সর্বশেষ সম্পাদনা করেছেন gmakas (১৬-০৬-২০১৭ ০৮:৩৫)

টপিকঃ আর্য আক্রমণ তত্ত্ব এবং দেড়শ বছরের এক ঐতিহাসিক ধাপ্পা

আর্য আক্রমণ তত্ত্ব এবং দেড়শ বছরের এক ঐতিহাসিক ধাপ্পা

Max Muller, যিনি আর্যর্বাদের মূল প্রবক্তা, তিনি 1872 সালে ষ্ট্রেসবার্গ বিশ্ব বিদ্যালয়ের এক বক্তৃতায় বললেন, আর্যভাষা-র অস্তিত্ব থাকলে- ও আর্যর্জাতি বা আর্য রক্তের কথা বলা অবৈঙ্গানিক।
(There are Aryan and Semitic languages but it is unscientific... to speak of Aryan race, Aryan blood and Aryan skulls.)
কিন্তু “আৰ্য তত্ত্ব’ বিশেষ করে ‘আৰ্য আক্রমণ তত্ত্ব' বা Aryan Invasion Theory =AIT] কিছুতেই বিলুপ্ত হল না, যদিও বর্তমানে ভাষাতাত্ত্বিক, নৃতাত্ত্বিক বা পুরাতাত্ত্বিক কোন-ও ভাবেই এ তত্ত্ব-কে সমর্থন করতে না পেরে অনেক ঐতিহাসিক |রোমিলা থাপার প্রমূখ] “আৰ্য আগমন তত্ত্ব’ বা ‘Aryan Migration Theory” |-AMT] নামক এক অদ্ভুত কথা বলছেন, যার গ্রহণযোগ্যতা একেবারেই পাওয়া যাচ্ছে না ।
তবে এসব কথা আলোচনা করার আগে আমাদের জানা দরকার এই ‘আর্য তত্ত্ব’ বিষয়টি কি এবং এর উদ্ভব ও বিকাশ হল কিভাবে?
অষ্টাদশ শতাব্দীতে [১৭০০-] তিন শ্রেণীর ইউরোপীয় মানুষ ভাগ্যান্বেষণে ভারতে আসতে লাগল। প্রথম শ্রেণীর মানুষেরা এলেন ভারতের মাটিতে বাণিজ্যিক কারণে। ইংরেজ, ফরাসী, ডাচ এবং পর্তুগীজরা তাদের দেশে এক একটি East India Company স্থাপন করলেন এবং সমৃদ্ধশালী (তেমনটাই প্রচারিত ছিল ইউরোপের মাটিতে) ভারতের সাথে বাণিজ্য করতে বেরিয়ে পড়লেন। জলপথে ভারতে পৌছবার তাগিদ থেকেই অতীতে কলম্বাস, ভাস্কো-ডা-গামা-দের মতন মানুষ অথবা না পেয়ে। এসব East India Company—গুলো ভারত ও অন্যান্য দেশে বানিজ্যিক ঘাটি গেড়ে বসল এবং পারস্পরিক লড়াই চালিয়ে গেল, যাদের মধ্যে British East India Company ভারতের বুকে রাজনৈতিক তথা শাষন ক্ষমতা দখল করে নিতে সক্ষম হল।
দ্বিতীয় দল এলেন খ্ৰীষ্টান মিশনারী-রা, যারা ভারতের কোনায় কোনায় ছড়িয়ে পড়লেন ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে এবং এদেশের সাধারণ মানুষ ও তাদের শিক্ষা – সংস্কৃতি-র সাথে এই মিশনারীদের যোগাযোগ হতে লাগল। তৃতীয় একদল মানুষ এলেন ব্যক্তিগত উদ্যোগে, কোন-ও প্রতিষ্ঠানের ছত্রছায়ার বাইরে। তারা বিলাতে নিযুক্ত East India Company বা মিশনারী প্রতিষ্ঠানের কমী নন। এদেশে এসে কোন-ও না কোন-ও কাজে যুক্ত হয়ে অর্থেপাৰ্জন করা তাদের মূল উদ্দেশ্য হলেও এদের মধ্যে কেউ কেউ এদেশের সাথে সাংস্কৃতিগত ভাবে জরিয়ে পড়লেন। সেসময় ইউরোপ নবজাগরণের মধ্য দিয়ে এসেছে এবং সাহিত্য, বিজ্ঞান, শিল্প সবক্ষেত্রে-ই পারদর্শিতার চূড়ান্ত শিখরে বসে থেকে তারা পৃথিবীর