টপিকঃ সীরাতুন্নবী (সাঃ) ৫০,কঠোর ধের্য্য

আগের টপিকঃ সীরাতুন্নবী (সাঃ) ৪৯, দায়িত্ব সচেতনতা

এসব কথা ছাড়াও মুসলমানরা অত্যাচারিত হওয়ার কেবল শুরু থেকেই নয়, বরং তার আগে থেকেই এটা জানতো যে, ইসলাম গ্রহণের অর্থ এই নয় যে, চিরস্থায়ী দুঃখ কষ্ট সহ্য করতে হবে। বরং ইসলামি দাওয়াতের মুল কথাই ছিল জাহেলী যুগের অবসান, সকল প্রকার অত্যাচার নিপীড়নমূলক ব্যবস্থার মুল উৎপাটন। ইসলামী দাওয়াতের একটা লক্ষ্য এটাও ছিল যে, মুসলমানরা পৃথীবিতে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করবে এবং রাজনৈতিকভাবে এমন বিজয় অর্জণ করবে, যাতে সকল মানুষকে আল্লাহর ইচ্ছা ও সন্তুষ্টির পথে পরিচালিত করা যায়। মানুষকে মানুষের দাসত্ব থেকে মুক্ত করে আল্লাহর দাসত্বে প্রবেশ করানো যায়।

কোরআনুল করিমের এসব সু-সংবাদ কখনো ঈশারা এবং কখনো খোলাখুলি ভাবে নাযিল হচ্ছিল। একদিকে এমন অবস্থা ছিল যে, প্রশস্ত হওয়া সত্ত্বেও পৃথীবি মুসলমানদের জন্য সংকির্ণ হয়ে যাচ্ছিলো, তাদের টিকে থাকাই ছিলো কঠিন। তাদেরকে উচ্ছেদ করতে একদল লোক ছিল সদা সক্রিয়। অন্যদিকে মুসলমানদের শক্তি সাহস ও মনোবল বাড়াতে এমন সব আয়াত নাযিল হচ্ছিলো যাতে পুর্বকালের ঘটনাবলী বর্ণনা করা হয়েছে,। পুর্ববর্তী সময়ের নবীদের অভিশ্বাস করা হয়েছে এবং তাদের উপরও অত্যাচার নিপীড়ন চালানো হয়েছে। সেসব আয়াতে যে চিত্র অন্কন করা হচ্ছিল তার সঙ্গে মক্কার মুসলমান ও কাফেরদের অবস্থা হুবহু সাদৃশ্য ছিল। পরিশেষে একথা উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইতিপুর্বে অবিশ্বাসীরা কিভাবে ধ্বংস এবং আল্লাহর পুন্যশীল বান্দাদের তাঁর জমীনের উত্তারাধিকারী করা হয়েছে। পরিণামে মক্কার অবিশ্বাসীরাই ব্যর্থ ও পরাজিত ও মুসলমান এবং ইসলামের দাওয়াতের সাফল্যই অর্জিত হবে। সেই সময় এমন সব আয়াতও হয়েছে, যেসব আয়াতে ঈমানদারদের বিজয়ের সু-সংবাদ সুপষ্ট ভাষায় উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন-আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন, আমার প্রেরিত বান্দাদের সম্পর্কে আমার এ বাক্য পূর্বেই স্থির হয়েছে যে, অবশ্যই তারা সাহায্য প্রাপ্ত হবে এবং আমার বাহিনীই হবে বিজয়ী। অতএব কিছুকালের জন্যে তুমি ওদেরকে উপেক্ষা কর। তুমি ওদের পর্যবেক্ষণ কর, শীঘ্রই ওরা প্রত্যক্ষ করবে।
ওরা কি আমার শাস্তি ত্বরাণ্বিত করতে চায়? তাদের আঙ্গিনায় যখন শাস্তি নেমে আসবে তখন সতর্কীকৃতদের প্রতিফল ভয়াবহ ও জঘন্য হবে।
আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন, এই দলতো শীঘ্রই পরাজিত হবে এবং পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে।
বহু দলের এই বাহিনীও সে ক্ষেত্রে অবশ্যই পরাজিত হবে।

