টপিকঃ সেইসব দিনগুলি ...

সিংগাড়া বিক্রয় করতে আসা ছেলেটাকে আর একটুর জন্য ধমক দিলাম না। বেচারা নোংরা হাতেই সিংগাড়া বিক্রয় করছে। তাকে ধমক দেওয়ার সময় আমার আগের কথা মনে পড়ে গেল। আমি একটু আনমনা হয়ে গেলাম। চোখের কোণা দিয়ে আমার অজান্তেই একফোটা পানি বেরিয়ে গেল। তাকে আমি প্রশ্ন করলাম পড়াশোনা করিস কিনা? বলল না। আমি তাকে বোঝালাম আর বললাম পড়াশোনা করতে।

আমাদের বাড়িতে একটা লেবুর গাছ ছিলো অনেক লেবু ধরতো। লেবুগুলো লম্বা লম্বা না হয়ে গোল গোল হতো। পরিপক্ক অবস্থায় দেখতে হলুদ রং এর হয়ে যেত এবং খাওয়ার সময় একেবারে টক না হয়ে খানিকটা মিস্টি হয়ে যেত। সেগুলো আর ভাতের সাথে খেতে ভাল লাগতো না। একদিন দুপুরে আমাকে আম্মু বললেন কয়েকটা লেবু বিক্রয় করে কিছু তরকারি কিনে আনার জন্য। হয়ত চাউল কেনার টাকা হয়েছিল কিন্তু তরকারি কেনার টাকা হয়েছিল না।

আমি কয়েকটা ভাল ভাল লেবু ছিড়ে নিয়ে একটি প্লাস্টিকের ছোট ঝাকাতে নিয়ে বাজারে গেলাম। লেবুগুলো দেখতে সুন্দর ছিল। কিন্তু আমার আবার বলল অভ্যেস নেই যেমন এই লেবু….. লেবু নিবেন …. এমন। বাজারে গিয়ে আমাকে একজন ডাকল—এই ছোকড়া… এদিকে আয়। আমি গেলাম। তারা আমার লেবুগুলো দেখল। একজন বলল খেয়ে দেখে দাম দিবে। আমি রাজী হলাম। খেয়ে তারা বলল এটা তো কমলা লেবু না। তাই দাম দিতে চাইল না। কিছু বদ মানুষের মধ্যে কিছু ভাল লোক থাকে। তাই একজন লোক বলল আপনারা ছেলেটার লেবু খেলেন তাই তাকে দাম দিন। তাই আমি দাম পেলাম। 10 টাকার মত লেবু বিক্রয় করলাম আমি। আর সেই টাকা দিয়ে ব্যাগ ভরে বাজার করে আনলাম। (2000 সালে)

আমার আম্মু বাড়িতে সবসময় তার ব্লাউজ উল্টো করে পরতেন। আমি প্রশ্ন করতাম তুমি উল্টো করে পরেছ কেন? আম্মু বললেন উল্টো করে পরলে বেশী দিন টেকে। কিন্তু আমি তখন বুঝতাম না, বেশী দিন টিকলে লাভ কি? বরং কম দিন টিকলেই তো আব্বু আবার কিনে দিবে। নতুন জিনিস পাবে। আমার আম্মু ছেড়া শাড়ি পরতেন, শুধু আমাকে নতুন নতুন জামা-কাপড় কিনে দেবার জন্য। মাগো, তখন তোমার কষ্ট বুঝতে পারিনি, এখন তোমাকে আর ব্লাউজ উল্টো করে পরতে হয় না, আমি তোমাকে কিনে দিব। তুমি যেমন আমার জন্য কষ্ট করেছ, তেমন কষ্ট করতে না পারলেও অন্তত আমার জন্য তোমাকে কোন কষ্ট পেতে দিব না।