অন্যান্য মানুষদের জাতি হিসাবে-ই দেখছিলেন। কিন্তু গোল বাধল। এদেশের মাটিতে খুঁজে পাওয়া বৈদিক সাহিত্যিক নিদর্শগুলি —যা রচনা ও অভ্যাস করার জন্য যে উন্নত, সভ্য ও শিক্ষিত মানুষদের প্রয়োজন তা সেইসময় ভারতের মাটিতে খুজে পাওয়া যাচ্ছিল না। ঐসব বৈদিক সাহিত্যগুলিতে ‘আর্য শব্দটি পাওয়া যাচ্ছিল যা একশ্রেণীর মানুষ সম্পর্কে প্রয়োগ করা ছিল। ১৬০০ সাল থেকে ভারতে ইউরোপীয়রা আসতে শুরু করেছিল। মিশনারীরা তার একটু আগে থেকেই ভারতে আসছিল। Robert De Noboli, যিনি ১৬০৬ সালে এদেশে আসেন, তার লেখা থেকে জানা যায়। ১৫৫৯ সালে গোয়ার মিশনারীগণ এক খৃষ্টধর্মগ্রহণকারী ব্রাহ্মণের কাছ থেকে ভারতীয় শাস্ত্ৰ তথা দর্শন গ্রন্থগুলি অধ্যয়ন করেন। উদ্দেশ্য অবশ্য ছিল ব্ৰাহ্মণদের তর্কযুদ্ধে আহ্বান করা। ১৬৯৭ সালে একদল ফরাসী জেসুইট মিসনারী এলেন। তাদের মধ্যে Father Pons ১৭৪০ সালে ব্ৰাহ্মণ্য গ্রন্থগুলির এক তালিকা প্ৰস্তুত করেন। এরপর ১৭৯০ সালে Johann Philip Wesdin নামক এক জামান পন্ডিত একটি সংস্কৃত ব্যাকরণ পুস্তক রচনা করেন। Abbe Dubois নামক এক ফরাসী মিশনারী সর্বপ্রথম ‘আর্য জাতি' শব্দটি প্রয়োগ করলেন। পরবর্তীকালে British East India Company এই মতবাদটি লুফে নিল এবং দৃঢ়ভাবে এই মতটিকে প্রচার করতে লাগল যে যেমনভাবে ইউরোপ থেকে তারা আধুনিক উন্নত শিক্ষা ও সংস্কৃতি নিয়ে এদেশে এসেছেন সেরকম-ই ‘আর্য জাতি’-র লোকেরা এদেশে এসেছিল এবং এসব বৈদিক সাহিত্য তাদের-ই। উন্নত শিক্ষার বহিঃপ্রকাশ । প্রথমদিকে ভারতীয় সাহিত্য সম্ভারের বিস্তৃত জ্ঞান যত-ই ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ছিল, ইউরোপীয় পন্ডিতদের মধ্যে ভারত সম্পর্কে এক উচ্চকিত ধারণার জন্ম । দিচ্ছিল। দুই বিখ্যাত ইউরোপীয়ান পন্ডিত ভলতেয়ার ও শ্লেগেল-এর দুটি বক্তব্য
Source: “The Invasion That never was: Michel Danino & Sujata Nahar; page 12-13 & 90-91]
এ ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক । 15.12.1775 তারিখে লেখা এক চিঠিতে, যা 1.777 সালে প্যারিস থেকে মুদ্রিত হয়েছিল, ভলতেয়ার জানালেন – “I am convinced that everything has come down to us from the banks of the Ganges - astronomy, astrology, metepsychosis etc
[জ্যোতিবিদ্যা, জ্যোতিষ এর মতন সবকিছুই গঙ্গা নদীর তীর থেকেই এসেছে বলে আমি বিশ্বাস করি]।

জামান দার্শনিক ফ্রেডেরিক ভন স্নেগেল 1803 সালে বললেন -
“Everything without exception is of Indian origin whether directly or indirectly, all nations are originally nothing but Indian colonies. [সবকিছু-ই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ভারত থেকেই উদ্ভূত এবং সব দেশগুলো ভারতের উপনিবেশ ] ।
