টপিকঃ ক্র্যাশ ইনভেস্টিগেশন ২.৫: TWA Flight 800 Conspiracy

মূলত, তৃতীয় পর্বে  চায়না এয়ারলাইনস ফ্লাইট ৬১১ নিয়ে লেখার কথা। কিন্তু সেটাকে নিয়ে লিখতে গেলে খানিক্ষনের জন্যে হলেও উঠে আসবে TWA Flight 800 এর কথা, রেফারেন্সের জন্য। তাই একটু ভেঙে নিয়ে "আড়াইতম" পর্বে আজকে TWA Flight 800।

Attraction: গৌতম'দা। আপনি সম্ভবত এটা খুজছিলেন।

Trans World Airlines এর Flight 800 নিয়ে সোজাসুজি রিপোর্ট করা সম্ভব না। দুর্ঘটনাটি নিয়ে যথেষ্ঠ কন্সপাইরেসী আছে। J.F.K এয়ারপোর্ট থেকে Flight 800 মূলত যেটি একটি বোয়িং ৭৪৭, সফল উড্ডয়নের প্রায় ১২ মিনিট পরে ধ্বসে পড়ে আটলান্টিক মহাসাগরে। রাত সাড়ে ৮টার দিকে হওয়ায় সরাসরি তেমন কোন উদ্ধারকার্য চালানোটা বরং কঠিনই ছিল। পরেরদিন সকালে এবং আগের দিন রাতে অভিযান চালিয়ে দেখা গেল, কেউই বেচে নেই। অনেকেই তখনও সীটেই বাধা রয়ে গেছে, অনেকে পানিতে ভাসছে, আর কেউ নিখোজ। প্রাকটিকালি ২৩০ জনের কেউই বেচে ছিল না ওই ফ্লাইটের। কি হয়েছিল আসলে ?


http://media.salon.com/2013/06/twa-flight-800.jpeg1-1280x960.jpg


J.F.K ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট, রাত ৮টা বেজে ৩১ মিনিট। ২১২ জন যাত্রী নিয়ে Flight 800 রওনা করে প্যারিসের উদ্দেশ্যে। সফলভাবে উড্ডয়নের প্রায় ১২ মিনিট পড়ে হঠাৎ করে ভয়াবহ একটি বিস্ফোরন ঘটে ককপিটের ঠিক পর পরেই। প্রচন্ড বিস্ফোরনে ককপিট আলাদা হয়ে ছিটকে নীচে পড়ে যায়, প্লেনের বাকিঅংশ নীচে না পড়ে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে আরো উচুতে উঠে যায়, প্রায় হাজার খানেক ফিট উপরে উঠে সেটি সরাসরি নেমে আসে সাগরের বুকে। কোন কিছু বুঝতে পারার আগেই শেষ হয়ে যায় সবকিছু।


TWA 800 এর ঠিক কাছাকাছিই ছিল EastWinds Airlines এর একটি বোয়িং 737, পাইলট ককপিট থেকেই দেখতে পাচ্ছিলেন TWA 800 কে। এবং হঠাৎ করেই তার চোখের সামনে বিস্ফোরিত হয় Boeing 747 a.k.a Jumbo Jet টি। তিনি সাথে সাথে কন্ট্রোল টাওয়ারকে জানান বিষয়টি। কন্ট্রোল টাওয়ার বারবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও ব্যার্থ হন TWA 800 এর সাথে।


সমুদ্র মোটামুটি বেশ বড় একটা জায়গা, পুরো একটি প্লেন সেখানে আছড়ে পড়লে সবকিছু খুজে বের করা আসলেই বেশ কঠিন। ইনভেস্টিগেটররা তাও খুজে খুজে প্রায় ৯৫ ভাগই তুলে আনলেন। ঠিক কোথায় কোন অংশ ভেঙে পড়েছে সেটিও বের করে আনলেন তারা। এবার শুরু হলো কেন ঘটলো এই দূর্ঘটনা।


সম্ভাবনা:
প্রথকমে ধারনা করা হলো  মেটাল ফেটিগ, একটি বিশেষ প্রসেস যেটার কারনে বেশ ভালরকমের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে, কিন্তু প্লেনের কোন অংশেই তারা মেটাল ফেটিগের কোন ছায়া পেলেন না। সম্ভাবনা নাকচ হয়ে গেল।


