সর্বশেষ সম্পাদনা করেছেন সদস্য_১ (১১-০১-২০১৭ ০৯:৩৫)

টপিকঃ আমি, কম্পিউটার আর প্রোগ্রামিং

প্রথম কম্পিউটার কখন/কোথায় দেখেছিলাম নিশ্চত ভাবে মনে পরছেনা। অতএব একাদশ শ্রেণীতে কম্পিউটার ল্যাবের সাক্ষাতটাকেই প্রথম ধরে নিচ্ছি। ঐচ্ছিক বিষয় হিসেবে বায়লজির বদলে কম্পিউটার শিক্ষা নিয়েছিলাম বাসায় কাউকে না জানিয়ে। উদ্দেশ্য ছিল ভবিষ্যতে “ডাক্তারী পড়ার” পথে কাঁটা দেয়া! কিন্তু প্রথম যেদিন কম্পিউটারের সাথে সাক্ষাত হল (সাক্ষাত বলতে অন্য ছাত্রদের সাথে দুর থেকে দাড়িয়ে দেখা!) সেদিন থেকেই এর প্রেমে পড়ে গেলাম! কি ছিল বলতে পারবনা হয়তো উইন্ডোজ ৯৫ এর সেই অদ্ভুত স্টার্টআপ মিউজিক, অথবা শ্বেত মনিটর/কীবোর্ডের সুভ্রতা... যে কারনেই হোক গেথে গেলাম এর সাথে আষ্ঠেপৃষ্ঠে।

ল্যাবে কম্পিউটার ছিল দুটা। একটা নতুন, উইন্ডোজ ৯৫, আরকেটা পুরোনো, ডস। পুরোনোটাতে হার্ডডিক্সে সমস্যা থাকায় ঠিকমত রান হত না। অতএব সেটা ছিল বাতিলে খাতায়। নিয়ম ছিল ফাস্টইয়ারের ছাত্ররা ক্লাস ছাড়া ল্যাবে ডুকতে পারবেনা, প্রথম বছরে ল্যাব ক্লাসও বিরল। সহপাঠিরা যখন ক্লাস বিরতিতে ক্রিকেট নিয়ে ব্যাস্ত, আমি তখন ল্যাবের বাইরে দাড়িয়ে কখনো জানালা, বা কখনো দড়জা দিয়ে সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্রদের কম্পিউটার চালানো দেখি। ছাত্রদের সাথে পরিচিত মুখ হতে বেশী সময় লাগেনা, কদিনের মধ্যেই কোন কিছু “টাচ করবনা” শর্তে ভেতরে প্রবেশ অধিকার পাই। ইন্টারনেট বিহীন কম্পিউটারে বড় ভাইদের কাজ বলতে ওয়ার্ড আর এক্সেল, কী বোর্ড চেঞ্জ করে বাংলা আনাটা বিশাল কিছু। আমি নিশ্চুপ দাড়িয়ে শুধু দেখে যাই। সঙ্গী/শিক্ষক বলতে নিজের আইকিউ আর জব্বারের কম্পিউটার শিক্ষা পাঠ্য বই।

মাস খানেক পর একদিন, কম্পিউটার চালক ছাত্রের শিক্ষক-রুমে তলব পড়ায় আমি কম্পিউটার রুমে একা হয়ে গেলাম। ক্ষনিকের দ্বিধা কেটে যাওয়ার পর, “ইহাকে পাইলাম” বলে ঝাপিয়ে পড়লাম। প্রথম বারের মত কি বোর্ড-মাউসে হাত দেয়া..., ছাত্রের ফিরে আসতে হয়তো মিনিট দশেক সময় লেগেছে। এরি মধ্যে আমি ওয়ার্ড ওপেন করে নিজের নাম ঠিকানা ইংরেজী এবং বাংলায় লিখে প্রিন্টকরে কাগজ জামার ভেতের চালান করে সুবোধ বালকের মত দাড়িয়ে গেলাম। প্রথমবার কম্পিউটারে বসার উত্তেজনা ছাপিয়ে ডটমেট্রিক্স প্রিন্টারের করকর সব্দ... অন্যকেউ শুনতে পাচ্ছে কি... প্রিন্টারটা এতো সময় নিচ্ছে কেন...! বলাই বাহুল্য ওয়ার্ড ওপেন করা থেকে প্রিন্ট করা পর্যন্ত সব কিছু শেখা সেই পেছনে দাড়িয়ে দেখে দেখেই।

