টপিকঃ অর্থনীতি চলে নিজস্ব নিয়মে

সূত্র যুগান্তর ( http://jugantor.com/online/news.php?id=101426&sys=3) মু ন তা সী র মা মু ন
মনে হচ্ছে সরকার অর্থনীতির বিষয়ে খুবই উদ্বিগ্ন। ট্র-থ কমিশন ধরনের কিছু করার ঘোষণা দিয়েছে। গত কয়েক মাস ব্যবসায়ীদের কী কী ছাড় দেয়া যায় সে বিষয়ে যেমন আলোচনা হচ্ছে, তেমনি তাদের জামিন আপিল বিভাগে আটকে যা”েছ, নতুনভাবে শীর্ষ ব্যবসায়ীদের দুদক হিসাবের নোটিশ পাঠিয়েছে। ফলে সিগনালটা সবুজ না হলুদ না লাল ব্যবসায়ীরা তা বুঝে উঠতে পারছেন না। বুদ্ধিজীবী, মিডিয়া ও সরকারি কর্মকর্তারা মাঝে মাঝে পাশ্চাত্য থেকে কিছু শব্দ ধার করে কথা বলা শুর“ করেন। ভাবটা বিরাট এক অবদান রাখছেন। যদিও এসব শব্দের পরিপ্রেক্ষিত আলাদা। ট্র-থ কমিশনের পরিপ্রেক্ষিতে ড. আকবর আলি খান বলেছেন, ‘তাহলে কি এক দেশে দুই আইন হবে? রাজনীতিবিদদের জন্য এক ধরনের আইন, ব্যবসায়ীদের জন্য আরেক ধরনের, বেসামরিক-সামরিক আমলাদের জন্য অন্য ধরনের!’ ব্রিটিশ দূত আনোয়ার চৌধুরী যাই বলুন না কেন তার কর্তাদের মš-ব্য এর বিপরীত। ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দফতরের কর্মকর্তা বলছেন, ব্যবসায়ীদের জন্য আলাদা আইন করা যাবে না। এখন দেখা যাক, আইন উপদেষ্টা ট্র-থ কমিশন করতে পারেন কিনা। আদালতের অবশ্য এক আইনে চলার কথা; কিš' তা চলবে কিনা বোঝা যা”েছ না। ব্যারিস্টার রফিকুল হক এ বিষয়ে যা বলছেন তা আমরা বলতে পারব না কারণ তাহলে বলা হবে আদালত অবমাননা হচ্ছে। যাদের ক্ষমতা আছে তারা বলতে পারেন। দুঃখের কথা কী জানেন, আদালতের প্রসঙ্গ এলে এখন সাধারণ মানুষ পাকিস্তানের বিচারক ও আইনজীবীদের উদাহরণ টেনে আনেন। অথচ ওইরকম উদাহরণ টানার কথা বাংলাদেশ থেকে, যে দেশ ঔপনিবেশিক পাকিস্তানের বির“দ্ধে লড়াই করে স্বাধীন হয়েছিল। কলোনির মনোভাব বাঙালিদের মধ্যে থাকা উচিত ছিল না।
স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে যে, এখন যত কোরামিনই দেয়া হোক, অর্থনীতি চাঙ্গা করা মুশকিল। আসলে সরকার বোধ হয় চেয়েছিল মুক্তবাজার অর্থনীতি থাকুক, কিš' অর্থনীতি চলবে তাদের নির্দেশে। অনেকটা কমান্ড অর্থনীতি বা হুকুমের অর্থনীতির মতো আর কী? কিন্ত' কমান্ডে সব চললেও অর্থনীতি চলে না। এর উদাহরণ সমাজবাদী দেশগুলো। গত ৫০ বছরে উপমহাদেশের ইতিহাসে দেখা গেছে ডাণ্ডা দিয়ে বিদ্যমান প্রতিষ্ঠান ভাঙতে গেলে বা ভাঙলে নিজের প্রতিষ্ঠান ও সামগ্রিকভাবে দেশের ক্ষতি-ই হয়।
যেহেতু আমি অর্থনীতিবিদ নই, তাই ইতিহাসের আলোকে গত ৩৫ বছরের শাসনে অর্থনৈতিক ইতিহাসটি তুলে ধরতে চাই। কারণ, ওই যে বলে অতীতের অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতের পাথেয় হতে পারে।