হাবশায় হিজরতকারীদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, “যারা অত্যাচারিত হওয়ার পরও আল্লাহর পথে হিজরত করেছে, আমি অবশ্যই দুনিয়ায় তাদের আবাস দেবো এবং আখেরাতের পুরস্কার তো শ্রেষ্ঠ। হায় ওরা যদি সেটা জানতো।“ (৪২,১৬)
অবিশ্বাসীরা আল্লাহর রসুলকে হযরত ইউসুফ (আঃ) এর ঘটনা জিজ্ঞাসা করার পর আল্লাহ তাআলা বলেন, “জিজ্ঞাসুদের জন্য নির্দশন রয়েছে” (৭,১২)    অর্থ্যাৎ মক্কাবাসীরা আজ হযরত ইউসুফ (আঃ) এর কথা জিজ্ঞাসা করছে এবং ঠিক সেরকমই ব্যর্থ হবে. যেমন ব্যর্থ হয়েছিল হযরত ইউসুফের ভাইয়েরা। এদের পরিণাম হবে হযরত ইউসুফ (আঃ) এর ভাইদের পরিণামের মতই। কাজেই হযরত ইউসুফ এবং তাঁর ভাইদের ঘটনা থেকে মক্কাবাসরি শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত। তাদের বোঝা উচিত যে, অত্যাচারিদের পরিণাম কি ধরনের হয়ে থাকে। এক জায়গায় পয়গম্বরদের প্রসঙ্গ আলোচনা করে আল্লাহ তাআলা বলেন, কাফেররা তাদের রসুলদের বলেছিলো, আমরা তোমাদেরকে আমাদের দেশ থেকে অবশ্যই বিহস্কার করবো। অথবা তোমাদেরকে আমাদের ধর্মাদর্শে ফিরে আসতেই হবে। অতঃপর রসুলদের প্রতি তাদের প্রতিপালক ওহী প্রেরণ করলেন। যালেমদেরকে আমি অবশ্যই বিনাশ করবো। (১৩-১৪,১৪)

পারস্য ও রোমে যখন যুদ্ধের দাবানল জ্বলছিলো, কাফেররা চাচ্ছিলো পারস্যবাসী যেন জয়লাভ করে। কেননা রোমকরা আল্লাহ তাআলা, পয়গম্বর, ওহী, আসমানী কিতাবে বিশ্বাসী বলে দাবী করতো। পারস্যবাসীরা জয়যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিলে আল্লাহ এ সু—সংবাদ প্রদান করেন যে, “ কয়েক বছর পর রোমকরা জয়লাভ করবে। শুধু এ সু-সংবাদই দেয়া হয়নি, বরং আল্লাহ তাআলা এই সু-সংবাদও দিয়েছিলেন যে, রোমকদের বিজয়ের সময় আল্লাহ তাআলা মোমেনদেরও বিশেষভাবে সাহায্য করবেন। এই সাহায্য পেয়ে তারা খুশি হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, “আর সেদিন মোমেনরা হর্ষোৎ্ফুল্ল হবে আল্লাহর সাহায্যে। (৪৫,৩০) পরবর্তী সময়ে বদরের যুদ্ধে মুসলমানদের বিজয় ও সাফল্যের দ্বারা আল্লাহর বাণীর সত্যতা প্রমাণিত হয়েছিলো।
কোরআনের ঘোষণা ছাড়াও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও বিভিন্ন সময়ের মুসলমানদেরকে এ ধরণের সু-সংবাদ শোনাতেন। হজ্জের সময় ওকায, মাযন এবং যুলমাজাযের বাজারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানুষের কাছে তাঁর নবুয়তের কথা প্রচার করতেন। সে সময় তিনি শুধু বেহেশতের সু-সংবাদই দিতেন না, বরং সুস্পষ্টভাবে একথাও ঘোষনা করতেন, হে লোক সকল, তোমরা বলো যে, আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই, এতে আমরা সফলকাম হবে। এর বদৌলতে তোমরা হবে আরবের বাদশাহ এবং অন্যরাও তোমাদের পদানত হবে। আর মরণের পরও তোমরা জান্নাতের ভেতর বাদশাহ হয়ে থাকবে।
ইতিপূর্বে ও ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে যে, ওতবা ইবনে যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে পার্থিব ভোগ বিলাস এবং ঐশ্বর্যের লোভ দেখাচ্ছিলো এবং জবাবে তিনি হা-মীম সেজদা সূরার কয়েকটি আয়াত পাঠ করে শুনেছিলেন, তখন ওতবা ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন যে, শেষ পর্যন্ত মুসলমানরাই জয় লাভ করবে।

