টপিকঃ আমেরিকায় এক বছর এবং মধ্যবিত্ত ছাত্রদের বাস্তবতা (পর্ব ৬)

এবার আসি থিয়েটার এর কথায়। থিয়েটার ক্লাস হতো সপ্তাহে দুই দিন, তিন ঘন্টা করে। প্রথম দিন গেলাম, সবার সাথে পরিচয় হলাম, থিয়েটার এর ইতিহাস বললেন প্রফেসর। আমি ভাবলাম আহ নিশ্চিন্ত.....এই ভাবেই কেটে যাবে। নাটকের ইতিহাসের উপর থিওরীর পরীক্ষা দিব। পরের ক্লাস এ প্রফেসর বললেন পুরো কথা, প্রতিদিন সবাই একটা করে ছোট অভিনয় করবে, মিড-টার্ম আর ফাইনাল এ কোনো একটা পুরো দৃশ্য করতে হবে। আমার অবস্থাটা চিন্তা করেন তখন, পুরা ছাইড়া দে মা কাইন্দা বাচি। বলে রাখা ভালো আমাদের থিয়েটার ক্লাস কিন্তু আসলেই মঞ্চে হতো। মন্টানা স্টেট ইউনিভার্সিটির নিজস্ব থিয়েটার আছে (ব্ল্যাক বক্স থিয়েটার)। প্রথম কয়েক ক্লাস যে কি অবস্থা গেছে তা যত কম মনে করা যায় ততই মঙ্গল। খাপ খাওয়াতে পারছিলাম না। ক্লাসে গেলে লজ্জায় মাথা কাটা যায় অবস্থা। একটা চাইনিজ মেয়ে ছিল, একই অবস্থার। আমরা দুজনেই শুধু এই ক্লাস এ ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট। শেষে ও আর আমি মিলে প্রফেসর কারা এর সাথে কথা বললাম। তাকে বললাম আমি জীবনেও এগুলা করি নাই, ইংরেজি আমার মাতৃভাষা না হওয়ায় যখন ডায়লগ ডেলিভারি দেই তখন ইমোশন আসে না। আর বড় ডায়লগ মনে রাখতেও আমার বেশ সমস্যা হচ্ছে। যারা এখানকার তারা ডায়লগ ভুলে গেলেও কাছাকাছি কিছু একটা বলে চালিয়ে দেয়, যেটা আমার পক্ষে সম্ভব হয় না। উনি বললেন তোমাদের প্রধান সমস্যা তোমরা স্টেজ এ খুব নার্ভাস হয়ে যাও। নার্ভাস হওয়ার কিছু নাই। এইখানে তোমরা শিখতে আসছ। না পারা টাই স্বাভাবিক। চাইনিজ মেয়েটা বলল অন্য সবাই এত ভালো করে যে, পরে আমার নার্ভাস লাগে। প্রফেসর বললেন অভিনয়ে ভাষা কোনো ব্যাপার না। তোমরা চাইলে নিজেদের ভাষার কোনো কিছুর অভিনয় করতে পার। আমি ভাবলাম যে আমি আসাদুজ্জামান নুর হয়া যাই নাই যে বাংলায় ডায়লগ দিয়ে এক্সপ্রেশন এর মাধ্যমে দর্শকদের পুরা অভিনয় খাওয়া দিব। তাই তাকে বললাম যে আমার ধারণা এইটা করলে আরো খারাপ হওয়ার সম্ভবনা আছে যেহেতু আমি অভিনয় কিছুই পারি না। উনি বললেন আচ্ছা দেখি কি করা যায়। পরের ক্লাস থেকে স্টেজ বাদে বাকি সব আলো নিভানো থাকত যাতে অভিনয়ের সময় অন্য কাউকে দেখা না যায়। এটা হেল্প করেছিল। কারা প্রায়ই নানা টিপস দিতেন এছাড়া যারা ভালো অভিনয় করত তাদের কাছ থেকেও অনেক হেল্প নিয়েছি। আস্তে আস্তে সহজ লাগলো সব, মজা পেতে শুরু করলাম।

