সর্বশেষ সম্পাদনা করেছেন পরিবেশ প্রকৌশলী (১৬-০৫-২০১৩ ১৬:০৮)

টপিকঃ পানি জীবানুমুক্ত করণের উপায়সমূহ

পানিজনিত রোগের একটা মূল কারণ হল পানিতে থাকা জীবানু। খাবার পানিতে আর্সেনিক বা এই ধরণের বিষাক্ত বস্তুর কারণে যত মানুষ ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে তার চেয়ে অনেক বেশি মানুষ খুব দ্রুত জীবানুজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে এমনকি মারা যেতে পারে। অতীতে পানিজনিত রোগে (কলেরা, ডায়রিয়া) গ্রামের পর গ্রাম মানুষ মরে সাফ হয়ে যেত। তাই পানির জীবানুমুক্ত করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজ। বর্তমানে উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার কারণে এই ধরণের মহামারিগুলো অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে, তবে বন্যা বা অন্য প্রাকৃতিক দূর্যোগের সময়ে জরুরী ভিত্তিতে স্থানীয়ভাবে পানি বিশুদ্ধকরণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। এই আলোচনায় পানি জীবানুমুক্তকরার বিভিন্ন উপায় নিয়ে কিছুটা বিশ্লেষন ও বর্ণনা দেয়া হয়েছে।

প্রাসঙ্গিক একটা তথ্য জানিয়ে রাখা প্রয়োজন যে, পানি পরিশোধণে সমস্ত পরিশোধন প্রক্রিয়ার শেষে সববরাহ করার আগের ধাপে সাধারণত এটাকে জীবানুমুক্ত করা হয়। তবে, ক্ষেত্রবিশেষে প্রয়োজনে এটা সহ পরিশোধনের অন্য ধাপেও পানিতে জীবানুনাশক দেয়া হতে পারে।

১.১ ডিসইনফেকশন বনাম স্টেরিলাইজেশন
জীবানুমুক্ত করণের দুইটি ইংরেজি আছে: ১। Disinfection এবং ২। Sterilization। ডিসইনফেকশন দিয়ে শুধুমাত্র ক্ষতিকারক বা রোগ সৃষ্টিকারী  জীবানুগুলোকে ধ্বংস করা বুঝানো হয়ে থাকে যেখানে স্টেরিলাইজেশন দিয়ে ক্ষতিকারক হউক বা না হউক সমস্ত জীবানুকে ধ্বংস করা বুঝায়। পানিশোধনের ক্ষেত্রে আমরা প্রথমটি অর্থাৎ সরবারহকৃত পানি থেকে শুধুমাত্র ক্ষতিকারক জীবানু দুর করতে চাই। ডাক্তারগণ তাঁদের অপারেশনে ব্যবহৃত ধারালো অস্ত্রগুলোকে স্টেরিলাইজ করেন।

কয়েকভাবেই জীবানু দুর করা যায়। এই পদ্ধতিগুলোকে দুটি ভাগে ভাগ করা যায়: ক) ভৌত পদ্ধতি, এবং খ) রাসায়নিক পদ্ধতি।

১.২ প্রভাবক সমূহ
জীবানুনাশের বিভিন্ন পদ্ধতি বিভিন্ন দক্ষতায় কাজ করে, তবে এই পদ্ধতিই শেষ কথা নয়। পানির এবং জীবানুর পরিমান এবং অবস্থা বা তারতম্য এই প্রক্রিয়াগুলোকে প্রভাবিত করে এবং বেশ কিছু ক্ষেত্রে কোনো কোনো প্রক্রিয়ার সফলতাও এই অবস্থাগুলোর উপর নির্ভর করে। উদাহরনস্বরূপ পানিতে থাকা জীবানুর পরিমানের বা মাত্রার কথা বলা যায়। জীবানুর মাত্রা বেশি হলে বেশি পরিমানে রাসায়নিক জীবানুনাশক লাগবে, অথবা এমন হতে পারে যে ভৌত পদ্ধতি সেই মাত্রায় অক্ষমও হতে পারে। এছাড়া কোন একটা রাসায়নিক পদার্থ পানিতে মেশানোর পর সেটা কী রূপ ধারণ করবে সেটার উপরেও জীবানুনাশের সফলতা নির্ভর করে। রাসায়নিক জীবানুনাশকের বিভিন্ন রূপ তথা কার্যক্ষমতা আবার পানির তাপমাত্রা, পানির পিএইচ (অম্লতা/ক্ষারকত্বের পরিমাপ), কতক্ষণ ধরে বিক্রিয়ার করানো হচ্ছে সেই সময়, পানিতে জীবানুনাশক মিশানোর পদ্ধতি ও দক্ষতার উপর নির্ভরশীল। কাজেই একটা পদ্ধতি অবলম্বন করলেই বা একটা রাসায়নিক পদার্থ নির্দিষ্ট মাত্রায় প্রয়োগ করলেই যে প্রতিবারে একইভাবে জীবানুনাশ হবে তা নয়; তাই পানি, জীবানু এবং প্রক্রিয়ার রসায়নটা যেন সর্বোৎকৃষ্টভাবে কাজ করতে পারে সে সম্পর্কেও ভাল ধারনা থাকতে হবে।

