টপিকঃ পথে হলো দেখা পর্ব-১

মেয়েটাকে আড়চোখে দেখছিলো স্বপ্নীল। আগে বেশ কয়েকবার সরাসরি তাকানো হয়ে গিয়েছে – এখন চোরাচোখে তাকানো ছাড়া উপায় নেই। অবশ্য দেখতেই হবে এমন কোনো জোরালো কারণ নেই – নিজের অবাধ্য মনটাকে প্রবোধ দিতে দিতে এইমাত্র আবার তাকিয়ে ফেললো। এবার কট এণ্ড বোল্ড! মেয়েটাও সরাসরি তাকিয়েছে। তীক্ষ্ণ ফলা ছুরির মত দৃষ্টিটা স্বপ্নীলকে বিঁধে ফেললো।

   তাড়াতাড়ি অন্যদিকে চোখ সরিয়ে নেয় স্বপ্নীল। এত রাতে যাচ্ছে কোথায় মেয়েটা? রাত প্রায় একটা। সাথে একগাদা ব্যাগেজ নিয়ে রীতিমত নাস্তানাবুদ হচ্ছে। স্লিভলেস একটা ফতুয়া আর চাপা একটা জিন্স পড়ে আছে – বেশ দীর্ঘাঙ্গি। ঈষৎ শ্যামলা কাটা কাটা চেহারার এই তরুণীর মুখটা যেন একটা রহস্য গল্পের মত মনে হলো। কেন মনে হলো – এর উত্তর জানা নেই স্বপ্নীলের। সত্যি বলতে সেই অনেকদিন বাদে কোনো তরুণীর মুখে সে এমন হ্যাংলাভাবে চাইল! অজান্তেই সে মিটমিট করে হাসতে থাকে।

   রাগে পিত্তি জ্বলে গেলো অনিমার। বেহায়া মানুষে কিলবিল করছে চারদিক। ধরা খাওয়ার পরও কেমন মিটমিটিয়ে হাসতে পারে মানুষ – নির্লজ্জ কোথাকার! ধুত, এসব কী ভাবছে সে? সামনে মহা বিপদ। রাগের মাথায় বাড়িওয়ালার সাথে বিবাদ করে এক কাপড়ে বেরিয়ে পড়েছে। মস্ত ভুল হয়ে গেছে। এই রাত-বিরেতে এখন যায় কার বাসায়? কোথায় আশ্রয় পাওয়া যায়? ব্যাগ-ব্যাগেজ নিয়ে ট্রেনে চেপে বসার সময় অবশ্য এত কিছু মনে হয় নি। তখন মনে হয়েছিলো যেদিকে দু’চোখ যায়, সেদিকে চলে যাবে তবু ঐ নচ্ছার বাড়িওয়ালার সাথে থাকবে না। অনিমার রাগ একটা বিষম ব্যাপার – যেমন ঝড়বেগে আসে আবার তেমন ফট করে পড়ে যায়! এই এখন যেমন রাগ জল হয়ে গেছে। সেখানে একটা দুর্ভাবনাজনিত ভীতি এসে জেঁকে বসেছে।

   কোথায় যাওয়া যায়? হঠাত কী মনে করে ফোনের বোতাম চাপতে থাকে। ট্রেনটা যেদিকে যাচ্ছে, সেদিকে হয়তো কেউ থেকে থাকতে পারে। উত্তেজনায় বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে যায় অনিমার কপালে, ঠোঁটের তিলে। সেদিকে তাকাতে দ্বিতীয়বারের মত ধরা খেলো স্বপ্নীল। এবার নিজেই নিজেকে গালি দিলো – অভদ্রতার আর বাকী রইল না। তড়িঘড়ি অন্যদিকে সরে যেতে যেতে যে ক’টি কথা টুংটাং জলতরঙ্গের মত হাওয়ায় ভাসতে থাকলো, তাতে সে না হেসে পারলো না – বাংলা কথা বলছে যে!

   ট্রেনটা স্টেশানে এসে থামতেই অনিমা ব্যস্ত হয়ে পড়লো। ছোটখাট সংসার নিয়ে বেড়িয়ে পড়েছে – এখন এটা নামানোও বিশাল ঝামেলার! প্লার্টফরমের লেভেলটা একটু নিচু হওয়াতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে অনিমার। বিশেষ করে বড় স্যুটকেসটা গোঁ ধরে থাকলো – কিছুতেই নামতে চাইছে না! এমনি অবস্থায় কে একজন এসে সবল হাতে নামিয়ে দিলো...ঘুরে দীর্ঘদেহি এক যুবককে দেখে মুখটা থমথমে হয়ে গেলো অনির – সেই বেহায়া লোকটা! নিশ্চয় পিছু নিয়েছে। ‘ডিড আই আস্ক ইয়্যর হেল্প?’