ক্লাস এর শুরুতে চরম এক সীন হত, সবাই সবার দিকে ভেংচি দিয়ে তাকিয়ে আছি। হঠাত দেখলে কেউ তাই মনে করত। আসল ঘটনা ছিল প্রফেসর কারা আমাদের ক্লাস এর শুরুতে মুখের স্ট্রেস দূর করতে আর মাসল রিলাক্স করতে বিভিন্ন ধরনের মুখের ব্যায়াম করাতেন। ওগুলা আসলে ব্যায়ামের নামে ভেংচিই ছিল। সে এক কিম্ভুতকিমাকার পরিবেশ।

যখন মোটামুটি একটু বুঝে উঠছি তখন এসে গেল প্রথম এসাইনমেন্ট। কারা একটা সিচুয়েশন বলে দিবেন, দুই জন পার্টনার মিলে তার উপর একটা ৩-৫ মিনিটের ডায়লগ সহ এক্ট বানাতে হবে। লটারির মাধ্যমে পার্টনার সেলেক্ট করা হবে। আমার কপাল, কপালের নাম গোপাল। পার্টনার পড়ল এক মেয়ে। ম্যাকেঞ্জি। আলাস্কার নীলনয়না। সীন পড়ল একটা ইউনিসেক্স ওয়াশ রুমে আমি আর ও, একজন উৎফুল্ল, একজন টেনসড। আমার মনের অবস্থা তখন "খোদা! আমারে উডায় নাও! নাইলে দড়ি ফালাও, বায়া উডি যাই!" মেয়েও আমার সাথে পরেছে দেখে যারপরনাই বিরক্ত। ওকে দোষ দেই না। ওর জায়গায় আমি হলেও, একই মনোভাব হতো। শুরু হলো স্ক্রিপ্ট এর জন্য চিন্তা ভাবনা। কিছুই খুঁজে পাই না। আমিও মেয়ের উপর বিরক্ত কারণ আমি নাইলে বাবা আনাড়ি, তুই কিছু বাইর কর !!! মজার ব্যাপার হলো শেষ পর্যন্ত স্কিপ্টটা আমিই লিখি এবং তাতে আমার মান সম্মান ম্যাকেঞ্জির কাছে কিছুটা হইলেও বৃদ্ধি পায়। স্ক্রিপ্টটা ছিল এরকম- "একটা নাইট ক্লাব এর ওয়াশ রুমে আমি আর ও। ম্যাকেঞ্জি চিয়ারলিডার। কলেজের বিখ্যাত বাস্কেটবল প্লেয়ারের সাথে আজকে ওর প্রথম ডেট, তাই ও অনেক খুশি+এক্সসাইটেড। আমি বাদামী এক লোক, যে ডেটিং সাইট এ এক মেয়ের সাথে পরিচয়ের পর আজকে প্রথম দেখা করতে এসেছে। কিন্তু মেয়ে তাকে পছন্দ করে নাই। এই নিয়ে সে হতাশ। তো ওয়াশরুমে যখন ম্যাকেঞ্জি মেকাপ নিতে থাকে তখন আমি ওর কাছে একটু ফেস পাউডার আর চিরুনি চাই, নিজেকে মেয়েটার সামনে একটু সুন্দর করে উপস্থাপন করার জন্য। ম্যাকেঞ্জি অপরিচিত লোক দেখে এড়িয়ে যেতে চায়, কথা বলে না, পর পর দুটো মেয়ে এভয়েড করায় আমি ক্রেজি হয়ে যাই"। চরিত্রের ব্যাকগ্রাউন্ড আমরা এক্ট শুরুর আগেই বলে নেই। শুধু ওয়াশরুমের ঘটনাটুকু অভিনয় করি। খুব না জমলেও মিডিয়াম গ্রেড পাই এটায়।

