টপিকঃ ডোল-- হারিয়ে যাওয়া শস্য সংরক্ষণের জন্য বাঁশের তৈরি বড় আকৃতির পাত্র বিশ

ডোল-- হারিয়ে যাওয়া শস্য সংরক্ষণের জন্য বাঁশের তৈরি বড় আকৃতির পাত্র বিশেষ



ঐতিহাসিক ভাবে আমরা ও আমাদের সংস্কৃতি অনেক পুরানো। আর আমাদের এই হাজার বছরের সংস্কৃতি পরিপূর্ণ শত শত উপাদান দিয়ে। সেই উপাদান গুলি দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের চোখের সামনে। আর কিছুদিন পর এই উপাদান গুলির নাম হয়তো কেও মনেও রাখবে না। হয়তো পুরানো কারো কারো স্মৃতিতে ঝলক দিয়ে যাবে হঠাৎ হঠাৎ। আসুন আজ জানি --- প্রায় হারিয়ে যাওয়া গ্রাম বাংলার জনজীবনের সঙ্গে এক সময় ওতপ্রত ভাবে জড়িয়ে থাকা একটি উপাদান ডোল সম্পর্কে। একে চট্টগ্রামের ভাষায় কাইজ্জ্যাও বলা হয়।



শুরুর কথাঃ ঐতিহ্যবাহী ধান মজুত রাখার পাত্র হিসাবে ব্যবহৃত বাঁশের তৈরি ডোল ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। ১৯৮০ দশকেও কৃষকের ঘরে ঘরে ডোলের চাহিদা ছিল প্রচুর। কৃষকদের মাথার ঘাম পায়ে ফেলে উৎপাদিত বার মাসের ধান বাঁশের তৈরি ডোলে মজুদ রাখা হতো। পোকামাকড় ও ইঁদুরের হাত থেকে ধানরক্ষার বিকল্প না থাকায় তৎকালীন সময়ে এখানকার হাজারো পরিবার ডোল তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করে আসত। দু’চারজন বড় গেরহস্থ ছাড়া ছোট-খাটো কৃষকরা এখন আর সেভাবে ধান মওজুদ রাখতেই পারেননা। খাওয়া-সাংসারিক সব খরচ মিটিয়ে যে সামান্য ধান থাকে তা কেউ বস্তায় কেউবা অন্য বাসন-কোসনেই রেখে দেন। ফলে এক সময়কার কৃষকদের অতি প্রয়োজনীয় ধানের ডোল এখন আর সচরাচর চোখেই পড়েনা। আর ৫-১০বছর পর হয়তোবা নতুন প্রজন্মের ছেলে-মেয়েরা হঠাৎ দেখে ধানের ডোল চিনতেই পারবে না। বাঁশ দিয়ে তৈরি ডোলে গেরহস্তরা সারা বছর ধান-চাল ও অন্যান্য শস্য সংরক্ষণ করতেন। যা ছিল গ্রামবাংলার প্রধান বৈশিষ্ট। কিন্তু কালক্রমে তা আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। ধানের মওসুমে ধান কেটে তা শুকিয়ে করা হতো ডোলজাত। এমন এক সময় ছিল, যখন ডোলভরা ধান বা চাল না থাকলে গ্রামবাংলার গেরহস্তরা সেই বাড়ীতে বিয়েই করাতেননা বা দিতেননা। এখন ও এসব কথা শুনা যায় মুরব্বিদের মূখে-মূখে। এমন কথাও শোনা যায় চোর-ডাকাতের ভয়ে অনেক গেরহস্ত ডোলের ধানের বা চাউলের মধ্যে টাকা-পয়সা এমনকি স্বর্ণালংকার পর্যন্ত লুকিয়ে রেখে সংরক্ষণ করতেন। যাতে চোর-ডাকাতরা টাকা-পয়সা বা অলংকার চুরি-ডাকাতি করে না নিতে পারে।

বাঁশ দিয়ে ধানের ডোল তৈরী করা হতো। অত্যন্ত মজবুত করে তৈরী করা হতো যাতে দীর্ঘদিন ব্যবহার করা যায়। এসব ধানের ডোল ২০-১০০মন, পর্যন্ত ধান মজুদ রাখা যায়। এসব ডোল তৈরি করা হয় গেরহস্তের প্রয়োজন অনুযায়ী। হাট-বাজারেও বিভিন্ন প্রকারের ডোল কেনা বেচা হয় এখনো কালে-ভদ্রে।

