টপিকঃ শায়খ রহমানের জবানবন্দি

http://prothom-alo.com/issues/2007-08-17/abdur.jpg

২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট সারা দেশে একযোগে পাঁচ শ বোমা ফাটিয়ে এক ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ−জেএমবি। এরপর তারা একের পর এক আত্মঘাতী হামলা ও ধ্বংসাত্মক তৎপরতা শুরু করলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ব্যাপক অভিযান শুরু করে। অল্প দিনের মধ্যে গ্রেপ্তার হন জেএমবির শীর্ষস্থানীয় নেতাদের সবাই। বিচার প্রক্রিয়া শেষে গত ২৯ মার্চ জেএমবির শীর্ষস্থানীয় নেতা শায়খ আবদুর রহমান ও বাংলা ভাইসহ ছয় জঙ্গির ফাঁসি কার্যকর করা হয়। তার আগে যৌথ জিজ্ঞাসাবাদ সেলে স্বীকারোক্তিতে শায়খ রহমান জানিয়েছেন তাঁর জঙ্গি তৎপরতার আদ্যোপান্ত। অনেক চেষ্টার পর শায়খ রহমানের এই জবানবন্দি প্রথম আলোর হাতে এসেছে। এ নিয়ে পাঠকের ব্যাপক আগ্রহের দিকটি বিবেচনা করে তা তুলে ধরা হলো।

শায়খ রহমানের জবানবন্দি
লেখাপড়া: আমি, শায়খ আবদুর রহমান। জন্ন: ১৯৫৯ সালের ৭ জানুয়ারি, জামালপুর জেলার সদর থানার চরশি খলিফাপাড়ায়। জন্নসুত্রে আহ্লে হাদিস মতাদর্শের অনুসারী। আমার বাবা মরহুম মাওলানা আব্দুল্লাহ ইবনে ফজল প্রখ্যাত আলেম ও বক্তা ছিলেন। ১৯৬৩ সালে চার বছর বয়সে জামালপুরের কামালখান হাট সিনিয়র মাদ্রাসায় ভর্তি হই। সেখান থেকে দাখিল, আলিম ও ফাজিল পাস করি। ১৯৭৯ সালে কামিল শ্রেণীতে প্রথমে ময়মনসিংহের কাতলাসেন আলিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হই। কিছুদিন পর রাজশাহীর সুলতানগঞ্জ ইসলামিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হই। মাদ্রাসাটি সৌদি আরবের মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্জুরিপ্রাপ্ত ছিল। প্রতিবছর এ মাদ্রাসা থেকে বেশ কিছুসংখ্যক ছাত্রকে বৃত্তি প্রদানের মাধ্যমে মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রেরণ করা হতো। মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের সুযোগ লাভের জন্যই আমি এখানে ভর্তি হই এবং ১৯৮০ সালে বৃত্তি নিয়ে মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাই। সেখানে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত অধ্যয়ন শেষে লিসান্স (ইসলামের মূলনীতি ও ধর্ম প্রচারবিষয়ক) ডিগ্রি লাভ করি। দেশে ফিরে ১৯৮৬ সালে সরিষাবাড়ী আরামনগর আলিয়া মাদ্রাসা থেকে কামিল পাস করি।
মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে আমি মাসিক ৩৫০ থেকে ৫০০ রিয়াল পর্যন্ত বৃত্তি পেতাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন শেষ দুই বছর আমি ভগ্নিপতি খোরশেদ আলমকে সঙ্গে নিয়ে হজ এবং ওমরা পালন করতে আসা বিদেশি হাজিদের বাড়ি ভাড়ার ব্যবসা শুরু করি। এ ব্যবসা করে প্রায় ২০ থেকে ৩০ হাজার রিয়াল উপার্জন করি। উল্লেখ্য, বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালীন ১৯৮৪ সালে আমি ছুটিতে এসে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হই।
জামায়াতের রাজনীতি ত্যাগ: কামালখান হাট সিনিয়র মাদ্রাসায় পড়াকালীন আমি ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে অনিয়মিতভাবে জড়িত ছিলাম। মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালীন আমি জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের মদিনা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার বৈদেশিক সম্পর্ক বিভাগের সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। এ ছাড়া সৌদি আরবে থাকাকালীন মিসরভিত্তিক মুসলিম ব্রাদারহুড (এখ্ওয়ানুল মুসলিমিন) সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতাম। বিশ্বজুড়ে জিহাদি কর্মকান্ড পরিব্যাপ্ত হওয়ার কারণে বাংলাদেশেও ইসলামি হুকুমত প্রতিষ্ঠার মাধ্যম হিসেবে জিহাদকে বেছে নেওয়ার ইচ্ছা পোষণ করি। পড়াশোনা শেষে বাংলাদেশে ফিরে এসে জামায়াতে ইসলামীর কার্যপদ্ধতি তথা গণতান্ত্রিক রাজনীতির সঙ্গে নীতিগত পার্থক্যের কারণে আমি তাদের সঙ্গে একাত্ম হতে পারিনি। তাই আমি নিজ উদ্যোগে বাংলাদেশে ইসলামিক আইন কায়েমের জন্য আলাদা জিহাদি সংগঠন তৈরির পরিকল্পনা করি।
