কাছ থেকে। তারা উভয়েই ছিল ঈগল ডাক্তার। যারা ডাক্তারি বিদ্যা অর্জন করেছিল ঈগল আত্মা থেকে। কোম্যানচোদের মধ্যে উত্তরসূরি চিকিৎসক খোঁজা হয়, নিকট আত্মীয় থেকে। সাধারণত মা ও মেয়েতে এই বিদ্যা হাত বদল হয়। সানোপিয়ার বিদ্যা তার আত্মীয়র কাছ থেকে অর্জিত হলেও এর মূল রোগ নিরাময়ের শক্তির উৎস কিন্তু অলৌকিক।
ঈগল-আত্মা, নিরাময়ের সময় দৈব-স্বপ্নে আসে, নানারকম মন্ত্রগান ও জপতপ শেখায়। তাই নিরাময় শক্তির মূল সাফল্য, দৈবশক্তিকেই দেওয়া হয়, ব্যক্তিকে নয়।
কিছু সংস্কৃতিতে মনে করা হয় ব্যাধি হল, ব্যক্তি-বিশেষের অতীত কৃতকর্মের ফল। কোনো ক্ষতিকর ঘটনা বা বস্তুর সংযোগে আসার ফলে বা কোনো আত্মার দেওয়া শাস্তির ফলশ্রুতি হিসাবে ব্যাধি হতে পারে। কিছু সমাজে ক্ষতিকারক মানুষ। ডাইনি বা জাদুবিদ্যাকে ব্যাধি সৃষ্টির জন্য দায়ী করা হয়। কিন্তু সব সংস্কৃতিতে রোগের এই কারণটি খুঁজে বার করা খুব জরুরি। এর মাধ্যমে নিরাময়ের সুবিধা হয়।
কারণটি খোঁজা হলে, ওঝা উৎসব শুরু করে অন্তর্নিহিত কারণগুলিকে দূর করার কাজে। অধিকাংশ সময় রোগ নিরাময় হয়, কিন্তু চিকিৎসা বিফলও হতে পারে। রোগ বেড়ে গিয়ে মৃত্যুও হয়। রোগ না। সারলে বা মৃত্যু হলে এটি ওঝার দক্ষতার ওপর দোষ দেওয়া হয়। হয়তো ওঝার অলৌকিকের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষমতা খুবই দুর্বল প্রকৃতির। তার ফলে রোগ নিরাময় হল না।
ইনুইট বিশ্বাস করে, অলৌকিক যখন বিরক্ত হন বা ক্ষুণ্ণ হন, তখনই অসুখ হয়। যদি যথেষ্ট পরিমাণ শ্রদ্ধা না দেখানো হয় বা গর্ভবতী মহিলা যথাযথ বিধি নিষেধ পালন না করেন তবে অসুখ। মানুষের অসহযোগিতা, তর্ক-প্রবণতা, কিংবা বদ মেজাজ ইত্যাদি স্বভাবের জন্য মানুষ অসুস্থ হতে পারে। যখন সাধারণ চিকিৎসায় কাজ হয় না, তখন ইনুইটরা বলে, তার পূর্বের ব্যবহার সম্পর্কে বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
যদি কোনো রোগীর, কোনো পূর্বকৃত কুকর্মের কথা মনে পড়ে এবং জনগণের সামনে তা স্বীকার করে, ওঝা তাকে কোনো বিধি নিয়ম পালন করার জন্য আদেশ দিতে পারে। কোনো রোগীকে আবার কোনও নির্দিষ্ট খাদ্য থেকে বিরত রাখা হয় বা কোনও নির্দিষ্ট গৃহ সামগ্ৰী বিদূরিত করতে পারে।
