টপিকঃ গহীন বান্দরবান: পর্ব-১৫ (শেষ পর্ব)

পর্ব-১৪ এর লিংক

পর্ব-১৫ঃ যাত্রা শেষের গল্প

এতক্ষণ নীল আকাশ দেখছিলাম কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই এক জায়গায় দেখলাম ঘন মেঘ করেছে। ওমা কিছুক্ষণ পর বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। অথচ আমাদের এখানে আকাশ একদম ফকফকা। প্রকৃতির এ খেয়াল বড়ই বিচিত্র। আমরা মাত্র আধা ঘন্টা সময়ে থানচি পোঁছে গিয়েছি কিন্তু এ স্বল্প সময়ে প্রকৃতির বিচিত্রতা আমাদের মোহিত করে দিয়েছিল।

https://c1.staticflickr.com/1/381/18987199052_c2ca061338_b.jpg
দূরে পাহাড়ে বৃষ্টি হচ্ছে

https://c1.staticflickr.com/1/364/18966408576_d4f352c11d_b.jpg
মেঘে ঢাকা থানচি ঘাট

থানচি পৌঁছে বাসার সবাইকে ফোন করে জানিয়ে দিলাম আমরা ভালো আছি, গত দুইদিন নেটওয়ার্কের বাইরে থাকার জন্য কেউই আমাদের ফোনে পায়নি। আমাদের গ্রুপের বাকী সদস্য যারা বান্দরবান শহরে আছে তাদেরও জানিয়ে দিলাম আমরা ফিরছি। সবাই যাতে বাস কাউন্টারে সময়মত এসে উপস্থিত হয়।

https://c2.staticflickr.com/4/3877/18966425116_93e95b1cfc_b.jpg
থানচি ব্রিজ থেকে তোলা নদী, এ পথ ধরেই আমরা রিমাক্রি গিয়েছিলাম

https://c1.staticflickr.com/1/286/18806475239_214cb7a639_b.jpg
থানচি ব্রিজ, পেছনে মনে হয় জলরঙ্গে আঁকা মেঘ

থানচি পৌঁছে নতুন সমস্যা দেখা দিল। বান্দরবান শহরে যাবার জন্য আমরা কোন গাড়ি খুঁজে পাচ্ছিলাম না। যতগুলো চাঁদের গাড়ি আছে সব আগে থেকেই রিজার্ভ করা, কোনটাই খালি নেই। একটা বাস আছে যেটা সম্ভবত তিনটা কি চারটার মধ্যে ছাড়বে কিন্তু ওখানে গিয়ে দেখলাম কোন টিকেট নেই। বাসের কন্ডাক্টরকে জিজ্ঞাসা করলাম, ও বললো একটা ব্যবস্থা করে দিবে। হয় আমাদের দাঁড়িয়ে যেতে হবে অথবা বাসের ছাদে উঠতে হবে।

https://c1.staticflickr.com/1/494/18805012120_6862f00563_b.jpg
থানচি ব্রীজের ওপারে পাহাড়ে বৃষ্টি হচ্ছে

বাইরে তখন তুমুল বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে, আমরা দুপুরের খাবার খেয়ে নিলাম আর গাইডের সব টাকা পরিশোধ করে দিলাম। অনেকক্ষণ পর বৃষ্টি থামলো। আমরা এর মধ্যে আরো কয়েকবার চেষ্টা করলাম কোন চাঁদের গাড়ী পাওয়া যায় কিনা, কারন বাস যদি চারটার সময় ছাড়ে তাহলে বান্দরবান পৌঁছে আমাদের ঢাকা যাবার বাস মিস হয়ে যাবার সম্ভাবনা আছে। কিন্তু বিধিবাম, আমরা কোন চাঁদের গাড়ি ঠিক করতে পারলাম না, বাসের জন্য অপেক্ষা করতে হলো।

https://c1.staticflickr.com/1/439/18806498919_c8babe0436_b.jpg
থানচি থেকে বান্দরবান শহরে যাবার রাস্তা

