টপিকঃ মহানবী (সা)-এর সচিবালয়

মহানবী (সা)-এর সচিবালয়
পৃথিবীর সূচনা লগ্ন থেকে অদ্যাবদি এর রাষ্ট্র শাসকদের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, যে সব গুণাবলীর ভিত্তিতে কোনো শাসককে আদর্শ হিসেবে পরিগণিত করা হয়, সেই নিরিখে বিশ্বের কোনো কোনো শাসক কোনো কোনো দেশে কিঞ্চিৎ কিংবা আংশিকভাবে সফল হলেও তাদের কেউ-ই আদর্শ রাষ্ট্র শাসক হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিতে পারেননি। যারা আদর্শ শাসকের কাতারেই আসতে পারেননি, তাদের কেউতো আদর্শ রাষ্ট্র নায়ক হবার প্রশ্নই অবান্তর।
এই ক্ষেত্রে এই ধরা পৃষ্ঠে একমাত্র ব্যতিক্রম শুধু একজনই। তিনি আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা.)। আদর্শ রাষ্ট্র শাসকের সবগুলো গুণাবলী শুধু তাঁর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য এবং এক অপরিহার্য বাস্তবতা। তাই তিনি একজন সফল শাসক এবং শাসকদের নায়ক। তাঁর রাষ্ট্র শাসনের সমালোচনার দুঃসাহস কেয়ামত পর্যন্ত কেউ করতে পারবেনা। তিনি সফল না হয়ে পারেন না, কারণ তিনি ছিলেন আল্লাহর ওহী দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। সূরা আহযাবের ২১নং আয়াতে আল্লাহ ঘোষণা করেন, “নিশ্চয়ই রাসূলের মধ্যে রয়েছে তোমাদের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ।” ইহা তাঁর সার্বিক জীবন নিয়ে আল্লাহর সাক্ষ্য। আর রাষ্ট্র শাসন রাসূল (সা.) এর জীবনেরই একটি অধ্যায়। তথাপি আদর্শ রাষ্ট্রনায়ক নিজেই ঘোষণা করেছেন, “আমার যুগ শ্রেষ্ঠ যুগ।” অতএব “আদর্শ রাষ্ট্রনায়ক মুহাম্মদ (সাঃ)” এক সার্থক ও যথার্থ শিরোনাম।
* আদর্শ রাষ্ট্রের গোড়াপত্তনঃ
পৃথিবীতে কোনো মতাদর্শ প্রতিষ্ঠার জন্য রাষ্ট্রশক্তি অপরিহার্য। পৃথিবীর স্রষ্টা আল্লাহ রাসূল (সঃ) কে আদর্শ রাষ্ট্র নায়ক হিসেবে অন্যান্য সকল মতাদর্শের উপর দ্বীন ইসলামকে বিজয়ী করার জন্য প্রেরণ করেছেন। আল্লাহর কুরআনের সূরা সফের ৯ নম্বর আয়াতে ঘোষণা করেছেন, “তিনি আল্লাহ! তার রাসূলকে হেদায়েত ও সত্য দ্বীন সহকারে পাঠিয়েছেন যেনো, অন্যান্য সকল দ্বীনের উপর তাকে বিজয়ী করতে পারেন।” সূরা বনী ইসরাঈলের ৮০নং আয়াতে আল্লাহ তার রাসূলকে রাষ্ট্রশক্তি অর্জনের নসিহত দিয়েছেন। তাই আদর্শ রাষ্ট্র নায়ক জন্মভূমির কাফেরদের অত্যাচারে আল্লাহর হুকুমে প্রাচীন ইয়াসরেব নগরে হিজরত করেন। ইয়াসরেবকে “মদীনা” নামে তিনি আদর্শ রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন করেন। ৬২২-৬৩২ ঈসায়ী সাল পর্যন্ত আমৃত্যু ১০ বছর মদীনাকে কেন্দ্র করে জাজিরাতুল আরবে শাসন কার্য পরিচালনা করেন। তার এই ১০ বছরের সুশাসনই তাঁকে ইতিহাসে আদর্শ রাষ্ট্র নায়ক হিসেবে ক্বিয়ামত পর্যন্ত অনুসরণীয় করে তুলেছে।
