সর্বশেষ সম্পাদনা করেছেন ইলিয়াস (২৯-১০-২০১১ ০৯:১৩)

টপিকঃ সীরাতুন্নবী (সাঃ)-২৭ (যুলুম নির্যাতন পর্ব-১)

সীরাতুন্নবী (সাঃ)-২৫

যুলুম নির্যাতন

নবুয়তের চতুর্থ বছরে ইসলামের প্রকাশ্য দাওয়াত বন্ধ করতে পৌত্তলিকরা যেসব কাজ করছে তার বিবরণ ইতিপূর্বে বর্ণনা করা হয়েছে। এসব অপতৎপরতা পৌত্তলিকরা পর্যায়ক্রমে এবং ধীরে ধীরে চালিয়েছে। সপ্তাহের পর সপ্তাহ, এমনকি মাসে পর মাস অতিরিক্ত কিছু করেনি এবং যুলুম অত্যাচারের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়িও করেনি। কিন্তু তারা যখন লক্ষ্য করলো যে, তাদের তৎপরতা ইসলামের দাওয়াতের পথে বাধা সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হচ্ছে তখন তারা পুনরায় সমবেত হয়ে পঁচিশজন কাফেরের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করলো। এরা ছিলো কোরায়শ বংশের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি। এ কমিটির প্রধান ছিলো রসূলুল্লাহ (সাঃ)’র চাচা। পারস্পরিক পরামর্শ এবং চিন্তা-ভাবনার পর কমিটি রসূলুল্লাহ (সাঃ) এবং সাহাবাদের বিরুদ্ধে একটি সিন্ধান্তমূলক প্রস্তাব অনুমোদন করলো। তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলো যে, ইসলামের বিরোধিতা করতে গিয়ে রসূলুল্লাহ (সাঃ) কষ্ট দেয়া এবং ইসলাম গ্রহণকারীদের নির্যাতন করার ব্যাপারে কোন প্রকার শিথিলতার পরিচয় দেয়া হবে না।
পোত্তলিকরা এ প্রস্তাব গ্রহণ করার পর সর্বাত্মকভাবে তা বাস্তবায়নের দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করলো। মুসলমান বিশেষত দুর্বল মুসলামানদের ক্ষেত্রে পৌত্তলিকদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন সহজ ছিলো। কিন্তু রসূলুল্লাহ (সাঃ) এর ক্ষেত্রে ছিলো কঠিন। কেননা তিনি ছিলেন অনন্য ব্যক্তিত্বের অধিকারী এক অসাধারণ মানুষ। সবাই তাকে সম্মান চোখে দেখতো। তাঁর কাছে সম্মানজনকভাবেই যাওয়া সহজ এবং স্বাভাবিক ছিলো। তাঁর বিরুদ্ধে অবমাননাকর এবং ঘৃণ্য তৎপরতা বর্বর এবং নিবোর্ধদের জন্যোই ছিলো মানানসই। ব্যক্তিত্বের এ স্বাতন্ত্র্য এবং প্রখরতা ছাড়া আবু তালেবের সাহায্যও তিনি পাচ্ছিলেন। মক্কায় আবু তালেবের প্রভাব ছিলো অনতিক্রম্য। ব্যক্তিগত বা সম্মিলিতভাবে এ প্রভাব অতিক্রম করা এবং তাঁর সাথে কৃত অঙ্গীকার ভঙ্গ করার সহাস ছিলো না। এ পরিস্থিতিতে কোরায়শরা নিদারুন মর্মপীড়ার মধ্যে দিন যাপন করছিলো। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, যে দ্বীনের প্রচার প্রসার তাদের ধর্মীয় আধিপত্য এবং পার্থিব নেতৃত্ব কর্তৃত্বের শেকড় কেটে দিচ্ছিলো, সে দ্বীনের ব্যাপারে আর কতোকাল তারা ধৈর্যধারণ করবে?পরিশেষে পোত্তলিকরা আবু লাহাবের নেতৃত্ব রসূলুল্লাহ (সাঃ) ওপর অত্যাচার নির্যাতন চালাতে শুরু করলো। প্রকৃত পক্ষে প্রিয় নবীর সাথে আবু লাহাবের শক্রতার মূলক আচরণ আগে থেকেই ছিলো। কোরায়শরা আল্লাহর রাসূলের ওপর নির্যাতনের কথা চিন্তা করারও আগে লাহাব চিন্তা করারও আগে আবু লাহাব চিন্তা করেছিলো। বনি হাশেমের মজলিস এবং সাফা পাহাড়ের পাদদেশে এই দুর্বৃত্ত যা বলেছিলো, ইতিপূর্বে সেসব কথা কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কোন কোন বর্ণনায় উল্লেখ করেছে যে, সাফা পাহাড়ের পাদদেশে দ্বীনের দাওয়াত দেয়ার পর নবী রসূলুল্লাহ (সাঃ) কে মারার জন্যে আবু লাহাব একটি পাথরও তুলেছিলো।
রসূলুল্লাহ (সাঃ) নবুওয়াত পাওয়ার আগে আবু লাহাব তার দুই পুত্র ওতবা এবং ওতাইবাকে রসূলুল্লাহ (সাঃ)’র দুই কন্যা রোকাইয়া এবং উম্মে কুলসুমের সাথে বিয়ে দিয়েছিলো। কিন্তু রসূলুল্লাহ (সাঃ)’র নবুয়াত পাওয়ার পর এবং দ্বীনের দাওয়াত প্রচারের শুরুতে আবু লাহাব নবীর দুই কন্যাকেই তালাক দিতে তার দুই পুত্রকে বাধ্য করেছিলো।
রসূলুল্লাহ (সাঃ)’র দ্বিতীয় পুত্র আবদুল্লাহর ইন্তেকালে পর আবু লাহাব এতো খুশি হয়েছিলো যে, তার বন্ধুদের কাছে দৌড়ে গিয়ে গদগদ করে বলেছিলো যে, মোহাম্মাদ অপুত্রক হয়ে গেছে।
ইতিপূর্বে এটাও উল্লেখ করা হয়েছে যে, হজ্জ মৌসুমে আবু লাহাব রসূলুল্লাহ (সাঃ)কে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করতে বাজার এবং বিভিন্ন জনসমাবেশে তাঁর পেছনে লগে থাকতো। তারেক ইবনে আবদুল্লাহ মুহাবেরীর বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, আবু লাহাব রসূলুল্লাহ (সাঃ)’র কথা মিথ্যা প্রমাণ করতেই শুধু ব্যস্ত থাকত না বরং তাঁকে পাথরও নিক্ষেপ করতো। এতে তার পায়ের গোড়ালি রক্তাক্ত হয়ে যেতো।

