টপিকঃ সায়েন্স ফিকশন: মঙ্গলের ছায়া (১)

অধ্যায় এক: দেশের মেধা ফেরত আসতে শুরু করেছে দেশে

২০১৪ সাল। পয়লা ফেব্রুয়ারি। সন্ধ্যা সাতটা। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়।

একটু আগে বাংলা একাডেমি চত্বরে একুশের বইমেলা উদ্বোধন করে এলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী এবং শিক্ষামন্ত্রী। মেলার উদ্বোধনী বক্তব্যে অন্যান্য অনেক কথার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করলেন যে- দরিদ্র রাষ্ট্র হয়েও মানব উন্নয়ন সূচকগুলোতে বাংলাদেশ অব্যাহতভাবে যে উন্নতি করছে, তা এককথায় অভাবনীয়। আর তা সম্ভব হয়েছে এদেশের খেটেখাওয়া মানুষগুলোর দিনরাত পরিশ্রমের ফলে। পাশাপাশি শিক্ষাদীক্ষায় তরুণরা যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, তাতে এটা স্পষ্ট যে, একদিন বাংলাদেশের এই মেধাবী তরুণরাই বিশ্বকে নেতৃত্ব দিবে।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য ও আশাবাদগুলো তাৎক্ষণিকভাবে অনলাইন নিউজ মিডিয়াগুলো গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করলেও উপস্থিত সুধীবৃন্দ তা কতোটুকু গুরুত্বের সঙ্গে নিলেন কে জানে! হয়তো তারা এগুলোকে প্রধানমন্ত্রীর রুটিন বক্তব্য হিসেবেই ধরে নিয়েছেন, তাদের চোখেমুখেই তা স্পষ্ট। কিন্তু তারা জানেন না, প্রধানমন্ত্রী যা বলেন, তা সিরিয়াসলিই বলেন। তিনি এমন অনেক বিষয়ে কূটনৈতিক জ্ঞান রাখেন এবং এসব জ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নেন, যেগুলো সুশীল নাগরিকদের ধরাছোঁয়ার বাইরে। একজন যোগ্য নেতৃত্বের কাছে এটাই তো প্রধান চাওয়া। প্রধানমন্ত্রীর ওই আশাবাদও সেরকমই দূরদর্শী, চমকজাগানো, টেকসই এবং দুনিয়া-বদলানোর প্রয়াসে একটি উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার প্রাথমিক ধাপ মাত্র। আর পরিকল্পনার মূল পর্বটি সম্ভবত শুরু হতে যাচ্ছে এই সন্ধ্যায়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে।

বইমেলায় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সংস্কৃতিমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রীর যাওয়াটাও কাকতালীয় নয়। মেলায় যেতে যেতে প্রধানমন্ত্রী দুই মন্ত্রীর সঙ্গে পরিকল্পনাটার কিছু কিছু বিষয় শেয়ার করলেন, মন্ত্রীদ্বয়েরও মতামত জানতে চাইলেন। মন্ত্রীপরিষদের সদস্যদের মধ্যে এই দুই মন্ত্রী যেভাবে স্বপ্ন দেখেন, প্রতিনিয়তই প্রধানমন্ত্রীর কাছে নতুন নতুন পরিকল্পনা হাজির করেন এ দেশটাকে কেন্দ্র করে, তা তাঁর খুবই পছন্দ- যদিও তিনি তা কখনো মুখফুটে মন্ত্রীদেরকে বলেন নি। আর সম্ভবত এ কারণেই প্রধানমন্ত্রীর প্রাথমিক পরিকল্পনাটি শোনার সৌভাগ্য হয়েছে এই দুই মন্ত্রীর।

