টপিকঃ মৃতরাও ভোট দিয়েছেন!

জনগণ ভালবেসে জাল ভোট দিয়ে ফেলেছে।

চারটি কেন্দ্রে নৌকা প্রতীকে প্রায় ১০০ শতাংশ ভোট পড়া নিয়ে প্রার্থীর ব্যাখ্যা—ভোটাররা নৌকা মার্কাকে ভালোবেসে জাল ভোট দিয়ে ফেলেছেন। এতে প্রার্থীর কোনো দোষ নেই। নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার চরআড়ালিয়া ইউনিয়নের এই চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী নুরুজ্জামান সরকার প্রতিপক্ষকে বিপুল ভোটে পেছনে ফেলে জয়ী হয়েছেন চতুর্থ ধাপের নির্বাচনে।
৭ মের ভোটাভুটিতে ওই ইউনিয়নের ভোটারদের ভোট দেওয়ার প্রবণতায় আরও কিছু অস্বাভাবিকতা চোখে পড়ে। ইউনিয়নটির ১ থেকে ৫ নম্বর কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ হয়েছে ৭৬ থেকে ৭৯ শতাংশ। সেখানে নৌকা প্রতীক পায় ১ হাজার ২৮০ ভোট। বিপরীতে ধানের শীষ প্রতীক ৩ হাজার ২৮২ ভোট এবং হাতপাখা ১৯৪ ভোট পায়। কিন্তু ৬ থেকে ৯ নম্বর কেন্দ্রে হাওয়া সম্পূর্ণ ঘুরে গেল। দেখা যাচ্ছে, এই চার কেন্দ্রে নৌকা প্রতীক পেয়েছে ৩ হাজার ৭৬৮। ধানের শীষ মাত্র ৩ এবং হাতপাখা ৫ ভোট। এই চার কেন্দ্রে ভোট গ্রহণের হার ৯৯ দশমিক ৪০ শতাংশ। চূড়ান্ত যোগ-বিয়োগের ফল—বিএনপি প্রার্থীর হার।
ভোট প্রদানের এই অস্বাভাবিক চিত্র নিয়ে আপত্তি তুলে বিএনপির মনোনীত চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী মোহাম্মদ হাসানুজ্জামান ১১ মে নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ করেছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, প্রথম পাঁচটি কেন্দ্রে সুষ্ঠুভাবে ভোট হয়েছে। পরের চারটি কেন্দ্র দখল করে নৌকা প্রতীকে সিল মেরে বিএনপিকে হারানো হয়েছে।
গত সোমবার নুরুজ্জামান সরকারকে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে ঘোরাঘুরি করতে দেখা যায়। জানতে চাইলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি তো সুষ্ঠু ভোট চেয়েছি। জাল ভোট চাইনি। কিন্তু ভোটাররা আমাকে ভালোবাসে। সে জন্য তারা আমাকে শতভাগ ভোট দিয়েছে। শতভাগ দিতে গিয়ে জাল ভোট দিয়েছে।’
প্রার্থীর লিখিত অভিযোগ থেকে জানা যায়, ৬ থেকে ৯ নম্বর কেন্দ্র যে দখল হয়ে যাবে, সে বিষয়ে তিনি ভোটের আগেই নির্বাচন কমিশনকে জানিয়েছিলেন, কিন্তু সাড়া পাননি।
গতকাল কমিশন সচিবালয় থেকে জানা গেছে, কমিশন অভিযোগটি আমলে নিয়ে উপসচিব মিহির সারোয়ার মোর্শেদকে তদন্তের দায়িত্ব দিয়েছে।
জানতে চাইলে কমিশন সচিবালয়ের সচিব সিরাজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, সংক্ষুব্ধ প্রার্থী কমিশনের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে এবং নির্বাচনের ফল সন্দেহজনক ও অস্বাভাবিক মনে হলে কমিশন সেটা আমলে নেবে।
কমিশন সচিবালয় সূত্র বলেছে, এখন পর্যন্ত নানা ধরনের এক হাজারের বেশি অভিযোগ জমা পড়েছে। কমিশন কিছু অভিযোগ আমলে নিয়ে কয়েকজন এসপি ও ওসিকে বদলি করেছে। কয়েকজন সাংসদকে কারণ দর্শাতে বলেছে। ভোট জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত শতাধিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। কিন্তু নির্বাচনের ফল জালিয়াতির বিষয়ে কমিশন হাতে গোনা কয়েকটি অভিযোগ আমলে নিয়েছে। এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে তারা বেশির ভাগ অভিযোগকারীকে আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে।