আবু তালেবের কাছে কোরাইযশদের সর্বশেষ প্রতিনিধি দল দেখা করতে এলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে জবাব দিয়েছিলেন, ইতিপূর্বে সেই জবাব উল্লেখ করা হয়েছে।সেখানেও পূর্ণ দৃঢ়তার সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছিলেন, তোমরা আল্লাহর তওহীদ বিশ্বাস স্থাপন করো, এর ফলে সমগ্র আরব তোমাদের অধীনস্থ হবে এবং অনারবের ওপরও তোমাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হবে।

হযরত খাব্বার ইবনে আরত (রা) বলেন, একবার আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে হাযির হলাম। তিনি কাবাঘরের ছায়ায় একটি চাদরকে বালিশ বানিয়ে শায়িত ছিলেন। সে সময় আমরা পৌত্তলিকদের হাতে অত্যাচারিত ও লাঞ্জিত হচ্ছিলাম। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল, আপনি আল্লাহর কাছে দোয়া করলেই পারেন। এ কথা শুনে তিনি উঠে বসলেন, তাঁর চেহরা রক্তিম হয়ে উঠলো। তিনি বললেন, তোমাদের পরবর্তী সময়ে ঈমানদারদের অবস্থা এমনও হয়েছিলো যে, লোহার চিরুনি দিয়ে তাদের গোশত খুলে নেয়া হতো, দেহে থাকতো শুরু হাড়। এরূপ বললেন, আল্লাহ তায়ালা দ্বীণের ওপর বিশ্বাস থেকে সরিয়ে নিতে পারেনি। এরপর বললেন, আল্লাহ তায়ালা দ্বীণকে পূর্ণতা প্রদান করবে। একজন ঘোড় সওয়ার সানয়া থেকে হাদরামাউত পর্যন্ত সফর করবে, এ সময়ে আল্লাহর ভয় ছাড়া তার অন্য কোন ভয় থাকবে না। তবে হাঁ বকরিদের ওপর বাঘের ভয় তখনো থাকবে।

একটি বর্ণনায় একথাও উল্লেখ রয়েছে যে, কিন্তু তোমরা তাড়াহুড়ো করছো।
স্মরণ রাখা দরকার যে, এসব সু-সংবাদ কোনো গোপনীয় বিষয় ছিলো না। এসব কথা ছিলো সর্বজনবিদিত। মুসলমানদের মতোই কাফের অবিশ্বাসীরাও এসব কথা জানতো। আসওয়াদ ইবনে মোত্তালেব এবং তার বন্ধুরা সাহাবায়ে কেরামকে দেখলেই নিজেদের মধ্যে বলাবলি করতো তোমাদের কাছে সারা দুনিয়ায় বাদশাহ এসে পড়েছে। ওরা খুব শীঘ্রই কেসরা কায়সারকে পরাজিত করবে। এসব কথা বলে তারা শিশ মারতো এবং হাততালি দিতো।

মোটকথা সাহাবায়ে কেরামের ওপর সে সময় যেসব যুলুম অত্যাচার নির্যাতন নিপীড়ন চালানো হতো সেসব কিছু বেহেশত পাওয়ার নিশ্চিত বিশ্বাস এবং সুসংবাদের মোকাবেলায় ছিলো তুচ্ছ। এসব অত্যাচারকে সাহাবায়ে কেরাম মনে করতেন এক খন্ড মেঘের মতো, যে মেঘ বাতাসের এক ঝাপটায় দূর হয়ে যাবে।