২ ভৌত পদ্ধতিসমূহ

২.১ ফুটানো
পানি ফুটিয়ে (Boiling) জীবানু মুক্ত করার পদ্ধতিটা প্রায় সকলেই জানেন। সীমিত পরিসরে এটি উন্নয়নশীল বিশ্বের কিছু অংশে ব্যবহৃত হয়। সরাসরি ডোবা বা জলাশয়ের পানির ক্ষেত্রে অন্তত ২০ মিনিট ধরে ফুটানোর কথা বলা হয়। তবে আমেরিকান সরকারী পরিবেশ সংরক্ষণ এজেন্সির (USEPA) মতে, ফিল্টারকৃত থিতানো পানি ১ মিনিট ধরে পূর্ণমাত্রায় ফুটালেই কাজ হবে (এক মাইলের চেয়ে বেশি উচ্চতার জায়গায় ৩ মিনিট; কারন, উঁচু জায়গায় পানির স্ফুটনাংক কমে যায়)। অর্থাৎ অপেক্ষাকৃত পরিষ্কার পানির জন্য ১ মিনিট টগবগ করে ফুটানো যথেষ্ট কিন্তু সরাসরি ডোবানালার অপরিশোধিত পানি হলে বেশি সময় ধরে ফুটানো দরকার। শক্তি খরচের বিচারে এটা পানি ফুটানোর সবচেয়ে অদক্ষ পদ্ধতি। পৃথিবীর কোনো পানির শোধনাগারে জীবানু দুর করার জন্য এই পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়না, এমনকি যেসব দেশে সরাসরি কলের পানি খাওয়া যায় সেখানেও হয় না।

২.২ আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মি
পরিষ্কার ও স্বচ্ছ পানি থেকে জীবানু দুর করার জন্য অতিবেগুনি বিকিরণ (ultra violet radiation) খুবই কার্যকরী একটা পদ্ধতি। যে কোনো ধরণের ব্যাকটেরিয়া, সিস্ট এবং স্পোর মারতে এই অতিবেগুনি রশ্মী অত্যন্ত শক্তিশালী একটা অস্ত্র; তবে ঘোলা পানিতে কিংবা পানিতে নাইট্রেট, সালফেট বা ফেরাস (আয়রন) আয়ন একে কাজ করতে বাধা দেয়। এছাড়া অতিবেগুনি রশ্মী পানির বেশি গভীরে প্রবেশ করতে পারে না, তাই পানিকে অগভীর ধারায় প্রবাহিত করতে হয় (সর্বোচ্চ ৩০ সেমি বা ১ ফুট)। পানিকে তাৎক্ষনিক ভাবে জীবানুমুক্ত করলেও পরবর্তীতে সেই পানি সরবরাহ লাইনে/পাইপে অন্য কোন জীবানু উৎস থেকে দুষিত হলে সেটা ঠেকানো যায় না; এছাড়া এটার খরচও বেশি। তাই এই পদ্ধতির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও পরীক্ষা নিরীক্ষার কাজে সীমাবদ্ধ। তবে জেনে রাখতে ক্ষতি নাই, হয়তো কখনো কোনো পরিস্থিতিতে কাজে লেগে যেতে পারে।