ইরোকোয়াগণ মনে করে, অসুখের মূল কারণ হল, মানুষের চিন্তাধারা এবং কার্যাবলী। তারা মনে করে, মানুষের অভ্যন্তরের ইচ্ছেগুলো, তার স্বপ্নের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। সুস্বাস্থ্য বজায় রাখার জন্য মানুষ এই ইচ্ছেগুলো পূরণ করে। যদি মানুষ এই ইচ্ছা পূরণ করতে ব্যর্থ হয় বা অস্বীকার করে তবে সে রোগগ্ৰস্ত হয়। তাই ইরোকেয়া ওঝা, রোগীকে তার স্বপ্নগুলি মনে করতে বলে। অনেক ক্ষেত্রে ইচ্ছেগুলি স্বপ্নের মধ্যে খুবই প্রকটিত হয়ে ওঠে। যেমন কোনও রোগী হয়ত বলল, সে স্বপ্নে কোনো নির্দিষ্ট উপহার পেতে দেখেছে। কোনো আত্মীয় বা বন্ধুর সঙ্গে দেখা করেছে বা কোনও উৎসবে যোগদান করেছে। যখন এইরূপ হয়, সমাজের সভ্যগণ তাকে সেই উপহারটি দিয়ে তার ইচ্ছাপূরণ করে। বা সেই আত্মীয় বন্ধুর সঙ্গে দেখা করার ব্যবস্থা করে দেয়।
অনেক সময় রোগী বুঝতে পারে না স্বপ্নে তার কী ইচ্ছা লুকিয়ে আছে, তখন কোনো বিশেষ ধরনের ওঝা, বিভিন্ন ধরনের পদ্ধতি অবলম্বন করে আত্মার কাছ থেকে গুপ্ত ইচ্ছাটি সম্পর্কে জানতে চায়। এজন্য তারা জলে বা আগুনে প্রবেশ করতে, উপবাস বা ধ্যানমগ্ন অবস্থাতেও থাকতে রাজি। ইচ্ছেগুলো নানারূপ ধরে দেখা দিতে পারে। ইচ্ছা জানা গেলে, রোগী ও তার পরিবার সেগুলি পূরণ করার চেষ্টা করে।
অনেক দেশজ আদিম জনগোষ্ঠী মনে করে ব্যাধি হল আত্মার নিরুদ্দেশের ফল। ইনুইটরা মনে করে, ঘুমের সময় আত্মা শরীর ছেড়ে বেরিয়ে যায়। নিদ্রাভঙ্গের আগে তা শরীরে প্রবেশ করে। এর মাঝখানে যদি ডাইনির দ্বারা বন্দি হয় বা ক্ষতিগ্রস্ত হয় বা হারিয়ে যায়, দেহে আর ফিরতে না পারে, তবে মানুষ ভীষণ ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়বে। শেষ পর্যন্ত মৃত্যু মুখে পতিত হবে। এই আত্মা হারানোর উপসর্গ হিসাবে শক্তি-ক্ষয় ক্ষুধা-হীনতা, অনিদ্রা বা হতাশাগ্ৰস্ত ইত্যাদি দেখা যায় ।
এই আত্মা হারানো ব্যক্তি, ‘আঙাকট”’ নামক এক ওঝার সাহায্য নেন। এরা বিভিন্ন নাটকীয় এবং আবেগপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক ধর্মাচরণ পদ্ধতির সাহায্যে চিকিৎসা করেন। রাতের বেলায় দরজা জানালা বন্ধ অন্ধকার এক বাড়িতে, আলো না জালিয়ে, এই রিচুয়াল শুরু হয়। রোগী মাদুরে শুয়ে থাকে। তার আত্মীয় ও সমাজবন্ধুরা উপস্থিত থাকে।
‘আঙাকট” রোগীর পিছনে একটা জায়গায় বসে, তার এতদিনের অর্জিত বিদ্যার দ্বারা অলৌকিক সাহায্যকারীদের আহ্বান করে। অশরীরী, জীবজন্তু এবং অলৌকিকের সহযোগী আত্মাদের আহ্বান করে। সংগীত ও ড্রাম বাদ্য চলে বেশ কিছুক্ষণ। এরপর সেই ওঝার ভর হয়। এক বিশেষ ভাষায় কথা বলে তারা। বিশেষ ভাষায় সেই আত্মাদের সাহায্য প্রার্থনা করে। আদেশ করে, যেন তারাও সেই ওঝার সঙ্গে মিলে রোগীর আত্মাকে খুঁজে বার করে। এই সময়ে তাদের অনেক দুষ্ট আত্মার সঙ্গে লড়াই করতে হয়। রোগী ও অন্যান্য লোকেরা ওঝাকে দেখে নানারকম চিৎকার, গোঙানি করতে থাকে।
