সর্বশেষ সম্পাদনা করেছেন মরুভূমির জলদস্যু (০৩-০১-২০১৬ ১৩:৩৬)

টপিকঃ মিশর রহস্য – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় (কাহিনী সংক্ষেপ)

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখা কাকাবাবু সিরিজের ৬ষ্ঠ বই “মিশর রহস্য”

১ম বই ভয়ংকর সুন্দর ছিল কাশ্মীর এলাকায় একটি মূর্তির মাথা উদ্ধারের কাহিনী নিয়ে লেখা।
২য় বই সবুজ দ্বীপের রাজা ছিল আন্দামানে বিদেশী বিজ্ঞানীদের নিখোঁজ হওয়া নিয়ে গল্প।
৩য় বই পাহাড় চূড়ায় আতঙ্ক ছিল নেপালের হিমালয়ের পাদদেশে ইয়েতি রহস্য নিয়ে।
৪র্থ বই ভূপাল রহস্য ছিল ভূপালের কিছু গুহাচিত্র আর সেখানকার ইতিহাসবিদদের খুনের রহস্যের।
৫ম বই খালি জাহাজের রহস্য ছিল সুন্দরবনে খুঁজে পাওয়া একটি বিদেশী খালি জাহাজের গল্প।


আজ লিখতে বসেছি সিরিজের ৬ষ্ঠ বই “মিশর রহস্য” এর কাহিনী সংক্ষেপ।

সতর্কতা :  কাহিনী সংক্ষেপটি স্পয়লার দোষে দুষ্ট।

http://i.imgur.com/eUdbs2s.jpg


কাহিনী সংক্ষেপঃ
সন্তুর দিদির বান্ধবী স্নিগ্ধাদির বর সিদ্ধার্থ দা। আগে কলেজে পড়াত এখন ফরেন সার্ভিসে যোগ দিয়েছে। তারা এখন আছে ইজিপ্টে। স্নিগ্ধাদির ছোট বোন রিনি, সেও এবার বেড়াতে যাবে ইজিপ্ট। এদিকে কাকাবাবু কি কাজে একাই গিয়েছে দিল্লী, তাই সন্তু নিজেই একটা রহস্য সমাধানের জন্য চেষ্টা করলো। একটা পুকুরে পরপর দু’দিনে ২টি ছেলে ডুবে গেছে, ডুবরিরাও তাদের খুঁজে পায়নি। সন্তু সেখানে তদন্ত করতে গিয়ে নিজেই পা পিছলে পুকুরে পরে গেলো।

ভিজে কাপড়ে বাড়িতে ফিরে দেখে কাকাবাবু চিঠি পাঠিয়েছে সন্তুকে দিল্লী যেতে, সাথে করে তার পাসপোর্ট নিয়ে যেতে বলেছেন। পরদিন বিকেলে প্লেনে করে সন্তু দিল্লী এয়ারপোর্টে পৌছতেই সেখান থেকে তাকে নিয়ে যাওয়া হল একটা হোটেলে। হোটেলে পৌঁছে দেখা হল কাকাবাবুর পুরনো বন্ধু C.B.I এর বড় কর্মকর্তা নরেন্দ্র ভার্মার সাথে। তিনি জানালেন দিল্লীতে আসার পর কেউ কাকাবাবুকে হত্যার চেষ্টা করেছে। কাকাবাবু ইনজুর হয়েছেন, এখন সেইফ হাউজে আছেন। সন্তুর উপরেও আক্রমণ হতে পারে বলে তাকেও সাবধানে থাকতে হবে।

পরদিন এক নার্সিংহোমে কাকাবাবুর সাথে সন্তুর দেখা হল। কাকাবাবু জানালেন আল মামুন নামের একজন লোক কলকাতাতে তাকে কয়েকটি হলদে কাগজে বিচিত্র কিছু ছোট ছোট ছবিলিপি দেখিয়ে অনুরোধ করে যাতে তিনি সেই লিপির পাঠ উদ্ধার করে দেন, তাই তিনি দিল্লীতে এসেছেন। আল মামুনের গুরু মুফতি মোহাম্মদ এই ছবি গুলি এঁকেছেন। তার বয়স ৯৭ বছর, তিনি লিখতে জানেন না। এদিকে তিনি অসুস্থ হয়ে তার জবান বন্ধ হয়ে গেছে, কোন কথা বলতে পারেন না। চিকিৎসার জন্য তাকে দিল্লিতে রাখা হয়েছে। সেখানেই তিনি ঘুমের ঘোরে হলুদ কাগজে লাল পেনসিল দিয়ে এই ছবি গুলি এঁকেছেন। মামুন কাকাবাবুকে এক লাখ টাকা দেবেন পাঠ উদ্ধার করে দিতে পারলে। কাকাবাবুর ছবিলিপির বিষয়ে পড়াশুনা আছে, তিনি বেস ক’বছর মিশরে থকে পিরামিডের ছবিলিপি নিয়ে গবেষণা করেছনে।