২.৩ সৌর পদ্ধতি
দুষিত পানিকে সূর্যালোকে রেখে দিলে সেখানকার ডায়রিয়া সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া অকার্যকর হয়ে যায়। ধারণা করা হয় রোগবাহী জীবানুগুলো সূর্যালোকের প্রভাবে দুর হওয়ার পেছনে তিনটি কারন কাজ করে: ক) অতিবেগুনি-এ রশ্মীর কারণে ব্যাকটেরিয়ার বিপাক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্থ হয় এবং কোষ কাঠামো ধ্বংস হয়। খ) ৩২০-৪০০ মিমি তরঙ্গদৈর্ঘের অতিবেগুনি রশ্মী পানিতে দ্রবীভুত অক্সিজেনের সাথে বিক্রিয়া করে এবং অক্সিজেনের অত্যন্ত সক্রিয় রূপ উৎপাদন করে (ফ্রী রেডিক্যাল, হাইড্রোজেন পার অক্সাইড); এগুলোও রোগজীবানুগুলোর দফারফা করে দেয় বলে ধারণা করা হয়, এবং গ) সৌরশক্তি সঞ্চয়ে পানির তাপমাত্রা বেড়ে যায়, ৫০°সে. এর অধিক তাপমাত্রায় এই জীবানুনাশী প্রক্রিয়াগুলো তিনগুন দ্রুততর হয়।

সৌর পদ্ধতিকে ইংরেজিতে SODIS বলে। এই পদ্ধতিতে জীবানুমুক্ত করতে ৩০°সে. তাপমাত্রায় প্রায় ৫ ঘন্টা পূর্ন সূর্যালোকে রাখতে হয় পানিকে। এসময়ে সৌর বিকিরণের মাত্রা থাকতে হয় ৫০০ ওয়াট/বর্গমিটার (সব তরঙ্গদৈর্ঘ মিলিয়ে)। 45°সে. এর অধিক তাপমাত্রায় অতিবেগুনি রশ্মি এবং তাপমাত্রার সম্মিলিত ক্রিয়ায় জীবানুনাশী দক্ষতা আরো বৃদ্ধি পায়। চিত্র ১ এ এই পদ্ধতিটি সহজ চিত্রে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে - যা প্রচার কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে।
https://lh5.googleusercontent.com/-_4O1ch2IPQE/UZSrJlKCjrI/AAAAAAAAB3A/RKOKuUj_AGo/w1277-h350-no/10000000000009170000027E0D6A4D78.jpg
চিত্র ১: SODIS বা সৌর পদ্ধতিতে পানি জীবানুমুক্তকরণের ধাপসমূহ (সূত্র: উইকিপিডিয়া, EAWAG)

এই পদ্ধতিতে পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় পানি শোধন করা যাবে না, কিন্তু যেসব প্রত্যন্ত স্থানে পরিশোধিত পানির অন্য কোনো উপায় নেই সেখানে এটা জীবন রক্ষা করতে পারে। দূর্গম এলাকায় ভ্রমনকারী (জঙ্গল, চরাঞ্চল, পর্বত ইত্যাদি) এবং প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে বিধ্বস্থ অঞ্চলে দুষিত পানি জনিত রোগ ঠেকাতে এই পদ্ধতি খুবই কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।


(চলবে) (?)
====
পরবর্তী পর্ব (বা পর্বগুলোতে) থাকবে:
৩ রাসায়নিক পদ্ধতিসমূহ
৩.১ একটা ভাল জীবানুনাশকের কী কী বৈশিষ্ট থাকা উচিত
৩.২ ক্লোরিন দ্বারা
৩.৩ ওজোন দ্বারা
৩.৪ আয়োডিন এবং ব্রেমিন দ্বারা
৩.৫ পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট দ্বারা
৪ কিছু সাধারণ ব্যবহারিক প্রয়োগ পদ্ধতি
৪.১ পানির ট্যাংকি, সরবরাহের পাইপ জীবানুমুক্তকরণ
৪.২ টিউবওয়েল জীবানুমুক্তকরণ
৪.৩ পাতকূয়া এবং পুকুর জীবানুমুক্তকরণ
৫ তথ্যসূত্র
এই পুরা প্রবন্ধটির পিডিএফ ডাউনলোড লিংক।

পরিবেশ প্রকৌশলী'এর ওয়েবসাইট

লেখাটি CC by-nc-sa 3.0 এর অধীনে প্রকাশিত

Re: পানি জীবানুমুক্ত করণের উপায়সমূহ

ধন্যবাদ ভাই অনেক কিছু জানলাম ।

Re: পানি জীবানুমুক্ত করণের উপায়সমূহ

শেয়ার করার জন্য ধন্যবাদ

"We want Justice for Adnan Tasin"

Re: পানি জীবানুমুক্ত করণের উপায়সমূহ

ফুটিয়ে পানি খাই সবসময়। সুর্যালোকে পানি জীবানুমুক্ত করা যায় জানতাম না। বাংলাদেশে ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা মনে হয় না সবসময় পাওয়া যায়। বছরে হয়ত দুই এক দিন। এটা ছাড়া আরেকটা ব্যাপার হল সুর্যালোকে কি সকল জীবানু ধ্বংস হয়?

