সর্বশেষ সম্পাদনা করেছেন তারিফ হক (২৩-০৮-২০১২ ১৩:২১)

টপিকঃ আমাদের শিক্ষা-জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি চর্চার ঐতিহ্য (কালের কণ্ঠ থেকে)

আমাদের শিক্ষা-জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি চর্চার ঐতিহ্য ঔপনিবেশিক শিক্ষায় শিক্ষিত আমরা অনেকেই বিশ্বাস করতে শিখেছি আমাদের জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি চর্চার ইতিহাস অল্পদিনের। ধূসর রঙের। বিশেষ করে বাঙালিদের জ্ঞান-বিজ্ঞান সাধনার ইতিহাস এই সেদিনের (!) এসব কথা যাঁরা বলেন তারা না ভেবেই, না জেনেই বলেন। বাংলার বিভিন্ন জনপদের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে এর উত্তর পরিষ্কারভাবে আমরা পাই। পাল-চন্দ্র পর্বের পূর্বে বাংলাদেশে বিহার-সংঘরামের (বিশ্ববিদ্যালয়) অপ্রতুলতা ছিল না, এর প্রমাণ হিসেবে এখনো সাক্ষ্য দেয় রাজকীয় লিপিমালা, ফা-হিয়েন, যুয়ান-চোয়াং ও ই-ৎসিঙের ভ্রমণ বিবরণ। শুধু ধর্মীয় শিক্ষা নয়, যুদ্ধবিদ্যা থেকে শুরু করে জ্ঞান-বিজ্ঞানের হেন শাখা নেই, যে শাখায় শিক্ষাদান হতো না। তিব্বতি, চীনা, জাপানি, নেপালি, মালয়, লঙ্কান থেকে শুরু করে ভারতের বিভিন্ন জাতি-প্রজাতির মানুষ অধ্যয়ন করতে আসতেন। প্রতিটি বিহারে ছিল বিশাল গ্রন্থাগার। যিনি সর্ববিদ্যায় বিদ্বান এবং যিনি বেশি সংখ্যক গ্রন্থের প্রণেতা, তিনিই হতেন একটি বিহারের মহাচার্য। বর্তমানে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এর উল্টোপথে চলছে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে জ্ঞানার্জনের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যিনি সবচেয়ে বড় তাঁবেদার ক্ষমতাসীন দলের, তিনিই উপাচার্য অথবা অধ্যক্ষ বনে যান।

বিক্রমশীলা মহাবিহারের মহাচার্য অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান (আনু-৯৮০-১০৫৩ খ্রিস্টাব্দ) সম্পর্কে শুধু একটি তথ্য প্রদান করে আজকের আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও অক্সফোর্ড, ক্যামব্রিজ, কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক উচ্চশিক্ষা লাভের দৌড়ঝাঁপের একটি তুলনামূলক চিত্র দেওয়ার চেষ্টা করেছি। এই বিহারে বসবাসকালেই তিব্বতের বৌদ্ধ রাজা লাহ-লামা দূত পাঠিয়ে দীপঙ্করকে তাঁর দেশের শিক্ষাব্যবস্থা পরিচালনার দায়িত্ব দিতে চেয়েছিলেন। নির্লোভ-নিরহংকার দীপঙ্কর সবিনয়ে আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। এর কিছুদিন পর প্রতিবেশী এক রাজকারাগারে প্রাণ বিয়োগের পূর্বে প্রাণের একান্ত অভিপ্রায় জানিয়ে দীপঙ্করকে তাঁর দেশে শিক্ষাব্যবস্থা পুনর্গঠনের জন্য চিঠি লিখে রেখে যান। লাহ-লামার মৃত্যুর পর তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র চান্চূবের তিব্বতি আচার্য বিনয়ধরকে দূত হিসেবে পাঠান বিক্রমশীলা বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিক্রমপুর অবস্থিত ছিল,নদী গর্ভে বিলীন)। এ সময় আচার্য রত্নাকর ছিলেন বিক্রমশীলা বিহারের অধিনায়ক। ভারতের বিভিন্ন বিহারের ভিক্ষুসংঘ তখন নানা ধরনের নৈতিক ও মানসিক শৈথিল্যে ভারগ্রস্ত; দীপঙ্কর ছাড়া ভিক্ষুদের নৈতিক শাসন করার তেমন কেউ ছিলেন না। রত্নাকর দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানকে তিব্বতে যেতে শর্ত দিলেন, রাজাকে চিঠি লিখলেন অতীশ না থাকিলে ভারতবর্ষ অন্ধকার। বহু বৌদ্ধ প্রতিষ্ঠানের কুঞ্চিকা তাঁহারই হাতে। তাঁহার অনুপস্থিতিতে এই সব প্রতিষ্ঠান শূন্য হইয়া যাইবে। চারদিকের অবস্থা দেখিয়া মনে হয়, ভারতবর্ষের দুর্দিন ঘনাইয়া আসিতেছে। অসংখ্য তুরস্ক সৈন্য ভারতবর্ষ আক্রমণ করিতেছে; আমি অত্যন্ত চিন্তিত বোধ করিতেছি। তবু, আশীর্বাদ করিতেছি, তুমি অতীশ ও তোমাদের সঙ্গীদের লইয়া তোমাদের দেশে ফিরিয়া যাও, সকল প্রাণীর কল্যাণের জন্য অতীশের সেবা ও কর্ম নিয়োজিত হউক। (নীহাররঞ্জন রায়ের বাঙালীর ইতিহাস-আদিপর্ব)।

সহস্রাব্দ পূর্বে একজন বাঙালি (যিনি ১৭৫টি মৌলিক ও অনুবাদ গ্রন্থের প্রণেতা) বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিলেন তিব্বতে। এখন আমরা সব ভুলে জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিশ্বায়ন করছি, শীতপ্রধান দেশের কম্বল আমাদের গ্রীষ্মে গায়ে জড়িয়ে সূর্যের তাপ নিবারণ করছি! আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের শিক্ষার কথা বলে, প্রযুক্তি-বিজ্ঞান কিংবা প্রয়োজনীয় জ্ঞানার্জন থেকে দূরে সরে এক হাজার বছর পূর্বের অবস্থায় ফিরে যেতে বলছি না। বলছি, আমাদের ষড়ঋতুতে, আমাদের জনসংখ্যায়, আমাদের ভৌগোলিক সীমানায় আমাদের মতো করে বিশ্ব ব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করতে। তৈরি করতে হবে আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের সংস্কৃতি; আরোপিত সংস্কৃতি নয়।

(সূত্রঃ "আমাদের শিক্ষা-জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি চর্চার ঐতিহ্য" http://www.kalerkantho.com/print_news.p … p;index=0)

} সবার উপর মানুষ সত্য {