টপিকঃ গহীন বান্দরবান: পর্ব-১২

পর্ব-১১ এর লিংক

পর্ব -১২ঃ কর্ণ ঝর্না/ ক্রাইক্রিয়ং ঝর্না

ঠুসাই পাড়াতে ফিরে এসে আমাদের সেই আগের মত অবস্থা। সবাই গাছের ছায়ার নিচে অনেকক্ষণ বসে ছিলাম। গাইডকে দিয়ে দোকান থেকে ট্যাং এর মত কিছু একটা ছিল সেগুলোর কয়েক প্যাকেট কিনে নিয়ে আসলাম। আমাদের সাথে অনেকগুলো স্যালাইন এর প্যাকেট ছিল কিন্তু সেগুলো নাফাখুম থেকে ফেরত যাওয়া গ্রুপের অন্য সদস্যদের ব্যাগের মধ্যে থাকায় আমরা এখানে নিয়ে আসতে পারিনি। পাহাড়ী ঢলের ঠান্ডা পানিতে শরবত খেয়ে পুরো শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।

আমরা সবাই গোসল সেরে নিলাম। মাঝখানে গাইড এসে জানালো যে একটা হরিন শিকার করা হয়েছে, ইচ্ছে করলে আমরা হরিনের মাংস খেতে পারি। কিন্তু ঠিকমত জবাই না করার কারনে আমাদের কেউই হরিনের মাংস খেতে রাজী হলোনা। আমাদের আগের দিনের কেনা বনমুরগী, সাথে ডিম ডাল আর সবজি দিয়েই খাবার সেরে নিলাম, তারপর বিশাল এক ঘুম।

আমরা যে ঘরে ছিলাম, সেঘরের এক ছেলের সাথে কথা বলে জানা গেলো এখানে আশে পাশে আরেকটা ঝর্না আছে যেটা একটু অপরিচিত, যাবার রাস্তাটা ভালো নয় বলে কেউ সেখানে একটা যায়না। জায়গার নাম কর্ণ ঝর্না, ওদের ভাষায় বলে ক্রাইক্রিয়ং ঝর্না। এ ঝর্না নাকি অনেকগুলো স্তরে স্তরে মিলে বেশ উঁচু হয়ে গেছে, আর ঠুসাই পাড়ার পানির সাপ্লাইয়ের উৎপত্তিস্থল এই কর্ণ ঝর্নার মুখ। ওই ছেলেকে সাথে নিয়ে আমরা রওনা দিলাম কর্ণ ঝর্ণা দেখার জন্য। আকাশের কোনে মেঘ জমেছে, বৃষ্টি হবে মনে হচ্ছে।

http://farm1.staticflickr.com/448/18707417492_4236006fa4_b.jpg
আকাশে মেঘ করেছে

গাইড বললো, একটা শর্টকার্ট রাস্তা আছে, একটু খারাপ রাস্তা কিন্তু এখান দিয়ে না গেলে সন্ধার আগে ফেরত আসা যাবেনা। আমাদের কোন রাস্তা তেই সমস্যা ছিলনা। আসল রাস্তা থেকে যখন কর্ণ ঝর্নায় যাবার রাস্তায় উঠলাম, মনে হলো গুহার মধ্যে প্রবেশ করেছি। আকাশে মেঘ থাকার কারনে রাস্তার ভেতরে বেশ অন্ধকার, আর লোকজন এ রাস্তায় চলাচল করেনা বলে ঝোপঝাড়ে পুরো রাস্তা ভরপুর।

আসলে এটা রাস্তা না, ঝর্না থেকে পানির স্রোত যেখান দিয়ে বয়ে যাচ্ছে সেটার পাশ দিয়েই আমরা হেঁটে যাচ্ছি। গাইড সাথে করে দা নিয়ে আসছিল, সে সামনে থেকে ঝোপঝাড় কেটে দিয়ে যাবার রাস্তা করে দিচ্ছিল, পুরোই গা ছম ছম অবস্থা যেন আমরা আলিফ লায়লার কোণ এক রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি। আর পুরো রাস্তা পিচ্ছিল পাথর আর কাদায় ভর্তি, ঠিকমত হাঁটাও যাচ্ছেনা।

http://farm1.staticflickr.com/471/18091609533_221df8733f_b.jpg
কর্ন ঝর্নায় যাবার রাস্তা, ফটো ক্রেডিটঃ সাইফুল ভাই