Feed থেকে ফোরাম সিগনেচার, imgsign.com
ব্লগ: shiplu.mokadd.im
মুখে তুলে কেউ খাইয়ে দেবে না। নিজের হাতেই সেটা করতে হবে।

শিপলু'এর ওয়েবসাইট

লেখাটি GPL v3 এর অধীনে প্রকাশিত

Re: পানি জীবানুমুক্ত করণের উপায়সমূহ

উপকারী টপিক!  clap
একটি প্রাসঙ্গিক কৌতূহলঃ খাবার পানি বিশুদ্ধ করার জন্য ফিটকিরি ব্যবহার করা হয় (ফিটকিরি সম্ভবতঃ পটাসিয়াম এবং এ্যালুমিনিয়াম সালফেটের মিশ্রণ) অনেককেই দেখেছি ছোটোখাটো এ্যান্টিসেপটিক হিসাবে ফিটকিরী ব্যবহার করতে (শেভিং-এর সময় কেটে গেলে, মাইনর ইন্জুরীতে)। ফিটকিরি দিয়ে পানীয় জল বিশোধ করা কতটুকু নিরাপদ?

Calm... like a bomb.

Re: পানি জীবানুমুক্ত করণের উপায়সমূহ

Unilever এর PureIT কোন পদ্ধতিতে কাজ করে?

ইন্জ্ঞিনিয়ার'এর ওয়েবসাইট

লেখাটি CC by-nc-sa 3.0 এর অধীনে প্রকাশিত

Re: পানি জীবানুমুক্ত করণের উপায়সমূহ

ইন্জ্ঞিনিয়ার লিখেছেন:

Unilever এর PureIT কোন পদ্ধতিতে কাজ করে?

ক্লোরিন ব্লীচঃ http://www.pureitwater.com/BD/4stage-purification

Calm... like a bomb.

Re: পানি জীবানুমুক্ত করণের উপায়সমূহ

invarbrass লিখেছেন:

উপকারী টপিক!  clap
একটি প্রাসঙ্গিক কৌতূহলঃ খাবার পানি বিশুদ্ধ করার জন্য ফিটকিরি ব্যবহার করা হয় (ফিটকিরি সম্ভবতঃ পটাসিয়াম এবং এ্যালুমিনিয়াম সালফেটের মিশ্রণ) অনেককেই দেখেছি ছোটোখাটো এ্যান্টিসেপটিক হিসাবে ফিটকিরী ব্যবহার করতে (শেভিং-এর সময় কেটে গেলে, মাইনর ইন্জুরীতে)। ফিটকিরি দিয়ে পানীয় জল বিশোধ করা কতটুকু নিরাপদ?

ফিটকিরি সাধারণত জলে কোলয়েড অবস্থায় দ্রবীভূত থাকা ময়লাকে(কাদা) থিতিয়ে অালাদা করে, ফিটকিরির লঘু দ্রবণের কোন অ্যান্টিসেপটিক গুণ নেই।

Life IS Neither TEMPEST, NOR A midsummer NIGHT'S DREAM, BUT A COMEDY OF Errors,
ENJOY AS U LIKE IT

Re: পানি জীবানুমুক্ত করণের উপায়সমূহ

শিয়ার করার জন্য ধন্যবাদ । সকলে র উপকার হবে ।

১০

Re: পানি জীবানুমুক্ত করণের উপায়সমূহ

অনেক কিছু জানতে পারলাম

১১

Re: পানি জীবানুমুক্ত করণের উপায়সমূহ

invarbrass লিখেছেন:
ইন্জ্ঞিনিয়ার লিখেছেন:

Unilever এর PureIT কোন পদ্ধতিতে কাজ করে?

ক্লোরিন ব্লীচঃ http://www.pureitwater.com/BD/4stage-purification

তারা যে দাবি করে, তাদের পদ্ধতি পানি সম্পূর্ণরুপে পরিশোধিত হয়- এটা কতোটুকু ঠিক তা কীভাবে বুঝা যাবে?

আমার সকল টপিক

কোনো কিছু বলার নেই আজ আর...

১২

Re: পানি জীবানুমুক্ত করণের উপায়সমূহ

ভালো পোষ্ট,,,,সামনের গুলোর জন্য অপেক্ষায় আছি,,,,

স্নিগ্ধ শুভ্রতায় আমি. . . . .

