টপিকঃ অপরূপ সাগরকন্যা কুয়াকাটা

কুয়াকাটা -সাগরকন্যা হিসেবে যার ব্যাপক পরিচিতি ভ্রমনপিয়াসী সবার কাছে। পর্যটকদের মুগ্ধতার বন্ধনে আটকে দেয়ার বহু উপকরন আছে ১৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য এই বিশাল সমুদ্র সৈকতে। রয়েছে অসংখ্য দর্শনীয় স্পট। পর্যটকদের কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে এখানে গড়ে ওঠেছে অসংখ্য আবাসিক হোটেল, খাবার হোটেল প্রশাসনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাসহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধা। পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলায় লতাচাপলী ইউনিয়নে পর্যটন কেন্দ্র কুয়াকাটার অবস্থান। ঢাকা থেকে সড়ক যোগে এর দূরত্ব ৩৮০ কিলোমিটার। আর বরিশাল থেকে ১০৮ কিলোমিটার, পটুয়াখালী থেকে ৭০ কিলোমিটার এবং কলাপাড়া থেকে ২২ কিলোমিটার। প্রকৃতির নিজ হাতে গড়া কুয়াকাটার সী-বীচ অতুলনীয়। যা এ দেশে আর দ্বিতীয়টি নেই। ১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ সী-বীচে এলে মন প্রফুল্ল হয়ে ওঠে যে কোন মানুষের। সূর্যোদয় দেখতে হলে আগে থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে। শীতের সময় ঠিক ঝাউবনের সামনে এসে দাঁড়াতে হবে এবং অন্যান্য মৌসুমে সী-বীচ এর জিরো পয়েন্টে দাঁড়ালেই হবে। সারাদিন বিভিন্ন দর্শনীয় স্পটগুলো ঘুরে ফিরে শেষ বিকেলে সবাই সূর্যাস্ত দেখার জন্য সী-বীচে ভীড় জমায়। বীচের পশ্চিম দিকে রয়েছে সুন্দর বনের পূর্বাংশ ফাতরার বন, লেবুচর, দুলবার চর, পূর্বদিকে গঙ্গামতির চর, কাউয়ার চর, ক্র্যাব ল্যান্ড ও সোনার চর। সূর্যোদয় দেখে নাস্তা সেরে বেড়িয়ে পড়তে পারেন বন অথবা দ্বীপগুলো দেখার জন্য। এর মধ্যে সুন্দর বনের পূর্বাঞ্চল ফাতরার বন, ফিস ল্যান্ড, ক্র্যাব ল্যান্ড, সোনার চর দেখতে যেতে পারেন নৌপথে ট্যুরিস্ট বোটে। সারাদিন বন, দ্বীপ ভ্রমণ শেষে দিনটা কাটিয়ে ফিরতে পারেন সূর্যাস্ত দেখার জন্য কুয়াকাটা সৈকতে। দুপুর বেলায় সী-বীচের এক পাশে ফুটবল, ক্রিকেট, ভলিবল খেলা জমে ওঠে। কুয়াকাটার সী-বীচ রাতে যে কত সুন্দর তা নিজ চোখে না দেখলে বুঝতেই পারবেন না। রাতের কুয়াকাটা উপভোগ করতে চাইলে সী-বীচ আসার বিকল্প নেই। কুয়াকাটার আরো কিছু জায়গা সম্পর্কে সংক্ষেপে নিচে দেয়া হলো :

গঙ্গামতি: প্রকৃতির নিপুণ হাতে গড়া আকাঁ বাঁকা লেকের দু'পাশে সবুজে ঢাকা অপরূপ সৌন্দর্যে ঘেরা গঙ্গামতি। যেতে পারেন নৌকা ট্রলারে। অথবা জিরো পয়েন্ট থেকে মোটরসাইকেল যোগে বা ভ্যান রিজার্ভ করে। গঙ্গামতির সবুজ বন, মহিষের পাল ও লেক দেখা শেষে একটু সামনে গেলে দেখতে পাবেন গঙ্গামতির বিশাল চর।

