টপিকঃ :::পলায়ন:::

আমার একটা ছোটখাট রাইটার্স ব্লক হয়েছিলো। কিছুই আসছিলো না মাথায়। কী-বোর্ড হাতে বৃথা সময় নষ্ট করছিলাম। এমনি সময় হঠাৎ এই ছোট গল্পটি লেখার ধারণা ঝুপ করেই চলে এলো। একটানে লিখে ফেলেছি। ভুল-ত্রুটি মার্জনীয়!

:::পলায়ন:::
========================================================================
   অনিমিখে চেয়ে আছে অনিমিখ। দীপান্বিতার বিস্ময়াভিভূত চোখে। অনিমিখের চোখে নানান আবেগের উথালি পাথালি স্রোত। এর মাঝে অন্যতম একটা হলো অপরাধবোধ। চুরি করে দীপান্বিতার ডায়রি পড়তে গিয়ে এইমাত্র ধরা খেয়েছে সে।

   দীপার এক শয্যার গোছানো ছিমছাম ফ্ল্যাটটিতে বেড়াতে এসে অঘটনটা ঘটে যায়। একটু আসছি বলে দীপা চলে গেলে ছটফটে অনি দীপার ডেস্কটাতে হানা দিয়ে বসে এবং আধাবোজা ডায়রিটা যেন হাতছানি দিয়ে ডেকে ফেলে।

   আজ প্রায় দু’বছর হতে চললো দীপা অনিকে একপ্রকার লেজে খেলাচ্ছে! এটা অবশ্য অনিমিখের গোপন ধারণা। দীপান্বিতা যেন একটা সোনার হরিণ – ধরা দিয়েও দেয় না ধরা! কেন? এ প্রশ্নের উত্তর জানা নেই! অবশ্য সেটা সরাসরি জিজ্ঞেস করে ফেললেই হয়। কিন্তু যতবারই বলতে গেছে সব গুবলেট করে ফেলেছে। অথচ এই অনিমিখই নাকি একটা চ্যানেলে তুখোড় প্রেজেন্টার! দীপাও সেখানে কাজ করে। সব ঠিক আছে কেবল ঐ একটা জায়গায় সব স্মার্টনেস গলে পানি হয়ে যায়।

   এই সম্পর্কের একটা আনুষ্ঠানিক নাম আছে অবশ্য – ভীষণ ভালো বন্ধু! মনে মনে গুলিতে ঝাঁঝরা করে অনি। সে ফেলুক, তবে বন্ধুত্ব আর প্রেমের মাঝে সে চুল পরিমাণ পার্থক্য আছে,  সেটা কিছুতেই ডিঙ্গাতে পারে না। দীপার শীতলতায় সে মাঝে মাঝেই বড় আপসেট হয়ে পড়ে।

   আর আছে একটা ডায়রি। কী লেখে কে জানে! সেটাতে আবার তালা দিয়ে রাখে। এটাকে দু’চোখে দেখতে পারে না অনি – যেন প্রতিদ্বন্দ্বী! কত রাত যে ওটাকে স্বপ্নে জ্বালিয়েছে তার ইয়ত্তা নেই! বেড়াতে এলেই কেবল আড়ে-ঠাড়ে ডায়রিটাকে দেখে। আহ, যদি একবার খোলা পেতো! তাহলে হয়তো সম্পর্কের এই প্রহেলিকার একটা কূলকিনারা হতো।

   দীপা কি ব্যাপারটা বোঝে? হয়তোবা। কেমন যেন রহস্যের হাসি হাসে। নির্দয় আর কাকে বলে? মেয়েরা এত নিষ্ঠুর হয় কেন?

   সেই দীপারই আজ মস্ত ভুলে হয়ে গেছিলো। ডায়রিটাতে তালা না লাগিয়েই সে চলে যায়। সুযোগের সদব্যবহারে পিছপা হয় না অনি। বিবেকে বাঁধলেও অকাজটা সে করেই ফেলে। দ্রুত পাতা উল্টাতে থাকে। বেশিরভাগই আটপৌরে কিন্তু সংক্ষিপ্ত কথাবার্তা। উফফ, মেয়েরা কত সামান্য জিনিসও খুঁটিয়ে দেখে। তারপর হঠাত আটকে যায় একটা পাতায়।