আগের দিনই সব মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীদের ফোন করে বলা হয়েছিল, প্রধানমন্ত্রী সব মন্ত্রীদের সঙ্গে ভিন্ন একটি বিষয়ে কথা বলার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বসতে চান। তাই নির্ধারিত সময়ের আগেই সবাই হাজির। প্রধানমন্ত্রী বিজ্ঞানমন্ত্রী এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিমন্ত্রীকে আলাদাভবে কিছু কাজ দিয়েছিলেন যেগুলো আজকের সভায় কাজে লাগবে। তাঁরাও যথাযথভাবে প্রস্তুত হয়ে এসেছেন। অন্যান্য মন্ত্রীরা অবশ্য আজকের এই সভার বিষয়বস্তু সম্পর্কে ওয়াকিফহাল নন, ফলে তাঁরা একধরনের অস্বস্তিতে ভুগছেন। যা হোক, নির্ধারিত সময়ে প্রধানমন্ত্রী সভাকক্ষে প্রবেশ করলেন। সঙ্গে সংস্কৃতিমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রী।

সভাকক্ষের নির্ধারিত চেয়ার বাদ দিয়ে অপরাপর মন্ত্রীদের সঙ্গে বসে পড়লেন প্রধানমন্ত্রী। তারপর হাস্যোজ্জ্বলভাবে বললেন, “আপনারা কে কে চা খাবেন? কে কে কফি? দেখি আমার সঙ্গে কার কার মিল আছে”?

প্রধানমন্ত্রীর এ ধরনের মিশুকে আচরণের সঙ্গে সবাই পরিচিত। ফলে দ্রুত জানা গেল কয়জন চা আর কয়জন কফি খেতে আগ্রহী। যারা চা খেতে আগ্রহী, তাঁদেরকে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, দুধ চা নাকি লাল চা? চিনি ছাড়া চা নাকি চিনিসহ। লাল চায়ে আদা-লেবু থাকবে কি থাকবে না? দেখা গেল একেকজনের একেক অভ্যাস। প্রধানমন্ত্রী হাসতে হাসতে বললেন, “আপনাদের সবার সঙ্গেই আমার মিল আছে। আমি সারা দিনে সব ধরনের চা-ই খাই- মেজাজমর্জির ওপর নির্ভর কখনো দুধ চা, কখনো লাল চা, কখনও চিনিসহ বা ছাড়া। আর লাল চায়ে আদা-লেবু তো থাকেই। আর কফি! সে তো আমার সারাক্ষণের বন্ধু”। বলে তিনি সহকরীকে বললেন সবাইকে যেন পছন্দমতো চা-কফি দেয়া হয়। নিজের জন্য চাইলেন কফি; কিন্তু বলে দিলেন, যতোক্ষণ তিনি থাকবেন এই সভায়, একেক ধরনের চা-কফি যেন তাঁকে একটু পরপর দেয়া হয়।

অনেকটা অনানুষ্ঠানিকভাবেই সভা শুরু করলেন প্রধানমন্ত্রী। প্রথমে জানতে চাইলেন, আজকে কারও তাড়াহুড়া আছে কিনা কারণ তিনি সম্পূর্ণ নতুন একটি পরিকল্পনা সবার সামনে উপস্থাপন করবেন এবং এ বিষয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে প্রচুর সময় লাগবে। জানা গেল, কারোরই কোনো তাড়া নেই। সুতরাং প্রধানমন্ত্রী আধাঘণ্টা সময় নিয়ে তাঁর পরিকল্পনা সম্পর্কে সংক্ষিপ্তাকারে ব্রিফ করলেন মন্ত্রীপরিষদের সমস্ত সদস্যকে।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য শুনে দুজন ছাড়া বাকি সব মন্ত্রীর চোখ ছানাবড়া। এও কি সম্ভব?

প্রধানমন্ত্রী বলে চলেছেন, “আমার এই পরিকল্পনা হয়তো আপনাদের কাছে অবিশ্বাস্য ঠেকছে। কিন্তু বিশ্বাস করুন, সব দিক ভেবেচিন্তেই আমি এই পরিকল্পনাটি আপনাদের সামনে উপস্থাপন করছি। যদি এটা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে পারি, তাহলে ২০৫০ সাল নাগাদ এই পৃথিবীকে নেতৃত্ব দিবে বাংলাদেশ। আজকে যারা বাংলাদেশের নাম শুনলে ভ্রু কুঁচকায়, মুখে বড় বড় কথা বললেও মনে মনে বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি ছাড়া আর কিছু মনে করে না, এ দেশটিকে যারা নানা ষড়যন্ত্র ও কৌশলে গরীব রাখতে চায়, মাত্র একটি পরিকল্পনাকে বাস্তবায়ন করে আমরা তাদেরকে দেখিয়ে দিতে পারি, এই বিশ্বে পরাশক্তি বলতে যা বুঝায়, সত্যিকার অর্থে সেরকম পরাশক্তির নাম হবে বাংলাদেশ। অবশ্য পরাশক্তিরা বাদবাকি বিশ্বের সঙ্গে যে ধরনের আচরণ করে, আমরা মোটেই সেরকম হতে চাই না; আমরা সবাইকে নিয়েই এগিয়ে যেতে চাই, কিন্তু বাংলাদেশের নাম উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সবাই যেন দেশটিকে, দেশের মানুষকে সমীহ করতে চলে, সেটা দেখা আমার অন্যতম একটি স্বপ্ন”।

