সর্বশেষ সম্পাদনা করেছেন ত্বোহা (০২-১২-২০১১ ০৬:১২)

টপিকঃ লিবিয়া যুদ্ধে আমি এবং আমাদের নিয়ার ডেথ এক্সপেরিয়েন্স

অনেক দিন পর ফোরামে এলাম। এই জীবনে আর আসতে পারব কি না সন্দেহ ছিল। কিন্তু এলাম শেষ পর্যন্ত।

গত আটমাসে লিবিয়া জুড়ে যত যুদ্ধ হয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ যুদ্ধটি হয়েছে গাদ্দাফীর জন্মস্থান সিরতে। সিরতের মধ্যে যে এলাকাটিতে সবচেয়ে ভয়াবহ যুদ্ধ হয়েছে, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যে এলাকাটিতে তুমুল যুদ্ধ চলেছে এবং যে এলাকা থেকে শেষ পর্যন্ত গাদ্দাফীকে ধরা হয়েছে, তার নাম রক্বম এতনীন (এরিয়া নাম্বার টু)। আর দুর্ভাগ্যবশত আমরা ছিলাম সেই এলাকার অধিবাসী এবং যুদ্ধের শেষ পর্যন্তও আমরা হাজার হাজার মিসাইল এবং লক্ষ লক্ষ রাউন্ড গোলাগুলির মধ্যেও সেই এলাকাতেই ছিলাম। বাঁচব - এই আশা ছিল না। কিন্তু সম্ভাব্যতার সকল সূত্রকে ভুল প্রমাণ করে একমাত্র আল্লাহ্‌র অসীম অনুগ্রহে শেষ পর্যন্ত আমরা বেঁচে গেছি।

মুভির মধ্যে ওয়ার জেনরটা আমার সবচেয়ে ফেভারিট। দ্যা পিয়ানিস্ট, সেভিং প্রাইভেট রায়্যান, শিন্ডলার্স লিস্ট, হোটেল রুয়ান্ডা, ব্রাদারহুড অফ ওয়্যার সহ দেশ-বিদেশের সেরা সেরা যুদ্ধের প্রায় সবকটি মুভিই আমার দেখা। কিন্তু যে যুদ্ধের অভিজ্ঞতা আমি নিজে প্রতক্ষ্য করেছি, সেটা নিঃসন্দেহে যেকোন সিনেমাকে হার মানায়। যে ঘটনাগুলো আমাদের জীবনে ঘটে গেছে, ভালো কোন ঔপন্যাসিকের হাতে পড়লে সেগুলো দিয়ে একটা কালজয়ী উপন্যাস লিখে ফেলা সম্ভব। কিংবা ভালো পরিচালকের হাতে পড়লে সেগুলো দিয়ে অস্কারজয়ী চলচ্চিত্র বানিয়ে ফেলাও অসম্ভব কিছু নয়। দুর্ভাগ্য সেরকম লেখনী বা পরিচালনা কোন রকম ক্ষমতা নিয়েই আমার জন্ম হয়নি। তাই আপাতত এই যুদ্ধে আমাদের জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর সারমর্ম লিখেই সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে।

অবশ্য আমার ইচ্ছা আছে ভবিষ্যতে এই যুদ্ধের ঘটনাবলী নিয়ে ধারাবাহিকভাবে একটা আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস লেখার, যেখানে আমার অভিজ্ঞতা তো অবশ্যই, সেই সাথে এই যুদ্ধের মূল কারণ, যুদ্ধের জনসমর্থন, গাদ্দাফীর জনপ্রিয়তা, মিডিয়ার ভূমিকা প্রভৃতি বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ থাকবে। পড়ার অগ্রিম আমন্ত্রণ রইল।

১। যুদ্ধের প্রথম দিকে অর্থাত ফেব্রুয়ারি মাসে সিরতের পরিস্থিতি খুবই স্বাভাবিক ছিল। মিছিল সমাবেশ যা হতো সবই সরকারী আয়োজনে এবং গাদ্দাফীর পক্ষে। সেই সব মিছিলে অবশ্য জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবেই অংশ নিত। মার্চ মাসের ৪ তারিখে পুরো লিবিয়াতে ইন্টারনেট কানেকশন কেটে দেওয়া হয়। মার্চের ১৯ তারিখে ফ্রেঞ্চ-আমেরিকান-ব্রিটিশ বিমান আক্রমণ শুরু করে। প্রথম দুই সপ্তাহে সিরতেও বেশ কিছু ভয়াবহ বিমান হামলা হয়। দিন-রাত চব্বিশ ঘন্টা ন্যাটোর উড়াউড়িতে কান ঝালাপালা হওয়া ছাড়া অবশ্য এতে সাধারণ মানুষের অবশ্য তেমন কোন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। প্রথম প্রথম ন্যাটোর বিমানের আওয়াজে ভয় লাগলেও পরে সেগুলো অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল। মে-জুন-জুলাই মাসের দিকে সিরতে ন্যাটো একেবারেই উড়ত না। তখন সিরতের মানুষের পক্ষে বুঝাই সম্ভব ছিল না যে, লিবিয়ার অন্যান্য এলাকায় রকম ভয়াবহ যুদ্ধ চলছে।