* আদর্শ রাষ্ট্রের কর্মসূচীঃ
সূরা হজ্জের ৪১ নম্বর আয়াত থেকে (১) নামায প্রতিষ্ঠা করা (২) যাকাত আদায় করা (৩) সৎ কাজের আদেশ প্রদান (৪) অসৎ কাজের নিষেধ প্রদান।
সূরা বনী ইসরাঈলের ২৩-৩৭ আয়াত থেকে- (১) শুধুমাত্র আল্লাহর ইবাদত করা (২) পিতা-মাতার প্রতি উত্তম আচরণ করা (৩) নিকটাত্মীয়, মিসকিন ও সম্বলহীন পথিকদের অধিকার প্রদান (৪) অপচয়-অপব্যয় না করা (৫) নিকটাত্মীয়, মিসকিন ও সম্বলহীন পথিকদের বিনয় সূচক জবাব দেয়া (৬) খরচের বেলায় মধ্যম পন্থা অবলম্বন করা (৭) দারিদ্রের ভয়ে সন্তান হত্যা না করা (৮) জ্বেনার নিকটবর্তী না হওয়া (৯) ন্যায় সঙ্গত কারণ ছাড়া কোনো মানুষ হত্যা না করা (১০) ইয়াতীমের সম্পত্তি আত্মসাৎ না করা (১১) ওয়াদা-প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা (১২) সঠিক পন্থায় ওজন করা (১৩) যে বিষয়ে মানুষের জ্ঞান নেই, তার পেছনে না ছুটা (১৪) জমিনে অহংকারীভাবে না চলা।
বস্তুতঃ আদর্শ রাষ্ট্র নায়কের মূল উৎস ছিলো আল কুরআন। তা থেকে সংগৃহীত উপরোক্ত ৪ এবং ১৪ দফা বাস্তবায়নের মাধ্যমেই তিনি রাষ্ট্র শাসনে সফলতা অর্জন করেছিলেন।
* কল্প কথার গল্পে নয় বাস্তব প্রমাণঃ
মুহাম্মদ (সাঃ) আদর্শ রাষ্ট্রনায়ক তা শুধু কল্প কথার গল্পে নয়, বাস্তবেও তাই। তিনি রাষ্ট্রপ্রধান হবার পর তাঁর জীবন থেকে কিছু বিষয় তুলে ধরা হলো –
(১) ভাঙ্গা নয়, গড়ার সুর – সমাজ ও রাষ্ট্রে এখনকার শাসকরা জনগণের মতভেদকে কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় জনগণের মধ্যে হিংসা, বিভেদ ও অনৈক্য প্রতিষ্ঠা করে বিশ্বকে জাহান্নাম করে তুলছে। অপরদিকে আমরা দেখতে পাই, আদর্শ রাষ্ট্রনায়ক মদীনা রাষ্ট্র গঠন করেই জনগণের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করলেন। যা ছিলো সুশাসনের জন্য অতীব জরুরী। মদীনার সমাজ ছিল বহুদা বিভক্ত। আওস ও খাজরাজ গোত্রের লোকেরা বংশ পরস্পরায় বিভেদের বীজ বহন করেছিলো। আদর্শ রাষ্ট্রনায়ক মুহাম্মদ (সা.) তাদেরসহ পুরো মদীনার জনগণকে পরস্পরের শত্রু থেকে কল্যাণকামী বন্ধুতে পরিণত করে দিলেন।
