টপিকঃ প্রিয় বান্ধবীর কাছে চিঠি......

চিঠিটি প্রথম আলো ব্লগে লিখেছিলাম

চিঠির জন্য যদি একটা আলাদা বিভাগ থাকতো মজাই হতো........... (বিষয়টি ভেবে দেখবেন মডুগণ)
------------------------------------------------------------------------------------------------------------

অই বান্দি/গাধি পিনু........

পত্রের পরথম কি দিয়ে শুরু করবো বুঝতেছি না । এই পর্যন্ত কোন চিঠিই তোর কাছে লিখি নাই বলেই মনে হয়....... দেখ তোর ভাইগ্য কত ভালা গো বইন । আমি লিখতাছি তোর কাছে হাহাহ ।

অই গাধি সালাম দিবি না নিবি । সালাম কর আমারে আগে।

অনেক দিন ধইরা ভাবতাছি একটা চিঠি লিখব তরে । ব্যস্ত জীবনে মোবাইলটা তো সাথেই রাখস না । সিম পাল্টায়ে রাখস, অন্য সিম লাগাস কেন? যাই হোক, মোবাইলে কি আর অতসব কথা কওয়া যায় রে । বিলের ভয়, সময়ের ভয়, নানা রকম ব্যস্ততা । শত ব্যস্ততা থাকলেও আউজকা তোরে লিখুমই লিখুম । তুই তো আমার প্রাণের বান্ধবী ছিলি । এখনো আছস নি বে ? না থাকলে নাই । আমি কিন্তু ঠিকই মনে রাখি । খবর নেই । ফোন করি । স্পেশাল ডে গুলোতে ম্যাসেজ পাঠাই । আচ্ছা তুই ক তো তুই কয় দিন আমার খবর নিছস? আর ফোন তো করছই না । যাক ব্যাপার না!

ভেবে দেখ কতটা সুন্দর সময়ই না আমরা কাটিয়েছি একসাথে । তুই, আমি, মুক্তা, লাকি, শিফা । ধুরু শিফার কথা মনে আইছে । বুকটা মোছড় দিয়া উঠলরে । শিফা তুই আমাদের ছেড়ে কেন চলে গেলিরে অবেলায় । আল্লাহ তোরে শান্তিতে রাখুক শিফা ।

পিনু তুই আমি স্কুল, কলেজ পর্যন্ত একসাথে কাটিয়েছি অনেকগুলো বছর । তখন মোবাইল ছিল না কিন্তু যোগাযোগটা ভালই থাকতো । তুই খবর না পেলে ছুটে আসতিস আমার বাড়ি অবধি । আবার আমি তোর খবর না পেলে ছুটে যেতাম তোদের বাসায় । যতটুকু সময় কাটিয়েছি আনন্দ, হই হুল্লোড়ে কাটিয়েছি । একবার ভাবতো তোর বাসা কতদুরে আর কলেজ ছিল অন্য প্রান্তে । এক সাথে যাওয়ার জন্য পায়ে হেঁটে তোর বাসায় ছুটে যেতাম । তারপর দুই টাকা রিক্সা ভাড়া দিয়ে কলেজে যেতাম । আচ্ছা এখন কলেজে যেতে রিক্সা ভাড়া কত নেয়রে ? নিশ্চয়ই ২০ টাকা । সময় আর টাকার হিসাব কেন করলাম । সময়, টাকা, মানুষের মন সবই পাল্টায় যে তাই ।

আজ লিখতে বসছি অনেক কিছুই স্মৃতিতে ভাসছে । হয়তো কয়েক পৃষ্ঠা ভরে যাবে লিখতে লিখতে । তুই কিন্তু বিরক্ত হোস না । বুড়ি হলে এই চিঠি খুলে পড়বি বুঝেছিস গাধি, তখন মজা পাবি আর চউক্ষের সামনে ভাসব স্মৃতিগুলো ।

আচ্ছা, ফোন করলে দুইজনই হ্যালো না কইয়া কি কই ক তো । হাহাহাহাহ । অই বান্দি ভালা আছত নি বে । তুই মরছস না বাইচা আছস.....হাহাহাহা । কি মজা ফোনের ভাষা ।