আল মামুনের সাথে যোগাযোগ করে যেদিন কাকাবাবু মুফতি মোহম্মদের সাথে দেখা করলেন তখন কাকাবাবু মুফতির জন্য তার মত করেই কিছু ছবিলিপি এঁকে নিয়ে গেছিলেন। সেই ছবিতে কাকাবাবু কিছু প্রশ্ন করে ছিলেন। মুফতি তখন কোন রকমে ৩টি ছবি এঁকে মৃত্যুবরণ করেন। মুফতির প্রচুর শিষ্য দিল্লিতে আছে, তাদের আবার দুই ভাগ আছে। এক ভাগের নেতা আল মামুন। আল মামুন বড় ব্যবসায়ী, বিশাল ধনী, কিন্তু ধনের লোভ তাকে ছাড়ে না। সে মুফতিকে দিল্লী নিয়ে যায় চিকিৎসা করাতে এই আশায় যে মুফতি তার লুকিয়ে রাখা সম্পদ তাকে দিয়ে যাবেন।
আরেক ভাগের নেতা হানি আলকাদি। হানি খুবই ভয়ংকর মানুষ, সে একবার বিমান হাইজাক পর্যন্ত করিয়েছে।

মুফতি মারা যাওয়ার আগে কাকাবাবুকে যে তথ্য দিয়েছেন তা যাচাই করার জন্য কাকাবাবু ও সন্তু ইজিপ্ট যাবেন। তারা যেদিন যাবে সেদিন সকালেই হানি ইজিপ্ট চলে যায়। আবার কাকাবাবু মামুনকে ছবি লিপির অর্থ ব্যাখ্যা না করায় সে খুব খেপে গেছে।

যাইহোক কায়রো যাওয়ার জন্য ওরা যে প্লেনে চড়লো সেটার পাইলট সন্তুদের পাড়ার ছেলে বিমান। খালি জাহাজের রহস্যে বিমান সন্তুদের সাথেই ছিল। কায়রোতে নেমেই দেখে সিদ্ধার্থরা তাদের নিতে এসেছে, কিন্তু কাকাবাবু হোটেলে উঠলেন। হোটেলেই দেখা করতে এলো কাকাবাবুর পুরনো বন্ধু কায়রো মিউজিয়ামের কিউরেটর আলি সাদাত মান্টো। মান্টো জানালো হানি আলকাদি এদেশে ফিরে এসে অভিযোগ করেছে যে কাকাবাবু মুফতির উইল চুরি করেছেন।

মান্টোর কাছে জানা গেল মুফতি মোহাম্মদ খুবই দরিদ্র ঘরের ছেলে ছিল। খুব ছোট বেলা বাবা মা মারা যাওয়ার পরে সে কিছু দিন ভিক্ষা করেন। একটু বড় হলে পরে কুলিগিরী শুরু করেন। কিছু দিন পর তিনি বিদেশীদের গাইড হিসেবে কাজ শুরু করেন। সেই সময় নানা দেশীয় পর্যটক আর বিজ্ঞানীদের সাথে নানা অভিযানে যান তিনি। বিভিন্ন পিরামিড আর পুরনো সমাধিতে অনেকবার গিয়েছেন তিনি। পরে অবশ্য তিনি গাইডের কাজ ছেড়ে দিয়ে রাজতন্ত্র বিরোধী আন্দোলনে যোগদেন এবং একটি বিপ্লবী দলের নেতা হয়ে যান।

রাজতন্ত্রের পতনের পরই তিনি বিপ্লবীদের সঙ্গ ত্যাগ করে আবার রাস্তায় নেমে যান।  বিপ্লবী দল ভেঙ্গে দিলেও সেই সময় দল চালাতে যে বিপল অর্থ সম্পদ আর অস্ত্র ছিল সেগুলির খোঁজ কিন্তু কেউ পায়নি। আর মুফতিকে কেউ সাহস করে সেগুলির কথা জিজ্ঞাস করতে পারেনি। সবার ধারনা মুফতি সেগুলি মৃত্যু সময় উইল করে গেছেন, সে জানিয়ে গেছেন কোথায় আছে সেই সম্পদ আর অস্ত্র। আর সেই উইলের অর্থ শুধু মাত্র একা কাকাবাবুই জানেন।

