সর্বশেষ সম্পাদনা করেছেন ইফতেখার আলম (১০-০৫-২০১৭ ০০:১৭)

টপিকঃ অনন্যার ঝুম বৃষ্টি

শেষ বিকেলের মিষ্টি বাতাস বেশ ভাল লাগছিল অনন্যার। প্রতিদিন দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত সময় কাটে তার বই পড়ে। কখনও বারান্দায় আবার কখনও নিজের রুমে। কলিং বেলের শব্দে উঠে দাঁড়ায়। শাহেদের আসার সময় এখন। দরজা খুলতেই ক্লান্ত শ্রান্ত শাহেদের প্রশ্ন-

    কি করা হচ্ছে ম্যাডাম আপনার?

:     কি আর করা বই পড়ছিলাম

    মাঝে মাঝে হিংসে হয় জান, তোমার ওই বই পড়া কেড়ে নিতে ইচ্ছে করে।

:     এত ক্ষোভ আমার বই পড়া নিয়ে?

    হবে না! আমার তো মনে হয় আমার জন্যই তোমার কাছে সময় নেই!

দুজনই হেসে উঠল। “ফ্রেশ হয়ে নাও, আমি চা দিচ্ছি” বলে অনন্যা রান্না ঘরের যাচ্ছিল, এমন সময় বাধা শাহেদের। “সে পরে হবে, একটু বস তো” মুচকি হেসে শাহেদের উত্তর।

তোমার জন্য দুটো খবর আছে যে।

কি খবর?!

প্রথমত, এই হল পত্রিকার সংবাদ আর তাতে তোমার ছবি। গতকাল “জাগো” এনজিওর অনুষ্ঠানে তুমি যে বক্তব্য রেখেছিলে তা নিয়ে চলছে মাতামাতি। বেশ ভালই সাড়া পড়েছে তোমার বক্তব্যে নিয়ে। নগরীর যে সমস্যাগুলো নিয়ে সমাধানের তা নিয়ে চলছে আলোচনা। কাউন্সিলররা এতে আশার আলো দেখেছে। এই ব্যাপারে সম্মেলনের আয়োজন চলছে।
“কি বলছে তুমি” অবাক দৃষ্টিতে প্রশ্ন অনন্যার। সংবাদপত্র হাতে নিয়ে হাসিতে ভরে উঠল তার মুখ।

    আরও একটা সংবাদ আছে তোমার জন্য।

:     আরেকটা! সেটা কিসের?

শাহেদ ব্যাগ থেকে খাম বের করে এগিয়ে দিল অনন্যার দিকে।

:     এটা কি?

    খুলেই দেখ।

খামের উপর ইউনিভার্সিটি অফ মিশিগানের সীল দেওয়া।

    তোমার স্কলারশীপ গ্রান্ট করেছে তারা সেই সাথে Research Assistant এর সুযোগ

: কখন এলো?

    আজ সকালে, ঠিক আছে তুমি দেখা আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি। বাবা-মাকে জানিয়ে দিও ফোন করে খুশি হবেন তারা।

খাম হাতেই নিয়েই অনন্যার মনে হল জীবনটা থমকে গেছে। জীবনের এই অবস্থানে হয়ত আজ সে নাও আসতে পারত! চার বছর আগের কথা। রুবাইদের সাথে পরিচয়। ক্লাসে একটু দেরিতে আসতে ছেলেটা। এলোমেলো চুল, অগোছালো পোশাক আর নির্ঘুম চোখ, সবসময় এমনই ছিল। সেমিস্টারের এক প্রজেক্টে দুজনে একই গ্রুপে পড়ল, একদিন ক্লাস শেষে দুজনের কথা হয়। সেই থেকে বন্ধুত্ব। অনন্যার জীবনে পরিবর্তন আসে এই বন্ধুটি আসার পর। রুবাইদের জগতটা কেমন জানি ভিন্ন, সবসময় চুপচাপ আর বেশিরভাগ সময় বই পড়ত, অনন্যা ছিল তার ঠিক উল্টো। এরই মাঝে রুবাইদ অনন্যাকে অনেক বই উপহার দিত। বইগুলোর বিষয় ছিল বিভিন্ন ধরনের জ্ঞানমূলক বিষয় নিয়ে, কেমন জানি ফ্যাকাশে বিষয়! সবই পড়ে থাকত রুমের এককোণায়, এত সময় কই?! গৎবাধা জীবনে অভ্যস্ত ছিল অনন্যা রুবাইদের উল্টোটা। এই নিয়ে দুজনের মাঝে খুনসুটি চলত দুজনের মাঝে।

রুবাইদ প্রায় বলত “এভাবে নিজেকে কত পিছিয়ে রাখবি?” অনন্যা উত্তর দিত “তুই আছিস না, তোর জন্মই তো হয়েছে লাইব্রেরী তে,যখন দরকার হবে তখন তুই বলে দিবি সব” বলে হাসত । রুবাইদ মুখ গম্ভীর করে বলত তোর মাথায় একটা গাট্টা দেওয়া লাগবে।

