সর্বশেষ সম্পাদনা করেছেন totalmamun (২০-১২-২০১৫ ১২:৫৭)

টপিকঃ জনসংখ্যা রপ্তানীতে স্থানীয় এনজিওদের সম্পৃক্ততা

জনসংখ্যা রপ্তানী ব্যবসা বলতেই গণমানুষের মনে পড়ে আদম ব্যাপারীর কথা। আদম ব্যাপারীদের কার্যকলাপ এতই ভীতির সঞ্চার করেছে যে নাম শুনলে সাধারন মানুষ এখনো আঁৎকে উঠেন। যুগ উন্নয়নের সাথে প্রাচীন এই ব্যবস্থার তেমন উন্নয়ন হয়েছে বলে মনে হয় না, বরং দিন দিন এই সেক্টরে প্রতারণার মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। আদম ব্যবসা আর আদম ব্যাপারী নিয়ে দেশে সিনেমা ও নাটক হয়েছে আনেক। নাট্যকার বা কাহিনীকারগণ তাদের নাটক ও চলচ্ছিত্রে উঠে এসেছে নানাবর্ণের করুণ চিত্র। আদম ব্যাপারীদের হাতে সর্বস্বান্ত হওয়া অগনিত দুঃখ দুর্দশার কথা সকল দরবারে উঠে আসলেও এ ব্যাপারে এখনো পর্যন্ত কোন সরকার কার্যকর কোন পদক্ষেপ নিতে এগিয়ে আসেননি। বিষয়টি অতীব জরুরী হলেও কেন জানি অতীব অবহেলিত হয়ে পড়ে আছে।
ঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশের মুক্তির অন্যতম প্রথম দুইটি পথ হিসেবে যদি সামনে আনা হয়, আমার মনে হয় জনসংখ্যা রপ্তানী একটি। জনসংখ্যা বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে নয় ইলেকট্রিক্যাল ট্রেনের গতিতে। ক্রমবর্ধমান এ জনসংখ্যার পরিমাণ এবং পরিণতি ভবিষ্যতে কী পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে তা কিছুটা অনুমান করা যায় তখন, যখন গত পাঁচ বছর আগে দেখে যাওয়া বসতিহীন ধু-ধু বিলের মাঝখান দিয়ে বয়ে যাওয়া সড়কগুলোর দু’পাশে যখন চোখ যায়। চৈত্র-বৈশাখ মাসে পাড়ায় আগুন লাগলে যেমন দ্রুত গ্রাস করে ফেলে সমস্ত জনপদ, তেমনি সড়ক, মহাসড়ক, পল্লী সড়কের দু’পাশের ফসলি জমি, পুকুর, দিঘি, জঙ্গল বাতাসের বেগে গ্রাস করে ফেলছে নতুন নতুন বসতি।  এজন্য শহর, গ্রাম সর্বপরি সারাদেশে গৃহায়নের সঠিক নীতিমালার অভাব কিঞ্চিত দায়ী হলেও মুলত দায়ী লাগামহীন জনসংখ্যা বৃদ্ধি, ভয়ংকর জনসংখ্যা বৃদ্ধি।
এখানে আমার একটা অভিজ্ঞতার কথা বলি। ২০০৮ সালের কথা। ভাড়াটিয়া অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ নামে একটা অধিকার ভিত্তিক সংগঠনের হয়ে আমরা কিছু মধ্যবিত্ত নিন্মবিত্ত ভাড়াটিয়ার সমস্যা পর্যবেক্ষণ করার উদ্যোগ নিই। বহুবছর আগের কথা। দ্বীন ইসলাম নামে এক ভাড়াটিয়া মেট্রিকুলেশন পাশ দিয়ে চলে আসে চট্টগ্রাম শহরে। হিযরতের একমাত্র উদ্দেশ্য; উচ্চতর শিক্ষা অর্জন। পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভাল নয়, প্রান্তিক কৃষক পরিবার। শহরে এসে যথারীতি মেচে উঠলেন তিনি, পাশাপাশি পাড়ার এক ভাইয়ের সহায়তায়  একটি লজিং আর দুইটি টিউশানী যোগাড় করেন। লজিংবাড়ীতে দু’বেলা ছাত্রছাত্রী পড়িয়ে দু’বেলা ভাতের সংস্থান আর দুইটি টিউশানী করে মেচের ভাড়া জোগাড় নিশ্চিত হলে তিনি উচ্চতর এলেম অর্জনে মনোনিবেশ করেন। এভাবে যুগ পেরিয়ে তিনি ভাল ভাল পাশ দিয়ে কোনরকম একটা চাকুরীও পেয়ে যান। একটা প্রাইভেট কোম্পানীর ছোটখাট হিসাবরক্ষক। তিনি ছোটখাট চাকুরীর বেতন নিয়ে সস্ত্রীক ছোটখাট বাসাভাড়া নিয়ে শহরেই বসবাস শুরু করলেন। বাসাভাড়া বাড়তে বাড়তে তিরি শহরে বসবাসে অক্ষম হয়ে পড়লেন একসময়। এর মধ্যে ছেলে-মেয়েও বড় হয়ে যাচ্ছে। ছেলে-মেয়ে বড় হওয়ার সাথে পল্লা দিয়ে বাড়ছে খরচাদি। বেতনের দুই-তৃতীয়াংশ চলে যায় বাসাভাড়ায়। দিশেহারা দ্বিন ইসলাম বাসা সরাতে সরাতে এমন এক জায়গায় চলে গেলেন, যে জায়গা নয় শহর নয় গ্রাম, শহর ও  গ্রামের সঙ্গমস্থল; শহরতলী। প্রতিদিন তিন/চারটি গাড়ী পাল্টিয়ে তিনি অফিস করেন। বয়সের ভারে চিন্তার ভারে তথাপি খরচের ভারে তিনি দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়ে পড়লেন। দুর্বল শরীর নিয়ে আমাদের দেশের পাবলিক পরিবহন সার্ভিসে (শহর এলাকার বাস, টেম্পু)  চড়ে প্রতিদিন অফিস করা অনেকটাই ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। অফিসের কাছে বা শহরে বাসা নেয়ার হিম্মতও তার নেই। তবুও বেঁচে থাকা জরুরী, বাল-বাচ্চাদের বাঁচিয়ে রাখা জরুরী। তিনি বেঁচে থাকা এবং বাঁচিয়ে রাখার জরুরী কাজ নিয়ে বাধ্য হয়ে চাকুরী করে যাচ্ছেন। শত কষ্টের মঝেও তার একটা ক্ষীণ আশালতা ছিল। অবর্ণনীয় কষ্ট করে ছেলেকে বিদেশ পাঠানোর জন্য কিছু টাকা জমিয়েছেন ব্যাংকে।  ছেলে বিদেশ যাবে, দুঃখ হযতো ঘুচে যাবে- এই তার আশালতা। একদিন! একদিন বিকেলে অফিস শেষে বাড়ী ফিরতে দ্বীন ইসলাম এক বাস পাল্ঠিয়ে অন্য বাস ধরতে গিয়ে পড়েন চলন্ত বাসের নীচে। যথারীতি বাস পালিয়ে যায়। দ্বীন ইসলামের চিকিৎসা চলে ছেলের বিদেশ পাঠানোর সঞ্চয়ের টাকা দিয়ে। অবশেষে দ্বীন ইসলাম জীবন যুদ্ধে হেরে যান, হাসপাতাল থেকেই বিদায় নিলেন পরপারে। তারপরের কাহিনী আরো করুণ, আরো মর্মান্তিক, যা দিয়ে হয়তো একটি পরিপূর্ণ উপন্যাস লেখা যায়, কিন্তু দ্বীন ইসলামদের মুক্তির রাস্তা মেলে না কোনকালে।
হৃদয়বিদারক ঘটনা শুনে আমরা বুঝে হোক আর না বুঝে হোক ভাড়াটিয়া কল্যাণ সংস্থা নামে আরেকটি সংগঠন গঠন করা উদ্যোগ গ্রহণ করি। এই সংগঠনের কার্যক্রমে আমরা অসচ্ছল ভাড়াটিয়াদের জীবনযাত্রায় সচ্ছলতা এনে জীবন-মান উন্নয়ণে অনেকগুলো উদ্যোগ গ্রহণের পরিকল্পনা করি। তার মধ্যে একটি ছিল; অসচ্ছল ভাড়াটিয়াদের ছেলেমেয়ের পড়ালেখা, অভিজ্ঞতার মান অনুযায়ী বিদেশে চাকুরী খুঁজতে আর্ন্তজাতিক চাকুরীদাতা/সংস্থার সাথে যোগাযোগ স্থাপন, বিদেশ যাওয়ার জন্য ঋণ হিসেবে পুঁজি সংগ্রহে বিভিন্ন অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠান/এনজিওদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রালয়ের কাগজপত্র/ অনুমোদন নেয়ার মাধ্যমে তাদের বিদেশ প্রেরণের জটিল কাজটি সম্পন্ন করার মাধ্যমে আদিমপন্থা আদম ব্যবসায়ীদের হাত থেকে নিরীহ জনসাধারনের রক্ষা করার প্রয়াস। পাশাপাশি বিদেশ যেতে ইচ্ছুক ছেলেমেয়েদের                 আর্ন্তজাতিক বাজারে কিংবা বিদেশের চাকুরীদাতার চাহিদা অনুযায়ী ভাষা, দক্ষতা অর্জনে ছোট ছোট ভিন্ন ভিন্ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণও এই জটিল কর্মচক্রে সংযুক্ত ছিল। পুরো পরিকল্পনাটি নিয়ে চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত দৈনিক আজাদীতে আমার একটি লেখাও প্রকাশিত হয়েছিল তখন।

