সর্বশেষ সম্পাদনা করেছেন আরণ্যক (৩০-০৭-২০১৩ ২০:১০)

টপিকঃ ফেরা

২৩ এপ্রিল, ২০১৩, সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা। কাঁচে ঘেরা খেলনার দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আর এক বার পকেটে হাত বুলিয়ে নিলেন রহমান সাহেব। না, ফেক্টরী থেকে বের হবার সময় তাড়াহুড়ায় ঢুকানো টাকা গুলি জায়গা মতই আছে। চারদিকের যে অবস্থা, পকেটে ঢুকানো টাকা যে সব সময় নিজের পকেটেই থাকবে তার গ্যারান্টি কই? কাপড়ের নীচের কাগজের টুকরো গুলি তাকে আরও একবার আশ্বস্ত করলো।

দেড় হাজার টাকা! গার্মেন্টস ফেক্টরীর ফোরম্যানের চাকুরী করা একজনের কাছে অনেক টাকা। একটা খেলনার পেছনে এত টাকা খরচ করতে মন ঠিক সায় দিচ্ছে না। এ ছাড়া তার নিজের জন্যে কিছু জরুরি কেনা-কাটা করা দরকার। নাহ, এবার বোধহয় কেনা হচ্ছে না। একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে কাঁচের ওপাশের চকচকে খেলনা গুলি থেকে চোখ সরিয়ে নিলেন তিনি। ভর সন্ধ্যায় আলোয় ঘেরা কাঁচের ঘর থেকে খেলনা গুলি যেন তাকে মুখ ভাঙাচ্ছে। ফিরে যাবার উদ্যোগ নিতেই সাত বছরের ছেলের মুখ ভেসে উঠলো রহমান সাহেবের চোখের সামনে। আহারে, ছোট ছেলেটা কত আশা নিয়েই না অপেক্ষা করছে তার ফেরার। সে যখন জানতে পারবে তার বাবা কথা রাখে নি; তখন কি কষ্টটাই না পাবে! নিজের ছোটবেলার কথা মনে পরে গেল।

পাশের বাসার ছেলেটিকে জন্মদিনে সাইকেল কিনতে দেখে রহমান সাহেবেরও শখ হয়েছিলো সাইকেল কেনার। ক্রমেই সে শখ পরিণত হয় জেদে। সামান্য কেরানীর চাকুরী করা বাবা তার অবাধ্য জেদের কাছে হার মেনে বলেছিলেন, সামনের মাসে কিনে দেবেন। এরপর মাসের পর মাস যায়, কিন্তু সামনের মাস আর আসে না। তার অনবরত প্রশ্নের শেষ জবাব দিয়েছিলেন বাবা প্রচন্ড মারের মধ্য দিয়ে। ছোটবেলার সে ঘটনা মনে পড়লে আজও রহমান সাহেব কষ্ট অনুভব করেন। সাইকেল না পাবার বেদনা, নাকি বাবার মার, কোনটা এই কষ্টের মুখ্য কারণ তা অবশ্য ঠিক বুঝে উঠতে পারেন না।

‘না, আমার ছেলের সাথে এমন হতে দিবো না। এ মাসটা নাহয় একটু কষ্ট করেই কাটাই।’ ছোটবেলার স্মৃতি রহমান সাহেবকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করলো। ঠিক এসময় পকেটে থাকা মোবাইলের রিংটোনের শব্দে তিনি কল্পনার সুতো ছিড়ে বর্তমানে ফিরে আসলেন। স্ত্রীর ফোন।
-হ্যালো, আসসালামু অলাইকুম।
-অলাইকুম আসসালাম। হ্যালো, বাবা আমি রাতুল বলছি।