ফাতরার বন: সুন্দর বনের পূর্বাঞ্চল ফাতরার বন। সুন্দর বনের বিকল্প হিসেবে এ বনে অসংখ্য পর্যটক ঘুরতে আসে। সরকারীভাবে এখানে ইকো পার্কসহ পর্যটকদের জন্য বাংলো ও পিকনিক স্পট তৈরী করা হয়েছে। যেতে হবে নৌপথে। ট্যুরিস্ট বোট আছে। এগুলো সকালে ছেড়ে যায় আবার দুপুরে চলে আসে। আবার দুপুরের পরে গিয়ে সন্ধ্যার আগে চলে আসে।

কুয়াকাটা টুরিস্ট সেন্টার (মোবাইল নম্বর ০১৭১৬-৭৩৩১৮৭) অফিসে এসে অগ্রিম টিকিট বুকিং দিয়ে গেলে আর কোন চিন্তা করতে হবে না। তারা সময় মত নিয়ে যাবে, নিয়ে আসবে। ট্যুরিস্ট বোটে যাওয়া আসার ভাড়া জনপ্রতি ১০০ টাকা করে এবং স্পীড বোট জনপ্রতি ২০০ টাকা। এখানে যাওয়া আসার প্যাকেজগুলো ১-৩ ঘন্টার।

ইকো পার্ক ঝাউবন: কুয়াকাটার জিরো পয়েন্ট থেকে ভ্যান ভাড়া প্রতিজন ১০ টাকা, মোটরসাইকেলে ২০ টাকায় যাওয়া যাবে কুয়াকাটার ইকোপার্ক ও ঝাউবন। ইকোপার্কের বিশাল এলাকা ঘুরতে আপনার অনেক সময় লাগবে। এখানে সারি সারি ঝাউবনসহ পিকনিক স্পট রয়েছে। লেকগুলোতে প্যাডেল বোট নিয়ে ঘুরতে পারেন। কুয়াকাটা জিরো পয়েন্ট থেকে মাত্র ২ কিলোমিটার পূর্বদিকে ঝাউবন। ইকোপার্কে গাড়ী পার্কিং, পিকনিক সেট, খাবার পানির ব্যবস্থাসহ পর্যটকদের জন্য অনেক সুযোগ-সুবিধা রয়েছে।

ক্র্যাবল্যান্ড তুফানের চর: স্থানীয় লোকজন এই দ্বীপটিকে বলে তুফানের চর। এই দ্বীপের কাছাকাছি এসে তাকালে মনে হবে একটি ছোট সবুজ দ্বীপ সমুদ্রের মাঝে ভাসছে। অপরদিকে দ্বীপের বীচটা লাল কাকঁড়ায় যেন ঢেকে আছে। কুয়াকাটা সৈকত থেকে সকালে স্পীড বোট ছেড়ে আসে এই দ্বীপে। জনপ্রতি আসা যাওয়ার ভাড়া হয় ৬০০ টাকা। এখানে আসতে চাইলে অবশ্যই আপনি ট্যুরিস্ট সেন্টারে অগ্রীম বুকিং দিয়ে রাখবেন।

সোনার চর: কুয়াকাটার পূর্বাংশে দ্বিতীয় সুন্দরবন নামে খ্যাত ৩০টি সবুজ বনায়নের মধ্যে অন্যতম সোনার চর। নদী খুব কাছ থেকে হরিণের দেখা মেলে এই চরে। ঢাকা থেকে এই বনে যেতে হলে দু-ভাবে যাওয়া যেতে পারে।
এক. কুয়াকাটা থেকে গ্রীণ ট্যুরিজম এর মাধ্যমে ট্যুরিস্ট বোটে গেলে ৩ ঘন্টায় পৌছে যাবেন গন্তব্যে।
দুই. পটুয়াখালী থেকে গলাচিপা এসে ট্যুরিস্ট বোটে চরমন্তাজ হয়ে সোনার চর। এই বন দেখতে এলে আরো অন্তত ১০টি বনের দেখা মিলে যেতে পারে। নদীর মাঝে বিচ্ছিন্ন এসব বন দেখতে দেখতে আপনি হারিয়ে যাবেন সবুজের দেশে।