প্রধানমন্ত্রী বলছেন, “আর সবকিছুই নির্ভর করবে আজকে আমরা এখান থেকে কী সিদ্ধান্ত নিই, তার ওপর। তবে সিদ্ধান্তটির কার্যকারিতা অনেকাংশে নির্ভর করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে আসা আজকের ভাষণের পর। আর মাত্র মিনিট পাঁচেক পরেই শুরু হবে সেই ভাষণ। ভাষণটি শুনে আমরা তারপর বিস্তারিত পরিকল্পনায় বসবো”।

ফুল ভলিউমে টেলিভিশন চলছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে। প্রধানমন্ত্রীসহ সবার মনোযোগ এখন টেলিভিশনের প্রতি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট শুরু করেছেন তাঁর ভাষণ। মাত্র মিনিট দশেকের ভাষণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট দেশের (এবং অবশ্যই বিশ্বের) জনগণকে কয়েকটি নতুন সিদ্ধান্ত জানালেন। তোলপাড় শুরু হয়ে গেল সারা বিশ্বেই। হাসিমুখে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তাকালেন অন্যান্য মন্ত্রীদের দিকে। দেখলেন, একই রকম হাসিমুখে তাকিয়ে আছেন সংস্কৃতিমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রী। অন্য মন্ত্রীরা মার্কিন প্রেসিডেন্টের ভাষণের তাৎক্ষণিক তাৎপর্য বুঝলেও এর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর পরিকল্পনাকে মেলাতে ব্যর্থ হলেন, ফলে তাঁরা সবাই প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে প্রধানমন্ত্রীর দিকে তাকিয়ে আছেন। বিষয়টি উপলব্ধি করে প্রধানমন্ত্রী তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিমন্ত্রীকে বললেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শাটডাউন [১] সম্পর্কে সবাইকে খুবই সংক্ষেপে ব্রিফ করতে।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ পেয়ে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিমন্ত্রী তাঁর বক্তব্য শুরু করলেন, “আপনাদের হয়তো মনে আছে, ২০১৩ সালের অক্টোবরে জরুরি বাজেট পাসের বিষয়ে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট একমত হতে না পারায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এক গভীর সংকটে পড়তে যাচ্ছিল। ফলে বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির এই দেশটির অনেক কার্যক্রম তাৎক্ষণিকভাবে গুটিয়ে নিতে হয়েছিল। বন্ধ হয়ে গিয়েছিলে অনেক ওয়েব সাইট; এমনকি নাসার অনেক কার্যক্রম। জেনে বিস্মিত হবেন যে, এই 'শাট-ডাউন'-এর কারণে তাদের অনেকগুলো যুদ্ধজাহাজের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গিয়েছিল যা সাম্প্রতিক ইতিহাসে বিরল। অক্টোবরের ১৭ তারিখের মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জাতীয় বাজেট পাস করার আহ্বান জানান কিন্তু রিপাবলিকান সদস্যদের বিরোধিতার কারণে শুরুতে সেটি পাস হয় নি। ফলে লাখ লাখ সরকারি কর্মচারি বেকার হওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছিল; শেয়ার বাজার, স্বাস্থ্য-গবেষণা প্রকল্পসহ নানা ধরনের জরুরি কার্যক্রম স্থবির হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। একেবারে শেষ সময়ে রিপাবলিকান পার্টির সদস্যরা জাতীয় বাজেট পাস করায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত শাট-ডাউন থেকে মুক্তি পেয়েছিল, কিন্তু রিপাবলিকানরা যেসব শর্ত বেধে দিয়েছিল, সেগুলো না মানলে মাস কয়েক পরেই পুনরায় শাট-ডাউন অবস্থার সৃষ্টি হবে বলে তারা প্রেসিডেন্টকে সতর্ক করে দিয়েছিল। তারই ফলাফল দেখতে পেলেন আপনারা আজকে মার্কিন প্রেসিডেন্টের ভাষণে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শাট-ডাউন শুরু হয়ে গেছে। বিশ্ব অর্থনীতিতে এর তোলপাড় শুরু হবে যার প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে পারবো না আমরাও। আমি মনে করি, এ ধরনের...”। হাত তুলে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিমন্ত্রীকে থামিয়ে দিলেন প্রধানমন্ত্রী।