সৌদি থেকে ফিরে চাকরি ও ব্যবসা: ১৯৮৫ সালে দেশে ফিরে জামালপুরের মাদারগঞ্জে আমার শ্বশুর কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত মির্জা কাশেম সিনিয়র মাদ্রাসায় শিক্ষকতা শুরু করি। একই বছর জামালপুরে নাবিল সোপ ফ্যাক্টরি নামে একটি কাপড় কাচার বল সাবান কারখানা প্রতিষ্ঠা করি। ১৯৮৬ সালে ঢাকায় সৌদি দুতাবাসে চাকরি পাওয়ায় সাবান কারখানাটি বিক্রি করে দিই। ১৯৯১ সাল পর্যন্ত সৌদি দুতাবাসের ভিসা সেকশনে পাবলিক রিলেশন অফিসার হিসেবে মাসিক ১৬ হাজার টাকা বেতনে চাকরি করি। ১৯৮৭ সালে দুতাবাসে চাকরিরত অবস্থায় জামালপুর বেলটিয়া মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল শামসুল আলমের অনুরোধে সেই মাদ্রাসায় অনিয়মিত শিক্ষক হিসেবে যোগদান করি। এ ছাড়া ১৯৯০ সালে ডিআইটি এক্সটেনশন রোড ফকিরাপুলে আল হেরা ট্র্যান্সলেশন সেন্টার নামে একটি অনুবাদকেন্দ্র এবং একই বছর ঢাকার খিলগাঁওয়ে আল হেরা ফার্মেসি নামে একটি ওষুধের দোকান দিই। পরিপূর্ণভাবে ব্যবসা করতে ১৯৯১ সালে সৌদি দুতাবাসের চাকরি ছেড়ে দিই। তারপর থেকে ব্যবসা করি। নাবিল এন্টারপ্রাইজের মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়া ও তুরস্ক থেকে যথাক্রমে ছোলা ও মসুর ডাল আমদানি করি। ১৯৯২ সালে ব্যবসায়ে বিনিয়োগ করার জন্য ইসলামী ব্যাংক জামালপুর শাখা থেকে ৩৫ লাখ টাকা ঋণ গ্রহণ করি এবং ১৯৯৫ সালে ওই ঋণের টাকা সম্পুর্ণ পরিশোধ করি। জামালপুরের নয়াপাড়া, মাদারগঞ্জ, সদর থানা, রংপুরের শালবন ও ময়মনসিংহের আকুয়া এলাকায় সারের ডিলারশিপ নিয়ে ব্যবসা করি।
ব্যাংক হিসাব: ইসলামী ব্যাংকের জামালপুর শাখায় নিজের নামে ও নাবিল এন্টারপ্রাইজের নামে দুটি অ্যাকাউন্ট, ঢাকার মতিঝিল শাখায় নিজের নামে দুটি, চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ শাখায় নাবিল এন্টারপ্রাইজের নামে একটি, নরসিংদীর পলাশ শাখায় নাবিল এন্টারপ্রাইজের নামে একটি, জামালপুরের তারাকান্দি শাখায় নিজের নামে একটি এবং ঢাকার যাত্রাবাড়ী শাখায় স্ত্রীর নামে একটি অ্যাকাউন্ট ছিল।
জিহাদি সংগঠন করার বাসনা: ১৯৯৫ সালে আমি ইসলাম ধর্মের জন্য কিছু করার চিন্তাভাবনা শুরু করি। তখন থেকেই আমি বিভিন্ন ইসলামিক বই পড়া শুরু করি। আমি আমার পূর্বপরিচিত আকরামুজ্জামানের (পরিচালক, রিভাইবাল অব ইসলামিক হেরিটেজ সোসাইটি) ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে বিভিন্ন বই অধ্যয়ন করি। উল্লেখ্য, আকরামুজ্জামানের ভাতিজা নাসরুল্লাহ যাত্রাবাড়ী মোহাম্মাদিয়া আরাবিয়া মাদ্রাসায় পড়ত। একই মাদ্রাসায় আমার দুই সন্তান নাবিল ও মাহমুদের পড়াশোনার সুবাদে নাসরুল্লাহর সঙ্গে পরিচয়ের সুত্র ধরে আকরামুজ্জামানের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। ওই বইগুলো অধ্যয়ন করে আমার মধ্যে জিহাদি কর্মকান্ডে নিজেকে নিয়োজিত করার বাসনা জাগ্রত হয়।
এরপর আমি নিজে বই লেখার ব্যাপারে মনোনিবেশ করি। আমি ১৯৯৬ সালে ফখরুজ্জামান ছদ্মনামে দীন কায়েমের সঠিক পদ্ধতি বইটি প্রকাশনা করি। ১৯৯৮ সালে শায়খ আব্দুল হালিম ছদ্মনামে দীন কায়েমের সঠিক আক্বিদা প্রকাশনা করি।
১৯৯৫ সালে আমার মনে জিহাদি চিন্তা-চেতনা শুরু হওয়ার পর আমি বিভিন্ন ব্যক্তি এবং সংস্থার সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করি।