কিন্তু অন্যান্য ইউরোপীয় পন্ডিতদের এমনধারা মতামত ভারতে ক্রমবিস্তরশীল। বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের সহায়ক শক্তি রূপে পরিগনিত হচ্ছিল না। East India Coas “Divide and Rule 438 first-C1st Divide and Convert skirts আকারে ভারতে প্ৰযুক্ত হচ্ছিল। ফলে ভারতের অতীত সম্পর্কিত এমন একটি মতবাদের প্রয়ােজন হয়ে পড়ল। যা বৃটিশ শাসনের পথকে প্রশস্ত করবে।
1831 সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে সৃস্টি করা হল “বোডেন প্রফেসরশিপ' নামক একটি পদ, যার ঘোষিত উদ্দেশ্য-ই ছিল ভারতীয় সভ্যতা, সংস্কৃতি এবং শাস্ত্রগুলির এমন ব্যাখ্যা প্ৰদান যা ভারতবর্ষে খৃষ্টধর্ম প্রচারের সহায়ক হবে। ঠিক এইসময় থেকেই ভারতীয় ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে বিদেশী রাজনীতি ও অর্থের অশুভ প্রভাব শুরু হয়ে গেল। আমেরিকান ঐতিহাসিক Thoman R.Traumann জানিয়েছেন, ইভাঞ্জেলিষ্টদের প্রভাবে ভারতীয় সভ্যতাকে ছোট করার কাজ শুরু হল "Evangelical influence drove British policy down a path that tended to
minimize and denigrate the accomplishment of Indian civilization - Aryans and British India, 1997 |

1833 সালে টমাস ব্যারিংটন মেকলে নিযুক্ত হলেন ভারতে East India Co-র শিক্ষাবিষয়ক কমিটির অধিকর্তা পদে। তিনি ভারতে রইলেন মাত্র ছয় বছর কিন্তু তার গৃহীত নীতি-কেই আদর্শ করে বৃটিশ শাসন চলতে লাগল ভারতের মাটিতে। তার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল ভারতীয়দের, বিশেষতঃ ব্রাহ্মণ পন্ডিতদের ইংরেজী শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে পারলে তারা বেদভিত্তিক হিন্দুধর্মের অসারতা বুঝতে পারবে এবং সহজেই খৃষ্টধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হবে। হিন্দু ধর্ম ও তার শাস্ত্রগুলি সম্পর্কে তার মত ছিল – “a literature admitted to be of small intrinsic value...(one) that inculcates the most serious erosion of the most important subjectsus সাহিত্যের অতি নগণ্য মূল্য আছে এবং বহু বিষয়ে ভুল তথ্যে ভরা। Source: India: A World in transition - By B. P. Lamb; page-194)
ভারতীয়দের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ও তার পরিস্কার মতামত ছিল। তিনি এদেশে-ই ইংরেজীশিক্ষিত একদল মানুষ তৈরী করতে চাইলেন যারা সর্ববষয়ে বৃটিশরাজের পদাঙ্ক অনুসরণ করবে। “1835 Minute”-এ তিনি বললেন যে তিনি চান, পাশ্চাত্য শিক্ষাপদ্ধতিতে একদল শিক্ষিত ভারতীয় শ্রেণী সৃষ্টি করতে যারা রক্তে ও গাত্রবণে । ভারতীয় হলেও নীতি, মত ও রুচিতে হবে ইংরেজ [ to create Indian elite through western style of education... Indian in blood and colour, but English in taste, in opinion, in morals, in intellect]
