টপিকঃ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ নারী প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুবার্ষিকী আজ

http://s3.amazonaws.com/somewherein/pictures/nurubrl/nurubrl-1446264262-cc50950_xlarge.jpg
ভারতের তৃতীয় এবং প্রথম ও আজ পর্যন্ত একমাত্র মহিলা প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা প্রিয়দর্শিনী গান্ধী। ডাক নাম ইন্দিরা। ইন্দিরা গান্ধী নামেই যিনি সমধিক পরিচিত। গন্ধী পরিবারে তিন প্রজন্ম ভারতের প্রধানমন্ত্রীর পদ অলংকৃত করে ছিলেন। তাঁর পিতা জওহরলাল নেহরু ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর ছেলে রাজীব গান্ধীও ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ইন্দিরা গান্ধী রেকর্ড সংখ্যক চারবার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। তিনি ১৯১৭ সালের ১৯ নভেম্বর থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত (১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টবর পর্যন্ত) ভারতের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ইন্দিরা গান্ধীর পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আর কোন নারী এখনো আসেননি। বিশ্বের বহু বিশ্ববিদ্যালয়ই তাঁকে সাম্মানিক ডক্টরেট ডিগ্রিতে সম্মানিত করেছে। তাঁর উজ্জ্বল ছাত্র জীবনের সুবাদে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ও তাঁকে বিশেষভাবে সম্মান জানিয়েছে। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। শৈশবে তিনি ‘বাল চড়কা সঙ্ঘ’ প্রতিষ্ঠা করেন। পরে, ১৯৩০ সালে অসহযোগ আন্দোলনের সময় কংগ্রেসকে সাহায্য করার জন্য ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের নিয়ে তিনি গড়ে তোলেন ‘বানর সেনা’। তাঁকে কারাবন্দী করা হয় ১৯৪২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। ১৯৪৭ সালে মহাত্মা গান্ধীর নির্দেশে তিনি দিল্লির দাঙ্গা বিধ্বস্ত এলাকাগুলিতে কাজ করেছিলেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সে সময়কার প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর রয়েছে অসামান্য অবদান। তিনি শুধু এক কোটি বাংলাদেশীকে আশ্রয় ও খাওয়া-পরার ব্যবস্থাই করেননি, মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য প্রশিক্ষণেরও ব্যবস্থা করেন। আর বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক বিশ্বের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা চালিয়েছেন। এমনকি মার্কিন রক্তচক্ষুর বিপরীতে এক অনন্য অবস্থানও নেন তিনি। ১৯৯৯ সালে বিবিসি আয়োজিত এক জনমত জরিপে ইন্দিরা গান্ধী শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ নারী নির্বাচিত হন। ১৯৮৪ সালের আজকের দিনে ভারতের রাজধানী দিল্লীতে আততায়ীর গুলিতে নিহত হন শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী। আজ তাঁর ৩১তম মৃত্যুবার্ষীকী। ভারতের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুবার্ষীকীতে আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।
http://s3.amazonaws.com/somewherein/pictures/nurubrl/nurubrl-1446264285-aca7be3_xlarge.jpg
ইন্দিরা প্রিয়দর্শিনী গান্ধী ১৯১৭ সালের ১৯ নভেম্বর ব্রিটিশ ভারতের এলাহাবাদে প্রভাবশালী নেহরু পরিবারে জন্ম গ্রহণ করে এক রাজনৈতিক পরিমন্ডলে বেড়ে উঠেন। নেহেরু পরিবার সবসময়ই জড়িত ছিল রাজনীতিতে ৷ তার দাদা মতিলাল নেহরু একজন প্রথম সারির কংগ্রেসী নেতা ছিলেন। যার কারণে ছোটবেলা থেকেই বাপ-দাদার রাজনৈতিক মতাদর্শের দিকে ঝুঁকে পড়েন ইন্দিরা গান্ধী। ইন্দিরা গান্ধী তার শক্তির পরিচয়ের বহিপ্রকাশের সাহস প্রথম জীবনেই সঞ্চয় করেছিলেন ৷ তার বয়স যখন মাত্র চার তখনই তাঁর বাবা এবং তাঁর দাদা কারাবন্দি হন ৷ কারণ তারা ছিলেন ব্রিটিশ বিরোধী ৷ ১৯৩৬ সালে ইন্দিরার মা কমলা নেহেরু পরলোক গমন করেন ৷ ইন্দিরা হয়ে