১৩

Re: পানি জীবানুমুক্ত করণের উপায়সমূহ

ধন্যবাদ ভাই শিয়ার করার জন্য, অনেক কাজে দেবে  clap

কাজকে বলেন নামাজ আছে, নামাজ কে বলবেন না কাজ আছে.......
premium Place
xpassplace

১৪ সর্বশেষ সম্পাদনা করেছেন পরিবেশ প্রকৌশলী (১৭-০৫-২০১৩ ১০:৩৫)

Re: পানি জীবানুমুক্ত করণের উপায়সমূহ

মন্তব্যের জন্য সকলকে ধন্যবাদ।

টিনের চালে বোতল শুইয়ে রোদে দিতে হয় (ছবির মত)। এতে টিনের চালের গরম থেকে ৪৫ ডিগ্রী তাপমাত্রা উঠা অসম্ভব নয়। বাইরের অ্যাম্বিয়েন্ট তাপমাত্রা ৩০-৩২ ডিগ্রী হলেও একটা জড় বস্তুতে কিউমুলেটিভের ফলে তাপমাত্রা বেড়ে যাবে, বিশেষত গরম ছাদ, সারফেস - যেটার উপরে বোতল রাখা হয়েছে - সেটার প্রভাবে। আমি নিজে তাপমাত্রা মাপিনি, তবে এই টেকনোলজি প্রচারের আগে বাংলাদেশে অনেকদিন যাবৎ টেস্ট করা হয়েছে - যার কিছু অংশে আমিও ছিলাম (EAWAG  এর সাথে কয়েকদিন কাজ করেছি)। এছাড়া ফিল্ড টেস্টিং-এর আগে ওদের সুইস ল্যাবে কাজটা বিশেষ ওয়েভলেন্থের আলো দেয়া লাইটের নিচে সিমুলেট করেছে (আমাকে ঐ প্রফেসর Dr. Stephan J Hug, য্যুরিখে ওদের ল্যাব ঘুরিয়ে দেখিয়েছিলেন)। বিষুবীয় এবং ক্রান্তীয় এলাকায় সূর্যের বিকিরন/তাপের ইন্টেনসিটি এরকমই হয়।

কোনো এক রৌদ্রজ্জ্বল দিনে স্থির পুকুরে নেমে দেখবেন। উপরের কয়েক ইঞ্চির পানি বাতাসের তাপমাত্রার চেয়েও অনেক গরম -- এটা সূর্যের তাপেই হয়। গরম পানি হালকা বলে স্বাভাবিক ভাবে নিচের দিকে যেতে পারেনা। উপরের স্তরেই থেকে যায় - ফলে পরিচলন প্রক্রিয়ায় পানির নিচের স্তরে তাপ সঞ্চালন হতে পারে না (বিকিরনে কিছুটা যায়)। ফলে ওটাই আরো তাপ গ্রহণ করতে থাকে। (Thermal stratification of lake -- গুগল করুন  tongue )। অর্থাৎ সূর্যের তাপে পানির তাপমাত্রা বায়্রুর তাপমাত্রার চেয়ে অনেক বেশি অর্থাৎ ৪৫ ডিগ্রী হতেই পারে। পুকুরে যা হয়, একটা টিনের চালে বা সারফেসে রাখা বোতলবন্দী পানিতে তার চেয়ে বেশি তাপমাত্রা হওয়ার কথা -- কারণ সারফেস থেকে প্রতিফলিত তাপ + বোতলের মধ্যে হওয়া গ্রীনহাউজ ইফেক্ট (অর্থাৎ তাপ ঢুকে কিন্তু একই ভাবে সহজে বের হতে পারে না মু হা হা হা )

ব্যাকটেরিয়া কিংবা ভাইরাস প্রাণী -- অর্থাৎ এদের মরা বাঁচাতে প্রাণ বেঁচে থাকার ক্রাইটেরিয়া প্রযোজ্য। মানব দেহে যেই জীবানুগুলো রোগ সৃষ্টি করে সেগুলোর বেঁচে থাকার তাপমাত্রার এক্সট্রিম রেঞ্জ ১৫ থেকে ৫৫ ডিগ্রী সেলসিয়াস হওয়ার কথা -- অর্থাৎ মেসোফিলিক টাইপের। আমরাও এই তাপমাত্রা রেঞ্জে বাঁচি। এই টেম্পেরাচারের বাইরে নিলে এদের পক্ষে বেশিক্ষণ বেঁচে থাকা সম্ভব না। কাজেই ১০০ ডিগ্রী ছাড়া এদের মারা যাবে না এটাও পুরাপুরি ঠিক না। অনেকদিন আগে TED Talkএ ঢাকা ইউনিভার্সিটির বায়োমেডিক্যাল ফিজিক্স/সায়েন্স (অ্যাপ্লাইড ফিজিক্স?) ডিপার্টমেন্টর একজন প্রফেসরের (ড. রাব্বানী) লেকচার দেখেছিলাম -- উনারা সোলার পিউরিফায়ার বানিয়ে বাজারে ছেড়েছেন -- জনস্বার্থে টেকনোলজিটা প্যাটেন্ট করেননি।