TWA 800 এর রুট খুব একটা নিরাপদ বলা যায় না। যাত্রাপথে তাদেরকে US মিলিটারীর একটি এলাকাও পার করতে হয়। সন্দেহ উঠলো এবার সেই দিকে, ভুল করে কোন মিসাইল ছুড়ে বসেনিতো মিলিটারী বেস থেকে ? EastWinds এর পাইলটও কিন্তু  বলেছিল তার কাছে মনে হয়েছিল এটা একটা বোম্ব এক্সপ্লোশান। ক্রাইসিস তৈরী হয়ে গেল বেশ ভাল রকমের।


সাধারনত বিমান দুর্ঘটনায় ইনভেস্টিগেটররা হয়ে থাকে NTSB ( National Transportation Safety Board), আর যেহেতু বোম্বিং বা মিসাইলের সন্দেহ উঠেছেই, সাথে সাথে FBI ও তাদের সাথে যোগ দিল ইনভেস্টিগেশনে। কিন্তু মোটামুটি ১৬ মাস খেটেখুটে শিওর হওয়া গেল আসলে এটা কোন মিসাইল এ্যাটাক নয়, কোন টেররিস্ট এ্যাটাক নয়, কোন বম্বিং ও নয়। তারা কেস ডিসমিস করে চলে গেল। খবর নিয়ে দেখা গেল, ওইদিন আমেরিকান ওই বেস থেকে যে শীপ থেকে মিসাইল ছোড়ার কথা বলা হচ্ছিল, সেটি সেদিন উল্টো দিকে ছিল আরো অণেকদুরে।


FBI চলে যাওয়াতে একা পড়ে গেল NTSB, তারা এবার নজর দিলো কোথায় সবচাইতে প্রথমে শুরু হয়েছিল সমস্যা। খুব দ্রুতই তারা খুজে পেলেন সেই জায়গা। প্লেনের নীচের দিকে যেখানে গ্যাসট্যাংক। তারা মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে গেলেন গ্যাসট্যাংক থেকেই ঘটেছে সেই বিস্ফোরন। কিন্তু, প্লেনে যে ফুয়েল ব্যাবহার করা হয় সেটা প্রচন্ড ঠান্ডা রাখা হয়, ইনভেস্টিগেটররা দেখলেন, ম্যাচের কাঠি জেলে ফেলে দিলে বরং কাঠিই নিভে গেল। তবে ????


চিলড ফুয়েল ভয়াবহ নয়। কিন্তু যদি সেটা হয় প্রেসারাইজড এবং ভ্যাপোরাইজড ? ইনভেস্টিগেটররা এবার খুজে পেলেন ক্লু। তারা একটি এক্সপেরিমেন্ট করলেন ফুয়েলকে প্রেসারাইজড করে। ফলাফল হলো ভয়াবহ। বিশাল একটি এক্সপ্লোশান হলো এবং তার সাথেই মিললো কি হয়েছিল সেখানে। ঠিক একই রকম এক্সপ্লোশানে ফেটে গিয়েছিল বিমানের নীচ দিকটা, আর সেই ফাটল গোলাকারে ঘুরে এসে ককপিটকে সরাসরি আলাদা করে ফেলেছিল বডি থেকে। বাদবাকি টুকু সবার জানা।
কিন্তু তারপরও থেকে গেল প্রশ্ন: এত বড় বিস্ফোরন ঘটতে হলে ফুয়েলকে গরম হতে হবে, ভ্যাপোরাইজড হতে হবে এবং একটি ইগনিশনও দরকার হবে ব্লাস্টের জন্য। সেগুলো কোথায় ???


Boeing 747 এর এয়ার কন্ডিশনারগুলো থাকে ফুয়েলট্যাংকের ঠিক নীচেই। কতটা নীচে ? ইঞ্চিখানেক ? হ্যা। এয়ার কন্ডিশনার জেটে ইঞ্জিনের গরম বাতাসকে ঠান্ডা করে সেটি প্যাসেঞ্জার প্যাসেজে দেয়া হয়। কাজেই সেটি বেশ গরম হওয়ার কথা। ইনভেস্টিগেটররা শুরু করলেন এটি নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট। আরেকটি ঠিক একই মডেলের বিমান নিয়ে এসে তারা একই তাপমাত্রায় একই উচ্চতায় নিয়ে এলেন প্লেনটিকে। দেখার জন্য কি ঘটে.........