   নোওওপ, ম্যম। কিন্তু বিপদে পড়া একটা মেয়েকে কীভাবে হেল্প না করি? বাংলায় সুইচ করে স্বপ্নীল। অবাক হয়ে গেলেও বুঝতে দেয় অনিমা। 

   বেশ পরোপকারী মানুষ দেখছি আপনি! এখন আমার পিছু ছাড়ুন তো দেখি। চিনেজোঁকে ভরে গেছে... শেষের কথাটা বিড়বিড় করে বলে। স্বপ্নীল কিন্তু ঠিকই শুনতে পায়।

   বাহ, আমি আপনার পিছে লাগলাম কখন? আজকাল মানুষের উপকার –ই করতে নেই। ধন্যবাদ দূরের কথা – উল্টা যা-তা বলে দেবে। অকৃতজ্ঞ!

   কী! আমি অকৃতজ্ঞ? যা-তা বলছি... ট্রেনে ওরকম চোরের মত তাকাচ্ছিলেন কেন?

   শুনুন, অত কথায় কাজ নেই। যা সত্য তাই বলেছি।  আমার একটু তাড়া আছে। খুবই ক্লান্ত; বাসায় ফিরতে হবে। ভালো থাকুন। বাই! বলেই অনিমাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই হনহন করে হেঁটে চলে গেলো।

   বড় অবাক হয়ে গেলো অনিমা! আর কয়েকটা কথা শোনাতে পারলে আরাম লাগতো, কিন্তু সে সুযোগই দিলো না লোকটা। রাগে ফুটতে ফুটতে বোঁচকা টেনে হিঁচড়ে স্টেশানের লিফটটার দিকে এগিয়ে চললো।

   সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়িয়ে অকৃতজ্ঞ সুন্দরীর কাণ্ড দেখছিলো স্বপ্নীল। চলে যেতে পারতো, কিন্তু কোনো এক বিচিত্র কারণে যেতে পারছে না। আচ্ছা, একে কি কোথাও দেখেছিলো আগে?

   এই যে, ওদিকে গিয়ে লাভ নেই। বলেই ইশারা করে লিফটের উপরে ‘আউট অব অর্ডার’ নোটিশটা চোখ নাচিয়ে দেখিয়ে দেয় স্বপ্নীল। মেজাজটা চড়ে যায় অনিমার – লিফটটার আজই খারাপ হতে হবে? তাও দেখিয়ে দেবে ঐ অভব্য লোকটা!
রাগে-দুঃখে চুল ছিড়তে ইচ্ছে করছে। দু’হাতে নিজের চুল খামচে করুণ মুখে দাঁড়িয়ে থাকে অনিমা।

   আমি নিজে হলে কিন্তু এমন সুন্দর কালো রেশমি সূতা ছিড়তাম না! অল ইয়্যু নিড ইস টু সে - আ সিম্পল ওয়ার্ড – স্যরি। স্বপ্নীল হাসতেই হাসতেই বলে।

   আমার বয়েই গেছে বলতে! আমার কোনো সাহায্যের দরকার নেই। আপনি বিদায় হোন তো!

   একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্বপ্নীল। নারীকূল মাঝে মাঝে এমন নিষ্ঠুর হয়, সেটা বলার মত নয়! কিন্তু ভারী ব্যাগেজগুলো ঠিকই তুলে নিলো এবং বলল – চলুন, আপনার কাছে কিছু আশা করাটাই আমার অন্যায় হয়েছে!