এই মেকলে সাহেব-ই পরবর্তীকালে 1854) জামান পন্ডিত ম্যাক্সমুলারকে খুজে পেলেন। মণিকাঞ্চন যোগাযোগ হল । তথ্য বলছে তিনি দশ হাজার পাউন্ড পারিশ্রমিকের বিনিময়ে ঋক বেদের অনুবাদ কাযে নিযুক্ত হন। এই শর্তে যে বেদ-এর ব্যাখ্যা ভারতের মাটিতে ইউরোপীয় সভ্যতা-সংস্কৃতি-র বিকাশের সহায়ক হবে। ম্যাক্সমুলার 1886 সালে তার স্ত্রীকে চিঠিতে জানাচ্ছেন
‘বেদের অনুবাদ অনেকাংশে ভারতের ভাগ্য নির্ধারণ করবে। ওদেশের লক্ষ লক্ষ লোক মুক্তির পথ খুজে পাবে। বেদই তাদের ধর্মের মুলে। এই মূলটা কি দেখানাে গেলে, আমি নিশ্চিৎ, ৩০০০ বছর ধরে যা কিছু উদ্ভূত হয়েছে তা মুলোৎপাটিত &C'('...it is the only way of uprooting all that has sprung from it during the last three thousand years - Life and letters of Friedrich MaxMuller from MaxMuller Exposed by Brahma Dutt Bharati)
ইতিপূর্বে ওয়ারেন হেস্টিংস-এর আমলে (১৭৭৩-) ইউরোপীয়ান-দের সংস্কৃত চচা শুরু হয়। হেস্টিংস নিজে উদ্যোগ নিয়ে আনলেন চার্লস উইলসকিন্স-কে । ইনি। বেনারস-এ গিয়ে সংস্কৃত চৰ্চা করলেন এবং 1785 সালে ভগবতগীতা’-র ইংরাজী অনুবাদ প্ৰকাশ করলেন।
ইতিমধ্যে 1786 সালে উইলিয়ম জোন্স (যিনি এশিয়াটিক সোসাইটি-র অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি) সংস্কৃত, গ্ৰীক, ল্যাটিন, জার্মান ভাষাগুলি একটি বিশেষ ভাষাগোষ্ঠীভুক্ত একথা ঘোষণা করলেন। জোন্স কর্তৃক প্রভাবিত হয়ে থমাস ইয়ং (পদার্থবিজ্ঞানী তথা মিশরতত্ত্ববিদ) ইন্দোইউরোপীয়ান এই পরিভাষাটি প্রথম ব্যবহার করেন  (The Quarterly Review; 1813) | এই শব্দটির সাহায্যে তিনি উপরোক্ত ভাষাসমূহের একটি সাধারণ উৎস খুঁজে বের করার চেষ্টা করলেন। খুব অল্পদিনে এই ধারনার উৎপত্তি হল যে ইন্দো-ইউরোপীয় জাতি-ই হল এসব ভাষাসমূহের স্রষ্টা। (1818 সালে জামান ভাষাবিদ Klaproth "ইন্দাে-জামানীয়' পরিভাষাটি ব্যবহার করলেন) একথাও বলা হল যে তারা আদিতে একটি জায়গায় বাস করত।
সে জায়গা কোথায়? 1820 সালে, জি জি রোড (Rhode) এই আদি স্থল-কে নিৰ্দ্ধারণ করলেন মধ্য এশিয়ায়। 1840 সালে এফ আ পট (Pott) হিন্দুকুশ এবং ওক্সাস উপত্যকা-কে আদি স্থান বললেন। জ ভন কালে প্রাথ (Caleprath) আবার বললেন "ইন্দোইউরোপীয়' শব্দটির বদলে ইন্দাে-জার্মানিক” শব্দটি বেশী যুক্তিযুক্ত। 