এর কিছুদিন পর খোজ পেলাম, এলাকায় নতুন কম্পিউটার শেখার দোকান খুলেছে। তিন মাসে ওয়ার্ড এক্সেল পাওয়ার পয়েন্ট শিখিয়ে দেয়ার কোর্স। কি শেখাবে তা অবান্তর, দৈনিক একঘন্টা করে কম্পিউটার চালাতে পারব এই ছিল অনেক! বাবাকে বুঝিয়ে রাজি করিয়ে ফেললাম। ক্লাস শেষে, সাইকেলে করে কম্পিউটার সেন্টার। ইয়াং এবং ভাব নেয়া প্রশিক্ষক। তিন মাসের কোর্স, শিখতে চাইলে ভাল করে মনোযোগ দেয়ার পরামর্শ দিলেন। দু সপ্তাহ পর দেখাগেলে ওনার শেখানোর আর কিছু নেই। ততদিনে আমরা বেশ ভাল বন্ধু। ওয়ার্ড টোয়ার্ড দুজেই সমান জানি, কে ভাল কম্পিউটার জানে সেটা প্রমান করার একমাত্র মাধ্যম বাকি থাকে গেম! অতএব নিষ্ঠা নিয়ে খেলে চলি ব্যাটস্‌, প্যারানয়েড, প্রিন্স-অব-পোর্শিয়া, ফিফা-৯২... মাঝে মধ্যে দোকানের শাটার নামিয়ে দিয়ে চলত বিশেষ এক পোকার!

ক্লাস শেষে খুব বেশী সময় পাওয়া যায় না। যদি কলেজেল্যাবের “নষ্ট” কম্পিউটারটাকে ঠিক করতে পারতাম তাহলে আরেকটু গেম প্রাকটিস করতে পারতাম! বিস্তর তদন্ত শেষে গ্রান্ড প্রশিক্ষক (আমার প্রশিক্ষকের প্রশিক্ষক) মারফত, বুট ডিক্স সম্বন্ধে জানলাম। টিফিনের পয়সা বাচিয়ে অর্ডার করিয়ে দুটা ফ্লপি ডিক্স জোগাড় করলাম। এবার ল্যাবে গিয়ে নষ্ট কম্পিউটার দখল করে বসলাম। বুট ডিক্স দিয়ে বুট করিয়ে যখন একে একে গেম খেলা শুরু করলাম। দেখা গেল গেম বিহীন নতুন উইন্ডোজ কম্পিউটারের চেয়ে পুরান-নস্ট-ডস কম্পিউটারেই বেশী মজা। যদিও সবার অজানা কোন কারনে আমি রুম থেকে বেরুলেই সেটা আবার মৃত হয়ে যায়!

কম্পিউটার সেন্টারে বন্ধু-প্রশিক্ষকের সাথে গেমের মত পাল্লা চলত কে দ্রুত টাইপ করতে পারে। বাসায় টাইপিং প্রাকটিস করার জন্য পাঠ্য বইয়ের বিজয় কীবোর্ড ল্যাআউট এর পাতাটা বড় করে ফটো কপি করে তা টেবিলে আঠাদিয়ে লাগিয়ে তার উপর চলত টাইপিং প্র্যাকটিস! একসময় (আবারো গ্রান্ড প্রশিক্ষকের কল্যানে) একটা নস্ট কীবোর্ডের কিনে ফেললাম! টাইপিং ওয়ার্ড-পার-মিনিটে  হাফসেন্চুরী করাটাকে আর কে ঠেকায়!

