টপিকঃ প্যাপিরাসের ইতিহাস

প্যাপিরাসের ইতিহাস
প্রাচীনকালে লোকে প্যাপিরাসের ওপর লিখত; এটি এমন এক উপাদান স্বাভাবিক পরিবেশ-পরিস্থিতিতে যা মাত্র কয়েকশ বছর টেকে। ফলে যিশুর জন্মের কাছাকাছি সময়ের ধ্রুপদী যুগের উৎকীর্ণ লিপি ছাড়া প্রায় কিছুই টেকেনি। সে-সময়ে যা কিছু লেখা হয়েছিল তার বেশির ভাগই প্যাপিরাস নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে হারিয়ে গেছে। তারপরেও যে প্রাচীন যুগের সাহিত্যের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ আমাদের কাছে আছে তার কারণ হলো, নষ্ট হয়ে যাওয়ার আগে সেগুলো প্রায়ই নকল করা হতো, কাজেই সে-সব আরেকটু বেশি দিনের জন্য সংরক্ষিত হয়েছিল। সৌভাগ্যক্রমে, চৰ্মপট বা চৰ্মপত্র (parchment) বলে একটা নতুন উপাদান প্রাচীন যুগের শেষের দিকে ব্যবহার হতে শুরু করে। সেটা ছিল জীবজন্তুর চামড়া দিয়ে তৈরি, এবং এই পাত বা ফলকগুলো ছিল কঠিন, দেখতে প্রায়ই হলদেটে, খুবই শক্ত, আর টেকসই। সেগুলোকে গুটিয়ে রাখা যেত না, কাজেই তার বদলে বড় বড় পাত বা ফলকগুলোকে ভাঁজ ক’রে সুবিধামতো পাতার আকার দেয়া হতো, তারপর সেগুলোকে একসঙ্গে বান্ডিলের মতো করে একপাশে সবগুলোকে ওপর থেকে নিচের দিকে সেলাই ক’রে জুড়ে দেয়া হতো। সেলাই-করা শিরদাঁড়া বা পুটটি এরপর একটা শক্ত আবরণের সঙ্গে বাঁধা হতো। আর এভাবেই আবিষ্কৃত হলো বই, কার্যত যা এখনো এভাবেই তৈরি হয়।
চর্মপটের তৈরি বই চতুর্থ শতকে জনপ্রিয়তা লাভ করে। কিন্তু তারপরেও প্যাপিরাস বেশ কিছু শতক ধরে ব্যবহৃত হতে থাকে, যদিও ধীরে ধীরে তা পুরোপুরি হারিয়ে যায়। এ-কথা সত্য যে, তুলনামূলকভাবে চর্মপট তৈরি অধিক সময়সাপেক্ষ, কিন্তু গৃহপালিত পশু সবখানেই লভ্য ছিল, ওদিকে প্যাপিরাস মিশর থেকে আমদানি করতে হতো।
ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে বাণিজ্য ক্রমেই কমে গিয়ে শেষ পর্যন্ত পুরোপুরি থেমে যেতে পশ্চিম ইউরোপে প্যাপিরাস আসা-ই বন্ধ হয়ে গেল। প্ৰযুক্তির এই পরিবর্তনটি লাতিনের পক্ষেই গেল বরং ।
প্যাপিরাসের রোল থেকে কেউ কোনো লাতিন টেক্সট চর্মাপটে নকল করলে সেই টেক্সট আরো বেশিদিন টিকে যেত।
প্ৰাচীন যে-সব টেক্সট আমাদের কাছে এখনো আছে সেগুলো চর্মাপটে নকল করা হয়েছিল। এ-রকম একটি নকল তৈরি করা সময় ও অর্থের দিক দিয়ে বড়সড় একটি বিনিয়োগই ছিল বটে, কাজেই এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে অনেক টেক্সটাই নকল করা হয়নি, এবং সেগুলো চিরতরে হারিয়ে গেছে। যদিও, অন্তত, আমাদের কাছে সেই বইগুলো আছে যেগুলো খোদ রোমকরা সেরা আর সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করত, কারণ - স্পষ্টতই — সেগুলোই সবার আগে নকল করা হয়েছিল।