   আশ্চর্য, অনিমা কিছু বলে না। ধীরে ধীরে স্বপ্নীলের সাথে সিঁড়ি ভাঙ্গতে থাকে। সে একটু দমে গিয়েছে।


   ভাগ্যক্রমে একি বাসে দুজনকে চেপে বসতে হলো। এই মধ্য রাতেও ঘর-ফেরতা লোকে গিজগিজ করছে পুরো বাস। আলাদা বসতে চাইলেও হয়ে উঠলো না। আপাতত কেউই কথা বলছে না। অস্বস্তিকর পরিবেশ। সেটা ভাঙ্গবার জন্য স্বপ্নীল –ই উদ্যোগী হলো।

   আচ্ছা, যদি কিছু মনে না করেন আপনি যাচ্ছেন কোথায়? আপনি এদিকে সম্ভবত নতুন; আমি হেল্প করলেও করতে পারি।

   কিছু মনে করবেন না; ঠিকানাটা দিতে চাচ্ছি না। আপনার হাবভাব এমনিতেই আমার সুবিধার ঠেকছে না। তার উপর ঠিকানা দিতে যাব কোন দুঃখে? কার মনে কী আছে বলা তো যায় না। অকপট বলে ফেলে অনিমা।

এ কথায় বেশ আহত হয় স্বপ্নীল। অনেকক্ষণ কিছুই বলতে পারলো না।

   ঠিকানা দেবেন না – ঠিক আছে। এভাবে অপমান করার কি খুব জরুরী? আপনি বাইরে যতটা সুন্দর, ভেতরে ঠিক ততটা কুৎসিত। আমাকে ক্ষমা করবেন – ভুলবশতঃ আপনাকে সাহায্য করতে চেয়েছি।

   কথাগুলো খুব গভীরে গিয়ে আঘাত করে অনিকে। মরমে মরে যায়। ছি ছি এতক্ষণ কি দুর্ব্যবহারটাই না করে এসেছে। হয়তো সে আর দশটা সুযোগসন্ধানীদের মত নয়! আড় চোখে তাকিয়ে দেখে – মুখ ছাই করে ঈষৎ ঘুরিয়ে আছে লোকটা। প্রশস্ত মুখে শিশুর অভিমানের মত সারল্য – মাথায় অবিন্যস্ত বিদ্রোহী চুলেরা ডানপিটের মত ঝুলছে। হঠাত ফিক করে সশব্দে হেসে ফেলে অনিমা। বড় অবাক হয়ে যায় স্বপ্নীল।

হাসছেন কেন? কী হলো আবার?
আপনি না একেবারে বাবুদের মত গাল ফুলিয়ে বসে ছিলেন – হি হি হি। যা কিউট লাগছিলো না!
কী!!

নাহ, আপনাকে আর রাগাবো না। স্যরি, আমি রেগে গেলে না উল্টোপাল্টা বলি – প্লীজ কিছু মনে করবেন না। আমি অনিমা রায়হান। বলেই হাতখানা বাড়িয়ে দেয়। অনিমার পেলব হাতটা স্বপ্নীলের উষ্ণ হাতে মৃদু কাঁপতে থাকে। গাঢ় চোখে তাকায় স্বপ্নীল। যেন কতদিনের চেনা! অনিমার উজ্জ্বল চোখে অদেখা, অশ্রুত কোনো গভীর ভালোলাগার অভূতপূর্ব দ্যোতনা! সহসা চোখ নামিয়ে নেয় – কোত্থেকে একরাশ লজ্জা এসে ভীড় করে চোখের পাতায়। সেই অবনত চোখজোড়া যেন জগতের শ্রেষ্ঠ মাদক হয়ে স্থান-কাল-পাত্র ভুলিয়ে বুঁদ করে রাখে স্বপ্নীলকে।

হাতখানা যে বেকুবের মত তখনো ধরে রেখেছে – খেয়াল হতেই তাড়াতাড়ি ছেড়ে দেয়।
আ...আ...আমি স্বপ্লীল হায়দার। নাইস টু মীট ইয়্যু!

স্বপ্নীলের এই ভ্যাবাচ্যাকা অবস্থায় মজা পেয়ে যায় অনি। মুখ টিপে দুলে দুলে হাসতে থাকে। মনে মনে বলে – ধরা পড়ে গেছো বাছাধন, যাবে কোথায়? হি হি হি।

চলবে..।

কিছু বাধা অ-পেরোনোই থাক
তৃষ্ণা হয়ে থাক কান্না-গভীর ঘুমে মাখা।

উদাসীন'এর ওয়েবসাইট

লেখাটি CC by-nc 3.0 এর অধীনে প্রকাশিত

Re: পথে হলো দেখা পর্ব-১

উদাসীন ভাইয়ের আরেকটা অপূর্ব লেখা পেতে চলেছি  yahoo yahoo yahoo yahoo

roll

Re: পথে হলো দেখা পর্ব-১

কঠঠিন সুন্দর হচ্ছে। চলতে থাকুক thumbs_up

রাবনে বানাদি ভুড়ি :-(

Re: পথে হলো দেখা পর্ব-১

চমত্কার হচ্ছে ।চালিয়ে যান ।

স্বাধীন কন্ঠ
সংবাদ প্রকাশের স্বাধীনতা...

