টপিকঃ সেমিকন্ডাক্টরের সরল পাঠ- ২য় পর্ব

প্রথম পর্ব এখানে

প্রথম পর্বে আলোচনা হয়েছিল সেমিকন্ডাক্টরের সাধারণ গঠন বৈশিষ্ট্য নিয়ে। এ পর্বে সিলিকন বা জার্মেনিয়াম এবং তাদের নিয়ে পরবর্তীতে n ও p- টাইপ সেমিকন্ডাক্টর তৈরির উপায় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

সিলিকন, জার্মেনিয়াম খুব পরিচিত অর্ধ-পরিবাহী পদার্থ। বিশুদ্ধ সিলিকন স্বাভাবিক তাপমাত্রায় কিন্তু প্রায় অপরিবাহীর মত আচরন করে। ঘটনাটা ঐ ইলেকট্রনের বিন্যাসেই। একটি সিলিকন পরমাণু তার একেবারে বাইরের স্তরের ৪টি ইলেকট্রন অপর ৪টি সিলিকন পরমাণুর সাথে শেয়ার করার মাধ্যমে কোভ্যালেন্ট বন্ড (সমযোজী বন্ধন) তৈরী করে নিজের বাইরের কক্ষপথে ৮টি ইলেকট্রনের কোটা পূরণ করে। ফলে সর্ববহিস্থ স্তরের ৪টির বদলে দেখা যায় ৮টি ইলেকট্রন। যদিও কোভ্যালেন্ট বন্ডের মাধ্যমে বাইরের স্তরের ইলেকট্রনগুলো কিছুটা দৃঢ়ভাবে তাদের মূল পরমাণুর সাথে যুক্ত থাকে, তবুও বল প্রয়োগ করে সেই বন্ড ভেঙে পুনরায় ইলেকট্রনগুলোকে ফ্রি করা যায়। তাছাড়া পারিপার্শ্বিক তাপ, আলো ইত্যাদি বেশ কিছু বন্ড ভেঙে ইলেকট্রনগুলোকে ফ্রি করে দেয়। ফ্রি ইলেকট্রন বলতে এতিম ইলেকট্রন (পরমাণু থেকে বিচ্ছিন্ন) বোঝায় না, বোঝায় সেই সব দুষ্টু বাচ্চাদের মত ইলেকট্রন যারা ঘরেই থাকে কিন্তু আইসক্রিমের গাড়ি দেখলেই (বিভব পার্থক্য) ছুট দেয়। ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় বিশুদ্ধ সিলিকনের প্রতি কিউবিক সেন্টিমিটার  প্রায় ১.৫x১০১০ টি বা ১৫০০ কোটি ফ্রি ক্যারিয়ার থাকে।

http://i.imgur.com/Guzed.jpg
সিলিকন পরমাণুর নিজেদের মধ্যে তৈরি সমযোজী বন্ধন

সেমিকন্ডাকটর বা অর্ধপরিবাহী পদার্থকে প্রথম দফাতেই আমরা দুই দলে ভাগ করতে পারি- একদল হলেন বিশুদ্ধ। এনাদের পারমানবিক গঠন অর্ধপরিবাহীর, যেমন বিশুদ্ধ সিলিকন, জার্মেনিয়াম, ইত্যাদি। ইংরেজীতে এই দলের নাম ইনট্রিনজিক সেমিকন্ডাকটর। আর এক দল আছেন যারা হচ্ছেন ভেজাল মেশানো- এক্সট্রিনজিক সেমিকন্ডাকটর। এই দ্বিতীয় দলকে যে খুব বড় অপারেশন করে এক্সট্রিনজিক এ রুপান্তরিত করা হয় তা নয়। মূলত ইনট্রিনজিক সেমিকন্ডাকটরের মধ্যে নিয়ন্ত্রিত পরিমানে উপকারী ভেজাল ঢুকিয়ে তাদেরকে এক্সট্রিনজিকে পরিনত করা হয়। যে ভেজালটির কথা বললাম তার একটি সুন্দর নাম আছে- ডোপিং। খেলাধূলার জগতে ডোপ নেয়া পাপ, আর ইলেকট্রনিক ডিভাইসের জগতে ডোপিং অত্যন্ত দরকারি ও কার্যকরী একটি পদ্ধতি। অবশ্য উভয় ক্ষেত্রেই ডোপিং পারফরম্যান্স বাড়ানোর জন্যই ব্যবহৃত হয়, তবে এক ক্ষেত্রে অনাকাঙ্ক্ষিত আর এক ক্ষেত্রে পরম আকাঙ্ক্ষিত।

এখন দেখা যাক ডোপিং এর তত্ত্বকথা। দুই ধরনের ডোপিং প্রচলিত সেমিকন্ডাক্টরের জগতে-ডোনার ডোপিং এবং অ্যাক্সেপ্টর ডোপিং। ডোনার ডোপিং এর মাধ্যমে আমরা পাই n-টাইপ ম্যাটেরিয়াল, আর অপরটির মাধ্যমে p-টাইপ।