২। রোযার মাস থেকে সিরতের পরিস্থিতির অবনতি হতে শুরু করে। বিদ্রোহীরা মিসরাতা, জিনতান, নাফূসা মাউন্টেইন সহ বিভিন্ন এলাকার উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে ফেলে এবং গুরুত্বপূর্ণ হাইওয়েগুলো দখলে নিয়ে নেয়, যার কারণে সিরতের সাথে ত্রিপলীর যোগাযোগ কঠিন হয়ে পড়ে। দোকান-পাট গুলো খালি হতে শুরু করে, পেট্রোলের অভাবে রাস্তায় ট্যাক্সি চলাচল বন্ধ হয়ে যায়, এমনকি, গ্যাস এবং বিদ্যুতের সংকটও শুরু হয়। রোযার মাঝামাঝি আমাদের গ্যাস শেষ হয়ে যায় এবং আমরা মাটির চুলা তৈরি করে কাঠ দিয়ে রান্না শুরু করি। শেষের দিকে অবশ্য শহরে কাঠেরও সংকট শুরু হয়। মানুষ মাজরায় গিয়ে আস্ত গাছ উপড়ে নিয়ে আসতে শুরু করে। এ সময় দুই দিন পরপর দুই-তিন ঘন্টা করে কারেন্ট দেওয়া হতো। অথচ এর আগে সারা জীবনে লিবিয়াতে মোট কত ঘন্টা বিদ্যুত ছিল না, সেটাও হাতে গুনে বলে দেওয়া যেত। গাদ্দাফী বাহিনীর দাবি ছিল বিদ্রোহীরা পাওয়ার সাপ্লাই কেটে দেওয়ার কারণে কারেন্ট নেই, কিন্তু এটা অনেকের কাছেই বিশ্বাসযোগ্য ছিল না কারণ বিদ্রোহীরা ইচ্ছে করলে পানির সাপ্লাইও কেটে দিতে পারত। বরং গাদ্দাফী বাহিনী নিজেই ইচ্ছে করে কারেন্ট বন্ধ করে রাখত যেন মানুষ আল জাজিরা, আল আরাবিয়া দেখে দেশের প্রকৃত অবস্থা (অধিকাংশ এলাকা বিদ্রোহীদের দখলে) জানতে না পারে - এটা আরও অধিকতর বিশ্বাসযোগ্য ছিল।

৩। রমজান মাসের ২০ তথা আগস্টের ২০ তারিখে বিদ্রোহীরা ত্রিপলী আক্রমণ করে এবং অকল্পনীয়ভাবে প্রায় বিনা বাধায় মাত্র এক রাতের মধ্যে ত্রিপলী দখল করে ফেলে। গাদ্দাফীর তথ্যমন্ত্রী মূসা ইব্রহীম আগের দিনও বলেছিল ত্রিপলী দখল করা অসম্ভব কারণ গাদ্দাফীর অনুগত ৬৫,০০০ সৈন্য এবং সশস্ত্র সাধারণ জনগণ ত্রিপলী রক্ষা করবে। কিন্তু বাস্তবে তার কিছুই হয় নি। ত্রিপলীর গ্রীন স্কয়ার দখলের পরদিন ২২ তারিখে বিদ্রোহীরা টিভি সেন্টার এবং মোবাইল ফোন কোম্পানীগুলো দখল করে নেয়, সাথে সাথেই সবাইকে ৫০ দিনার (প্রায় ২৫০০ টাকা) করে উপহার দেয়, দীর্ঘ ছয মাস পর ইন্টারনেট উন্মুক্ত করে দেয় এবং "গাদ্দাফীকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য সবাইকে অভিনন্দ" এই জাতীয় একটা এসএমএস পাঠায়। এই এসএমএস মোবাইলে আসা মাত্রই সিরতে গাদ্দাফী বাহিনী নেটওয়ার্ক কেটে দেয়।

৪। ত্রিপলী দখলের পরপরই বিদ্রোহীরা নজর দেয় সিরত, সাবহা এবং বেনওয়ালিদের উপর। এরমধ্যে সিরত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ সিরত কোস্টাল হাইওয়ের উপর অবস্থিত। এবং ত্রিপলী বা মিসরাতার সাথে বেনগাজীর যোগাযোগের মাধ্যম হচ্ছে এই কোস্টাল হাইওয়ে। রোযার ঈদের পরপরই বিদ্রোহীরা বেনওয়ালিদ আক্রমণ করে। সেপ্টেম্বরের দুই তারিখ রাত ঠিক বারোটার সময় বিদ্রোহীরা বেনওয়ালিদ শহরের প্রায় কাছাকাছি পৌঁছে যায়। ঠিক যে মুহূর্তে আল জাজিরাতে এই সংক্রান্ত ব্রেকিং নিউজ পরিবেশন করে, তার পাঁচ মিনিট পরেই সমগ্র সিরতের বিদ্যুত সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। গ্যাস, ইন্টারনেট, ফোন আগেই বন্ধ ছিল। এবার কারেন্টও গেল। আমরা শুধু আল্লাহ্‌র কাছে দোয়া করছিলাম পানিটা যেন না যায়।

৫। সেপ্টেম্বরের ১০ বা ১১ তারিখে সিরতে একটা ভয়াবহ ঘটনা ঘটল। সিরতের রক্বম ওয়াহেদ (এরিয়া নাম্বার ওয়ান) নামক এলাকার অধিবাসীদের অধিকাংশই মিসরাতী ক্বাবিলার (গোত্রের) অন্তর্ভুক্ত এবং স্বভাবতই তারা গাদ্দাফীবিরোধী। কিন্তু সংখ্যালঘু হওয়ায় তারা এতোদিন নিশ্চুপ ছিল। তাদের অনেকে এমনকি মিছিলে সবুজ নিয়ে "আল্লাহ‌, মোয়াম্মার, ওয়া লিবিয়া, ওয়া বাস" অর্থাত "আল্লাহ, গাদ্দাফী অ্যান্ড লিবিয়া, অ্যান্ড দ্যাটস অল" স্লোগান পর্যন্ত দিয়েছে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে অনেকেই গোপনে স্যটেলাইট ফোনের মাধ্যমে বিদ্রোহীদের সাথে যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছিল। এরকম একজন ব্যক্তি ছিল আ'দ সাফরুনী। খবর পেয়ে গাদ্দাফী বাহিনী তাকে গ্রেপ্তারের জন্য যায়। ধরা খাওয়া মানেই নিশ্চিত মৃত্যু, তাই সে ধরা না দিয়ে বিদ্রোহীদের চাঁদ-তারা খচিত তিন বর্ণের পতাকা নিয়ে বেরিয়ে আসে। শুরু হয় গোলাগুলি। সাফরুনীর পুরো বাড়ি রকেট লঞ্চার দিয়ে ধ্বসিয়ে দেওয়া হয়। সে এবং তার এক ছেলে মারা যায়। গাদ্দাফীর পক্ষের মারা যায় আরও পাঁচজন।