পাণ্ডুলিপির খুব বেশি আমাদের সংগ্রহে নেই। কিছু আছে পঞ্চম শতকের ,যার মধ্যে দুটিতেই রয়েছে ভার্যিলের মহাকাব্য ঈনীড,  কিন্তু বেশিরভাগই হারিয়ে গেছে কালের গর্ভে। আমাদের কাছে যা আছে তা হলো সে-সব নকলের পরবর্তীকালের নকল। শার্লামেন ও তার সমসাময়িক কিছু মানুষের উদ্যোগের কারণে নবম শতকের ধ্রুপদী লেখকদের বেশ কয়েকজনের কাজ সংরক্ষণ করা গেছে। অন্যক্ষেত্রে, সবচাইতে পুরানো বিদ্যমান পাণ্ডুলিপিটি পঞ্চদশ শতকের, সেই সময়ের যখন ধ্রুপদী যুগের ব্যাপারে রেনেসাঁ যুগের উৎসাহী মানুষেরা সুসম্বদ্ধভাবে পুরানো পাণ্ডুলিপির সন্ধানে ব্যাপৃত হয়ে সেগুলো নকল করিয়েছিলেন।
কেউ একটা চৰ্মপটের পাণ্ডুলিপি তৈরি করার মানেই এই নয় যে সেটা আজীবন টিকে থাকবে । বেশি ব্যবহারে সেটা জীৰ্ণ হয়ে যেতে পারে, বৃষ্টি ঝড় বা স্যাঁতসেঁতে অবস্থার জন্য ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে। আবার, আগুনও আমাদের বঞ্চিত করেছে। অনেক পাণ্ডুলিপি থেকে। কখনো কখনো সে-সবের মালিকরা সেগুলোকে বইয়ের আবরণ বা মলাট হিসেবে বা অন্য কোনো দৈনন্দিন কাজে ব্যবহার করেছেন। কখনো কখনো আবার লোকে কোনো চাছনি বা রাসায়নিক পদার্থ দিয়ে পাণ্ডুলিপির পাতার সব লেখা মুছে ফেলে তার ওপরে নতুন কিছু লিখেছে। এরককম পুনঃব্যবহৃত পাণ্ডুলিপিকে ইংরেজিতে palimpsest বলে।
এসব ক্ষেত্রে, গোড়াতে কি লেখা ছিল সেটা মাঝে মাঝে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব। হয়, এবং এভাবেই বেশ কিছু প্ৰাচীন টেক্সট পুনরাবিষ্কার করা সম্ভব হয়েছে। অবশ্য, প্রাচীনতম পাণ্ডুলিপিগুলো সংরক্ষণ করা হয়নি বললেই চলে, কিন্তু তারপরেও কোনো না কোনোভাবে এখনো অনেক লাতিন পাণ্ডুলিপি রয়েছে আমাদের কাছে। আমার জানামতে কেউই সেগুলোর সংখ্যা নিরূপণ করার চেষ্টা করেননি, কিন্তু তারপরও বলা যায় যে সংখ্যাটা বেশ কয়েক লাখ হবে। আজ সেগুলোর বেশিরভাগই বিভিন্ন গ্রন্থগার বা মহাফেজখানায় রয়েছে।
ভ্যাটিকানের গ্রন্থাগারে, বা ব্রিটিশ গ্রন্থাগারে, বা প্যারিসের বিবলিওথেক ন্যাশনালের মতো জায়গায় বেশ কয়েক হাজারের মতো পাণ্ডুলিপির বিশাল সংগ্রহ রয়েছে। এ সবের বেশির ভাগই গির্জার লিপিকরেরা বিভিন্ন মঠে তৈরি করেছিলেন।
চর্মপটে উত্তরণের ব্যাপারটা প্ৰায় সেই সময়ে ঘটেছিল। যখন খৃষ্টধর্ম রোমক সাম্রাজ্যে নিজের স্থান করে নিয়েছিল এবং যতদূর মনে হয়, মূলত খৃষ্টানরাই নতুন কৌশলগুলো ব্যবহার করেছিল,একেবারে প্রথম থেকেই। কাজেই এটা কোনো আপতিক ঘটনা নয়। যে, যে-সব পাণ্ডুলিপি টিকে গেছে তার সিংহভাগই সে-সব বইপত্রের নকল বা অনুলিপি যেগুলো খৃষ্ট সম্প্রদায়ের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় বাইবেলের অন্তর্গত প্রার্থনা-সংগীত (the psalter), স্তোত্র সংগ্ৰহ, ইত্যাদি। অতি অবশ্যই সেখানে সম্পূর্ণ বাইবেল ছিল, ছিল বাইবেলের নানান অধ্যায় বা পর্বের টীকাভাষ্য, গির্জার ফাদারদের লেখা, আর অন্যান্য খৃষ্টীয় রচনা।