হরকাতুল জিহাদের সঙ্গে আলোচনা: ১৯৯৫ সালে আমি ঢাকার খিলগাঁওয়ের হরকাতুল জিহাদের কার্যালয়ে গমন করে তাদের তৎকালীন আমির মুফতি আব্দুল হাই এবং অন্যান্য নেতা তথা মুফতি শফিক, শেখ ফরিদ, আব্দুল্লাহ, ফারুক হোসেন খান (পরে জেএমবির শুরা সদস্য খালেদ সাইফুল্লাহ), আব্দুর রউফ প্রমুখের সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। প্রাথমিকভাবে আমার হরকাতুল জিহাদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে কাজ করার ইচ্ছা ছিল। ১৯৯৬ সালে আমি কক্সবাজারের উখিয়ায় আটককৃত হরকাতুল জিহাদের ৪০ জন সদস্যের মুক্তির ব্যাপারে আমার পূর্বপরিচিত ব্যারিস্টার কোরবান আলীকে নিজস্ব অর্থায়নে উকিল নিয়োগ করি। এ মামলার ব্যাপারে ১৯৯৬-৯৭ সালে আমি সাত-আটবার কক্সবাজার ও বান্দরবান গিয়েছিলাম। কিন্তু পরে আদালতের রায় বিপক্ষে যাওয়ায় হরকাতুল জিহাদ নেতারা আমাকে দোষারোপ করেন এবং ওই সদস্যদের মুক্তির ব্যাপারে আমার প্রচেষ্টার কারণে নেতারা আমার ওপর ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়েন বলেও আমার ধারণা জন্নে। এ ছাড়া ওই নেতাদের সঙ্গে ধর্মীয় মতাদর্শগত বিশেষত মাযহাবি পার্থক্যের কারণে আমি হরকাতুল জিহাদের সঙ্গে কাজ করার প্রাথমিক চিন্তাধারা থেকে সরে আসি এবং নিজস্ব দল গঠনের সিদ্ধান্ত নিই। উল্লেখ্য, হরকাতুল জিহাদের উল্লিখিত আটককৃত সদস্যদের মামলা পরিচালনার জন্য কক্সবাজার ও বান্দরবানে গমনাগমনকালে আরাকানভিত্তিক সংগঠন রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশনের (আরএসও) কতিপয় নেতা−দ্বীন মোহাম্মদ, সলিমুল্লাহ, আব্দুর রশিদ প্রমুখের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়।
আহলে হাদিস আন্দোলনে যোগ দিতে গালিবের প্রস্তাব: ১৯৯৫ সালে জিহাদ বিষয়ে পরামর্শের জন্য আমি ড. এম এ বারী (জমিয়াতে আহলে হাদিস), ড. আসাদুল্লাহ আল গালিব (আহলে হাদিস আন্দোলন বাংলাদেশ) প্রমুখ আহলে হাদিস নেতার সঙ্গেও সাক্ষাৎ করি। ১৯৯৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে ড. গালিবের ঢাকার উত্তরার তৌহিদ ট্রাস্টের অফিসে তাঁর সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ হয়। সেখানে আহলে হাদিস আন্দোলন বাংলাদেশের নায়েবে আমির অধ্যক্ষ আব্দুস সামাদ উপস্থিত ছিলেন। উল্লেখ্য, অধ্যক্ষ আব্দুস সামাদের ছেলে আব্দুল্লাহ আমার সঙ্গে মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছে। সেই সুবাদে পরে দেশে এসে তার বাবার সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। ড. গালিবের সঙ্গে ওই বৈঠকে তাঁর প্রণীত দাওয়াত ও জিহাদ নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা হয়। ওই দিন শুক্রবার থাকায় জুমার নামাজ আদায় করতে আমরা একত্রে মাইক্রোবাসযোগে পল্লবী সাড়ে এগারোর আহলে হাদিস মসজিদে গমন করি। নামাজ শেষে পুনরায় তাঁর অফিসে ফিরে এসে জিহাদ এবং কিতাল সম্পর্কে আলোচনা করি। আমি ড. গালিবকে কিতালের তিনটি ধাপ−(১) উদ্বুদ্ধকরণ, (২) প্রশিক্ষণ এবং (৩) কিতাল সম্পর্কে বোঝাতে সক্ষম হলেও ড. গালিব এখনো কিতাল করার সময় হয়নি বলে মত ব্যক্ত করেন। কিতাল সম্পর্কিত এই মতপার্থক্যের কারণে ড. গালিবের সঙ্গে আমার আর কোনো সাক্ষাৎ না হয়নি। তবে ১৯৯৮ সালে জেএমবি গঠনের পর ড. গালিব তাঁর দলে যোগ দিতে আমার কাছে প্রস্তাব পাঠান। বিনিময়ে যানবাহন, থাকার জায়গা, অর্থ ইত্যাদি দিয়ে সহযোগিতার আশ্বাস দেন। এর জবাবে আমি চারটি শর্ত পূরণ সাপেক্ষে তাঁর দলে যোগদান করার প্রস্তাব দিয়ে শাহেদ বিন হাফিজ ও নাসরুল্লাহকে প্রতিনিধি হিসেবে তাঁর কাছে পাঠাই। ওই শর্তগুলো হলো: (১) কিতালের সঠিক ব্যাখ্যা দিতে হবে এবং দলের কর্মীদের লিখিত আকারে সম্ভব না হলেও মৌখিকভাবে বুঝিয়ে বলতে হবে; (২) কিতালের জন্য সময় নির্ধারণ করতে হবে; (৩) প্রশিক্ষণের জন্য সার্বিক সহযোগিতা করতে হবে এবং (৪) সংগঠনের প্রশিক্ষণ ক্যাম্প স্থাপন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে আহলে হাদিস আন্দোলন বাংলাদেশের কর্মীরা সাহসী না হলে জেএমবিকে ক্যাম্প স্থাপনের জন্য অনুমতি এবং সার্বিক সহযোগিতা দিতে হবে।