স্কুল কলেজের বন্ধের দিনগুলোতে আমাদের বাড়ির পুকুর পাড়ে তালগাছ, খেজুর গাছের তলায় বসতো পিকনিকের জমজমাট আসর/আড্ডা । সেদিনের একটা কথা মনে আছে নি গো তোর । সোহেল তোরে কি কইছিলো হাহাহাহা । আমাকে একটু তরকারী পাতে বেড়ে দাওনা গো । হাসতে হাসতে দম ফাটা অবস্থা ।

রুবেল সোহেল সেলিম ফাজিলগুলান্তে আজকাল আর খবরই নেয় না । তাও আমি মাঝে মাঝে ফোন দেই । সবাই জীবনের খুঁজে, জীবন দৌঁড়ে, জীবনে শান্তির আশায়, জীবনে ক্যারিয়ার গঠনে যে যার যেমন সুযোগ সুবিধা অনুযায়ী দিকবিদিক ছুটে চলে গিয়েছে বন্ধুত্বের বন্ধন হতে অনেক দুরে । বন্ধুত্ব যে কি এখন বুঝি । আনন্দ আর আড্ডা আর যা খুশি তাই হল বন্ধুত্ব । বন্ধুদের কাছে সুখ দুখের কথা বলা যেতো । বিপদ আপদে মন খুলে কথা বলা যেত । আজ আর কারো কাছে সুখ দু:খ আনন্দ ভাগ করা হয় নারে । কত করে তোরে অনুরোধ করে বললাম । একটা দিনের জন্য অন্তত: ছুটি নিয়ে আয় ঢাকা একদিন সারাদিন পার্কে ঘুরে বেড়ামো একেবারে আগের মতো নিজের মতো করে । আহারে দুই প্রান্তে দুইজন । সময় আর হয়েই উঠে না । সময় হয়ে উঠবে কিনা তাও সন্দেহ জাগে মনে ।

এই গাধি ইন্টার পরীক্ষার পরে তুই আমি আর মুক্তায় হাতের কাজের দোকান দিছিলাম । মনে আছেনি । দোকান না ঠিক । কাপড় কিনে জামা বানায়ে হাতের কাজ করছিলাম । কিন্তু সময়ের অভাবে আমরা আর সেটা দাঁড় করাতে পারিনি । পরে নিজেদের মধ্যে জামাগুলো লটারি করে ভাগ করে নিয়ে নিছিলাম । হাহাহা এই হল আমাদের ব্যবসা । এ বিষয়ে বেশী কিছু আর লিখলাম না । শুধু মনে করায়ে দিলাম । আরে গাধি চিঠি লিখতাছি তো, চিঠির মধ্যে এত হাবিজাবি কথা লিখতে গেলে দিন পুরাবে রাত এসে যাবে লিখতে লিখতে তবু শেষ হবে না রে ।

ওহ আরেকটা কথা মনে হইছে । তোর মনে আছে কিনা জানি না! ইন্টার পরীক্ষার সময় একাউন্টিং পরীক্ষার আগে দশ দিন গ্যাপ ছিল । এই সুযোগে ভাল ভাবে অংকগুলো করার জন্য আমি চলে গেছিলাম তোর বাসায় ১০ দিনের জন্য । সেই স্মৃতিগুলো মনে হলে আজো আনমনে হেসে উঠি । আহারে কত মজার দিনগুলারে বইন । তোর মনে নাইগো বইন আমার মনে আছে। প্রতিদিনই পড়াশেষে শুরু হতো তোর আমার মাঝে ঝগড়া । আজিব ঝগড়া .... এমন ঝগড়া মনে হয় কোন বান্ধবী বান্ধবীদের সাথে হয় না । হাহাহা । ঝগড়া লেগে তুই আমার হাতে দিতি নখের আঁছড় বসিয়ে তখন পাল্টা আমিও সুযোগ বুঝে দিতাম নখের আঁচড় বসিয়ে..... পুরা বাসায় দৌঁড়া দৌঁড়ি করে বাসাটা মাথায় উঠাতাম । ভুলেই যেতাম সেটা ছিল তোর বাসা হাহাহাহাহ । তখন খালাম্মার বিচার ছিল এক তরফা । এমন বিচারও আমি কোনদিন দেখি নাইরে। তোর মা দেইখ্যা তোর পক্ষ নিয়া বেচারী খালাম্মা আমারে বিছানার ঝাড়ু নিয়া দিতেন দৌঁড়ান । আমি কইতাম খালাম্মা গো পিনু আপনের মাইয়া বইলা তার পক্ষ নিলাইন আমার মা হইলে আমিই মাইর বকা খাইতাম তুই দুরে দাঁড়াইয়া খিল খিল হাসতি । খুব মজা লাগত তাই না হাহাহা ।

