টপিকঃ বাংলাদেশে সূর্যবাদ – পাঠ এক

বাংলাদেশে সূর্যবাদ – পাঠ এক
লৌকিক ধর্ম তথা লোককৃতির অন্যতম প্রধান অবদান দেবতা। এই দেবতার সৃষ্টি সাধিত হয়েছে দ্বিবিধ বুনিয়াদে, দ্বিবিধ পন্থায় ।
আদি কৃষিয়ুগের সেই পর্যায়, যখন মানুষ তার খাদ্য উৎপাদন-প্রক্রিয়ার ওপর প্রাকৃতিক কিছু বস্তু বা ঘটনার প্রভাব লক্ষ্য করে। অবশ্যি, কার্যকারণের কোনো সম্পর্কগত ব্যাখ্যা না জেনে । দ্বিতীয় পন্থায় দেবদেবীর জন্ম হয় মানুষের হাতে বাস্তব ঘটনা বা ইতিহাসের অতিরঞ্জনের মাধ্যমে পুরাণ (mythology) সৃষ্টির ফলে, সংশ্লিষ্ট ঘটনা বা ইতিহাসের নায়কও যাতে ফোলানো-ফাপানো ।
**সিসিলির দার্শনিক ইউহিমেরাসের (Euhemerus—খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতক) ভাষায়, ‘magnified man'. এভাবে দেবদেবীর সৃষ্টি বস্তুত বীরপুজোর এক বিশেষ ধরন।
এখানে বিবেচ্য বিষয় আদি কৃষিয়ুগের খাদ্য উৎপাদকের হাতে দেবতার সৃষ্টি। মানুষ যখন তার প্রাণধারণের জন্যে খাদ্যের উৎপাদন নয়, কেবল আহরণের ওপর নির্ভর করেছে, তখনই তার ধারণা ছিলো, তার পরিবেশের সকল কিছুরই আত্মা আছে, যেমন গাছগাছালির, পাহাড়-পর্বতের, তেমনি পশুপাখির। এরপর কৃষিকর্মে ব্ৰতী মানুষ দেখে, তার এ-কর্মের সাফল্য-বিফলতা বিশেষভাবে নির্ভরশীল আত্মাধারী কয়েকটি বস্তুর ওপর। তাদের একটি হল সূর্য। যার তাপ ফসল উৎপাদনে সহায়ক – এমনকি, অপরিহার্য। সেকালের মানুষ আরো ধরে নিয়েছে, আত্মা আসলে বিশেষ এক শক্তির দান, যার নাম দেবতা এবং সেই দেবতা কোনো-না-কোনো আকারের দেহ ধারণ করে বিরাজমান থাকেন। সাকারে বা নিরাকারে পুজোর মাধ্যমে তার তুষ্টিবিধান তাই কৃষিকর্মে সাফল্যলাভের জন্যে জরুরি। এবং সাকারের পুজোর মূলে দেবতার যে কল্পিত রূপ থাকে, তারই বাস্তব অনুবাদ তার মূর্তি বা প্রতিমা ।
সে যা-ই হোক, কৃষিজীবী মানুষের কাছে অতি প্রভাবশালী সূর্য প্রথমে এমনি করেই পরম পূজ্য সূর্যদেবরূপে প্রতিষ্ঠা পান, তার উদ্দেশে নিবেদিত হতে থাকে ভক্তের স্তুতি ।
>>বিভিন্ন স্থানে সূর্যদেবতার আবির্ভাবঃ
বলা নিম্প্রয়োজন, এটি যদিও কৃষিজীবী মানবসমাজের একটি বিশেষ ধারণা তথা পরিস্থিতির ফল, বিশেষ কোনো স্থানের বা কালের কৃতি নয়—বিশেষ কোনো মানবগোষ্ঠী বা গোত্রেরও। বরং স্বীকার করা বাঞ্ছনীয়, বাস্তবে অনুকূল পরিস্থিতিতে এমন ঘটনা, এমনিভাবে সূর্যের দেবতারূপে প্রতিষ্ঠালাভ বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন কালে এবং বিভিন্ন গোত্রে বা গোষ্ঠীতে ঘটা সর্বতোভাবেই সম্ভব এবং ঘটেছেও তেমনিভাবেই।
*প্রমাণঃ আজও এমন সব সম্প্রদায়, জনগোষ্ঠী বা উপজাতির মধ্যে সূর্যপুজোর প্রচলন দেখা যায়, যেগুলির ভেতর কোনো কালেই ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য বা সামাজিক ঐক্যের বন্ধন ছিলো বলে ধরে নেয়া সম্ভব নয়। এ ছাড়া, সূর্যদেব এক-এক দেশে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে একই অঞ্চলে এক-এক কালে পূজিত হয়েছেন
--এক-এক নামে, এক-এক পদ্ধতিতে।
---কোনো কোনো দেশে সূর্যদেবতার সংখ্যা একাধিক।
মানবসমাজে সূর্যের প্রভাববিস্তারের কারণের প্রতি কোনো কোনো পণ্ডিতের এক পরোক্ষ, ব্যতিক্ৰমি দুর্বলতা লক্ষণীয়। এতে সূর্য ঠিক সরাসরি দেবতারূপে প্রতিষ্ঠিত নন। কিন্তু কৃষিকৰ্ম আর জীবন-মৃত্যুর প্রবল নিয়ন্ত্রকরূপে স্বীকৃত, যার প্রমাণ মেলে প্রাচীনকালের ঋতুভিত্তিক—বিশেষত, ক্রান্তিকালীন উৎসবগুলিতে । এসব উৎসব অনুষ্ঠিত হত ধমীয় অনুষ্ঠানের আকারে, সাধারণত শীতের শেষে ফসল বোনাবুনির আয়োজনকালে এবং শরতে অথবা শীতের শুরুতে ফসল তোলার সময় ৷ নভেম্বরে পালিত এমনি এক অনুষ্ঠান সম্পর্কিত ছিলো মৃতজনের সাথে। এর বর্ণনা দিতে গিয়ে Oxford Junior Encyclopaedia- তে বলা হয়েছে--- When the days were shortening as autumn passed into winter, and men's minds were turned towards death and decay, the departed were thought to return to their old homes and haunts and assembled round the fireside.
