টপিকঃ জুয়েল মিয়াজির গল্প।

লাভ লেটার


................
সুজাতাদের রান্না ঘরে ঝনঝন থালাবাসনের শব্দ হচ্ছে।রান্না ঘরে ঝনঝন শব্দ প্রতিদিনই হয় তাদের, তবে কালেভদ্রে যখন তা তীব্র রূপ ধারণ করবে তখন বুঝে নিতে হয় যে সুজাতার মন ভালো নেই।সুজাতার মন কালেভদ্রে খারাপ হয়, কারণ তার দাদা বৌদির ঝগড়াও কালেভদ্রে হয়। এছাড়া অন্য কোন রোগ শোক জরা মৃত্যু সহজেই সুজাতার হাসিমাখা মুখ মলিন করতে পারে না। সুজাতার দাদা বৌদি যখন অযথা কারনে কেরেঙ্গাল বাধায় তখন বুক ব্যথা বেড়ে যায় সুজাতার।আবার মাঝেমধ্যে সে ব্যথা তীব্র রাগে রূপান্তরিত হয়,তাই উপায়ান্তর না পেয়ে রাগ ঝারতে হয় তাকে হাড়িপাতিল বাসনকোসনের উপর।মনে হয় যেন সব দোষ হাড়িপাতিলেরই।মাঝে মাঝে খুব কাদতেও ইচ্ছে করে সুজাতার, কিন্তু কাদেঁ না সে কারন কাদলে আরেকটা লঙ্কাকাণ্ড বেধে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।হয়তো সুজাতার কান্নার রহস্য আবিষ্কার করতে গিয়ে দাদা বৌদির মধ্যে দ্বিতীয়বার ঝগড়া বাধবে।ঐ দিকে আবার সামনের সপ্তাহ থেকে ওর অনার্স ফাইনাল ইয়ারের সেমিস্টার পরিক্ষা। তাই দাদা বৌদির চিন্তায়, পরিক্ষার।চিন্তায় সুজাতার মন মারাত্মকভাবে খারাপ হয়ে রয়েছে। আজ সকাল থেকে কোন বলা নেই কওয়া নেই বৌদি কাদতেছে।কাদতেছে মানে মুখ দিয়ে কোন আওয়াজ বের হচ্ছে না তবে চোখ বেয়ে বেয়ে পানি পরতেছে। হাতের করগুনে হিসেব করলে সকাল থেকে এই নিয়ে সাঁইত্রিশবার সুজাতা বৌদিকে কান্নার কারন জিঙ্গেস করেছে।কিন্তু বৌদির চোখ নড়ে, নাক নড়ে কিন্তু ঠোট নড়েনা।বৌদির উপর বিরক্তি চলে আসছে সুজাতার ধুর ছাই! ভাল্লাগেনা।কিন্তু রাগ করে বেশিক্ষণ থাকতেও পারে না সে। কারণ দাদা বৌদি তার ভালোবাসার সর্বোচ্ছ স্থানটা দখল করে অাছে তাই তাদের উপর রাগ করে থাকা সম্ভব হয় না সুজাতার। তাদের কষ্ট তাদের বিরহ সুজাতার মন খারাপের কারন। স্কুলে অভিভাবক মন্ডলীর বৈঠকে সব ছেলে মেয়ের মা বাবা উপস্থিত থাকতেন, কিন্তু সুজাতার অভিভাবক হিসেবে দেখা যেতো তার মালতী ভাবী কিংবা তার বড়দা তমালকে।মালতী তমালের কোন ছেলে মেয়ে ছিলনা, সন্তানের জন্য যতটুকু স্নেহ হৃদয়ভান্ডারে সঞ্চিত ছিল তাদের, তার পুরোটাই দখল করে নিয়েছে সুজাতা। তাই অকারণে সন্তান জন্ম দিয়ে ভালেবাসা বিতরনে অসাম্যের সৃষ্টি হতে পারে ভেবে তারা কোন সন্তান জন্ম দেন নি।হাসি কান্না সুখ দুখ নিয়ে মোটামোটি ভালোই অাছে তারা, কিন্তু মাঝে মাঝে স্বামী স্ত্রীর কথা কাটাকাটিতে অশান্তি নেমে আসে সংসারে।যার দরুন সুজাতার মন খারাপ হয়ে যায়।ফলে দাদা বৌদির মধ্যকার সমস্যাগুলি তাকেই সমাধান করতে হয়।সেদিন বারবার চেষ্ঠা করেও বৌদির কান্নার রহস্য উন্মোচন করতে না পেরে সুজাতা ভাইয়ের কাছে সাহায্যের জন্য যায়।কিন্তু তমালের মুখেও কোন কথা নেই। গম্ভীর মুড নিয়ে ইজি চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে বসে ঝিমাচ্ছে সে।