   জীবনের গোপনতম কথাগুলো কিংবা দুঃখগুলো সম্ভবত সবচে’ খরুচে আবেগের হয়ে থাকে। আর বুকের গভীরতম প্রদেশে সেগুলো অন্তক্ষরা স্রোতের মত বয়ে যায়। নীল কালিতে মুক্তা দানার মত অক্ষরগুলি যেন ভারী বেদনার ব্যাকুল অশ্রুবিন্দু! একটা বাষ্পরুদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ভারী হতে থাকে অনিমিখের বুকে। বরাবরের স্বল্পভাষী দীপান্বিতার এক পাতার ঐ মনোকথাও স্বল্প দৈর্ঘ্যের – পড়তে সময় লাগে না অনিমিখের। ঠিক তখনি যেন অলখে এসে হাজির হয় দীপান্বিতা।

   মুখ ফিরিয়েই জমে পাথর হয়ে যায় অনিমিখ! দীপান্বিতার বিস্ফারিত চোখে অনুযোগের যে ভীষণ অভিব্যক্তি তাতে এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে যাওয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। কোনো কথা হয় না; কেবল তাকিয়ে থাকা। প্রবল সংসক্তির অস্বস্ত ক’টা মিনিট শ্লথের মত এগোতে থাকে!

   অনিমিখের অপলক দৃষ্টিতে কী একটা যেন থাকে যেটার কাছে দিপান্বিতার অভিযোগ পরাজিত হয়ে যায়। এত বেদনার্ত দৃষ্টি তো সে আর দেখে নি আগে! এই তো কত স্পষ্ট পড়তে পারছে লোকটাকে – দু’কূল ছাপানো ব্যথা। ওর জন্য? বুকের কোথাও কঠিন অনড় কিছু একটা যেন নড়ে গেলো! কী নাম এই টনটনে অনুভূতির? উত্তরটা সহসাই পেয়ে যায় দীপান্বিতা।

   কিন্তু কীসের এই দুঃখবোধ? ডায়রিতে কী দেখে অনিমিখ এমন আপ্লুত হয়ে গেলো? হাত বাড়িয়ে ডায়রিটা ছিনিয়ে নিয়ে মেলে থাকা পাতাটিতে চোখ বুলিয়ে হেসে ফেলে দীপান্বিতা! হাসিটা বড় হতে হতে অট্টহাসিতে পরিণত হলো নিমেষেই। সে আর থামতে চায় না।

   অনিমিখ –এর মাথায় কিছু ঢুকে না। সে বোকার মত তাকিয়ে থাকে। নারীজাতি বড়ই রহস্যময়!

   বুদ্ধু কোথাকার! এরই জন্য তোমার অত ছলছল চোখ! ইস, বড্ড ভুল হয়ে গেছে – মোবাইলে তুলে রাখতে হতো। জ্বী না, আমার মা হওয়া নিয়ে কোনো সমস্যা নেই! ওটা আমার নিজের কথা নয়; গল্পের একটা আইডিয়া লিখে রেখেছি ডায়রিতে। আর ওটা পড়েই...হাসির দমকে বাকীটুকু আর বলতেই পারে না দীপান্বিতা!

   অনিমিখ সামলে নেয়। হঠাত গত দু’বছরের সবচে’ সাহসী কাজটা করে ফেলে সে। ঝট করে নিজের কাছে টেনে নিয়ে... দীপান্বিতা সহস্র হৃদয়-দীপের মোহন উষ্ণতা ধরে ফেলে কোমল অধরে! ছিটকে সরে গিয়ে হাঁফাতে থাকে।

   অদূরেই জগতজয়ী বীরের মত দাঁড়িয়ে থাকে অনিমিখ – মুখে অম্লান হাসি।

   আর দীপান্বিতা? ক’ফোটা জল নীরবে গড়িয়ে পড়ে। সেটার সাথে অদ্ভুত একটা সুখ দ্রবীভূত হয়ে থাকে। কিন্তু পরক্ষণেই একটা ছোট্ট দীর্ঘশ্বাসের সাথে ভাবতে থাকে – পালাতে হবে খুব শীঘ্রই। ডায়রির পাতাটা আদতে যে মিথ্যে বলেনি! 

=======================================================================
উদাসীন
০৭।০১।২০১৩

কিছু বাধা অ-পেরোনোই থাক
তৃষ্ণা হয়ে থাক কান্না-গভীর ঘুমে মাখা।

উদাসীন'এর ওয়েবসাইট

লেখাটি CC by-nc 3.0 এর অধীনে প্রকাশিত

Re: :::পলায়ন:::

খুব ভালো হয়েছে ।

লেখাটি CC by-nc-nd 3. এর অধীনে প্রকাশিত

Re: :::পলায়ন:::

ছোট লেখার মধ্যে বিশাল ঘটনা .............দারুন হয়েছে.......।

তবে স্বভাব দোষে কয়েকটি উদ্ভট প্রশ্ন মাথায় ঢুকে গেছে..........(সমালোচনা করতে গিয়ে ২-৩ বার পড়তে হলো  sad)........

