টপিকঃ চুক্তি পর্ব-১

চুক্তি

১.

সত্যিই জানো না? অবাক হয়ে যায় মিথি।
না, জানি না। আধা ঘুম আধা জাগরণে জড়ানো গলায় জবাব দেয় অনিমিখ।
বল না ভাইয়া, সত্যিই জানিস না?  মিথি যেন মরিয়া।
সাধের ভাত-ঘুমটা কেঁচেই গেলো অনিমিখের – আহ, কেন প্যানপ্যান করিস? বললাম তো জানি না!
নিশিকে চিনিস না? তবে, এই চিঠিটার কী হবে?
এই যুগে এখনও মানুষে চিঠি লিখে? দূর হ, ঘুমাতে দে না বাবা!
হঠাত কী একটা যেন বিদ্যুতের মত মনে পড়ে যায়। টনক নড়ে অনিমিখের – কী বললি, কার চিঠি?
নিশি।
আর কিছু লেখা নেই?
না, শুধু ছোট্ট করে নামটুকু লেখা। ব্যস, আর কিছু নেই!

বেশ আঁটোসাটো ঘরটায় একটা অগোছালো খাটে শোয়া থেকে তড়াক করে উঠে বসে  অনিমিখ। ব্যগ্র গলায় – দেখি, চিঠিটা?
কেন, চেন না, নাকি? যাই বিন –এ ফেলে দিয়ে আসি। কিংবা আমিই ছিঁড়ে দেখি। ফিঁচেল হাসতে থাকে মিথি। সুর পাল্টে ফেলে অনিমিখ। গলায় মধু মিশিয়ে – মিথু সোনামণি, দে দেখি, চিঠিটা দেখি। তোকে একটা হাত ঘড়ি কিনে দিবো।
হা-হা-ত-ঘঘ-ড়ড়ি কিনে দিবো...ভেংচে ওঠে মিথি। টাকা পাবি কোথায়? কাজ তো কিচ্ছু করিস না!
ভুলে যাস না। তিনটা ট্যুশানি করি। তারপর অকস্মাৎ কোনো সুযোগ না দিয়ে তড়িতবেগে উঠে চিঠিটা মিথির হাত থেকে কেড়ে নিলো।
ভালোভাবে বললাম, দিলি না। এখন আঙ্গুল চোষ। যা ভাগ এখান থেকে...

কিংকর্তব্যবিমূঢ় ভাবটা কাটিয়ে উঠেই সম্ভাব্য ঘড়ি না পাওয়ার শোকেই কিনা মিথি অনিমিখের একমাথা চুলে খাবলে ধরে ঝাঁকিয়ে চম্পট। অনিমিখ উঠতে উঠতে হাওয়া। নিরাপদ দূরত্বে চলে গেছে মিথি।
খবর্দার আগাবি না! মাকে বলে দিবো কিন্তু!

মায়ের কথায় দমে যায় অনিমিখ। মা জানতে পারলে কেলেংকারি হয়ে যাবে। রাজ্যের সব উদ্ভট প্রশ্ন করে মাথা চিবিয়ে খাবে। তাছাড়া, বেকার বসে খাচ্ছে। কী করে যেন মায়ের সব রাগ ঐখানটাতে গিয়ে জমা হয়! সব কথার শেষটা ইনিয়ে বিনিয়ে ঐ বসে থাকায় গিয়ে গোত্তা খেয়ে গজরাতে থাকে। যেন সে ইচ্ছে করেই কাজ পায় না। কে বোঝাবে?

মাকে অবশ্য খুব একটা দোষ দিতে পারে না। বাবা রিটায়ার করেছেন বছর দুয়েক হলো। এখন তো তারই দায়িত্ব নেবার কথা। পড়াশুনার পাট চুকিয়ে লাভটা কী হলো? একটা গতিও হলো না! এরই মাঝে সংসারটা যে কীভাবে এই দুর্মূল্যের বাজারে উতরে যাচ্ছে মায়ের কল্যাণে – সে এক আশ্চর্যের বিষয় বটে! অনিমিখ মিইয়ে যায়।

