টপিকঃ একবার বনভোজনে... ১ম পর্ব

আরে ভাই, একটু জোরে চালান না!
আর কত জোরে চালামু, আপা? আমি তো পঙ্খিরাজের ড্রাইভার না।
সে আমি কী জানি। বেশি কথা না বলে একটু তাড়াতাড়ি করেন না!

উদ্বিগ্ন মুখে দীপিন্তি ঘড়িটা দেখে। ইস, বড় দেরী হয়ে গেলো! ৯ টায় ছাড়বে বলেছিলো। এখন ন’টা বেজে ৩৬ মিনিট। পিকনিকের বাসটা কি ওকে ছেড়ে চলেই গেলো নাকি! কত আশা করে কত কী করবে ভেবেছিলো, সব ভেস্তে যেতে বসেছে! বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে থাকে ওর মসৃণ কপালে, চিবুকে। বুকটা হাপরের মত ওঠানামা করতে থাকে।

সবই ঠিক ছিলো। ঘড়িতে এলার্মও দেয়া ছিলো। সকাল ৬টায় উঠে তৈরি হবে। কিন্তু সকালে সে কিছুতেই উঠতে পারে না। এলার্ম শুনেও ঘুমের ঘোরে টেবল ঘড়িটার টুটি চেপে ধরেছিলো। ফলাফলঃ ৮ টায় উঠে দৌঁড়-ঝাঁপ। কিন্তু শেষ রক্ষা হবে কিনা, কে জানে?
এইসব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে রিক্সাটা ডিপার্টমেন্টের ফটক ধরে গলতে থাকে। ভয়ে ভয়ে ইতি-উতি একটা বাস খুঁজতে থাকে। বাসের মুখে একটা ব্যানার ঝুলবে। ও নিজেই লিখেছে। কত কাজ করেছে এই পিকনিকের জন্য। অথচ তারই যাওয়াটা ভণ্ডুল হয়ে যায় নাকি? মোবাইলটাও এই সময়ে চার্জ খুইয়ে বসে আছে। জয়িতা দিদিকে শুধু বলতে পেরেছিলো ওকে ছেড়ে যেন না যায়...অপেক্ষা করে। সে কি সবাইকে এতক্ষণ ধরে রাখতে পারবে?

ভাড়াটা মিটিয়ে এদিক-ওদিক খুঁজেও কোনো বাস দেখতে পেলো না। দুঃখে কান্না আসি আসি করছে। নিজের নির্বুদ্ধিতার জন্য হাত কামড়াতে ইচ্ছে হচ্ছে। কী করবে ভেবে পাচ্ছে না। কাউকে কি জিজ্ঞেস করবে? এমন সময় মেইন বিল্ডিং-এর পেছন থেকে কারা যেন হেঁকে উঠলো, ‘এই যে লেইট লতিফা বেগম, এই দিকে আয়...কানা নাকি? চোখে দেখিস না!’

দীপিন্তির বুকে রক্ত ছলকে উঠে। বকা খেয়েও হাসতে হাসতে দৌঁড়াতে থাকে। তাহলে ওরা ওকে ছেড়ে যায় নি!

বাসের দরজায় জয়িতা দাঁড়ানো। দুই ইয়ার সিনিয়ার। অগ্নিশর্মা মূর্তি!
তোকে ধরে চাবকানো উচিৎ! কী করছিলি এতক্ষণ? বাস কি তোর জন্য পুরা দিনটা বসে থাকবে? কেলাস কোথাকার!
রাগ করো না, জয়িদি। আমি জানতাম তুমি আমাকে ছেড়ে যাবে না। আমার লক্ষ্মি আপু!
ন্যাকামো রাখ। এখন সীটে বসে আমাকে উদ্ধার কর। ক’বে যে পাংচুয়ালিটি শিখবি!