যতই সামনে যাচ্ছি ততই মনে হচ্ছে আমরা এক এক ধাপ পার হয়ে উপরে উঠছি। রাস্তায় পানি খুবই অল্প কিন্তু যেখানে পাথর আছে সেখানে মারাত্মক পিচ্ছিল, একটু অসাবধান হলেই পড়ে যাব। হাতের লাঠি ভালো করে ভর দিয়ে সামনে এগুচ্ছি আর যেখানে ঝোপঝাড় আছে সেখানে লতাপাতা ধরে এগুচ্ছি।

http://farm1.staticflickr.com/448/18714649411_2cf191f540_b.jpg
কর্ন ঝর্নায় যাবার রাস্তা, ফটো ক্রেডিটঃ সাইফুল ভাই

http://farm1.staticflickr.com/311/18524568960_6b4b910aa7_b.jpg
কর্ন ঝর্নায় যাবার রাস্তা, ফটো ক্রেডিটঃ সাইফুল ভাই

কর্ণ ঝর্নায় যখন পৌঁছালাম তখন গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে। পুরো ঝর্না মনে হচ্ছে থরে থরে সাজানো, কিন্তু ঝর্নায় একদম পানি নেই। অল্প অল্প পানি গড়িয়ে পড়ছে, পানি না থাকার কারনে ঝর্নার গায়ে ঝোপঝাড়ে ভরে গেছে। কিন্তু ঝর্নায় যখন ভরপুর পানি থাকে তখন তো এখানে নাকি আসাই যায়না। কোন ঝর্নায় গেলে এ এক কথা শুনতে শুনতে কান পঁচে যাচ্ছে। ঝর্না দেখতেই তো আসছি, শুকনো ঝর্না দেখে মনটাই খারাপ হয়ে যাবার জোগাড়। কিন্তু এখানে আসতে যে রাস্তার মাঝ দিয়ে আসতে হয়েছে সে এক্সপেরিয়েন্সটাই সব কিছু পুষিয়ে দিয়েছে।

http://farm1.staticflickr.com/530/18091597503_b7396ab635_b.jpg
কর্ণ ঝর্না

http://farm1.staticflickr.com/276/18091595653_103332cf9e_b.jpg
কর্ণ ঝর্না

সময় পার হয়ে যাচ্ছিল। রাত হলে পাহাড়ি রাস্তায় আমাদের চলাচল করা প্রায় অসম্ভব, আমরা তাই তাড়াতাড়ি ফিরে এলাম, যদিও পাড়ায় ফিরতে ফিরতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিল।

রাতে পাড়ায় আরেকটা ট্যুরিস্ট গ্রুপ এসেছিল। ১৫-২০ জনের বড় গ্রুপ। সবাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র। তারা ইতিমধ্যে অন্য রুট ধরে সাতভাইখুম এসেছে এবং সাতভাইখুম আসার জন্য তারা নাকি বাঁশ কেটে ভেলা বানিয়ে তারপর সাতভাইখুম পার হয়ে এসেছে। তাদের মুখে গল্প শুনে সাতভাইখুম না দেখতে পারায় আফসোস করছিলাম। পরের বারের বান্দরবান ভ্রমনের জন্য সাতভাইখুম তোলা রাখলাম।

গাইডের সাথে কথা বলে আগামী কাল সকালে ফেরার প্লান করলাম। সকাল বেলা উঠেই হাঁটা শুরু করবো। পদ্মার পার নামে একটা জায়গা আছে যেখান থেকে থানচি যাবার জন্য ইঞ্জিনের নৌকা পাওয়া যায়। পদ্মার পার কোনমতে যেতে পারলে সহজেই থানচি পৌঁছানো যাবে, সেখান থেকে বান্দরবান শহরে। আগামীকাল রাতের বেলা ফিরে যাবার জন্য আমাদের ইতিমধ্যেই টিকেট কাটা আছে।

গাইডকে জিজ্ঞাসা করলাম কতক্ষণ লাগবে পদ্মার পাড় যেতে? গাইড বললো খুব একটা বেশি সময় লাগবে না। এক থেকে দেড় ঘণ্টার মধ্যেই চলে যাওয়া যাবে। কয়টা পাহাড় হাঁটা লাগবে জিজ্ঞাসা করলে গাইড বললো একটা বড় পাহাড়, আর দুই একটা ছোট ছোট পাহাড়। পাহাড় গুলো পার হওয়া একদম সোজা, একদম খাড়া না। আমরা গাইডের কথা শুনে আঁতকে উঠলাম। পুর্ব অভিজ্ঞতা অনু্যায়ী গাইডের একটা পাহাড় মানে আমাদের কাল কয়েকটা পাহাড় পার হতে হবে, মনে হয় খবর আছে কালকে।

চলবে...

You are the one who thinks that i didn't get the point, so do i think of you...what a coincidence!!