গোলমালটা বাঁধে সাফরুনীর ছেলেকে নিয়ে। সে মারা গিয়েছিল ধারণা করে তাকে ফ্রিজে ঢুকিয়ে রাখা হয়। কিন্তু লাশ গোসল করানোর জন্য বের করতে গিয়ে দেখা গেল যে সে আসলে তখনও মরে নি। এই খবর কোন এক আশ্চর্য উপায়ে মিডিয়াতে ছড়িয়ে পড়ে। এবং মিডিয়া তার স্বভাব অনুযায়ী ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে জীবন্ত মানুষকে ফ্রিজে ঢুকিয়ে রাখার মতো এই অমানবিক ঘটনাকে বিশ্লেষণ করে। এর ফল হিসেবে মিসরাতার বিদ্রোহী যোদ্ধারা সিরত আক্রমণের জন্য দলে দলে এসে জমা হতে থাকে।

৬। ১৩ই সেপ্টেম্বর প্রথম আমরা একটু ভিন্ন ধরনের শব্দ পেলাম। এর আগে ন্যাটো যখন অনেক দূরে কোথাও বোমা ফেলত, তখন শব্দ যতটুকু হতো না হতো, সেই তুলনায় মাটি এবং ঘরের দরজা-জানালা কেঁপে উঠত অনেক বেশি। কিন্তু এই প্রথম আমরা অনেক দূর থেকে ধুপ-ধাপ জাতীয় এক ধরনের প্রতিধ্বনির শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম, কিন্তু কোন কম্পন অনুভব করছিলাম। আমাদের অনেকেরই ধারণা হল এবং মাত্র চার-পাঁচ জন লিবিয়ান স্বীকার করল এগুলো ট্যাংক, মর্টার এবং আরপিজির (রকেট প্রপেলিং গ্রেনেড) আওয়াজ। বিদ্রোহীরা চল্লিশ কিলোমিটার পর্যন্ত চলে এসেছে। সেখানে যুদ্ধ হচ্ছে। কিন্তু সিরত রেডিও এবং সাধারণ লিবিয়ানদের মুখে তাদের সেই ক্লাসিক্যাল সুর। এগুলোর লিবিয়ান সেনাবাহিনীর (গাদ্দাফী বাহিনী) অনুশীলনের আওয়াজ। বিদ্রোহীরা সিরতের কাছাকাছি আসার প্রশ্নই উঠে না। কারণ সিরতে গাদ্দাফীর ২০,০০০ সৈন্য আছে। তাছাড়া লিবিয়ার সব জনগণই তো গাদ্দাফীকে চায়। বিদ্রোহীরা মূলত তালেবান এবং কাতার ও আরব আমিরাতের সৈন্য, তারা সংখ্যায় খুবই কম। সিরতে ঢুকবে কি, মিসরাতাই তো এখন আর তাদের দখলে নেই। সিরতের দিকে যখন এগোচ্ছিল, তখন লিবিয়ান সৈন্যরা দক্ষিণ দিকের সাহারা থেকে আক্রমণ করে মিসরাতা দখল করে ফেলেছে। একদিকে মিসরাতা পর্যন্ত এবং অন্যদিকে ব্রেগা পর্যন্ত গাদ্দাফীর দখলে। আর এক সপ্তাহের মধ্যেই পুরা লিবিয়া গাদ্দাফীর দখলে চলে আসবে।

৭। ১৪ই সেপ্টেম্বর একটু শান্ত ছিল। কিন্তু ১৫ই সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার দুপুর থেকেই মর্টারের শব্দ ধীরে ধীরে জোরালো হতে থাকে। সকালে আমি, আমার খালাতো ভাই শাওন, আমাদের প্রতিবেশী ইয়াসিন এবং শাকের সমুদ্রে গিয়েছিলাম মাছ ধরার জন্য। গত কয়েকমাস ধরে বাজারে কোন মাছ নেই। এক মাসেরও বেশি সময় ধরে ডিম নেই, মুরগীও নেই প্রায় সপ্তাহখানেক ধরে। মাছ অবশ্য পাই নি, কিন্তু সেখানে একজনকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম বিদ্রোহীরা নাকি সিরতের বিশ কিলোমিটারের মধ্যে চলে এসেছে। বাসায় ফিরে এসে দেখি আমার ছোটভাই তালহা ঘরে নেই। সে বাড়িওয়ালার ভাই মোত্তালেবের সাথে খুবজা কিনতে গেছে। খুবজার দোকানটা (কুশা) সিরত শহরের একেবারে শেষ প্রান্তে। বিদ্রোহীরা ঐদিক দিয়েই আসছে। মর্টারের আওয়াজ যত জোরালো হয়ে উঠতে লাগল, তালহার জন্য আমরা তত দুশ্চিন্তা করতে লাগলাম। বিকেল চারটার দিকে তালহা যখন রাস্তার দিক থেকে কান ফাটানো শব্দ হতে লাগল, ঠিক তখনই ধুলো ছিটিয়ে প্রায় ১২০ কিমি গতিতে মোত্তালেব গাড়ি চালিয়ে এসে ব্রেক করল এবং হাঁপাতে হাঁপাতে তালহা গাড়ি থেকে নেমে এল। তারা মাত্র নেমেছে, আর সাথে সাথেই রাস্তার দিকে মর্টার শেল এসে পড়তে লাগল।

