টপিকঃ সীরাতুন্নবী (সাঃ)-১০

পর্ব-০৯

অর্থনৈতিক অবস্থা
অর্থনৈতিক অবস্থা ছিলো সামগ্রিক সামাজিক অবস্থার অধীন। আরবের জীবিকার উৎসের কথা চিন্তার করলে দেখা যায় যে, ব্যবসা-বাণিজ্যই ছিলো তাদের জীবনের প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহের প্রধান মাধ্যম। বাণিজ্যক আদান-প্রদান সম্ভব ছিলো না। জাযিরাতুল আরবের অবস্থা এমন ছিলো যে, নিষিদ্ধ মাসসমূহ ছাড়া শান্তি ও নিরাপত্তার পরিবেশ অন্য কোন সময় বিদ্যমান ছিলো না। একারণেই জানা যায় যে, নিষিদ্ধ মাসসমূহের আরবের বিখ্যাত বাজার ওকায, যিল মায়ায, মাযনা প্রভৃতি মেলাগুলো বসতো।

শিল্পক্ষেত্রে আরবেরা ছিলো বিশ্বের অন্য সকল দেশের পেছনে। কাপড় বনুন, চামড়া পাক করা ইত্যাদি যেসব শিল্পের খবর জানা যায়, তাঁর অধিকাংশের হতো প্রতিবেশী দেশ ইয়েমেনে। সিরিয়া ও হীরা বা ইরাকে। আরবের ভেতর খেত-খামার এবং ফসল উৎপাদনের কাজ চলতো। সমগ্র আরবে মহিলার সূতা কাটার কাজ করতো। কিন্তু মশকিল ছিলো এই যে, সূটা কাটার উপকরণ থাকতো যুদ্ধের বিভীষিকার দুলর্ভ। দারিদ্র্যতা ছিলো একটি সাধারণ সমস্যা। প্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য এবং পোশাক থেকে মানুষ প্রায়ই বঞ্চিত থাকতো।

চারিত্রিক অবস্থা
এটা স্বীকৃত সত্য যে, আরবের লোকদের মধ্যে ঘৃণ্য ও নিন্দনীয় অভ্যাসসমূহ পাওয়া যেতো এবং এমন সব কাজ তারা করতো, যা বিবেক বুদ্ধি মোটেই অনুমোদন করত না। তবে তাদের মধ্যে এমন কিছু চারিত্রিক গুণও ছিলো, যা রীতিমত বিস্ময়কর। নীচে সেসব গুণাবলীর কিছু বিবরণ উল্লেখ্য করা যাচ্ছে।

(এক) দয়া ও দানশীলতা। এটা ছিলো তাদের একটা বিশেষ গুণ। এক্ষেত্রে তাদের মধ্যে রীতিমত প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব লক্ষ্য করা যেতো। এ গুণের ওপর তারা এতো গর্ব করতো যে, আরবের অর্ধেক মানুষই কবি হয়ে গিয়েছিলো। এ ব্যাপারে কেউ নিজের এবং অন্য কেউ অন্য কারো প্রশংসা করতো। কখনো এমন হতো যে, প্রচন্ড শীত এবং অভাবের সময়েও হয়তো কারো বাড়িতে মেহমান এলো। সেই সময় গৃহস্বামীর কাছে একটা মাত্র উটই ছিলো সম্বল। গৃহস্বামী আতিথেয়তা করতে সেই উটকে যবাই করে দিতো। দয়া এবং উদারতার কারণেই তারা মোটা অংকের আর্থিক ক্ষতি স্বীকৃতি করে নিতো এবং সে ক্ষতি যথারীতি আদায় করতো। এমনিভাবে মানুষকে ধ্বংস এবং রক্তপাত থেকে রক্ষা করে অন্যান্য ধনী এবং বিশিষ্ট ব্যক্তির ওপর নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে গর্ব করতো।