অষ্টম শ্রেণীতে উঠলাম। সবাই নতুন নতুন বই কিনছে। কিন্তু আমার নতুন বই কেনার সংগতি ছিল না। আমি পুরাতন লাইব্রেরী থেকে বই কিনেছিলাম। বই কেনার দিন আমার বাড়িতে দুপুরে রান্না হয়েছিল না। কিন্তু আমি টের পাইনি। শুধু আমার জন্য ভাত রাখা ছিল। আমি বুঝতেও পারিনি একবেলা না খেয়ে আমার জন্য বই কেনার টাকা জোগাড় করা হয়েছিল। কিন্তু সব বই কিনে ইংরেজি দ্বিতীয় পত্র বই আর কেনা হয়েছিল না। কারন সেবার স্যাররা অন্য আরেকটি বই কিনতে বলেছিলেন যা বাজারে একেবারেই নতুন। পুরাতন পাওয়া যাচ্ছিলো না। আমার সেই বই আমি আর কিনতেই পারিনি। সপ্তাহে যেই দুই দিন গ্রামার ক্লাস ছিল আমি সেই দুই দিন আমি স্কুলে যেতাম না। অনেক পরে ক্লাস টেনে এসে আমি গ্রামার বই কিনি।

মাগো, তোমার সেই গ্রামার বই কিনতে পারা ছেলেটা আজ তার ক্লায়েন্টের সাথে অনর্গল ইংরেজিতে কথা বলে। ইংরেজি তার কাছে এখন আর কিছুই না। সব সে এখন ইংরেজিতে করে।

আমার দেশের বাড়ি হল রাজশাহী। কিন্তু আমরা থাকি নানীর বাড়ির এলাকাতে। বাবা নানীর বাড়ির পাশেই একটুকরো জমি কিনেছিলেন। সেখানেই থাকি। ছোট ছিলাম যখন তখন কেউ আমাকে খেলতে নিত না। বলত আমি নাকি বিদেশি, বাইরের লোক। সবাই সবার সাথে খেলত আর আমার জায়গা হতো না। তার পরে আমি ছিলাম গরীব, খেলার চাদা দিতে পারতাম না। আমার আব্বু বলতেন কেউ খেলা না নিলে কি হবে? আমি তোমার সাথে খেলব, তাই বলে তিনি আমার সাথে ফুটবল খেলতেন, ক্রিকেট খেলতেন।

বাবা, তোমার সেই ছেলেটার সাথে আজ অনেকেই খেলতে চায়, তার সাথে আজ অনেকেই হাত মিলিয়ে বলে, আমার আশা পূর্ণ হলো। তার সাথে অনেক দুর থেকে লোকজন দেখা করতে আসে।

পুনশ্চ: লেখাটা লিখতে গিয়ে চোখের পানি আটকাতে পারিনি আমি। লেখাটার একমাত্র উদ্দেশ্য হল, “আমি অভাবে আছি তাই কিছু করতে পারছি না” এমন মনে করা লোকেদের জন্য। লেখাটি আমার অনুমতি ছাড়াই যে কোন স্থানে শেয়ার করতে পারেন।

....

Re: সেইসব দিনগুলি ...

কষ্ট কাকে বলে তুমি ভাল করেই অনুভব করেছো, আশাকরি আজকের মত আগামি দিনগুলোতেও এ কষ্টের কথা মনে রাখবে।  তুমি আরো এগিয়ে যাও এ কামনাই করি।

Re: সেইসব দিনগুলি ...

ইলিয়াস লিখেছেন:

কষ্ট কাকে বলে তুমি ভাল করেই অনুভব করেছো, আশাকরি আজকের মত আগামি দিনগুলোতেও এ কষ্টের কথা মনে রাখবে।  তুমি আরো এগিয়ে যাও এ কামনাই করি।

অবশ্যই মনে রাখব। চেষ্টা করে যাচ্ছি আমার সামনের ছেলেগুলোকে যেন কষ্টের মধ্যে পড়তে না হয়। আপনি জানেন। প্রশিক্ষণ দিচ্ছি যাতে তারা দক্ষ হয়ে উঠতে পারে। আমি কষ্ট পেয়েছি বলেই তো...

....

Re: সেইসব দিনগুলি ...

