টপিকঃ সিলেট ডায়েরি

আমি গত প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর ধরে সিলেটে থাকি। কিন্তু আমার জন্ম এবং বেড়ে ওঠা ঢাকা শহরে। অনেক জিনিস, অনেক ঘটনাতে ঢাকা এবং সিলেটের মধ্যে পার্থক্যগুলো চোখে পড়ে। কিছু পার্থক্য ভালো লাগে। কিছু খারাপ। দেরীতে হলেও এই ঘটনাগুলো বা চোখে পড়া পার্থক্যগুলো লিখে রাখার তাগিদ থেকে এই সিরিজ লেখা শুরু করলাম।

আমার ইউনিভার্সিটির সামনের রাস্তাটা ওয়ানওয়ে। চৌহাট্টা পয়েন্ট থেকে যানবাহন জিন্দাবাজারের দিকে যেতে দেয়া হয়না। যখন সিলেটে প্রথম আসি তখন চৌহাট্টা পয়েন্টের দিকের মুখে রাস্তাটার অর্ধেক ব্লক করা ছিলো। আর বর্তমানে বাকি খোলা অর্ধেক অংশেও একটা পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে সেটাকে আরও সংকীর্ন করা হয়েছে। এই ওয়ানওয়ে দিয়ে জিন্দাবাজারের দিকে আপনি তখনই যেতে পারবেন যখন আপনি সকাল দশটার আগে ও রাত দশটার পরে সেখানে যাবেন, বাইক বা মোটরবাইকওয়ালা হবেন অথবা মহিলা কলেজের ছাত্রী হবেন। আমি যেহেতু এই ক্যাটাগরিগুলোর কোনটাতেই পড়িনা, তাই সকাল দশটার পরে সেখানে রিক্সাওয়ালাকে থামিয়ে ভাড়া দিয়ে হাঁটা ধরা ছাড়া কোন উপায় থাকেনা। ভাগ্য ভালো থাকলে মাঝে মাঝে ওখানে কোন নবাবজাদার রিক্সা বা গাড়ি হাঁকিয়ে ঢুকে যাবার চেষ্টা এবং তাতে বাধা দিয়ে ট্রাফিক পুলিশদের সিংঘাম হয়ে ওঠার দৃশ্য দেখার সৌভাগ্য হয়।