বসবার জন্য জয়িতা সামনে তাকিয়ে দেখেঃ সবার মুখে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ঝুলছে। কারো মুখে রাগ, কারো মুখে বিরক্তি, কেউ কেউবা বেশ উদ্বিগ্ন। কিন্তু সব ছাড়িয়ে সবার মাঝে একটা সূক্ষ্ণ কৌতুক কি খেলা করছে? ওর ভুলও হতে পারে। কিন্তু কেন?

কারণটা খুব দ্রুতই বুঝতে পারলোঃ বাসে কোনো আসনই আর ফাঁকা নেই! সবাই সবার পছন্দের মানুষের সাথে বসে গেছে। জয়িদির জন্যও অসীমদা অপেক্ষা করছেন। শুধু একটা আসনই বাকী। কিন্তু যার পাশে বসতে হবে, সেটা দেখে রাগে গা জ্বলে গেলো! আজকের দিনটাই কুফা!

জয়িদি, আমি মরে গেলেও ঐটার পাশে বসবো না! চাপাস্বরে দীপিন্তি ফুঁসে ওঠে।
ছিঃ, এভাবে বলে না দীপি! সিন ক্রিয়েট করিস না। এমনিতে অনেক দেরী হয়ে গেছে। নে, বসে পড়তো। মাত্র দু’ঘন্টার পথ। দেখতে দেখতে চলে যাবে। তাছাড়া শৈবালকে যা ভাবিস, ও মোটেও তেমনটা নয়!

এই মুহুর্তে দীপিন্তির সহযাত্রি নিজের নামটা শুনে একটা বেজায় ঘোর থেকে যেন উঠে আসে। কী ভাবছিলো, কে জানে? মাথায় ঝাঁকড়া চুল। পরনে একটা খদ্দেরের পাঞ্জাবি আর ব্লাক জিন্স। চৌকো মুখে একটা তিরিক্ষি রাগ খেলে গেলেও চোখজোড়া কেমন যেন অদ্ভুত স্বপ্নালু! পুরো ডিপার্টমেন্টে দীপিন্তির একমাত্র বিখ্যাত শত্রু – শৈবাল অরিত্র!

আমি বাঘও না, ভাল্লুকও না। আমার পাশে বসলে কারো মান যাবে না। আর যদি যায়ই তো...জয়ি, আয় তুই বস আমার পাশে।
গমগমে কন্ঠে বলে ওঠে শৈবাল।

অ্যাঁ, তাহলে অসীম বসবে কার সাথে? জয়িতা খাবি খায়।
ওদিকে অসীমের মুখ ছাই হয়ে গেলো। নিজের প্রেমিকার সাথে কে-ইবা না যেতে চায়? দীপিন্তি সব দেখেশুনে অগত্যা রাজী হয়ে যায়। গজগজ করতে করতে ধপাস করে বসে পড়ে শৈবালের পাশটিতে।

এখন খুশি তো! যাও গিয়ে বসো। তোমরা সবাই ষড়যন্ত্র করে এই ব্যবস্থা করেছো। বুঝি, আমি সবই বুঝি। আ বাঞ্চ অব ক্রিমিনাল মাইন্ডস!

জয়িতা হাসি হাসি মুখে চলে যায়। রাগে পিত্তি জ্বলে গেলেও কিছুই করার থাকে না দীপিন্তির।

সরে বসেন। এত ঘেঁষে বসেছেন কেন?
কোথায় ঘেঁষে বসলাম? আজব তো! খামোখা বাজে কথা না বললেই কি নয়!
আমি জানালার পাশে বসবো। জানালার পাশে ছাড়া আমি বসতে পারি না।
আমারও জানালার পাশে ছাড়া ভালোলাগে না। শৈবাল ঘোষণার ভঙ্গিতে বলে।
ম্যানারলেস, রুড! কীভাবে মেয়েদের সাথে কথা বলতে হয়, তা-ই জানে না।
জানার দরকারও নেই! ঐ লেসন মরিচমুখি কারো কাছে থেকে আমার শিখতে হবে না।
কী! ঠিক আছে, দরকার নেই আমার জানালার পাশে বসে। আপনিই বসেন। গুম হয়ে থাকে দীপিন্তি।