1835 সালে ফ্রাঞ্জ বপ [Franz Bopp] তুলণামূলক ভাষাতত্ত্বে-র এক বই লিখে ফেললেন। সংস্কৃত শব্দমন্ডলীর সাথে ইউরোপীয় ভাষার শব্দের সাদৃশ্য ইউরোপীয় পন্ডিতদের এই ধারণার দিকে ঠেলে দিচ্ছিল যে ইউরোপ-ই আদি বৈদিক ভাষার জন্মস্থান এবং পরবর্তীকালে এই ভাষা (বৈদিক-সংস্কৃত) ও ভাষাবাহক জনগোষ্ঠী ইউরোপ থেকে ভারতে চলে আসেন। বপ-এর কাছে জামান পন্ডিতদ্বয় স্লেগেল এবং ম্যাক্সমুলার সংস্কৃত ভাষা শিক্ষা করেন। ম্যাক্সমূলার ছয় খন্ডে ঋক বেদ অনুবাদ করা ছাড়াও তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব ও ভারতীয় দর্শন –এর উপর আর-ও গ্রন্থ রচনা করলেন। তিনি 1857 সালে লিখলেন “A History of Ancient Sanskrit Literature |
এতে  তিনি বললেন-ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাসমূহের উৎস যারা তাদের ইন্দো-ইউরোপীয়’ বা ইন্দো-জামানিক না বলে বলা উচিত ‘আয' ।
কারণ যারা ভারতবর্ষ আক্রমণ করেছিল তাদের ভাষা ছিল ংস্কৃত এবং তারা নিজেদের ‘আর্য হিসাবে চিহ্নিত করত। এরাই হলেন হিন্দু, পারশিক, গ্ৰীক, রোমান, শ্লাভ, কেল্ট ও জার্মানদের পূর্বপুরুষ। এই আর্যর্জাতি ইউরোপে উদ্ভূত এবং নানা দলে দক্ষিণে, দক্ষিণ-পশ্চিমে এবং পশ্চিমে সভ্যতা বিস্তার করতে করতে আরমেনিয়া, পারস্য হয়ে ভারতবর্ষে এসে পড়ে। এর মধ্যে জামান ভাষাতত্ত্ব ও জাতিতত্ত্ববিদ Ker Penka প্রাচীণ আযদের “dolicho - cephalic (দীঘর্কপালি) leptorhine type” Ki Gori বৰ্ণনা করেছেন, আবার পরবর্তীকালে (1901) ভারতের জাতিতত্ত্ব সংকলন বিভাগের অধ্যক্ষ হার্ভার্ট রিসালে জািঠ ও রাজপুতানা-র লোকেদের মধ্যে পেঙ্কা বর্ণিত আর্য লক্ষণ খুজে পেলেন। ম্যাক্সমুলার আযর্জাতিতত্ত্বের প্রচারের পাশাপাশি দ্বিতীয় এক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করলেন- সেটি হল ঋক বেদাদি গ্রন্থের কাল নির্ণয়। তিনি এক অবোধ্য কারনে একাদশ শতকের কাশ্মীরী পন্ডিত সোমদেব ভট্ট রচিত কথাসরিতসাগর’ নামক এক গ্রন্থ থেকে এক ভৌতিক কাহিনী থেকে নন্দ রাজার এক মন্ত্রী বররুচি' সম্পর্কিত বৰ্ণনাটি গ্রহণ করলেন, যে বররুচি পূর্ব জন্মে কাত্যায়ণ নামে পরিচিত ছিল। এদিকে বৈদিক গ্রন্থগুলির যে সকল সূত্রগ্রন্থাবলি পাওয়া যায় তাদের একটির সূত্রকার হলেন কাত্যায়ণ নামক এক ঋষিপন্ডিত। ম্যাক্সমুলার ঐ কাত্যায়ণকে নন্দ রাজার সমসাময়িক (অথচ কাত্যায়ণ নন্দ-মন্ত্রী নন) ধরে নিয়ে সূত্রগ্রন্থাগুলির কালনিৰ্ণয় করলেন খ্ৰীঃ পূঃ চতুর্থ শতক (নন্দ রাজা আলেকজান্ডার-এর সমসাময়িক)। তিনি সর্বসাকুল্যে যা যা কল্পনা করলেন, তা হল –
১। আর্যরা ভারতে এসেছিল 1500 BC নাগাদ উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে;
২। ঋক বেদ হল প্রাচীনতম গ্রন্থ:
৩। সমগ্র বৈদিক সাহিত্যের চারটি স্তর বা কালপর্যায়, যথা – ছন্দ, মন্ত্র, ব্ৰাহ্মণ ও সূত্র;
৪। প্রাচীণ সাহিত্যের প্রতিটির কালপর্যয় ছিল আনুমানিক দুশ বছর;