বাংলাদেশের রাজনীতি মূলত দুটি ধারায় বিভক্ত। একটি ধারা বিএনপি বা ডানপš’ী ও চরম ডানপš’ী দলসমূহ, অন্যটি আওয়ামী লীগ বা মধ্যপš’ী ও মৃদু বামধারার। প্রথমটি ঔপনিবেশিক, প্রগতিবিরোধী, রক্ষণশীল বা সাম্প্রদায়িক ধারা, যা সাধারণ মানুষের স্বার্থে কাজ করে না। এ ধারার যারা পৃষ্ঠপোষক বা সমর্থক তাদের স্বার্থেই কাজ করা হয়। তবে সাধারণ মানুষ যারা এ ধারার সমর্থক তারা আবার এ ধারা থেকে অর্থনৈতিক কোন সুবিধা পায় না। সুবিধা পায় একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী বা চক্র। এর বিপরীত ধারার নেতৃত্ব মধ্যবিত্ত বা এলিট দিলেও, সাধারণ মানুষ এক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সুবিধাটা পায় বেশি।
পাকিস্তানি শাসনের সময় অর্থনৈতিক সুবিধা পেয়েছে পশ্চিম পাকিস্তানের সামস্তগোষ্ঠী, উচ্চপদস্থ’ আমলা, ব্যবসায়ীরা। বলাই হতো, পাকিস্তান চালাচ্ছে ২২ পরিবার। বাঙালির আন্দোলনটাও ছিল তার বির“দ্ধে। বাংলাদেশ এখন পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে গেছে। কিন্ত' পাকিস্তানে শাসক এখনও সামরিক বাহিনী। মাঝখানে ‘র“টি কাপড়া মকান’ স্লোগান নিয়ে ভুট্টো এসেছিলেন; কিš' খুব সুবিধা করতে পারেননি। পাকিস্তান এখন প্রায় নিঃস্ব একটি রাষ্ট্র। মানুষ গরিব থেকে গবিরতর হয়েছে।
অন্যদিকে ভারতে কেন্দ্রে কংগ্রেস এবং বিভিন্ন রাজ্যে কংগ্রেস/বামপš’ার সমর্থনে কংগ্রেস/কমিউনিস্টরা শাসন করেছে। তারা এলিট বা শিল্পপতিদের স্বার্থ দেখে বটে; কিš' এজেন্ডা থেকে সাধারণ মানুষ বাদ যায়নি। দারিদ্র্য দূর হয়নি ভারত থেকে; কিš' দারিদ্র্যের যাতনা থেকে বড় সংখ্যক মানুষ মুক্তি পাচ্ছে। কংগ্রেস ভারতকে শিল্পে স্বনির্ভর শুধু নয়, আÍমর্যাদাসম্পন্ন একটি জাতি হিসেবে গড়ে তুলতে পেরেছে। বিপরীতে অন্য ধারা এসে শাসন ব্যবস্থা ¯স্থিতিশীল করতে পারেনি, সাধারণের অর্থনৈতিক চাহিদাও মেটাতে পারেনি। বিজেপির পরাজয় এর উদাহরণ।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশ ছিল একেবারে বিধ্ব¯-। বঙ্গবন্ধুর পুরো সময়টাই কেটেছে যুদ্ধবিধ্ব¯- দেশে ন্যূনতম অবকাঠামো গড়ে তোলা ও সাধারণ মানুষের খাদ্যের বন্দোব¯- করার কাজে, যেটি অšি-মে যুক্তরাষ্ট্রের কারণে সম্ভব হয়নি। কিš' মূল বিষয় হল সংবিধান থেকে শুর“ করে বাজেটÑ সবকিছু নিবেদিত ছিল সাধারণ মানুষের জন্য। এমনকি বিশ্বব্যাংকের ডিকটাট মানতেও রাজি ছিল না বাংলাদেশ। শেখ মুজিব বলেছিলেন, ‘ফান্ডামেন্টালি আমরা একটা শোষণহীন সমাজ গড়তে চাই। আমরা একটা সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি করতে চাই।’ দেশের পরি¯ি’তি ১৯৭২ সালে কী দাঁড়িয়েছিল তার দু’একটি উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। ১৯৭১ সালে চাল ছিল প্রতি মণ ৩৪.৬৩, ১৯৭২ সালে ৯৩.