(২) বেকারের হাতকে কর্মীর হাতে পরিণত করা – জনগণের কর্মসংস্থানে যাকাত ভিত্তিক অর্থব্যবস্থা গঠন করে আদর্শ রাষ্ট্রনায়ক যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করেন। তার প্রেরণায় মদীনার মানুষ কৃষি ও ব্যবসায় প্রচুর উন্নতি সাধন করে। তিনি হীন ভিক্ষা বৃত্তি নিষিদ্ধ করেন। ঘোষণা করেন “নিশ্চয় নিচের হাত থেকে উপরের হাত শ্রেষ্ঠ।” অর্থাৎ গ্রহীতা থেকে দাতা উত্তম। এক ব্যক্তিকে তার শেষ সম্বল একখানা কম্বল বিক্রি করিয়ে তার হাতে কুঠার তুলে দিয়ে কর্ম যুদ্ধে অবতীর্ণ করান। এভাবে জনগণক তিনি কর্মসংস্থানে উদ্বুদ্ধ করে অনুসরণীয় আদর্শ সৃষ্টি করেছেন।
(৩) শিক্ষা বিস্তারে আদর্শ – পবিত্র কুরআনের প্রথম ওহী “ইকরা”। তাই আদর্শ রাষ্ট্রনায়ক তাঁর জনগণকে শিক্ষিত করতে সর্বদা তৎপর ছিলেন। তিনি ছিলেন একজন সার্বক্ষণিক শিক্ষক। তিনি মসজিদে নববীকে একটি উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করেছিলেন। যুদ্ধবন্দীদের শিক্ষা দানের বিনিময়ে মুক্ত করে দেবার নজির শুধু তিনিই স্থাপন করেছিলেন। বদরের যুদ্ধে বন্দী শিক্ষিত মুশরেকদের অশিক্ষিত মুসলিমকে শিক্ষা দিয়ে মুক্ত হতে তিনি সুযোগ করে দিয়েছিলেন।
(৪) যুদ্ধ নয়, সন্ধি চাই – মানুষ একটু ক্ষমতাবান হলেই আগ্রাসী হয়ে ওঠে। বর্তমান বিশ্বের ক্ষমতাবানরা এর বাস্তব নজির। অথচ আদর্শ রাষ্ট্রনায়ক বিশাল ক্ষমতাবান হওয়া সত্ত্বেও সর্বদা যুদ্ধ এড়িয়ে তিনি সন্ধি স্থাপনে আগ্রহী ছিলেন। জীবনে তিনি বহু সন্ধি ও চুক্তি স্থাপন করেছিলেন। এর মধ্যে হুদাইবিয়ার সন্ধি ও ঐতিহাসিক মদীনা সনদ শান্তি স্থাপনে তাকে আদর্শ রাষ্ট্রনায়কে পরিণত করেছে।
(৫) যুদ্ধ ক্ষেত্রে আদর্শ – রাসূল (সা.) কখনো যুদ্ধ চাননি। কিন্তু, যুদ্ধবাজ শয়তানরা বারবার তাঁর উপর যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়ে ছিলো। তিনি আত্মরক্ষার্থে যুদ্ধ করেছেন। তাই তাঁর জীবনে বদর, ওহুদ, খন্দক, হুনায়েন প্রভৃতি যুদ্ধ এসেছে। তিনি ছিলেন সর্বক্ষেত্রে আদর্শ। তাই যেমন মসজিদে ইমামতি করেছেন, তেমনি যুদ্ধে সেনাপতিত্ব করেছেন। যুদ্ধ ক্ষেত্রে প্রথমে হামলা না করা, নারী-শিশু-অক্ষমদের হত্যা না করা, গবাদী পশু, ফলবতী গাছ-পালা না কাটা এবং যুদ্ধ বন্দীদের সাথে সু-আচরণে একজন রাষ্ট্র প্রধান হিসাবে তিনি উদাহরণ।