এসব শর্তের পরিপ্রেক্ষিতে ড. গালিব প্রতিনিধিদলকে সুনির্দিষ্টভাবে জবাব না দিয়ে কৌশলে তাদের প্রথমে তাঁর সংগঠনে যোগদান করার পরামর্শ দেন। পরে ড. গালিব তাঁর সংগঠনের সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক রেজাউল করিমকে প্রস্তাবনার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করার জন্য প্রেরণ করেন। আমি ও নাসরুল্লাহ তাঁর সঙ্গে তাওহিদ ট্রাস্টের আরামবাগের অফিসে সাক্ষাৎ করি। রেজাউল করিমকে ওই প্রস্তাবনার ব্যাপারে সুনির্দিষ্টভাবে জিজ্ঞেস করায় তিনি বলেন, "আমি জিহাদের জন্যই জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ ত্যাগ করে আহলে হাদিস আন্দোলন বাংলাদেশে যোগদান করি। ড. গালিব আপনাদের প্রস্তাবে রাজি না হলে আমি তাঁকে কৌশলে রাজি করানোর চেষ্টা করব। আপনারা প্রথম আমাদের দলে যোগদান করেন, পরে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কর্মসুচি গ্রহণ করা হবে।" আমি তাঁকে ড. গালিবের সঙ্গে আমার প্রস্তাবনার সুনির্দিষ্ট জবাব প্রদানের জন্য বলি এবং এই শর্তগুলোতে রাজি না হলে আমরা যোগদান করব না বলে জানিয়ে দিই। পরে ড. গালিবের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া না পাওয়ায় তাঁর সঙ্গে আমাদের যোগাযোগের অবসান ঘটে।
জামায়াত নেতার সঙ্গে আলোচনা: ১৯৯৬ সালে জামালপুরে স্থানীয় ইসলামিক বিজনেসম্যান সোসাইটির উদ্যোগে জামায়াতে ইসলামীর একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে সংগঠনের জেনারেল সেক্রেটারি কামারুজ্জামান ও অধ্যাপক শরিফ আহমেদ উপস্থিত ছিলেন। ওই সভা উপলক্ষে জামালপুর ইসলামী ব্যাংকের ম্যানেজার আমাকে এর ব্যয় নির্বাহ এবং ঢাকা থেকে কামারুজ্জামান ও অধ্যাপক শরিফ আহমেদকে নিয়ে আসার জন্য অনুরোধ করেন। আমি ঢাকা থেকে গাড়িযোগে তাঁদের জামালপুর নিয়ে আসি। যাত্রাপথে তাঁদের সঙ্গে আমার জিহাদবিষয়ক আলোচনা হয়। বিস্তারিত আলোচনা শেষে আমি গণতন্ত্রের মাধ্যমে ইসলামি হুকুমত কায়েম করা সম্ভব কি না প্রশ্ন করলে জবাবে কামারুজ্জামান তাঁদেরও সর্বশেষে জিহাদের পথেই যেতে হবে বলে মত ব্যক্ত করেন।
বায়তুল মোকাররমে মতবিনিময় সভা: ১৯৯৬ সালে বায়তুল মোকাররমে একটি মতবিনিময় সভা আহ্বান করি, যেখানে অন্যান্য ব্যক্তির সঙ্গে রুহুল আমিন (পিআরও, সৌদি আরব দুতাবাসের মিলিটারি অ্যাটাশে), মাওলানা ইসাহাক (শিক্ষক, যাত্রাবাড়ী মাদ্রাসা) প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। যাত্রাবাড়ীর মোহাম্মাদিয়া আরাবিয়া মাদ্রাসার শিক্ষক মাওলানা বেলাল আসার কথা ছিল; কিন্তু তিনি উপস্থিত হতে পারেননি। চিঠির মাধ্যমে পরে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের আগ্রহ প্রকাশ করেছিলাম। ওই সভায় বাংলাদেশে জিহাদের প্রয়োজনীয়তা এবং তা কীভাবে করা যায় সে ব্যাপারে আলোচনা হয়েছিল।
ভারতীয় জঙ্গি টুন্ডার সঙ্গে যোগাযোগ: ওই সভার কিছুদিন পরে আমি মাওলানা বেলালের সঙ্গে তাঁর মাদ্রাসায় সাক্ষাৎ করি। মাওলানা বেলাল সে সময় আমাকে আব্দুল করিম টুন্ডা ওরফে আব্দুল কুদ্দুস ওরফে বাবাজির (৬০) কথা বলেন। উল্লেখ্য, টুন্ডা একজন আহলে হাদিস অনুসারী ভারতীয় নাগরিক (উত্তর প্রদেশ, ভারত), যার সঙ্গে পাকিস্তানের আহলে হাদিসভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তৈয়বা এবং পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইর সম্পর্ক ছিল। ভারতের অভ্যন্তরে বিভিন্ন বিস্কোরণের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ১৯৯২-৯৩ সালে ভারত সরকার টুন্ডাকে মোস্ট ওয়ানটেড আসামি হিসেবে তালিকাভুক্ত করলে তিনি সপরিবারে বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন। বাংলাদেশে অবস্থানকালীন টুন্ডা সপরিবারে মিরপুরে বসবাস করতেন। তিনি ঢাকার যাত্রাবাড়ীর মোহাম্মাদিয়া আরাবিয়া মাদ্রাসার পাশে বটতলায় অবস্থিত একটি ছাত্র মেসকে তাঁর অফিস হিসেবে ব্যবহার করতেন। ১৯৯৬ সালে ঢাকার পল্টনস্থ এশিয়া ড্রাগন ট্রাভেলস এজেন্সি অফিসে মাওলানা ইসাহাকের মাধ্যমে আমি টুন্ডার সঙ্গে