বললেন, “শাট-ডাউন সম্পর্কে একটা ধারণা পেলেন আপনারা। এখন আমরা আরেকটি বিষয়ে শুনবো বিজ্ঞান মন্ত্রীর কাছ থেকে”।

প্রধানমন্ত্রীর ইশারা পেয়ে শুরু করলেন বিজ্ঞানমন্ত্রী, “ওই অক্টোবরেই আরেকটি সংবাদ প্রকাশিত হয় মিডিয়াতে। নির্ধারিত সময়ে চাঁদা না দেওয়ায় জাতিসংঘ আর্থিক টানাটানিতে পড়ে গেছে। জানা যায়, জাতিসংঘে সবচেয়ে বেশি চাঁদা দেয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল ও ভেনেজুয়েলার কাছ থেকে বিরাট অঙ্কের টাকা পায় জাতিসংঘ। একমাত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছেই প্রায় আটশ কোটি টাকা পায় [২] জাতিসংঘ। সম্ভবত শাট-ডাউনের কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সেসময় তাদের নির্ধারিত চাঁদা দিতে ব্যর্থ হয়। অপরদিকে হিসাবনিকাশের পর দেখা যায় জাতিসংঘের কাছে অন্যতম শীর্ষ পাওনাদার দেশ হচ্ছে বাংলাদেশ”। বক্তব্য শেষ করে বসে পড়লেন বিজ্ঞান মন্ত্রী।

“বুঝলাম। কিন্তু এর সঙ্গে আমাদের আজকের বৈঠক বা পরিকল্পনার সম্পর্ক কী?” প্রশ্ন করলেন একজন সিনিয়র মন্ত্রী।

“সম্পর্ক আছে”, শুরু করলেন প্রধানমন্ত্রী, “অক্টোবরে যখন শাট-ডাউন আর জাতিসংঘের দেনাপাওনার হিসাবটি মিডিয়াতে আসে, তখনই ধারণা করি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থা এমনই করুণ যে, দেশটিকে ভালোভাবেই অর্থনৈতিক সঙ্কটের মোকাবিলা করতে হবে। এমনকি আজকে প্রেসিডেন্ট ভাষণে কী ধরনের বক্তব্য দিতে পারেন, সেটাও আঁচ করতে পারছিলাম তখন থেকেই। অপরদিকে জাতিসংঘে আমাদের আবাসিক প্রতিনিধির কাছ থেকে হিসাব নিয়ে দেখেছি, যে পরিমাণ টাকা আমরা জাতিসংঘের কাছে পাই, সেটা দিয়ে একটু আগে যে পরিকল্পনাটার কথা বললাম, সেটা ভালোভাবেই বাস্তবায়ন করা যাবে। কিন্তু সমস্যা হলো, জাতিসংঘের কাছ থেকে টাকাটা কীভাবে পাবো? নিজ উদ্যোগেই আমি জাতিসংঘের মহাসচিবের সঙ্গে কথা বলি। বলি যে, আমাদের দেশ অর্থনৈতিকভাবে কিছুটা সঙ্কটের মধ্যে আছে। এই অর্থটুকু পেলে আমাদের খুব সুবিধা হয়। তাছাড়া আশঙ্কা ছিল যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শাট-ডাউন একবার শুরু হয়ে গেলে তারা জাতিসংঘের চাঁদা পরে আর পরিশোধ করতে পারবে না আর সেটা না হলে আমাদের টাকা পাওয়ার আশাও ক্ষীণ! আমাদের অনুরোধের ফলে জাতিসংঘের মহাসচিব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেনাদার দেশগুলোর ওপর চাপ প্রয়োগ করে এবং সর্বশেষ ১৫ জানুয়ারিতে জাতিসংঘ আমাদের পুরো টাকাটাই পরিশোধ করে”।