তালহার মুখ থেকে যা শুনতে পেলাম তা হচ্ছে, তারা যখন কুশায় খুবজার জন্য লাইন ধরে দাঁড়িয়ে ছিল, তখন প্রথমে একজন লোক এসে খবর দিল যে বিদ্রোহীরা ২৩ কি.মি. পর্যন্ত চলে এসেছে। তার পাঁচ মিনিট পরেই আরেকজন এসে বলল বিদ্রোহীরা ১৭ কি.মি. পর্যন্ত এসে গেছে, সবাই যেন তাড়াতাড়ি বাসায় চলে যায়। লোকজন তার কথা বিশ্বাস না করে তাকে ধমকে ভাগিয়ে দিল। কারণ সবাই গাড়ির রেডিওতে সিরত রেডিও শুনছিল। সেখানে বলা হচ্ছিল, পঞ্চাশ কি.মি. দূরে যুদ্ধ হচ্ছে, স্বেচ্ছাসেবীরা যেন তাদের গাড়ি এবং অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে যুদ্ধে যায়। গাড়িতে বেশি পেট্রোল না থাকলেও সমস্যা নেই, ত্রিশ কি.মি. দূরের একটি ফিলিং স্টেশনে ফ্রি পেট্রোল দেওয়া হচ্ছে। দ্বিতীয় লোকটা চলে যেতে না যেতেই হঠাত কান ফাটানো শব্দ হতে থাকে এবং গাদ্দাফীর সৈন্যরা শহরের বাইরের দিকে ফিরে এসে কুশার সামনের গোল চত্বরে মেশিনগান এবং মিসাইল ফিট করে পজিশন নিয়ে ফায়ার করতে শুরু করে। সাথে সাথে সবাই দিগ্বিবিক শূণ্য হয়ে পালাতে শুরু করে। তালহা জোরে চিতকার করে কথা বলছিল কিন্তু আমরা সেটাও ঠিকমতো শুনতে পারছিলাম না। কারণ ততক্ষনে আমাদের সামনের গলিতে পজিশন নিয়ে গাদ্দাফী বাহিনী রাস্তার দিকে মেশিনগানের ফায়ার করা শুরু করে দিয়েছে। অর্থাত বিদ্রোহীরা শহরে ঢুকে পড়ছে।

বৃহস্পতিবারের সেই বিকেল আমাদের জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ দিনগুলোর মধ্যে একটা। কান ফাটানো শব্দ করে একটার পর একটা মিসাইল এসে আশেপাশে পড়ছে। উপর দিয়ে ন্যাটো প্রচন্ড শব্দ করে উড়ছে। গাদ্দাফী বাহিনীর মেশিনগান অবিরত বৃষ্টির মতো গুলিবর্ষন করে যাচ্ছে। এর মধ্যে আমরা হঠাত অনেক মানুষের মিছিলের মতো আনন্দধ্বনি শুনতে পেলাম। আমাদের বাসার উত্তরে সমুদ্রের পাড় দিয়ে নতুন একটা রাস্তা গিয়েছে যেটা সমতল থেকে বেশ উঁচু, সেই রাস্তা দিয়ে বিদ্রোহীরা এগিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে হঠাত গাদ্দাফী বাহিনীর কয়েকটা ছেলে এসে আমাদের বাসার ঠিক সামনে থেকে আড়াল নিয়ে বের হয়ে সেই রাস্তা লক্ষ করে একটা আরপিজি মারল। ধোঁয়ায় চারদিক ভরে গেল। এবং ছেলেগুলো আরপিজি মেরেই দৌড়ে পালিয়ে গেল। বিদ্রোহীরা সেই রাস্তা ধরে আর না এগিয়ে পিছু ফিরে গেল। কিন্তু সেখান থেকে শহরের উপর এলোপাথাড়ি মেশিনগানের গুলি আর মিসাইল মারতে লাগল। আমরা এবং বাড়িওয়ালারা আমাদের বাসা থেকে বের হয়ে সামনে বাড়িওয়ালার ভাই হামজা নতুন বাড়ি বানাচ্ছিল, সেখানে আশ্রয় নিলাম। বাড়িটাতে এখনও দরজা-জানালা লাগানো হয় নি, কিন্তু এর ছাদটা তুলনামূলকভাবে একটু মজবুত। তাই মিসাইল পড়লে হয়তো একটু কম ভাঙবে। এরমধ্যেই ন্যাটো হঠাত একটা বোমা মারল আমাদের বাসা থেকে এক থেকে দেড়শ মিটারের মধ্যে। মনে হল পুরো ঘর যেন ভেঙ্গে মাথার উপর পড়ছে। কিন্তু না, পুরানো প্লাস্টার খসে পড়ে ছাড়া আর কিছু ঘটল না।

এই গোলাগুলির মধ্যেই আমাদের বাড়িওয়ালা কামাল তার যাবতীয় অস্ত্রশ্ত্র, অর্থাত আট-দশটা কালাশনিকভ রাইফেল, একটা স্নাইপার রাইফেল, তিনটা রকেট লঞ্চার এগুলো বস্তায় ভরে মাটি গর্ত করে লুকিয়ে ফেলল। কামাল নিরাপত্তা বাহিনীর কিছুতে চাকরি করত। প্রায়ই সে অস্ত্র নিয়ে ব্রেগা, রাস লানুফ প্রভৃতি শহরে গাদ্দাফীর যোদ্ধাদের সহযোগিতা করতে যেত। কিন্তু আজ যখন একেবারে ঘরের সামনে যুদ্ধ চলছে, সে তখন সব অস্ত্র মাটিচাপা দিয়ে বাচ্চা কোলে নিয়ে বউয়ের পাশে বসে আছে।

সেদিন শহরের ভেতর যুদ্ধ মাত্র দুই ঘন্টা স্থয়ী হয়েছিল। সন্ধ্যার সাথে সাথেই বিদ্রোহীরা ফিরে গেল। কিন্তু রেখে গেল একটি শহরের ধ্বংসস্তুপ। জায়গায় জায়গায় আগুন জ্বলছে। আমাদের গলি থেকে বেরুলে রাস্তার উপরেই যে ফার্নিচারের দোকান, সেটায় দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। আগুনের গন্দে বাতাস ভারী হয়ে গেছে। আমাদের নিঃশ্বাস নিতে পর্যন্ত কষ্ট হতে থাকে। কিছুক্ষণ পরেই অবশ্য শুনলাম গাদ্দাফী বাহিনী রাস্তায় মিছিল বের করেছে। তাদের দাবি, তারা বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে "ইঁদুরগুলোকে" তাড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে। এটা তাদের মহা বিজয়।