Bonfires were lighted to renew the energy of the sun, lest it should burn itself out and leave the world without its light and warmth." * Oxford junior Encyclopaedia, vol. 1, (1960), pp. 175-6
এ-তত্ত্ব মূলত জীবনের অনিত্যতা আর পুনর্জনাবাদের। কিন্তু এখানে আলো এবং তাপের উৎস হিসেবে সূর্যের যে উপস্থাপন, আদি কৃষিজীবী সমাজেও তার অনুরূপ কৃতি দেখা গেছে। সূর্যের প্রভাবে নিয়ন্ত্রিত হত খাদ্য আহরণকারী মানুষের জীবনও। কিন্তু এই প্রভাব তখন সরাসরি অভিজ্ঞতায় শনাক্তকৃত নয়— শনাক্তকরণের অভিজ্ঞতার সূচনা কৃষিজীবী সমাজে। সুতরাং একথা বললে অন্যায় হবে না যে, জীবন-মৃত্যুর সাথে গ্রথিত সূর্যভাবনাও কার্যত আদি কৃষিজীবী সমাজেরই দান।
অবশ্যি, জীবন-জীবিকার সম্পর্ক দিয়ে দেবতারূপে সূর্যের আবির্ভাব ব্যাখ্যা করা সবসময় সম্ভব নয়। বিশেষ করে, যখন দেখি, কৃষকের ফসল উৎপাদনে বা মানুষের জীবনরক্ষায় কোনো কোনো সূর্যদেবতা আগ্রহী নন।
**এমনই এক সূর্যদেবতা গ্রিস আর রোমের অ্যাপোলো, যিনি পুজো পেতেন প্রধানত কাব্য, সঙ্গীত, চিকিৎসাশাস্ত্র, ধনুর্বিদ্যা আর কূটনীতির দেবতা হিসেবে। কৃষির দেবতা হিসেবে তখন ওসব দেশে পূজিত ছিলেন শনি। প্রসঙ্গত আরো উল্লেখ্য, অ্যাপোলো গ্রিক পুরাণের একমাত্র সূর্যদেবতা নন। সেখানে তার এক প্রবলপ্রতাপ দোসর বা প্রতিদ্বন্দী হেলিয়োস এবং অ্যাপোলো হেলিয়োসের রথের সারাথ! সূর্যপুজোর ইংরেজি প্রতিশব্দটিও (heliolatry) ওই হেলিয়োসেরই নাম থেকে।
>>সূর্যদেবতার প্রথম দেশঃ
দেবতারূপে সূর্যের প্রতিষ্ঠালাভের প্রসঙ্গে আরো দুই-একটি কথা বিশেষভাবে স্মরণীয়। সূর্যদেবতার জন্ম এবং প্রতিষ্ঠালাভ প্রথমে আদি কৃষিজীবী সমাজে। কৃষিজীবী সমাজ প্রথম দেখা যায় আজ থেকে প্রায় দশ হাজার বছর আগে। এর অর্থ, সূর্যদেবতার—বস্তুত, কোনো দেবতারই—বয়েস নয় হাজার বছরের বেশি নয়। অন্য দিকে, নৃবিজ্ঞানীদের মতে, কৃষির সূচনা এবং প্রথম বিকাশ ঘটে প্রাচীন মিশরে। এই মতের অনুসৃতিতে বলতে হয়, দেবতারূপে সূর্যের আবির্ভাব এবং প্রথম প্রতিষ্ঠালাভও ওই দেশে। কিন্তু তাই বলে এমন কথা নিশ্চিতরূপে ধরে নেয়া কোনোক্রমেই সম্ভব নয় যে, প্রাচীন মিশর থেকেই সূর্যপুজো পৃথিবীর অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে পড়ে। কৃষিকৰ্ম সম্ভব এক বিশেষ অনুকূল পরিবেশে । এর সুযোগ এক-এক এলাকার মানুষ নেয় এক-এক সময়ে, প্রায় সর্বত্রই অন্যনিরপেক্ষভাবে । ঠিক এমনি কথাই প্রযোজ্য সূর্যপুজোর প্রসঙ্গেও। সমাজবিকাশের কোনো কোনো স্তরে গোত্র বা কওমের ধর্মবিশ্বাস অন্য গোত্র বা কওমে সংক্রমিত হয়েছে অবশ্যই। কিন্তু সমগ্র মানবসমাজের ধর্মবিশ্বাসের ইতিহাসে তা বস্তুত ব্যতিক্রম।