(৬) অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতি সহনশীলতা – সংখ্যালঘুদের প্রতি আদর্শ রাষ্ট্রনায়কের আচরণ অনুসরণীয়। ঐতিহাসিক মদীনা সনদের মাধ্যমে তিনি তাদেরকে যে অধিকার দিয়েছিলেন, তা আজকের দিনে রূপ কথার গল্প। এক ইহুদী মসজিদে নববীতে পেশাব করা শুরু করলো। সাহাবারা তাকে মারতে উদ্যত হলে, বিশ্বনবী বাঁধা দিলেন। কাজ সেরে ফেলার পর নবী (সা.) তাকে বললেন, “তোমার দ্বীনের পবিত্র স্থানে কেউ এমন করলে কি করবে?” লোকটি লজ্জিত হলো। রাসূল (সাঃ) তাকে ক্ষমা করলেন। তাই সে আদর্শ রাষ্ট্র নায়কের আচরণে মুগ্ধ হয়ে ইসলামে দাখিল হলো। তিনি-ই সাহাবীদের আদেশ করেন, “তোমরা মুশরেকদের প্রভূকে গালি দিওনা। তাহলে তারা না বুঝে আল্লাহকে গালি দেবে।”
(৭) দানের ক্ষেত্রে আদর্শ – বিশ্বের শাসকরা যেখানে জনগণের সম্পদ কুক্ষিগত করে সম্পদের পাহাড় গড়ছে, সমুদ্রের বিশালতার হৃদয় দিয়ে আদর্শ রাষ্ট্রনায়ক সেখানে সব কিছু বিলিয়ে দিয়েছেন। হুনায়েনের যুদ্ধের পর তিনি যা দান করেছিলেন, ইতিহাসে তা বিরল। জুবায়ের ইবনে মুত’য়েম (রা.) থেকে বর্ণিত, হুনায়েন থেকে প্রত্যাবর্তনের সময় কিছু গ্রাম্য লোক রাসূলকে (সা.) জড়িয়ে ধরলো এবং সাহায্যের আবদার করলো। এমনকি তারা তাঁকে একটি বাবলা গাছের নিচে নিয়ে তাঁর চাদরটি খুলে নিলো। নবী (সাঃ) সেখানে দাড়িয়ে বললেন, “আমার চাদর খানা ফিরিয়ে দাও। যদি আমার কাছে এই কাটা বৃক্ষগুলোর সমান সংখ্যক বকরী বা উট থাকতো তাহলে সবই তোমাদের মধ্যে বিলিয়ে দিতাম। কেননা, আমি কৃপন স্বভাব, মিথ্যাচারী বা ভীরু কাপুরুষ নই।” (বুখারী)
(৮) পরামর্শ গ্রহণে আদর্শ – আদর্শ রাষ্ট্র নায়ক মুহাম্মদ (সা.) সর্ব বিষয়ে একক সিদ্ধান্ত প্রদানের অধিকারী ছিলেন। তথাপি তিনি পরমত সহিষ্ণু ছিলেন। বিভিন্ন পর্যায়ে, তিনি সাথীদের পরামর্শ গ্রহণ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। যেমন- হুদাইবিয়ার সন্ধির পর সাহাবীদের আবেগ প্রশমিত করতে তিনি উম্মে সালমার (রা.) পরামর্শে মাথা মু-ন করেন। খন্দক যুদ্ধে সালমান ফারসীর (রাঃ) পরামর্শে পরিখা খনন করেন। বদর যুদ্ধের ময়দানেও তিনি সাহাবী হুবাব ইবনে মুনযের (রা.) এর পরামর্শ পছন্দ করেন।
(৯) বিজয়ীর মহানুভবতা – আদর্শ রাষ্ট্র নায়কের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচার চালিয়ে সত্যের দুশমনরা জনগণের মনে জুজুর ভয় সৃষ্টি করতে পেরেছিলো। মক্কা বিজয়ের দিন মিথ্যা ভয়ে লোকজন পালাচ্ছিলো। মহানুভব আদর্শ রাষ্ট্র নায়ক দেখলেন, এক বৃদ্ধা অতিকষ্টে তার লটবহর নিয়ে চলছে। তিনি বৃদ্ধার লটবহর নিজে বহন করে গন্তব্যে পৌঁছে দিলেন। বৃদ্ধা জানালো সে মুহাম্মদের ভয়ে মক্কা ছেড়ে পালাচ্ছে। পরে বললো! কে বাবা তুমি এত ভাল লোক? রাসূল (সা.) বললেন, যার ভয়ে তুমি পালাচ্ছ, আমি সেই আব্দুল্লার পুত্র মুহাম্মদ। বৃদ্ধার জুজুর ভয় কেটে গেলো। সে আদর্শ রাষ্ট্র নায়কের মহানুভবতায় ইসলামে দাখিল হলো।