এখন পর্যন্ত সারা দেশে চার ধাপে ২ হাজার ৬৬৯টি ইউপিতে নির্বাচন হয়েছে। এতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ১৫০ জন প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হয়েছেন। ২৮ মে অনুষ্ঠেয় পঞ্চম ধাপ পর্যন্ত সাড়ে চার শতাধিক ইউপিতে চেয়ারম্যান পদে বিএনপি প্রার্থী মনোনয়ন দিতে পারেনি।
গতকালের হিসাব অনুযায়ী এখন পর্যন্ত নির্বাচনী সহিংসতায় অন্তত ৭২ জনের প্রাণহানি এবং কয়েক হাজার লোক আহত হয়েছেন।
শতভাগ ভোট: চরআড়ালিয়া ইউপির ফলাফল বিবরণী থেকে জানা যায়, ৬ নম্বর বাতাকান্দি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের মোট ভোট ৮৫২। এখানে শতভাগ ভোট গৃহীত হয়েছে। একটি বাদে বাকি সব ভোট পেয়েছে নৌকা। ধানের শীষ একটি ভোটও পায়নি। ৭ নম্বর বটতলী প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের মোট ভোট ১ হাজার ৯০। এখানেও ভোট গ্রহণের হার ১০০ শতাংশ। এর মধ্যে বিএনপি ৩ এবং ইসলামী আন্দোলনের হাতপাখা ৪ ভোট পেয়েছে। বাকি সব ভোট পেয়েছে নৌকা। ৮ ও ৯ নম্বরের খামারপাড়া মাদ্রাসা ও বটতলী খামার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট গ্রহণের হার যথাক্রমে ৯৭ দশমিক ৭২ এবং ৯৯ দশমিক ৯০ শতাংশ। এ দুই কেন্দ্রের সব ভোটই পেয়েছেন নৌকা প্রতীকধারী প্রার্থী নুরুজ্জামান সরকার। অন্য প্রার্থীরা একটি ভোটও পাননি।
দুটি কেন্দ্রে মৃতরাও ভোট দিয়েছেন: অভিযোগ থেকে আরও জানা যায়, ৬ নম্বর ওয়ার্ডে বিজয়ী নুরুজ্জামান সরকারের মা আমেনা খাতুনসহ তিনজন ভোটার জীবিত নেই। ৭ নম্বরে এ রকম মৃত ভোটার ২৪ জন। এ দুটি কেন্দ্রেই শতভাগ ভোট গ্রহণ হয়েছে। অর্থাৎ মৃত ব্যক্তিদের ভোটও গৃহীত হয়েছে। এ ছাড়া ৬, ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সাড়ে তিন শতাধিক লোক দেশের বাইরে অবস্থান করছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
শতভাগ ভোট গ্রহণ সম্পর্কে জানতে চাইলে বাতাকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের প্রিসাইডিং কর্মকর্তা কুতুব উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘মানুষ ভোট দিয়েছে, আমরা নিয়েছি। শতভাগ ভোটই তো পড়েছে। এর বেশি তো আর পড়েনি।’
খামারপাড়া মাদ্রাসার প্রিসাইডিং কর্মকর্তা হোসেন মোবারক বলেন, ‘আপনারা তো সবই জানেন। আমাদের আসলে কিছুই করার ছিল না। বলেছি, ভোটারদের অনেকে মারা গেছেন, তাই সব ভোট দেওয়ার দরকার নেই। কিন্তু নৌকার প্রার্থী বললেন, কোনো সমস্যা হবে না। মরা মানুষও ভোট দিতে পারে।’
বিএনপির প্রার্থীর অভিযোগের সঙ্গে জমা দেওয়া ভিডিও ও অডিও থেকে জানা যায়, ভোটের আগের দিন প্রার্থী নুরুজ্জামান সরকার তাঁর কর্মী-সমর্থকদের উদ্দেশে বলেন, নৌকা প্রতীকে প্রকাশ্যে এবং মেম্বার পদে গোপনে ভোট দেবেন। এতে প্রিসাইডিং কর্মকর্তারা আপত্তি জানাবেন না।