রাতের বেলা আমাদের প্রতিবেশী নবী স্যার এবং ইয়াসিনের আব্বা রমজান আংকেল আসল আমাদের বাসায়। ইয়াসিনের ছোট বোন খাদিজা পালি গুলি খেয়েছে। ঘরের দেয়াল ভেদ করে গুলি এসে পায়ে ঢুকেছে। ঐ মুহূর্তে হসপিটালে নেওয়া সম্ভব ছিল না, তাই রমজান আংকেল নিজেই ব্লেড দিয়ে উরুর মাংস কেটে এরপর প্লায়ার্স দিয়ে টেনে গুলিটা বের করেছেন। পরে যুদ্ধ থামার পর হসপিটালে নিয়ে গেছেন। হসপিটালে গিয়ে শুনলেন তখন পর্যন্ত দেড়শ লাশ নেওয়া হয়েছে হসপিটালে।

আজকের মতো যুদ্ধ শেষ হয়েছে। গাদ্দাফী বাহিনী যতই দাবি করুক, তারা বিদ্রোহীদের তাড়িয়ে দিয়েছে, আমরা তো দেখেছি তারা তেমন কোন প্রতিরোধই করতে পারেনি। বিদ্রোহীরা এল, দেখল এবং মারল। আজ হয়তো সন্ধ্যা হয়ে যাওয়ায় তারা চলে গেছে। কিন্তু কাল তো আবার আসবে। সিরতের তথাকথিত ২০,০০০ সৈন্যের বূহ্য ভেদ করে একবার যেহেতু তারা ঢুকতে পেরেছিল, আবারও পারবে। কিন্তু কথা হচ্ছে কতদিন এভাবে আসবে আর আক্রমণ করে চলে যাবে? এতোদিন শুধু দোয়া করতাম বিদ্রোহীরা সিরতে আসে না কেন, এসে দখল করে ফেললেই তো শেষ হয়ে যায়। কিন্তু একবেলার এই যুদ্ধ দেখে এখন মনে হচ্ছে বিদ্রোহীরা না এলেই ভালো হতো।

... চলবে ...



দ্বিতীয় পর্ব এখানে - লিবিয়া যুদ্ধে আমি এবং আমাদের নিয়ার ডেথ এক্সপেরিয়েন্স - পর্ব ২
তৃতীয় পর্ব এখানে - লিবিয়া যুদ্ধে আমি এবং আমাদের নিয়ার ডেথ এক্সপেরিয়েন্স - পর্ব ৩




সিরত যুদ্ধের কিছু ছবি -

আরপিজি মারছে একজন বিদ্রোহী
http://desmond.imageshack.us/Himg52/scaled.php?server=52&filename=libya101505.jpg&res=medium

হাইডলার রোড (আমাদের বাসা থাকে পৌনে এক কিমি দূরে) দখল করছে বিদ্রোহীরা
http://i345.photobucket.com/albums/p395/toha_mh/libya_1015_06.jpg

হাইডলার রোড
http://i345.photobucket.com/albums/p395/toha_mh/libya_1015_07.jpg

হাইডলার রোড
http://i345.photobucket.com/albums/p395/toha_mh/libya_1015_08.jpg

হাইডলার রোড
http://i345.photobucket.com/albums/p395/toha_mh/view_1319610680.jpg

হাইডলার রোড
http://i345.photobucket.com/albums/p395/toha_mh/view_1319610560.jpg

হাইডলার রোড
http://i345.photobucket.com/albums/p395/toha_mh/ss-111014-libya-06_grid-9x2.jpg

সিরত দখল করতে আসছে বিদ্রোহীরা
http://i345.photobucket.com/albums/p395/toha_mh/ss-110926-libya-06_grid-6x2.jpg

মিসাইল মারছে বিদ্রোহীরা
http://i345.photobucket.com/albums/p395/toha_mh/ss-111003-libya-sept-001_grid-9x2.jpg

মিসাইল রেডি করছে বিদ্রোহীরা
http://i345.photobucket.com/albums/p395/toha_mh/ss-111007-libya-06_grid-8x2.jpg

মিসাইল মারছে বিদ্রোহীরা
http://i.imgur.com/AZiQZ.jpg

https://www.facebook.com/tohamh
মোজাম্মেল হোসেন ত্বোহা
সিরত - লিবিয়া

Re: লিবিয়া যুদ্ধে আমি এবং আমাদের নিয়ার ডেথ এক্সপেরিয়েন্স

ত্বোহা ভাই, আপনার কথা অনেক মনে পরত আমাদের। আবার ফিরে আসায় শুভেচ্ছা গ্রহন করুন  thumbs_up

লেখাটি LGPL এর অধীনে প্রকাশিত

Re: লিবিয়া যুদ্ধে আমি এবং আমাদের নিয়ার ডেথ এক্সপেরিয়েন্স

কিছুটা পড়লাম বাকিটা কাল পিসিতে বসে পড়ব ইনশাআল্লাহ ।

Re: লিবিয়া যুদ্ধে আমি এবং আমাদের নিয়ার ডেথ এক্সপেরিয়েন্স

পুরা লেখাটা পড়লাম। অনেক ভালো লিখেছেন। মনে হয়েছে লেখার কথা গুলো সামনে হতে দেখছি। আশা করি সামনেও রেগুলার লিখে যাবেন।

আর ধংস স্তুপের ছবি দেখে কষ্ট লাগলো। এতো যুদ্ধ কতে সাধারণ পাবলিকদের কি লাভ তাই বড় প্রশ্ন ?

আর আপনার লেখা-পড়ার বর্তমান অবস্থা কি ?