৭৫। এ অব¯’ায় দেশের ভার গ্রহণ করেও তিনি চেষ্টা করছিলেন শাšি-, শৃংখলা ফিরিয়ে আনতে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কারণে ১৯৭৪ সালে দুর্ভিক্ষ হলেও ১৯৭৫-এর দিকে শৃংখলা ফিরে আসছিল। শেখ মুজিব ১৯৭৪ সালে ‘দ্বিতীয় বিপ্লব’ কর্মসূচি গ্রহণ করার পর পরি¯ি’তি নিয়ন্ত্রণে আসে। অর্থনীতির ক্ষেত্রে ¯ি’তিশীলতার লক্ষণ ফুটে ওঠে। চালের দাম ৮ টাকা থেকে সাড়ে ৫ টাকায় নেমে আসে। ঢাকা শহরে মধ্যবিত্তের ব্যয় সূচক ৪৫৮.৫ (জানুয়ারি) থেকে ৪১৬.৯ (এপ্রিলে) এবং খাদ্যমূল্য সূচক একই সময়ে ৪৫৯.০ থেকে ৪৪৬.৩ হ্রাস পায়। আগস্ট মাসে অব¯’ার আরও উন্নতি হয় ভালো আবহাওয়া ও ভালো ফসল হওয়ার কারণে। দ্রব্যমূল্য নামতে থাকে। ১ সেপ্টেম্বর থেকে নতুন প্রশাসনিক ব্যব¯’া শুর“ হওয়ার কথা; কিš' তার আগেই ১৫ আগস্ট সপরিবারে নিহত হন শেখ মুজিব।
জিয়াউর রহমান ক্ষমতা সংহত করার জন্য যখন দল গঠন করেন তখন তার সমর্থকদের প্রচুর অবৈধ অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা দেন। বলা হয়ে থাকে, তার আমলে দুর্নীতি যে পর্যায়ে পৌঁছেছিল তার আগে এ ভূখণ্ডে তা দেখা যায়নি। বিভিন্ন শিল্প-কারখানা, ব্যবসার নামে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো জিয়া সমর্থকদের ঋণ দিতে থাকে। তারা তা গ্রহণ করে আর ফেরত দেয়নি [অধিকাংশ]। এভাবে বাংলাদেশে ‘ঋণখেলাপি’ নামে শক্তিশালী একটি চক্রের সৃষ্টি হয়। বিএনপির রাজনৈতিক কর্মীরা ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সুবিধা লাভ করে। সেনাবাহিনীতে বিনা কারণে প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করা হয়। ১৯৮১ সালে সংবাদপত্রের রিপোর্ট অনুযায়ী দেশে জমা হয়েছিল ৫০০ কোটি কালো টাকা। কারণ ইতিহাসের সাম্প্রদায়িক ও ঔপনিবেশিক মতাদর্শ অক্ষুণœ রেখে যারা ক্ষমতায় আসেন তাদের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় নিজের ঘনিষ্ঠ চক্র বা সমর্থকদের সš'ষ্ট রাখা, সাধারণ মানুষকে নয়। সাধারণ মানুষের অব¯’া তখন কী দাঁড়ায় তারও দু’একটা উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। ১৪ আগস্ট ১৯৭৫ সালে যেখানে চাল প্রতি মণ ছিল ৬০ টাকা, ১৯৭৮ সালে তা গিয়ে দাঁড়ায় ১০০ টাকায়। আরও কিছু সংখ্যাতাত্ত্বিক হিসাব দেয়া যায়Ñ ১৯৬৯-৭০ এর তুলনায় ১৯৭৮-৭৯ সালে চালের ব্যবহার মাথাপিছু হ্রাস পায় ১৬২ কিলোগ্রাম থেকে ১৪০ কিলোগ্রাম। ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশে ভূমিহীনের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৫১ ভাগে। ১৯৬৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ২৯ ভাগ। জিয়ার কৃষিমন্ত্রী পর্যš- জানান, ‘ভূমিহীন ও ভাগচাষীরা প্রকৃতপক্ষে বিভিন্ন প্রকার নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। জমির মালিকদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক দাস-প্রভু ও ক্রীতদাসের মতোই।’