স্মিত হেসে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “এরই ধন্যবাদস্বরূপ আমরা এ বছর শুরুতেই জাতিসংঘে আমাদের চাঁদাটা পরিশোধ করে দিয়েছি। শুধু তাই নয়, কৃতজ্ঞতাস্বরূপ আমরা পরবর্তী পাঁচ বছরের চাঁদাও অগ্রিম পরিশোধ করি। ফলে জাতিসংঘ যেমন আমাদের ওপর সন্তুষ্ট, তেমনি আমাদের উদাহরণ দিয়ে অপরাপর দেশগুলোকে তাদের চাঁদা জলদি পরিশোধের আহ্বান জানাচ্ছে”।

একটু থামলেন প্রধানমন্ত্রী। দারুণ এক চা দিয়ে গেল অফিস সহকারী। কুচি কুচি করে কাটা আদা ভাসছে। চুমুক দিয়ে বললেন, “আসুন এখন এই দুটো ঘটনার সঙ্গে আমার পরিকল্পনার যোগসূত্রটা শুনি”।

পরবর্তী তিনটি ঘণ্টা যেন টানটান উত্তেজনার মধ্য দিয়ে গেল। প্রধানমন্ত্রী তাঁর বিস্তারিত পরিকল্পনা হোয়াইট বোর্ডে এমন সরল ও প্রাঞ্জলভাবে জানালেন যে, মন্ত্রীসভার সদস্যবৃন্দের চোখ উত্তেজনায় চকচক করতে লাগলো। প্রথমদিকে কিছুটা দ্বিধা থাকলেও (কারও কারও মধ্যে এখনও আছে) সবাই একবাক্যে স্বীকার করতে বাধ্য হলেন যে, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে মহাবিশ্বে একতরফাভাবে রাজত্ব করবে বাংলাদেশ নামের এই ছোট্ট ভূখণ্ডটি এবং তার মেধাবী জনগণ। মন্ত্রীসভার অন্যান্য সদস্যরাও প্রধানমন্ত্রীর মূল পরিকল্পনার সঙ্গে কিছুটা যোগবিয়োগ করলেন, সবার মতামতে পরিকল্পনাটি আস্তে আস্তে পূর্ণতার দিকে এগুতে থাকলো।

রাত প্রায় বারোটার দিকে সভা শেষ হলো। দেশের অধিকাংশ মানুষ ঘুমিয়ে পড়েছে। তারা জানে না, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে এই মুহূর্তে যেসব পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে এই দেশের চেহারা অকল্পনীয়ভাবে বদলে যাবে। কোনো মেধাবী শিক্ষার্থী এখন থেকে আর বিদেশে পড়তে যাবে না, বরং বিদেশিরাই পড়তে আসবে এদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। ২০৫০ সালের মধ্যে সারা বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশ হয়ে উঠবে একটি আইকন। এই দেশটি দেখিয়ে দিবে- যুদ্ধের মাধ্যমে নয়, শিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে উন্নতি ঘটিয়ে একটি দেশ হয়ে উঠতে পারে বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি, যে দেশ অন্যান্য বিশ্বকে কখনও ভয় দেখায় না, বরং সহায়তা করে অকাতরে- উন্নতির জন্য। ধ্বংস নয়, আস্থা রাখে সৃষ্টিতে।