প্রথমবার সাক্ষাৎ করি। প্রাথমিক আলাপের একপর্যায়ে মাওলানা ইসাহাক টুন্ডাকে বলেন, আমি ওয়ালিউর রহমানের ভাই। উল্লেখ্য, সে সময় ওয়ালিউর রহমান কলকাতার একটি মাদ্রাসায় পড়াশোনা করত এবং টুন্ডার সঙ্গে সে কাজ করত বলে আমি জানি। এক সপ্তাহ পর যাত্রাবাড়ীর বটতলা মাদ্রাসা মেসে টুন্ডার সঙ্গে আমার দ্বিতীয় সাক্ষাৎ হয়। ওই সাক্ষাতে জিহাদসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করি এবং প্রশিক্ষণসংক্রান্ত বিষয়ে তাঁর সাহায্য চাই। মাদ্রাসার ছাত্র সানাউল্লাহ দ্বিতীয় সাক্ষাৎ হতে টুন্ডার সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য মাধ্যম হিসেবে কাজ করত।
আমার জানামতে, ওই মাদ্রাসার ছাত্র সানাউল্লাহ, নাসরুল্লাহ, শাহেদ বিন হাফিজ ও হাফেজ মাহমুদ আগে থেকেই টুন্ডার সঙ্গে কাজ করত। ১৯৯৭ সালে আমি টুন্ডার সঙ্গে চট্টগ্রামের ঝাউতলা আহলে হাদিস মসজিদে গমন করি এবং সেখানে প্রশিক্ষণের ব্যাপারে আবারও তাঁর সঙ্গে কথা হয়। পরে তিনি আমাকে প্রশিক্ষণের জন্য পাকিস্তান পাঠাতে রাজি হন এবং পাসপোর্ট, ভিসা তৈরি করতে বলেন।
পাকিস্তান প্রশিক্ষণ: টুন্ডার পরামর্শ অনুযায়ী ১৯৯৭ সালে আমি পাকিস্তানে যাওয়ার জন্য সড়কপথে বেনাপোল-হরিদাসপুর হয়ে ভারতে প্রবেশ করি। প্রথমে কলকাতায় আমার ভাই ওয়ালিউর রহমানের বাসায় উঠি। পরে আমি দিল্লি হয়ে পাকিস্তান যাওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে বাংলাদেশে ফিরে আসি। ভারত থেকে ফেরত আসার পর ১৯৯৭ সালের শেষের দিকে আমি টুন্ডার ব্যবস্থাপনায় বিমানযোগে বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানে গমন করি। প্রথমে করাচিতে টুন্ডার সঙ্গে দেখা হয় এবং পরে তিনি আমাকে লাহোরের মুরিদকিতে অবস্থিত মার্কাজ আদ-দাওয়া ওয়াল ইরশাদের (পাকিস্তানের একটি আহলে হাদিস সংগঠন এবং আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তৈয়বার মাতৃ সংগঠন) সদর দপ্তরে নিয়ে যান। সেখানে আমার সঙ্গে মার্কাজ আদ-দাওয়া ওয়াল ইরশাদের প্রধান এবং লস্কর-ই-তৈয়বার আমির হাফেজ সাঈদের সাক্ষাৎ হয়। কিন্তু সেদিন টুন্ডা অজ্ঞাত কারণে আমাকে হাফেজ সাঈদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেননি। লাহোর থেকে আমি মোজাফ্ফরাবাদে গমন করে সেখানে অবস্থিত লস্কর-ই-তৈয়বার প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে ২০ দিন যাবৎ অস্ত্র, বিস্কোরক, রণকৌশল, গোপনীয়তার কৌশল ইত্যাদির ওপর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করি। প্রশিক্ষণ শেষে আমি দেশে ফিরে আসি।
ভারতে নাশকতায় যুক্ত হতে অস্বীকৃতি: প্রায় তিন মাস পর ১৯৯৮ সালের শুরুর দিকে টুন্ডা বাংলাদেশে এলে চট্টগ্রাম শহরের ঝাউতলা মসজিদে তাঁর সঙ্গে আমার সর্বশেষ সাক্ষাৎ হয়। ওই বৈঠকে শাহেদ বিন হাফিজ, নাসরুল্লাহ, সানাউল্লাহ, আব্দুস সালাম (ভারতীয়), সেলিম (পাকিস্তানি), টুন্ডা ও আমি উপস্থিত ছিলাম। বৈঠকে জিহাদবিষয়ক আলোচনা হয়। উল্লেখ্য, টুন্ডার সঙ্গে সাক্ষাতের পর থেকেই আমার বিভিন্ন আলোচনা ও প্রস্তাবনায় তিনি সায় দিয়ে আসছিলেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তাঁর মনে আমাকে অন্যদের মতো ভারতে পাঠিয়ে বিস্কোরক হস্তান্তর বা নাশকতামূলক কর্মকান্ডে ব্যবহারের ইচ্ছা ছিল। এ কারণেই তিনি আমাকে পাকিস্তানে পাঠিয়ে প্রশিক্ষণ প্রদানের ব্যবস্থা করেন। তাঁর প্রকৃত উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে আমি বিরোধিতা করি এবং বাংলাদেশে ইসলামি হুকুমত কায়েমের জন্য জিহাদ করার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিই। ওই বৈঠকে এ বিষয়ে চুড়ান্ত ফয়সালা হয়। টুন্ডা তাদের সঙ্গে কাজ না করলে কোনো ধরনের সহযোগিতা করবে না বলে জানায় এবং তার ধারণা ছিল যে একা আমার পক্ষে এ ধরনের একটি জিহাদি সংগঠন গড়ে তোলা সম্ভব নয়। এ বৈঠকের পর দু-একবার মোবাইলে যোগাযোগ ছাড়া টুন্ডার সঙ্গে আমার আর কোনো সাক্ষাৎ বা যোগাযোগ হয়নি।