ভারী ধাতু ঘনমাত্রায় বিষাক্ত হতে পারে। মানব দেহেও অ্যালুমিনিয়ামের একটা নিরাপদ মাত্রা আছে --- একবার ল্যাবরেটরিতে মেপেছিলাম: অ্যালাম (ফিটকিরি) (বেসিকালি অ্যালুমিনিয়াম সালফেট) দিয়ে থিতানো পানির পরিশ্রুততে থাকা অ্যালুমিনিয়ামের মাত্রা নিরাপদ মাত্রার চেয়ে বেশি। এটা মানুষের জন্য। ওদিকে কপার আবার শ্যাওলার জন্য বিষাক্ত -- সুইমিং পুলে যেন শ্যাওলা (algae) না জন্মায়  সেজন্য পানিতে তুতে বা কপার সালফেট মিশিয়ে দেয়া হয়; এজন্য পানির রং একটু নীলচে দেখায়। একই ঘটনা ঘটে কমোড ফ্লাশের ট্যাংকে দেয়া জীবানুনাশক কেকের ক্ষেত্রেও -- ঘন নীল রঙের সলিড কেকটা দেখে কপার সালফেট ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না। এদিকে লবন গরম পানি দিয়ে কুলকুচি করলে মুখের জীবানু মারা যায়। --- ব্যাপারটা এমন না যে সমুদ্রের পানিতে জীবানু নাই। বরং এখানে থাকা জীবানুর জন্য লবণাক্ততা হল এলিয়েন এনভায়রনমেন্ট। কাজেই এই লজিকে ফিটকিরি ঘষলে সেটা অ্যান্টিসেপ্টিক হিসেবে কাজ করতেই পারে।

পরিবেশ প্রকৌশলী'এর ওয়েবসাইট

লেখাটি CC by-nc-sa 3.0 এর অধীনে প্রকাশিত

১৫

Re: পানি জীবানুমুক্ত করণের উপায়সমূহ

summer এসে পড়েছে সুইমিংপুলটা জীবানুমুক্ত করা লাগিবে  thinking কি সব কি সব রিডিং নিয়া যায় আর পড়ে এসে কি কি রিএজেন্ট ঢেলে দেয় পানি দুই দিনে ফকফকা এখন সেই রহস্য উদঘাটন হইলো। থ্যংক্স প্রকৌশলী ভাই

Rhythm - Motivation Myself Psychedelic Thoughts

লেখাটি CC by 3.0 এর অধীনে প্রকাশিত

১৬ সর্বশেষ সম্পাদনা করেছেন @m0N (২৬-০৫-২০১৩ ২৩:১৬)

Re: পানি জীবানুমুক্ত করণের উপায়সমূহ

অত্যন্ত চমৎকার তথ্য সমৃদ্ধ লেখা। কিছু প্রশ্ন করি
* যেহেতু লিখছেন ব্যাকটেরিয়া কিংবা ভাইরাস প্রাণী -- অর্থাৎ এদের মরা বাঁচাতে প্রাণ বেঁচে থাকার ক্রাইটেরিয়া প্রযোজ্য। মানব দেহে যেই জীবানুগুলো রোগ সৃষ্টি করে সেগুলোর বেঁচে থাকার তাপমাত্রার এক্সট্রিম রেঞ্জ ১৫ থেকে ৫৫ ডিগ্রী সেলসিয়াস হওয়ার কথা -- অর্থাৎ মেসোফিলিক টাইপের। আমরাও এই তাপমাত্রা রেঞ্জে বাঁচি। এই টেম্পেরাচারের বাইরে নিলে এদের পক্ষে বেশিক্ষণ বেঁচে থাকা সম্ভব না। তাহলে কুলিং করেও কি পানি জীবানুমুক্ত করা সম্ভব কি ?