বৈঠক শেষ করার পূর্বে প্রধানমন্ত্রী পরিকল্পনাটিকে অবিশ্বাস্য দ্রুততার সঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য দায়িত্ব দেন শিক্ষামন্ত্রীকে। সঙ্গে থাকবেন বিজ্ঞানমন্ত্রী, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিমন্ত্রী, সংস্কৃতিমন্ত্রী এবং অর্থমন্ত্রী। তাছাড়া প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি তো আছেনই। অন্যান্য মন্ত্রীদের নির্দেশ দিলেন, এই কমিটির যে কোনো নির্দেশ বিনাবাক্যব্যয়ে সঙ্গে সঙ্গে করার জন্য। চোখ বন্ধ করে দৃঢ়তার সঙ্গে বলে উঠেন, “সাবাস, বাংলা দেশ, এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়ঃ/ জ্বলে পুড়ে-মরে ছারখার/ তবু মাথা নোয়াবার নয়” [৩]।

বৈঠককক্ষ থেকে সবাই বেরুলেন নতুন এক স্বপ্ন নিয়ে। কে জানে আজকে রাতে ঘুম হবে কিনা। নতুন বাংলাদেশ গঠনে তারাই যে মুখ্য ভূমিকা পালন করতে চলেছেন! এমন সময় প্রধানমন্ত্রী বললেন, “আজকে দুপুরে আমি নিজ হাতে রান্না করেছি। সবজি, মুরগির মাংস আর টেংরা মাছ। যাবেন নাকি? সবাই মিলে না হয় আজকে একসাথেই খাই! যদি বলেন তো বাসায় ফোন করে দিচ্ছি, যেতে যেতে ওরা ভাতটা রেঁধে ফেলুক। কী বলেন?”

সবাই একবাক্যে সম্মতি জানালেন। প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রীদের গাড়ি এগুচ্ছে গণভবনের দিকে। রাতে খেতে খেতে আরও কিছু আলোচনা করলেন পরিকল্পনাটি নিয়ে। সবাই যেন এখনও পরিকল্পনাতে মগ্ন। অন্য কিছু আলোচনার সময় নেই। খেতে খেতেই প্রচুর আলোচনা চললো। ফলে খাওয়াতে সময়ও লাগলো অনেক বেশি। রাতের খাওয়াটাও সবার একটু বেশিই হয়ে গেল! প্রধানমন্ত্রী যে এতো দারুণ রান্না করেন, তা অনেকেরই জানা ছিল না।

পরবর্তী একটা মাস এই কার্যক্রম দ্রুত এগুলো। কমিটি সদস্যরা মোটামুটি ৪-৫ ঘণ্টা ঘুমের সময় ছাড়া আর কোনো বিশ্রাম বা অবসরের সময় পান না। আসলে বলতে গেলে, তাঁরা বিশ্রাম বা অবসরের সময়টা নেনও না। নিজেদের সমস্ত শক্তি ও উদ্যম তাঁরা ব্যয় করছেন এই প্রজেক্টের পেছনে। নাম, খ্যাতি কিংবা জাগতিক কোনো সুবিধা নেয়ার আশায় নয়, দিনরাত তাঁরা খেটে চলেছেন বাংলাদেশকে তো বটেই, পুরো বিশ্বকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য। বাংলাদেশ যে কাজে নেতৃত্ব দিবে, বিশ্রাম সেখানে পরিত্যক্ত।

এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৪ সালের এপ্রিলের ৩ তারিখে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ডয়চে লুফ্‌টহানজা এ.জি.-এর [৪] একটি বিমান থেকে জার্মানি থেকে দেশের মাটিতে পা রাখলেন বিজ্ঞানী রায়হান আবীর।

***
প্রাসঙ্গিক টীকা

[১] মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির শাট-ডাউন সম্পর্কে কিছুটা আইডিয়া পাওয়া যাবে এখানে: http://www.bonikbarta.com/24news/2013/10/01/17825/print

[২] জাতিসংঘের কাছে শীর্ষ দেনাদার ও পাওনাদার দেশগুলোর তালিকা সম্পর্কে জানতে হলে দেখুন এই লিংকটি: http://www.banglanews24.com/detailsnews … 2013231227

[৩] কবিতার লাইনগুলো নেয়া হয়েছে সুকান্ত ভট্টাচার্যের দুর্মর কবিতা থেকে। পুরো কবিতাটি পাবেন এখানে: http://bn.wikisource.org/wiki/%E0%A6%A6 … E%E0%A6%B0

[৪] জার্মানির বৃহত্তম ও ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিমান সংস্থা। বিস্তারিত দেখুন এখানে: http://bn.wikipedia.org/wiki/%E0%A6%B2% … C%E0%A6%BE

***
পূর্বে সচলায়তন ব্লগে প্রকাশিত

আমার সকল টপিক

কোনো কিছু বলার নেই আজ আর...