আমরা একটু আগেই আলোচনা করেছি ১টি সিলিকন পরমাণুর অপর ৪টি সিলিকন পরমাণুর সাথে কোভ্যালেন্ট বন্ড তৈরীর কথা। একেবারে বাইরের কক্ষপথে ৫টি ইলেকট্রন আছে এমন একটি পরমাণু যদি এই সিলিকন পরমাণুগুলোর মধ্যে হাজির হয় তাহলে কী ঘটে তাই দেখা যাক।

http://i.imgur.com/nw4sS.jpg
n-টাইপ সেমিকন্ডাক্টর

৫ ইলেকট্রনওয়ালা পরমাণু তার একটি একটি করে ইলেকট্রন অপর ৪টি সিলিকন পরমাণুর সাথে শেয়ার করবে। এই ৪টি সিলিকন পরমানু তাদের সর্বশেষ কক্ষপথে ৮টি ইলেকট্রন রাখার জন্য প্রয়োজনীয় বাড়তি ৪টি ইলেকট্রনের একটি পেলো নতুন ঐ ভিন্ন পরমাণুর কাছ থেকে, আর বাকি ৩টি অন্যান্য ৩টি সিলিকন পরমাণুর কাছ থেকে। এদিকে কিন্তু ভিনদেশী ঐ পরমাণুর তার ৪টি ইলেকট্রন শেয়ার করার পর অবশিষ্ট ১টি ইলেকট্রন বাড়তি থেকে গেলো। অর্থাৎ বহিস্থ স্তরে ৫টি ইলেকট্রনবিশিষ্ট পরমাণুটি সিলিকন পরমাণুদের মধ্যে হাজির হয়ে আশেপাশের সকল সিলিকন পরমাণুর চাহিদা পূরণ তো করলোই, উপরন্তু একটি বাড়তি ইলেকট্রনের উপস্থিতি নিশ্চিত করলো। ফ্রি ইলেকট্রন বিশিষ্ট এই সেমিকন্ডাক্টরকে n-টাইপ সেমিকন্ডাক্টর বলা হয়। n-টাইপ বলতে মূলত নেগেটিভ টাইপ বোঝানো হয়। বাড়তি ইলেকট্রনের উপস্থিতি ঋণাত্মক আধানের সৃষ্টি করে বলে এমন নাম।  n-টাইপ ম্যাটেরিয়াল কিন্তু নিউট্রাল, এটি কিন্তু নেগেটিভ চার্জড নয়। বর্ণনার সময়ই আমরা দেখেছি বাড়তি একটি ইলেকট্রনের উপস্থিতি আপোস-রফাতেই হয়েছে। কোন বলপ্রয়োগ বা বিক্রিয়ার ফলে কোন একটি পরমাণু থেকে সেই ইলেকট্রন আলাদা হয়ে আসেনি। যে ৫ ইলেকট্রনওয়ালা পরমাণুর কথা আমরা আলোচনা করলাম, তার উদাহরণ হলো অ্যান্টিমনি, আর্সেনিক, ফসফরাস ইত্যাদি। এই পরমাণুগুলো ইলেকট্রন দাতা হিসেবে আসে বলে এদের নাম ‘ডোনার এটম’। অতএব আমরা পেলাম বিশুদ্ধ সিলিকন/জার্মেনিয়াম বা কোন ইনট্রনজিক সেমিকন্ডাক্টরের মধ্যে কোন পেন্টাভ্যালেন্ট/পঞ্চযোজী মৌলের ভেজাল বা ইমপিউরিটি ডোপিং এর মাধ্যমে n-টাইপ এক্সট্রিনজিক সেমিকন্ডাক্টর তৈরী করা হয়। এখানে একটা কথা মনে হতে পারে একটি মাত্র বাড়তি ইলেকট্রন দিয়ে কী এমন হাতি-ঘোড়া হয়ে যায়। সাধারণ তাপমাত্রায় বিশুদ্ধ সিলিকনের প্রতি ১০ ট্রিলিয়ন পরমাণুর (১x১০১২) মধ্যে একটি ফ্রি ইলেকট্রন থাকে। এখন আমরা যদি বেশী না,  প্রতি ১ মিলিয়ন (১x১০৭) সিলিকন পরমাণুর সাথে একটি ভেজাল/ইমপিউরিটি পরমাণু যোগ করি তাহলে আগের ১০ ট্রিলিয়নে ০১টির জায়গায় ফ্রি ইলেকট্রনের সংখ্যা হচ্ছে ১০০০০০টি (১x১০১২/১x১০৭=১x১০৫)। মাশাল্লাহ্, মাশাল্লাহ!!