ডোল কি ভাবে তৈরি হয়ঃ

ডোল তৈরির মুল উপাদান হল বাঁশ। তবে অনেক এলাকায় বেতও ব্যাবহার করা হয়। বাঁশের লম্বা লম্বা পাট হতে তৈরি হয় ডোল। তবে অনেক আগে প্রাচীন মানুষেরা নলখাগড়া বা নরম লতা জাতীয় উদ্ভিদ হতে নিজেদের প্রয়োজনে তৈরি করত পাত্র বিশেষ। আর তারই ধারাবাহিকতায় ডোল। এই ডোল কৃষিজীবী গ্রামীণ পরিবারের একটি অপরিহার্য উপকরণ । কুটির শিল্পীরা বিশেষ দক্ষতার সঙ্গে বাঁশ-বেত দিয়ে এসব ডোল তৈরি করেন।ওজনের চাপে ডোল যাতে ভেঙ্গে না যায় সেজন্য চারপাশ চতুর্ভুজ আকৃতির ঘন ঘন বাঁশের ফ্রেম দিয়ে বেঁধে দেয়া হয়। ভাল বাঁশের তৈরি ডোল দশ বছরেও নষ্ট হয় না। একেকটি ডোলের ধারণ ক্ষমতা থাকে কমপক্ষে দশ থেকে সর্বোচ্চ ৫০ মণ পর্যন্ত। কিন্তু প্লাস্টিক ও টিন জাত পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধিসহ বাঁশ-বেতের সঙ্কট ও দুর্মূল্যের কারণে ডোল এর প্রয়োজন দেশের কৃষকদের কাছে জনপ্রিয়তা হারিয়েছে।

ব্যবহারঃ


কৃষকের উৎপাদিত কিংবা ক্রয় করা ধান-শস্য সংরক্ষণ করার কাজে বাঞ্ছিত অন্যতম বাঁশ দিয়ে তৈরি ডোল । এ ছাড়া আর এক কাজে এই ডোল ব্যবহার করা হত। আর তাকে বলা হত ডোল ফেলা । এটি হল ধান হতে চাল করার কাজে কৃষকরা বা গৃহস্থরা পুকুরে ধান ভেজাবার কাজে এই ডোল ব্যবহার করত। বড় বড় গৃহস্থরা সারা বছরের চাল করার জন্য ৫-৬ টা ডোলে করে ধান ভিজিয়ে তা হতে চাল করত। আজ সে সব স্মৃতি।

ক্রয় বিক্রয়ঃ

প্রতিটি ডোল বিক্রি হয় ৩০০-৩৪০ টাকায় । একটি ডোল তৈরিতে খরচ হয় ২৫০ থেকে ২৫৫ টাকা আর এ হিসাবে একটি ডোল বিক্রি করে ৫০ থেকে ৮৫ টাকা । এর মধ্যে রয়েছে যাতায়াত ও হাটের খাজনা খরচ। ফলে লাভের পরিমাণ খুবই কম।

যে ভাবে সংরক্ষণ করা হত ধান –চালঃ

কৃষকেরা সাধারণত ডোল ( সংরক্ষণের জন্য বাঁশের তৈরি বড় আকৃতির পাত্র বিশেষ) ব্যবহার করে। ধান-চাল বা অন্যান্য শস্য সংরক্ষণ করতে হলে নীচের কৌশলগুলো অনুসরণ করতে হবে।

১ম ধাপ------- গোবর ও মাটি একসাথে মিশিয়ে ডোলের ভেতরে ও বাইরে এমনভাবে লেপে দিয়ে রোদে শুকাতে হবে যাতে ডোলের ছিদ্র ভালো ভাবে বন্ধ হয়ে যায়। ডোলের শরীর বাতাস প্রুফ করা হয়।

২য় ধাপ-------- এর পর সেই ডোল কে ঘরের নির্দিষ্ট জায়গায় রেখে এরপর ভালো ভাবে রোদে শুকানো ধান-চাল বা অন্যান্য শস্য ঠান্ডা করে ডোল এ রাখতে হবে।

৩য় ধাপ ------- সবশেষে উপরের ডোলের গলা বা মুখ একটু খালি রেখে ডোলে রাখা ধান-চাল বা অন্যান্য শস্যের উপর প্লাস্টিক বা কাগজ দিয়ে ভাল মত আস্তরণ দিয়ে তার উপর অংশে ছাই অথবা শুকনা বালি দিয়ে কমপক্ষে ৩ ইঞ্চি পুরো করে ছিটিয়ে ঢেকে দিতে হবে।

উপকারিতা

১) বালির আবরণ থাকার ফলে গুদামজাত ধান-চাল বা অন্যান্য শস্য উপর পোকা ডিম পাড়তে পারে না, ফলে পোকার আক্রমণ থেকে ধান-চাল বা অন্যান্য শস্য রক্ষা করা যায়।

২) খুব কম খরচেই এ পদ্ধতি ব্যবহার করা যায়।

৩) এটি দূর্যোগমুক্ত এবং পরিবেশ বান্ধব একটি পদ্ধতি।

সচরাচর জিজ্ঞাসা

প্রশ্ন ১ : এই পদ্ধতি ব্যবহারে কি ধরনের উপকারিতা পাওয়া যায় ?

উত্তর : এ পদ্ধতি ব্যবহার করার ফলে বিভিন্ন পোকার আক্রমণ থেকে ডাল রক্ষা করা যায়।

প্রশ্ন ২ : এ পদ্ধতির কি পরিবেশের উপর কোন ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে ?