অবশেষে আমরা বাসে একটা বসার সিট পেলাম। বাকি দুইজনকে দাঁড়িয়ে যেতে হবে। নওশাদ আর সাইফুল ভাই বললো আমাকে সবগুলো ব্যাগ নিয়ে সিটে বসতে আর তারা দুইজন বাসের ছাদে করে যাবে। বাসে লোকজন ভরপুর ছিল তাই ঠিকমত ব্যাগ রাখার জায়গা ছিলনা। কোনরকম আমাদের সিটের পাশে রেখে বাকি দুইজন ছাদে উঠে গেল। আমার পাশে বিজিবির এক সদস্য ছিল, তাকে জানালার পাশের সিট ছেড়ে দিতে হলো। উনি একটু মোটাসোঁটা হবার কারনে আমার সিটে বসতে কষ্ট হয়ে যাচ্ছিল, তাও তো বাকি দুইজনের চেয়ে অনেক সুবিধায় আছি।

বাস যখন চলতে শুরু করেছে তখন টিপটিপ বৃষ্টি ঝরছিল। আমাদের কাছে প্লাস্টিকের কিছু বড় বড় ব্যাগ কেনা ছিল, কন্ডাক্টরকে দিয়ে দুইটা ব্যাগ উপরে পাঠিয়ে দিলাম যাতে অন্তত বৃষ্টিতে না ভেজে। প্রচন্ড পরিমানে ঠান্ডা বাতাস বইছিল।

আমি জানালা দিয়ে বাইরে খুব ভালো করে দেখতে পারছিলাম না, কিন্তু যতটুকু দেখছিলাম তাতে মনে হচ্ছে পুরো বান্দরবানটা একটা স্বর্গ। সুর্যের আস্তে করে নেমে যাচ্ছে, কোথাও কোথাও বৃষ্টি। পুরো আকাশে মেঘ গুলো যেন ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। একপাশে বড় একটা রংধনু উঠেছে। আমি না পারছিলাম ভালো করে দেখতে না পারছিলাম ছবি তুলতে। কিন্তু অন্যান্য সিটে জানালার পাশে থাকা লোকজন একটু পরপর বিস্ময় প্রকাশ করছিল চারপাশ দেখে। আমি জানালার কাঁচের ভেতের থেকেই ছবি তোলার চেষ্টা করলাম, কিন্তু খুব একটা সুবিধা করতে পারলাম না। পাশে বসে থাকা বিজিবির সদস্য তখন ঘুমাচ্ছে, আমি অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম।

https://c2.staticflickr.com/4/3823/18806493669_293c863acc_b.jpg
জানালার কাঁচের উপর দিয়ে তোলা ছবি

নওশাদ এর কাছ থেকে পরে শুনেছিলাম, থানচি থেকে বান্দরবান শহরে যাবার এই ছাদ জার্নি তার জীবনের একটা অবিস্মরনীয় ঘটনা। বাসের ছাদ থেকে পুরো বান্দরবান কে এত কাছ থেকে দেখা যায় এটা সে আগে কল্পনাও করতে পারেনি। আর মুহুর্তেই আলোর পরিবর্তন, রংধনু, পাহাড়ের মাঝে মাঝে মেঘ ভেসে যাওয়া, এমনকি এখান থেকে নাকি কক্সবাজারের বিচও দেখতে পাওয়া যায়। সবচাইতে সুন্দর দৃশ্য হলো সুর্য্য ডুবে যাবার সময়টা, পুরো আকাশ হলুদ হয়ে একসময় লাল রঙ এ ধারন করে, তারপর আস্তে করে পাহাড়ের পেছনে ডুব দেয়, যে এ দৃশ্য না দেখেছে সে কখনোই চিন্তা করতে পারবে নে কত সুন্দর হতে পারে এ সময়টা। শুনে আমার এত হিংসে হচ্ছিল যে বলার মত না।

কিন্তু রাতের অন্ধকারে বাসের ছাদে থেকে সময় পার করা কত কঠিন একটা কাজ সেটাও বলতে ভুললো না, খাড়া রাস্তায় যখন বাস বাঁক নেয় মনে হয় তখনি বাস খাদে পড়ে যাবে, আর বৃষ্টির সাথে সাথে প্রচন্ড পরিমান বাতাস মনে হচ্ছিল সবকিছু উড়িয়ে নিয়ে যাবে, কোন রকমে ওরা প্লাস্টিকের ব্যাগ গায়ে রেখে দিয়েছে। রোমাঞ্চ ভরা মুহুর্তটা আমি অনুভব করতে পারিনি।