১৯৯৭ সালে রিভাইবাল অব ইসলামিক হেরিটেজ সোসাইটির পরিচালক আকরামুজ্জামান তাঁর সংগঠনের পক্ষ থেকে আমাকে আমার গ্রামের বাড়িতে মাদ্রাসাসংলগ্ন একটি মসজিদ নির্মাণের জন্য ছয় লাখ টাকা প্রদান করেন। আমি ওই মসজিদ নির্মাণে ছয় লাখ টাকার চেয়েও অধিক অর্থ ব্যয় করে মসজিদটি নির্মাণ করি।
জেএমবি গঠন: ১৯৯৮ সালের এপ্রিলে আমি, খালেদ সাইফুল্লাহ, হাফেজ মাহমুদ, সালাউদ্দিন, নাসরুল্লাহ, শাহেদ বিন হাফিজ ও রানাকে শুরা সদস্য নির্বাচন করে জামায়াতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি) গঠন করি। বাংলাদেশকে মোট ছয়টি প্রশাসনিক বিভাগে ভাগ করে কার্যক্রম শুরু করি। প্রথম দিকে দাওয়াতের মাধ্যমে সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালনা করা হতো। পরে দাওয়াত ও লিফলেট বিতরণের মাধ্যমে দুই দফায় সংগঠনের কার্যক্রম সম্পর্কে প্রচার-প্রচারণা চালানো হয়। আমার নেতৃত্বে জামাআতুল মুজাহিদীন সংগঠন নতুনভাবে প্রতিষ্ঠিত হলেও প্রকৃতপক্ষে ব্রিটিশ আমলে এর উৎপত্তি হয়েছিল। সে সময়ে জামাআতুল মুজাহিদীন নামক ইসলামি জিহাদি দলের শীর্ষস্থানীয় নেতা ছিলেন মাওলানা সৈয়দ আহামদ এবং প্রথম সচিব ছিলেন মাওলানা শাহ ইসমাইল, যাঁরা বালাকোটের যুদ্ধে শহীদ হন। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর আমির বরকতুল্লাহকে (আফগানি) পূর্ব পাকিস্তান জামাআতুল মুজাহিদীনের আমির নিযুক্ত করা হয় এবং সে সময়ে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় রাজধানী ছিল আফগানিস্তান ও ইরানের সীমান্তবর্তী এলাকা আস্তমাস্ত প্রদেশে। আমির বরকতুল্লাহর মৃত্যুর পর দিনাজপুর (চিরিরবন্দর) নিবাসী মাওলানা জিল্লুর রহমান হামদানি দলের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। সে সময় তিনি আল মুজাহিদ নামে একটি জিহাদি পত্রিকা প্রকাশনা করতেন। আনুমানিক ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে নাজমুল হক হামদানি দলের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। তিনি দীর্ঘদিন কোনো দলীয় কর্মকান্ড পরিচালনা করেননি। দীর্ঘদিন পর আমার নেতৃত্বে নতুনভাবে জামাআতুল মুজাহিদীন পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর নাজমুল হক হামদানি আমার কাছে এমারতের দায়িত্বভার অর্পণ করে আমার হাতে বাইয়্যাত গ্রহণ করেন।
কর্মী সংগ্রহ শুরু উত্তরাঞ্চল থেকে: জেএমবি গঠনের পর থেকে মূলত আমি সাংগঠনিক কর্মকান্ডের ওপর মনোনিবেশ করি। আমি ঢাকার সবুজবাগ থানাধীন বাসাবোর কদমতলায় অবস্থিত ইয়াসিন মঞ্জিলের নিচতলা ভাড়া নিয়ে ওই বাসা থেকে সংগঠনের কর্মকান্ড পরিচালনা শুরু করি। শুরা সদস্যরা দেশের উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা তথা বৃহত্তর রাজশাহী, রংপুর, দিনাজপুর, বগুড়া ও পাবনা জেলায় গমন করে বিভিন্ন মসজিদ এবং মাদ্রাসায় জিহাদভিত্তিক আলোচনা ও প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। শুরা সদস্যরা দাওয়াত প্রদানের মাধ্যমে বিভিন্ন জেলা থেকে কর্মী সংগ্রহ করে তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে থাকেন। উত্তরাঞ্চলে কর্মী সংগ্রহ আশানুরৃপ হওয়ার পর সারা দেশের বিভিন্ন জেলায় শুরা সদস্যদের সংগঠন সম্প্রসারণের দায়িত্ব দিয়ে প্রেরণ করি।
প্রশিক্ষণ কর্মকান্ড: সংগঠনের তিন ধরনের প্রশিক্ষণ কর্মকান্ড ছিল। যথা−(১) এক রাতব্যাপী প্রশিক্ষণ, (২) তিন দিনের সাধারণ তালিম এবং (৩) টিএস ও টিসি। রিকশা চালনা সংগঠনের প্রশিক্ষণ কর্মকান্ডের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল কর্মীদের অহংকারবোধ খর্ব করে তাদের মধ্যে আনুগত্য সৃষ্টি করা এবং বৈরী পরিবেশে জীবিকা নির্বাহ করার জন্য কর্মঠ করে গড়ে তোলা। ২০০১ সালের শেষ দিকে টাঙ্গাইল জেলার সখীপুরের হাঁটুভাঙ্গার তক্তারচালা নামক স্থানে বোমা প্রস্তুতির ওপর একটি তাত্ত্বিক প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে আমি, নাসরুল্লাহ ও মোল্লা ওমর প্রশিক্ষণ প্রদান করি। ওই প্রশিক্ষণে প্রায় ১৫ জন প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে।