১৯৭৯ সালে জিয়া যখন ক্ষমতার শীর্ষে তখন বাংলাদেশে ‘কর্মদক্ষ জনসমষ্টির এক-তৃতীয়াংশ ছিল কর্মহীন।’ গ্রামের মানুষ ১৯৭৫-৭৬ সালে গ্রহণ করতেন ৮০৭ গ্রাম খাদ্যদ্রব্য। ১৯৮১-৮২ সালে তা হ্রাস পেয়ে দাঁড়ায় ৭৪৬ গ্রামে। ১৯৭৫-৭৬ সালে গড়পড়তা ক্যালোরি গ্রহণের পরিমাণ ছিল ২০৯৪-এ, ১৯৮১-৮২ সালে তা হ্রাস পেয়ে দাঁড়ায় ১৯৪৩-এ, যা নিুতমের চেয়ে ১৫ ভাগ কম। ১৯৮১-৮২ সালে তিন-চতুর্থাংশ মানুষ পুষ্টিহীনতায় ভুগেছেন। ১৯৭৭-৭৯ সালে উ”চ শিক্ষার্থী ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা হ্রাস পায় ২১ ভাগ। এ ধরনের ইতিহাসের ধারায় যারা ক্ষমতায় আসেন তারা কীভাবে মানুষজনের সঙ্গে প্রতারণা করেন তা বোঝা যাবে একটি উদাহরণ দিলে। মৃত্যুর কয়েকদিন আগে জিয়া প্রতিশ্র“ত প্রকল্পগুলোর মূল্যায়নের জন্য একটি বৈঠক ডাকা হয়। তাতে দেখা যায়, ‘বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে সড়ক ও জনপথ বিভাগে যে পরিমাণ টাকা বরাদ্দ করা হয় তা যদি অব্যাহত থাকে তাহলে প্রেসিডেন্টের প্রতিশ্র“ত প্রজেক্ট বা¯-বায়নে ৬২ বছর সময় লাগবে।
এমনকি ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমান এক বক্তৃতায় বলেন, উন্নয়নের জন্য সংরক্ষিত মোট সম্পদের চল্লিশ ভাগ বিনষ্ট হ”েছ দুর্নীতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের জন্য। অর্থনীতিবিদদের এক সম্মেলনে তিনি একথা স্বীকার করেছিলেন। এর পরিপ্রেক্ষিতেই বোধ হয় ইন্সটিটিউট অফ ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের পরিচালক আবদুল মোমেন লিখেছিলেন
‘Coruption has been converted from a crime to a habit and the acknowledgement of this fact has led to a faster growth of corruption in the country. Following it has appeared political corruption which has taken upon itself the protection of other crimes.Õ
জেনারেল এরশাদ জিয়ার পথই অনুসরণ করেছিলেন। তার আমলের বৈশিষ্ট্য হল, রাষ্ট্রের ও নিজের এবং তল্পীবাহকদের সম্পদের মধ্যে পার্থক্য না করা। এরশাদ আমলে কয়েক হাজার কোটি টাকা লোপাট করেছে তার পরিবার ও নতুন সমর্থরা। তার সময়ে ‘উন্নয়ন বাজেটের মধ্যেও মূল আঘাত গিয়ে পড়েছিল শিক্ষা, স্বা¯’্য, মানবসম্পদ উন্নয়নের মতো সামাজিক অবকাঠামো খাতের ওপর।’ সাধারণ মানুষ এমন নিঃস্ব অব¯’ায় পৌঁছে যে, গণঅভ্যুত্থানে অবশেষে এরশাদ বিদায় হন।