কিন্তু লাতিনের অন্যান্য যত নমুনা আমরা পেয়েছি।উৎকীর্ণ লিপিগুলো ছাড়া — সেই প্রাচীনতম কাল থেকে একেবারে ছাপাখানা আবিষ্কার হওয়া পর্যন্ত, সেগুলো আমরা খৃষ্টীয় বা অথুষ্টীয় নানান পাণ্ডুলিপি থেকেই পেয়েছি, এবং কেউ হয়তো সংগত কারণেই প্রশ্ন করতে পারেন যে, কোনোভাবেই খৃষ্টধর্মের সঙ্গে সম্পর্কিত নয় এমন কিছুর নকল তৈরি করার কোনো দায় সন্ন্যাসীদের ছিল কিনা। এ-প্রশ্নের জবাব এই যে, প্রাচীন যুগের শেষ দিকে আশ্রমিক প্রথা শুরুর সময় থেকে সচেতনভাবেই করা হয়েছে কাজটা। আমরা আগেই দেখেছি, কাসিওদোরাস ও অন্যান্য যারা মঠগুলো প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁরা প্রাচীন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের, বিশেষ ক’রে লিখিত সাহিত্যের কিছু অংশের দায়িত্বভার নিয়ে সেটার খানিকটা পরবতী কালের কাছে পৌছে দেয়ার কাজটিকে খৃষ্টানদের জন্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করতেন। তাছাড়া, পাণ্ডুলিপির নকল তৈরি করাটা সন্ন্যাসী ও সন্ন্যাসিনীদের জন্য একটা উপযুক্ত কাজ হিসেবেও বিবেচনা করা হতো।
ভালো ভালো মঠে একটা scriptorium’ বা লেখার ঘর থাকতই সবসময়, যেখানে সম্প্রদায়টির কিছু সদস্যকে সেই মঠের নিজস্ব বা অন্য কোথাও থেকে ধার করে আনা পাণ্ডুলিপি নকল করার কাজে নিরত রাখা হতো।
নিজস্ব বা তৈরি-করা পাণ্ডুলিপির সংখ্যা অবশ্যই মঠভেদে ভিন্ন হতো, কিন্তু মোটের ওপর একটা বড়সড় শিল্প ছিল সেটা, কারণ মঠ ছিল শত শত। টেক্সট বাছাইয়ের কাজটা সম্ভবত আপতিক-ই ছিল প্রায় সব সময়, অন্তত কিছুটা হলেও, কারণ যা হাতের কাছে পাওয়া গিয়েছিল বা জোগাড় করা গিয়েছিল সেগুলোরই নকল করিয়ে রেখেছিল মঠগুলো। সে যা-ই হোক, মাদ্দো কথা হলো, প্রাক-খুষ্টীয় যুগের একটা যথেষ্ট ভালো বারোয়ারি সংগ্ৰহ সংরক্ষিত রয়েছে আজ আমাদের জন্য।
  লিভির রোমের ইতিহাস, যার মূল ১৪২টি বইয়ের মধ্যে মাত্র ৩৫টি পাওয়া গেছে। অন্যদিকে, খৃষ্টান লেখকদের লেখা বরং ব্যাপকভাবে নকল করা হয়েছে। যেমন, চার্চ ফাদার অগাস্তিন ও জেরোমে ছিলেন অবিশ্বাস্য রকমের বহুপ্রজ, এবং তাদের রচনার প্রায় প্রতিটি লাইনই টিকে গেছে।
গোটা মধ্যযুগ জুড়েই খৃষ্টীয় অখুষ্টীয় দুই বিষয়েই লোকে লাতিন ভাষায় লিখে গেছে। কাজেই, নকলযোগ্য বই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বেড়েই চলেছিল অবিরত। স্পষ্টতই, এর মধ্যে একটা বড় অংশ বেমালুম উধাও হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু অনেকগুলোই তা হয়নি, এবং আজ আমাদের হাতে যে-সব লাতিন টেক্সট আছে তার অনেক বড় একটা অংশ প্রাচীন যুগের পর লেখা হয়েছে।
