টপিকঃ স্বাস্থ্য কথন

যখন অ্যান্টিবায়োটিক দিয়েও কাজ হয় না

পেনিসিলিন আবিস্কারের পর মানুষ খুব সাহসী হয়ে উঠেছিলো। মনে হতো, ভয় কি? পেনিসিলিন আছে না! অচিরেই দেখা গেলো পেনিসিলিন ব্যবহার করলেও অনেক জীবাণু তেমন তোয়াক্কা করে না। একে একে নতুন নতুন আরও শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিক তৈরি করা হতে থাকলো। কিন্তু রোগ জীবাণুদের দুষ্ট বুদ্ধি মানুষের চেয়ে মনে হয় বেশী। অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণুর সংখ্যা বেড়েই চলেছে।

সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণু সম্পর্কে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। এ সমস্যা সম্পর্কে বিভিন্ন সময়ে অনেক আলোচনা করা হলেও, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এটাই প্রথম গ্লোবাল রিপোর্ট। অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণুকে এই রিপোর্টে দুনিয়াব্যাপী একটি বড় স্বাস্থ্য ঝুঁকি হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। মূলত ৭ ধরণের ব্যাকটেরিয়াদ্বারা গুরুত্বপূর্ণ সংক্রমণসমূহ ঘটে থাকেঃ রক্তের ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ বা সেপসিস, ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, মূত্রনালীর সংক্রমণ এবং গনোরিয়া।

বর্তমান রিপোর্টের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছেঃ
• ক্লেবসিয়েলা নিউমোনি ( Klebsiella pneumonia) নামে পরিচিত একধরণের আন্ত্রিক ব্যাকটেরিয়া অত্যন্ত অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী হয়ে উঠেছে। এর ফলে হাসপাতালে অনেক ভয়াবহ সংক্রমণ ঘটছে। সারা পৃথিবীজুড়েই এর প্রকোপ দেখা যাচ্ছে এবং প্রচলিত কার্বাপেনেম এর বিরুদ্ধে ৫০ শতাংশ ক্ষেত্রে আর কাজ করছে না।
• ই কোলাই (E coli) দ্বারা সৃষ্ট মূত্রনালীর সংক্রমণের বিরুদ্ধে ফ্লুরোকুইনোলনজাতীয় অ্যান্টিবায়োটিক প্রচুর ব্যবহৃত হয়ে থাকে। ১৯৮০-র দশকে প্রথম ব্যবহার শুরুর সময় এর বিরুদ্ধে কোন প্রতিরোধী জীবাণু ছিল না বললেই চলে। কিন্তু এখন অধিকাংশ দেশে এগুলি কার্যকারীতা হারিয়েছে।
• প্রতিদিন দুনিয়ায় প্রায় ১০ লাখ মানুষ গনোরিয়ায় আক্রান্ত হয়। গনোরিয়া অতি পরিচিত একটি যৌন রোগ। কিন্তু এর বিরুদ্ধে তৃতীয় প্রজন্মের সেফালোস্পোরিনজাতীয় অ্যান্টিবায়োটিক আর সহজে কাজ করছে না।
• অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হলে রোগ বেশী সময় স্থায়ী হয়, রোগের তীব্রতা বেশী হয়, জটিলতা এবং মৃত্যুর হার বেড়ে যায়। যেমন-মেথিসিলিন প্রতিরোধী স্টাফাইলোকক্কাস (MRSA)ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ ঘটলে প্রতি পাঁচ জনের মধ্যে তিন জনের মৃত্যু সুনিশ্চিত। অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণু সংক্রমণের ফলে চিকিৎসার খরচ বেড়ে যায় এবং অনেক ক্ষেত্রেই নিবিড় পরিচর্যার দরকার হয়।

এতদিন আধুনিক মেডিসিনের চিকিৎসার জন্য অ্যান্টিবায়োটিক একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এসেছে। দুনিয়াজুড়ে মানুষের সুস্থ দীর্ঘ জীবন অর্জনের পিছনে অ্যান্টিবায়োটিকের ভূমিকা অনস্বীকার্য। কিন্তু এখন আমরা এক ক্রান্তি কালে। অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ অপব্যবহারের ফলে সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে ব্যবহারের এই প্রধান অস্ত্র অকেজো হওয়ার পথে। এসম্পর্কে এখন থেকে সতর্ক না হলে আমরা এক বড় ধরণের স্বাস্থ্য সমস্যার মুখোমুখী হতে পারি।
অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণু যেন আর সৃষ্টি না হয় সে জন্য জনগণের সচেতনতা বাড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এ বিষয়ে জনগণের করণীয়ঃ
• চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করবেন না।
• অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের পর সুস্থ বোধ করলেও প্রেসক্রিপশনের পুরো কোর্স ওষুধ সেবন করুন।
• একজনের জন্য দেওয়া প্রেসক্রিপশনের অ্যান্টিবায়োটিক অন্য কেউ সেবন করবেন না।

চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্য কর্মীদের মনে রাখতে হবেঃ
• জীবাণু সংক্রমণ প্রতিরোধের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে যেন অ্যান্টিবায়োটিক লেখার দরকার না হয়।
• শুধু প্রয়োজন হলেই অ্যান্টিবায়োটিক প্রেসক্রিপশন করতে হবে।
• যে রোগের জন্য যে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন সেটাই ব্যবহার করতে হবে।

নীতি নির্ধারক এবং ওষুধ শিল্পের জন্য করণীয়
• নতুন কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিক উদ্ভাবনের জন্য গবেষণাকে উৎসাহিত করতে হবে
• অ্যান্টিবায়োটিকের সুষ্ঠু ব্যবহার সম্পর্কে জনগণ এবং সংশ্লিষ্ট সকলের সচেতনতা বাড়াতে হবে।
তথ্যসূত্রঃ http://www.who.int/drugresistance/docum … report/en/