ভিডিও চিত্রে দেখা গেছে, খামারপাড়া মাদ্রাসা কেন্দ্রে ভোটাররা ভোট দিতে এলে সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা বলেন, চেয়ারম্যানের ব্যালট পেপার নেই। সব দেওয়া হয়ে গেছে। মেম্বার পদে ভোট দেওয়া যাবে।
একই উপজেলার চরসুবুদ্ধি ইউনিয়নে নৌকা পেয়েছে ৬ হাজার ৯০১ ভোট, ধানের শীষ ২৬৪। এর মধ্যে পাঁচটি কেন্দ্রে বিএনপির ভোট যথাক্রমে ০, ৫, ৭, ১০ ও ১৫। জানা গেছে, কমিশন এই ইউনিয়নের অভিযোগও খতিয়ে দেখবে।
জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিশ্লেষক তোফায়েল আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, নির্বাচনের ফলাফল বিবরণী দেখলে কমিশনের পক্ষেই বোঝা সম্ভব, কোথায় অনিয়ম হয়েছে, কোথায় হয়নি। সে অনুযায়ী তাদের ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা আছে। আদালতে পাঠানোর প্রয়োজন নেই। কিন্তু তারা সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিচ্ছে না। একান্ত বাধ্য হয়ে তারা কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নিচ্ছে।
আরও শূন্য ভোট: এবারের ইউপি নির্বাচনে চরআড়ালিয়ার মতো ভোটের চিত্র আরও অনেক ইউনিয়নে দেখা গেছে। কিন্তু নির্বাচন কমিশন বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
প্রথম ধাপে অনুষ্ঠিত বাগেরহাটের মংলার চাঁদপাই ইউনিয়নে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী একটি ভোটও পাননি। চিলা ইউনিয়নে ধানের শীষ প্রতীক সব মিলিয়ে পেয়েছে ১৬৩ ভোট। মোরেলগঞ্জের খাউলিয়া ইউনিয়নে বিএনপির প্রার্থী পেয়েছেন ৫৮ ভোট। জিউধরা ইউনিয়নে ধানের শীষ ভোট পেয়েছে ৭৫টি। এর মধ্যে ১, ২ ও ৬ নম্বর কেন্দ্রে একটি ভোটও পায়নি। নিশানবাড়িয়ায় বিভিন্ন কেন্দ্রে ধানের শীষ পেয়েছে যথাক্রমে ৩, ২, ১০, ৮, ৩, ৩, ৫, ১২, ৫০ ও ১১৭ ভোট।
চতুর্থ ধাপে চট্টগ্রামের রাউজানের নোয়াপাড়া ইউনিয়নের সাতটি কেন্দ্রে ধানের শীষের ভোট যথাক্রমে ১৪, ২২, ৩১, ৩৪, ৩৫, ৫০ ও ৬৮। হাটহাজারীর গুমান মর্দ্দন ইউনিয়নে বিএনপি সব মিলিয়ে পেয়েছে ১০০ ভোট। এর মধ্যে একটি কেন্দ্রে শূন্য ভোট। শিকারপুর ইউনিয়নে ছয়টি কেন্দ্রে বিএনপির প্রার্থী পান ৩ হাজার ৩০১ ভোট এবং আওয়ামী লীগের প্রার্থী ২ হাজার ৬০৭ ভোট। কিন্তু অন্য তিনটি কেন্দ্রে আওয়ামী লীগের প্রার্থী পান ২ হাজার ৭৮৪ এবং বিএনপি ২২৮ ভোট। ভোট গ্রহণের দিন এই তিন কেন্দ্র দখল হওয়ার অভিযোগ উঠলেও কমিশন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলার সূচিপাড়া উত্তর ইউনিয়নে প্রথম ছয়টি কেন্দ্রে ধানের শীষের ভোট ৩ হাজার ৩৫০। নৌকার ৭৮৪। কিন্তু পরের তিনটি কেন্দ্রে বিএনপির ভোট মাত্র ৬০। এর মধ্যে চেড়িয়ারা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দলটি একটি ভোটও পায়নি।

http://www.prothom-alo.com/bangladesh/a … 8%E0%A7%87

Re: মৃতরাও ভোট দিয়েছেন!

এইবার চেয়েরমেন নির্বাচনে বড়িতে ভোট দিতে জাওয়া হয়নাই, কেউ না কেউ তো ঠিক ই দিছে আমার ভোট।

বেকুবে কয় কি?

লেখাটি CC by 3.0 এর অধীনে প্রকাশিত