অন্যদিকে কাকাবাবুকে তার হোটেল থেকে হানির তিনজন লোক এসে ধরে নিয়ে যায়। মরুভূমির মাঝে এক ভাঙ্গা প্রাসাদে হানির সাথে কাকাবাবুর দেখা হয়। কাকাবাবু হানিকে জানায় যে মুফতি কোন উইল করে যাননি, তবে তিনি তার একটা কৌতূহলের কথা জানিয়ে গেছেন, সেটাই কাকাবাবু যাচাই করতে এসেছেন। হানি কাকাবাবুর কথা বিশ্বাস করে, আর তরুণ সুদর্শন ভদ্র বিপ্লবী নেতা হানিকেও কাকাবাবুর পছন্দ হয়।

কাকাবাবু একটা পিরামিডে অভিযানে যাবেন তাই তার গাইড উট আর অন্যান্য জিনিস লাগবে। ডাগো আবদুল্লা কাকাবাবুর পুরনো পরিচিত গাইড। কাকাবাবু হানির লোককে দিয়ে সন্তুর কাছে চিঠি লিখে পাঠিয়েছে যেন আগামী কাল সকালে সন্তু একটা উট ভাড়া করে মেমফিসের পিরামিডের কাছে চলে আসে। এদিকে বিমান আর রিনি সেই সময় হোটেলে ছিল,  তারাও সন্তুর সাথে যাওয়ার জেদ ধরল এডভেঞ্চারের লোভে। পরদিন সকালে সন্তু, বিমান আর রিনি উটের পিঠে চেপে পিরামিডের দিকে চলল।  ওরা যখন নিদিষ্ট যায়গায় পৌঁছল তখন ডাগো একটা জীপ নিয়ে সন্তুকে নিতে এলো, ঠিকে সেই সময়ই মামুনের কয়েকজন লোক আরেকটা জীপে করে এসে রাইফেল বাগিয়ে ধরে সন্তুকে নিয়ে চলে গেলো। তারা যাওয়ার আগে ডাগোকে একটা চিঠি দিয়ে গেলো।

ডাগো চিঠি নিয়ে কাকাবাবুর কাছে এসে সমস্তটা খুলে বলল।  চিঠিতে লেখা ছিল কাকাবাবুকে ছেড়ে দিতে হবে যাতে তিনি মামুনকে মুফতির উইল বুঝিয়ে দিতে পারে। হানি সব শুনে খুব রেগে গেলো তখনই মামুনকে আক্রমণ করার জন্য রওনা হতে চাইলো, কিন্তু কাকাবাবু তাকে ক্ষান্ত করলেন। কাকাবাবু তাকে বুঝলেন মুফতির উইলে আসলে কোন সম্পদ নাই, তাই কাকাবাবু বুদ্ধি দিলেন মামুনকে চিঠি লিখতে। চিঠিতে লেখা হল যদি উইল অনুযায়ী কোন সম্পদ পাওয়া যায় তবে তার অর্ধেক মামুনকে দেয়া হবে। এই চিঠি পেয়ে মামুন সন্তুকে ছেড়ে দিলো। তাপর কাকাবাবুরা সবাই মুফতির নির্দেশিত পিরামিডের দিকে রওনা হল।

সম্রাট খুফুর মা হেটেফেরিস মারা যাওয়ার তার জন্য এই পিরামিড তৈরি করে তার মরদেহ মমি করে সেখানে রাখা হয়। এই মমি নিয়ে একটা রহস্য বা ভৌতিক ব্যাপার চালু হয়ে যায়। একজন সাহেব প্রথম সেই মমিটি আবিষ্কার করেন। কিন্তু পরে যখন উনি সরকারি লোকজন নিয়ে সেখানে যান তখন সেখানে মামিটিকে আর খুঁজে পান না। অনেকদিন পরে আবার মমিটিকে তার কফিনে দেখতে পাওয়া যায়, কিন্তু সেটি আবারও গায়েব হয়ে যায়।

রানির পিরামিডের কাছে পৌঁছে ডাগো, কাকাবাবু আর সন্তু পিরামিডের সুরঙ্গ ধরে এগিয়ে চলল।  একটা নিদিষ্ট যায়গায় গিয়ে কাকাবাবু ডাগোকে আসতে নিষেধ করলেন, শুধু তিনি আর সন্তু এগিয়ে চললেন। শেষ পর্যন্ত তারা রানির সমাধিস্থলে পৌঁছলেন। এখানে এসে তিনি সন্তুকে জানালেন মুফতি আসলে তার কোন উইল রেখে যায়নি। মুফতি যখন গাইডের কাজ করতেন তখন তার এক গাইড বন্ধুর সাথে মিলে তারা রানির মমিটা এখানেই একটা গোপন স্থানে লুকিয়ে ফেলে। পরে আবার সেটা কফিনে বের করে রাখে। লোকজন দেখার পরে আবার তার মমিটা লুকিয়ে ফেলে। এভাবে তারা দুই তিন বার করে। তার আর বন্ধুর আবিষ্কারগুলি সাহেবরা নিজেদের নামে চালিয়ে দিত বলে তারা এই কাজ করে।