Re: সায়েন্স ফিকশন: মঙ্গলের ছায়া (১)

পড়লাম। পরবর্তী পর্বের অপেক্ষায়  clap

রাবনে বানাদি ভুড়ি :-(

Re: সায়েন্স ফিকশন: মঙ্গলের ছায়া (১)

ওরে বাপরে, এত দারুণ লেখা। গৌতমদা আপনি এত ভাল লেখেন তা আমাদের আগে বুঝতে দেননি কেন?

পরের পর্বের অপেক্ষায় থাকলাম। আর অতি অবশ্যই +।

"সংকোচেরও বিহ্বলতা নিজেরই অপমান। সংকটেরও কল্পনাতে হয়ও না ম্রিয়মাণ।
মুক্ত কর ভয়। আপন মাঝে শক্তি ধর, নিজেরে কর জয়॥"

Re: সায়েন্স ফিকশন: মঙ্গলের ছায়া (১)

করছো এ কী! দাদা,
মনের মধ্যে ঢুকিয়ে দিলেন, বিরাট বিরাট ধাঁধাঁ!
শাট ডাউনের কেবল শুরু; তাতেই,
নামিয়ে দিলেন এত্ত বড়, সায়েন্স ফিকশন পাতেই!
এবার নিয়ে চা-কফি আর, পপ্পন,
অপেক্ষাতে কুটুর কুটুর, চিবাই যখন তখন ... ...

ছড়াবাজ'এর ওয়েবসাইট

লেখাটি CC by-nc-sa 3.0 এর অধীনে প্রকাশিত

Re: সায়েন্স ফিকশন: মঙ্গলের ছায়া (১)

দুর্দান্ত সূচনা দাদা ! এক চুমুকেই পড়ে ফেললাম ! পরের পর্বের পথ চেয়ে রইলাম ।

জানি আছো হাত-ছোঁয়া নাগালে
তবুও কী দুর্লঙ্ঘ দূরে!

লেখাটি CC by-nc-nd 3. এর অধীনে প্রকাশিত

Re: সায়েন্স ফিকশন: মঙ্গলের ছায়া (১)

নিজের দর্শন ও চিন্তাভাবনাকে জানানোর বিভিন্ন তরিকা আছে।

সায়েন্স ফিকশন নিঃসন্দেহে একটা সুখপাঠ্য মাধ্যম। প্রথম ধাপ দেশের মেধাকে দেশে ফিরিয়ে আনা ... ... একমত। অনলাইনের সুবিধা ব্যবহার করে দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাঁদের সুচিন্তিত মতামত দিয়ে অংশগ্রহণ বাড়ানো যেতে পারে। এর আগে শিক্ষানীতির ক্ষেত্রে এটা অনলাইনে ছেড়ে যেভাবে মতামত বা ফীডব্যাক নেয়া হয়েছিলো সেটা ভাল লেগেছিলো। এভাবে সরাসরি দেশে ফিরিয়ে না এনেও কিন্তু তাদের অংশগ্রহণ বাড়ানো যায়। যা হোক, আপনার চিন্তাভাবনাটা শোনার/পড়ার জন্য অধীর অপেক্ষায় থাকলাম।

শামীম'এর ওয়েবসাইট

লেখাটি CC by-nc-sa 3.0 এর অধীনে প্রকাশিত

Re: সায়েন্স ফিকশন: মঙ্গলের ছায়া (১)

তার-ছেড়া-কাউয়া লিখেছেন:

পড়লাম। পরবর্তী পর্বের অপেক্ষায়  clap

আশা করছি দিন কয়েকের মধ্যে পরবর্তী পর্ব দিতে পারবো। পড়ার জন্য ধন্যবাদ। smile

আরণ্যক লিখেছেন:

ওরে বাপরে, এত দারুণ লেখা। গৌতমদা আপনি এত ভাল লেখেন তা আমাদের আগে বুঝতে দেননি কেন?