কিছু কিছু ক্ষেত্রে তুলনা করা হয়ত ঠিক না। কারণ নিজের যার সাথে তুলনা করা হচ্ছে তার থেকে নিজের স্থান নিচে হলে হতাশা এসে পড়ে। রাসেল ভাইয়ের কথা আমার যখনই মনে হয় তখনই কেমন যেন মনে হয় neutral কারণটা অবশ্য তেমন কিছুই না। উনি আর আমি একসাথেই ওয়েব ডেভলপমেন্ট শুরু করেছিলাম। উনি ঠিকই তার লক্ষ্যে ছিলেন এবং অনের কষ্ট করেও ঠিকঠাক পথে এগিয়েছেন যার কারণে আজ সাফল্য হাতে ধরা দিয়েছে। আর আমি কিছুদিন পরই লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হওয়ার কারণে এখন কোন অবস্থানে আছি সেটা নিজেই ভালো করে জানি roll এত খারাপ যে বলার মত অবস্থা না cry

Re: সেইসব দিনগুলি ...

কেন জানি চোখ দিয়ে পানি বেরিয়ে গেল।

Re: সেইসব দিনগুলি ...

রাসেল, সিম্পলি এ্যামেইজিং! একটি স্ট্যাবল ক্যারিয়ার হাতড়ে বেড়ানো তরুণদের জন্য আপনি নিঃসন্দেহে একটি "লাইট-হাউজ"।

Re: সেইসব দিনগুলি ...

কিছু বলার ভাষা নাই, বড় হোন আরও বড় হোন সেই দোয়াই করি, আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করুন যিনি আপনাকে এরকম সফল বানিয়েছেন  smile

Re: সেইসব দিনগুলি ...

রাসেল, আপনি কখনও আমাকে একটা লাল দাগ দিয়েছিলেন বলে খুব কষ্ট পেয়েছিলাম এবং রাগও করেছিলাম আপনার উপর, কিন্তু আজ আপনার এই লেখাটা পড়ে আপনার সম্বন্ধে সম্পূর্ণ একটা ভিন্ন ধারণা হল, বলা ভাল আগের ধারণাটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল৷
আপনার মত মানুষ যাঁরা এত প্রতিকূলতার মধ্যেও বড় হয়ে সাফল্য অর্জন করতে পেরেছেন তারা আমার কাছে অনন্য সম্মানীয়৷
ভালো থাকবেন, আরো আরো উন্নতির শিখরে পৌঁছন আপনি, এই শুভেচ্ছা রইল৷

গল্প-কবিতা - উদাসীন - http://udashingolpokobita.wordpress.com/
ছড়া - ছড়াবাজ - http://chhorabaz.wordpress.com/

Re: সেইসব দিনগুলি ...

রাসেল, তোমার প্রিয় রাফিন রাঈদাকে দৈনিক ২৫ টাকা হাজিরার রাসেল..... লেখাটি দেখিয়েছিলাম। তারা অবাক বিস্ময়ে পড়ছিলো......এও সম্ভব...... তাদের খুউব কাছের আংকেলটা কেমন কষ্ট করে বড় হয়েছে ! তুমি সব সময়ই তাদের কাছে প্রেরণার উৎস ।

তোমার ধরিয়ে দেয়া লাইনে আমি নানান ব্যস্ততা এবং কিছুটা অ-সামর্থের জন্য চলতে পারিনি, আর এজন্য তোমার ভাবীর কাছে কম কথাও শুনতে হয়নি ! দেখি ...শুরু করতে হবে খুব শীঘ্রি !!

আরো অনেক বেশি সাফল্য তোমার কাছে ধরা দিক, শুধু একটা অনুরোধঃ তোমার এই চেষ্টা ও সাফল্যের শুকরিয়া আদায় করতে ভুলোনা । আল্লাহ পাক সর্বদা তোমার ভাল করুন, আমীন ।

একজন মানুষের জীবন হচ্ছে - ক্ষুদ্র আনন্দের সঞ্চয়। একেকজন মানুষের আনন্দ একেক রকম ...
এসো দেই জমিয়ে আড্ডা মিলি প্রাণের টানে !
   