যা, যা ছেড়ে দিলাম। পরে পড়া বুঝতে আসিস। খেল দেখাবো। খানিক হম্বিতম্বি করে অনিমিখ চিঠিটার দিকে নজর দেয়। হলুদ খামের উপর গোটা গোটা মুক্তার মত হাতে লেখা – হতে, নিশি। তার সাতাশ বছরের অভিশপ্ত জীবন আতিপাতি হাতড়ে কেবল একটাই ‘নিশি’ সে খুঁজে পাচ্ছে। কিন্তু এ তো অসম্ভব! প্রবল অবিশ্বাসে সে মাথা নাড়াতে থাকে।


২.
আপনিই অনিমিখ রহমান? সুন্দর চিকন কিন্তু কিছুটা রাশভারী কন্ঠে কেউ বলে ওঠে।
জ্বী ম্যম। বিশাল ড্রয়িংরুমের অসহ্য রকম অশ্লীল দামের সোফাটা থেকে তড়াক করে উঠে দাঁড়িয়েছিলো অনিমিখ।
আমাকে ম্যম বলার দরকার নাই। আমি নিশি, নিশি অরণি। শুধু নিশি বললেই চলবে। দাঁড়ানোরও কোনো প্রয়োজন দেখি না। বসুন।
দাঁড়ানো একটা সাধারণ ভদ্রতা। ওটার প্রয়োজন আছে। কাটা কাটা গলায় অনিমিখ বলেই বুঝতে পারলো – বড় ভুল হয়ে গেছে। রাফিনের যোগাড় করে দেয়া ট্যুশানিটা ফস্কে গেলো বলে। কিন্তু কথা তো আর ফিরিয়ে নেয়া যায় না!
তাই নাকি? কিছুটা অপ্রতিভ হয়ে গেলেও সামলে নেয়  নিশি।
সুভার জন্য বাপি একটা টিউটর এপয়ন্টের দায়িত্ব দিয়েছেন আমাকে। আপনি রাফিন ভাইয়ের বন্ধু। তবু আমি আমার কাজটা ঠিকভাবে করতে চাই। একটা ইন্টারভ্যু নিবো যদি কিছু মনে না করেন।
কে বাধা দিচ্ছে? তেড়িয়া হয়ে জবাব দেয় অনিমিখ।
নিঁখুত ধনুকের মত বাঁকানো ভ্রূজোড়া কি একটু বেশিই টানটান হয়ে ওঠে? লাবণ্যে ঢলঢল মুখটায় বড় বেমানান একটা গাম্ভীর্য আমদানি করে নিশি – আপনি তো এম এ করেছেন?
জ্বী, বাংলায়।
বাংলায়? তাহলে সুভাকে অংক করাবেন কী করে?
ক্লাস সেভেনের একটা বাচ্চা মেয়ের অংক করাতে কি খুব বেশি এলেম দরকার?
হুম। আচ্ছা, বাংলায় এম এ? বলুন দেখি অনিমিখ মানে কী?
মানে বলতে চাচ্ছেন, আমি আমার নামের মানে জানি না! এটা কিন্তু ইন্সাল্ট!
বেশি কথার দরকার কী? জানলে বলে ফেলেন। ল্যাঠা চুকে যায়।

অনিমিখ কোনো জবাব দেয় না। একদৃষ্টে অপলক চোখে চেয়ে থাকে নিশির দিকে। খুব রাগ করতে ইচ্ছে হচ্ছে, কিন্তু এই মেয়েটির উপরে একটা বিচিত্র কারণে রাগ করতে পারছে না। বরং রাগি রাগি মুখটা ভালো লেগে যাচ্ছে। বরং নিজের উপরে রাগ হতে থাকে অনিমিখের। কিন্তু চোখটাও সরিয়ে নেয় না।

কী হলো, কথা বলছেন না কেন? এভাবে অপরিচিত কারো দিকে তাকিয়ে থাকা যে অসভ্যতা, সেটা আপনার মত ভদ্রদের(!) তো জানা উচিৎ!
মাফ করবেন। অনিমিখ মানে জানতে চেয়েছেন। তাই তাকিয়ে থেকে লাইভ ডেমনস্ট্র্বেশান দিয়ে দিলাম। হেসে ফেলে অনিমিখ। চমৎকার ভূবন ভোলানো হাসি।