p-টাইপ সেমিকন্ডাক্টর বানানোর তরিকাও ঠিক n-টাইপের মতই। শুধু এখানে পঞ্চযোজীর বদলে ত্রিযোজী ব্যবহৃত হয়, অর্থাৎ এমন পদার্থের পরমাণু যাদের একেবারে বাইরের স্তরে ৩টি ইলেকট্রন থাকে। এসব পরমাণু তার ৩টি ইলেকট্রন দিয়ে সিলিকনের সাথে কোভ্যালেন্ট বন্ড তৈরী করে আরাম করে সবার মধ্যে বসে পড়ে ঠিকই, কিন্তু তার পাশে ৪র্থ একটি সিলিকন থাকে যার সাথে তার বন্ডিং এ একটি ইলেকট্রনের ঘাটতি থাকে। একটি সিট খালি, যেখানে একজন ইলেকট্রন বসতে পারেন। এই শূণ্যস্থানকে বলা হয় ‘হোল’। হোলগুলো ইলেকট্রন অ্যাক্সেপ্ট করতে পারে বলে p-টাইপের ইমপিউরিটি এটমগুলোকে অ্যাক্সেপ্টর এটম বলা হয়। p-টাইপে ইমপিউরিটি হিসেবে বোরন, গ্যালিয়াম, ইন্ডিয়াম, ইত্যাদি ব্যবহৃত হয়।

http://i.imgur.com/USbBr.jpg
p-টাইপ সেমিকন্ডাক্টর

n-টাইপের বেলায় দেখেছিলাম একটি বাড়তি ইলেকট্রনের উপস্থিতি, আর p-টাইপে একটি ইলেকট্রনের অনুপস্থিতি। দুই পরিস্থিতিই চার্জের প্রবাহ তৈরী করে। একটিতে বাড়তি ইলেকট্রন বিভব পার্থক্যের কারণে ছোটাছুটি করতে পারে, আরেকটিতে ইলেকট্রনকে থাকার জায়গা দিয়ে ইলেকট্রনের প্রবাহকে নিশ্চিত করা হয়। ইলেকট্রনিক্সের জগতে চার্জ ক্যারিয়ার বলতে ইলেকট্রন ও হোলের কথাই বলা হয়। n-টাইপের চার্জ ক্যারিয়ার ইলেকট্রন আর p-টাইপের হোল।

ইলেকট্রনের অনুপস্থিতি একটি হোল তৈরী করে-এজন্য অনেকে মনে করতে পারেন কোন হোল এ একটি ইলেকট্রন এসে বসলে সেই পরমাণুর ইলেকট্রনের অভাব পূরণ হবে। ব্যাপারটা কিন্তু সেরকম নয়। n-টাইপের বেলায় বলেছিলাম ইলেকট্রন একটি বাড়তি থাকলেও n-টাইপ ম্যাটেরিয়াল নেগেটিভ্‌লি চার্জড নয়, নিউট্রাল। p-টাইপের বেলায়ও হোল থাকলেও সেটি পজিটিভ্‌লি চার্জড নয় যে ইলেকট্রন আসলে তা নিউট্রাল হবে। বরং p-টাইপও নিউট্রাল, p-টাইপ ম্যাটেরিয়ালের একটি পরমাণুর হোল এ একটি ইলেকট্রন আসলে তা বাড়তি ইলেকট্রন পেয়ে নেগেটিভ আয়ন হয়ে যাবে।

এখানে আর একটি বিষয় জেনে নেয়া ভালো। মেজরিটি এবং মাইনোরিটি চার্জ ক্যারিয়ার বলে দু’টো শব্দ হরহামেশাই ব্যবহৃত হয়। মেজরিটি হচ্ছে যারা সংখ্যায় বেশী। n-টাইপে ইলেকট্রন হলো মেজরিটি ক্যারিয়ার। আর অল্প পরিমানে থাকায় হোল হল n-টাইপের মাইনোরিটি ক্যারিয়ার। n-টাইপ ম্যাটেরিয়ালের দু’প্রান্তে ভোল্টেজ প্রয়োগ করলে কারেন্টের যে ফ্লো পাওয়া যাবে তার প্রধান কারণ হবে ইলেকট্রনের প্রবাহ। অপরদিকে p-টাইপের মেজরিটি ক্যারিয়ার হচ্ছে হোল এবং মাইনোরিটি ইলেকট্রন। এখানে ভোল্টেজ প্রয়োগ করলে তড়িৎ প্রবাহ তৈরীতে হোল প্রধান ভূমিকা রাখবে। n-টাইপ বা p-টাইপ সবার মধ্যেই ইলেকট্রন ও হোল থাকে, শুধু সংখ্যায় ভিন্নতা।

Re: সেমিকন্ডাক্টরের সরল পাঠ- ২য় পর্ব

খুব ভাল পোষ্ট Continue করলে ভাল হবে।

এই গরমে স্বাক্ষর আর কি দিমু........

Re: সেমিকন্ডাক্টরের সরল পাঠ- ২য় পর্ব

অসাধারণ পোস্ট। ফিজিক্সের স্টুডেন্টদের জন্য ভীষণ রকম তথ্যবহুল। thumbs_up

"No ship should go down without her captain."

হৃদয়১'এর ওয়েবসাইট

লেখাটি LGPL এর অধীনে প্রকাশিত

Re: সেমিকন্ডাক্টরের সরল পাঠ- ২য় পর্ব

ইলেক্ট্রনিক্সের ছাত্রদেরও কাজে লাগবে  smile

লেখাটি CC by-nc-nd 3. এর অধীনে প্রকাশিত