টপিকঃ জুতা নিক্ষেপ, ফাঁসির দাবি, তবুও ঘাতকের মুখে হাসি!

অনেকে বলৈন আরেক জজ মিয়া নুরহোসেন, তাকে রিমান্ডে নিলে অনেকের নাম বেরিয়ে আসতো

শীর্ষ নিউজ, ঢাকা: ‘ফাঁসি ফাঁসি ফাঁসি চাই, নূর হোসেনের ফাঁসির দাবি। নূর হোসেনের দুই গালে, জুতা মারো তালে তালে’-এ রকম স্লোগানে খানিকটা উত্তপ্ত হয়ে ওঠে আদালতপাড়া। এসময় বিক্ষোভকারীরা শুধু স্লোগান দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, নূর হোসেনের দিকে তারা জুতাও নিক্ষেপ করেছে।

শুক্রবার দুপুরে নারায়ণগঞ্জের আদালতপাড়ায় এ ঘটনা ঘটে। নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুনের ঘটনার দুটি মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেনকে তখন হাজির করা হয়েছে চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে।

এর আগে থেকেই নিহতদের স্বজনরা ভিড় করে সেখানে। নূর হোসেনকে জুমার নামাজের পর আদালতে হাজির করা হলে তাদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ক্ষুব্ধ স্বজনরা নূর হোসেনের ফাঁসি চেয়ে বিক্ষোভ শুরু করে। এক পর্যায়ে তাকে লক্ষ্য করে জুতা নিক্ষেপ করে। তবে চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সহিদুল ইসলামের আদালতে হাজির করার সময় নূর হোসেনের মধ্যে কোনো উদ্বেগ বা উৎকণ্ঠা লক্ষ্য করা যায়নি। তাকে কোনো ধরনের বিমর্ষও দেখা যায়নি। তার মধ্যে কোনো ধরনের ভয়ও কাজ করতে দেখা যায়নি। নিহতদের পরিবারের ক্ষুব্ধ সদস্যরা তার ফাঁসি চেয়ে বিক্ষোভ আর স্লোগানের মধ্যে জুতা নিক্ষেপ করলেও তাকে কোনো ভাবান্তর দেখা যায়নি। বিক্ষোভকারীরা যখন ‘ফাঁসি ফাঁসি ফাঁসি চাই, নূর হোসেনের ফাঁসি চাই, নূর হোসেনের দুই গালে জুতা মারো তালে তালে-এসব স্লোগান দিচ্ছিল তখন তাকে মিটিমিটি হাসতে দেখা গেছে। এসময় নূর হোসেনের পরনে ছিল খাকি রঙের প্যান্ট আর সাদা কালো স্ট্রাইপের গেঞ্জি। বাম হাতে নীল রঙের একটি ঘড়ি পরা ছিল।

এদিকে, নূর হোসেনের এমন আচরণে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নিহত কাউন্সিলর নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি। তিনি দাবি করে বলেন, নূর হোসেনকে আবারও নতুন করে জিজ্ঞাসাবাদ করে চার্জশিট দেয়া হোক। তাহলে অনেক কিছু পরিষ্কার হয়ে যাবে। কিন্তু নূরের চেহারা দেখে আমাদের কিছু ভয় কাজ করছে। কারণ আদালতে নেয়া আর আনার সময় নূর হোসেনকে হাসতে দেখা গেছে। দুপুর আড়াইটায় নারায়ণগঞ্জ নূর হোসেনকে চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সহিদুল ইসলামের আদালতে হাজির করানো হয়। আদালতে ১১টি মামলায় শ্যোন অ্যারেস্ট দেখায় রাষ্ট্রপক্ষ। শুনানি শেষে বিচারক নূর হোসেনকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংকরোড থেকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনর কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম, আইনজীবী চন্দন সরকারসহ সাতজনকে অপহরণ করা হয়। তিন দিন পর শীতলক্ষ্যা নদীতে তাদের লাশ পাওয়া যায়। নজরুলের শ্বশুর শহীদুল ইসলাম সে সময় অভিযোগ করেন, র‌্যাবকে ছয় কোটি টাকা দিয়ে সিদ্ধিরগঞ্জের আওয়ামী লীগ নেতা নূর হোসেন ওই হত্যাকা- ঘটিয়েছেন।

পরে র‌্যাবের অভ্যন্তরীণ তদন্তেও তার সত্যতা পাওয়া যায়। হত্যাকাণ্ডের প্রায় এক বছর পর গত ৮ এপ্রিল নূর হোসেন এবং র‌্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তাসহ ৩৫ জনের বিরুদ্ধে নারায়ণগঞ্জের আদালতে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। হত্যাকাণ্ডের পর নিজের সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করলেও একপর্যায়ে ভারতে পালিয়ে যান নূর হোসেন।

এরপর ২০১৪ সালের ১৪ জুন কলকাতার দমদম বিমানবন্দরের কাছে কৈখালি এলাকার একটি বাড়ি থেকে দুই সহযোগীসহ তাকে গ্রেপ্তার করে পশ্চিমবঙ্গের পুলিশ। তাদের বিরুদ্ধে অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগে মামলা হয়। গতবছর ১৮ আগস্ট নূর হোসেন ও তার দুই সহযোগী ওহাদুজ্জামান শামীম এবং খান সুমনের বিরুদ্ধে চব্বিশ পরগনার বারাসাত আদালতে অভিযোগপত্র দেয় বাগুইআটি থানা পুলিশ। নূর হোসেনের বিরুদ্ধে ভারত সরকারের দায়ের করা অবৈধ অনুপ্রবেশের মামলা তুলে নেওয়ার আবেদন মঞ্জুর করে উত্তর চব্বিশ পরগণার অতিরিক্ত মুখ্য বিচারিক হাকিম সন্দীপ চক্রবর্তী গত ১৬ অক্টোরবর তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর পথ তৈরি করে দেন।

কে এই নূর হোসেন:

ট্রাকচালকের সহকারী হিসেবে জীবন শুরু করা নূর হোসেন ১৯৯২ সালে বিএনপির সাবেক সাংসদ গিয়াসউদ্দিনের আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে যোগ দেন বিএনপিতে। সিদ্ধিরগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে তিনি শামীম ওসমানের হাত ধরে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। বাংলাদেশ ট্রাকচালক শ্রমিক ইউনিয়ন কাঁচপুর শাখার সভাপতি হন। তার বিরুদ্ধে দাঙ্গা-হাঙ্গামাসহ বিভিন্ন অভিযোগে ১৩টি মামলা হয়। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে তাকে ধরিয়ে দিতে ইন্টারপোলে রেড নোটিশও পাঠানো হয়েছিল। ২০০৮ সালে সংসদ নির্বাচনের পর তিনি এলাকায় ফেরেন। পরে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি হন। ২০১৪ সালে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রথম নির্বাচনে তিনি ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। কাঁচপুরে শীতলক্ষ্যা নদী দখল করে বালু-পাথরের ব্যবসা, উচ্ছেদে বাধা, পরিবহনে চাঁদাবাজিসহ নানা কারণে বারবার আলোচনায় এসেছেন তিনি। তার বিরুদ্ধে সিদ্ধিরগঞ্জ ও ফতুল্লা থানায় ছয়টি হত্যা মামলাসহ ২২টি মামলা রয়েছে।

শীর্ষ নিউজ/এসঅঅর

http://www.sheershanewsbd.com/2015/11/14/103682