ভালোয় ভালোয় আমরা বান্দরবান শহরে সময়মতো পৌঁছে গিয়েছিলাম, বাস যেখানে থামে তার সাথেই একটা হোটেল কয়েকঘন্টার জন্য ভাড়া করে আমরা গোসল সেরে ফ্রেশ হয়ে নিলাম। তারপর খাবার দাবার শেষ করে সবাই মিলে বাস স্ট্যান্ডে একসাথ হয়েছিলাম। আমাদের অভিজ্ঞতার কথা শুনে গ্রুপের বাকী লোকজনের আফসোসের সীমা ছিলনা। তবে এ কয়দিন ওরাও নীলাচল, নীলগিরী আর মেঘলা দেখে খুশী।

আমাদের নিয়ে বাস রওনা দিল ঢাকার উদ্দ্যেশ্যে, সবার চোখে প্রচন্ড পরিমান ঘুম। কিন্তু আমি জানি কেউই ঘুমাচ্ছে না, সবার চোখেই গত চারদিনে ঘটে যাওয়া অসংখ্য স্মৃতি স্বপ্ন হয়ে চোখে জড়িয়ে যাচ্ছে।

আমরা স্বপ্ন কাতর মানুষ, স্বপ্ন দেখেই তো বাঁচবো!

(সমাপ্ত)

You are the one who thinks that i didn't get the point, so do i think of you...what a coincidence!!

Re: গহীন বান্দরবান: পর্ব-১৫ (শেষ পর্ব)

ওয়াও  dream dream কি সুন্দর ছবি কিন্তু শেষ হয়ে গেল যে  sad

এক টুনিতে টুনটুনালো সাত রানির নাক কাঁটালো

Re: গহীন বান্দরবান: পর্ব-১৫ (শেষ পর্ব)

থানচি থেকে বান্দরবান শহরে যাবার রাস্তার ছবিটা সব চেয়ে সুন্দর লেগেছে।
পুরো সিরিজটিই অনবদ্য লিখেছে। +

এখনো অনেক অজানা ভাষার অচেনা শব্দের মত এই পৃথিবীর অনেক কিছুই অজানা-অচেনা রয়ে গেছে!! পৃথিবীতে কত অপূর্ব রহস্য লুকিয়ে আছে- যারা দেখতে চায় তাদের নিমন্ত্রণ।

Re: গহীন বান্দরবান: পর্ব-১৫ (শেষ পর্ব)

অসাধারণ একটা ভ্রমণকাহিনী শেষ হয়ে গেল sad
আবার কবে ঘুরতে যাবেন? big_smile

ইট-কাঠ পাথরের মুখোশের আড়ালে,
বাধা ছিল মন কিছু স্বার্থের মায়াজালে...

Re: গহীন বান্দরবান: পর্ব-১৫ (শেষ পর্ব)

RubaiyaNasreen(Mily) লিখেছেন:

ওয়াও  dream dream কি সুন্দর ছবি কিন্তু শেষ হয়ে গেল যে  sad

পুরো সিরিজটায় সাথে থাকার জন্য অনেক ধন্যবাদ।

মরুভূমির জলদস্যু লিখেছেন:

থানচি থেকে বান্দরবান শহরে যাবার রাস্তার ছবিটা সব চেয়ে সুন্দর লেগেছে।
পুরো সিরিজটিই অনবদ্য লিখেছে। +

মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ, জানালার পাশে বসলে হয়তো আরো মারাত্মক ছবি তুলতে ও শেয়ার করতে পারতাম।

ছায়ামানব লিখেছেন:

অসাধারণ একটা ভ্রমণকাহিনী শেষ হয়ে গেল sad
আবার কবে ঘুরতে যাবেন? big_smile

আবার কবে ঘুরতে যাব বলতে পারছি না, পুরো সিরিজে উৎসাহ দিয়ে মন্তব্য করার জন্য ধন্যবাদ।

You are the one who thinks that i didn't get the point, so do i think of you...what a coincidence!!