সুজাতা তমালের কব্জির উপর হাত থেকে বলল,বড়দা বৌদি কাদেঁ কেন? তুমি কি তাকে খারাপ কিছু বলছ? তমাল শুনেও না শোনার ভাঁন করে গম্ভীর মুডে পত্রিকা পড়তে লাগলো। সুজাতা আবারো তমালের শরীরে নাড়া দিয়ে বলল, দাদা;বৌদি কাদেঁ কেন? তমাল অনেক্ষন চুপ থাকার পর গম্ভীর কন্ঠে বলতে লাগলো,তোর বৌদিকে ডিবোর্স দিয়েছি।কাল থেকে সে আর আমাদের সাথে থাকবে না।খবরটা শোনা মাত্র সুজাতার মুখ মন্ডল হলুদ হয়ে গেলো।তমালের হাতের পাশে রাখা কাগজ পত্র দেখে সুজাতার রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে আসতেছিল,সুজাতা ভেবে নিয়েছেন,নিশ্চই খামে মোড়ানো কাগজগুলির মধ্যে উকিল নোটিস রয়েছে। আস্তে আস্তে সুজাতার হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসতে লাগলো।সুজাতার ফ্যাকাসে মুখ দেখে তমাল নিজেকে সামলাতে পারেনি।সুজাতাকে কাছে   নিয়ে তমাল বলল,ধুর!পাগলী।মিথ্যা কথা বলছি তোর সাথে।কালরাত তোর ভাবীর সাথে আমার ছোটখাটো একটা ঝগড়া হয়েছে।আমি তার উপর খুব রেগে গেছি, তাই ভয় দেখানোর জন্য মিথ্যা ডিবোর্সের নাটক সাজিয়েছি।সুজাতার মুখে সুখের হাসি। সুজাতা টেবিলের উপর রাখা খামটা হাতে নিয়ে অাহ্লাদের সুরে বলল, তাহলে দাদা এগুলি কি? তমাল হেসে বলল, এগুলি লাভ লেটার, অামি আর মালতী যখন ইউনিভার্সিটিতে পড়তাম তখন প্রতি সপ্তাহে একটা করে লেটার পাঠাতো।  লেটারগুলি পড়ে ফেলে আসা দিনের স্মৃতিগুলি মনে করতেছিলাম।সুজাতা তমালের রসিকতা দেখে গড়গড়িয়ে  হাসে।সুজাতা হাসি থামিয়ে বলল ঠিক আছে দাদা, তাহলে আমি যাই। বৌদির কান্না থামাতে হবে, বৌদি কেঁদে কেঁদে  ঘরটাকে লেক বানিয়ে ফেলেছে।তমাল আতকে উঠে বলল, তাই নাকি! এতবেশি কাদছে সে।যাক! তোর বৌদিকে বোকা বানাতে ফেরেছি তাহলে।তবে দাদা, বৌদি কিন্তু তোমাকে অনেক ভালোবাসে।সুজাতার কথা শুনে তমাল হাসতে হাসতে বলল, হাঁ সেটা জানার জন্যই তো এই নাটক।হা হা হা, বোকা মেয়ে কোথাকার।হো হো হো। তমাল আবারো স্ত্রী কে বোকা বানাতে পেরে দম্ভের হাসি হাসলো।সুজাতা তমালের হাসি দেখে দেখে সময় লস না করে তৎক্ষনাৎ বৌদির রুমে চলে গেল। বৌদির রুমে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে বলল বৌদি আর কেঁদো না, দাদা তোমাকে ডিবোর্স দেয়নি। সুজাতার কথা শুনে মালতী ভ্রু উচাতন করে, তলচোখে সুজাতার দিকে তাকিয়ে হো হো করে হেসে দিয়েছে।না, ডিবোর্সের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে, সে জন্য না। মালতী সুজাতার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলতে লাগলো,শোন! তোর দাদা যে আমারে ডিবোর্স দিবে না সেটা আমিও ভালো করেই জানি।সুজাতা অবাক হয়ে বলল, তাই নাকি! তাহলে তোমার চোখে পানি কেন বৌদি? মালতী আচলে বেধে রাখা মলমের কৌটাটা সুজাতার হাতে দিয়ে বলল, তোর দাদা কে  বোকা বানিয়েছি।হা হা হা।তমাল  নিজেকে খুব চালাক ভাবে, আসলে সে একটা বোকা লোক। বৌদিকে হাসতে দেখে সুজাতাও হো হো করে হেসে দিল।সুজাতাকে এখন ঠিক সেই রকম সুন্দর দেখাচ্ছে,কালো আকাশ বেয়ে  বৃষ্টি হওয়ার পর, আকাশটাকে যেমন সুন্দর দেখায়, ঠিক তেমন।

2 minutes and 9 seconds after:

গল্প কেমন হয়েছে, জানাবেন দয়া করে।সমালোচনায় আমি মনঃক্ষুণ্ণ হই না।আপনাদের আলোচনা, সমালোচনা, আমার আগামীর পথচলা শুভ হবে।