আসলে তো পৃথিবীর অধিকাংশ এলাকা তথা মানবগোষ্ঠী আপন আপন সূর্যদেবতা সৃষ্টি করেছে স্বাধীনভাবে, আপন আপন অভিজ্ঞতাজাত ধারণার বুনিয়াদে, যার এক প্রমাণ বিভিন্ন দেশ তথা মানবগোষ্ঠীতে সৃষ্ট সূর্যদেবতার গুরুত্ব, রূপ, বাহন ইত্যাদির বিভিন্নতা। মিশরে সূর্য একদা ছিলেন রাষ্ট্রের প্রধান দেবতা, অন্যান্য দেশে অন্যতম প্রধান বা গৌণ দেবতা। নীলনদের অববাহিকায় তিনি হন দেহাংশে মানুষ, কিন্তু মাথায় বাজপাখি। গ্রিস-রোমের অ্যাপোলো তিলোত্তম পুরুষ। নিম্ন মিশরের হেলিয়োপলিসের হেলিয়োস আকাশ পরিক্রমা করতেন চার ঘোড়ার রথে, ভারতের সূর্যদেব সাত ঘোড়ার রথ নিয়ে, মিশরের রা সোনার নৌকোয় ।
>>মানুষ ও সূর্যদেবতাঃ
এখানে একটি সতর্কবাণী । দেবতাদের জন্ম প্রাচীন কৃষিজীবী সমাজের আত্মা-সম্পর্কিত কল্পনায় । সমাজবিজ্ঞানীদের কাছে একথার সত্যতা অবশ্যই তর্কাতীত । কিন্তু তারা আবার দেবতার জন্মের অন্যতর কারণও নির্দেশ করে দেন— যার ইঙ্গিত ইউহিমেরাসের মতবাদের উল্লেখের মাধ্যমে। আমাদের তাই মানতে হয়, দেবতাসৃষ্টির সকল কৃতিত্ব কেবল প্রাচীন কৃষিজীবী সমাজের নয়।
--প্রাচীন আজটেক সমাজে সূর্য ফসলের তথা কৃষিকর্মের অন্যতম দেবতারূপে পূজিত হয়েছেন। এক্ষেত্রে সূর্যদেবতার আবির্ভাব আদি কৃষিজীবী আজটেকদের কল্পনায় সংঘটিত বলে ধরে নিতে কোনো বাধা নেই । কিন্তু কোনো সূর্যদেব যখন মানবসূলভ গুণাবলিতে অন্বিত হন— কিংবা মানুষের মতো সংসারধর্ম পালনে উৎসাহী অথবা বীরসুলভ কোনো কীর্তির জন্যে স্মরণীয় বা প্রতিষ্ঠিত— তখন তার ক্ষেত্রে ইউহিমেরাসের তত্ত্ব প্রয়োগ ছাড়া গত্যন্তর থাকে না।
--গ্রিসের সূর্যদেব অ্যাপোলো ছিলেন বিবিধ সদগুণ বা নিষ্কলুষতার অধিকারী । অন্য দিকে, তার প্রতিষ্ঠা পাইথন নামক এক ড্রাগনহত্যার মাধ্যমে। গ্রিসের আর-এক সূর্যদেব হাইপারিয়ন, ভারতের সূর্য প্রমুখের সংসারধর্ম পালনের কাহিনী সর্বজনজ্ঞাত। মিশরের সূর্যদেবতা আমনকে ঠিক সংসার বলে জানিনে । কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, তিনিও নারীভোগে উৎসাহী ছিলেন।
--কোনো সূর্যদেবের জন্ম বা লালনের জন্যে উপরি-উক্ত দুই কারণই একই সঙ্গে দায়ী কি না, তা অবশ্যি নৃবিজ্ঞানীদের গবেষণার বিষয়। প্রথম কারণে জাত সূর্যদেবের সাথে দ্বিতীয় কারণে জাত ফোলানো-ফাপানো মানুষের সংমিশ্রণ ঘটা অসম্ভব নয় ।
--একদা বহু রূপে এবং বহু ভূমে পূজিত, প্রবলপ্রতাপ সূর্যদেবতা এখন, স্বাভাবিক আর অনিবাৰ্য কারণেই, পৃথিবীর অধিকাংশ মানবগোষ্ঠীতেই বর্জিত বা বিস্তৃত— বড়ো জোর স্মৃতিবাসী, আরো অসংখ্য দেবতার মতো। প্রকৃতির বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে মানুষের যে অস্পষ্ট, অসম্পূর্ণ বা অবাস্তব ধারণা তার জনের কারণ, তার ক্রমবিকশিত বিজ্ঞানমনস্কতায় তার মৃত্যু বা প্রতিষ্ঠালোপ। একদা যিনি কোনো কোনো দেশে রাষ্ট্রীয় ধর্মের কেন্দ্র অবধি জুড়ে বসেছেন, এখন তিনি জাগ্রত আর পূজিত কেবল কয়েকটি অনুন্নত খণ্ড জাতির মনে আর গোড়া সম্প্রদায়ের মন্দিরে। এবং তাদের মধ্যেও তার প্রভাব ক্রমক্ষীয়মাণ। আর কতো দিন তিনি টিকে থাকতে পারবেন, বলা মুশকিল। তবে, তার জন্যে আশার কথা, তিনি ইতিমধ্যেই, পৃথিবীর অনেক দেশেই, পুরাণ-কাহিনীর অন্যতম প্রধান পুরুষে—এবং তাই কৌতহলী নৃবিজ্ঞানীর অনুসন্ধিৎসার লক্ষ্যে—পরিণত । দ্বিতীয়ত, তিনি এখন কিছু নতুন শক্তির প্রতীকও।