Re: গহীন বান্দরবান: পর্ব-১৫ (শেষ পর্ব)

একেবারে সাহিত্যিকদের মত সুন্দর করে লিখেছিস  thumbs_up

IMDb; Phone: Huawei Y9 (2018); PC: Windows 10 Pro 64-bit

Re: গহীন বান্দরবান: পর্ব-১৫ (শেষ পর্ব)

সুন্দর একটা সিরিজ শেষ হয়ে গেলো। লেখা ও ছবি দুটোই সুন্দর ছিলো । চমৎকার বর্ণনা।
আপনার সঙ্গে বান্দরবান ভ্রমণ উপভোগ করেছি। smile thumbs_up

আল্লাহ আমাকে কবূল করুন

Re: গহীন বান্দরবান: পর্ব-১৫ (শেষ পর্ব)

বোরহান লিখেছেন:

একেবারে সাহিত্যিকদের মত সুন্দর করে লিখেছিস  thumbs_up

হা হা, সাহিত্যিক!! মনে করিয়ে দিলি!!
মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ।

জারাহ লিখেছেন:

সুন্দর একটা সিরিজ শেষ হয়ে গেলো। লেখা ও ছবি দুটোই সুন্দর ছিলো । চমৎকার বর্ণনা।
আপনার সঙ্গে বান্দরবান ভ্রমণ উপভোগ করেছি। smile thumbs_up

আপনাকেও ধন্যবাদ সাথে থাকার জন্য।

You are the one who thinks that i didn't get the point, so do i think of you...what a coincidence!!

Re: গহীন বান্দরবান: পর্ব-১৫ (শেষ পর্ব)

অসাধারন সব বর্ণনা আর সুন্দর সব ছবির মাধ্যমে খুব সুন্দর একটা ভ্রমন সিরিজ পার করলাম।দেখতে দেখতে যে কিভাবে সিরিজটা শেষ হয়ে গেল বুঝতেই পারলাম না। আপনার প্রতিটি বর্ণনার এত সুন্দর করে আমাদের কাছে উপস্থাপন করেছেন যে আমাদের ভ্রমনপিপাসা আরও কয়েকগুন বাড়িয়ে দিয়েছেন।আপনাকে ধন্যবাদ যে এত সুন্দর একটা ভ্রমন সিরিজ আমাদের উপহার দিয়েছেন।আশায় থাকলাম নতুন আর ও কোন সিরিজের জন্য smile

অন্যের কাছ থেকে যে ব্যবহার প্রত্যশা করেন আগে নিজে সে আচরন করুন।

লেখাটি CC by-nc 3.0 এর অধীনে প্রকাশিত

১০

Re: গহীন বান্দরবান: পর্ব-১৫ (শেষ পর্ব)

সেজান লিখেছেন:

আমাদের ভ্রমনপিপাসা আরও কয়েকগুন বাড়িয়ে দিয়েছেন

সেজান ভাই, আপনার আর বোরহানের পিপাসা দেখে পুলকিত হলাম, খুব শীঘ্রই বের হয়ে পড়ুন আর আমাদের ভ্রমন পিপাসাও বাড়িয়ে দিন।  tongue tongue

এনিওয়ে, আপনি আসলেই অনেক সুন্দর করে কমেন্ট করেন, অনেক ধন্যবাদ এত সুন্দর সুন্দর কমেন্ট করার জন্য আর পুরো সিরিজ জুড়ে সাথে থাকার জন্য।

You are the one who thinks that i didn't get the point, so do i think of you...what a coincidence!!

১১

Re: গহীন বান্দরবান: পর্ব-১৫ (শেষ পর্ব)

অনেক গুলো পর্ব একসাথে পড়লাম।
দারুন হয়েছে।

১২

Re: গহীন বান্দরবান: পর্ব-১৫ (শেষ পর্ব)

অস্থির সব ছবি তুলেছেন,  আমার তো এখনি যেতে ইচ্ছা করছে + smile

বর্তমান স্বাক্ষর দিলাম
[img]http://i.imgur.com/bF7Lr.jpg[/img]  ফেসবুকে আমি
https://www.facebook.com/rafik.topu?ref=tn_tnmn

১৩

Re: গহীন বান্দরবান: পর্ব-১৫ (শেষ পর্ব)

সদস্য_১ এবং তপু ভাইকে মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ।

You are the one who thinks that i didn't get the point, so do i think of you...what a coincidence!!