ওঝা, সু-আত্মা ও কু-আত্মার লড়াই শেষে হারানো আত্মাকে উদ্ধার করে রোগীর দেহে ফিরিয়ে দেয়। রোগী একটা আবেগপূর্ণ স্বাস্থ্য লাভ করে। রোগমুক্তি হয় অচিরেই।
অনেক ট্রাইব মনে করে অসুখের মূলকারণ হল কোনো বিদেশি বস্তু যখন মানব শরীরে প্রবেশ করে। এই বস্তুকে খুঁজে বের করলেই রোগ নিরাময় হবে। এই ‘বহিবস্তুগুলো শরীর ও মনের সমন্বয় নষ্ট করে দেয়, যে ভারসাম্যগুলো সুস্বাস্থ্যের সহায়ক। অলৌকিক শক্তি এই শক্তিগুলো মানবশরীরে ঢুকিয়ে দেয়, যথেষ্ট লোকচার পালনে ব্যর্থতা বা আত্মার প্রতি অশ্রদ্ধার শাস্তি হিসাবে। ডাইনিও মানুষের ক্ষতি করার জন্য এইগুলি ছুড়তে পারে।
পশ্চিমাঞ্চল সমতল ভূমির শোশোনে ও কোম্যানচে ওঝা বিভিন্ন পদ্ধতির আশ্রয়ে এই বিদেশি বস্তুকে খুঁজে বের করে, তা নিৰ্গত করে। রোগ সৃষ্টিকারী বস্তু, যেমন ছোট্ট পালক, পাথর কুচি, জন্তুর হাড়ের টুকরো, বা কোনো বিশেষ মন্ত্রপূত তরলবস্তু (আকারহীন)-এই বস্তুগুলি নানারকম উপসর্গের সৃষ্টি করে, কোনও স্থানে প্রচণ্ড যন্ত্রণা, ফুলে ওঠা, অথবা শক্ত হাওয়া ইত্যাদি।। ওঝা প্রথমে সেই স্থানে মালিশ করে এবং তারপর ঠোঁট দিয়ে চুয়ে সেই বস্তুকে বার করে। সেই বস্তুকে তারা অগ্নি বা বিশুদ্ধ স্থানে থুতুর মাধ্যমে ফেলে দেয়।
নাভাহোগণ মনে করে মানুষ অসুস্থ হয়, যখন কোনো ছোঁয়াচে বা সংক্রামক বস্তু, ব্যক্তি বা শক্তির সংস্পর্শে আসে। বিভিন্ন জন্তু ও গাছপালা অসুখেৰ জন্য দায়ী। যেমন ভালুক, সজারু, কায়োটি, ঝুমঝুমি সাপ, পিঁপড়ে, মথ এবং ক্যাকটাস ইত্যাদি। প্রাকৃতিক শক্তির মধ্যে বিদ্যুৎ, ঘূর্ণিঝড় ইত্যাদি বিপজ্জনক। নাভাহোদের এই সংক্রমণের তত্ত্ব দাঁড়িয়ে আছে একটি ধারণার ওপর। স্বাস্থ্য নির্ভর করে মানুষের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক ভারসাম্যের সংরক্ষণের ওপরে। কিন্তু জীবজন্তু ও প্রাকৃতিক শক্তি এই ভারসাম্যর ব্যাঘাত সৃষ্টি করে। অবশ্যই তাই রোগ নিরাময়ের পথটি হল, এই সংক্ৰামক বিষয়টিকে দূর করা, শরীরের স্বাভাবিক সমন্বয় ও সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনা।