আবু লাহাবে স্ত্রী উম্মে জামিলের প্রকৃত নাম ছিলো আবওয়া। সে ছিলো হারর ইবনে উমাইয়ার কন্যা এবং আবু সুফিয়ানের বোন। রসূলুল্লাহ (সাঃ)’র প্রতি শক্রতার ক্ষেত্রে সে তার স্বামীর চেয়ে কোন অংশে কম ছিলো না। রসূলুল্লাহ (সাঃ) যে পথে চলাফেরা করেতেন, ঐ পথে এবং তাঁর দরজায় সে কাঁটা বিছিয়ে রাখতো। অত্যন্ত অশ্লীল ভাষী এবং ঝগড়াটে ছিলো এ নোংরা মহিলা। রসূলুল্লাহ (সাঃ) কে গালাগাল দেয়া এবং কুটনামি, নানা ছুতার ঝগড়া, ফেতনা-ফাসাদ সৃষ্টি এবং সংঘাতময় পরিস্থিতির সৃষ্টি করা ছিলো তার কাজ। এ কারণে কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “এবং তার স্ত্রীও সে ইন্ধন বহন করে”।
আবু লাহাবের স্ত্রী যখন জানতে পারলো যে, তার এবং স্বামীর নিন্দা করে আয়াত নাযিল হয়েছে, তখন সে রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে খুঁজে খুঁজে কাবা শরীফের কাছে এলো। প্রিয় নবী সে সময় কাবাঘরের পাশে অবস্থান করেছিলেন। তাঁর সাথে আবু বকর সিদ্দিক(রা) ও ছিলেন। আবু লাহাবের স্ত্রীর হাতে ছিলো এক মুঠি পাথর। আল্লাহর রসূলের কাছাকাছি গিয়ে পৌঁছুলে আল্লাহ তায়ালা তার দৃষ্টি কেড়ে নেন, সে আল্লাহর রসূলকে দেখতে পায়নি, হযরত আবু বকর দেখতে পাচ্ছিলো। হযরত আবু বকরের সামনে গিয়ে সে জিজ্ঞাসা করলো যে, তোমার সাথী কথায়? আমি শুনছি তিনি আমার নামে নিন্দা করেছেন। আল্লাহর শপথ, যদি আমি তাকে পেয়ে যাই তার মুখে এ পাথর ছুড়ে মারব। দেখো আল্লাহর শপথ, আমিও একজন কবি। এরপর সে এ কবিতা শোনালো, “মোযাম্মাম আছাইনা ওয়া আমরাহু আবাইনা ওয়া দ্বানাহু কালাইনা”। অর্থাৎ মোযাম্মালের অবাধ্যতা করেছি, তার কাজকে সমর্থন করিনি এবং তার দ্বীনকে ঘৃণা অবজ্ঞাভরে প্রত্যাখান করেছি। এরপর সে চলে গেলো।
আবু বকর সিদ্দিক (রা) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল সে কি আপনাকে দেখতে পায়নি? তিনি বললেন, না দেখতে পায়নি, আল্লাহ তায়ালা আমার ব্যাপারে তার দৃষ্টি কেড়ে নিয়েছিলেন।