লেখাটি LGPL এর অধীনে প্রকাশিত

Re: লিবিয়া যুদ্ধে আমি এবং আমাদের নিয়ার ডেথ এক্সপেরিয়েন্স

অনেক ভালো লাগলো আমাদের মাঝে ফিরে আসতে পেরেছেন দেখে । অবস্থা তো দেখি খুবই ভয়ানক ছিলো । surprised

IMDb; Phone: Huawei Y9 (2018); PC: Windows 10 Pro 64-bit

Re: লিবিয়া যুদ্ধে আমি এবং আমাদের নিয়ার ডেথ এক্সপেরিয়েন্স

পড়ালেখার অবস্থা কাহিল। সিরত ইউনিভার্সিটিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমাদের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টে একটা ১০৬ মিমি মিসাইল ঢুকেছে। সব কাগজপত্র গেছে। অবশ্য কম্পিউটারে সব রেকর্ড আছে। তবে আমার এসএসসি, এইচএসসির ট্রান্সক্রিপ্টগুলো সম্ভবত গেছে।

যুদ্ধ শেষ হয়েছে ২০শে অক্টোবর। কিন্তু এরপর থেকে এতোদিন পর্যন্ত শহরে কারেন্ট, পানি, নেটওয়ার্ক কিছুই ছিল না। শহরের রাস্তাগুলোর পীচ দেখা যেত না বুলেটের খোসার কারণে। প্রথম দুই-তিন সপ্তাহ ধরে শুধু রাস্তা পরিষ্কার করার কাজই চলেছে। এখন পানি সব এলাকায় চলে এসেছে। কারেন্টও অধিকাংশ এলাকায় আছে। তবে নেটওয়ার্ক নেই। আমি নেট ব্যবহার করছি ত্রিপলী থেকে।

ভার্সিটি ঝাড়ু দেওয়া শেষ হয়েছে। কিন্তু সবগুলো কাঁচ ভাংগা, প্রায় প্রতিটা ভবনের ওয়ালের কিছু অংশ ধ্বসে পড়া, কারেন্টের তার ছিঁড়ে-টিড়ে একাকার। কয়দিন লাগে ঠিক করতে কে জানে। গত পরশুদিন মাত্র মন্ত্রীসভা গঠিত হল। এখনও অনেককিছু বাকি। তাছাড়া বেনগাজী এবং মিসরাতা প্রধান সরকারের সিরতের উপর কতটুকু সুদৃষ্টি থাকবে বলা মুশকিল। এক সেমিস্টার লস হল। শোনা যাচ্ছে জানুয়ারী থেকে ক্লাস চালু হতে পারে। আসলে কি হবে, কে জানে?

https://www.facebook.com/tohamh
মোজাম্মেল হোসেন ত্বোহা
সিরত - লিবিয়া

Re: লিবিয়া যুদ্ধে আমি এবং আমাদের নিয়ার ডেথ এক্সপেরিয়েন্স

আপনার অক্ষত থাকার কথা জেনে ভাল লাগল। এবং আপনার ভয়াবহ অভিজ্ঞাতার জন্য সমবেদনা।

আমি মিডইস্ট এবং উত্তর আফ্রিকার এই অভ্যুত্থান গুলো ভালভাবে ফলো করিনা। ড্রাইভ করার সময় রেডিওতে মাঝে মধ্যে একটু আধটু শুনি এই যা।
আমরা মানুষ এক অদ্ভুত প্রজাতি। মানুষ যে আসলে কি চায় সেটা বেশীর ভাগ সময়ই আমার বোধগম্য হয় না।

সে যাই হোক আমার একটা প্রশ্নছিল, আপনর লেখা পড়ে মনে হচ্ছে আপনার উত্তর দেয়ার যোগ্যতা আছে।

ধরুন টাইম মেশিনের মাধ্যমে আপনাকে অতীতে নিয়ে যাওয়া হল।
এবং আপনাকে ক্ষমতা দেয়া হল কোন একটা ঘটনা নিয়ন্ত্রনের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ এর  সম্পুর্ন ঘটনা প্রবাহট বদলে ফেলার।
মানে কোন গনঅভ্যুত্থান ঘটবে না, গৃহ যুদ্ধ হবে না।
৩০,০০০ নিহত ৪,০০০ নিখোজ হওয়ার ঘটনা ঘটবে না।
গত ৩০ বছর লিবিয়া যেভাবে চলছিল সেভাবেই চলতে থাকেবে।

প্রশ্ন হল আপনি কি করবেন? আপনকি যুদ্ধটা বন্ধ করবেন?

Re: লিবিয়া যুদ্ধে আমি এবং আমাদের নিয়ার ডেথ এক্সপেরিয়েন্স

মাগো ... ভাই সই সালামতে আইছেন এটাই বড় ।






.

মুইছা দিলাম। আমি ভীত !!!

লেখাটি CC by 3.0 এর অধীনে প্রকাশিত

Re: লিবিয়া যুদ্ধে আমি এবং আমাদের নিয়ার ডেথ এক্সপেরিয়েন্স

সর্বশক্তিমান আপনাকে রক্ষা করেছেন। আচ্ছা আমার একটা প্রশ্ন হলো, বিদ্রোহীদের কাছে হেভী আর্টিলারী আসলো কিভাবে? সেনাবাহিনীর একাংশ কি বিদ্রোহ করেছিলো? কারণ বাইরের বাহিনী (আলকায়েদা, আরব আমিরাত) আমার হিসেবে কোনভাবেই বিদ্রোহী হতে পারে না। এরাতো হানাদার। কাহিনীটা কি?

রাবনে বানাদি ভুড়ি :-(

১০

Re: লিবিয়া যুদ্ধে আমি এবং আমাদের নিয়ার ডেথ এক্সপেরিয়েন্স

যুদ্ধের ভয়াবহতা যে দেখেছে সেই বুঝতে পারে তার মর্ম কি? আপনি সেরকম মানুষগুলোর একজন। মহান ও সর্বশক্তিমান আল্লাহ, আপনি ও আপনার পরিবারকে নিরাপদে রেখেছে সেজন্য আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া। আলহামদুলিল্লাহ। আপনার ভবিষ্যত পর্বগুলোর অপেক্ষায় রইলাম।