বলেন কি! আমি যে দুর্দান্ত লিখি এটা জানতেন না! wink

না রে ভাই, আমি তেমন ভালো লিখতে পারি না। এইটা লিখতে আমার ৪-৫ দিন টাইম লেগেছে। তাহলে ভাবেন কীরকম লেখক আমি।

ছড়াবাজ লিখেছেন:

করছো এ কী! দাদা,
মনের মধ্যে ঢুকিয়ে দিলেন, বিরাট বিরাট ধাঁধাঁ!
শাট ডাউনের কেবল শুরু; তাতেই,
নামিয়ে দিলেন এত্ত বড়, সায়েন্স ফিকশন পাতেই!
এবার নিয়ে চা-কফি আর, পপ্পন,
অপেক্ষাতে কুটুর কুটুর, চিবাই যখন তখন ... ...

বাহ্ আপনি তো দারুণ ছড়া লিখেন! পড়ার জন্য অনেক অনেক ধন্যবাদ। smile

জামিল মণ্ডল লিখেছেন:

দুর্দান্ত সূচনা দাদা ! এক চুমুকেই পড়ে ফেললাম ! পরের পর্বের পথ চেয়ে রইলাম ।

অনেক ধন্যবাদ। আশা করি পরের পর্ব আসবে কিছুদিনের মধ্যেই।

শামীম লিখেছেন:

নিজের দর্শন ও চিন্তাভাবনাকে জানানোর বিভিন্ন তরিকা আছে।

সায়েন্স ফিকশন নিঃসন্দেহে একটা সুখপাঠ্য মাধ্যম। প্রথম ধাপ দেশের মেধাকে দেশে ফিরিয়ে আনা ... ... একমত। অনলাইনের সুবিধা ব্যবহার করে দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাঁদের সুচিন্তিত মতামত দিয়ে অংশগ্রহণ বাড়ানো যেতে পারে। এর আগে শিক্ষানীতির ক্ষেত্রে এটা অনলাইনে ছেড়ে যেভাবে মতামত বা ফীডব্যাক নেয়া হয়েছিলো সেটা ভাল লেগেছিলো। এভাবে সরাসরি দেশে ফিরিয়ে না এনেও কিন্তু তাদের অংশগ্রহণ বাড়ানো যায়। যা হোক, আপনার চিন্তাভাবনাটা শোনার/পড়ার জন্য অধীর অপেক্ষায় থাকলাম।

আপনার মতামতের জন্য অনেক ধন্যবাদ শামীম ভাই। আসলে এখানে আমি আমার ব্যক্তিগত চিন্তাভাবনা বা দর্শনকে যুক্ত করি নি, ওটা অনেক বড় ব্যাপার। আপাতত এটাকে একটা নিখাদ সায়েন্স ফিকশন হিসেবে মনে করলেই খুশি হবো।

পরের পর্ব আসছে শিগগিরই।

আমার সকল টপিক

কোনো কিছু বলার নেই আজ আর...

Re: সায়েন্স ফিকশন: মঙ্গলের ছায়া (১)

২য় পর্ব শেষ করে প্রথম পর্ব পড়লাম । দারুন  love

এই ব্যাক্তির সকল লেখা কাল্পনিক , জীবিত অথবা মৃত কারো সাথে মিল পাওয়া গেলে তা সম্পুর্ন কাকতালীয়, যদি লেখা জীবিত অথবা মৃত কারো সাথে মিলে যায় তার দায় এই আইডির মালিক কোনক্রমেই বহন করবেন না। এই ব্যক্তির সকল লেখা পাগলের প্রলাপের ন্যায় এই লেখা কোন প্রকার মতপ্রকাশ অথবা রেফারেন্স হিসাবে ব্যবহার করা যাবে না।

Re: সায়েন্স ফিকশন: মঙ্গলের ছায়া (১)

আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। smile

আমার সকল টপিক

কোনো কিছু বলার নেই আজ আর...