> দীপান্বিতা কিভাবে জানলো তার সমস্যার কথা.....একটা অবিবাহিত ছেলে-মেয়েরতো এমন সমস্যা ধরাপড়ারই কথানা.......। তাই ওর অন্য অসুখ......যেমন ক্যান্সার-ট্যান্সার হলে ভালো মানাতো big_smile

টিপসই দিবার চাই....স্বাক্ষর দিতে পারিনা......

Re: :::পলায়ন:::

গল্পটা বেশ ভাল হয়েছে। অল্প জায়গায় অনেকখানি আবেগ ধরে ফেলেছেন।  thumbs_up thumbs_up

গর্ব এবং আশায় ভরা বুক! কাঁধে কাঁধ, হাতে হাত, সমুন্নত শির!
আমি তুমি সবাই মিলে এক, একই লাল সবুজের কোলে সবার নীড়।

Re: :::পলায়ন:::

রিফাত, মেহেদী হাসান, এবং যাপিত সময়, ধন্যবাদ আপনাদের hug

মেহেদী হাসান লিখেছেন:

তবে স্বভাব দোষে কয়েকটি উদ্ভট প্রশ্ন মাথায় ঢুকে গেছে..........(সমালোচনা করতে গিয়ে ২-৩ বার পড়তে হলো  sad)........
> দীপান্বিতা কিভাবে জানলো তার সমস্যার কথা.....একটা অবিবাহিত ছেলে-মেয়েরতো এমন সমস্যা ধরাপড়ারই কথানা.......। তাই ওর অন্য অসুখ......যেমন ক্যান্সার-ট্যান্সার হলে ভালো মানাতো big_smile

হা হা হা ভালো পর্যবেক্ষণ নি:সন্দেহে! তবে, কোথাও তো বলা নেই ওদের বৈবাহিক অবস্থার কথা! ছোটগল্পে কল্পনার ব্যাপ্তিটা অনেক। গল্পে দু'জন পরিণত বয়সের মানুষের কথা বলা হয়েছে যাদের সম্পর্কটা অসংজ্ঞায়িত থেকে যাচ্ছিল। এখন এদের একজনের সম্পর্কের অন্য ইতিহাস থাকতেই পারে। কী পারে না? smile চমৎকার মন্তব্যের জন্য আবারো ধন্যবাদ!

কিছু বাধা অ-পেরোনোই থাক
তৃষ্ণা হয়ে থাক কান্না-গভীর ঘুমে মাখা।

উদাসীন'এর ওয়েবসাইট

লেখাটি CC by-nc 3.0 এর অধীনে প্রকাশিত

সর্বশেষ সম্পাদনা করেছেন @m0N (০৮-০১-২০১৩ ১৬:৫১)

Re: :::পলায়ন:::

উদাসীন লিখেছেন:

তবে, কোথাও তো বলা নেই ওদের বৈবাহিক অবস্থার কথা! ছোটগল্পে কল্পনার ব্যাপ্তিটা অনেক। গল্পে দু'জন পরিণত বয়সের মানুষের কথা বলা হয়েছে যাদের সম্পর্কটা অসংজ্ঞায়িত থেকে যাচ্ছিল। এখন এদের একজনের সম্পর্কের অন্য ইতিহাস থাকতেই পারে। কী পারে না? smile চমৎকার মন্তব্যের জন্য আবারো ধন্যবাদ!

আমিও এমনটাই ভেবেছিলাম। ভালো লাগল তবে যেলড্রিয়ান প্রহেলিকা থেকে পালাতো পারবেন না।  shame আপনার সব গল্প পড়লেই নতুন বাংলা শব্দ শিখি। আজ যেমন শিখলাম "অনিমিখ" তবে আপনি কবিতার অনেক শব্দ গদ্যে ব্যবহার করেন যার জন্য অপ্রচলিত লাগে। ৭০০টা দেখতে সুন্দর লাগেছ তাই রেপু না দিয়ে পালিয়ে বাঁচলাম। পরে পুষিয়ে দিব।

hit like thunder and disappear like smoke

Re: :::পলায়ন:::