সেকেন্ড এসাইনমেন্ট ছিল আমার আশেপাশের কোনো এক ইউনিক চরিত্র খুঁজে বের করে তার জায়গায় আমাকে অভিনয় করতে হবে। অভিনয় করতে হবে মানে আমি স্টেজ এ বসব, সবাই আমাকে প্রশ্ন করবে, ওই চরিত্রটা কিভাবে উত্তর দিত, উত্তর দেয়ার সময় তার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ কেমন হতে পারে তা ফুটিয়ে তুলতে হবে। এখানেও প্রথমে চরিত্রের বর্ণনা সবাইকে প্রথমে বলে নিতে হয়েছিল। এইটায় মার্ক বেশ ভালো এসেছিল কারণ আমি নিজে যা করতে পারতাম ততটুকুই চরিত্র সম্পর্কে বলেছিলাম। মিডটার্ম এ আমার এক্ট পড়ল হ্যারি পটার এর প্রফেসর স্নেইপ এর একটা দৃশ্য। ওই যে প্রথম মুভিতে স্নেইপ প্রথম বার ক্লাস এ এসে পুরো ক্লাস এর উদ্দেশে যা বলেন ওই সীনটা। প্রফেসর বলেছিলেন মুভি দেখে স্নেইপ এর নকল করনা, নিজের মত কর। একটা আলখেল্লা যোগাড় করতে হয়েছিল এটার জন্য। ফলাফল খারাপ না। তবে দুই বার ডায়লগ ভুলে গিয়েছিলাম।

ডেইলি এক্ট গুলোর মধ্যে একটা জিনিস প্রায়ই হত যে সবাই দুই লাইনে মুখোমুখি হয়ে দাড়াতাম, যে যার ইচ্ছা মত একটা চরিত্র বেছে নিয়ে সামনের জনকে কিছু একটা বলত, সামনের জন আরেকটা চরিত্র পিক করে তার রিপ্লাই দিত। এভাবে পালাক্রমে চলত। এরপরে দেখতে দেখতে ফাইনাল চলে এলো। এতদিনে আমার কনফিডেন্স বেশ বাড়ছে। পারলে কোপায়া অভিনয় করি এমন অবস্থা। এমন সময় কারা বললেন ফাইনাল এক্ট হবে ডুয়েট। স্ক্রিপ্ট উনি সিলেক্ট করে দিবেন। আমি মনে মনে ভাবি কুচ পরোয়া নেহি। কিন্তু স্ক্রিপ্ট পেয়ে বলি "ধরণী তুমি দ্বিধা হও"। বেথ হেনলি'র "ক্রাইমস অফ দ্যা হার্ট" এর নির্দিষ্ট কিছু সীন। ৭ পাতার এক বিশাল স্ক্রিপ্ট। লটারির মাধ্যমে আবার পার্টনার নির্বাচন। আমাদের ক্লাসে দুই ম্যাকেঞ্জি। এইবার পড়ল আরেক ম্যাকেঞ্জি'র সাথে। এক ছেলে তো আমার নামই দিল "ম্যাকেঞ্জি গাই"। সমস্ত ফাইনাল পরীক্ষা সামনে আসছে। প্রচন্ড প্রেশার। এর মধ্যে এই মহাভারত স্ক্রিপ্ট কিভাবে মুখস্ত করব ঐটা ভেবে আমার তো পুরা মাথা নষ্ট অবস্থা। কয়েকদিন চেষ্টা করলাম কাজ থেকে এসে রাত্রে বেলা। কিছুই হইলো না। কনফিডেন্স আবার শুন্যের কোঠায়। সিরিয়াসলি ভাবা শুরু করলাম ফাইনাল দিব না। দিলেও ফেল, না দিলেও ফেল, শুধুই সবার সামনে লজ্জায় পরে লাভ কি.....ম্যাকেঞ্জি কে ফোন দিয়ে বললাম এক্সাম দিব না। তুমি অন্য কোনো পার্টনার খুজ। ও বলল সমস্যা কি? আমি বললাম আমার এক লাইন ও মুখস্থ হচ্ছে না, এক পেজ মুখস্ত করে দ্বিতীয় পেজ এ গেলে প্রথমটা আবার ভুলে যাই। শুধু শুধু আমার কারণে তোমার বিপদে পরে লাভ নেই। ম্যাম কে বলে অন্য গ্রুপে ঢুকে যাও। ও বলল "তুমি না দিতে চাইলে নাই, কিন্তু একসাথে কয়েকদিন রিহার্সাল করে দেখো কি হয়" এই মেয়ে ৭/৮ দিন টানা দেখা করে একসাথে রিহার্সাল করেছে ঘন্টার পর ঘন্টা। প্রত্যেকটা এক্সপ্রেশন যতক্ষণ ওর মন মত হয় নাই ততবার রিপিট করছে। সুন্দরী মেয়ে পার্টনার পড়লে এই এক সুবিধা, অনেকক্ষণ রিহার্সাল করলেও ক্লান্তি লাগে না, এক জিনিস বার বার করলেও বিরক্ত লাগে না। ম্যাকেঞ্জির রসবোধ ছিল অসামান্য। সব সময় এত হাসাইত আমাকে সময় কোন দিক দিয়ে গেছে টের ও পেতাম না। পুরো স্ক্রিপ্ট মুখস্ত হয়ে গিয়েছিল। এক্সাম এর দিন ম্যাকেঞ্জি বলল আমরা সবার প্রথমে যাব তাহলে বাকি সময় টেনশনহীন ভাবে অন্য সবার এক্ট দেখা যাবে। আমি রাজি হয়ে গেলাম। কেমন করেছিলাম নিজে বুঝি নাই কিন্তু এক্ট শেষ হওয়ার পর ভালই তালি পরেছিল। এই দিন স্টুডেন্টরা বাইরের গেস্ট ও নিয়ে এসেছিল। দুই ক্লাসে এক্সাম শেষ হয়। শেষ হওয়ার পর পর ই ম্যাম পারফর্মেন্সের নাম্বার জানিয়ে দেয় আর বলে ফাইনাল গ্রেড ওয়েবসাইট এ দিয়ে দিবেন। অষ্ঠম আশ্চর্যের ঘটনা হলো শেষ পারফরমেন্সে ম্যাকেঞ্জির চেয়ে আমি নাম্বার বেশি পাই। রেজাল্ট এর পরে ম্যাকেঞ্জি ওর বয়ফ্রেন্ডের সাথে পরিচয় করানোর সময় হাসতে হাসতে বলে "তোমার সাথে রিহার্সাল করাই ঠিক হয় নাই"। অসাধারণ এক মেয়ে ছিল এই ম্যাকেঞ্জি। থিয়েটার ক্লাসের কথা মনে থাকবে অনেকদিন।