কলেজে কম্পিউটার শিক্ষার টিচার ছিলনা। অর্থনীতি টিচার প্রক্সি হিসেবে ক্লাসটা নিতেন। কম্পিউটারে টিচারের জ্ঞান ছিল সর্টকোর্স পর্যন্ত, কিন্তু ক্লাসে ভালই পড়াতেন। অন্তত ঐ কলেজে ফিজিক্স/ক্যামিস্ট্রি/ম্যাথ টিচারদের থেকে অনেক সাবলীল ভাবে বুঝাতে পারতেন। হয়তো নিজে নিজে অনেক পড়তাম বিধায় অমনটা লাগতে পারে। বছর অর্ধেক না পেরুতেই প্রথম পত্র/দ্বিতীয় পত্র খতম দিয়ে ফেললাম। এক্সপ্লোরিং ফাইনাল ফ্রন্টিয়ার স্টাইলে শুরু করলাম প্রগ্রামিং কিউ বেসিক দিয়ে। মুল লক্ষ্য ছিল বইয়ের সমস্যা গুলোতে দক্ষ হওয়া। সেই শুরু, ছোট হলেও, লক্ষ্যটা ছিল পরিস্কার এবং নির্দিষ্ট। তাই আগ্রহের কমতি ছিলনা। বই কেনার বাতিক আগে থেকেই ছিল, কম্পিউটার বই কেনাটা নেশা হয়ে দাড়াল, ফর্ট্রান থেকে ফক্সপ্রো কোন বইই বাদ দিইনি। যদিও নিজের কম্পিউটার না থাকায় বই গুলোর প্রথম অধ্যায়ের পরে আর আগানো হত না।

মনে পরে, ব্যাবহারিক পরিক্ষা ফাইনালের দিন দু'ঘন্টা আগে যাওয়ার নির্দেশ ছিল। শিক্ষক-রুমে বসে ব্যাবহারিক প্রশ্নের সবগুলোর উত্তর লিখলাম। এরপর কয়েক সেট ফটোকপি করে সবাইকে বিতরন। অন্য কলেজ থেকে একজন পরিদর্শক টিচার এসেছিলেন, পরিক্ষা শেষে প্রোগামিং প্রশ্নের সলিউশান গুলোর তাকে ফটোকপি করে দেয়ার হুকুম পড়ল!

বার ক্লাস শেষে ঢাকা চলে আসলাম। উদ্দেশ্য ইউনিতে ভর্তি হওয়ার আগে কম্পিউটার কোর্স করা। নিজের কম্পিউটারও কেনা হল। সি/সি++ ক্লাসে প্রশিক্ষক ছিল, সদ্য গ্রাজুয়েট করা এক তরুন টিচার। আমার আগ্রহটা যেভাবেই হোক উনি বুঝতে পেরেছিলেন। নিজে নিজে কি ধরনের প্রজেক্ট করতে পারি সে ব্যাপারে প্রায়ই আইডিয়া দিতেন। ম্যাথ ইকুয়েশন সল্ভার থেকে শুরু করে টেক্সট গ্রাফিক্স মুডে গেম কোন কিছুই বাদ দিইনি। আজ ফিরে তাকালে ছোট কিন্তু সুনির্দিশ্ট সেই লক্ষ্য গুলোকেই মনে হয় সত্যিকারের স্টেপিং স্টোন!