উত্তর : না, বরং এটি দূর্যোগমুক্ত এবং পরিবেশের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি পদ্ধতি।

>> তথ্যসূত্রঃ  বিভিন্ন পত্রিকা ও ড. মোঃ আলী আকবর, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনষ্টিটিউট, বাংলাদেশের সনাতন কৃষি প্রযুক্তি, জুলাই-১৯৯৭।

গোলাম মাওলা , ভাবুক, সাপাহার, নওগাঁ

Re: ডোল-- হারিয়ে যাওয়া শস্য সংরক্ষণের জন্য বাঁশের তৈরি বড় আকৃতির পাত্র বিশ

ঢাকা শহরে এরকম অনেক "ডোল" রাস্তাঘাটে ঘুরে বেড়ায়। tongue
যাহোক, অনেক জায়গায় একে "গোলা" নামে ডাকে। ঐযে কথা আছে না, গোয়ালভরা গরু আর গোলাভরা ধান!
ভাল লাগল আপনার গ্রামীন সংস্কৃতি বিষয়ক পোস্টগুলা। বেস্ট অফ লাক smile
(উপরের কথায় ভুড়িদার কেউ মাইন্ড করবেন না প্লিজ। ভুড়ি নিয়ে মজা করলে শুনেছি তারা খুশি হন tongue)

Re: ডোল-- হারিয়ে যাওয়া শস্য সংরক্ষণের জন্য বাঁশের তৈরি বড় আকৃতির পাত্র বিশ

"গোলা" হল সম্পূর্ণ আলাদা একটি বিষয়। এ নিয়ে পরে লিখব।

গোলাম মাওলা , ভাবুক, সাপাহার, নওগাঁ

Re: ডোল-- হারিয়ে যাওয়া শস্য সংরক্ষণের জন্য বাঁশের তৈরি বড় আকৃতির পাত্র বিশ

আমরা টাইল বলি

ধন্যবাদ শেয়ার করার জন্য

জাযাল্লাহু আন্না মুহাম্মাদান মাহুয়া আহলুহু......
এই মেঘ এই রোদ্দুর

Re: ডোল-- হারিয়ে যাওয়া শস্য সংরক্ষণের জন্য বাঁশের তৈরি বড় আকৃতির পাত্র বিশ

আপনার "হারিয়ে যাচ্ছে" টাইপের টপিকে একটা করে ঐ বস্তুর ছবি দিয়ে দিলে ভাল হত।

IMDb; Phone: Huawei Y9 (2018); PC: Windows 10 Pro 64-bit

Re: ডোল-- হারিয়ে যাওয়া শস্য সংরক্ষণের জন্য বাঁশের তৈরি বড় আকৃতির পাত্র বিশ

আপনার এই পোস্টটির মত করে ছবি সহ দিলে আরো ভালো হতো , টপিকটি ভালোই হয়েছে

"We want Justice for Adnan Tasin"

Re: ডোল-- হারিয়ে যাওয়া শস্য সংরক্ষণের জন্য বাঁশের তৈরি বড় আকৃতির পাত্র বিশ

বোরহান লিখেছেন:

আপনার "হারিয়ে যাচ্ছে" টাইপের টপিকে একটা করে ঐ বস্তুর ছবি দিয়ে দিলে ভাল হত।

http://www.news39.net/news/sites/default/files/styles/large/public/field/image/GOLA-PIC.JPG

Re: ডোল-- হারিয়ে যাওয়া শস্য সংরক্ষণের জন্য বাঁশের তৈরি বড় আকৃতির পাত্র বিশ

আমি ছবি এড করতে পারিনা এই ব্লগে। বার বার অনুরোধ করেও কেও আমাকে সে বিষয়ে বিস্তারিত বলে দিচ্ছে না।
আমি কি ভাবে এই ব্লগে আমার লিখায় ছবি এড করব কেও কি বলে দিবেন।

গোলাম মাওলা , ভাবুক, সাপাহার, নওগাঁ

Re: ডোল-- হারিয়ে যাওয়া শস্য সংরক্ষণের জন্য বাঁশের তৈরি বড় আকৃতির পাত্র বিশ

gmakas লিখেছেন:

আমি ছবি এড করতে পারিনা এই ব্লগে। বার বার অনুরোধ করেও কেও আমাকে সে বিষয়ে বিস্তারিত বলে দিচ্ছে না।
আমি কি ভাবে এই ব্লগে আমার লিখায় ছবি এড করব কেও কি বলে দিবেন।

প্রথমত, এটা ব্লগ নয়।
দ্বিতীয়ত, এই ফোরামে সরাসরি ছবি আপ্লোড করা যায় না।
যাইহোক, ছবিসহ পোস্ট করার জন্য এই টপিকের সাহায্য নিন smile
নতুন ফোরামিকরা ছবিসহ টপিক/পোস্ট করতে পারছেন না? টিপস দেখে নিন

Since I've got an Awesome signature, I don't have to write Awesome posts...

১০

Re: ডোল-- হারিয়ে যাওয়া শস্য সংরক্ষণের জন্য বাঁশের তৈরি বড় আকৃতির পাত্র বিশ

এবার ছবি দিতে পাচ্ছি ভাই। ধন্যাবাদ

গোলাম মাওলা , ভাবুক, সাপাহার, নওগাঁ