সেই সময় থেকে মুদ্রণের যুগ শুরু হওয়ার আগের প্রায় সব কিছু আমাদের কাছে পৌছে দেবার ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা ছিল সন্ন্যাসী আর সন্ন্যাসিনীদের যারা পাণ্ডুলিপিগুলো নকল করার কাজটি করেছেন। দীর্ঘদিন তাঁরা চর্মাপটে লিখেছেন, কিন্তু চতুর্থ শতক থেকে কাগজের ব্যবহার প্রচলিত হলো। এটা বেশ পুরনো একটি কৌশল, যা যিশু খৃষ্টের জন্মের কিছুদিনের মধ্যেই চীনে আবিষ্কৃত হয়েছিল। মুসলিম জগতে কাগজের ব্যবহার চলে আসছে সেই অষ্টম শতক থেকে, কিন্তু ইউরোপে, আরো সঠিকভাবে বললে স্পেনে সেটা তৈরি হতে শুরু করে কেবলই ত্ৰয়োদশ শতকে। প্ৰায় সেই সময়েই শিক্ষা ও লেখালেখি সংক্রান্ত সব বিষয়ের ওপর থেকে গির্জা তার নিয়ন্ত্রণ হারাতে থাকে। কাগজ যেহেতু চৰ্মপটের চাইতে সস্তা। তাই লোকজনের পক্ষে আর্থিকভাবে সাশ্রয়ী উপায়ে টেক্সটগুলোর নিজের নকল নিজেই করা বা নিজে নিজেই টেক্সট লেখা সম্ভব হলো।
চতুর্দশ ও পঞ্চদশ শতকের এমনকি আরো পরের এমন বহু টেক্সট রয়েছে। গ্রন্থনির্মাণের প্রধান ভূমিকা থেকে গির্জাকে প্রতিস্থাপিত করার জন্য কেবল মুদ্রণ শিল্পই যে দায়ী ছিল তা নয়। পঞ্চদশ শতকের শেষ দিকে ছাপাখানা যখন নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে গেছে, মঠগুলো ততদিনে এই বাজারে তার অগ্রগণ্য অবস্থান হারিয়ে ফেলেছিল।
তারপরেও, প্রায় এক সহস্রাব্দ ধরে, প্রাচীন যুগের সংস্কৃতি প্রচার করার দায়িত্ব বিভিন্ন মঠের স্ক্রিপ্টোরিয়াম বা লেখার ঘরগুলোর ওপর বর্তেছিল প্ৰায় নিরঙ্কুশভাবেই। সেখানে যে-সব পাণ্ডুলিপি তৈরি হতো। সেগুলো সব সময় সহজপাঠ্য ছিল না। সমস্যাটা যে হাতের লেখারই ছিল সাধারণত তা নয়, যদিও অবশ্যই লিপিকর, কাল, এবং স্থানভেদে প্রায়ই লিখনশৈলীর তফাত হতো। হস্তরেখা পরীক্ষা করে বিশেষজ্ঞরা একটি পাণ্ডুলিপি তৈরির স্থান ও কাল সম্পর্কে মূল্যবান সিদ্ধান্তে পৌছাতে পারেন। এই বিদ্যাটিকে palaeography বলা হয়; লাতিন টেক্স নিয়ে যারা কাজ করেন তাদের প্রত্যেকের কাছে  এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।
বইঃ লাতিন ভাষার কথা
লেখকঃ তরে ইয়নসন
অনুবাদঃ জি এইচ হাবিব
-----------------

গোলাম মাওলা , ভাবুক, সাপাহার, নওগাঁ

Re: প্যাপিরাসের ইতিহাস

বাহ thumbs_up অনেক অজানা তথ্য জানা হলো।ধন্যবাদ আপনাকে smile

ডিজিটাল বাংলাদেশে ত আর সাক্ষরের নিয়ম চালু নাই।সবটায় দেখি বায়োমেট্রিক।তাই আর সাক্ষর দিতে পারলাম না।দুঃখিত।