শুঁটকি পল্লী: কুয়াকাটা জিরো পয়েন্ট থেকে ৫কিলোমিটার পশ্চিম দিকে এই শুটঁকি পল্লী। বিশাল এলাকা চাং বানিয়ে শুটকি তৈরীর পদ্ধতি নিজের চোখে দেখে আসতে পারেন। বাসা বাড়ির জন্য তাজা শুটকি নিয়ে আসতে পারেন। ভ্যান ভাড়া প্রতিজন ১০ টাকা, মোটর সাইকেলে ২০ টাকা। এখানে আসতে হলে দিনের বেলা সময় করে নিবেন।

রাখাইন পল্লী: কুয়াকাটা উন্নয়নে রাখাইনদের ভূমিকা ব্যাপক। কেরানীপাড়া, নয়াপাড়া, থঞ্জুপাড়া, আমখোলাপাড়া, কালাচাঁনপাড়া, নাইউরীপাড়া, কুয়াকাটার কাছাকাছি রাখাইনদের এসব পাড়া। ঘুরে ঘুরে এসব পাড়া সহ রাখাইনদের কৃষ্টি কালচার দেখতে পাবেন।

সীমা বৌদ্ধ মন্দির: দেশের সর্ববৃহৎ বৌদ্ধ মন্দির কুয়াকাটা মিশ্রিপাড়া সীমা বৌদ্ধ মন্দির। কুয়াকাটা থেকে ৭ কিলোমিটার পূর্বদিকে এ মন্দির অবস্থিত। মন্দিরে আছে ৩৬ ফুট উঁচু বিশাল মূর্তি। মন্দিরে যেতে কুয়াকাটা থেকে ভ্যানভাড়া প্রতিজন ৫০ টাকা, মটর সাইকেল প্রতিজন ১০০ টাকা (আসা যাওয়া)।

বৌদ্ধ বিহার: অষ্ট ধাতুর মন্দির নামে পরিচিত এই বৌদ্ধ বিহারটি কুয়াকাটা জিরো পয়েন্টের পূর্বে পাশে। বেশীরভাগ সময় এই বিহারের দরজা খোলা থাকে পর্যটকদের দেখার জন্য। ৮টি ধাতুর মিশ্রনে এই বিহারের মূর্তিটি তৈরী।

খাবার হোটেল: কুয়াকাটা বেড়িবাঁধের ভিতরে পর্যটন ক্যান্টিন, স্কাই প্যালেস ক্যান্টিন, নীলাঞ্জনা ক্যান্টিন, হোটেল রাজধানী, হোটেল আপ্যায়ন, তরঙ্গ হোটেল, জয় হোটেলসহ বেড়িবাঁধের বাইরে রয়েছে খাবার ঘর, বরিশাল হোটেল, পটুয়াখালী হোটেল, খেপুপাড়া হোটেল, এছাড়াও ছোট খাট অনেক খাবার হোটেল আছে। এসব হোটেল গুলোতে অগ্রিম পছন্দমত খাবার তালিকা দিয়ে আসতে পারেন।

কিভাবে যাবেন কুয়াকাটায়: রাজধানী ঢাকা থেকে সরাসরি বাসযোগে কুয়াকাটায় যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে সরাসরি দীর্ঘপথ বাস ভ্রমণের চেয়ে বিলাসবহুল লঞ্চযোগে রিলাক্স মুডে বরিশাল হয়ে সেখান থেকে মাইক্রোবাস রিজার্ভ নিয়ে স্বাচ্ছন্দে পৌঁছতে পারেন কুয়াকাটায়।

Submitted By: www.stylenews24.com