এছাড়া ঈমাণদারদের ঈমানের পরিপক্কতা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা দিয়ে নিয়মিতভাবে সাহাবায়ে রূহানী খাবার সরবরাহ করতেন। কোরআন শিক্ষা দেয়ার মাধ্যমে তাদের মানসিক পরিশুদ্ধতার ব্যবস্থা করতেন। ইসলাম সম্পর্কিত প্রশিক্ষণ, রূহানী শক্তির ব্যবস্থা, মানসিক পরিচ্ছন্নতা চারিত্রিক সৌন্দর্যের শিক্ষা সাহাবাদের মনোবল বাড়িয়ে দিচ্ছিলো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবাদের ঈমানের নিভু নিভু স্ফুলিঙ্গকে উজ্জল শিখায় পরিণত করতেন। অন্ধকার থেকে বের করে তাদেরকে হেদায়াতের আলোকে পৌঁছে দিতেন। এর ফলে সাহাবাদের দ্বীনী শিক্ষা ও বিশ্বাস বহুগুণ উন্নত হয়ে গিয়েছিলো। প্রবৃত্তির দাসত্ব ছেড়ে তারা আল্লার সন্তুষ্টি লাভের পথে অগ্রসর হতেন। জান্নাতের অধিবাসী হওয়ার আগ্রহ, জ্ঞান লাভের আকাঙ্খা এবং আত্মা সমালোচনায় তাঁরা উদ্যোগী হয়েছিলেন। এসব কারনে বিধর্মী পৌত্তলিকদের অত্যাচার নির্যাতন তাঁদেরকে লক্ষ্য পথ থেকে দূরে সরাতে পারেনি, ধৈর্য সহিষ্ণুতা তাঁরা ছিলেন অটল অবিচল। বিশ্ব মানবের জন্য তাঁরা প্রত্যেকেই হয়ে উঠেছিলেন এক একজন উজ্জল আর্দশ।


{চলবে}


প্রথম প্রকাশ

Re: সীরাতুন্নবী (সাঃ) ৫০,কঠোর ধের্য্য

সুন্দর টপিক লিখার জন্য ইলিয়াস ভাইকে অনেক ধন্যবাদ।  hug  clap

Re: সীরাতুন্নবী (সাঃ) ৫০,কঠোর ধের্য্য

সাদী লিখেছেন:

সুন্দর টপিক লিখার জন্য ইলিয়াস ভাইকে অনেক ধন্যবাদ।  hug  clap

মন্তব্যের জন্য আপনাকেও ধন্যবাদ সাদী ।

Re: সীরাতুন্নবী (সাঃ) ৫০,কঠোর ধের্য্য

সুন্দর টপিকের জন্য ভাইজানকে অসংখ্য ধন্যবাদ.......

জাযাল্লাহু আন্না মুহাম্মাদান মাহুয়া আহলুহু......
এই মেঘ এই রোদ্দুর

Re: সীরাতুন্নবী (সাঃ) ৫০,কঠোর ধের্য্য

ছবি-Chhobi লিখেছেন:

সুন্দর টপিকের জন্য ভাইজানকে অসংখ্য ধন্যবাদ.......

ধন্যবাদ আপনাকেও সুন্দর মন্তব্যের জন্য।  smile

Re: সীরাতুন্নবী (সাঃ) ৫০,কঠোর ধের্য্য

পরবর্তী পর্বের অপেক্ষায়  hug

۞ بِسْمِ اللهِ الْرَّحْمَنِ الْرَّحِيمِ •۞
۞ قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ ۞ اللَّهُ الصَّمَدُ ۞ لَمْ * • ۞
۞ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ ۞ وَلَمْ يَكُن لَّهُ كُفُوًا أَحَدٌ * • ۞

Re: সীরাতুন্নবী (সাঃ) ৫০,কঠোর ধের্য্য

সাইদুল ইসলাম লিখেছেন:

পরবর্তী পর্বের অপেক্ষায়

মন্তব্য ও আগ্রহের জন্য ধন্যবাদ। ইদানিং আর লিখতে ইচ্ছে হয় না, তাই পরের পর্ব কবে পাচ্ছ ঠিক বলতে পারছি না। sad