স্বেচ্ছাসেবকঃ  ফাউন্ডেশন ফর ওপেন সোর্স সলিউশনস বাংলাদেশ, নীতি নির্ধারকঃ মুক্ত প্রযুক্তি।

১০

Re: সেইসব দিনগুলি ...

আশিফ শাহো লিখেছেন:

আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করুন যিনি আপনাকে এরকম সফল বানিয়েছেন

অবশ্যই! সবসময় করি।

Arun লিখেছেন:

রাসেল, আপনি কখনও আমাকে একটা লাল দাগ দিয়েছিলেন বলে খুব কষ্ট পেয়েছিলাম এবং রাগও করেছিলাম আপনার উপর, কিন্তু আজ আপনার এই লেখাটা পড়ে আপনার সম্বন্ধে সম্পূর্ণ একটা ভিন্ন ধারণা হল, বলা ভাল আগের ধারণাটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল৷
আপনার মত মানুষ যাঁরা এত প্রতিকূলতার মধ্যেও বড় হয়ে সাফল্য অর্জন করতে পেরেছেন তারা আমার কাছে অনন্য সম্মানীয়৷
ভালো থাকবেন, আরো আরো উন্নতির শিখরে পৌঁছন আপনি, এই শুভেচ্ছা রইল৷

আসলে আমার বয়সটা একটু কম। মাঝে মাঝে এমনসব করে ফেলি যার জন্য পরে খারাপ লাগে। স্যরি ভাই।

মাসুদ৩০১১ লিখেছেন:

রাসেল, তোমার প্রিয় রাফিন রাঈদাকে দৈনিক ২৫ টাকা হাজিরার রাসেল..... লেখাটি দেখিয়েছিলাম। তারা অবাক বিস্ময়ে পড়ছিলো......এও সম্ভব...... তাদের খুউব কাছের আংকেলটা কেমন কষ্ট করে বড় হয়েছে ! তুমি সব সময়ই তাদের কাছে প্রেরণার উৎস ।

তোমার ধরিয়ে দেয়া লাইনে আমি নানান ব্যস্ততা এবং কিছুটা অ-সামর্থের জন্য চলতে পারিনি, আর এজন্য তোমার ভাবীর কাছে কম কথাও শুনতে হয়নি ! দেখি ...শুরু করতে হবে খুব শীঘ্রি !!

আরো অনেক বেশি সাফল্য তোমার কাছে ধরা দিক, শুধু একটা অনুরোধঃ তোমার এই চেষ্টা ও সাফল্যের শুকরিয়া আদায় করতে ভুলোনা । আল্লাহ পাক সর্বদা তোমার ভাল করুন, আমীন ।

আম্মুটার আর আংকেলটার কথা মনে করিয়ে দিলেন?  sad ইশ! পরীক্ষার আগে যেতে পারব না। কতদিন ওদের দেখি না।  cry সবসময় শুকরিয়া আদায় করি আল্লাহর কাছে। আমার জন্য দোয়া করবেন।

....

১১

Re: সেইসব দিনগুলি ...

আমার অনুমতি ছাড়াই যে কোন স্থানে শেয়ার করতে পারেন।

আপনার এই উক্তি বহু বছর ধরে দেখে আসলেও এ উক্তিটা আমি আজও দিতে পারিনা।  neutral neutral
সত্যিই আপনিই অনুসরনীয়

roll

১২

Re: সেইসব দিনগুলি ...

রাসেল ভাইয়ের জীবন কাহিনী শুনলে - নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়, সত্যিই অনুসরণ করবার মত একটা মানুষ। আপনি অনেক বড় হন, রাসেল ভাই।

অসীম শুন্যতার মাঝে চেয়ে দেখি , //"আমি"  ছাড়া কেউ নেই// !!!
--- অলসতায় আমার জুড়ি নেই --

১৩

Re: সেইসব দিনগুলি ...

আমাদের কে নিজের মনে করে শেয়ার করার জন্য ধন্যবাদ।

লেখাটি LGPL এর অধীনে প্রকাশিত