>>বাংলাদেশে সূর্যপুজো
নেপাল ভারতের প্রতিবেশী। আর, বাংলাদেশ মাত্র চার দশকের কিছু আগেও ছিলো ভারতের অন্তর্গত—এবং সমস্তত না হলেও অনেকাংশেই হিন্দু ধর্মধারণায় প্রভাবিত, অনেককাল আগে থেকেই। এদেশে সূর্যবাদের প্রসার তথা সূর্যপুজোর প্রচলন থাকা তাই আদৌ অস্বাভাবিক নয়। বস্তুত, ইতিহাসের সাক্ষ্য, এখানে— যেমন ভারতে— এককালে মর্যাদায় আর জনপ্রিয়তায় সূর্যদেবের স্থান ছিলো বিষ্ণুর ঠিক পরেই। এবং তখন তিনি পূজিত হয়েছেন রাজপুর থেকে শুরু করে সাধারণ ভক্তের কুটির অবধি। কোথাও সাকারে শাস্ত্রীয় বিধিমতে, কোথাও নিরাকাররূপে লৌকিক প্রথায় । বলছি, বাংলাদেশে সূর্যপুজোর প্রচলন বহুকালাবধি। কিন্তু ঠিক কবে থেকে, আমাদের তা জানা নেই। ঢাকার জাদুঘরে সূর্যদেবের চারটি মূর্তি সংগৃহীত হয়েছে— একটি ফরিদপুর এবং তিনটি রামপাল আর মুন্সিগঞ্জ থেকে। এই মূতিগুলি দশম এবং একাদশ শতকের। অনুমান করতে তাই বাধা নেই, অন্তত দশম শতকের কিছু আগেও সূর্যদেব এদেশে পুজো পেয়েছেন। সম্ভবত মুসলিম বিজয়ের পর—এবং বৈষ্ণব ধর্মের প্রসারের ফলে—সূর্যদেবের সাকারে পুজো উঠে যেতে থাকে।

বাংলাদেশের বিভিন্ন সূর্যব্রত একসময় বাংলাদেশের হিন্দু নারীসমাজে মাঘমণ্ডল নামে একটি ব্ৰত অনুষ্ঠিত হত। এটি ছিলো সাপ্তাহিক—এবং চার বা পাচ সপ্তাহের অনুষ্ঠান । এতে মেয়েরা মাঘ মাসের রবিবার সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত অবধি দাড়িয়ে থেকে সূর্যের পুজো করেছেন। আনুষ্ঠনিকতায় এ-ব্ৰত শ্রমসাপেক্ষ এবং কষ্টকর। আধুনিক জ্ঞানবিজ্ঞানের প্রভাবও এর জনপ্রিয়তা ক্রমশ সীমিত করে ফেলছিলো। সবশেষে, ভারত বিভাগের ফলে ব্যাপক হারে হিন্দুদের দেশত্যাগ বাংলাদেশে মাঘমণ্ডল ব্ৰত অনুষ্ঠানের ওপর বস্তুত শেষ যবনিকা টেনে দেয় । তবে, মাঘমণ্ডল ব্রতের প্রচলন এখন যেমনই হোক, সূর্যবাদী অন্য কিছু ব্ৰত বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে আজও প্রচলিত রয়েছে। এসব ব্রতের কোনো ‘কথা’ আমরা পাইনি। কিন্তু ব্ৰত উদযাপনের যে-বিবরণ মেলে, তার থেকে দেখি, এগুলির লক্ষ্য বিচিত্র। মূলে সূর্যপুজো বা সূর্যব্রতের লক্ষ্য যা-ই থাক-না কেন, উল্লিখিত ব্ৰতগুলির কোনোটির লক্ষ্য অগ্নিভয় নিবারণ, কোনোটির-বা সংসারসুখ লাভ । একটি আবার পালিত হয় সন্তানলাভের মানসে । ব্ৰতগুলির জন্ম যে সহজদাহ্য ঘরবাড়িতে বসবাসকারী এবং কৃষিজীবী মধ্যবিত্ত সমাজে, তা তাদের লক্ষ্য এবং উপকরণাদির তালিকা থেকেই স্পষ্ট। এখানে আরো উল্লেখ্য, ব্ৰতগুলির কোনোটিতেই পুরোহিতের প্রয়োজন হয় না। তার অর্থ, এগুলি লৌকিক ব্ৰত । ব্যাপক সংগ্রহের মাধ্যমে হয়তো অন্যতম লক্ষ্যে পালিত সূর্যব্রতের সন্ধানও পাওয়া যাবে |