এখানে তার আমলের কয়েকটি সংখ্যাতত্ত্ব তুলে ধরছি উদাহরণ হিসেবে। এক হিসেবে জানা যায়, মাত্র ২৫টি প্রকল্পে লোপাট হয়েছিল ১৩,৪৮৫ কোটি টাকা। লক্ষ্যণীয় যে, এসব প্রকল্পে ঘুরে ফিরে স্বল্প কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠীই লাভ করেছিল। এদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন স্বয়ং প্রেসিডেন্ট, তার স্ত্রী, নিকট আÍীয়স্বজন, মন্ত্রিবর্গ, আমলাবৃন্দ। বেগম রওশন এরশাদের নাম হয়ে গিয়েছিল ‘ম্যাডাম টেন পারসেন্ট’। অর্থাৎ সরকারি যে কোন প্রকল্প কেউ পেলে তাকে দশভাগ কমিশন দিতে হতো। এক পরিসংখ্যানে জানা যায়Ñ ‘১৯৮৯ সালের ৩০ জুন পর্যš- শিল্পঋণ সং¯’ার মেয়াদোত্তীর্ণ অনাদায়ী ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ৭শ’ কোটি টাকা। ওই টাকা আটকে ছিল ৩৮২টি প্রকল্পে। আর সেই ৩৮২টির মধ্যে মাত্র ২২টি প্রকল্পেই ছিল প্রায় পঞ্চাশ শতাংশ। যার অর্থ হ”েছ ২২ জন ব্যক্তি বা গ্র“প শিল্পঋণের প্রায় অর্ধাংশ আÍসাৎ করে বসে আছে। ঃ ১৯৮৪ সালের জুনে মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণের পরিমাণ ছিল ১৭০ কোটি টাকা, যা ৫ বছর পর ৭শ’ কোটি টাকা অতিক্রম করেছে। অর্থাৎ এই ৫ বছরে যেসব ব্যক্তি ঋণের সুযোগ গ্রহণ করেছেন তাদের বড় অংশই সুস্পষ্টভাবে জনগণের সম্পদকে কুক্ষিগত করেছে।’
এরশাদের আমলে সামগ্রিকভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়ন হওয়া সম্ভব ছিল না সর্বগ্রাসী লুটপাটের জন্য এবং তা হয়ওনি। যদিও সরকারি প্রচার মাধ্যমে অহরহ উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।
এখানে কয়েকটি উদাহরণ দেয়া যাক। ১৯৮০-৮১ সালে উন্নয়ন বাজেটের ৬৫ শতাংশ আসত বৈদেশিক সাহায্য থেকে, ১৯৮৮-৮৯ সালে তা গিয়ে দাঁড়ায় ১২৬.৩ শতাংশে। ঋণ দ্বারা ব্যাপকভাবে লাভবান হয় উ”চ মধ্যবিত্তরা যার মধ্যে অš-র্গত সামরিক-বেসামরিক আমলা ও রাজনীতিবিদরা। ১৯৭২-৮১ সালে গড় প্রবৃদ্ধি ছিল ২.৮৩, ১৯৮১-৮৯ সালে ২.৫৫ ভাগ। ১৯৮৪-৮৫ সাল থেকে ১৯৮২-৮৯ সালে খাদ্য উৎপাদন বাড়েনি। ১৯৭২-৮১ সালে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৫.৯৫ ভাগ। ১৯৮১-৯০ সালে গিয়ে দাঁড়ায় তা ৩.১৯ ভাগ। ব্যয় বৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি হয়েছিল সামরিক খাতে। অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ দেখিয়েছেন ১৯৮২-৮৮ সালে সামরিক খাতে প্রকৃত মূল্যে ব্যয় বেড়েছে ৯.৪ ভাগ। পুলিশ, আনসার ও বিডিআর খাতে ৫.৪ ভাগ। কারণ সহজেই অনুমেয়।
অন্যভাবেও বিষয়টি দেখা যেতে পারে। ১৯৭২ থেকে ১৯৯৬ পর্যš- সরকারি খাতে চুরি হয়েছে ১৭,৮৭৯ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। এ তথ্য দিয়েছিলেন তৎকালীন (১৯৯৬) সরকারের দুর্নীতি দমন ব্যুরোর মহাপরিচালক।