চলবে......
আমেরিকায় এক বছর এবং মধ্যবিত্ত ছাত্রদের বাস্তবতা (পর্ব ১)
আমেরিকায় এক বছর এবং মধ্যবিত্ত ছাত্রদের বাস্তবতা (পর্ব ২)
আমেরিকায় এক বছর এবং মধ্যবিত্ত ছাত্রদের বাস্তবতা (পর্ব ৩)
আমেরিকায় এক বছর এবং মধ্যবিত্ত ছাত্রদের বাস্তবতা (পর্ব ৪)
আমেরিকায় এক বছর এবং মধ্যবিত্ত ছাত্রদের বাস্তবতা (পর্ব ৫)

দিনের পর দিন............

Re: আমেরিকায় এক বছর এবং মধ্যবিত্ত ছাত্রদের বাস্তবতা (পর্ব ৬)

ভাই কিছু ফটো-টটো দিন। লেখা ভালো হয়েছে - একটানে পড়ে ফেললাম। তবে ছবি ছাড়া থিসিস পেপারের মত লাগছে লেখার চেহারা...  tongue

Calm... like a bomb.

সর্বশেষ সম্পাদনা করেছেন Jol Kona (২৩-০৬-২০১৩ ১৪:৫৬)

Re: আমেরিকায় এক বছর এবং মধ্যবিত্ত ছাত্রদের বাস্তবতা (পর্ব ৬)

কয়েকটা  প্যারায় একটু  ভাগ করে দেন না ভায়া smile পড়তে আসলেই ভাল লাগছে

Re: আমেরিকায় এক বছর এবং মধ্যবিত্ত ছাত্রদের বাস্তবতা (পর্ব ৬)

চমৎকার লাগল। নিজের পছন্দের বিষয় নিয়ে বর্ণনা আরও আনন্দ দিল। আপনি ভাল লিখেন। thumbs_up

"সংকোচেরও বিহ্বলতা নিজেরই অপমান। সংকটেরও কল্পনাতে হয়ও না ম্রিয়মাণ।
মুক্ত কর ভয়। আপন মাঝে শক্তি ধর, নিজেরে কর জয়॥"

Re: আমেরিকায় এক বছর এবং মধ্যবিত্ত ছাত্রদের বাস্তবতা (পর্ব ৬)

চমৎকার লিখছেন আগের টাও ভাল ছিল ।