১১

Re: লিবিয়া যুদ্ধে আমি এবং আমাদের নিয়ার ডেথ এক্সপেরিয়েন্স

আসলে কিছু কিছু ঘটনা ঘটে যার উপর কারো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। এই যুদ্ধ ইচ্ছে করলে গাদ্দাফী খুব সহজেই থামিয়ে দিতে পারতেন। যুদ্ধের আগে লিবিয়াতে গাদ্দাফীর যথেষ্ট ঈর্ষণীয় জনপ্রিয়তা ছিল। প্রথম যখন বেনগাজীতে আন্দোলন শুরু হয়, তখন গাদ্দাফী যদি নিজে সেখানে উপস্থিত হয়ে বলত, আমি ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে নিরপেক্ষভাবে নির্বাচন দিচ্ছি - তোমরা থাম। আমি শতভাগ নিশ্চিত, জনগণ তাহলে গাদ্দাফীকেই আবার নির্বাচিত করত। কিন্তু গাদ্দাফী সেটা করেন নি। তিনি সম্ভবত এটাকে অপমানজনক মনে করেছিলেন। তিনি হয়তো মনে করেছিলেন কিছু মানুষকে মেরে ফেললে আর বাকিদেরকে টাকার লোভ দেখালেই আন্দোলন থেমে যাবে। কিন্তু ফলাফল হিতে-বিপরীত হয়েছে। তিনি যত নিপীড়ন করেছেন, মানুষ তত তার বিরুদ্ধে গেছে।

আপনি দেখবেন ১৫ ফেব্রুয়ারি বেনগাজির মিছিলে মাত্র কয়েকশ মানুষ ছিল, তাও খালি হাতে। কিন্তু তাদের উপর গুলি করার পর ১৭ ফেব্রুয়ারি আল-বেইদাতে যে মিছিল হল সেটা আরও বড় ছিল, কয়েক হাজার মানুষ। এরপর মিসরাতায় প্রথমে মাত্র হাজার দেড়েক মানুষ খালি হাতে বের হয়েছিল। কিন্তু তাদের উপর গুলি করার পর পুরো মিসরাতা গাদ্দাফীর বিপক্ষে চলে যায়। ১৭ এবং ১৮ ফেব্রুয়ারি বেনগাজীর মানুষের উপর ভাড়াটে আফ্রিকানদের লেলিয়ে দেওয়ার পরেই বেনগাজীর মানুষ অস্ত্র হাতে তুলে নেয়। তখনও কিন্তু আজদাবিয়ার মানুষ গাদ্দাফীর বিপক্ষে যায় নি। কিন্তু প্লেন থেকে বোমা হামলা করার পর তারাও বিপক্ষে চলে যায়।

এখন গাদ্দাফী ইচ্ছে করলে একেবারে প্রথম দিনেই মানুষ অস্ত্র হাতে নেওয়ার আগেই ব্যাপারটার নিষ্পত্তি করে ফেলতে পারতেন। কিন্তু প্রথমে যেহেতু করেননি, মানুষ অস্ত্র হাতে নিয়ে ফেলার পর গাদ্দাফীরও আর তেমন কোন বিকল্প ছিল না।


কথা হচ্ছে মানুষ অস্ত্র পেল কোথা থেকে? ১৯শে ফেব্রুয়ারি বেনগাজীতে যে মিছিলটা হওয়ার কথা ছিল, সে ব্যাপারে গোয়েন্দা প্রধান আব্দুল্লাহ সেনুসী বলেছিলেন যদি মিছিল হয়, যদি মানুষ মৌন মিছিলও করে, যদি হাত পিছে বেঁধেও মিছিল করে তবুও গুলি করা হবে। মিছিল করা নিষিদ্ধ - এটাই হচ্ছে আইন। মিছিলের উপর গুলি করার নির্দের দেওয়ার পরপরই বেনগাজীর সেনাবাহিনীর একটা বড় অংশ পদত্যাগ করে এবং মাত্র তিনঘন্টার যুদ্ধে তারা আর্মি হেড কোয়ার্টার দখল করে নেয়। সেদিন থেকেই মূলত বেনগাজী স্বাধীন। ক্যান্টমেন্টের সকল অস্ত্র বেনগাজীর মানুষের হাতে। অস্ত্র চালাতে কারো কোন সমস্যা নেই কারণ এদেশে সামরিক ট্রেনিং সবার জন্য বাধ্যতামূলক।

আল ক্বায়েদার কথাটা পুরাই ফালতু। গাদ্দাফী সব দোষ ক্বায়েদার ঘাড়ে চাপিয়ে পশ্চিমাদেরকে নিজের পক্ষে রাখতে চেয়েছিলেন। তবে আল-ক্বায়েদা না থাকলেও ইসলামপন্থী দল গুলো এই বিদ্রোহে একটা বড় ভূমিকা নিয়েছে।

https://www.facebook.com/tohamh
মোজাম্মেল হোসেন ত্বোহা
সিরত - লিবিয়া

১২

Re: লিবিয়া যুদ্ধে আমি এবং আমাদের নিয়ার ডেথ এক্সপেরিয়েন্স

আল্লাহ আপনাকে বাচিয়েছে। আপনি যুদ্ধ শুরুর সময় চলে আসেন নি কেন?
অনেক অজানা তথ্য জানা যাবে আপনার লিখায়। আরো লিখুন। মিডিয়ার প্রপাগান্ডায় ত আসল খবর কিছুই বোঝা যায় না।

I am not far, but alone. Like a pair of rail tracks in winter morning.............

১৩

Re: লিবিয়া যুদ্ধে আমি এবং আমাদের নিয়ার ডেথ এক্সপেরিয়েন্স

তোমার লেখা পুরোটা না পড়েই আগে মন্তব্য করছি। তুমি যে সহি-সালামতে আছ, তাতেই আমার খুব ভালো লাগছে। খুবই মনে হচ্ছিল তোমাদের কথা। তিথী কেমন আছে?