দুর্নীতির কারণে চার্জশিট বেশি হয়েছে বেগম জিয়ার আমলে, ৯২.৭৭ শতাংশ। দ্বিতীয় মুজিব আমলে ৬৮.৫০ শতাংশ। তবে মনে রাখার বিষয়, মুজিব আমল ছিল ৩ বছরের আর খালেদার আমল ৫ বছরের। সেদিকে থেকে মুজিব আমলের পরিমাণ বেগম জিয়ার পরিমাণের প্রায় সমান সমান। আরেকটি বিষয় উল্লেখ্য, বেগম জিয়ার আমলে চার্জশিটের একটি বড় পরিমাণ করা হয়েছে এরশাদ ও সাঙ্গপাঙ্গদের বির“দ্ধে। নিজের দলের বির“দ্ধে নয়। শেখ মুজিবের কিš' সেই রাজনৈতিক সুবিধা ছিল না।
কারও বির“দ্ধে চার্জশিট করাটাই বড় কথা নয়। চার্জশিট আঁটোসাঁটো কিনা অর্থাৎ মামলায় টিকবে কিনা বা চার্জশিটের ফলে শা¯ি- হবে কিনা সেটাও প্রধান বিবেচ্য বিষয়। কারণ, চার্জশিটের কারণে যদি শা¯ি-ই না হয় বা মামলাই না টেকে তাহলে চার্জশিট করে কী লাভ? এবার তাহলে সে হিসাব দেখা যাক।
মুজিব আমলে চার্জশিটের পর সবচেয়ে বেশি শা¯ি- হয়েছে ৪৭.৯৩ শতাংশ। সবচেয়ে কম জেনারেল জিয়ার আমলে ১৬.৮২ শতাংশ। বেগম জিয়ার ¯’ান তার ওপরে ২২.৪৬ শতাংশ। এ হার জেনারেল এরশাদের শাসনামলের চেয়েও কম।
চার্জশিটের ফলে যে মামলা হয়েছে তাতেও দেখা যায় মুজিব আমলে শা¯ি-র পরিমাণ (অর্থাৎ হার) সবচেয়ে বেশি ৩২.৮৩ শতাংশ। সবচেয়ে কম জেনারেল জিয়ার আমলে ১০.৮২ শতাংশ, বেগম জিয়ার ¯’ান জেনারেল এরশাদেরও নিচে, তার স্বামীর ওপরে ২০.৮৪ শতাংশ।
এই উপাত্ত একটি বিষয়ই তুলে ধরে তা হল, কলোনি ধারায় যারা শাসন করেছেন তারা জনস্বার্থে আগ্রহী নন যতটা আগ্রহী গোষ্ঠীস্বার্থে। জেনারেল জিয়া ও এরশাদ ছিলেন সামরিক গোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ প্রতিনিধি, বেগম জিয়া ছিলেন পরোক্ষ প্রতিনিধি।
বেগম জিয়ার প্রথম আমলের চিত্রও ওই একই রকম। বিপরীতে অসাম্প্রদায়িক বা উপনিবেশবিরোধী ধারায় ক্ষমতায় আসা শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগ আমলের চিত্রটি দেখা যাকÑ
এ সময় পররাষ্ট্র থেকে সামাজিক নানা বিষয়ে উদ্যমী ও সাহসী সব পরিকল্পনা শুধু নেয়া নয়, কার্যকরও করা হয়। যেমন পার্বত্য চট্টগ্রামে শাšি-চুক্তি ও ভারতের সঙ্গে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি, মিয়ানমারের সঙ্গে ভূমিচুক্তি, সামাজিক, শিক্ষা ও স্বা¯’্য এবং খাদ্য খাতের সম্প্রসারণ ও পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা প্রণয়ন।
১৯৯৬-২০০০ সালে বাংলাদেশে খাদ্যশস্য উৎপাদনের পরিমাণ ১৯০ লাখ থেকে ২৭০ লাখ টনে উন্নীত হয়। কৃষিঋণ বিতরণ পরিমাণ তিনগুণ বৃদ্ধি পায়। দেশের বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার ক্রমান্বয়ে বেড়ে বার্ষিক ৬.৬ ভাগে উন্নীত হয়। মুদ্রাস্ফীতি পূর্ণাঙ্গভাবে নিয়ন্ত্রণে রেখে দেশের সার্বিক সঞ্চয় (মোট জাতীয় উৎপাদনের ১৯ ভাগ) ও বিনিয়োগ (মোট জাতীয় উৎপাদনের ২২ ভাগ) বাড়ানো হয়। দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসরত জনগণের সংখ্যা ৫৩ থেকে ৪৪ ভাগে নেমে আসে।