একাউন্টিং পরীক্ষার সেই ইতিহাস মনে আছে নিবে তোর । পরীক্ষার দিন তুই আর আমি মাঝের বেঞ্চিতে বসছিলাম আর আগের বেঞ্চিতে ছিল মনোয়ারা আর অন্যান্যা বান্ধবীরা । অংক অংশ শেষ করে যখন থিউরীতে আসছিলাম তখন দেখি কয়েকটা থিউরির উত্তর মনে আসতেছে না বা কমন পড়ে নাই । তুইও পারস না আমিও না । কিন্তু মনোয়ারা সবগুলোই লিখেছিল । তুই আমি অনুরোধ করলেও কিছুতেই রাজী হচ্ছিল না । কি আর করা দুইজন বসেছিলাম খানিক্ষণ । হঠাৎ আল্লাহর রহমতে মনোয়ারা বাথরুমের প্রয়োজন হলো । সে স্যারের অনুমতি নিয়ে যেই বাইর হইলো তুই আর আমি বুদ্ধি করে মনোয়ারার পেপার সাবধানে টেনে নিয়ে এসে থিউরির তুই লেখছ ডেবিট আর আমি লিখি ক্রেডিট সাইট । হাহাহ । আরো ছোট প্রশ্নগুলো দুইজনে মিলে শর্টকাটে ১৫/২০ মিনিটে শেষ করে ফেলি । মনোয়ারা আইস্যা পেপার টান দিয়া নিয়া যায় । তাতে লেখা প্রায় শেষের দিকে ছিল । হাহাহাহ কি মজা না ।

ইন্টার পাশ করেই তুই ঢাকা চলে আসলি আর আমি রয়ে গেলাম চুনারুঘাটেই । তুই নিলি অনার্স আর আমি সাধারণ ডিগ্রি। সে সময়গুলোতে তেমন যোগাযোগ ছিল না আমাদের । কারণ ছিল অনেক । তখনো প্রযুক্তি আমাদের মাঝে ছিল না । মাঝে মাঝে তুই বাড়ি আসলে দেখা হতো ।

ডিগ্রি পাশ করে যখন মাস্টার্স ফাইনাল দিমু তখন তোর সাথে আবার ঢাকায় থাকার সৌভাগ্য হয়েছিল । ঢাকা কলেজ থেকে মাস্টার্স প্রাইভেটে দিতে গিয়েছিলাম তোর হবু শ্বশুড় বাড়ীতে। তুই পড়তি বদরুন্নেছায় । কত তফাৎ পড়াশুনায় তাই না রে । তখন শহরের কিছুই বুঝে উঠতে পারিনি । শুদ্ধ ভাষায় তো কথাই বলতে পারতাম না । অনেক ভয়ে ভয়ে থাকতাম । মনটাও যারপর নাই খারাপ হতো । পরীক্ষার দিনগুলো তোর সাথে ভালই কাটছিল । দুইজনে কত জায়গায় ঘুরলাম ।

তোর শ্বশুড় বাড়ির লোকজনও খুব ভাল ছিল । অনেক আদর করেছিল সে সময়গুলোতে । অই যা, আর একটা হাসির কথা মনে হইছে । সেখানে গিয়েও কিন্তু তোর সাথে মারামারি হইছে । তখন হাতে খামছি দেইনি দিয়েছিলাম কিল । সে কিল খেয়ে তুই তোর হবু শ্বাশুড়ীকে বলছিলি, খালাম্মাগো ছবির হাতের একটা চড় খাইয়া দেখইন । বাপরে বাপ একবারে বেটাইন্তের হাত (ছেলেদের হাত) । সে কথাগুলো মনে হলে আজো হাসি । পড়াশুনার পর্ব শেষ করে তুই নিলি চুনারুঘাটেই কলেজের চাকুরী । আর আমি চলে এলাম ঢাকায় । সরকারী চাকরী নিয়ে । আসলেই কার ভাগ্যে যে কি আছে হাহাহা । তুই ছিলি ঢাকা এখন চুনারুঘাট আর আমি ছিলাম স্থায়ী চুনারুঘাটের এখন ঢাকার বাসিন্দা ।