(১০) রাষ্ট্রনায়কের ক্ষমা – কুরায়শরা আদর্শ রাষ্ট্র নায়ককে এতো অত্যাচার করলো। এমন কি নিজের জন্ম মাটি থেকে উৎখাত করলো। অথচ মক্কা বিজয়ের দিন তাদের উপর কোনো প্রতিশোধ নিলেন না। ক্ষমা করে দিলেন। বললেন, “আজ তোমাদের প্রতি কোনো অভিযোগ নেই। তোমরা সবাই মুক্ত”। বিশ্ব ইতিহাসে যুদ্ধ জয়ী কোনো আদর্শ রাষ্ট্র নায়কের এমন উদাহরণ শুধু মুহাম্মদ (সঃ)-ই সৃষ্টি করেছেন।
*সচিবালয়
রাষ্ট্র গঠনের ইতিহাসে মহানবী (সা)-এর প্রতিষ্ঠিত মদীনার ইসলামী জনকল্যাণমূলক সর্বোত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে। প্রশাসনিক কার্যাবলী সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের জন্যে ছিল একটি সুসংগঠিত সচিবালয়। সচিবালয়ের বিভিন্ন দফতর ও বিভাগসমূহের নাম নিম্নে দেওয়া হলোঃ
@ রাষ্ট্র প্রাধানের ব্যক্তিগত বিভাগ-
(১) হযরত হানযাল ইবন আল রবী (রা), সোণ (সা) এর একাও সচিব (২) হযরত শুরাহবিল ইবন হাসান (রা), সচিব (৩)হযরত আনাস ইবন মালেক ।
@ সীল মোহর বিভাগ-
(১) হযরত মুকার ইবন আবি ফাতিমা (রা) রসূলুল্লাহ (সা:) এর সীলমোহর করার আংটিটি তাঁর নিকট সংরক্ষিত থাকত ।
@ অহী লিখন বিভাগ-
(১) হযরত যায়েদ ইবন সাবিত (রা) (২) হযরত আবু বকর সিদিক (রা) (৩) হযরত ওমর ফারুক (রা) (৪) হযরত ওসমান (রা) (৫) হযরত আলী (রা.) (৬) হযরত উবাই ইবন কাব (রা) (৭) হযরত আবদুল্লাহ ইবন সারাহ (রা) (৮) হযরত যোবায়ের ইবন আল আওয়াম (রা) (৯) হযরত খালেদ ইবন সাঈদ (রা) (১০) হয়রত আবদুল্লাহ ইবন রাওয়া (রা) (১১) হযরত খালেদ ইবন ওলীদ (রা) (১২) হযরত মুগীরা ইবন শোবা (রা) (১৩) হযরত মুআ’বিয়া ইবন আবু সুফিয়ান (রা)। অহী লিপিবদ্ধ করার কাজে যারা নিয়োজিত ছিলেন তাদের সংখ্যা প্ৰায় চল্লিশ জন পর্যন্ত বর্ণিত হয়েছে।
@ পত্ৰ লিখন ও অনুবাদ বিভাগ-
(১) হযরত যায়েদ ইবন সাবিত আনসারী (রা) (২) আবদুল্লাহ ইবন আকরাম (রা) শেষের দিকে মুআবিয়াও (রা) এ কাজে নিয়োজিত ছিলেন ।
@ অভ্যর্থনা বিভাগ-
(১) হযরত আনাস ইবন মালেক (রা) (২) হযরত বারাহ (রা) ।
নবুওতের প্রথম হতেই হযরত বেলাল (রা) মেহমানদারীর কাজে নিয়োজিত ছিলেন ।
@ দাওয়াত ও শিক্ষা বিভাগ-