মানুষের মাথাপিছু আয় ২৮০ থেকে ৩৮৬ ডলারে উন্নীত হয়। ১৯৯৫-৯৬ সালে মানব দারিদ্র্য সূচক ৪১.৬ থেকে ২০০১ সালে তা নেমে আসে ৩২ শতাংশে। মানুষের গড় আয়ু ৫৮.৭ থেকে ৬২ বছরে উন্নীত হয়। বিএনপি আমলে সাক্ষরতার হার ছিল যেখানে ৪৪ শতাংশ শেখ হাসিনার সময় তা বৃদ্ধি পায় ৬৭ শতাংশে।
কৃষি ক্ষেত্রে প্রবল উন্নতি, প্রাকৃতিক দুর্যোগে মানুষকে রক্ষার কৃতিত্ব দেখায় এই সরকার। নারীদের ক্ষমতায়নে সচেষ্ট থাকে। ১২টি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিদ্যালয়ের কাজ শুর“ করে, বৈষম্যমূলক শত্র“সম্পত্তি আইন বাতিল করে, এই প্রথমবারের মতো অস”ছল মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ভাতা ও মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় সম্মানে দাফনের ব্যব¯’া করা হয়। শুধু তাই নয়, প্রথমবারের মতো বয়স্ক ও বিধবা ভাতা এবং গৃহহীনদের জন্য আশ্রয়ণ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। ২১ ফেব্রয়ারি বিশ্বে মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
আওয়ামী লীগের পর জোট সরকার ক্ষমতায় এসেছে। ওই আমলের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িকতার নীতি ত্যাগ করা হয়েছে, মৌলবাদ বিকশিত হয়েছে, ইসলামী জঙ্গিদের হুমকি ও বোমাবাজি, হত্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, আইন-শৃংখলা ও মানবাধিকারের এত অবনতি আর কখনও হয়নি। খাদ্যশস্যের দাম প্রচণ্ডভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যান্য বিষয়ের কথা বাদ দিলাম। একটি উদাহরণ দেয়া যেতে পারে, ক্ষমতায় আসার পর জোট সরকার প্রথম যে কাজটি করে তা হল, প্রধানমন্ত্রী তনয় ও ভ্রাতা এবং অর্থমন্ত্রীর পুত্রের কয়েকশ’ কোটি টাকা ব্যাংক ঋণ মওকুফ।
বর্তমান সরকার প্রশংসনীয় অনেক কিছু করেছে; তবুও কেন জনসমর্থন তাদের হ্রাস পা”েছ বা অর্থনীতি চাঙ্গা হ”েছ না কেন তা অনুধাবনের সময় এসেছে। সরকার দুর্নীতি দমন করতে চাইছে। সবাই তাই চায়। কিš' প্রক্রিয়ার মধ্যে একটা হুকুমের ব্যাপার আছে, এটা অনেকের পছন্দ হ”েছ না। কারণ, এই সরকারের মূল কাজ ছিল সুষ্ঠু নির্বাচনÑ কিš' তারা হাতে নিয়েছে অনেক এজেন্ডা। রাজনীতির বির“দ্ধে নি”েছ বিভিন্ন ব্যব¯’া।
ঈদ ও পূজোর বোনাস, বেতন প্রভৃতির ফলে এ মাসে খানিকটা চাঙ্গা হবে হয়তো অর্থনীতি। তারপর তা যদি মাথা তুলে দাঁড়ায় তবে আমাদের সৌভাগ্য। উপদেষ্টারা সব কিছুর পেছনে অনেক ষড়যন্ত্র খুঁজে পেতে পারেন। কিš' ইতিহাস বলে, হুকুমের অর্থনীতি চলে না। অর্থনীতি চলে নিজস্ব নিয়মে, অর্থনীতির হুকুমে।
মুনতাসীর মামুন : ইতিহাসবিদ

"We want Justice for Adnan Tasin"