* কোথায় যেন পড়েছিলাম কোল ব্যবহারের কথা। এই বিষয়টা নিয়ে কিছু জানা থাকলে লিখবেন আশা করি।

hit like thunder and disappear like smoke

১৭

Re: পানি জীবানুমুক্ত করণের উপায়সমূহ

@m0N লিখেছেন:

কোথায় যেন পড়েছিলাম কোল ব্যবহারের কথা। এই বিষয়টা নিয়ে কিছু জানা থাকলে লিখবেন আশা করি।

কয়লা দিয়ে পানি পরিষ্কার করা যায়। তবে সম্ভবত সম্পুর্ণরুপে জীবানুমুক্ত করা যায় না।

Feed থেকে ফোরাম সিগনেচার, imgsign.com
ব্লগ: shiplu.mokadd.im
মুখে তুলে কেউ খাইয়ে দেবে না। নিজের হাতেই সেটা করতে হবে।

শিপলু'এর ওয়েবসাইট

লেখাটি GPL v3 এর অধীনে প্রকাশিত

১৮

Re: পানি জীবানুমুক্ত করণের উপায়সমূহ

@m0N লিখেছেন:

অত্যন্ত চমৎকার তথ্য সমৃদ্ধ লেখা। কিছু প্রশ্ন করি
* যেহেতু লিখছেন ব্যাকটেরিয়া কিংবা ভাইরাস প্রাণী -- অর্থাৎ এদের মরা বাঁচাতে প্রাণ বেঁচে থাকার ক্রাইটেরিয়া প্রযোজ্য। মানব দেহে যেই জীবানুগুলো রোগ সৃষ্টি করে সেগুলোর বেঁচে থাকার তাপমাত্রার এক্সট্রিম রেঞ্জ ১৫ থেকে ৫৫ ডিগ্রী সেলসিয়াস হওয়ার কথা -- অর্থাৎ মেসোফিলিক টাইপের। আমরাও এই তাপমাত্রা রেঞ্জে বাঁচি। এই টেম্পেরাচারের বাইরে নিলে এদের পক্ষে বেশিক্ষণ বেঁচে থাকা সম্ভব না। তাহলে কুলিং করেও কি পানি জীবানুমুক্ত করা সম্ভব কি ?

* কোথায় যেন পড়েছিলাম কোল ব্যবহারের কথা। এই বিষয়টা নিয়ে কিছু জানা থাকলে লিখবেন আশা করি।

উত্তরটাতো বলাই আছে। কুলিং করলেও ব্যাকটেরিয়া মারা যাওয়ার কথা। এজন্যই পাহাড়ের বরফ কেউ মারা গেলে পঁচে না (ব্যাকটেরিয়া নাই তো পঁচাবে কে?)।

কয়লা দিয়ে জীবানুমুক্ত করে না। এটা একপ্রকার শোষক -- কয়লার গুড়া বিভিন্ন রকম ধাতব, অধাতব এবং গ্যাসীয় জিনিষপাতি শোষন করে। আগে বিষাক্ত কিছু খেয়ে ফেললেও পাউরুটি পুড়িয়ে কয়লার মত বানিয়ে খাওয়ানো হত যেন তা বিষ শুষে নেয়। পানির পরিশোধণেও কয়লার গুড়া ব্যবহৃত হয়, তবে সেটা ছোট ছোট বিশেষায়িত যন্ত্রে। বড় স্কেলে একটা শহরের পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় এ ধরণের উপাদান ব্যবহার ঝামেলা জনক।

এমনকি বায়ু শোধনেও কয়লার গুড়া ফিল্টার ব্যবহার করা হয়।

পরিবেশ প্রকৌশলী'এর ওয়েবসাইট

লেখাটি CC by-nc-sa 3.0 এর অধীনে প্রকাশিত

১৯ সর্বশেষ সম্পাদনা করেছেন @m0N (২৬-০৫-২০১৩ ২৩:৫২)

Re: পানি জীবানুমুক্ত করণের উপায়সমূহ

পরিবেশ প্রকৌশলী লিখেছেন:

উত্তরটাতো বলাই আছে। কুলিং করলেও ব্যাকটেরিয়া মারা যাওয়ার কথা। এজন্যই পাহাড়ের বরফ কেউ মারা গেলে পঁচে না (ব্যাকটেরিয়া নাই তো পঁচাবে কে?)।