বাসটা চলতে থাকে। বাইরে চৈত্রের সূর্যটা তার ভেল্কি দেখাতে শুরু করেছে। চড়চড় করে তাপ বাড়ছে। পথের দু’ধারে আম আর কলা গাছের সারি একমনে দেখছিলো শৈবাল। একটা হালকা মিঠে গন্ধ আসছে। কোথায় যেন আমের বোল ফুটেছে। সাথে পাশে বসে থাকা মেয়েটির ব্যবহার করা একটা হালকা পারফিউমের গন্ধ। ঠিক কোনটা যে ওর ভালো লাগছে, সেটি ঠিক ঠাহর করতে পারছে না! হঠাত সে দাঁড়িয়ে পড়ে।

বসো, জানালার পাশে গিয়ে বসো।

অবাক হয়ে গেলেও দীপন্তি সরল মনে জানালার পাশে গিয়ে বসে। রোদ বেশ কড়কড়ে হয়ে উঠেছে। একেকটা আগুনের গোলা যেন দীপিন্তির ফর্সা মুখে আছড়ে আছড়ে পড়তে থাকলো। শৈবালের মুখটা কি একটু হাসি হাসি? যে রাম গরুড়ের ছানা...এর মুখে তো হাসি থাকার কথা না!

চালটা বুঝে যায় দীপিন্তি। গরমে পুড়িয়ে মারার ধান্দা। কিন্তু এখন কিছুতেই সে সেটা স্বীকার করবে না। শত্রুকে আনন্দের উপলক্ষ্য এনে দেবার কোনো ইচ্ছেই আপাতত নেই। কিছুটা সময় সে গ্যাঁট হয়ে বসে বসে পুড়তে থাকে। শেষটায় না পেরে জানালার পর্দাটা ধরে টানাটানি করতে থাকে। পর্দাটাও এমন...ঠিক সময়ে এমন গিট্টু নিয়ে ঝুলছে যে দীপি কিছুতেই কায়দা করে উঠতে পারলো না। ধ্যাত! দিনটাই খারাপ আজকে।

আড়চোখে সবই দেখছিলো শৈবাল। নীল-সাদা একটা চমৎকার শাড়ি পরেছে দীপিন্তি। সেটার আঁচলটা জানালার হাওয়ায় উড়ে এসে শৈবালের চোখে আছড়ে পড়ছে। এবার যেন একটু মায়া হয়ে যায় দাঁড়িয়ে যুঝতে থাকা মেয়েটির জন্য। হাত বাড়িয়ে দীপির নীল রেশমি চুড়ি ছুঁয়ে নামিয়ে আনে আসনে। তারপর জানালার পর্দাটা ঠিক করে দেয়। অপ্রস্তুত হয়ে যায় দীপিন্তি। ভেতরের কোলাহল কি ক্ষণের জন্য থেমে যায়? তারপর একটা চাপা হাসি... সব ষড়যন্ত্র...দীপি দুঃখে চোখ বন্ধ করে ফেলে। 

চলবে...

কিছু বাধা অ-পেরোনোই থাক
তৃষ্ণা হয়ে থাক কান্না-গভীর ঘুমে মাখা।

উদাসীন'এর ওয়েবসাইট

লেখাটি CC by-nc 3.0 এর অধীনে প্রকাশিত

Re: একবার বনভোজনে... ১ম পর্ব

বাসে বসে পড়ুম নে.....