৫। সোমদেব-এর গ্রন্থ-এর ব্যাখ্যা অনুসারে সূত্র রচনার কাল মৌৰ্য্যযুগের সমসাময়িক;
৬। বেদ-এর চারটি স্তর পার হতে লেগেছিল। 200 x 4 = 800 বছর। সূত্রযুগকে। 400 BC ধরে নিয়ে ঋকবেদ রচনাকাল হল 400+800 = 1200 BC সোমদেব রচিত ‘কথাসরিতসাগর’ নামক গ্রন্থের কাণভূতি নামক এক ভূত বা অশরীরি প্রকৃতপক্ষে বররুচি-কাত্যায়ণ-এর কাহিণী শুনিয়েছিল। অতএব কাণভূতি নামক ভূতের সাক্ষ্যে ভারতবর্ষের প্রাচীণ ইতিহাস রচিত হল। ম্যাক্সমুলারের এই গল্পগাথা সকলে একবাক্যে মেনে নিল না। উইলিয়াম হুইটনী (ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতভাষার অধ্যাপক), থিওডোর গোন্ডষ্ট্রকার (লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত ভাষার অধ্যাপক)-দের মতন সমসাময়িক পন্ডিতেরা ঐ তত্ত্বের বিরোধিতা করতে লাগলেন লিখিতভাবে । আইজ্যাক টেলর নামক এক পাদ্রি 1890-তে লিখেছিলেন (Origin of the Aryans; page-39) আর্যদের আতুরেঘর  হল সেই দেশ যেখানে সংস্কৃত ও জেন্দ উচ্চারিত হয়েছিল।[The cradle of Aryans must have been in the region where Sanskrit and Zend were spoken] 
অবশেষে চাপের মুখে ম্যাক্সমুলার তার দুই মতবাদ থেকেই পিছু হটলেন। 1890 নাগাদ জানালেন –
১। বেদের যে কাল তিনি নির্ণয় করেছেন তা হল নু্যুনতম;
২। বেদের সঠিক কাল নিৰ্ণয় করা অসম্ভব এবং সবশেষে
৩। আর্যজাতি বলে আসলে কিছু হয় না।
1. “I have repeatedly dwell on the merely hypothetical character of dates, which I have ventured to assign to the first period of vedic literature. All I have claimed for them has been that they are minimum dates and that the literary productions of each period which still exist or which formerly existed could hardly be accounted for within shorter limits of time than those suggested
2. 'whether the vedic hymns were composed (in) 1000 or 1500 or 2000 or 3000 BC, no power on earth will ever determine
3. "To me an ethnologist who speaks of an Aryan race, Aryan blood, Aryan eyes and hair, is as great a sinner as a linguist who speaks of a dolicho-cephalic dictionary. ---- Physical Religion, 1891, London; Longman)
অবশেষে সেই কথা দিয়ে শেষ করতে হয় যা দিয়ে এই রচনা শুরু হয়েছিল – “There are Aryan and Sematic languages, but as it is unscientific. to speak of Aryan race, Aryan blood and Aryan skulls. ততদিনে অবশ্য
British East India Company-র কাছে  ম্যাক্সমূলারের প্রয়োজন ফুরিয়ে এসেছে।
সূত্রঃ আর্য দিগন্তে সিন্ধু সভ্যতা—রজত পাল

গোলাম মাওলা , ভাবুক, সাপাহার, নওগাঁ