নিশির রাঙ্গা গালে প্রবল ঝড়ের মেঘ জমতে থাকে। হয়তো ফেটেই পড়তো কিন্তু কোত্থেকে সেই ভূতুড়ে গাম্ভীর্যটা আনিয়ে নিয়ে মুখে সেঁটে ফেলে। ততক্ষণে অনিমিখ উঠে দাঁড়িয়েছে। কী একটা বুঝে নিজেই ফেরার পথে পা বাড়িয়েছিলো।

দাঁড়ান। কোথায় যাচ্ছেন। ইন্টারভ্যু তো শেষ হয় নি।
দিবো না। এই ট্যুশানির আমার দরকার নাই!
আপনার দরকার না থাকতে পারে, কিন্তু সুভার তো আছে। সেটার কী হবে? ছাত্রীকে না দেখেই চলে যাচ্ছেন?
মানে?
ইংরেজিতে বলবো? বসুন। সুভাকে পাঠিয়ে দিচ্ছি। পরিচিত হয়ে নিন। বাকীটা পরে দেখা যাবে। এই বলে নিশি বাড়তি কোনো কথা না বলেই গটগট করে চলে গেলো।
ধন্যবাদ মধ্যরাতের আগুনজ্বালা পাথর!
চলেই যাচ্ছিলো নিশি। মুখ ফিরিয়ে কটমট করে তাকালো।
আপনার নামটার মানে বললাম আর কী! সুন্দর নাম!!

নিশি কিছু না বলে চলে গেলো। তবে ওঁর মুখে কি একটা চাপা হাসি লেগে ছিলো। চোখের ভুলই হবে। হাসার তো কথা না!
এভাবেই নিশি এসেছিলো অনিমিখের জীবনে। তবে সেটা সত্যিকারের আসা কিনা, নিশ্চিত হতে পারে নি কখনো। সেই দিনের পর খুব কমই দেখা হয়েছে ওদের। তবে, ছাত্রীর তুবড়ি ছোটানো মুখের বদৌলতে অনেক কিছুই জেনেছে। এই যেমন, খুব রাগি, গম্ভীর – বাবাও ভয় পায় ওকে। এইসব নানান কথা। আরো জেনেছিলো একটা বাতিকের কথা। নিশি চিঠি লিখতে বড় ভালোবাসে। ইলেক্ট্রনিক মেল নয়, হাতে লেখা চিঠি। দেশ বিদেশে চিঠি লেখা তার একটা শখ। এখনকার দিনের জন্য বড় আজব লেগেছিলো অনিমিখের কাছে! এই সস্তা মুঠোফোনের যুগে চিঠি লেখা তো লোকে প্রায় ভুলতে বসেছে!

দিন যায়। নিশি কেমন যেন একটা গোপন আকাংখিতের বস্তু হয়ে উঠছিলো। একেবারে অন্যায় চাওয়া! কিন্তু মন যে মানে না! এমনি সময় একদিন নিশি সব আকাঙ্ক্ষার বেলুন ফাঁসিয়ে দিয়ে পাড়ি জমালো বিদেশে। নিশি হারিয়ে গেলো। বড় কষ্ট পেয়েছিলো অনিমিখ। অবুঝ কষ্ট! যা বাস্তবতার একটাও যুক্তি মানে না!

তারপরেও অনেক দিন গেলো। প্রায় বছর দুই কিংবা তিন। সুভাকে এখন আর পড়ায় না অনিমিখ।

এমনি সময়ের এক অলস দুপুরে মিথির হাত ধরে হাজির হলো একটি চিঠি। জনৈকা নিশির থেকে একটি চিঠি। এ নিশি কি সেই নিশি? 

চলবে...

কিছু বাধা অ-পেরোনোই থাক
তৃষ্ণা হয়ে থাক কান্না-গভীর ঘুমে মাখা।

উদাসীন'এর ওয়েবসাইট

লেখাটি CC by-nc 3.0 এর অধীনে প্রকাশিত

Re: চুক্তি পর্ব-১

প্রাপ্তবয়স্কদের প্রেমের গপ্প মনে হচ্ছে..... যাই পড়ার আগে আমার জন্ম আর প্রাপ্তবয়স্কের প্রমাণ পত্র স্ক্যান করে আনি...৷

গল্প-কবিতা - উদাসীন - http://udashingolpokobita.wordpress.com/
ছড়া - ছড়াবাজ - http://chhorabaz.wordpress.com/

Re: চুক্তি পর্ব-১

ঠিক বুঝতে পারছি না ?