ছেলে ফোন করেছে তার মার মোবাইল থেকে। ছেলের কচি কণ্ঠে বাবা ডাকে রহমান সাহেবের মনটা ভরে গেল।
-হ্যাঁ, বাবা বলো।
-বাবা, তুমি কেমন আছো?
-এই তো বাবা ভালো আছি।
-আচ্ছা বাবা, তুমি কি আমার জন্যে রিমোট কন্ট্রোল গাড়িটা কিনেছো?
-না বাবা! এখনও কেনা হয় নি।
-এখনও কেনো নি! তুমি কিন্তু বাবা কথা দিয়েছিলে, আমি পরীক্ষায় প্রথম হলে এবার বাসায় ফেরার সময় রিমোট কন্ট্রোল গাড়ি কিনে নিয়ে আসবে। মা বললো, তুমি কালকে বাসায় আসছো, আর এখনও গাড়ি কেনো নি! তুমি কি কথা রাখবা না বাবা?
-অবশ্যই রাখবো বাবা! আমি তো এখন তোমার খেলনা কিনতেই এসেছি।
-সত্যি বাবা!
-হ্যাঁ বাবা সত্যি। আচ্ছা শোন বাবা, তুমি কি রংয়ের গাড়ি নিবে? লাল না হলুদ।
-লাল রং বাবা!
-আচ্ছা ঠিক আছে।
-আর শোন বাবা, যে গাড়িটা বেশি জোরে চলে সেই গাড়ি কিনবা। ঠিক আছে বাবা?
-ঠিক আছে।
-হ্যাঁ, সবচেয়ে জোরে চলা গাড়িটাই কিনবা। বাবা, এই যে মা তোমার সাথে কথা বলবে। আমি রাখছি, খোদা-হাফেজ।
-খোদা হাফেজ বাবা।
-এই রাতুলের বাবা শুনছো, তোমার অত টাকা নষ্ট করে খেলনা কেনার কোনো দরকার নেই। তোমার নিজের তো কিছু খরচ আছে। আমি রাতুলকে বুঝিয়ে বলবো। দেখ ঠিক বুঝবে।
-আরে না, তার দরকার হবে না। খুব বেশি টাকা তো না। ঠিক ম্যানেজ করে নিবো।
-ঠিক আছে তাহলে। আর শোন, কাল সকালের জন্যে অপেক্ষা করার কি দরকার। খেলনাটা কিনে আজ সন্ধ্যায় চলে আসো না। রাতুল বার বার তোমার কথা বলছে।
-সম্ভব না। কাল সকালে অফিসে একবার যেতেই হবে। চিন্তা কর না, যতটা সম্ভব তাড়াতাড়ি রওনা দেবো। তুমি ভালো থেকো।
-আচ্ছা। তুমিও ভালো থেকো। খোদা হাফেজ।

পকেটে মোবাইল ফোনটি ঢুকাতে ঢুকাতে রহমান সাহেবের ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠলো। তার বৌ কখনও তাকে নিয়ে কোনো চিন্তা করে না। সব চিন্তা রাতুলই করে। স্ত্রী-সন্তানের হাসি মাখা মুখ কল্পনা করতে করতে রহমান সাহেব ঢুকে পরলেন খেলনার দোকানে। দেড় হাজার টাকা খরচ করতে তার আর কোনো দ্বিধা নেই।

২৪ এপ্রিল সকাল নয়টা ত্রিশ মিনিট। সাভারের ‘রানা প্লাজার’ তিন তলা। রহমান সাহেব ফেক্টরী অফিসে। তিন দিনের ছুটিতে বাড়ি যাচ্ছেন, তাই আজ একটু সকালে এসে সব কাজ বুঝিয়ে দিয়েছেন। এখন মোটামুটি ফাঁকা। আর একটু পরেই বের হবেন বাস ধরতে। এ বিল্ডিং এ বলে কি সব সমস্যা দেখে গেছে। তাড়াতাড়ি বের হওয়াই ভালো। এমন সময় বাসা থেকে ফোন-
-হ্যালো, আসসালামু অলাইকুম।
-অলাইকুম আসসালাম। বাবা আমি রাতুল। তুমি কখন রওনা দিবা?
-এই তো বাবা, আর একটু পরেই।
-আমার গাড়িটা ঠিক মত নিয়েছো তো?
-হ্যাঁ বাবা নিয়েছি।
-আচ্ছা বাবা, গাড়িটার রং কেমন?
-লাল, কালকে রাতেই তো বললাম বাবা।
-আচ্ছা গাড়িটা খুব জোড়া চলে তাই না বাবা?
-হুম!
-বাবা, গাড়িটা কি তোমার চেয়ে জোড়ে যেতে পারবে?
-তা তো জানি না বাবা!
-বাবা তুমি তাড়াতাড়ি চলে এসো.....