আপনার এই অণুগল্পটা ভালো লাগলো.
একটু অফটপিক করলাম...... বাস্তব জীবনে এই গল্পটার একটা প্রতিচ্ছবি দেখছি খুব খুব কাছ থেকে......
দশ বছর আগে আলাপ-পরিচয় থেকে বর্তমানে সবচেয়ে কাছের বন্ধু বাপ্টুদা. ওর আর মৌ-এর আলাপ আমাদের পরিচয় হওয়ার পর... ফলে মৌ-কেউ দীর্ঘদিন ধরেই চিনি. ওদের বিবাহের ২ বত্সরের মাথায় ওদের একটি কন্যা সন্তান হয়েছিল এবং জন্মের ১৯দিনের পর মারা যায় আর মৌ প্রায় যমে মানুষে টানাটানির পর বেঁচে গেলেও ও আর কোনদিন জৈবিকভাবে মা হতে পারে নি. কিন্তু ওদের কখন দূরে যেতে দেখিনি দীপান্বিতার মত..... বরং প্রতিদিন আরও কাছে আসতে দেখেছি, দেখেছি মৌ কিভাবে মৌ থেকে ছোট-মা তে পরিণত হয়েছে বাপ্টুর দুই ভাইপোর কাছে. কাছ থেকে ওই সুখী পরিবারটাকে দেখেছি.........
আপনার এই গল্পটা বেশ জায়গায় শেষ করেছেন, পাঠক তার নিজের কল্পনা অনুযায়ী পরিসমাপ্তি করে নেবে.

গল্প-কবিতা - উদাসীন - http://udashingolpokobita.wordpress.com/
ছড়া - ছড়াবাজ - http://chhorabaz.wordpress.com/

Re: :::পলায়ন:::

আমি কোনদিন গল্প লিখিনি। মানুষ যে কেমনে ব্লক হওয়ার পরও কি-বোর্ড চাপাচাপি করে এতো সুন্দর গল্প লিখে ফেলে!
ছোট গল্প এ জন্যে আমার বেশ ভালো লাগে যে, আমি ইচ্ছেমত হ্যাপি এন্ডিং দিয়ে দিই smile

বেদনাদায়ি, তবুও দিনান্তে যে তোমায় ভালবাসি!

Re: :::পলায়ন:::

অসাধারন গল্প। ছোট কিন্তু ব্যাপ্তি অনেক

এখনও শিখছি। আরো শিখতে চাই। পরে নাহয় শেখানো যাবে। আপাতত শেয়ার করতে পারি

১০

Re: :::পলায়ন:::

@m0N লিখেছেন:

আমিও এমনটাই ভেবেছিলাম। ভালো লাগল তবে যেলড্রিয়ান প্রহেলিকা থেকে পালাতো পারবেন না।  shame আপনার সব গল্প পড়লেই নতুন বাংলা শব্দ শিখি। আজ যেমন শিখলাম "অনিমিখ" তবে আপনি কবিতার অনেক শব্দ গদ্যে ব্যবহার করেন যার জন্য অপ্রচলিত লাগে। ৭০০টা দেখতে সুন্দর লাগেছ তাই রেপু না দিয়ে পালিয়ে বাঁচলাম। পরে পুষিয়ে দিব।

হা হা হা নাহ, যেলড্রিয়ান থেকে পালাই নি; আসলে লিখতে পারছিলাম না। প্রেরণা হারিয়ে ফেলেছিলাম। ভালো কথা - আমি কিন্তু আবার লিখতে শুরু করেছি big_smile নাহ, রেপু না দিলেও কিছু না। অনেক ধন্যবাদ।

@অরুণদা, আপনার অভিজ্ঞতাটাও এক টাইপের। কে জানে, এই কাহিনির শেষটা থাকলে হয়তো সেরকমই হত!

অংকিতা লিখেছেন:

আমি কোনদিন গল্প লিখিনি। মানুষ যে কেমনে ব্লক হওয়ার পরও কি-বোর্ড চাপাচাপি করে এতো সুন্দর গল্প লিখে ফেলে!

লুল...আসলেই ব্লকড্‌ হয়ে গেছিলাম sad খুবই খারাপ লাগে তখন..

@তাহসান, অনেক অনেক ধন্যবাদ  hug

কিছু বাধা অ-পেরোনোই থাক
তৃষ্ণা হয়ে থাক কান্না-গভীর ঘুমে মাখা।

উদাসীন'এর ওয়েবসাইট

লেখাটি CC by-nc 3.0 এর অধীনে প্রকাশিত