এই রুবাইদই একদিন অনন্যাকে নিয়ে যায় বিশ্বসাহিত্যে কেন্দ্রে, সদস্য করে দেয় অনন্যাকে, অবজ্ঞার হাসি হেসে রুবাইদকে বলে “আমার দ্বারা হবেনা এসব বই টই পড়া ”।

প্রায়ই রুবাইদ অনন্যার সাথে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করত, অনন্যা বুঝতে পারল সে কতটা পিছিয়ে আছে, তাতেও কোন ভ্রক্ষেপ নেই, সে তার মতই থাকতে লাগল হাসি ঠাট্টা নিয়ে, এভাবে দিন ভালই কাটছিল তার। একদিন রুবাইদ ক্লাসে আসে না, কোন যোগাযোগ নেই। ফোন বন্ধ, কোনভাবেই যোগাযোগ করতে পারল না। এভাবে প্রায় বিশ দিন চলে গেল। ছটফট করতে লাগল অনন্যা, কি হলে তার ছেলেটার! রুবাইদ খুব বেশি কারও সাথে মিশত না আর যাদের সাথেও মিশত তাদের কাছেও কোন খবর ছিল না। ভার্সিটির বিভাগীয় তথ্যকেন্দ্র থেকে ঠিকানা জোগাড় করে অনন্যা গেল রুবাইদের বাসায়। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। দীর্ঘদিনের অসুস্থতা থেকে মুক্তি নিয়ে রুবাইদ বিদায় নিয়েছে এই পৃথিবী থেকে। রুবাইদ কখনই কিছু বলেনি কাউকে তার অসুস্থতা নিয়ে। রুবাইদের ছোট ভাই একটা কাগজের বাক্স এনে দিল অনন্যাকে , বাক্সে কিছু জিনিস দিয়ে গেছে অন্ন্যার নামে। ঝাপসা চোখে সেই বাক্স নিয়ে বাড়ি ফিরল অনন্যা। চিৎকার করে কান্না করতে ইচ্ছে করছে তার। বন্ধুতের যত স্মৃতি সবই রেখে গেছে রুবাইদ, সেই সাথে একটা চিঠি আর ডায়েরী।

ঝাপসা চোখে চিঠির শেষ লাইন ভাসছে-

“নিজেকে আলোকিত কর, এরই মাঝে তুই খুজে পাবি আমায়”

হাসি ঠাট্টায় সময় পার করা অনন্যার জীবনে এরপরই আসে পরিবর্তন। তার এখন আড্ডা দিতে ভাল লাগে না, ভাল লাগে না ঘুরে ফিরে সময় নষ্ট করতে । এত বছর রুবাইদের দেওয়া বইগুলোতে যেন খুজে পাচ্ছিল রুবাইদকে রুবাইদের ডায়েরীতে লেখা ছিল তাদের বন্ধুতের নানা স্মৃতি আর বেশ কিছু অনুপ্রেরণামূলক লেখা। রুবাইদের ইচ্ছে ছিল বিদেশ যাবে উচ্চ শিক্ষা অর্জনে, পরিবর্তন আনবে এই ঘুনে ধরা সমাজে। জীবনের অনন্যার সাথে নানা স্মৃতি লিখে রেখেছে সে। ডায়েরী পড়ত আর হাসত অনন্যা। এরই মাঝে ডিবেটিং সোসাইটিতে ভাল নাম করেছে। রেজাল্টও বেশ ভাল করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অনুষ্ঠানে পরিচয় হয় শাহেদের সাথে। অনুষ্ঠানে সাম্প্রতিক অনন্যার গবেষণা প্রবন্ধ সমাদৃত হয় সকল অনুষদে। এরই মধ্যে একই ছাদের নিচে আবদ্ধ হয় অনন্যা আর শাহেদ। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তার ভাল ফলাফল আর অগ্রগামী নারী হিসেবে চাকরির  প্রস্তাব পায়।চাকরির পাশাপাশি বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য আবেদন করে, আজ তারই “অ্যাপ্রুভ লেটার” এসেছে। অশ্রুতে টলমল দুচোখে ভেসে উঠছে রুবাইদের এলোমেলো চুলের মুখটা। দুচোখ ফেটে যেন অশ্রু আসছে।

    সেকি তুমি এখনও বসে আছ? বাসায় ফোন করে জানিয়েছ এই সংবাদ?

........................................................................................................................

বাইরে বৃষ্টি নেমেছে। অনন্যা বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে, একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে শাহেদ। অনন্যা কাদছে, ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাদছে, শাহেদ বুঝতে পারছে না, এই কান্না কিসের? আনন্দের নাকি কষ্টের কান্না?

অনন্যা কাদছে, বাইরে ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে। হয়তবা রুবাইদও কাদছে, বাইরে ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে। অশ্রু আর বৃষ্টির পানি মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে।



অনন্যার ঝুম বৃষ্টি

২৫ শে আগস্ট ২০১৬ থেকে ২৭ শে আগস্ট ২০১৬

মুহাম্মদ ইফতেখারুল আলম

প্রথম প্রকাশিত হয় ব্লগে, http://www.mynetwall.info/%e0%a6%85%e0% … %e0%a6%bf/

আমার বাংলা ব্লগ-  http://www.mynetwall.info
আমার পোর্টফোলিও-  http://efthaqur.mynetwall.info