রহমান সাহেব তার ছেলের সাথে যখন মধুর আলাপচারিতায় ব্যস্ত হঠাৎই বীভৎস, কুৎসিত শব্দ। তারপর সব কিছু যেন ভেঙ্গে পড়লো হঠাৎ করেই। রহমান সাহেব চাপা পড়লেন একতাল জঞ্জালের মধ্যে। তার হাতে ধরা মোবাইল থেকে তখনও ভেসে আসছে রাতুলের কণ্ঠ।
-হ্যালো বাবা, এটা কিসের শব্দ। বাবা তুমি কথা বলছো না কেন? বাবা, ও বাবা তুমি কি শুনতে পাচ্ছো........

------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

প্রিয় পাঠক: রহমান সাহেবের গল্প এখানেই শেষ। রহমান সাহেব এবং রাতুলের কি হলো তা পুরোপুরি নির্ভর করছে আপনাদের উপর।

* আপনি ধরে নিতে পারেন, রহমান সাহেবের কিছুই হয় নি। কিছু অকুতভয় উদ্ধারকর্মীদের সহযোগিতায় তিনি সেই মৃত্যুকূপ থেকে অক্ষত অবস্থায় বের হতে পেরেছিলেন। রাতুল তার বাবাকে ফিরে পেয়েছে ভেবে আপনি আনন্দিত হতে পারেন। সেই উদ্ধারকর্মীদের জন্যে আন্তরিক ভাবে দোয়া করতে পারেন। কিন্তু সেখানে থাকা হাজারও মানুষ, যারা রহমান সাহেবের মত ভাগ্যবান ছিলেন না, তাদের কথা ভেবে আপনার আনন্দ উড়ে যেতে সময় লাগবে না।

* আপনি ধরে নিতে পারেন, রহমান সাহেবকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু তার একটি হাত এবং একটি পা কেটে ফেলতে হয়েছে। অথবা আপনি ধরে নিতে পারেন- রহমান সাহেব মারা গেছেন। অসহায় রাতুলের কথা ভেবে আপনার মন কেঁদে উঠতে পারে। 

অসহায় এবং সঞ্চয়হীন অথবা এতিম এসব মানুষের পু্নর্বাসনের জন্যে প্রয়োজন সামর্থ্যবানদের সরাসরি সহযোগিতার। আপনি জানেন, কিছু সংগঠন এদের পূনর্বাসনের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। আপনি সামর্থ্য মত সাহায্য (অর্থ, সময় বা শ্রম)  প্রত্যক্ষ ভাবে রহমান সাহেব কে বা রাতুল কে বা ইনাদের মত কাউকে সহযোগিতা করতে পারেন। মানুষ হিসাবে কিছু হলেও দায়িত্ব পালন করতে পারেন।



.......
আসলে কোন ঘটনা ঘটে যাবার পর আমরা আবেগ থেকে অনেক কাজ করে ফেলি। কখনও কখনও প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কাজ করি। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদী কাজে আমাদের লেগে থাকার প্রবণতা কম।  যেমন সাভারের সেই ঘটনার পর আমি যে সংগঠনে সেচ্ছা সেবক হিসাবে কাজ করি তারা দুদিনে তিন হাজার ব্যাগের বেশি রক্ত সংগ্র করে। সবাই তখনই রক্ত দিবেন। লম্বা লাইন। অথচ তাদের অনেকেই পরে প্রয়োজনে আর রক্ত দিতে রাজি করাতে পারা যাচ্ছে না। অথচ রক্তের প্রয়োজন এখনও আছে! ( সরাসরি আহতদের ছাড়াও আমাদের প্রতিষ্ঠান থেকে কিছু হাসপাতালে (যেখানে আহতরা ছিলেন) রক্ত সরবরাহ করা হয়।)