নাভাহো ওঝা এর জন্য মন্ত্রপাঠ ও গানের আশ্রয় নেয়। এই মন্ত্রগান বিভিন্ন অবস্থার জন্য বিভিন্ন রকম। সংগীত ব্যাধি নিরাময় করে। কারণ তা বিভিন্ন নাভাহো দেবতাকে আকৃষ্ট করে। এই নিরাময় সংগীত দুই, পাঁচ বা নয় রাত্রি স্থায়ী হয়। এক একটি রাত্রি, সূর্যস্ত থেকে আর একটি সূর্যস্ত পর্যন্ত গণনা করা হয়। প্রতিটি গানের সঙ্গে যুক্ত থাকে বিশেষ লোকাচার। প্রথমে গানের সঙ্গে সঙ্গে রোগীকে স্নান করানো হয়। মন্ত্রপাঠ ও গানের মাধ্যমে নাভাহো দেবতাকে তুষ্ট করা হয়, যাতে তিনি সংক্রামক বস্তুটি দূর করে দেন। নাভাহো ওঝা কিছু বস্তুকে ব্যবহার করে, যার মধ্যে নিরাময় ক্ষমতা আছে। যেমন, পালকের দণ্ড, রঙ করা মন্ত্রকাঠি, আশমানি রঙের অস্বচ্ছ পাথরের টুকরো, ক্রিস্টাল, ভুট্টা আঠা,ভুট্টাপরাগ এবং নানাবিধ ভেষজ ঔষধ। এগুলো রোগীর শরীরে স্পর্শ করানো হয়। এবং নিরাময় শক্তি অনুপ্রবেশ করানো হয়। এ ছাড়া অলৌকিক শক্তিকে আকৰ্ষিত করার জন্য তারা একটি শুকনো অঙ্কন ব্যবহার করে। সেটি হল বালির সঙ্গে নানান প্রাকৃতিক রং মিশিয়ে তৈরি চিত্র। রঙিন বালি মাটিতে ছুড়ে ছুড়ে নানানরকম জটিল আলপনা আঁকা হয়। এর প্রাচীন নকশা হল Holy Peopleএর নকশাকৃতি প্রতিমূর্তি। যখন Dry Painting গুলো সম্পন্ন হয়, রোগীকে ওই চিত্রের মধ্যে একস্থানে বসানো হয়। ওঝা, রোগীর করতল ওষুধ জলে ধুইয়ে দেয়। এরপর সে বালিচিত্ৰ স্পর্শ করে এবং রঙিন বালি তার হাতে লেগে যায়। এরপর ওঝা সেই বালি রোগীর দেহে লেপন করে। চিত্রের বিভিন্ন শারীরিক অঙ্গের অংশগুলি, রোগীর অঙ্গের সেই সেই অংশে বালি লেপন করে। এটি নাভাহো দর্শনের শরীরের প্রতীক। কোনো রোগীর হয়তো কোনো বিশেষ অঙ্গে র যন্ত্রণা হচ্ছে। কিন্তু যেহেতু অসুখের প্রভাব সারা শরীর মনের ভারসাম্য নষ্ট করে, সেইহেতু পুরো শরীরেরই চিকিৎসা হয়। যেহেতু বাহ্যিক পরিবেশও মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব সৃষ্টি করে, তাই প্রাকৃতিক শক্তির ভারসাম্যও রক্ষার চেষ্টা করা হয়। একটি নাভাহো মন্ত্রের অংশ বিশেষ: আমি তোমার জন্য বলি প্ৰস্তুত করেছি আমি তোমার জন্য ধোঁয়া প্ৰস্তুত করেছি
আনন্দপূর্ণ প্রভূত কৃষ্ণ-মেঘ আমি কামনা করি আনন্দপূর্ণ প্রচুর বারিধারা আমি কামনা করি আনন্দপূর্ণ প্রভূত পরাগ আমি কামনা করি আনন্দপূর্ণ প্রভূত শিশির আমি কামনা করি। আর একটি ব্যাধি তত্ত্বে ডাইনি বা জাদুকরের বিষয়টিকে কারণ হিসাবে ধরা হয়। ডাইনি বা জাদুকররা এমন মানুষ, যারা ক্ষতিকারক ম্যাজিক চর্চা করে। কারণ তারা দুষ্ট ক্ৰোধী ও ঈর্ষাপরায়ণ। তারা ম্যাজিকের মাধ্যমে মানুষকে তুক করে। তারা শুধু তাদের শত্রুরই হানি