সে যাই হোক না । তোর আমার মনের মিল চিরদিনই অটুট থাকবে তাই নারে । তুই ভুললেও আমি তোরে ভুলব না রে বান্দি।

ওরে বাপস, দেখছস লেখতে লেখতে কতটা লিখে ফেলেছি । আরো কত কথা জমা আছে স্মৃতির মণিকোঠরে । অন্য একদিন লিখব বাকি সে সব কথা ।

চিঠি পাইয়া উত্তর দিবি না জানি । ফোন করে দুই একটা কথা বলে উত্তর পর্বটা সেড়ে নিস কেমন।
হুনছি (শুনছি) তোর জামাই নরসিংদি চাকুরী করে । তোর তো আর সময়ই হবে না ঢাকা আসার । চুনারুঘাট আর নরসিংদী দৌঁড়াদৌঁড়ি তো মনে হয় তোরই করতে হয় ।

অহ, আর একটা কথা তোর আর আমার মাঝে কত মিল দেখছত নি বে । তোর দুইটা পোলা আমারও আল্লাহর দেয়া দুইটা পোলা হাহাহা । মাইয়া নাইরে তোরও আমারও । নাইলে বেয়াইনআলা করলাম নে । আল্লাহ যা করেন ভালার লাইগ্যাই করেন তাই নারে । বেয়াইন থাইকা বান্ধবীই ভালা হাহাহা ।

লেখতাম না আর বুঝছত । ভালা থাকিস জামাই পোলা আর সংসার নিয়া সেই দোয়াই করি । অই বান্দি শেষ করার আগে তোর নাকে দুইটা ঘুষি আর তোর হাতে নখের আঁচড় দিয়া চিঠি শেষ করতাছি বুঝছত । পাল্টা জবাব দিবি কেমনে হাহাহা । আমি তোর ধারেও নাই কাছেও নাই । তোর মা'রে বিচার দিস । দেখি খালাম্মা বাঘিনীর বাচ্চা আমার বিচারটা করেন ক্যামনে হিহিহিহি।

আর একটা কথা কইয়া শেষ কইরা দেই । যত ব্যস্তই থাকিস না কেন অবশ্যই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়বি কিন্তু । আজ আর নয় আসি ।আল্লাহ হাফেজ ।

ইতি তোর প্রাণের বান্ধবী ছইব্বানি
(প্রাণের না কচু)

https://lh3.googleusercontent.com/-JDEuNmnBO3g/U5WBDt37AEI/AAAAAAAAATc/pz0NRf49HNg/w465-h259/tumblr_m98ollAb5y1rpwthr.gif

(চিঠি টিতে হবিগঞ্জের আঞ্চলিক ভাষার মিশ্রণ আছে । যে ভাষাগুলো বুঝতে অসুবিধা হবে কারো । কমেন্টে আমাকে জিগ্যেস করবেন । বলে দিব ইনশাল্লাহ । বানান ভুল হতে পারে )

জাযাল্লাহু আন্না মুহাম্মাদান মাহুয়া আহলুহু......
এই মেঘ এই রোদ্দুর

Re: প্রিয় বান্ধবীর কাছে চিঠি......

চিঠির মাঝে স্মৃতি রোমন্থন ! ভাল লাগলো।

Re: প্রিয় বান্ধবীর কাছে চিঠি......

মহা চমৎকার হয়েছে  thumbs_up

অ.ট.এতবড় চিঠি লেখার সময় পেলেন কোথায়?

"We want Justice for Adnan Tasin"

Re: প্রিয় বান্ধবীর কাছে চিঠি......

ইলিয়াস লিখেছেন:

চিঠির মাঝে স্মৃতি রোমন্থন ! ভাল লাগলো।

অনেক ধন্যবাদ ভাইজান

আউল লিখেছেন:

মহা চমৎকার হয়েছে  thumbs_up

অ.ট.এতবড় চিঠি লেখার সময় পেলেন কোথায়?

পোস্ট করার আগের দিন মোবাইলে লিখে সেইভ করে পরের দিন ফিনিশিং দেই পিসি তে বসে ।
ধন্যবাদ অনেক অনেক

জাযাল্লাহু আন্না মুহাম্মাদান মাহুয়া আহলুহু......
এই মেঘ এই রোদ্দুর