সাভার ট্রেজেডিতে যারা কাজ করেছেন আন্তরিক ভাবে, তাদের সবার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে বলছি- এখনও দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়নি। এখনও অনেক কিছু করার আছে, করতে হবে।

"সংকোচেরও বিহ্বলতা নিজেরই অপমান। সংকটেরও কল্পনাতে হয়ও না ম্রিয়মাণ।
মুক্ত কর ভয়। আপন মাঝে শক্তি ধর, নিজেরে কর জয়॥"

Re: ফেরা

এইসব একদম ঠিকনা। ইফতারীর আগে এইভাবে......... crying

রাবনে বানাদি ভুড়ি :-(

Re: ফেরা

আরণ্যকের লেখা বরাবরই একটু অন্যরকম ! এটাও তার ব্যতিক্রম নয়।  thumbs_up

Re: ফেরা

আরও একবার ঘটনার ভয়াবহতা মনে পরে গেল। অসহায় মানুষ গুলোর কথা মনে পরে খারাপ লাগছে।

Re: ফেরা

যারা লেখাটি যারা পড়েছেন তাদের সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ।

ইলিয়াস ভাই, কাউয়া ভাই, রিহাম ভাইকে ধন্যবাদ মন্তব্য করে উৎসাহ যোগানোর জন্য।

"সংকোচেরও বিহ্বলতা নিজেরই অপমান। সংকটেরও কল্পনাতে হয়ও না ম্রিয়মাণ।
মুক্ত কর ভয়। আপন মাঝে শক্তি ধর, নিজেরে কর জয়॥"

Re: ফেরা

হুম........ জীবন এমনই
হঠাৎই থেমে যায় সব কিছু

ভাল লাগল গল্প
আশাকরি এমন আরো  টপিক পাবো তোমার কাছ হতে ।

জাযাল্লাহু আন্না মুহাম্মাদান মাহুয়া আহলুহু......
এই মেঘ এই রোদ্দুর

Re: ফেরা

বাহ্ ফাইন!

Re: ফেরা

ঘটনার শুরু দেখেই অন্য রকমের একটা ঘ্রাণ অনুভব করেছিলাম তবে শেষের ভাবনাগুলো কিবা প্রশ্নগুলো বাস্তব পরিস্থিতি অনুধাবনে সত্যিই সহায়ক হয়েছে। এখন শুধু আবেগ নয় বরং পরিস্থিতি মোকাবিলার বাস্তবিক পদক্ষেপ গ্রহণ করাটাই প্রয়োজনীয়।

আরণ্যক ভাইয়ের লিখায় আশা করি অনেকের মনই জাগ্রত হবে।

হে আল্লাহ, তুমি সকলের মঙ্গল কর; তোমার রহমতের আশ্রয়ে আশ্রিত কর..... আমীন
সঠিক পদ্ধতিতে ওয়ার্ডপ্রেস ইন্সটল করুন এবং আপনার ওয়ার্ডপ্রেস সাইটটিকে সুরক্ষিত রাখুন

কাজী আলী নূর'এর ওয়েবসাইট

লেখাটি GPL v3 এর অধীনে প্রকাশিত

Re: ফেরা

কিছু কিছু সময় এমন হয়।

১০ সর্বশেষ সম্পাদনা করেছেন আরণ্যক (০১-০৮-২০১৩ ০০:০৭)

Re: ফেরা

যারা কষ্ট করে পড়েছেন সবাইকে আর একবার ধন্যবাদ। hug

যারা মন্তব্য করেছেন বা লাইক দিয়েছেন সবাইকে বিশেষ ধন্যবাদ।

@কাজী ভাই: যদি হয়- তাহলে তো ভাল হয়। লেখার উদ্যেশ্য সার্থক হয়।

"সংকোচেরও বিহ্বলতা নিজেরই অপমান। সংকটেরও কল্পনাতে হয়ও না ম্রিয়মাণ।
মুক্ত কর ভয়। আপন মাঝে শক্তি ধর, নিজেরে কর জয়॥"