টপিকঃ ছাতার কবলে পর্ব -১

বাসের শেষ সারিতে ধ্পাস করে বসে পড়লো নয়ন। একেবারে বিধ্বস্ত অবস্থা। যে দৌঁড়টা দিয়েছিলো না! আর একটু হলে জনতার হাতে আলু ভর্তা হয়ে যেত। বাজারে একটা মুদির দোকানে দুইটা ডিম সটকাতে গিয়েই যত কাণ্ড হয়ে গেলো! আহ, মাত্র তো দুইটা ডিম – এমন না যে রহিম মিয়ার সুন্দরী মেয়েটা কে সে হাতিয়ে নিয়েছে! তাও যদি নিজের জন্য নিত – বাসায় ছোট বোনটাকে কথা দিয়েছে – ডিম এর ডালনা আজ যেভাবেই হোক ওকে খাওয়াবে। কিন্তু পকেট তো গড়ের মাঠ! অগত্যা এক জোড়া ডিম কৌশলে হাপিস করতে গিয়েই রহিম মিয়ার কর্মচারী, কালুর এমন হাত মুচড়ানিটা খেলো – সে আর বলার মত নয়! এটুকু হলেও বলার কিছু ছিলো না – কর্ম ফল। কিন্তু কালুটা আজকে বেশি বাড়াবাড়ি করে ফেললো। পথচারীদের ডাকার কী দরকারটা ছিলো? যেন রাঘব বোয়ালের চুরি ধরেছে!

   আমজনতার মেজাজ এই আকালের দিনে এমনিতেই তেঁতে থাকে। ভিতরে বাহিরে হরেক সমস্যার যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে একেকজন ছাইচাঁপা আগুন হয়ে ঘুরে বেড়ায়। নয়নের ধরা পড়ার মত ঘটনা সামনে এসে গেলে বেশ যুত হয় – আগুন নেভানো জরুরি কিনা! অতএব, কয়েকজন বীর জুটে গেলো ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায়। এদের মুখের পিছনে পৈশাচিক আনন্দের হাসি দেখে ভয়ে আত্মারাম খাঁচা ছাড়া হওয়ার উপক্রম হলো নয়নের। তৎক্ষণাৎ হাতটা কালুর খপ্পর থেকে ছাড়িয়ে নিয়েই চোঁচা দৌঁড়। এই অঞ্চলে দৌঁড়ে রৌপ্যধারী নয়নকে ধরার মত লোক বিরল। অতএব, নয়ন ফস্কে গেলো – আহা, বেচারীদের আগুন নেভানো হলো না!

   পকেট থেকে রুমালটা বের করে ঘাম মুছলো নয়ন। বুকটা ভারী হয়ে আছে। একধরণের অনুশোচনা কি? শেষ পর্যন্ত চুরি করতে গেলো? কী করবে? বেকার মানুষ; কত কাজ খুঁজেছে – না পেলে কী আর করার আছে? অনেক কষ্টে বি এ পাস করতেই বাবা ধুরন্ধরের মত পরপারে কেটে পড়লেন! মা আর ছোট দুই বোনের ভার এসে পড়ল নয়নের কাঁধে। চোখে আঁধার দেখতে আর বাকী থাকলো না। কিন্তু তাই বলে চুরি? অভাবে যে স্বভাব নষ্ট হয় – এটা আজকে হাতেনাতে প্রমাণ পাচ্ছে।

   ক্ষুধা বড় চরিত্র বিনষ্টকারী। দিনের পর দিন আধপেটা থাকতে গিয়ে নৈতিকতাগুলো এমনিতেই ধীরে ধীরে ঔজ্জ্বল্য হারাচ্ছিলো। ন্যায়-অন্যায়ের ভেদটা কমতে কমতে প্রায় শূন্যে গিয়ে ঠেকল যখন ছোটবোনটার ডিমের ডালনার মত তুচ্ছ একটা আবদার মেটানোর মত মহা সমস্যা(!) এসে হাজির হলো। তাই রহিম মিয়ার দোকানে গিয়েই হাত-সাফাই –এর আইডিয়াটা একেবারে কেলিয়ে উঠলো!

   চিন্তার জাল ছিঁড়ে গেলো বৃষ্টির ফোঁটা বাসের জানালায় সজোরে আছড়ে পড়ার শব্দে। ভারী বর্ষন হচ্ছে। একটা ছাতা না হলে আজকে নির্ঘাত ভিজে কাক হয়ে বাড়ী ফিরতে হবে। এই ভাবনাটায় হঠাত হাসি পেয়ে গেলো নয়নের – পেটে ভাতই জোটে না, তো ছাতার থাকা না-থাকা! ফুঃ! ঠিক তখনি দেখলো – একটা বেশ বাহারি ছাতা তার থেকে তিনটা আসন তফাতে শুয়ে আছে।

   বেশ সুন্দর ছাতা। বেশি লম্বা নয়; আবার খুব বেঁটেও নয়। ক্রীম কালারের বাঁটটায় চমৎকার কারুকার্য। স্টীলের কাঠামোটা বেশ মজবুত মনে হচ্ছে। ছাতার কাপড়ে কিছু জাপানি পুতুলের ছাপ দেয়া। দেখেই বলে দেয়া যায় জিনিসটা বেশ দামী এবং সম্ভবত মেয়েদের। লিপুকে ডিম খাওয়াতে না পারুক, অন্তত ছাতাটা তো দিতে পারবে। সুন্দর জিনিস; খুশী না হয়ে যাবে কোথায়? এই ভেবে নয়ন চারপাশটা একবার তাকিয়ে নিলো।