কয়েকদিন আগে দুর্বিষহ গরমের এক দুপুরে আমরা দুজন (আমি আর রিক্সাওয়ালা) যাচ্ছিলাম আমার ইউনিভার্সিটির দিকে। চৌহাট্টা পয়েন্টের কাছে এসেই দেখলাম যে, আমাদের সামনের একটা রিক্সা সুন্দরমতন ওয়ানওয়ে দিয়ে পুলিশি বাধা ছাড়াই ভিতরে চলে গেলো। আরও দেখলাম যে, পুলিশ ভাই সে সময় পাশের দোকানে গিয়ে রাস্তার দিকে পিঠ দিয়ে পান খাচ্ছে। তো আমি আমার ড্রাইভারকে অভয় দিলাম,
-    ডাইবার, যাওগি। কিছু অইতো নায়।
আমার রিক্সা ড্রাইভারও দুঃসাহসী হয়ে ওয়ানওয়েতে রিক্সা ঢুকিয়ে দিলো। কিন্তু কোন এক অজানা কারণে রাস্তার দিকে পিঠ দিয়ে পান চাবাতে থাকা পুলিশ ভাই সাঁই করে ঘুরে চুলবুল পান্ডের মতন এসে আমার রিক্সা দাঁড় করিয়ে, শাহেনসার অমিতাভ বচ্চনের মতন পান চাবাতে চাবাতে লাঠি ঘুরিয়ে বললো,
-    রিক্সা ঘুরান। জানেন না ওয়ানওয়ে?
আমি মুখ কাঁচুমাচু করে বললাম,
-    ইয়ে মানে, আপনি পান খাচ্ছিলেন তো। তাই চান্স নিতে চাচ্ছিলাম আরকি।
ফুটপাতের ধারের পানের দোকানী আর দাঁড়িয়ে থাকা একজন কাস্টমার, কোন এক অজানা কারণে এই দৃশ্যে অপার আনন্দ খুঁজে পেয়ে পান খাওয়া লালচে দাঁত বের করে নির্মল হাসি হাসতে থাকে। এ দৃশ্য দেখে পুলিশ ভাইয়েরও মনেহয় ইগোতে লাগে। সাব কুচ কারনেকা, লেকিন পুলিশওয়ালেকা ইগোকো হার্ট নেহি কারনেকা। উনি বেজার মুখ করে, পান চাবাতে চাবাতেই বললেন,
-    চান্স নিতে চাচ্ছিলেন মানে কি? বাইক আর সাইকেল ছাড়া সবকিছু ঢোকা নিষেধ।
আমি আবারও মুখ কাঁচুমাচু করে বললাম,
-    না মানে, আমাদের সামনের ঐ রিক্সাটা চলে গেলো তো, তাই ভাবলাম, আপনি মনেহয় ট্রাফিক কম থাকায় এখন ঢুকতে দিচ্ছেন।
আমার দেখানো রিক্সাটাকে দেখে ট্রাফিক পুলিশ এবারে কিছুটা বিব্রতভাবে উত্তর দেয়,
-    ও ঐটা? ঐটাতে রুগী ছিলো।
এটা শুনে আমিও খুব সিরিয়াস ভঙ্গিতে বললাম,
-    তাই নাকি? আরে এইটাতেও তো রুগী আছে?
আমার উত্তর শুনে ট্রাফিক পুলিশ ছেলেটা একটু থতমত খেয়ে যায়,
-    রুগী? কই রুগী? আপনি রুগী?
আমি রিক্সাতে বসে বসেই জবাব দেই,
-    নাহ, রুগী না। তবে আলহামরা পর্যন্ত যাইতে যাইতে রুগী হয়া যামু।
-    মানে?!
-    আরে যে গরম পড়সে। তাতে ঐ পর্যন্ত যাইতে যাইতে গরমে অসুস্থ হয়ে রুগী হয়ে যাওয়ার চান্স আছে।
আমার কথা শুনে ফুটপাতের পানওয়ালা আর তার কাস্টমার এবারে অত্যন্ত আনন্দিতভাবে  হে হে শব্দে হাসতে থাকে। কিছুটা হতভম্ব এবং বিরক্ত ইয়াং ট্রাফিক পুলিশ ছেলেটা পান চাবানো বন্ধ করে, হাত দুটো একসাথে করে খানিকটা কাতরভাবে অনুরোধ করে বলে,
-    প্লিজ স্যার, এতোটুকু পথ হেঁটে চলে যান দয়া করে।
ইচ্ছে ছিলো আরও ত্যানাপ্যাচানি কথাবার্তা বলে ছেলেটাকে শিক্ষা দেয়ার। কিন্তু এবারে ছেলেটার কথা বলার ভঙ্গিটা দেখে ভালো লাগে। রিক্সা ভাড়া মিটিয়ে প্রচন্ড গরমে ঘামতে ঘামতে অফিসের দিকে হাঁটা দেই। এতোটুকু আসতেই পুরো শরীর ঘামে ভিজে যায়। অথচ সারাদিন এই প্রচন্ড গরমের মধ্যেই ট্রাফিক পুলিশদের তাদের দায়িত্ব পালন করতে হয়। শরীরের ঘাম শরীরেই হয়তো শুকায়। হয়তো শরীর খারাপও করে। তারপরও তাদের ছুটি নাই। তাদের কষ্টের সামান্য উপলব্ধিটুকু সম্বল করে স্বার্থপরের মতন অফিসের এসির আরামদায়ক শীতলতায় প্রবেশ করি।

রাবনে বানাদি ভুড়ি :-(

Re: সিলেট ডায়েরি

ভাল লাগল। পরের পর্বের অপেক্ষায় থাকলাম।

"সংকোচেরও বিহ্বলতা নিজেরই অপমান। সংকটেরও কল্পনাতে হয়ও না ম্রিয়মাণ।
মুক্ত কর ভয়। আপন মাঝে শক্তি ধর, নিজেরে কর জয়॥"

Re: সিলেট ডায়েরি

সুন্দর লাগল। পরের পর্বের অপেক্ষায় থাকলাম।

লেখাটি LGPL এর অধীনে প্রকাশিত

Re: সিলেট ডায়েরি

ভালই লাগলো, লিখতে থাকুন।

IMDb; Phone: Huawei Y9 (2018); PC: Windows 10 Pro 64-bit

Re: সিলেট ডায়েরি

চমতকার। আপনার রসবোধ আছে বটে! হা হা হা

কিছু বাধা অ-পেরোনোই থাক
তৃষ্ণা হয়ে থাক কান্না-গভীর ঘুমে মাখা।

উদাসীন'এর ওয়েবসাইট

লেখাটি CC by-nc 3.0 এর অধীনে প্রকাশিত

Re: সিলেট ডায়েরি

ধন্যবাদ সবাইকে। ডায়েরি লেখা চলবে  smile

রাবনে বানাদি ভুড়ি :-(

Re: সিলেট ডায়েরি

thumbs_up  পরের টা পড়ি গিয়ে!!