টপিকঃ সীরাতুন্নবী (সাঃ) ৪২ দলিল ছিন্ন করার ঘটনা

আগের পর্ব  সীরাতুন্নবী (সাঃ) ৪১ সর্বাত্মক বয়কট

এ অবস্থায় পুরো তিন বছর কেটে যায়। এরপর নবুয়্যতের দশম বর্ষে মহররম মাসে দলিল ছিন্ন হওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে অত্যাচার নির্যাতনের অবসান ঘটে। কোরাইশদের মধ্যে কিছু লোক এ ব্যবস্থার বিরোধী থাকায় তারা অবরোধ বাতিল করার ও উদ্যোগ গ্রহণ করেন।

এ অমানবিক অবরোধ সম্পর্কিত দলিল বিনষ্ট করার প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন বনু আমের ইবনে লুয়াই গোত্রের হেশাম ইবনে আমের নামক এক ব্যক্তি। হেশাম রাত্রিকালে চুপিসারে খাদ্য দ্রব্য পাঠিয়ে আবু তালেব ঘাঁটির অসহায় লোকদের সাহায্য করতেন। প্রথমে হেশাম যুহাইর ইবনে আবু উমাইয়া মাখযুমির কাছে যান। যুহাইয়েরর মা আতেকা ছিলেন আব্দুল মোত্তালেবের কন্যা। অর্থ্যাৎ আবু তালেবের বোন। হেশাম তাকে বললেন, যুহাইর তুমি কি চাও যে, তোমরা মজা করে পানাহার করবে অথচ তোমার মামা এবং অন্যেরা ধুঁকে ধুঁকে মারা যাবে ? তারা কি অবস্থায় রয়েছে, সেটা কি তুমি জানো না ? যুহাইর বললেন, আফসোস, আমি একা কি করতে পারি ? যদি আমার সাথে আরো কেউ এগিয়ে আসে তবে আমি সে দলিল বিনষ্ট করার উদ্যোগ করতে পারি। হেশাম বললেন, আরো একজন রয়েছে। যুহাইর বললেন, তিনি কে, হেশাম বললেন, আমি নিজে। যুহাইর বললেন, আচ্ছা তবে তৃতীয় কাইকে খুঙজে বের করো। এ কথা শোনার পর হেশাম মোতআম ইবনে আদীর কাছে গেলেন এবং বনু হাশেম ও বনু মোত্তালেবের দুরবস্থার কথা উল্লেখ করে তার সাহায্য চাইলেন। ওরা যে তার নিকটাত্মীয় সে কথাও বললেন। মোতআম বললেন, আমি একা কি করতে পারি? হেশাম বললেন, আরো একজন আছেন। মোতআম জিজ্ঞাসা করলেন, তিনি কে ? হেশাম বললেন, আমি। মোতআমা বললেন, আচ্ছা তৃতীয় একজন খুঁজে নাও। হেশাম বললেন, আমি সেটাও করেছি। মোতআম বললেন তিনি কে ? হেশাম বললেন তিনি হচ্ছেন যুহাইর ইবনে উমাইয়া। মোতআম বললেন, আচ্ছা চতুর্থ একজন খোঁজ করো। এরপর হেশাম আবুল বাখতারির কাছে গেলেন এবং তার সাথেও মোতআমের সাথে যেভাবে কথা বলেছেন সেভাবে কথা বললেন। আবুল বাখতারী জানতে চাইলেন, এ ব্যাপারে সমর্থক কেউ আছে কিনা। হেশাম বললেন, হ্যাঁ আছে। এরপর তিনি যুহাইর ইবনে আবু উমাইয়া, মোতআম ইবনে আদী এবং নিজের কথা জানালেন। আচ্ছা তবে বিশ্বস্ত একজন লোক খোঁজ করো। এরপর হেশাম জামআ ইবনে আসওয়াদ ইবনে মোত্তালেব ইবনে আছাদের কাছে গেলেন। তার সাথেও বনু হাশেম বনু মোত্তালেবের দুরবস্থার বিষয়ে আলোচনা করে সাহায্য চাইলেন। তিনি জানতে চাইলেন অন্য কেউ সহায়তাকারী আছে কিনা ? হেশাম বললেন, হ্যাঁ আছে। এরপর সকলের নাম জানালেন। পরে উল্লেখিত সবাইউ হাজুন নামক স্থানে একত্রিত হয়ে দলিল বিনষ্ট করার ব্যাপারে অঙ্গীকারাবদ্ধ হলেন। যুহাইর বললেন, প্রথমে আমি কথা তুলবো।

সকাল বেলা নিয়ম অনুযায়ী মজলিশে সবাই একত্রিত হলো। যুহাইর দামী পোশাক পরিধান করে সেজেগুজে উপস্থিত হলো। প্রথমে কাবাঘর সাতবার তওয়াফ করে সবাইকে সম্বোধন করে বললো, মক্কাবাসীরা শুনো, আমরা পানাহার করবো, পোশাক পরিধান করবো, আর বনু হাশেম ধ্বংস হয়ে যাবে। তাদের কাছে কিছু বিক্রি করা হচ্ছে না, তাদের কাছ হতে কিছু কেনাও হচ্ছে না। খোদার কসম, এ ধরণের অমানবিক দলিল বিদ্যমান অবস্থায় থাকায় আমি নীরব হয়ে থাকতে পারি না । আমি চাই এ দলিল বিনষ্ট করা হউক।