আল-কায়েদা নেতার সঙ্গে সাক্ষাৎ: ১৯৯৮ সালে ঢাকার মাদারটেকের ভাড়া করা বাসায় আল-কায়েদার দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক সমন্বয়কারী (আমার জানামতে) তারিকের (বাংলাদেশের ফেনী বাড়ি) সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়। খালেদ সাইফুল্লাহ এ ক্ষেত্রে পূর্ব যোগাযোগের দায়িত্ব পালন করে। ওই আলোচনায় আমি আমার সংগঠনের উদ্দেশ্য ও কর্মকান্ড সম্পর্কে তাকে বিস্তারিত অবগত করি। আমরা তার কাছে আল-কায়েদার বর্তমান কর্মকান্ড সম্পর্কে জানতে চাই। সে জানায়, ওসামা বিন লাদেন বর্তমানে সৌদি আরবভিত্তিক জিহাদ পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এ কথা শুনে আমরা তাঁর কর্মকান্ডে অংশ নেওয়ার ইচ্ছা পোষণ করি। তখন সে জানায়, সে সৌদি আরবে যাওয়ার পর আমাদের জানাবে। সে আরও জানায়, "এখনো বাংলাদেশে জিহাদের পরিবেশ তৈরি হয়নি। এখানে জিহাদের ক্ষেত্র তৈরি হতে আরও সময় লাগবে। আপনারা কাজ করতে থাকেন।" প্রায় ঘণ্টাব্যাপী আলোচনা শেষে সে প্রস্থান করে। পরে তার দেওয়া ফোন নম্বরে খালেদ সাইফুল্লাহ দু-তিনবার যোগাযোগ করে আমাদের সৌদি আরবে জিহাদি কাজে অংশ নেওয়ার জন্য নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে জানতে চাইলে সে বলে, "আমি যোগাযোগ করছি, পরে জানাব।" কিন্তু দু-তিনবার একই বিষয়ে যোগাযোগ হওয়ার পর ওই নম্বরে তাকে আর পাওয়া যায়নি।
আরএসও ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ: ২০০০ সালে নাইক্ষ্যংছড়িতে অবস্থিত আরএসওর ক্যাম্পে আমি, আতাউর রহমান সানি, সালাউদ্দিন, মোল্লা ওমর ও বাংলা ভাই তাদের ১৫-২০ জন সদস্যকে ১০ দিনব্যাপী বিস্কোরকের ওপর প্রশিক্ষণ প্রদান করি। সে সময়ে আরএসও সদস্যরা আমাদের অস্ত্রের ওপর ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ প্রদান করে।
নতুন শুরা কমিটি: ২০০১ সালের শেষের দিকে নতুনভাবে শুরা কমিটি গঠন করা হয়। পুরোনো শুরা কমিটির কিছু সদস্য তথা শাহেদ বিন হাফিজ ও রানা দল ছেড়ে চলে যাওয়ায় নতুন কমিটি গঠনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। ড. গালিবের দলে যোগদানের বিষয়ে আমাদের সঙ্গে শাহেদ ও রানার মতপার্থক্যের কারণে মূলত তারা দল ছেড়ে দেয়। এ ছাড়া শাহেদ সংগঠন থেকে কিছু অর্থনৈতিক সুবিধা দাবি করে, যা সংগঠনের পক্ষে পূরণ করা সম্ভব না হওয়ায় সংগঠনের সঙ্গে তার দুরত্ব সৃষ্টি হয়। নতুন শুরা কমিটি সদস্যদের মধ্যে আমি আমির। বাকিরা হচ্ছেন নাসরুল্লাহ, হাফেজ মাহমুদ, সালাউদ্দিন, ফারুক হোসেন খান ওরফে খালেদ সাইফুল্লাহ, আসাদুজ্জামান হাজারী, আতাউর রহমান সানি, আব্দুল আউয়াল, সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাই।
পরে ২০০২ সালে নাসরুল্লাহ রাঙামাটিতে বোমা বিস্কোরণে মৃত্যুবরণ করে এবং ২০০৩ সালে আসাদুজ্জামান হাজারী অসুস্থতার কারণে সংগঠন ছেড়ে দেয়।
মহিলা ইউনিট: সংগঠনের প্রায় ৫০-৬০টি মহিলা ইউনিট ছিল। ১০-১২ জন মহিলা নিয়ে একটি ইউনিট গঠিত। তাদের প্রধান দায়িত্ব ছিল দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালনা করা, কোরআন পড়া, নামাজ-কালাম শেখা এবং অন্যকে শিক্ষা দেওয়া, নিজে জিহাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে স্বামী-ভাই-বোন-ছেলেদের উদ্বুদ্ধ করা ইত্যাদি। সাধারণত সংগঠনের সদস্যদের মা, স্ত্রী, বোন এবং মেয়েরাই ওই মহিলা ইউনিটের সদস্য। মহিলা ইউনিটের মধ্যে কেউ আত্মঘাতী দলের সদস্য নন। মহিলা ইউনিটকে জিহাদসংক্রান্ত কোনো শারীরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়নি। জেএমবির কোনো প্রশিক্ষিত এবং নির্ধারিত আত্মঘাতী সদস্য নেই। তবে ১৭ আগস্ট ২০০৫-পরবর্তী ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে অনেক সদস্য আত্মঘাতী হতে উদ্বুদ্ধ হন। ১৭ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে পুলিশ, র‌্যাব ও গোয়েন্দা বাহিনীর হাতে তানজিমের কিছু সদস্য গ্রেপ্তার হন। বিশেষ করে গাজীপুর ও রাঙামাটি জেলায় আটক করা কিছু ব্যক্তি নিজেদের তানজিম নামে সংগঠনের সদস্য বলে পরিচয় দেন। কিন্তু তাঁরা প্রকৃতপক্ষে জেএমবির সদস্য। উল্লেখ্য, তানজিম শব্দের বাংলা অর্থ সংগঠন।