পড়েন ভীষণভাবে একা ৷ ইন্দিরা গুটিয়ে যান নিজের মধ্যে ৷ একা থাকতেন, বেশির ভাগ সময়ই একা কাটাতেন। ১৯৪১ সালে অক্সফোর্ড থেকে ফিরে এসে ইন্দিরা গান্ধী পিতার সাথে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। ইংল্যান্ডে পড়াশোনা করার সময়ই ইন্দিরার পরিচয় পার্সি ফিরোজ গান্ধীর সঙ্গে। ১৯৩৮ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ইন্দিরা গান্ধী ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে যোগ দেন ৷১৯৪২ সালে তিনি বিয়ে করেন সাংবাদিক ফিরোজ গান্ধীকে৷ বিয়ের কিছুদিন পরই তাঁরা কারাবন্দী হন। এলাহাবাদের নৈনি কারাগারে তাঁরা ৮ মাস বন্দী থাকেন ৷ ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীনতা লাভ করে ব্রিটিশ শাসন থেকে ৷সে বছরই ইন্দিরার বাবা জওহরলাল নেহেরু স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হন। তখন থেকেই ইন্দিরা প্রায় ছায়ার মত বাবার পাশে পাশে থাকতেন ৷১৯৫০ সাল থেকে অপেশাগত ভাবে জওহরলাল নেহরুর অফিস সহকারীর কাজ করে আসছিলেন তিনি। ১৯৫৯ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে তথ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেন ৷১৯৬৪ সালের জওহরলাল নেহরুর মৃত্যুর পর ভারতের রাষ্ট্রপতি তাকে রাজ্যসভার সদস্য হিসেবে নিয়োগ দেন। তখন ইন্দিরা লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর মন্ত্রীসভায় তথ্য ও প্রচার মন্ত্রনালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৬ সালে প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর মৃত্যুর পর ইন্দিরা গান্ধী ভারতের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বচিত হন ৷
http://s3.amazonaws.com/somewherein/pictures/nurubrl/nurubrl-1446264308-ab89c5d_xlarge.jpg
১৯৭১ সালে সাধারণ নির্বাচনে বিপুল সংখ্যক ভোট পেয়ে ইন্দিরা গান্ধী দ্বিতীয় বারের মত প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন ৷১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে প্রতিবেশী হিসেবে প্রতিবাদী অথচ নিরস্ত্র বাঙালিকে সাহস জোগান তিনি। ছাত্র, শিক্ষক, কৃষক, যুবকদের গেরিলা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয় ভারতে। এর ফলেই অনেকটা ঘুরে দাঁড়ানো সহজ হয় বাংলাদেশীদের। মুক্তিযোদ্ধারা ভারত থেকে প্রশিক্ষণ পেয়ে সশস্ত্র অবস্থায় বাংলাদেশে প্রবেশ করে একের পর এক গেরিলা যুদ্ধে পরাস্ত করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে। বাংলাদেশকে সহযোগিতার জন্য ভারতের বিরুদ্ধেও পাকিস্তান যুদ্ধ ঘোষণা করলে সেখানেও এক হয়ে পকিস্তানের বিরুদ্ধে তিনি যুদ্ধের নির্দেশ দেন। বাংলাদেশের লাখ লাখ শরণার্থীকে সেবাযত্ন করায় ইন্দিরা গান্ধীর এ কাজকে যীশু খৃষ্টের কাজের সঙ্গে তুলনা করেছেন নোবেলজয়ী মাদার তেরেসা। 'তারা সবাই ঈশ্বরের সন্তান' শীর্ষক একটি বইয়ে তেরেসা এ বিষয়টি উল্লেখ করেন। কর্মজীবনে বহু কৃতিত্ব ও সাফল্যের নজির রেখে গেছেন শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী। ১৯৭২ সালে তাঁকে ভারতরত্ন ঘোষণা করা হয়। বাংলাদেশের মুক্তি যুদ্ধে তাঁর বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিতে তিনি লাভ করেন মেক্সিকান অ্যাকাডেমি পুরস্কার (১৯৭২)। ১৯৭৩ সালে তাঁকে দেওয়া হয় এফ .এ.ও.-র দ্বিতীয় বার্ষিক পদক। ১৯৭৬ সালে লাভ করেন নাগরী প্রচারিনী সভার সাহিত্য বাচস্পতি (হিন্দি) পুরস্কার। ১৯৫৩ সালে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মাদার্স অ্যাওয়ার্ড-এ সম্মানিত হন। কূটনীতিতে বিচক্ষণতার জন্য ইতালির আইবেলা ডি এস্ট পুরস্কারে তিনি সম্মানিত হন পরবর্তীকালে। এছাড়াও লাভ করেন ইয়েল ইউনিভার্সিটির হোল্যান্ড মেমোরিয়াল প্রাইজ। ফ্রেঞ্চ ইনস্টিটিউট অফ পাবলিক ওপিনিয়ন-এর এক জনমত সমীক্ষার নিরিখে ১৯৬৭ এবং ১৯৬৮ সালে পরপর দু’বার ‘বিশ্বের সেরা মহিলা’ খেতাবে সম্মানিত হন। একইভাবে ১৯৭১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গ্যালাপ পোল সার্ভের বিচারে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি প্রশংসিত ব্যক্তি হিসেবে তাঁকে সম্মান জানানো হয়। এছাড়াও একই বছর প্রাণী ও জীবজন্তুর প্রতি তাঁর বিশেষ যত্নের স্বীকৃতিতে আর্জেন্টাইন সোসাইটি তাঁকে বিশেষ সম্মানে ভূষিত করেন।