এ বিভাগটি সম্পূর্ণরূপে রসূল (সা)-এর নিয়ন্ত্রণে ছিল। সাহাবীগণ এ দায়িত্ব পালন করতেন। কুরআনে হাফিজ ও কারাদিগকে অগ্রাধিকার দেওয়া হতো।
@ জাতি ও গোত্ৰসমূহের মধ্যে যোগাযোগ বিভাগ-
(১) মুগীর ইবন শোবা (রা) (২) হাসান ইবন নুসীরা (রা)।
@প্রতিরক্ষা বিভাগ-
মদীনা রাষ্ট্রে কোন বেতনভোগী নিয়মিত সেনাবাহিনী ছিল না; প্রয়োজনে প্রত্যেক সক্ষম মুসলমানই মুজাহিদ হিসেবে যুদ্ধের মাঠে হাজির হতেন। রসূলুল্লাহ (সা) ছিলেন প্রতিরক্ষা বিভাগের সর্বাধিনায়ক। প্রয়োজনের সময় তিনি বিভিন্ন সাহাবীগণকে সেনাপতি নিযুক্ত করতেন। বিভিন্ন সময় মনোনিত কয়েকজন সেনাপতির নাম নিম্নরূপঃ- (১) হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা) (২) হযরত ওমর ফারুক (রা) (৩) হযরত আলী মুর্তজা (রা) (৪) হযরত যোবায়ের ইবন আল আওয়াম (রা) (৫) হযরত আবু ওবায়দা ইবন যাররাহ (রা) (৬) হযরত উব|দ ইবন সমেত (রা) (৭) হযরত হামজা ইবন মুত্তালিব (রা) (৮) হযরত মুহাম্মদ ইবন মাসলাম (রা) (৯) হযরত খালিদ ইবন ওয়ালীদ (রা) (১০) হযরত আমার ইবনুল আসি (রা) (১১) হযরত ওসামা ইবন যায়েদ (রা)।
মদীনা রাষ্ট্রের নাগরিকগণ তলোয়ার চালনা, তীর চালনা, বল্লম চালনা ও অশ্ব চালনা শিখতেন। যুদ্ধের বিভিন্ন কলা কৌশলও তাদের শিখানো হতো।
@ নিরাপত্তা বিভাগ-
মদীনা রাষ্ট্রে নিয়মিত কোন পুলিশ বাহিনী ছিল না। স্বেচ্ছায় কিছু সংখ্যক সাহাবী এ বিভাগে কর্মরত ছিলেন। এদের মধ্যে যারা আর্থিক দিক থেকে নিঃস্ব ছিলেন, বায়তুলমাল হতে তাদের ব্যয়ভার বহন করা হত। এ বিভাগের প্রধান ছিলেন। হযরত কায়েস ইবন সায়াদ (রা)।
@ জল্লাদ বিভাগ-
প্রাণদন্ডে দন্ডিত অপরাধীদের শিরচ্ছেদ করার কাজে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নির্দেশে যোগদান করলেন। হযরত যোবায়ের (রা), হযরত আলী (রা), হযরত মেকদাদ ইবন আসওয়াদ (রা), মুহাম্মদ ইবন মুসলিম (রা), আসেম ইবন সাবিদ (রা) এবং দাহহাক ইবন সুফিয়ান কেলবী (রা)।
@ বিচার বিভাগ-
এই বিভাগরে প্রধান ছিলেন। রসূলুল্লাহ (সা) নিজে। প্রাদেশিক কিংবা মদীনায় তিনি নিজেই বিচারপতিদের নিয়োগ করতেন। হযরত আবু বকর, হযরত ওমর, হযরত ওসমান, হযরত আলী, হযরত আবদুর রহমান ইবন আওফ, হযরত মুয়াজি ইবন জাবাল, হযরত আবু ওবায়দা ইবন জাররাহ, হযরত উবাই ইবন কাব্য রসুল (সা) কর্তৃক বিচারপতি হিসেবে নিযুক্ত হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন।
@ হিসেব সংরক্ষণ ও অর্থ বিভাগ (বায়তুল মাল)-
রসূল (সা) নিজেই এ বিভাগের কাজ তদারক করতেন। মুয়ানকী ইবন আবি ফাতিমাও এ বিভাগের সংগে সংশ্লিষ্ট ছিলেন ।