এ ধরণের দানশীলতার কারণেই দেখা যেতো যে, তারা মদ পান করায় গর্ব অনুভব করতো। মদ পান প্রকৃতপক্ষে কোন ভাল কাজ ছিলো না; কিন্তু এতে তারা উদার হতে পারতো এবং দান –খয়রাত করা তাদের জন্যে সহজ হতো। কেননা নেশার ঘোরে অর্থ-সম্পদ ব্যয় করা মানুষের জন্যে কষ্টকর হয় না। এ কারণে আরবের লোকেরা মদ তৈরীর উপকরণ আঙ্গুরের গাছকে ”করম” এবং মদকে বিনতুল করম বলে অভিহিত করতো। জাহেলি যুগের কবিদের কবিতার লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, তারা গর্ব প্রকাশের ক্ষেত্রে যথেষ্ট মনোযোগী ছিলো।

আনতারা ইবনে শাদ্দাস আবসী তার রচিত মোয়াল্লাকায় লিখেছেন, দুপুরের প্রখর রোদে কমে যাওয়ার পর আমি একটি কারুকার্য খরিচ পীত রঙের পাত্র থেকে মদ পান করলাম। যখন আমি মদ পান করি, তখন আমার অর্থ-সম্পদ দান করে ফেলি। কিন্তু এ সময়েও আমি নিজের ইযযত আব্রু সম্পর্কে সচেতন থাকি। ওতে কোন দাগ দেই না। জ্ঞান ফিরে আসার পরও আমি দানশীলতার ক্ষেত্রে কোন কার্পণ্য করি না। আমার চারিত্রিক সৌন্দর্য এবং দয়া সম্পর্কে তোমাদের কি আর বলবো, সেটাতো তোমাদের অজানা নয়।

দয়াশীলতার কারণেই আরবের লোকেরা ঢালাওভাবে জুয়া খেলতো। তারা মনে করতো যে, এটা দানশীলতার একটা পথ। কেননা জুয়া খেলার পর জুয়াড়িয়া যা লাভ করতো অথবা লাভ থেকে খরচের পর যা বেঁচে যেতো, সেসব তার গরীব দুঃখীদের মধ্যে দান করে দিতো। এ কারণেই পবিত্র কোরআনে মদ এবংজুয়ার উপকারের কথা অস্বীকার করা হয়নি। বরং বলা হয়েছে যে, এ দু’টোর উপকারের চেয়ে অপকার বেশি। আল্লাহ তায়ালা বলেন, লোকে তোমাকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞসা করে, বল উভয়ের মধ্যে মহাপাপ এবং মানুষের জন্যে উপকারও আছে। কিন্তু এদের পাপ উপকারের চাই বেশী।

(দুই) অংগীকার পালন। আরবের লোকেরা অংগীকার পালনকে ধর্মের অংশ মনে করতো। অংগীকার পালন কথা রাখতে গিয়ে তারা জানমালের ক্ষতিকেও তুচ্ছ মনে করতো। এটা বোঝার জন্যে হানি ইবনে মাসুদ শীয়বানি, সামোয়াল ইবনে আদীয় এবং হাজের ইবনে জারারার ঘটনাগুলোই যথেষ্ট।

(তিন) আত্নমর্যাদা সচেনতনা। যুলুম অত্যাচার সহ্য করেও নিজের মর্যাদা বজায় রাখা ছিলো জাহেলি যুগের পরিচিত একটি চারিত্রিক গুণ। এর ফণে তারা বীরত্ব বাহাদুরি প্রকাশ করতো। তাদোর ক্রোধ ছিলো অসামান্য, হঠাৎ করেই তারা ক্ষেপে যেতো। অবমাননার লক্ষণ প্রকাশ পাওয়া গেলেই তারা অস্ত্র নিয়ে বেরিয়ে এবং রক্তপাত ঘটাতো। এ ব্যাপারে তারা নিজের জীবনকে তুচ্ছ মনে করতো।

(চার) প্রতিজ্ঞা পালনে জাহেলী যুগের লোকদের একটা বৈশিষ্ট ছিলো এই যে, কোন কাজ করতে প্রতিজ্ঞা করলে সে কাজ থেকে তারা কিছুতেই দূরে থাকতো না।কোন বাধাই তারা মানত না। জীবন বিপন্ন হলেও সে কাজ তারা সম্পাদন করতো।