http://s3.amazonaws.com/somewherein/pictures/nurubrl/nurubrl-1446264341-5536504_xlarge.jpg
একটানা ১৯৬৬ সাল থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ইন্দিরা গান্ধী ৷ ১৯৭৫ সালে তিনি দেশে শান্তি এবং শৃংখলা ফিরিয়ে আনতে বিশেষ জরুরী আইন জারী করেন ৷ এ জন্য সমালোচিত হন ইন্দিরা গান্ধী এরপর ১৯৮০ সালে চতুর্থবারের মত নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে প্রধান মন্ত্রী হন ইন্দিরা গান্ধী ৷ সব মিলিয়ে প্রায় ১৫ বছর ভারত শাসন করেছেন ইন্দিরা গান্ধী। তুখোর রাজনীতিবিদ ইন্দিরা গান্ধী প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গেছেন ভারতে ৷ব্যক্তিগত জীবনে অত্যন্ততশৌখিন মানুষ ছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। ইন্দিরা গান্ধী জন্ম দেন দুটি পুত্র সন্তানের ৷ সঞ্জয় এবং রাজীব ৷তার ছেলে রাজীব গান্ধী ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। পুত্র সঞ্জয় গান্ধী বিমান দুর্ঘটনায় মারা যান এবং পুত্র রাজিব গান্ধী এক আত্মঘাতী বোমা হামলায় মারা যান। দুই পুত্র বধু মানেকা গান্ধী ও সোনিয়া গান্ধী বেঁচে আছেন।
http://s3.amazonaws.com/somewherein/pictures/nurubrl/nurubrl-1446264361-e3c763c_xlarge.jpg
(ইন্দিরা গান্ধী স্মৃতিস্থল; ১, সফদরজঙ্গ রোড, নতুন দিল্লি। এখানেই নিহত হয়েছিলেন ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী)
১৯৮০ সালে ভারতে বিচ্ছিন্নতাবাদী শিখদের একটি আন্দোলন দানা বাঁধে। গান্ধী তা দমন করার চেষ্টা করেন। ১৯৮৪ সালের জুন মাসে ইন্দিরা গান্ধীর আদেশে শিখদের পবিত্র ধর্মাশালা স্বর্ণ মন্দিরে ভারতীয় সেনা হানা দেয়। তার খেসারত ইন্দিরা গান্ধী দেন সে বছরই ৩১শে অক্টোবর। অপারেশন ব্লু স্টার না্মে এই অপারেশন চলাকালীন স্বর্ণমন্দির নামে পরিচিত শিখদের সর্বোচ্চ তীর্থ হরমন্দির সাহিবে সেনা অভিযানের প্রতিশোধকল্পে শ্রীমতী গান্ধীর নিজের দুই শিখ দেহরক্ষী সৎবন্ত সিংহ ও বিয়ন্ত সিংহ তাঁর জীবন প্রদীপ নিভিয়ে দেয় ৷ এই ঘটনা ভারতের ইতিহাসে ইন্দিরা গান্ধী হত্যাকাণ্ড নামে পরিচিত। মৃত্যুর ঠিক এক দিন আগে ওড়িশায় শেষ ভাষণে ইন্দিরা গান্ধী বলেন, "আজ আমি বেঁচে আছি, কালকে নাও থাকতে পারি। শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত আমি দেশের জন্য কাজ করব এবং আমি মারা গেলে আমার রক্তের প্রতিটি ফোঁটা ভারতকে শক্তিশালী করবে ও একটি অখণ্ড ভারতকে বাঁচিয়ে রাখবে"।
http://s3.amazonaws.com/somewherein/pictures/nurubrl/nurubrl-1446264387-34bbfd7_xlarge.jpg
শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর আগ্রহ ছিল বিভিন্ন বিষয়ে। জীবনকে তিনি দেখতেন একটি সুসংহত চলমান প্রক্রিয়া হিসেবে যেখানে সমস্ত দিক এবং বিষয় পৃথক পৃথকভাবে না থেকে সামগ্রিক হয়ে উঠত। জীবনকে তিনি কখনই বিচ্ছিন্ন কোন কিছু হিসেবে কল্পনা করতেন না, বরং তিনি জীবনকে দেখতেন বহুবিধ বিষয়ের এক সমষ্টি হিসেবে। হাজারো কর্মব্যস্ততার মধ্যেও শ্রীমতী গান্ধী লিখে গেছেন বেশ কিছু গ্রন্থ। ‘দ্য ইয়ার্স অফ চ্যালেঞ্জ’ (১৯৬৬-৬৯), ‘দ্য ইয়ার্স অফ এনডেভার’ (১৯৬৯-৭২), ‘ইন্ডিয়া (লন্ডন)’ (১৯৭৫) এবং ‘ইন্ডে (লুসানে)’ (১৯৭৯) – হল এমনই কয়েকটি সঙ্কলন গ্রন্থ যেখানে তাঁর বহু লেখা ও বিভিন্ন সময়ে প্রদত্ত ভাষণ স্থান পেয়েছে। আজ এই মহিয়সী না্রীর ৩১তম মৃত্যুবার্ষীকী। মৃত্যু দিনে ভারত তথা বিশ্বের রাজনৈতিক অঙ্গন শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীকে স্মরণ করছে গভীর শ্রদ্ধায়।