আবু জেহেল এ কথা শুনে বললো, তুমি ভুল বলছো। খোদার কসম, এ দলিল ছিন্ন করা যাবে না। জামআ ইবনে আসওয়াদ বললেন, খোদার কসম তুমি ভুল বলছো, এ দলিল যখন লেখা হয়েছিলো তখনো আমি রাজি ছিলাম না। আমি এটা মানতে প্রস্তুত নই। এরপর মোতআম ইবনে আদী বললেন, তোমরা দুজন ঠিকই বলচো, আমরা এ দলিলে যা কিছু লেখা রয়েছে তা থেকে খোদার কাছে পানাহ চাই।
হেশাম ইবনে আমরও একই ধরণের কথা বললেন।

এ কথা শুনে আবু জেহেল বললো, হুহু বুঝেছি রাত্রিকালেই এ ধরণের ঐক্যমত হয়েছে, এখানে পামর্শ নয় বরং অন্য কোথাও কোথাও করা হয়েছে।

সে সময় আবু তালেবও অদুরে উপস্থিত ছিলেন। রসুলুল্লাহ (সাঃ) তাঁকে জানিয়েছিলেন যে, দলিল বিনষ্ট করতে আল্লাহ তাআলা একরকম পোকা পাঠিয়েছেন। তারা যুলুম অত্যাচারের বিবরণ সমূহ কেটে ছারখার করে ফেলেছে, শুধু যেখানে যেখানে আল্লাহ তাআলার নাম রয়েছে সেসব অবশিষ্ট আছে।

আবু তালেব কোরইশদের বললেন, আমার ভাতিজা আমাকে আপনাদের কাছে এ কথা বলতে পাঠিয়েছেন যে, আল্লাহ তাআলা তাঁকে জানিয়েছেন যে, আপনাদের অঙ্গীকার পত্রটি আল্লাহ তাআলা একরকম পোকা পাঠিয়ে নষ্ট করে দিয়েছেন। শুধুমাত্র আল্লাহ তাআলার নামটুকু সেখানে অবশিষ্ট রয়েছে। এ কথা মিথ্যা বলে প্রমাণিত হলে আমি তার ও আপনাদের মাঝখান হতে সরে দাড়াবো এবং আপনারা যা ইচ্ছা তাই করতে পারবেন। আর সত্য বলে প্রমাণিত হয় তাহলে বয়কটের মাধ্যমে আমাদের প্রতি যে অন্যায় আচরণ করছেন তা থেকে বিরত থাকবেন। এতে কোরাইশরা সম্মত হলো।
এ নিয়ে আবু জেহেল ও অন্যান্যদের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক শেষ হলে মোতাআম ইবনে আদী অঙ্গীকার পত্র ছিড়তে গিয়ে দেখলেন যে, আল্লাহর নাম লেখা অংশ বাদে বাকি অংশ সত্যি সত্যি পোকা খেয়ে ফেলেছে। পরে অঙ্গীকার পত্র ছিড়ে ফেলা হলে বয়কটের অবসান হলো এবং রসুলুল্লাহ (সাঃ) ও অন্য সকলে শাবে আবু তালিব থেকে বেরিয়ে এলেন। কাফেররা এ বিস্ময়কর নিদর্শনে আশ্চর্য হলো, কিন্ত তাদের মনোভাবের কোন পরিবর্তন হলো না। আল্লাহ তাআলা বলেন, আল যদি তারা কোন মোযেযা দেখে, তখন টালবাহানা করে এবং বলে, এ তো যাদু।

আরবের পৌত্তলিকেরা নবুয়তে এ বিস্ময়কর এ নিদর্শন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলো এবং নিজেদের কুফুরীর পথে আরো কয়েক কদম অগ্রসর হলো।

{চলবে}

প্রথম প্রকাশ

Re: সীরাতুন্নবী (সাঃ) ৪২ দলিল ছিন্ন করার ঘটনা

ধন্যবাদ শেয়ার করার জন্য আগামি পর্ব লিখবেন  mail

۞ بِسْمِ اللهِ الْرَّحْمَنِ الْرَّحِيمِ •۞
۞ قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ ۞ اللَّهُ الصَّمَدُ ۞ لَمْ * • ۞
۞ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ ۞ وَلَمْ يَكُن لَّهُ كُفُوًا أَحَدٌ * • ۞

Re: সীরাতুন্নবী (সাঃ) ৪২ দলিল ছিন্ন করার ঘটনা

ধন্যবাদ clap

ঝামেলা'এর ওয়েবসাইট

লেখাটি CC by-sa 3.0 এর অধীনে প্রকাশিত

সর্বশেষ সম্পাদনা করেছেন আল মাহমুদ (২৯-১২-২০১১ ১৩:২৫)

Re: সীরাতুন্নবী (সাঃ) ৪২ দলিল ছিন্ন করার ঘটনা

শেয়ার করার জন্য ধন্যবাদ ইলিয়াস ভাই।  clap

Re: সীরাতুন্নবী (সাঃ) ৪২ দলিল ছিন্ন করার ঘটনা

ধন্যবাদ সবাইকে ।