বাংলা একাডেমীর প্রখ্যাত লোককৃতিবিশারদ মোহাম্মদ সাইদুর উপরি-উক্ত বিচিত্র ধরনের কয়েকটি ব্রতের বিবরণ সংগ্রহ করেছেন। ব্ৰতগুলি কিশোরগঞ্জ জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচলিত। এবং সবকটিই স্থানীয় ভাষায় সূর্যাই বর্ত’ (অর্থাৎ সূর্যব্ৰত) নামে পরিচিত। ক্রমবিলুপ্তিমান ব্রতের দেশ বাংলাদেশের সূর্যবদের ইতিহাসে ব্ৰতগুলির গুরুত্ব অনেক । এখানে তাদের একটু বিস্তারিত পরিচয় দিলে তাই অন্যায় হবে না।
>>অগ্নি ভয় নিবারণের ব্রতঃ
আলোচ্য ব্ৰতগুলির প্রথমটির বিবরণ সংগৃহীত হয় বাজিতপুর উপজেলার ইলচিয়া গ্রাম থেকে। ব্রতটি ঐ অঞ্চলে প্রচলিত রয়েছে বহুকালাবধি । এর উদযাপনকাল পৌষ সংক্রান্তির দিবাভাগ।
--ব্ৰতিনী সাধারণত পরিবারে কত্রীস্থানীয়া মহিলা এবং তার লক্ষ্য অগ্নিভয় নিবৃত্তি । অনুষ্ঠানের বাস্তব উপকরণ ফুল, পঞ্চপত্র, ঘট, এক কাদি কলা, আতপ চাল, মিষ্টান্ন এবং পান। আনুষঙ্গিক করণীয় মূল ব্ৰতিনীর আসন্ধ্যা উপবাস । ব্রতের দিন অনুষ্ঠান শুরু হয় ঠিক দুপুরবেলা, আঙিনায় কয়েকজন মহিলার আলপনা অঙ্কনের মাধ্যমে। এই আলপনায় প্রথম এবং প্রধান অংশ একটি মণ্ডল, যার ভেতরে থাকে একটি প্রস্ফুটিত পদ্ম আর সূর্যসহ তারা, লাঙল, মই, আসন, গাছ, লতাপাতা ইত্যাদির চিত্র। অনুষ্ঠানের পরবতী পর্যায় বৈকালিক এবং তার প্রধান অঙ্গ আলপনার দিকে করজোড়ে বসে মূল ব্ৰতিনী কর্তৃক প্রার্থনার আকারে মনস্কামনা নিবেদন। সূর্যদেবতার উদ্দেশে নিবেদিত এই প্রার্থনা চলে মনে মনে— উচ্চারিত সঙ্গত থাকে সমবেত মহিলাদের উলুধ্বনির । তারপর ছেলেমেয়েদের ছড়া আবৃত্তি। তাও সমবেত কণ্ঠের। তবে, ছেলে আর মেয়েদের পৃথক পৃথক ভাবে।
*এতে ছেলেদের অংশ–
সূর্য ঠাকুর অরণে
বর দেব বরণে,
*মেয়েদের অংশ–
‘লেপি পুছি ঘরে যাই
আগুন পানির ভয় নাই ।
এরপর পরিবার তথা গ্রামের অন্যান্য মহিলার প্রার্থনা। তখন অনুষ্ঠানের রূপ সামাজিক। তবে, মূল ব্ৰতিনী ছাড়া আর কারো জন্যে উপবাস বাধ্যতামূলক নয়। অনুষ্ঠান শেষ হয় সন্ধ্যাকালে, উপস্থিত সকলের মধ্যে ফলমূল, মিষ্টান্ন বিতরণের মাধ্যমে, বাস্তব উপকরণের কিছু অংশ পৃথক করে রেখে। সেগুলো মূল ব্ৰতিনী কুলোয় সাজিয়ে নদীর জলে কিংবা পুকুরে ভাসিয়ে দেন। তারপর তার স্নান এবং উপবাসভঙ্গ । এই ব্রত পালনকারিনীদের বিশ্বাস, এতে কেবল আগুন নয়, রোগব্যাধি থেকেও রক্ষা পাওয়া যায় । ব্রতটি এককালে গ্রামব্যাপী উৎসবরূপে উদযাপিত হত। কিন্তু বর্তমানে প্রায় অপ্রচলিত। এর কারণ সহজেই অনুমেয় ।
>>সন্তানকামনার ব্রত
দ্বিতীয় ব্রতটির বিবরণ সংগ্রহের স্থান শোলাকিয়া গ্রাম। এর লক্ষ্য সন্তানকামনা। অনুষ্ঠান করা চলে যে-কোনো সোমবার। বাস্তব উপকরণ আতপ চাল, গুলগুলি’, সিঁদুর, জবা (অভাবে অন্য যে-কোনো) ফুল, পিঠে, পায়েস, নতুন কুলো, ধান কোটার ‘গাইল’, চালের গুড়ো, পঞ্চপত্রসহ ঘট, পঞ্চপ্রদীপ ইত্যাদি। অনুষ্ঠানের সূচনায় ভোরে ব্ৰতিনীর স্নান এবং উপবাস শুরু। দুপুরে আলপনা আঁকা এই আলপনার গোলাকার এক মণ্ডলে থাকে মানুষের মুখাকৃতিবিশিষ্ট এবং রুশিযুক্ত সূর্যের চিত্র। তার পাশে উপুড় করে রাখা হয় গাইল । ব্ৰতিনী প্রার্থনা জানায় উপকরণরূপে ব্যবহৃত খাদ্যের কিছু অংশ কুলোয় তুলে মাথায় নিয়ে, গাইলটির ওপর বসে সূর্যের চিত্রের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে থেকে। ব্রতটির আলপনা দেওয়া আর পিঠে তৈরির চাল একটি বিশেষ নিয়মে নির্দিষ্ট পাত্রে রাখা হয় ।