আবু বকর রাযযারও এ ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তিনি সংযোজন করেছেন যে, আবু লাহাবের স্ত্রী হযরত আবু বকরের সামনে গিয়ে একথাও বলেছিলো যে, আবু বকর , আপনার সঙ্গী আমার নিন্দা করেছেন। আবু বকর বললেন, এ কথা ঠিক নয়। এই ঘরের প্রভুর শপথ, তিনি কবিতা রচনা করেন না এবং কবিতা মুখেও উচ্চারণ করেন না। আবু লাহাবের স্ত্রী বলল আপনি ঠিকই বলেছেন।

আবু লাহাব ছিল রাসুলে মাকবুল (সাঃ)’র প্রতিবেশী এবং চাচা। তাঁর ঘর রাসুলে মাকবুল (সাঃ)’র ঘরের কাছাকাছি ছিল। অন্য প্রতিবেশীরাও রাসুলে মাকবুল (সাঃ)’কে কষ্ট দিতো। ইবনে ইসহাক বলেন, যেসব লোক রাসুলে মাকবুল (সাঃ)কে ঘরের মধ্যে কষ্ট দিতো তাদের নাম হলো আবু লাহাব, হাকাম ইবনে আবুল আস ইবনে উমাইয়া, উকবা ইবেন মুঈত, আদি ইবনে হামারা, ছাকাফি ইবনুল আছদা হুজ্জালি প্রমুখ। এরা সবাই ছিল তাঁর প্রতিবেশী। এদের মধ্যে হাকাম ইবনে আবুল আস ব্যতিত অন্য কেউ মুসলমান হয়নি। এদের কষ্ট দেয়ার পদ্ধতি ছিল এরকম যে, যখন রাসুলে মাকবুল (সাঃ) নামায আদায় করতেন তখন এদের কেউ বকরীর নাড়িভুড়ি এমনভাবে ছুড়ে মারতো যে সেসব গিয়ে তাঁর গাঁয়ে পরতো। আবার উনুনের উপর হাড়ি চাপানো হলে বকরীর নাড়িভুড়ি এমনভাবে নিক্ষেপ করতো যে সেসব গিয়ে সেই হাড়িতে পরতো। রাসুলে মাকবুল (সাঃ) পরে নিরাপদে নামায আদায় করার জন্য ঘরের ভিতর একটি জায়গা করে নিয়েছিলেন।

রাসুল (সাঃ)’র উপর এসব নাড়িভুড়ি নিক্ষেপের পর তিনি সেগুলো একটা কাঠির মাথায় নিয়ে দরজায় দাড়িয়ে বলতেন, হে বনী আবদে মন্নাফ, এটা কেমন ধরনের প্রতিবেশী সুলভ আচরণ ? এরপর সেসব নাড়িভুড়ি ফেলে দিতেন।

Re: সীরাতুন্নবী (সাঃ)-২৭ (যুলুম নির্যাতন পর্ব-১)

এই ঘটনাবলী আগে শুনে থাকলেও এতোটা বিস্তারিত জানা ছিল না। আপনার লেখায় অনেক কিছু বিস্তারিত জানা হচ্ছে। ইলিয়াস ভাইকে অসংখ্য ধন্যবাদ। পরবর্তী পর্বের অপেক্ষায় থাকলাম।

Re: সীরাতুন্নবী (সাঃ)-২৭ (যুলুম নির্যাতন পর্ব-১)

খুব ভাল লেগেছে  smile

Re: সীরাতুন্নবী (সাঃ)-২৭ (যুলুম নির্যাতন পর্ব-১)

অনেক কিছু জানতে পারলাম। ইলিয়াস ভাইকে ধন্যবাদ।  thumbs_up

আল্লাহ এক, অদ্বিতীয় ও সর্ব শক্তিমান।

Re: সীরাতুন্নবী (সাঃ)-২৭ (যুলুম নির্যাতন পর্ব-১)

কমেন্ট করার জন্য ধন্যবাদ সবাইকে ।

Re: সীরাতুন্নবী (সাঃ)-২৭ (যুলুম নির্যাতন পর্ব-১)

অনেক কিছু জানতে পারলাম। hug ধন্যবাদ  hug

۞ بِسْمِ اللهِ الْرَّحْمَنِ الْرَّحِيمِ •۞
۞ قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ ۞ اللَّهُ الصَّمَدُ ۞ لَمْ * • ۞
۞ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ ۞ وَلَمْ يَكُن لَّهُ كُفُوًا أَحَدٌ * • ۞