   বাদলার এই ভর দুপুরে খুব বেশি লোক নেই বাসে। সে ছাতাটা নেবে কি নেবে না, বিষম চিন্তায় পড়ে গেলো। ডিম চুরির ঘটনা এক ঘন্টাও হলো না, তাতেই আবার এ কী ফ্যাসাদ! কিন্তু ছাতাটা ভয়ানক সুন্দর! এটাকে হাতছাড়া হতে দেয়াটা বিরাট বোকামি হবে। সে না হোক, অন্য কেউ না কেউ এটাকে হাতিয়ে নেবেই এবং খুব শীঘ্রই! সুযোগ-সন্ধানীরা কেমন কিলবিল করছে চতুর্দিকে – এটা বোঝা তো ছেলেখেলা! আবার বুকটা ভারী হয়ে গেলো। এ কীসব ভাবছে ও? একেবারে ছিঁচকেদের মত ভাবনা? কোথায় গেলো তার কষ্টার্জিত শিক্ষা-দীক্ষা? নীতিবোধ?

   এমন ভাবনায় ঝাড়া মিনিট দশেক কেটে গেলো। তখন হঠাত করে কন্ডাক্টার আবির্ভূত হলো।মূর্তিমান যমদূত! ভাড়া যে দেয় নাই – এই মাত্র খেয়াল হলো। দেবে কোথা থেকে? থাকলে তো দেবে। পকেট কোণা চষে বেড়িয়ে সে পাঁচটি টাকার বেশি খুঁজে পেলো না! ধুন্ধুমার কথা কাটাকাটি লেগে গেলো। অনেক মান-অপমানকর কথার পর অবশেষে নয়নকে পথের মাঝে নামিয়ে দেয়া হলো। তবে যাবার সময় কী মনে করে ছাতাটা অভ্যস্ত ভঙ্গীতে তুলে নিলো। কন্ডাক্টর লোকটি কুতকুতে চোখে তাকিয়ে ছিলো যেন এই ঝামেলার কারণে ছাতাটার উপর তার হক জন্মেছে! কিন্তু নয়ন ছাতাটা হাতছাড়া করার পক্ষপাতি নয়। শক্ত মুঠোয় রেখে সে নেমে গেলো।

   বাসটা হুস করে চলে গেলে সে চমকে গেলো। এ কোথায় তাকে নামিয়ে দিয়ে চলে গেলো! পড়ন্ত দুপুরে বাসে চড়েছিলো। বাদলার কারণে না হয় কিছুটা অন্ধকার হবে, তাই বলে রাত হতে যাবে কেন? নাকি ভুল দেখছে - ঠাহর করতে পারলো না! সে দাঁড়িয়ে আছে একটা আম গাছের নীচে। পথের পাশে একটা কাঁচা পথ দূরে গিয়ে অন্ধকারে মিশেছে। বৃষ্টি বেশ তোড়েই পড়ছে। গাছের ঘন ছাদ ভেদ করেই সে ভিজে যাচ্ছে। হঠাত মনে হওয়াতে ছাতাটা মেলে দিলো। মেয়েদেরই ছাতা। একটা অদ্ভুত মদির গন্ধ আশে পাশের সোঁদা গন্ধ হঠিয়ে জায়গা করে নিলো। ঠিক তখনি ঐ কাঁচা পথটা পাড়ি দেবার একটা উদ্গ্র বাসনা জাগ্রত হলো নয়নের। মনের কোণে কে যেন এই অদ্ভুত ঘটনাপ্রবাহের কোনো মানে খুঁজে পেলো না! কিন্তু সে ভাববার কোনো ফুরসৎ নেই! ভেতরে একটা তাড়া – কোথায় যেন পৌঁছতে হবে এবং খুব জরুরী।


চলবে..

কিছু বাধা অ-পেরোনোই থাক
তৃষ্ণা হয়ে থাক কান্না-গভীর ঘুমে মাখা।

উদাসীন'এর ওয়েবসাইট

লেখাটি CC by-nc 3.0 এর অধীনে প্রকাশিত

Re: ছাতার কবলে পর্ব -১

পরবর্তী পর্বের আশায়....... smile

গল্প-কবিতা - উদাসীন - http://udashingolpokobita.wordpress.com/
ছড়া - ছড়াবাজ - http://chhorabaz.wordpress.com/

Re: ছাতার কবলে পর্ব -১

thumbs_up thumbs_up
দ্বিতীয় পর্ব টা তারাতারি শেয়ার কইরেন। জটিল  mail  লিখছেন।

বাংলা সাহিত্য ভাণ্ডার
FREE Bangla pdf Boi

Re: ছাতার কবলে পর্ব -১

শুধুই অপেক্ষা......... thinking sleeping

Seen it all, done it all, can't remember most of it.

লেখাটি CC by-nc-sa 3.0 এর অধীনে প্রকাশিত

Re: ছাতার কবলে পর্ব -১

পড়লুম। এবার দ্বিতীয় পর্ব পড়বো।

রাবনে বানাদি ভুড়ি :-(

Re: ছাতার কবলে পর্ব -১

অদ্ভুদ সুন্দর হয়েছে।  love

roll

Re: ছাতার কবলে পর্ব -১

পড়তে অনেক দেরী করে ফেললাম বস। যাহোক ২য় পর্বটা পড়ে আসি।  big_smile