কাজকে বলেন নামাজ আছে, নামাজ কে বলবেন না কাজ আছে.......
premium Place
xpassplace

Re: চুক্তি পর্ব-১

অরুণ লিখেছেন:

প্রাপ্তবয়স্কদের প্রেমের গপ্প মনে হচ্ছে..... যাই পড়ার আগে আমার জন্ম আর প্রাপ্তবয়স্কের প্রমাণ পত্র স্ক্যান করে আনি...৷

ইয়ে ..কী আর বলি?  kidding আমার তো মনে হয়, তুমি ওভারম্যাচিওর.. hehe সিনিয়ার সিটিজেন কোথাকার!

masudiqbal925 লিখেছেন:

ঠিক বুঝতে পারছি না ?

কী বুঝতে পারছেন না? অবশ্য পরের পর্ব দিলে আরেকটু পরিষ্কার হয়ে যাবে  thinking

কিছু বাধা অ-পেরোনোই থাক
তৃষ্ণা হয়ে থাক কান্না-গভীর ঘুমে মাখা।

উদাসীন'এর ওয়েবসাইট

লেখাটি CC by-nc 3.0 এর অধীনে প্রকাশিত

Re: চুক্তি পর্ব-১

চিঠিতে কি লিখলো? ধুর মিয়া! এমন জায়গায় কেউ শেষ করে? angry angry

রাবনে বানাদি ভুড়ি :-(

Re: চুক্তি পর্ব-১

এইটা ভালো হচ্ছে, মৌলিকতা, উত্তেজনা, রোমাঞ্চ wink সবকিছুই আছে। চালায় যান  thumbs_up (আগের টা খ্রাপ হইছিলো)

সারিম'এর ওয়েবসাইট

লেখাটি CC by-nc-sa 3.0 এর অধীনে প্রকাশিত

Re: চুক্তি পর্ব-১

তার-ছেড়া-কাউয়া লিখেছেন:

চিঠিতে কি লিখলো? ধুর মিয়া! এমন জায়গায় কেউ শেষ করে? angry angry

হা হা হা কাউয়া ভাই, এমনিতেই বড় হয়ে গেছে। কেউ পড়তে চাবে না। আজকেই দিতে পারি। ধন্যবাদ।

সারিম লিখেছেন:

এইটা ভালো হচ্ছে, মৌলিকতা, উত্তেজনা, রোমাঞ্চ wink সবকিছুই আছে। চালায় যান  thumbs_up (আগের টা খ্রাপ হইছিলো)

ধন্যবাদ সারিম।
এটা কী বললে? আগেরটা তো সর্বশ্রেষ্ঠ প্রেম নিয়ে লিখেছিলাম kidding

কিছু বাধা অ-পেরোনোই থাক
তৃষ্ণা হয়ে থাক কান্না-গভীর ঘুমে মাখা।

উদাসীন'এর ওয়েবসাইট

লেখাটি CC by-nc 3.0 এর অধীনে প্রকাশিত

Re: চুক্তি পর্ব-১

২ টা সেকশন মনে হচ্ছে দুই নিশ্বাসে পড়লাম, ভাল্লাগছে  smile

Re: চুক্তি পর্ব-১

প্রারম্ভ ভালো হয়েছে। অরুণের কমেন্ট পড়ে অনেকক্ষন হাসলাম।  lol

hit like thunder and disappear like smoke

১০

Re: চুক্তি পর্ব-১

পড়তে অনেক দেরি কলে ফেললাম মনে হচ্ছে, ইদানিং সব কিছুতেই কেমন যেন লেট লতিফ হয়ে যাচ্ছে।  sad

১১

Re: চুক্তি পর্ব-১

আমার কাছে ভালো লেগেছে, তবে এক বসায় পড়ে শেষ করতে পারিনা
অ.ট.আশাকরি আগামী বই মেলায় আমরা পাঠকরা চুক্তি বই আকারে বাজারে পাবো

"We want Justice for Adnan Tasin"

১২

Re: চুক্তি পর্ব-১

নিশি অরনী
অরুনের বউ হি হি হি
পেরেম কাহিনী ভালাই লাগল

জাযাল্লাহু আন্না মুহাম্মাদান মাহুয়া আহলুহু......
এই মেঘ এই রোদ্দুর