@ যাকাত ও সাদকাহ বিভাগ-
যাকাত ও সাদাকাহ বাবদ যে অর্থ সংগৃহীত হতো তার হিসেব কেন্দ্রীয় ভাবে সংরক্ষণ করতেন। হযরত যোবায়ের ইবন আল আওয়াম ও হযরত যুহাহির ইবন আল সালাত । অঞ্চলের জন্য স্বতন্ত্র আদায়কারী হিসেবে ছিলেনঃ (১) হযরত ওমর- মদীনা (২) আৰু উবায়দা ইন জাররাহ-নাজরান (৩) আমর ইবনুল আস-বনু ফাজারা (৪) আদীি ইবন হাতেম। তাই-বনু তয় ও বনু আসাদ (৫) আবদুল্লাহ ইবন লাইতাই-বনু জাবিয়ান (৬) উৰ্ব্ববাত ইবন বিশার-বনু সুলাইম ও বনু মজায়না। (৭) দহহাক ইবন সুফিয়ান-বনু কিলাব (৮) আবু জাহম ইবন হুজায়ফা-বনু লাইস (৯) বোরায়দা ইবন হােসাইন-বনু গেফার ও বনু আসলাম, (১০) বসুর ইবন সুফিয়ান-বনু কাব। ইহা ছাড়া আরও কতিপয় আদায়কারী ছিলেন। প্রয়োজনে আদায়কারী:দিগকে পারিশ্রমিক দেওয়া হতো ।
@ জনস্বাস্থ্য বিভাগ-
নাগরিকদের চিকিৎসা সুবিধার জন্য এ সময়ের প্রসিদ্ধ চিকি ৎসক হারিস ইবন সালাহ ও আবি রাদার পুত্রকে এ বিভাগের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তারা বায়তুল মাল হতে ভাতা পেতেন। লোকেরা বিনামূল্যে চিকিৎসা সুবিধা পেতেন।
@ শিক্ষা বিভাগ-
শিক্ষাবিভাগ ছিল রসূলের (সা) প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে সাফা পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত আকরাম ইবন আবুল আকরাম (রা)-এর বাড়ীতে । মুসলিম উম্মার প্রথম শিক্ষা দপ্তর প্রতিষ্ঠিত হয় মদীনায় শিক্ষা ও স্বাক্ষর জ্ঞানদানের জন্য হযরত আবদুল্লাহ বিন সাঈদ ইবনুল আস (রা:) কে নিয়োগ করা হয়েছিল ।বিশেষ করে হযরত আয়েশা (রা) শিক্ষা বিভাগের কর্মকান্ডে বিশিষ্ঠ ভূমিকা পালন করে গেছেন। তাদের গৃহগুলো ছিল নারী শিক্ষার কেন্দ্র।
@ পরিসংখ্যান বিভাগ-
রসূল (সা) তাঁর জীবদ্দশায় দু’বার আদমশুমারী করেছিলেন এবং রেজিশটার বইতে  রাষ্ট্রের সকল নাগরিকদের নামের তালিকা প্ৰণয়ন করেন।
@ কৃষি ও বন বিভাগ-
বুখারী শরীফে বর্ণিত হয়েছে। হযরত আবু হুরায়রা (রা) বৰ্ণন। পরেন। রসূল (সা:) এরশাদ করেনঃ যার নিকট চাষাবাদেরযোগ্য জমি থাকবে তার অবশ্যয়
চাষাবাদ করা উচিৎ। অন্যথায় তা অন্য ব্যক্তিকে চাষাবাদের জন্য দিয়ে দেওয়া উচিত।
কুতায়ার ইবন সাঈদ (রা) আনাস (রা) হতে বর্ণিত, নবী (সা) বলেছেন, যে কোন মুসলমান ফলেবান গাছ রোপন করে কিংবা কোন ফসল চাষাবাদ করে আর তা থেকে পাখি কিংবা মানুষ বা চতুষ্পদ জন্তু খায়। তবে তা তার পক্ষে সাদকা বলে গণ্য।