আসলে প্রশ্নটা গুছিয়ে করি নি। মূলত ভৌত পদ্ধতিতে এটার স্থান না পাওয়াটাই ছিল প্রশ্নের কারণ। তাছাড়া Psychrophile টাইপ আছে দেখা যাচ্ছে। বাকী প্রশ্নের উত্তর দেয়ার জন্য ধন্যবাদ। আর উঁচু জায়গায় প্রেশার কুকার ব্যবহার করলে ১ মিনিটই লাগবে।

hit like thunder and disappear like smoke

২০ সর্বশেষ সম্পাদনা করেছেন পরিবেশ প্রকৌশলী (২৭-০৫-২০১৩ ০১:২৬)

Re: পানি জীবানুমুক্ত করণের উপায়সমূহ

@m0N লিখেছেন:
পরিবেশ প্রকৌশলী লিখেছেন:

উত্তরটাতো বলাই আছে। কুলিং করলেও ব্যাকটেরিয়া মারা যাওয়ার কথা। এজন্যই পাহাড়ের বরফ কেউ মারা গেলে পঁচে না (ব্যাকটেরিয়া নাই তো পঁচাবে কে?)।

আসলে প্রশ্নটা গুছিয়ে করি নি। মূলত ভৌত পদ্ধতিতে এটার স্থান না পাওয়াটাই ছিল প্রশ্নের কারণ। তাছাড়া Psychrophile টাইপ আছে দেখা যাচ্ছে। বাকী প্রশ্নের উত্তর দেয়ার জন্য ধন্যবাদ। আর উঁচু জায়গায় প্রেশার কুকার ব্যবহার করলে ১ মিনিটই লাগবে।

যত সহজে গরম করা সম্ভব তত সহজে ঠান্ডা করা সম্ভব না (টেকনোলজি) -- সেজন্যই গৃহস্থালী পর্যায়ে ফুটানোর কথা বলা হয়, কিন্তু ফ্রিজ করার কথা বলা হয় না। শীতপ্রধাণ এলাকায় সরাসরি বরফ গলা পানি খেতে পারে। কিন্তু মানুষ সেখানে নিশ্চয়ই গরম পানির উত্তাপ খুঁজবে ব্যাকুল হয়ে। বাড়িঘরের হিটিং সিস্টেমও পানি সঞ্চালন নির্ভর হয়। এমনকি শীতপ্রধান অঞ্চলে যেন বাইরের ফ্রিজিং তাপে সরবরাহ লাইনের পানি না জমে যায় সেজন্য প্রচুর কারিগরি খাটাতে হয়। বুঝেনই তো, জমে গেলে পানি সরবরাহ যেমন বন্ধ হয়ে যাবে, তেমনি বরফের বর্ধিত আকারের চাপে পাইপ ফেটে যাবে।
যে কোন জায়গায় উপযুক্ত পাত্র থাকলে শুকনা পাতা জড়ো করে পানি ফুটাতে পারবেন, চূলা, আগুন - এসব রান্নারও অংশ -- তাই পানি ফুটানোর কথাই ঘুরে ফিরে আসে।

এছাড়া ব্যাকটেরিয়ার খাদ্য না থাকলেও সেই পানিতে ব্যাকটেরিয়া টিকতে পারবে না।

চীনে কিছু মমি পাওয়া গেছে -- ঐ এলাকার মাটি লবণাক্ত -- যাতে ব্যাকটেরিয়া বেঁচে থাকতে পারে না। তাই মাটি চাপা পড়া লাশগুলো জলীয় অংশ শুকিয়ে শুটকি হয়েছে কিন্তু এ্যাত শত বছরেও পঁচেনি।

কিছু ব্যাকটেরিয়া কঠিন সময়ে স্পোর নামক বর্ম তৈরী করে শীতনিদ্রা দেয়। ওগুলোই বিপদজনক। কিছু ব্যাঙ আছে শীতকালে বরফে জমে যায় ... আবার স্বাভাবিক তাপমাত্রায় বেঁচে ওঠে (কৃতজ্ঞতাঃ ন্যাশনাল জিওগ্রাফি) -- কিছু ব্যাকটেরিয়ার ঐ বৈশিষ্ট থাকলে সেটা ফ্রিজিং পদ্ধতির জন্য বিপদজনক হবে। বিপরীত দিকে গরমে বা ফুটন্ত তাপমাত্রায় টিকে থাকে এমন ব্যাকটেরিয়া আছে বলে শুনিনি। এটাও একটা কারণ হতে পারে।

পরিবেশ প্রকৌশলী'এর ওয়েবসাইট

লেখাটি CC by-nc-sa 3.0 এর অধীনে প্রকাশিত