(পাঁচ) সহিষ্ঞুতা এবং দূরদর্শীতামূল প্রজ্ঞা। এটাও ছিল আরবদের একটা মহৎ গুন। কিন্তু বীরত্ব এবং যুদ্ধের জন্যে সব সময় তৈরী থাকার কারণে এ গুণ তাদের মধ্যে ছিলো দুর্লভ।

(ছয়) বেদুইন সুলভ সরলতা। তারা সভ্যতার উপকরণ থেকে দূরে অবস্থান করতো এবং ক্ষেত্রে তাদের অনীহা ছিলো। এ ধরণের সহজ সরল জীবন যাপনের কারণে তাদের মধ্যে সত্যবাদিতা এবং আমানতকারী পাওয়া যেতো। প্রতরণা, অংগীকার ভঙ্গ তারা ঘৃণা করতো।

আমরা মনে করি য, জাযিরাতুল আরবের সাথে সমগ্র বিশ্বের এ ধরণের ভৌগোলিক অবস্থান ছিলো, সেটা ছাড়া উল্লেখিত চারিত্রিক গুণাবলীর কারণেই তাদেরকে মানব জাতির নেতৃত্বে এবং নবুয়তের জন্যে মনোনীত করা হয়েছিলো। এসব গুণাবলীর কারণে হঠাৎ করে যদিও তারা ভয়ংকর হয়ে উঠতো এবং অঘটন ঘটাতো, তবু এ কথা অস্বীকার করা যাবে যে, এসব গুণাবলী ছিলো অত্যস্ত প্রশংসনীয় প্রকৃত মানবিক গুণ। সামান্য সংশোধনের পর এসব গুণ মানুষের জন্যে মহাকল্যাণকর প্রমাণিত হতে পারে। ইসলাম সেই কাজ সম্পাদন করেছে।

সম্ভবত উল্লেখিত চারিত্রিক গুণাবলীর মধ্যে অংগীকার পালনের পর আত্নমর্যাদাবোধ এবং প্রতিজ্ঞা পালন ছিলো সবচেয়ে মূল্যবান এবং প্রশংসনীয়। এইসব গুণাবলী এবং চারিত্রিক শক্তি ছাড়া বিশৃঙ্খলা, অশান্তি ও অকল্যাণ দূর করে ন্যায়নীতি ও সুবিধামূলক ব্যবস্থার বাস্তবায়ন অসম্ভব।

জাহেলী যুগে আরবের লোকদের মধ্যে আরো কিছু উল্লেখ্যযোগ্য চারিত্রিক গুণ ছিলো কিন্ত এখানে সবচেয়ে আলোচনা করার প্রয়োজন নেই।

[.......................চলবে........................]

পুর্বপ্রকাশ

Re: সীরাতুন্নবী (সাঃ)-১০

(চার) প্রতিজ্ঞা পালনে জাহেলী যুগের লোকদের একটা বৈশিষ্ট ছিলো এই যে, কোন কাজ করতে প্রতিজ্ঞা করলে সে কাজ থেকে তারা কিছুতেই দূরে থাকতো না।কোন বাধাই তারা মানত না। জীবন বিপন্ন হলেও সে কাজ তারা সম্পাদন করতো।
(পাঁচ) সহিষ্ঞুতা এবং দূরদর্শীতামূল প্রজ্ঞা। এটাও ছিল আরবদের একটা মহৎ গুন। কিন্তু বীরত্ব এবং যুদ্ধের জন্যে সব সময় তৈরী থাকার কারণে এ গুণ তাদের মধ্যে ছিলো দুর্লভ।

thumbs_up thumbs_up

সব কিছুর মধ্যে ও এই গুন দুটি ভাল লেগেছে

ধন্যবাদ শেয়ার করার জন্য

۞ بِسْمِ اللهِ الْرَّحْمَنِ الْرَّحِيمِ •۞
۞ قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ ۞ اللَّهُ الصَّمَدُ ۞ لَمْ * • ۞
۞ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ ۞ وَلَمْ يَكُن لَّهُ كُفُوًا أَحَدٌ * • ۞

Re: সীরাতুন্নবী (সাঃ)-১০

সাইদুল ইসলাম লিখেছেন:

ধন্যবাদ শেয়ার করার জন্য

তোমাকেও ধন্যবাদ সাইদুল।