পাকিস্তানে বিভিন্ন জঙ্গি নেতার সঙ্গে সাক্ষাৎ: ২০০২ সালের প্রথম দিকে আমার সৌদি প্রবাসী ভাই ওয়ালিউর রহমানের সহযোগিতায় দ্বিতীয়বার পাকিস্তানে গমন করি। পাকিস্তানে গমন করে প্রথমে লাহোরে অবস্থিত লস্কর-ই-তৈয়বার কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংগঠনের আমির হাফেজ সাঈদ কারাবন্দী থাকায় ভারপ্রাপ্ত আমির আব্দুস সালাম বাটবিসহ অন্যান্য নেতার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। আমার ভাই ওয়ালিউর রহমান লস্কর-ই-তৈয়বার বৈদেশিকবিষয়ক সম্পাদক আবু ওমরের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে এই সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। আমি আব্দুস সালাম বাটবিকে জেএমবির গঠনতন্ত্র, লক্ষ্য এবং কর্মসুচিসংবলিত আরবিতে লেখা চার পৃষ্ঠার একটি লিখিত পুস্তিকা প্রদান করি। ওই পুস্তিকায় বাংলাদেশে কেন কিতাল প্রয়োজন সে বিষয়টিতে বিশেষভাবে আলোকপাত করা হয়। এর কারণ হিসেবে (১) বাংলাদেশে ইসলামি হুকুমত কায়েম নেই, (২) ভারতের আগ্রাসী মনোভাব, (৩) বাংলাদেশে পার্বত্য চট্টগ্রামে ভারতের তৎপরতা এবং (৪) সারা দেশে বিভিন্ন পশ্চিমা মিশনারির ইসলামবিরোধী কর্মকান্ড উল্লেখ করা হয়। আমাদের উল্লিখিত বিষয়বস্তুর ব্যাপারে তিনি একমত পোষণ করেন, তবে দেশের অভ্যন্তরে কিতাল জাতীয় কর্মকান্ড পরিচালনা করলে নিজেদের সমূহ বিপদের আশঙ্কা রয়েছে বলে উল্লেখ করেন।
পরে তাহ্রীক-উল-মুজাহিদীনের আমির শেখ জামিলুর রহমানের সঙ্গে ইসলামাবাদে তাঁর অফিসে সাক্ষাৎ করি। সাক্ষাতে আল-কায়েদা নেটওয়ার্কের সঙ্গে আমার যোগাযোগ করিয়ে দিতে তাঁকে অনুরোধ করি। জবাবে তিনি বলেন, তাঁদের কর্মকান্ড কাশ্মীরভিত্তিক এবং আল-কায়েদার সঙ্গে তাঁদের কোনো যোগাযোগ নেই। আমাদের সংগঠনের কর্মকান্ডের ব্যাপারে আলোচনা করায় তিনি মৌন সমর্থন জ্ঞাপন এবং বাংলাদেশে সফরে এলে এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানার ইচ্ছা পোষণ করেন। অতঃপর আমি বালাকোটের ময়দান পরিদর্শন এবং সৈয়দ আহ্মদ ও শাহ ইসমাইল শহীদের কবর জিয়ারত শেষে তাহ্রীক-উল-মুজাহিদীনের ক্যাম্প পরিদর্শন করতে কাশ্মীরের মোজাফ্ফরাবাদে গমন করি। সে সময় পাকিস্তান সরকার কর্তৃক ওই সংগঠনের কর্মকান্ডের ওপর বিধিনিষেধ আরোপের কারণে আমি সেখানে কোনো প্রশিক্ষণ নিতে পারিনি। শুধু ক্যাম্প এলাকা পরিদর্শন করে ফিরে আসি। ফিরে আসার সময় শেখ জামিলুর রহমান আমাকে ৬০ হাজার রুপি হাদিয়া হিসেবে এবং ঢাকায় অবস্থিত তাহ্রীক-উল-মুজাহিদীনের সদস্য আবদুর রাজ্জাককে হস্তান্তরের জন্য এক লাখ টাকা প্রদান করেছিলেন। দেশে ফিরে আমি ওই টাকা আবদুর রাজ্জাককে (গুরুদাসপুর, নাটোর) হস্তান্তর করি।
পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে ফিরে আসার সময় লাহোরে অবস্থিত মার্কাজে জমিয়াতে আহলে হাদিসের অফিসে তাদের নেতাদের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়। তাঁরা বাংলাদেশে আহলে হাদিস আন্দোলন সংগঠনের বিষয়ে খোঁজখবর নেন। এ ছাড়া জামাআতুল মুজাহিদীন পাকিস্তানের আমির ড. রশিদ রামদাওয়ার সঙ্গে স্বল্পকালীন সাক্ষাৎ হয়। (আগামীকাল পড়ুন বাকি অংশ)

সূত্রঃ প্রথম আলো
কৃতজ্ঞতাঃএস এম মাহবুব মুর্শেদ, অরূপ কামাল

Re: শায়খ রহমানের জবানবন্দি

শায়খ রহমানের পর্বতো ফাঁসির মাধ্যমে শেষ- বাকিদের খুজেঁ তাদের কেও এই শাস্তি দেয়া উচিৎ।

নিজে শিক্ষিত হলে হবে না- প্রথমে বিবেকটাকে শিক্ষিত করতে হবে