>>ঘর-বর ও সুখ-সমৃদ্ধি কামনার ব্রত
তৃতীয় ব্রতটির বিবরণ সংগ্রহের স্থান বত্ৰিশ নামের একটি গ্রাম। এর লক্ষ্য ঘর-বর আর সুখ-সমৃদ্ধি কামনা। বাস্তব উপকরণ অনেকটা প্রথমোক্ত ব্রতটির উপকরণের মতো। বর্তমানে স্বল্পপ্রচলিত, এ-ব্রত পালন করে কুমারী মেয়েরা। পালনকাল পরপর পাচ বছর, কিন্তু কেবল মাঘ মাসের রবিবারগুলিতে। বলা নিম্প্রয়োজন, এর সূচনা হয় কোনো মাঘ মাসের প্রথম রবিবারে। সেদিন ব্ৰতকারিণী মেয়েরা সূর্যোদয়ের আগেই জবাফুল সংগ্রহ করে। তারপর স্নান এবং কোনো বয়স্কা মহিলার সাহায্যে বাড়ির আঙিনায় বা ঘাটের পাশে আলপনা আঁকা। আলপনার প্রধান অঙ্গ সূর্যর প্রতিকৃতি, যার চারপাশে থাকে গাছগাছালি, পুকুর, আসন, নৌকো, পালকি, রথ, চৌদোল, জয়-বিজয় মন্দির, আয়না-চিরুনি, নানারকম তৈজসপত্র, পাশার ঘর ইত্যাদির চিত্র। অনুষ্ঠানকালে ব্ৰতিনী মেয়েরা একে একে বা সমবেতভাবে ভিজে কাপড়ে ঘুরে ঘুরে এক-একটি চিত্রের ওপর জবাফুল দেয়। আর, সেইসঙ্গে চলে সূর্যদেবের কাছে বরপ্রার্থনা। পঞ্চম বৎসরে শেষ দিনের অনুষ্ঠানটি বিশিষ্ট। সেদিন মিষ্টান্ন বিতরণ এবং একজন ব্রাহ্মণকে নববস্ত্র দান করা হয় ।
*ব্রতটির একটি ছড়া—
লাল ঠাকুর অরণে বর দেয় বরণে
যত ফুল তত বর,
ধনজনে ভরে বাপ-ভাইয়ের ঘর।
>>উপজাতীয় সূর্যপুজো
বাংলাদেশের হিন্দু সমাজে এখন আর সূর্যদেবের পুজোর প্রচলন নেই বললেই চলে— যদিও জাগ্রত এবং পূজ্য দেবতা তিনি এদেশের অনেক হিন্দুর কাছে আজও। এবং তিনি একালেও পূজিত আমাদের কোনো কোনো উপজাতি মহলে। সাওতাল দেবলোকে তিনিই প্রধান দেবতা, চান্দো নামে। তার নৈমিত্তিক পুজো যেমন আছে, তেমনি আছে নিয়মিত পুজো, চার-পাচ বছর পরপর। নৈমিত্তিক পুজোর উপলক্ষ মানস বা মানত । তখন তার পুজো দেওয়া হয় কোনো কিছু মানস করে। এ-পুজোয় সূর্যদেব চান্দো নাম পান সিম বোঙা, ভোগ হিসেবে পান মুরগির ছানা। চার-পাচ বছর পরপর তার যে পুজো হয়, তাতেও তার পরিচয় থাকে সিম বোঙা বলে। তখনকার পুজোর সবচেয়ে বড়ো দিক উপায়ন ভোজ (Sacrificial meal) । আমাদের আর-এক উপজাতি উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের গারো। তাদের দেবলোকের এক প্রধান দেবতা সালজং। তিনি সূর্যদেবতা।
>>একটি অর্বাচীন সূর্যবাদ
বাংলাদেশে আরো একটি ক্ষীণানুসৃত সূর্যবাদের সন্ধান পাওয়া গেছে। এটি প্রবর্তিত হয় আজ থেকে মাত্র ষাট-সত্তর বছর আগে। এত তরুণ আর কোনো সূর্যবাদ তথা লৌকিক বা অভিজাত ধর্ম পৃথিবীর আর কোথাও আছে বলে আমাদের জানা নেই। যত দূর জানা গেছে, এই সূর্যবাদ অন্য কোনো দেশে বা কালে প্রচলিত কিংবা প্রবর্তিত কোনো সূর্যবাদের অনুকরণ নয়। বরং সম্পূর্ণতই অন্যনিরপেক্ষ, যদিও অন্য দুই-একটি সূর্যবাদের মূল তত্ত্বের সাথে এর মিল আছে।