বলাবাহুল্য দেখা গেল আসলেই প্রচন্ড গরম হয়ে যায় জায়গাটি। কিন্তু তাদের অবাক করে দিয়ে দেখা গেল বিস্ফোরন জাতীয় কিছু ঘটলো না। কারন ??? বিস্ফোরন ঘটতে দরকার একটি ইগনিশন, সেটির সমাধান তারা তখনো খুজে পাচ্ছিলেন না।


এয়ারপ্লেনের ফুয়েলট্যাংক মূলত বেশ কয়েকটি সেকশনে ভাগ করা থাকে এ্যালুমিনিয়ামের ওয়াল দিয়ে। আর ট্যাংকের ভিতরে ছোট একটি সেন্সর থাকে। ধারনা করা হলো ইগনিশনটি ঘটেছে সেখান থেকে। কিন্তু আবারো হতাশ হয়ে তারা আবিষ্কার করলেন ওই ডিভাইসটিতে যে পরিমান ভোল্টেজ থাকে তাতে করে কোনভাবেই ইগনিশন সম্ভব নয়। মাত্র ২ ভোল্ট। তবে ???


হ্যা, সম্ভব, যদি কোনভাবে ওই কানেকশনটিতে হাই ভোল্টেজ পাস হয়ে থাকে, আর সেটি সম্ভব কেবলমাত্র কোন শর্ট সার্কিটের মাধ্যমে। ইনভেস্টিগেটররা ঘেটে দেখলেন প্লেনটির তারগুলোর অবস্থা খুবই খারাপ। কোথাও কোথাও কেবলমাত্র টেপ দিয়ে জোড়া লাগানো, কোথাও উপরে একটা জয়েন্ট দিয়ে লাগানো রয়েছে। ইনভেস্টিগেটররা পৌছে গেলেন তাদের সিদ্ধান্তে।


প্রায় ৪ বছর পর তাদের দেয়া রিপোর্টে বলা হয়, হাইভোল্টেজ ক্যারী করা তারগুলোর কোনএকটির সাথে শর্টসার্কিট হয়ে যায় ওই লোভোল্টেজ কানেকশনের। ফলাফলে ইগনিশন ঘটে ফুয়েলট্যাংকে। প্রচন্ডভাবে বিস্ফোরিত হওয়ার সময় বিমানের দেয়ালের সবচাইতে কাছের এ্যালুমিনিয়াম ওয়ালটি সজোরে আঘাত হানে বিমানের দেয়ালে। আর তাতেই ফেটে যায় বিমানের ওয়াল। গোলাকার হয়ে ফেটে গিয়ে ককপিট ছিটকে আলাদা হয়ে যায় বিমান থেকে। বাকি বিমানটুকু আরো কিছু দূর গিয়ে সেটিও আছড়ে পড়ে আটলান্টিকের বুকে।


রিপোর্ট অনুযায়ী প্লেনের ডিজাইনে বেশ বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়, হাইভোল্টেজ লাইনগুলোকে করা হয় আরো সিকিউর। ফুয়েলট্যাংক যেন কখনোই এতটা গরম না হয় সেদিকেও লক্ষ্য রাখা হয়।


যদিও প্রায় ৪ বছরের অনুসন্ধান শেষে রিপোর্ট এটিই ছিল, কিন্তু এখনো অনেক মানুষ বিশ্বাস করে যে এটি আসলেই একটি মিসাইল এ্যাটাক ছিল। একজন প্রত্যক্ষদর্শী দাবীও করেন যে তিনি একটি মিসাইলকে রাতের আকাশে ছুটে যেতে দেখেছেন বিমানটির দিকে। কিন্তু তাদের এই সাক্ষ্য মিথ্যে বলেই প্রতিপন্ন হয় শেষমেষ। হতেই পারে আমেরিকান সরকারের চেপে যাওয়ার চেষ্টা কিংবা আসলেই একটি ডিজাইন + মেইনটেনান্স ফল্ট, কিন্তু TWA800 ছিল আমেরিকার ওই সময়ের দ্বিতীয় সবচাইতে বড় প্লেন দুর্ঘটনা।  সত্যিকার অর্থে কি দুর্ঘটনা ঘটেছিল সেটি সেদিন সন্ধ্যের আকাশে রহস্য রেখেই হারিয়ে গিয়েছিল TWA Flight 800.