জাযাল্লাহু আন্না মুহাম্মাদান মাহুয়া আহলুহু......
এই মেঘ এই রোদ্দুর

Re: একবার বনভোজনে... ১ম পর্ব

আরেকটা সুপার স্টোরি পাচ্ছি মনে হচ্ছে thumbs_up

লেখাটি CC by-nc-nd 3. এর অধীনে প্রকাশিত

Re: একবার বনভোজনে... ১ম পর্ব

চমৎকার গল্প......  thumbs_up দারুণ শুরু...

আমি রাবেয়া সুলতানা....

Re: একবার বনভোজনে... ১ম পর্ব

clap clap চমৎকার গল্প , রোমান্টিক টা সেরকম লাগল ।

উদা দা এবার দিপিন্তি আপু আসলেই হবে , বলবে আমার নাম নিয়ে বনভোজন  hehe .

নিবন্ধিতঃ১১/০৩/২০০৯ ,নিয়মিতঃ১০/০৩/২০১১, প্রজন্মনুরাগীঃ১৯/০৫/২০১১ ,প্রজন্মাসক্তঃ২৬/০৯/২০১১,
পাঁড়ফোরামিকঃ২২/০৩/২০১২, প্রজন্ম গুরুঃ০৯/০৪/২০১২ ,পাঁড়-প্রাজন্মিকঃ২৭/০৮/২০১২,প্রজন্মাচার্যঃ০৪/০৩/২০১৪।
প্রেম দাও ,নাইলে বিষ দাও

Re: একবার বনভোজনে... ১ম পর্ব

তারপর? এভাবে শেষ করলে কেমনে হবে ? angry ধুর মিয়া  sad

রাবনে বানাদি ভুড়ি :-(

Re: একবার বনভোজনে... ১ম পর্ব

ধন্যবাদ সবাইকে hug

আবদুল্লাহ আল রিফাত লিখেছেন:

আরেকটা সুপার স্টোরি পাচ্ছি মনে হচ্ছে thumbs_up

হে হে

রাবেয়া সুলতানা লিখেছেন:

চমৎকার গল্প......  thumbs_up দারুণ শুরু...

ধন্যবাদ, আপুমণি!

Jemsbond লিখেছেন:

clap clap চমৎকার গল্প , রোমান্টিক টা সেরকম লাগল ।
উদা দা এবার দিপিন্তি আপু আসলেই হবে , বলবে আমার নাম নিয়ে বনভোজন  hehe .

হা হা হা। দীপিন্তি সেরকম মেয়েই নয়। আমাকে কিছু বলবে না। অনেক মিস করি ওনাকে।

তার-ছেড়া-কাউয়া লিখেছেন:

তারপর? এভাবে শেষ করলে কেমনে হবে ? angry ধুর মিয়া  sad

আসলে পুরোটাই দিতাম..কিন্তু বেশি বড় হয়ে যায় বলে একটা জায়গায় ছেড়ে দিতে হয়েছে hehe

কিছু বাধা অ-পেরোনোই থাক
তৃষ্ণা হয়ে থাক কান্না-গভীর ঘুমে মাখা।

উদাসীন'এর ওয়েবসাইট

লেখাটি CC by-nc 3.0 এর অধীনে প্রকাশিত

Re: একবার বনভোজনে... ১ম পর্ব

মচতকার হয়েছে ভাইজান।  hug

Re: একবার বনভোজনে... ১ম পর্ব

লাস্টের কয়েকটা লাইনে গিট্টু মার্কা কথাবার্তা। দুই তিনবার পরে লা্‌ইনগুলোর গিট্টুর জট খুলতে হয়েছে।
মেয়েটিকে ছেলেটি তুমি করে বলে আর মেয়েটি ছেলেটিকে আপনি করে বলে কেন? দুইজনই তুমির মাঝে থাকলে ভালো হতো না।
শত হলেও গায়ক বলেছেন-
"তুমি করে ডাকলে,
বড়ই মধুর লাগে"।
যাই হোক পরের পর্বে দৌড় দেই.....

আমাকে কোথাও পাবেন না।