মমিটা তারা এখানেই গোপন কুঠুরিতে লুকিয়ে রেখেছে, যদি কেউ চুরি করে নিয়ে গিয়ে না থাকে তাহলে সেটা এখনো লুকানো আছে, সেটা যাচাই করার জন্যই মুফতি কাকাবাবুকে অনুরোধ করেছেন। গোপন কুঠরিটা আছে ছাদের দিকে। কাকাবাবুর পক্ষে উপরে উঠা সম্ভব না বলে সন্তু দেয়ালের খাজ ধরে ধরে উপরে উঠে গেলো। ঠিক সেই সময় নিচে একটা কফিন থেকে বেরিয়ে এলো আল মামুন, হাতে রিভলভার নিয়ে। কাকাবাবু মমির কথা মিউজিয়ামের কিউরেটরকে বলেছিল, তার কাছ থেকে মামুন একথা জানতে পেরেছে। মামুন কিন্তু সহজেই নাস্তানাবুদ হয়ে পড়লো কাকাবাবুর হাতে থাকা দড়ির বাড়ি খেতে খেতে। শেষে মামুনকে হাত পা বেধে সেখানে ফেলে রাখা হল।

এদিকে সন্তু কাকাবাবুর নির্দেশিত ছবিতে চাপ দিতেই একটা গোপন অংশ খুলে গেলো। সেখানে রানির মমি থাকেলও কোন ধনরত্ন দেখতে পেলো না। মমির কাছেই আরো কয়েকটা ছবি আকা ছিল, সন্তু সেই ছবি গুলি নকল তুলে আনলো এঁকে। কাকাবাবু ও সন্তু এবার বের হওয়ার পথ ধরল, ডাগোকে সাথে করে তারা সবাই সুরঙ্গ থেকে বেরিয়ে এলো। 

কাকাবাবুরা কোন সম্পদ পায়নি শুনে হানির খুব মন খারাপ হল। তবুও সে কৃতজ্ঞতা জানালো তার গুরুর ইচ্ছা পূরণের জন্য কাকাবাবু এতদূর এসেছেন তাই। কাকাবাবু যখন বিদায় নিয়ে চলে আসবেন তখন হানিকে বলল যে তারা মমির কাছ থেকে কিছু ছবি পেয়েছেন। সেগুলির অর্থ তিনি উদ্ধার করেছেন, তার ধারণা সেখানে মুফতির সম্পত্তি থাকতে পারে। ছবির সংকেতের অর্থ হানিকে দিয়ে আর নিচে ফেলে রাখারা মামুনকে উদ্ধার করতে লোক পাঠিয়ে কাকাবাবুরা ফেরার পথ ধরলেন।


পর্যবেক্ষণ -
বইটিতে চমৎকার কিছু লাগি পেয়েছি

১। আলুর বস্তার ইঁদুর

২। বাঁধাকপির পোকা

৩। নরদমার আরশোলা

৪। বাঁদরের গায়ের উকুন

৫। শয়তানের দাঁতের ময়লা


এপিগ্রাম :

১। কিছু একটা শিখতে শিখতে মাঝ পথে ছেড়ে দেয়া মোটেই ঠিক নয়।

২। কাছে দাড়িয়ে থাকলেও সব সময় সব কিছু বুঝা যায় না।

৩। দুর্দান্ত প্রকৃতির মানুষকে খুব সহজেই বাগে আনা যায়। যাদের বাইরে থেকে নরম সরম মনে হয় তাদেরই ভেতরটা বুঝা মুশকিল।

৪। পৃথিবীতে অবাক হবার মত ঘটনার প্রচুর ঘটে।

৫। বিপদ দেখলে একেবারে ঘাবড়ে গেলে চলে না।

এখনো অনেক অজানা ভাষার অচেনা শব্দের মত এই পৃথিবীর অনেক কিছুই অজানা-অচেনা রয়ে গেছে!! পৃথিবীতে কত অপূর্ব রহস্য লুকিয়ে আছে- যারা দেখতে চায় তাদের নিমন্ত্রণ।