Re: গহীন বান্দরবান: পর্ব-১২

faysal_2020 লিখেছেন:

পরের বারের বান্দরবান ভ্রমনের জন্য সাতভাইখুম তোলা রাখলাম।

আমাকে সাথে নিস কিন্তু।

IMDb; Phone: Huawei Y9 (2018); PC: Windows 10 Pro 64-bit

Re: গহীন বান্দরবান: পর্ব-১২

বোরহান লিখেছেন:
faysal_2020 লিখেছেন:

পরের বারের বান্দরবান ভ্রমনের জন্য সাতভাইখুম তোলা রাখলাম।

আমাকে সাথে নিস কিন্তু।


আমাকেও ......প্লিজ  smile

এক টুনিতে টুনটুনালো সাত রানির নাক কাঁটালো

Re: গহীন বান্দরবান: পর্ব-১২

কর্ণ ঝর্নাটা বেশ সুন্দর লাগলো।
এই দিকে যাওয়া অনেক ইচ্ছে ছিলো, কিন্তু মোটা শরীর নিয়ে যেতে ভয় পাচ্ছি। ৭/৮ দিনের একটা রিলেক্স প্লান করবো আগামীতে ঐদিকে।

এখনো অনেক অজানা ভাষার অচেনা শব্দের মত এই পৃথিবীর অনেক কিছুই অজানা-অচেনা রয়ে গেছে!! পৃথিবীতে কত অপূর্ব রহস্য লুকিয়ে আছে- যারা দেখতে চায় তাদের নিমন্ত্রণ।

Re: গহীন বান্দরবান: পর্ব-১২

পুরো সিরিজটাই যেন রোমান্চে ভরপুর।প্রতিটি টপিক যেন একে অপরকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে।অসাধারন লাগছে আপনার এই বান্দরবান ভ্রমনের সিরিজটি smile

অন্যের কাছ থেকে যে ব্যবহার প্রত্যশা করেন আগে নিজে সে আচরন করুন।

লেখাটি CC by-nc 3.0 এর অধীনে প্রকাশিত

Re: গহীন বান্দরবান: পর্ব-১২

ঈর্ষা জাগানিয়া টপিক!

দেশের ভেতরে এ্যাত দূর্দান্ত দর্শনীয় স্থান আছে সেটা আপনার এই সিরিজ না দেখলে অজানাই থেকে যেত। ভ্রমণের এই অভিজ্ঞতা লাভ করাতে আপনাকে অভিনন্দন। আর আমাদের সাথে চমৎকারভাবে শেয়ার করার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ।

পরিবেশ প্রকৌশলী'এর ওয়েবসাইট

লেখাটি CC by-nc-sa 3.0 এর অধীনে প্রকাশিত

Re: গহীন বান্দরবান: পর্ব-১২

RubaiyaNasreen(Mily) লিখেছেন:
বোরহান লিখেছেন:

আমাকে সাথে নিস কিন্তু।

আমাকেও ......প্লিজ  smile

মিলি আপু, পাহাড়ে উঠতে পারবেন তো? জান কয়লা হয়ে যায় একবারে।
বোরহান, এখন থেকে দৌড়ঝাঁপ শুরু কর, যেতে চাইলে শক্তি সঞ্চয় করে যেতে হবে।

মরুভূমির জলদস্যু লিখেছেন:

কর্ণ ঝর্নাটা বেশ সুন্দর লাগলো।
এই দিকে যাওয়া অনেক ইচ্ছে ছিলো, কিন্তু মোটা শরীর নিয়ে যেতে ভয় পাচ্ছি। ৭/৮ দিনের একটা রিলেক্স প্লান করবো আগামীতে ঐদিকে।

কর্ণ ঝর্না আসলেই সুন্দর, অনেক উঁচু। এতটাই যে ক্যামেরায় ঠিকমত আসেনা। যতদুর মনে পড়ে এখানে টোটাল আটটা স্টেপ উপর থেকে পানি পড়ে। শরীর নিয়ে চিন্তা করে লাভ নেই, ঘুরে আসুন। শুধু যাবার আগে আর পরে নিজের ওজন মেপে আমাদের সাথে শেয়ার করবেন  tongue

সেজান লিখেছেন:

পুরো সিরিজটাই যেন রোমান্চে ভরপুর।প্রতিটি টপিক যেন একে অপরকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে।অসাধারন লাগছে আপনার এই বান্দরবান ভ্রমনের সিরিজটি smile

সেজান ভাই এর মন্তব্য পেয়ে ফুলে ফেঁপে যাচ্ছি, ধন্যবাদ এত সুন্দর করে মন্তব্য করার জন্য।

পরিবেশ প্রকৌশলী লিখেছেন:

ঈর্ষা জাগানিয়া টপিক!

দেশের ভেতরে এ্যাত দূর্দান্ত দর্শনীয় স্থান আছে সেটা আপনার এই সিরিজ না দেখলে অজানাই থেকে যেত। ভ্রমণের এই অভিজ্ঞতা লাভ করাতে আপনাকে অভিনন্দন। আর আমাদের সাথে চমৎকারভাবে শেয়ার করার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ।

অনেক ধন্যবাদ, আপনার মন্তব্য পেয়ে আর লেখা পছন্দ করেছেন যেন বেশ ভালো লাগলো।

You are the one who thinks that i didn't get the point, so do i think of you...what a coincidence!!