@নগর প্রশাসন বিভাগ-
নগর প্রশাসন বিভাগের দায়িত্ব ছিল শহরে নগরে যাতে করে কোন প্রকার অবৈধ প্ৰবঞ্চনামূলক ক্রয় বিক্রয় না হয় তা নিশ্চিত করা। হযরত ওমর (রা) এ বিভাগের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন।
@ স্থানীয় সরকার বিভাগ-
রসূল (সা) প্রত্যেক প্রদেশে একজন করে ওয়ালী বা প্রাদেশিক শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন। রসূল (সা)-এর সময় মদীনা রাষ্ট্রে ছিল ৮টি ওয়ালী শাসিত প্ৰদেশ । (১) মদীনা-রসূল (সা) স্বয়ং (২) মক্কা-হযরত ইত্তাব ইবন উসাইদ (রা) (৩) নাজরান-(ক) হযরত আমর ইবন হাজাম (রা) (খ) হযরত আলী (রা) (গ) হযরত আবু সুফিয়ান (রা) (৪) ইয়েমেন-হযরত বায়ান ইবন সামান (রা) (৫) হাজরা মাউত-হযরত যিয়াদ ইবন লবীদুল (রা) (৬) আম্মান-হযরত আমর ইবনুল আস। (রা) (৭) বাহরাইন-হযরত আলী ইবন হাযরাম (রাঃ) (৮) তাইমা-হযরত ইয়াজিদ ইবন আবু সুফিয়ান (রা) (৯) জুন্দে আলজানাদ-হযরত মুয়াজি ইবন জাবাল (রা)।
প্রাদেশিক প্রশাসন ছাড়াও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অঞ্চল ও বড় বড় গোত্রের উপর স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার প্রধান ছিলেন ‘আমিল’ মদীনা রাষ্ট্রের অধীনে এরূপ ২২টি আমিল শাসিত অঞ্চল ও গোত্র ছিল । রসূল (সা) স্বয়ং আমিলদেরকে তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় বিষয়ে তালিম দিয়ে বিভিন্ন অঞ্চল ও গোত্রে প্রেরণ করতেন।
পরিশেষে বলা যায়, চৌদ্দশ বছর পূর্বে আদর্শ রাষ্ট্র নায়ক হিসেবে মুহাম্মদ (সা.) বিশ্বের তাবৎ রাষ্ট্র শাসকদের জন্য যে আদর্শ স্থাপন করেছিলেন আজকের বিশ্ব তীব্রভাবে তার অভাব অনুভব করছে। আজ পৃথিবীর দেশে দেশে ভ- শাসকদের শাসন শোষণে পৃথিবীর মজলুম মানুষ একজন আদর্শ রাষ্ট্র নায়কের জন্য আর্তনাদ করছে। শত আর্তনাদেও আর্দশ রাষ্ট্রনায়ক মুহাম্মদ (সা.) আসবেন না বটে। কিন্তু, তাঁকে অনুসরণের মাধ্যমে তার আদর্শ বাস্তবায়ন করে বিশ্বের নির্যাতিত মানুষকে যুলুমের অন্ধকার কু-লী থেকে উদ্ধার করতে কেউ না কেউ এগিয়ে আসবে, এই কামনা আমরা করতেই পারি। যত শীঘ্র এই কামনা বাস্তবায়িত হবে, তত শীঘ্র বিশ্ব মানবতার কল্যাণ সাধিত হবে। দার্শনিক মাইকেল হার্ট যথার্থই বলেছেন, “আমি বিশ্বাস করি অশান্তির বিশ্বে শান্তি আনতে হলে সমগ্র বিশ্বের একক ক্ষমতা আদর্শ রাষ্ট্র নায়ক মুহাম্মদ (সঃ) এর হাতে অপর্ন করলেই তা শুধু সম্ভব।”

গোলাম মাওলা , ভাবুক, সাপাহার, নওগাঁ