বাংলাদেশের এই অর্বাচীন সূর্যবাদে দেবতা হিসেবে সূর্য এক এবং অদ্বিতীয়—যেমন ছিলেন মিশরের আটেন। তবে, আটেনকেন্দ্রিক সূর্যবাদে আটেনের মূর্তি, মন্দির এবং পুরোহিত দেখা গেছে, বাংলাদেশে উদ্ভূত সূর্যবাদটিতে সেসবের কিছুই নেই। এর মূলে আছে, সহজেই অনুমেয়, আখেনাটেনের মিশর এবং বর্তমান শতাব্দীর বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার পার্থক্য ।
অবশ্যি, মিশরের আদি সূর্যবাদেও সূর্যই ছিলেন একমাত্র দেবতা এবং স্বয়ম্ভ । মিশরীয় পুরাণ বলে, সৃষ্টির আদিতে জনপ্রাণী বা গাছপালা বলতে কিছুই ছিলো না, ছিলো কেবল অন্তহীন এক সমুদ্র । সেই সমুদ্রে নিঃসঙ্গ ভেসে বেড়াতো একটি ফুল । তারই থেকে একদা আবির্ভূত হন সূর্যদেব রা বা রি। এবং তার সন্তান-সন্ততিই মিশরের আদি দেবদেবী, তিনিই বিশ্বজগতের সকল কিছুর স্রষ্টা। আর, সেদেশের রাজবংশ তার থেকেই উদ্ভূত। যদিও এখন অনেকাংশে বিকৃত, জাপানের আদি ধর্ম শিন্তোও এমনি সূর্যবাদ।
হিসেব নিলে দেখা যাবে, পৃথিবীর সর্বত্রই এ-জাতীয় সূর্যবাদ প্রচলিত হয়েছে সংশ্লিষ্ট দেশের মানবসমাজের সবচেয়ে শক্তিশালী সম্প্রদায় তথা শাসককুল বা সামন্তদের মাধ্যমে, তাদের শ্রেণী:স্বার্থ রক্ষার প্রয়োজনে। কিন্তু আমি বাংলাদেশের যে অর্বাচীন সূর্যবাদের কথা বলছি, তার মূলে এমন কোনো স্বার্থচেতনা নেই। এই সূর্যবাদে সূর্য অনাদি অনন্ত দেবতা, বিশ্বজগতের সকল কিছুর স্রষ্টা এবং একেশ্বর, তার অনুসারীদের কাছে একমাত্র উপাস্য।
আর, মানবসৃষ্টির প্রয়োজনে তিনি চন্দ্রকে পত্নীরূপে গ্রহণ করেন। চন্দ্ৰ-সূৰ্য দম্পতি পৃথিবীর অনেক দেশের পুরাণেই আছে। যেমন, চীনে— তার পুরাণে সূর্যের অধিষ্ঠাতা দেবতা এবং চন্দ্রের অধিষ্ঠাত্রী দেবী পতিপত্নী । কিন্তু অনন্য দেবতারূপে সূর্যের অস্তিত্ব আটেনবাদ ভিন্ন অন্য কোনো সূর্যবাদ ছিলো বা আছ বলে আমাদের জানা নেই।
>>ঈমানউদ্দিন কৃারী
এখানে আলোচিত সূর্যবেদের প্রচলন এবং কার মাধ্যমে হয়, আমরা সঠিক জানিনে। কিন্তু এর বর্তমান গুরু এবং কিছু কাগজপত্র থেকে জানি, এ-সূৰ্যবাদের প্রথম গুরু ছিলেন কুমিল্লা সোনাপুরবাসী ঈমানউদ্দিন কারী। তবে, বিশ্বাস করবার কারণ আছে, তিনি নিজেই তার সূর্যবাদ তথা সৌরধর্মের প্রবর্তক। তার নামে মুদ্রিত এবং প্রচারিত একটি রচনায় দেখি, তিনি লিখেছেন–
... ২৪শা চৈত্র সর্ব শক্তিতে আকর্ষণ
মাথা আমার চিত করি সূর্যে দর্শন!
২০শে সাহাপুরে অন্ধকার যখন,
সর্বাপেক্ষা মহান সূর্যে দর্শন দেন?
মাটি থেকে উপরে করিলেন গমন,
গুরুর স্বরে বলেন সঙ্গে থাকি যেন!
সঙ্গে সঙ্গে সদায় চরণ তলে রাখেন,
দয়াল গুরু সূর্য বিনে নাই এখন
করুণার স্বরে সূর্যে আমাকে ডাকেন,
শ্ৰীযুক্ত ফানাপিল্লা মম নাম রাখেন।
তাই বাস্তব শিক্ষক ঈশ্বরি ঈমান,
বিশ্বাসির পারের মাজি স্বর্গ দর্শন!..