Re: পথে হলো দেখা পর্ব-১

clap clap clap

সব কিছু ত্যাগ করে একদিকে অগ্রসর হচ্ছি

লেখাটি CC by-nd 3.0 এর অধীনে প্রকাশিত

সর্বশেষ সম্পাদনা করেছেন অরুণ (২২-০৮-২০১২ ০১:৩০)

Re: পথে হলো দেখা পর্ব-১

আবারও একটা অসাধারণ ভালোবাসর গল্পের অপেক্ষায় রইলাম।
আচ্ছা গল্পের চরিত্রদ্বয় কি লন্ডনে থাকে  tongue
উদাসীন, বই আকারে পাবলিশ করে ফেলবেন আপনার সমস্ত গল্প ও কবিতাগুলি কোন একদিন।  smile

গল্প-কবিতা - উদাসীন - http://udashingolpokobita.wordpress.com/
ছড়া - ছড়াবাজ - http://chhorabaz.wordpress.com/

Re: পথে হলো দেখা পর্ব-১

দারুণ লাগল। thumbs_up আশা করছি দ্রুতই শেষ হবে। মানে পরের পর্ব গুলি পাব আর কি। big_smile


মেয়েটাও দেখি ছেলেটার মতই রোমান্টিক। hehe

ইয়ে, গল্পটা তো বর্তমান কালের বেশ বুঝতে পারছি। তা তারিখটা কত? hehe hehe

Arun লিখেছেন:

আচ্ছা গল্পের চরিত্রদ্বয় কি লন্ডনে থাকে 

তা আর বলতে। dream

"সংকোচেরও বিহ্বলতা নিজেরই অপমান। সংকটেরও কল্পনাতে হয়ও না ম্রিয়মাণ।
মুক্ত কর ভয়। আপন মাঝে শক্তি ধর, নিজেরে কর জয়॥"

Re: পথে হলো দেখা পর্ব-১

নতুন পণ্ডিত লিখেছেন:

উদাসীন ভাইয়ের আরেকটা অপূর্ব লেখা পেতে চলেছি  yahoo yahoo yahoo yahoo

ধন্যবাদ তোমাকে।

তার-ছেড়া-কাউয়া লিখেছেন:

কঠঠিন সুন্দর হচ্ছে। চলতে থাকুক thumbs_up

এই তো ঝোঁকের মাথায় লিখে ফেললাম। ভেবেছিলাম বেশ কয়েক মাস গল্প লেখা বন্ধ রাখবো...কিন্তু হলো না hairpull

Arun লিখেছেন:

আবারও একটা অসাধারণ ভালোবাসর গল্পের অপেক্ষায় রইলাম।
আচ্ছা গল্পের চরিত্রদ্বয় কি লন্ডনে থাকে  tongue
উদাসীন, বই আকারে পাবলিশ করে ফেলবেন আপনার সমস্ত গল্প ও কবিতাগুলি কোন একদিন।  smile

ধন্যবাদ দাদা। ইয়ে চরিত্ররা হ্যাঁ লান্ডন কিংবা ইংলন্ডের কোনো একটা শহরেও হতে পারে। বই ছাপানো? ওরে বাবা!

আরণ্যক লিখেছেন:

দারুণ লাগল। thumbs_up আশা করছি দ্রুতই শেষ হবে। মানে পরের পর্ব গুলি পাব আর কি। big_smile
মেয়েটাও দেখি ছেলেটার মতই রোমান্টিক। hehe
ইয়ে, গল্পটা তো বর্তমান কালের বেশ বুঝতে পারছি। তা তারিখটা কত? hehe hehe

হ্যাঁ, পরের পর্বেই শেষ করে দেব। গল্পের তারিখটা ধরে নিন জুলাই -এর কোনো এক সামার -এর রাত....হা হা হা

কিছু বাধা অ-পেরোনোই থাক
তৃষ্ণা হয়ে থাক কান্না-গভীর ঘুমে মাখা।

উদাসীন'এর ওয়েবসাইট

লেখাটি CC by-nc 3.0 এর অধীনে প্রকাশিত

Re: পথে হলো দেখা পর্ব-১

দারুন পর্ব শুরু হলো। যাই ২য় পর্ব পড়ে আসি।