পরিকল্পনাটি সবার সম্মতিক্রমে সংগঠনের কার্যক্রমে অর্ন্তভুক্ত করার অনেকদিন পর আমাদের মধ্যে অনেকেই বলাবলি শুরু করল যে, এই পরিকল্পনা সম্পূর্ণ কাল্পনিক, এটি বাস্তবায়ন হওয়ার যোগ্য নয়। গত মাস দুয়েক আগে পত্রিকায় গ্রামীণ উদ্যোগের একটি প্রতিষ্ঠানের নাম দেখে আমি অত্যন্ত আনন্দিত হই। ডঃ ইউনুস গত বৎসর “গ্রামীণ এ্যমপ্লয়মেন্ট সার্ভিস” নামে একটি প্রতিষ্ঠান গঠন করে সরকারের অনুমতির জন্য প্রেরণ করেছেন, যার লক্ষ্য উদ্দেশ্য হুবহু আমাদের সেই  ২০০৮ সালে গৃহীত স্বপ্নের পরিকল্পনার মত। অতীব দুঃখের বিষয় আমাদের সরকার বাহাদুর এই প্রতিষ্ঠান এবং এই মহান কার্যক্রম এর মমার্থ বুঝতে পারেননি এবং যথারীতি অনুমোদন দেননি। ডঃ ইউনুসের এই উদ্যোগ দেখে আমি অত্যন্ত আনন্দিত হই এই পরিকল্পনাটির প্রতি অঅমার দৃঢ়তা বেড়ে যায়।