https://i.imgflip.com/1hethc.gif

Re: আমি, কম্পিউটার আর প্রোগ্রামিং

বাহ, পড়তে বেশ লাগলো। আসলে ভালোবাসা ছাড়া কোনো কিছুতে সাফল্য পাওয়া যায় না।

কিছু বাধা অ-পেরোনোই থাক
তৃষ্ণা হয়ে থাক কান্না-গভীর ঘুমে মাখা।

উদাসীন'এর ওয়েবসাইট

লেখাটি CC by-nc 3.0 এর অধীনে প্রকাশিত

Re: আমি, কম্পিউটার আর প্রোগ্রামিং

বাসায় টাইপিং প্রাকটিস করার জন্য পাঠ্য বইয়ের বিজয় কীবোর্ড ল্যাআউট এর পাতাটা বড় করে ফটো কপি করে তা টেবিলে আঠাদিয়ে লাগিয়ে তার উপর চলত টাইপিং প্র্যাকটিস! একসময় (আবারো গ্রান্ড প্রশিক্ষকের কল্যানে) একটা নস্ট কীবোর্ডের কিনে ফেললাম! টাইপিং ওয়ার্ড-পার-মিনিটে  হাফসেন্চুরী করাটাকে আর কে ঠেকায়!

যাক পৃথিবীতে আরেকজন পাবলিক পাওয়া গেল, যে এই টেকনিকে টাইপ শিখেছে। ৯৫ তে আমারো বাসায় কম্পিউটার ছিলনা। এলাকার এক বড়ভাই এর কিবোর্ড দেখে ক্যালেন্ডারের পেছনের পাতায় ইংরেজী কিবোর্ডের লেআউট এঁকে নিয়ে চলল ধুমায় প্র্যাকটিস। ৯৬ তে কম্পিউটার কেনার পর দেখা গেল আমার টাইপিং স্পিড 40WPM yahoo

Re: আমি, কম্পিউটার আর প্রোগ্রামিং

সুন্দর লিখেছেন  thumbs_up

লেখাটি LGPL এর অধীনে প্রকাশিত

Re: আমি, কম্পিউটার আর প্রোগ্রামিং

আপনি দেখি সিন্দবাদের প্রোগ্রামার সংস্করণ। ভালো লাগল স্মৃতি রোমন্থন।

hard to hate but tough to love

Re: আমি, কম্পিউটার আর প্রোগ্রামিং

শুভ১৭১ লিখেছেন:

যাক পৃথিবীতে আরেকজন পাবলিক পাওয়া গেল, যে এই টেকনিকে টাইপ শিখেছে

কম্পিউটার টেক্স মউকুফের আগে... অনেকেই হয়তো এরকম করেছেন!  lol

Gypsy Saleh লিখেছেন:

আপনি দেখি সিন্দবাদের প্রোগ্রামার সংস্করণ। ভালো লাগল স্মৃতি রোমন্থন।


ধন্যবাদ।

নিজের বটগাছটাকে ত্রিপলদিয়ে ঢেকে রাখতেই বেশী সাচ্ছন্দ্য বোধ করি। ৯বছর ফোরামে, বটগাছে পয়লা টপিক! প্রাসংঙ্গিক কিছু নিয়ে ভাবতে গেলে ওয়েষ্টওয়ার্ল্ডের ডিফেক্টিভ রোবটের মত সংক্রিয়ভাবে স্মৃতি রোমন্থন হয়ে যায়। আপনার প্রোগামিং শেখার পোস্টে রিপ্লাই করতে গিয়ে এসব হাবিজাবি মনে পড়ল। দুলাইন লিখে অবশ্য ভালই লাগছে, স্মৃতিতে থাকলে কাহিনী ধীরে ধীরে মিউটেড হয়!

Re: আমি, কম্পিউটার আর প্রোগ্রামিং

দারুণ লিখেছেন ভ্রাতা। সি প্রোগ্রামিং তো কোন রকমে করেছি। তবে জাভা তো একে বারে জীবন ছাড়খাড় করে দিয়েছিল আমার   crying crying crying

সব কিছু ত্যাগ করে একদিকে অগ্রসর হচ্ছি

লেখাটি CC by-nd 3.0 এর অধীনে প্রকাশিত