চাদ সূর্য জ্যোতি তিনি জিঃ ত্রিপুরা এখন,
চাদের কোলে সাং শ্ৰীঈমানের আমান! --- ঈমান ফকিরের জীবনী; পূঃ ৩-৪
* এ-ধরনের দাবি বা মতবাদ প্রচার একালে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়ার কথা নয়। ঈমান ফকির তাই আশ্রয় নিয়েছিলেন চাদপুরের এক জলটুঙ্গিতে। সম্ভবত সমাজ কর্তৃক তার সৌরধর্মের বিরোধিতা তথা সাম্প্রদায়িক বৈরিতা থেকে আত্মরক্ষার প্রয়োজনে । শিষ্যমহলে তিনি শ্রিযুক্ত ঈমান ফকির নামে পরিচিত। তিনি বাংলা ১৩৪৬ সালে মারা যান ।
তার জীবন সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য কিছু জানা যায় না বা তার অনুসারীদেরও কিছু জানা নেই। ঈমান ফকিরের জীবনী এবং শ্রীযুক্ত ঈমান ফকিরের ৬ পাস জীবনী’ নামে দুখানি মুদ্রিত পুস্তিকা পাওয়া যায়।
কিন্তু এগুলি কেবল নামেই জীবনী—আসলে ঈমান ফকিরের মতবাদের অগোছালো প্রচার এবং অন্যান্য ধর্মীয় মতবাদের এলোমেলো সমালোচনা।
প্রথম পুস্তিকাখানির শিরোনামের নীচে বন্ধনীর মধ্যে লিখিত আছে— ‘১৩৩৯ সন ২১শে ভাদ্র মঙ্গলবার’। অনুমান , এটি তার রচনাকাল । পুস্তিকাখানির সূচনাভাগের কিছু অংশ—
শ্ৰীঈমানের পিতা মাতা মানুষ যখন,
জীবিত ভূমির অসংখ্য মিষ্ট ফল খান?
জীবিত সৃষ্টিকর্তা প্রেমে দর্শন না চান,
আত্মসমপণ নামাজ রোজা না করেন?
শ্ৰীহোসেন গাজি, মতি হাপেজা খাতুন,
সাং চৌমুখা জিঃ কুমিল্লা কুসঙ্গি হন?
কুমেলা চাল দেক্তে ও মাতা সেবা জন্যে,
মক্কা গিয়ে ধাক্কা খাই মিথ্যা না পুজো?
এখানে যা আছে, তা ঈমান ফকিরের আত্মসমালোচনা । ::: ঈমান ফকিরের জীবনী, পৃঃ ১
>>ঈশ্বরদের ঈশ্বর বাছনী’ নামের একখানি পুস্তিকায় তার একটি সংক্ষিপ্ত পরিচিতি আছে—
Very good man must do as newly told by his vast God Sun. মুশাই মুসলমান শ্রীযুক্ত ঈমানউদ্দীন পয়গম্বর (ঈশ্বরিক পিয়ন) কিম্বা শ্রীচাঁদ সূর্যের বিশ্বাস পণ্ডিত—সাং চাদের ভিতর –ত্রিপুরা।
--এর রচনাকাল ১৩৪১ সালের আষাড় মাস। এবং শিরোদেশে লেখা রয়েছে ‘তেীরেত (দ্বিতীয়) ১০ অঃ ১৬-১৭ পদ’। অর্থাৎ এতে হজরত মুসার অগ্নিরূপী খোদাদর্শনের প্রতি ইঙ্গিত এবং তার থেকে সূর্যবাদ সমর্থনলাভের প্রয়াস আছে।
(পরে আমরা দেখতে পাবো, ঈমান ফকিরের অনুসারীদের মতে সূর্য যখন অদৃশ্য থাকে, তখন তার প্রতীক হিসেবে আগুনের উদ্দেশে মন্ত্ৰোচ্চারণ করা চলে ) রচনাটি ঈমানী সূর্যবাদের কিছু পরিচয় দেয়—
***ধর্ম অর্থ লোক সমাজ (বাজার) যে লোকে যাহাকে আল্লা (ঈশ্বর) চিনে মানে সে লোকে তাহার আল্লা (ঈশ্বর) কে কিনে, একমাত্র স্বজীবন মূল্য দিয়া। (আক্কলে আওলিয়া এবং ১ সর্ব শক্তিমান আকার ঈশ্বর (আল্লাহু) (চাদ সূর্য) আছেন, যাত্রা ৩-১৪ \৩ সূর্য হইতে রৌদ্র, রৌদ্র থেকে ফলগাছ, ফল থেকে জীব লোক । আকার পয়গম্বর (দেব) পির বর্তমানে সঙ্গে পার কল্যে মাজি। সতীর পতির সন্তানেগ পিতা পরিচিত আকার আছেন। ... যাহা দেখি, খাই বিশ্বাসি ভবিষ্যতে পাব তাই। ** ঈশ্বরদের ঈশ্বর বাছনী পৃঃ ১
--ক্রমশ-----

গোলাম মাওলা , ভাবুক, সাপাহার, নওগাঁ