এই ঘটনার ৬ বছর পরে আরো একটি Boeing 747 একই রকম দুর্ঘটনায় পড়ে। China Airlines Flight 611 আকাশে উড়ার কিছুক্ষন পরেই প্রায় ৩ ভাগ হয়ে আছড়ে পড়ে সাগরের বুকে। বিমান দূর্ঘটনার ইতিহাসে সবচাইতে বেশী খরচসাপেক্ষ অনুসন্ধান নিয়ে থাকছে পরবর্তী টপিক। সেই পর্যন্ত চিন্তা করতে থাকুন, দুর্ঘটনার কারন কি একই ছিল নাকি অন্য কিছু, হয়তোবা Alien Attack ?

Re: ক্র্যাশ ইনভেস্টিগেশন ২.৫: TWA Flight 800 Conspiracy

দূর্দান্ত টপিক  thumbs_up

মেহেদী৮৩ লিখেছেন:

সেই পর্যন্ত চিন্তা করতে থাকুন, দুর্ঘটনার কারন কি একই ছিল নাকি অন্য কিছু, হয়তোবা Alien Attack ?

এটা কি এজেন্ট মালডারের রিপোর্ট?

One thing I’ve learned is if you’re good at something, never do it for free.

Re: ক্র্যাশ ইনভেস্টিগেশন ২.৫: TWA Flight 800 Conspiracy

এটাই খুঁজছিলাম বোধহয়। অনেক আগে এটা দেখিয়েছিল ডিসকভারি/ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক চ্যানেল। ওরা একটা একটা করে বিশ্লেষণ করে, আর নানা সম্ভাবনা ও যুক্তির ভিত্তিতে সেটা বাতিল করে দেয়। বিশেষ করে, কীভাবে তারা লজিকগুলো দিচ্ছে এবং কীভাবে বাতিল করছে- সেটা আমার কাছে খুব আগ্রহোদ্দীপক ছিল। ধন্যবাদ মেহদী ভাই।

আমার সকল টপিক

কোনো কিছু বলার নেই আজ আর...

Re: ক্র্যাশ ইনভেস্টিগেশন ২.৫: TWA Flight 800 Conspiracy

মেহেদী৮৩ লিখেছেন:

বিমান দূর্ঘটনার ইতিহাসে সবচাইতে বেশী খরচসাপেক্ষ অনুসন্ধান নিয়ে থাকছে পরবর্তী টপিক।

অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি।

Re: ক্র্যাশ ইনভেস্টিগেশন ২.৫: TWA Flight 800 Conspiracy

  “যাবৎ জীবেৎ সুখং জীবেৎ, ঋণং কৃত্ত্বা ঘৃতং পিবেৎ যদ্দিন বাচো সুখে বাচো, ঋণ কইরা হইলেও ঘি খাও.

Re: ক্র্যাশ ইনভেস্টিগেশন ২.৫: TWA Flight 800 Conspiracy

https://www.youtube.com/watch?v=vaIbpSaEoYc

আমিও একটা দিলাম। smile

....

Re: ক্র্যাশ ইনভেস্টিগেশন ২.৫: TWA Flight 800 Conspiracy

thumbs_up thumbs_up

খুব মন দিয়ে বহুদিন পর একটা  টপিক পড়লাম , সুন্দর চালিয়ে যান ।

নিবন্ধিতঃ১১/০৩/২০০৯ ,নিয়মিতঃ১০/০৩/২০১১, প্রজন্মনুরাগীঃ১৯/০৫/২০১১ ,প্রজন্মাসক্তঃ২৬/০৯/২০১১,
পাঁড়ফোরামিকঃ২২/০৩/২০১২, প্রজন্ম গুরুঃ০৯/০৪/২০১২ ,পাঁড়-প্রাজন্মিকঃ২৭/০৮/২০১২,প্রজন্মাচার্যঃ০৪/০৩/২০১৪।
প্রেম দাও ,নাইলে বিষ দাও