আমরা জানি আমাদের দেশে যে সমস্ত এনজিওসমুহ কাজ করছেন তারা আর্ন্তজাতিকভাবে একটি নেটওয়ার্ক রক্ষা করে থাকেন। ইচ্ছে করলে এনজিওরা সারা পৃথিবীতে সমগ্রোত্রীয় বিভিন্ন বিদেশী বা আর্ন্তজাতিক সংস্থা / চাকুরীদাতাদের সাথে যোগাযোগ করে বিশ্বব্যাপী চাকুরীর বাজার খোঁজার একটি শক্তিশালী কার্যকর নেটওয়ার্ক সৃষ্টি করতে পারে। নতুন নতুন চাকুরীর বাজার পাওয়া গেলে চাকুরীদাতা / সংস্থার চাহিদা অনুযায়ী গ্রামে-গঞ্জের কিংবা দরিদ্র পরিবারের ছেলে-মেয়েদের প্রশিক্ষণ দিয়ে উপযুক্ত করে তুলতে পারে তারা। যেহেতু প্রায় এনজিও তাদের প্রোপাইলে দারিদ্র বিমোচনে কাজ করার অঙ্গীকার করে থাকে এবং গ্রামে-গঞ্জে, শহরের বস্তিতে দরিদ্রদেও নিয়ে কাজ কওে থাকেন, সেহেতু তাদের জন্য এই কাজটা অত্যন্ত উপযুক্ত বলে আমি মনে করি। অর্থলগ্নিকারী এনজিওরা দেশে মাইক্রো-এন্টারপ্রাইজ বা আরো নানা নামে ঋণ প্রদান করে থাকেন। এখানে তারা এই ঋণের আওতায় বিদেশগামীদের ঋণ সহায়তা প্রদান করতে পারেন। এনজিওরা এই মহতি উদ্যোগকে একটি সামাজিক ব্যবসা হিসেবেও গ্রহণ করতে পারেন। এনজিওদের এধরণের অভিনব কার্যক্রমে দারিদ্র বিমোচন, যথার্থ ঋণের ব্যবহার, ঋণ আদায়ে সহজলভ্যতা এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে কার্যকরী ভুমিকা রাখতে পারে।
এই বিশাল কর্মযজ্ঞে সরকারী বেসরকারী এবং আর্ন্তজাতিক প্রতিষ্ঠানসমুহের সাথে সমন্বয় ও যোগাযোগ স্থাপন এবং কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার জন্য এনজিওদের মধ্যে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা সম্ভব। আমরা জানি দেশে কর্মরত এনজিওরা প্রয়োজনীয় অপ্রয়োজনীয় কত কার্যক্রমই না বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। অবশ্য এ ব্যাপারে সরকারের অনুমোদন, সহযোগীতা, পৃষ্টপোষকতা নিতান্তই জরুরী।

----------------------------সৈয়দ মামুনূর রশীদ

Re: জনসংখ্যা রপ্তানীতে স্থানীয় এনজিওদের সম্পৃক্ততা

যদি এনজিও ওলারাই জনশক্তি রপ্তানী করত ভাই তাহলে সরকার যে টাকা নিয়ে রেখেছে ঐটা ফেরত দিতে বলে দেন। দেউলিয়া হয়ে গেলেও ঐটা সরকার ফেরত দিতে পারবে না।

totalmamun লিখেছেন:

বরং দিন দিন এই সেক্টরে প্রতারণার মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে।

ভাই মানুষ এখন যদি স্বেচ্ছায় প্রতারিত হয় তবে কার কি করার আছে। আগে আমাদের জনগণের একাংশ এবং কতিপয় কিছু অসাধু ব্যবসায়ী আছে যাতে জন্য আজ এই সেক্টর ধ্বংস হয়ে গিয়েছে।

সব কিছু ত্যাগ করে একদিকে অগ্রসর হচ্ছি

লেখাটি CC by-nd 3.0 এর অধীনে প্রকাশিত