আল্লাহর অশেষ রহমত। অনেক কথা বলতে কমেন্ট করতে গিয়ে দেখি কোন কথাই আর আসছে না। চোখ থেকে পানি চলে আসছে...।

তুমি কিন্তু খুব ভালো লেখো। আর অনেক বুদ্ধিমান। তুমি চাইলেই লিখতে পারবে আমি সেটা জানি। আমার বর তোমার লেখার ভূয়সী প্রশংসা করেছে। আরও অনেকেই করেছে। তোমার সাই-ফাই, রিভিউ ইত্যাদির। তোমার লেখা থেকে যেমন আমরা জানতে পারব ঘটনা প্রবাহ সম্পর্কে তেমনি অনুভব করতে পারব আরও বেশি, আর অনেক কিছুই উঠে আসবে। তুমি লিখে যাও যতটুকু পারো...।

আল্লাহুম্মা ইন্নাকা য়াফু্‌ঊন - (হে আল্লাহ আপনি ক্ষমাশীল)
তুহীব্বুল য়াফওয়া - (আপনি মাফ করতে ভালবাসেন)
ফা' ফু আন্নী - (আমাকে মাফ করে দিন।)

১৪

Re: লিবিয়া যুদ্ধে আমি এবং আমাদের নিয়ার ডেথ এক্সপেরিয়েন্স

ভাই পুরা যুদ্ধ যেন চোখের সামনে দেখতে পেলাম।সুস্থ্য থাকুন,ভালো ও নিরাপদ থাকুন এই কামনা করি।

seeming is being

১৫

Re: লিবিয়া যুদ্ধে আমি এবং আমাদের নিয়ার ডেথ এক্সপেরিয়েন্স

ধন্যবাদ মুন আপু। তিথি ভালোই আছে। পরবর্তী পর্বগুলোতে বিস্তারিত লেখার চেষ্টার করব।

https://www.facebook.com/tohamh
মোজাম্মেল হোসেন ত্বোহা
সিরত - লিবিয়া

১৬

Re: লিবিয়া যুদ্ধে আমি এবং আমাদের নিয়ার ডেথ এক্সপেরিয়েন্স

পুরা লেখাগুলো ভাল করে পড়তে পারিনি। আগামী কাল পড়ে নিবো।

আল্লাহ যে আপনাকে আবার আমাদের মাঝে উপস্থিত করেছে এটাই আমার কাছে সব বড় খবর।
আল্লাহ সকলকে নিরাপদ এবং সুস্থ রাখুক।

রক্তের গ্রুপ AB+

microqatar'এর ওয়েবসাইট

লেখাটি GPL v3 এর অধীনে প্রকাশিত

১৭

Re: লিবিয়া যুদ্ধে আমি এবং আমাদের নিয়ার ডেথ এক্সপেরিয়েন্স

অনেক বড় লেখা দেখে একটু সময় নিয়ে মনোযোগ দিয়ে পরলাম। যুদ্ধ আমি দেখি নি, তবে আপনার লেখাটা পরে এর ভয়াবহতা উপলদ্ধি করছি। সবথেকে কষ্ট লেগেছে যে লাইনগুলো পড়ে-

ত্বোহা লিখেছেন:

ইয়াসিনের ছোট বোন খাদিজা পালি গুলি খেয়েছে। ঘরের দেয়াল ভেদ করে গুলি এসে পায়ে ঢুকেছে। ঐ মুহূর্তে হসপিটালে নেওয়া সম্ভব ছিল না, তাই রমজান আংকেল নিজেই ব্লেড দিয়ে উরুর মাংস কেটে এরপর প্লায়ার্স দিয়ে টেনে গুলিটা বের করেছেন।

একজন প্রিয় মানুষের পা নিজ হাতে কেটে প্লাস দিয়ে গুলি বাহির করা যে কি রকম একটা ভয়ংকল দৃশ্য হতে পারে তা ভেবে আমার শরীরের সকল লোম দাড়িয়ে উঠছে। আপনি সুস্থ আছেন এটা যেনে ভালো লাগছে।

আমাকে কোথাও পাবেন না।

১৮

Re: লিবিয়া যুদ্ধে আমি এবং আমাদের নিয়ার ডেথ এক্সপেরিয়েন্স

ওমাইগড!!! ছবিগুলো কি আপনি তুলেছেন ভাইয়া?

Rhythm - Motivation Myself Psychedelic Thoughts

লেখাটি CC by 3.0 এর অধীনে প্রকাশিত

১৯

Re: লিবিয়া যুদ্ধে আমি এবং আমাদের নিয়ার ডেথ এক্সপেরিয়েন্স

নাহ! নিজের জান বাঁচাব, না ছবি তুলব? তাছাড়া গাদ্দাফীর সৈন্যদের সামনে ছবি তোলার মত দুঃসাহস আমার নেই। তাছাড়া দীর্ঘদিন কারেন্ট না থাকাতে মোবাইলের চার্জও ছিল না। যুদ্ধের পরে অবশ্য কিছু ছবি তুলেছিলাম কিন্তু মোবাইলটা চুরি হয়ে গেছে। এইসব ছবি নেট থেকে নেওয়া।

https://www.facebook.com/tohamh
মোজাম্মেল হোসেন ত্বোহা
সিরত - লিবিয়া

২০

Re: লিবিয়া যুদ্ধে আমি এবং আমাদের নিয়ার ডেথ এক্সপেরিয়েন্স

surprised surprised surprised আপনার লেখা কাল বাসায় বসেই পড়েছি.........বিশ্বাস করুন আর নাই করুন...........আপনার আর তিথীর কথা যুদ্ধের সময় প্রায়ই মনে পড়তো........বিশেষ করে সব বাংলাদেশি যখন দেশে ফিরতে শুরু করেছে...........। আমি কনফাম ছিলাম এ দলে আপনারাও আছেন।
কিন্তু কি বুদ্ধিতে থেকে গেলেন আল্লাহ মালুম  surprised surprised...........যদিও এতোদিনে আপনাদের অনলাইন এক্টিভিটি না দেখে আরো কনফিউজড হয়ে গিয়েছিলাম। যদি এটা কনফার্ম হতে পারতাম এতো ভয়াবহ যুদ্ধের মধ্যে আপনারা সিরতেই আছেন............ নিশ্চিতভাবেই এতোদিনে অনলাইনে আপনাদের শেষকৃত্য করে ফেলতাম।

টিপসই দিবার চাই....স্বাক্ষর দিতে পারিনা......