করেন না, ঈৰ্ষা প্রসূত হয়ে, অনেক নিরপরাধ ব্যক্তিকেও তারা তুক করে তথা ক্ষতি করে। প্রতিটি সংস্কৃতিতে ডাইনি সম্পর্কে ভিন্ন মতামত থাকলেও একটি বিষয়ে প্রত্যেকেই একমত, যে ডাইনিরা এই শক্তি অলৌকিকের আরাধনা করে অর্জন করে। তারা ডাইনিবিদ্যা কোনো জাদুকরি (ডাইনি) দের কাছ থেকেও অর্জন করতে পারে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই ডাইনিরা গুপ্তভাবে তাদের কাজ চালায়। জুনিদের সমাজে ডাইনিদের বহিষ্কার বা হত্যা করা হয়। ডাইনি বিদ্যায় শুধু ক্ষতিকারক তুকতাকই নয়, এমনকি গুপ্তহত্যা পর্যন্ত করা হয়। তাই জুনিদের সমাজে তা বেআইনি। অনেক সমাজে ডাইনিদের সামাজিক ভাবে গ্রহণ করা হলেও তাদের ডাইনি বিদ্যাকে গভীরভাবে নিষিদ্ধ করা হয় এবং দণ্ডও দেওয়া হয়। কারণ অলৌকিক শক্তির চরিত্র যেহেতু নিরাপদ; তাই ভালো মন্দ দুই কাজেই তাকে লাগানো যায়।
পশ্চিম ওয়াশিংটনের স্নোহোমিশরা বিশ্বাস করে, ওঝারা স্বাস্থ্য ও ব্যাধি দুইএর জন্যই দায়ী। যদি ওঝা (ডাক্তার) কারও ক্ষতি করতে চায়, তারা কোনো বিজাতির বস্তু নিয়ে রোগীর শরীরে ঢুকিয়ে দিতে পারে বা তার জীবনটা টেনে বার করে দিতে পারে। একজন আদিবাসী-লোকের কাছে জানা যায়, এই ওঝারা চুপিসারে ঘুমন্ত মানুষের জীবনটা টেনে বার করে মাথা দিয়ে। এবং কবর খানায় সেটা লুকিয়ে রাখে। অথবা তারা আত্মাটি সিডার গাছের ছাল দিয়ে ঢেকে আগুনের ধোঁয়ায় ঝুলিয়ে রাখে। তাতে রোগী প্রচন্ড অসুস্থ হয়ে মরতে বসে। অ্যাপাচি-রা মনে করে, ডাইনিরা ব্যাধি ঘটানোর নানা ছল কৌশল জানে। তারা ভালুকের বিষ্টা, সাপের চামড়া, বাজপাড়া গাছের ছোটো কাঠ ইত্যাদি দিয়ে নানারকম বিষ তৈরি করে। এই বিষগুলি ব্যক্তির খাদ্যে বা বাড়িতে ছোড়া হয়, বা ঘুমন্ত অবস্থায় নাকে বা মুখে ঢোকানো হয়। ডাইনিরা নানারকম ক্ষতিকারক মন্ত্রও পাঠ করে। Spirit-এর মতো তারা ব্যক্তির শরীরে কিছু ছুড়তেও পারে। কোনো ব্যাধি এলেই ডাইনিদের সন্দেহ করা হয়। যদি কোনো রোগের নিরাময় প্রক্রিয়া ব্যর্থ হয়, তখনও ডাইনিদের দায়ী করা হয়। বা কোনো পরিবারে যদি হঠাৎ ব্যাধির প্রকোপ বাড়ে ও মৃত্যু হয়, তখনও সন্দেহ বাড়ে। অ্যাপা****ের নিরাময় পদ্ধতিতে তারা তুকতাক উৎখাত করে এবং সুস্বাস্থ্য ফিরিয়ে আনে।

গোলাম মাওলা , ভাবুক, সাপাহার, নওগাঁ

Re: রোগ- ব্যাধি নিরাময়- ওঝা ও ডাইনি( নেটিভ অ্যামেরিকান সংস্কৃতি)

প্রতিদিন এই ধরনের স্বাস্থ্য পরামর্শ পেতে ভিজিট করুনঃ স্বাস্থ্য কথা